সন ১৩১৫। সে সময় ঝালকাঠিতে আব্দুল আলী নামের এক যুবক বাস করতো। ২০ বছর বয়সী এই যুবক অত্যন্ত সুদর্শন ছিল। শখের বশে একটা ঘোড়া কিনে তাতে চেপে সে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়াতো সে। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন গিয়ে পৌঁছালো বরিশালে। সেখানে গিয়ে আলীর দেখা হয় এক সাপুড়ে দলের সাথে। দলের প্রধানের নাম ছিলো ঘাড়ওয়াল। সেই ঘারওয়ালের ঘরে ছিল একটা পরমা সুন্দরী মেয়ে, নাম নিবারণ। নিবারনকে দেখে আলী তার প্রেমে পড়ে যায়।
“ঘাড়ওয়ালের এক মেয়ে ছিল, বয়স পনর ষোল
আর্শি চেয়ে চুল ঝাড়ে চিরুণী লাগাই।।
যেয়ছা মেয়ের মুখের ছটা,
নারাঙ্গি হৃদের গোটা,
হুর পরী মোহ যায় থাকুক গোসাই।
কিন্তু সাপুড়েকে কীভাবে জানাবে তার ভালোবাসার কথা? যদি ভিনদেশী যুবকের হাতে মেয়ে তুলে দিতে না চায়? এ নিয়ে ভীষণ চিন্তায় পড়ে যায় আলী। অনেকক্ষণ ভেবেচিন্তে সে এক ফন্দি বের করে। সাপুড়ের সমস্ত সাপ খাঁচা থেকে বের করে এনে লুকিয়ে নিজের কাছে রাখে। সাপুড়ে অবশ্য ঘুণাক্ষরেও তা জানতে পারে না। পরদিন সাপের খাঁচা নিয়ে বেরিয়ে যায় গ্রামে খেলা দেখাতে। কিন্তু খাঁচায় কোনো সাপ না পেয়ে সে খুব লজ্জায় পড়ে যায়। বাড়িতে ফিরে আসে। বাড়ি এসে সাপুড়ের দল বৈঠকে বসে যে এমন কাজ কে করলো তাদের সঙ্গে! তখন এক সাপুড়ে বলে ওঠে, সেই ভিনদেশী মানুষটা করেছে হয়তো। অন্য কারো তো এমন করার কথা নয়। এমন সব কথার মধ্যখানেই আলী সেখানে গিয়ে পৌঁছায়।
আলীকে দেখেই সাপুড়েরা তাকে মারতে উদ্যত হয়। কিন্তু বিজ্ঞ একজন সাপুড়ে বলে- “ভিনদেশী আলীকে মেরো না। এর দ্বারা যদি আমাদের কোনো ক্ষতিও হয় তবুও এর গায়ে হাত ওঠানো আমাদের উচিত হবে না। কারণ এ আমাদের মেহমান”। একথা শুনে সব সাপুড়েরা আলীর কাছে যায় কথা বলতে। আলীর কাছে গিয়ে তারা আলীর খুব আদর যত্ন করে। কেউ তাকে পিঁড়িতে বসায় তো কেউ পা ধুইয়ে দেয়। তারপর জিজ্ঞেস করে তাদের সাপের ব্যাপারে।
আলী তখন বলে- “আমি ভিনদেশী মানুষ এসেছি তোমাদের এখানে, কিন্তু তোমরা কেউ আমার খোঁজ-খবর নাওনি। তাইতো তোমাদের উপর রাগ করে তোমাদের সব সাপ লুকিয়ে রেখেছি”।
তখন সাপুড়েরা বলে- “আমাদের সাপগুলো আমাদের ফিরিয়ে দাও, এর বিনিময়ে তুমি যা চাইবে তাই দেওয়া হবে”। সুযোগ বুঝে আলী সবার সামনে নিজের ইচ্ছার কথা বলে,
“তবে শুনহ খবর,
নিবারণের সঙ্গে যদি দেও সয়ম্বর–
কুণ্ডলী হইতে সর্প করিব খালাস।”
সাপুড়েরা এ প্রস্তাবে খুব সহজেই রাজি হয়ে যায়। খুব ধুমধাম করে আলীর সঙ্গে নিবারণের বিয়ে দিয়ে দেয়। বিয়ের কয়েক দিন পর আলী স্ত্রী নিবারণকে নিয়ে তার নিজের বাড়িতে যায়। আলীর মা পুত্রবধুকে দেখে খুব খুশি হয়। এভাবেই হাসিখুশির মধ্যে কাটে কয়েক মাস।
কিন্তু এক রাতে নিবারণ স্বপ্নে বিশাল এক অজগর সাপকে দেখে। সাপটা নিবারণের স্বামীর কল্যাণের জন্য পাঠাবলি চায়। নিজের ঠিকানা জানিয়ে সাপটি বলে, তাকে ধরতে চাইলে অবশ্যই আবদুল আলীকে একটি পাঁঠা বলি দিতে হবে। অন্যথা বিপদ! স্বপ্ন দেখে ভয়ে কেঁপে ওঠে নিবারণ। কাঁপতে কাঁপতে আলীকে বলে তার ভয়ানক দুঃস্বপ্নের কথা। আলী অবশ্য খুব একটা পাত্তা দেয় না, বরং রেগেমেগে সেই সাপটাকে মেরে ফেলার বুদ্ধি করে। আলীর এমন সিদ্ধান্ত শুনে তার মা বিলাপ শুরু করে এবং আলীকে যেতে নিষেধ করে। কিন্তু আলী মায়ের কথাও উপেক্ষা করে।
দিনটা ছিল ১৩১৫ সালের ৮ই মাঘ। একে একে ১৭টা নৌকা জড়ো করলো আলী। এই বিশাল প্রস্তুতি নিয়েছ সেই অজগর অভিযানের জন্য। অজগরের বাসস্থানের কাছে গিয়ে নৌকা ভিড়িয়ে দেয় আলী, এরপর সবাইকে নৌকায় রেখে একা এগিয়ে যায় সাপের ঢিবির দিকে। ঢিবির কাছে গিয়ে শুরু করে বীণ বাজাতে। সেই বীণের শব্দে সাঁপটি ফোঁসফোঁস করতে করতে ঢিবি থেকে বেরিয়ে আসে।
“ছত্রিশ রাগিনী আবদুল বাঁশিতে ফুকোয়
শুনিয়া সে বাশির সুর, সর্পে অঙ্গরে ফুলায়।”
সোয়া হাত সাপটি চোখের পলকে ফুলেফেঁপে পঁয়তাল্লিশ হাত হয়ে আলীকে আষ্টেপৃষ্টে পেঁচিয়ে ধরে। আলী তখন উপায়ান্তর না দেখে মা আর বউকে ডাকতে থাকে। সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলো তমিজউদদীন। সে মাটিতে রক্ত দেখে উপরে বাঁশঝাড়ের দিকে তাকায়। তাকিয়ে দেখে বিশাল এক সাপ একটা মানুষকে পেঁচিয়ে আছে। দূরে সে নৌকা বাঁধা দেখে নৌকার কাছে গিয়ে চিৎকার করে বলে- “তোমাদের লোককে সাপে ধরেছে”। একথা আলীর মা শুনতে পেয়ে বিলাপ করতে থাকে।
“আহারে পাপিষ্ঠ সর্প দুষ্ট দুরাচার
বধূসঙ্গে দর্প করি হইলাম সংহার।
নিবারণের সঙ্গে কত করিলাম জেদ
মরণকালে না শুনিলাম মায়ের নিষেধ!”
নিবারণ তখন ঘুমাচ্ছিলো। আবদুল আলীর মায়ের বিলাপেও তার ঘুম ভাঙে না, তখন শ্বাশুড়ি তাকে রাগের চোটে লাথি মারতে থাকে। তিন লাথির পর নিবারণ জেগে ওঠে এবং স্বামীকে বাঁচানোর জন্য জোড়াপাঁঠা নিয়ে গিয়ে বলি দেয় সেই সাপের সামনে তবুও সাপকে শান্ত করতে পারে না। উপায় না পেয়ে নিবারণ মন্ত্রপড়া কড়ি সাপের মাথায় নিক্ষেপ করে। সেই কড়ির মন্ত্রের আঘাতে সাপটি আলীকে ছেড়ে দেয় এবং আগের সোয়া হাত আকারে ফিরে যায়।
“নড়িতে চড়িতে সর্পের শক্তি না রহিল
ষোল পেচি লেজ ক্রমে খসাইতে লাগিলো
আপন লেজের পেচ খসাইয়া লয়
পাচল্লিশ হাত সর্প ছিল, সোয়া হাত হয়।”
মৃত আলীকে কোলে নিয়ে নিবারণ আমতলী থানায় যায়। থানার দারোগা আলীর মৃত্যুর কারণ জিজ্ঞেস করলে নিবারণ বলে সাপে কেটে আলী মারা গেছে। কিন্তু দারোগা ঘুষ খাবার লোভে সে কথাতেও ভুল ধরা শুরু করে– “নিজেই স্বামীকে মেরে এখন সাপের দোষ দিচ্ছ?” নিবারণ তখন উপায় না পেয়ে দারোগার হাতে দশ টাকা ঘুষ দেয়। তখন দারোগা শান্ত হয়ে আলীর নাম সাপে কাটা মরার তালিকায় দিয়ে দেয়।
থানার ঝুটঝক্কি মিটিয়ে নিবারণ বাড়িতে ফিরে আসে আলীকে। মৃত আলীকে ঘিরে সবাই বিলাপ করতে থাকে। কিন্তু হাল ছাড়ে না নিবারণ। সে তার বাবার রেখে যাওয়া কড়ি নিয়ে মন্ত্র পড়া শুরু করে। মন্ত্রের প্রকোপে কড়ি জাগ্রত হয়ে সেই অজগর সাপের মাথায় বাড়ি দিতে থাকে। সেই আঘাতে সাপ অস্থির হয়ে মাটিতে পড়ে তড়পাতে থাকে। তখন নিবারণ মন্ত্রের তেজ আরো বাড়ায়। সাপ তখন সহ্য করতে না পেরে আলীর শরীরের বিষ তুলে নেয় নিজের শরীরে এবং মারা যায়।
আস্তে আস্তে আলীর জ্ঞান ফেরে। এমন ঘটনা দেখে আশ্চর্য হয়ে যায় সবাই। নিবারণের নাম ধরে সবাই ধন্য ধন্য করতে থাকে। স্বামী সুস্থ হলে নিবারণ মন্ত্র পড়া বন্ধ করে স্বামীর পায়ে প্রণাম করে জড়িয়ে ধরে স্বামীকে। আলীর মা ও যেন তার হারানো সাত রাজার ধন ফিরে পায়। আলী তখন প্রতিজ্ঞা করে যে, না বুঝে গায়ের জোরে সে আর কোনোদিন কিছু করবে না।
তারপর আলী স্ত্রী নিবারণ ও তার মাকে নিয়ে সুখে শান্তিতে দিন কাটাতে থাকে।