Cover illustration for বেঙ্গমা ও রাজপুত্র

বেঙ্গমা ও রাজপুত্র

CATEGORY
Bengali Folktale

BASED ON THE BOOK

Fabulous Females and Peerless Pirs

by Tony K. Stewart

রাজা ভীমসেনের রাজধানী ছিল ভিল্লির পশ্চিম অংশে। রাজা ছিলেন ন্যায়পরায়ণ। তার দরবারে হাজির হতেন বহু জ্ঞানীগুণী পণ্ডিত এবং ব্রাহ্মণরা। সে রাজ্যে ছিল রাখাল, মালি, তেলী, কামার, চাষীসহ সকল পেশার মানুষজন, এমনকি ভবঘুরেও। একেবারে হতদরিদ্র বাদে সকলেরই ঘরবাড়ি ছিল। মানুষ ছিল মোটামুটি সচ্ছল।

এমন সুখের রাজ্যে বাস করতো এক তরুণ পাখিশিকারী। পাখি শিকার করলেও সে কখনো মারতো না। রোজ ভোরে সে জাল নিয়ে বনে যেত পাখি ধরতে। বুনো পাখিগুলোকে ধরে ঐ জালেই ভরে কাঁধে নিয়ে চলে যেত হাটে, আর সেসব বেচে যা মিলতো– তা দিয়ে খেয়েপরে বাঁচতো।

সে জলা থেকে ধরে আনতো পাতিহাঁস আর ল্যাঞ্জাহাঁস। ধরতো নদীচিল, পাকাশি, কালাপাখ ঠেঙ্গি, মেটে রাজহাঁস। গাছের কোটর থেকে বের করে আনতো নানা জাতের পেঁচা। টিয়া, লালগলা চুটকি, টিট্টিভ ধরতো ঝাঁকে ঝাঁকে। ফিঙ্গে, চখা, পানকৌড়ি, আর কদাচিৎ ধনেশও ধরা পড়তো তার জালে।

এক সকালে বরাবরের মতো কাঁধে জাল আর খাঁচা নিয়ে ব্যাধ বের হলো। ঠিক সে সময়ই মক্কায় বসে সত্যপীর ফকিরকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর উপাসনা কেমন হচ্ছে, তা জানাতে। ফকির বললো,

“হজরত, এক শিকারী রোজ বনে পাখি ধরতে যায়। আপনি তাকে দেখা দিন এবং বেঙ্গমা পাখির সন্ধান দিন। সেই পাখির মুখ থেকে আপনার প্রার্থনা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে যাবে।”

ফকিরের কথামতো সত্যপীর এক ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধারণ করলেন, পরলেন পৈতা আর সাদা ধুতি, পায়ে খড়ম, একহাতে ছাতা। আরেক হাতে রাখলেন পঞ্জিকা। গিয়ে দাড়াঁলেন শিকারীর চলার পথে একবারে মাঝখানে– “এসো শিকারী, পঞ্জিকার কথা শুনে যাও।”

ব্যাধ জবাব দিল, “‘ক্ষমা করবেন। আমার একটি কড়িও নেই। এখন আমি পঞ্জিকা শুনতে পারবো না।”

সত্যপীর থামলেন না। তিনি পঞ্জিকা পড়া শুরু করলেন।

“আজ বুধবার, সূর্যগ্রহণের ৩য় দিন, বাণিজ্যের জন্য শুভ। হে তরুণ ব্যাধ, আজ সুন্দরবনে তুমি সাফল্যের মুখ দেখবে। বনে পাবে প্রচুর বুনো পাখি। কিন্তু মন দিয়ে শোনো কী বলছি। বনের গভীরে এক অশোক গাছের ফাটলে একজোড়া বেঙ্গমা-বেঙ্গমী বাস করে। ঐ পাখি ধরতে পারলেই তোমার সব দুঃখ চলে যাবে।”

এই কথা শুনে জঙ্গলের গভীরে ঢুকলো শিকারী। ওই অশোক গাছের কাছে গিয়ে সে তার জাল ছড়িয়ে দিল। ডালপালা, ঘাসপাতা দিয়ে নিজের শরীর ঢেকে রাখলো যাতে হুট করে তাকে দেখে বোঝা না যায়। কিন্তু বেঙ্গমা-বেঙ্গমীর চোখ এড়াতে পারলো না। বেঙ্গমী বললো, “ওগো, শুনছো, বনটা কেমন নড়ছে, অশুভ লক্ষণ। ওখানে তো অত পাতা থাকবার কথা নয়, ফুলের কুড়িও নেই, ডালগুলোও কেমন করে দুলছে। বহুদিন হলো এই জঙ্গলে আছি, কিন্তু আমাদের বোধহয় অন্য কোথায় চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। চলো, এখনই আমরা অন্য বনে চলে যাই। গাছগুলো যেন আমাদের চারপাশে ঘিরে ফেলছে। আমি কখনো এরকম দেখিনি আগে। এখানে থাকলে জীবন হারাতে হবে!”

বেঙ্গমা বেঙ্গমীর কাছে গিয়ে বসলো, কিন্তু স্ত্রীর কথাকে সে তেমন গুরুত্ব দিল না। ততক্ষণে পীরের কেরামতিতে ব্যাধের গুটিয়ে আনা জাল বেঙ্গমার গলায় চেপে বসলো। মাটিতে পড়ে পাখিটা ছটফট করতে লাগলো, মনে হলো, যেন মরেই যাবে।

বেঙ্গমা বললো, “শিকারী, তুমি প্রাণীহত্যা করছো কেন? যে পাখিদের তুমি কষ্ট দিয়ে বন্দী করছো, তোমার দশাও একসময় তাদের মতোই হবে। তুমি যত পশুপক্ষী হত্যা কিংবা বন্দী করবে, সবার ফল তোমাকে পেতে হবে। তোমার স্ত্রী-সন্তান কেউ সেই শাস্তির ভাগ নেবে না। আমার কথা শোনো। শ্রীকৃষ্ণের বন্দনা করো।”

পাখির মুখে মানুষের কণ্ঠে কথা শুনে ব্যাধ জাল কেটে দিলো এবং বেঙ্গমাকে হাতে বসিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। এদিকে গাছে বসে বেঙ্গমী কাঁদছে। বললো, “শিকারী, তুমি ধর্ম-অধর্ম কিছুই বোঝো না। এই যে পাখিদের শিকার করছো, এ অন্যায়, অধর্ম। এখন অন্তত সঠিক কাজটা করো, আমার স্বামীকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে এক ছড়া চুনি দেব।”

ব্যাধ বললো, “সুন্দর-পালক পাখি, তোমার কথা বিশ্বাস করলাম। কিন্তু আমার লাভ কী হবে?”

বেঙ্গমা তখন শিকারীকে কৃষ্ণের কাহিনী শোনালো।

“এক ভোরে কৃষ্ণ তার পালক পিতা নন্দের বাড়িতে বন্ধুদের সাথে খেলছিলেন। এই ফাঁকে গোপাল গিয়ে মাটি হাতে নিয়ে মুখে দেয়। আরেক বালক এই মাটি খাওয়া দেখে গিয়ে যশোদাকে বলে দেয়। যশোদা দৌড়ে আসেন, রাগে কৃষ্ণকে বকতে শুরু করেন, “সকালেই না তোমাকে দুধ-ননী দিলাম, কেন মাটি খাচ্ছো?” নিরীহ কৃষ্ণ বলেন, “থামো থামো। আমি তো মাটি খাইনি মা, এই যে আমার মুখে দেখো।” যশোদা তার মুখের ভেতর তাকালেন, তাকিয়েই দেখলেন পুরো বিশ্বজগত।”

কৃষ্ণের কাহিনী শুনে শিকারী নিজের পাপের কথা ভেবে কাঁদতে লাগলো। বললো, “আজকে থেকে তুমি আমার গুরু। কৃষ্ণের গল্প বলে তুমি আমাকে শুদ্ধ করলে। কিন্তু আমি পাখি ধরি, কারণ এটাই আমার জীবিকা। না হলে খাবো কী? পরবো কী?”

বেঙ্গমা তখন তাকে নিজের গলায় গাঁথা তিনটি অমূল্য চুনিপাথর ব্যাধকে দিয়ে দিল। কিন্তু দরিদ্র ব্যাধ মণিমুক্তা চেনে না। সে বললো, “তুমি আমাকে বুনো ফলের বীজ গছিয়ে দিলে?”

বেঙ্গমা তখন শিকারীকে বললো, “আগামীকাল রাজদরবারে এগুলো নিয়ে যাও। আমি কথা দিচ্ছি, যদি তুমি কোনো বিপদে পড়ো, আমাকে স্মরণ করো। বেঙ্গমারা কথা রাখে।” এই প্রতিশ্রুতি পেয়ে ব্যাধ বেঙ্গমাকে ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে গেলো। পথে তার পাখি ধরার জাল ফেলে দিল।

এদিকে ব্যাধের বউ উদ্বিগ্ন হয়ে বসে ছিল। সাতদিন হলো ঘরে খাবার কিছু নেই। সকালে উঠেই স্বামী বনে গেছে। কোনো পশু-পাখি ধরতে পারলে নিশ্চই সে দ্রুত ফিরে আসতো। এরইমধ্যে ব্যাধ খালি হাতে বাড়ি ঢুকলো। এই দেখে শিকারী-বউ দুঃখে কান্না জুড়ে দিল। ব্যাধ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে তিনটি চুনি দেখালো, যা তাকে বেঙ্গমা দিয়েছে।

বউ বেশ উলটেপালটে দেখে বললো, “এগুলো আসলেই চুনি? নাহ, নিশ্চই কোনো ফলের বীজ।” বলেই সে ছুঁড়ে ফেলে দিল। দুটো চুনি ঘরেই পড়লো, আরেকটা পড়লো বাইরে। সেই রাত তাদের রাগেদুঃখে কাটলো। তারা দুজনেই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন বাইরে টহল দিচ্ছিল এক পেয়াদা। চাঁদের আলোয় চুনি জ্বলজ্বল করতে দেখে পেয়াদা তা তুলে নিলো। সে তখনই চুনিটা নিয়ে দ্রুত নিজের বাড়ি চলে গেল।

সত্য নারায়ণ সব ঘটনাই জানতেন। তিনি ঘুমন্ত শিকারীর শিয়রে বসে তার স্বপ্নে বললেন, “ওঠো, ওঠো। তুমি বোকামি করে চুনি পেয়েও কীভাবে রাগের মাথায় ফেলে দিতে পারো? পাখিটা তোমাকে অমূল্য মণি দিয়েছে। সেগুলো ফেলে দিয়ে ঘুমাচ্ছো কেন? বাকি মণি দুটো রাজার কাছে নিয়ে যাও! তোমার দুঃখের দিন ফুরাবে।”

সকালে উঠে চুনিগুলো নিয়ে শিকারী রাজদরবারে গেল। রাজার কাছে প্রার্থনা করলো, “আমাকে কিছু চাল এবং কড়ি দিন, নিয়ে আমি নিজের কুটিরে ফিরে যাব।” রাজা অবিশ্বাসের সুরে হেসে ফেললেন, “কত মণ চাল চাও এর বিনিময়ে?”

শিকারী এসব বিষয়ে তেমন কিছু বোঝে না। তাই সে পাঁচ মণ চাল চাইলো। রাজা চুনির মূল্য বুঝেছিলেন, তাই এর বদলে তাকে খুব সহজে পাঁচ মণ চাল দিয়ে দিলেন। শিকারী আর তার বউও খুব খুশি হলো।

রাজা সে রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে বিছানায় বসে একটু জর্দা দিয়ে কর্পূরমাখা পান খেলেন। তারপর রানিকে চুনি দুটো উপহার দিলেন। রানি তো মহাখুশি। তিনি চাকরানিদের ডেকে সাজসজ্জা করাতে বললেন। তারা তার চুল আঁচড়ে দিল, ফুল জড়িয়ে দিল খোঁপায়, চোখে দিল কাজল। রানিকে অপরূপ লাগছিল। চুনি দুটো তিনি দুই কানে পড়লেন। রূপ দেখে মনে হচ্ছিল যেন ইন্দ্রের অপ্সরী। কিন্তু তার দাসীদের একজন বললো, “আরেকটা অলঙ্কার থাকলেই সাজ পূর্ণ হতো।” তখন দাসী বললো, “রাজাকে বলুন আরেকটা চুনি এনে দিতে। তা রানির কপালে পরালে তার চেহারা শত চন্দ্রের চেয়েও উজ্জ্বল দেখাবে।”

রাজা অন্দরমহলে আসতেই রানি কথাটা পাড়লেন। কিন্তু রাজার কাছে তো আর চুনি নেই। এই নিয়ে রানি কান্নাকাটি শুরু করলেন। রাজাকে মাথার দিব্যি দিলেন, যে করেই হোক আরেকখানা চুনি তার চাই-ই চাই।

রানিকে শান্ত করে রাজা এরপর অমাত্যদের ডেকে তাদের পরামর্শ চাইলেন। তারা বললো ব্যাধকে ধরে এনে আরেকটা চুনি খুঁজে আনতে বলা হোক। কোটাল গিয়ে ব্যাধকে ধরে আনলো।

সব শুনে বেচারা শিকারীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। তবু সে মনে আশা নিয়ে বললো, “ঠিক আছে মহারাজ, আমি যেখানে আগেরগুলো পেয়েছিলাম সেখান থেকেই আবার নিয়ে আসবো।” তখন তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো। ব্যাধ আবার বনে সেই অশোক গাছের কাছে গেল। কিন্তু এবার বেঙ্গমা তাকে দেখেই উড়াল দিল। শিকারী গাছের গোড়ায় বসে কাঁদতে লাগলো, ‘তুমি আমাকে কথা দিয়েছিলে। দয়া করে কথা রাখো বেঙ্গমা!”

তখন বেঙ্গমা নেমে এলো, শিকারী তাকে রাজদরবারে নিয়ে গেল।

“মহারাজ, এই পাখিই আমাকে চুনিগুলো দিয়েছিল।”

“তুমি কি আমাকে আরেকটা চুনি দিতে পারবে এখুনি?” মহারাজ জিজ্ঞেস করলেন।

“মহারাজ, আমার কাছে কৃষ্ণের নাম আর কাহিনি ছাড়া আর কোনো সম্পদই নেই।”

“তাহলে কৃষ্ণের কথাই শুনি তোমার মুখ থেকে!”

তখন সকলে বেঙ্গমার বর্ণনায় কৃষ্ণের জন্মের সময় ব্রহ্মা, নারায়ণ এবং গোবর্ধন পর্বতের কথা মুগ্ধ হয়ে শুনলো। বেঙ্গমা রাজাকে পরামর্শ দিলো, হিংসার পথ ছেড়ে ভক্তির পথে ফিরতে। বেঙ্গমাকে রাজার খুব পছন্দ হয়েছে। তার কথায় তিনি শিকারীকেও ছেড়ে দিলেন। কিন্তু রাজা ছাড়লেন না বেঙ্গমাকে। সোনার খাঁচায় পুরে তাকে রেখে দিলেন, দুই বেলা রাজা-রানি নিয়ম করে বেঙ্গমার কাছে কৃষ্ণকথা শোনা শুরু করলেন।

এভাবেই বারো বছর কাটলো। একবার রাজ্যে বাঘেরা হানা দিল। রাজা নয় লক্ষ সেনার বাহিনী নিয়ে সেই উপদ্রব দূর করতে গেলেন। এদিকে রাজপুত্র কামোদরা বেঙ্গমার মুখে কৃষ্ণকথা শুনছে মুগ্ধ হয়ে। পাখি বললো, “কামোদরা, আমি এখন নাচবো। মন ভরে দেখো। যখন ময়ূরের মতো পেখম ছড়িয়ে সেই অপূর্ব পাখি নাচতে আরম্ভ করলো, রাজপুত্র যেন সম্মোহিত হয়ে গেল। তখন বেঙ্গমা বললো, “কিন্তু এই খাঁচার মধ্যে নাচা যে অসম্ভব। আমাকে ছেড়ে দাও।”

কামোদরা বললো, “কিন্তু তুমি যে উড়ে চলে যাবে।”

বেঙ্গমা বললো, “আমি কেন উড়ে যাবো? তুমি ছেড়ে দিলে আমি বরং ঠিকভাবে তোমাকে নাচ দেখাতে পারবো।”

বেঙ্গমার কৌশল বুঝতে না পেরে কামোদরা খাঁচা খুলে দিল। বেঙ্গমা বাইরে এসে পাখা ছড়িয়ে কিছুক্ষণ নাচলো, আর রাজপুত্র যখন অসতর্ক, তখনই পাখা মেলে বেঙ্গমা হাসতে হাসতে উড়াল দিল। উড়ে গিয়ে বসলো প্রাসাদের দেয়ালের চূড়ায়। কামোদরার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। সে বেঙ্গমার কাছে কাঁদতে কাঁদতে বললো, “তুমি চলে গেলে রাজা আমাকে মেরেই ফেলবেন।” পাখি তখন তাকে আশ্বস্ত করে বলললো, “রাজা তোমাকে মারতে গেলে আমার কথা মনে করো, আমি আসবো। কিন্তু ১২ বছর বন্দী থাকার পর আমি অবশেষে মুক্তি পেয়েছি, এখানে আর থাকতে পারবো না।”

এই বলে সে উড়ে চলে গেল। এদিকে ঠিক এই সময়ই মহারাজ বন থেকে ফিরে এলেন এবং বেঙ্গমাকে আনতে পাঠালেন। কিন্তু পাখির পালিয়ে যাওয়ার খবর শুনে তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। তক্ষুনি কামোদরাকে ডেকে পাঠানো হলো। আজ তার রক্ষা নেই।

পাখি তো উড়ে চলে গেলো। ঘোর বিপদে পড়লো বেচারা রাজপুত্র। সে তার বাবার কাছে কাঁদতে কাঁদতে প্রাণভিক্ষা করতে লাগলো। কিন্তু রাজা তাকে কোনো মায়াদয়া দেখালেন না। পাখির শোকই যেন তার কাছে বেশি বড়। রাজার আদেশে কোটাল কামোদরাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল। তখন কোটালের কাছে কামোদরা অনুরোধ করলো,

“আমাকে একবার আমার মায়ের কাছে যেতে দাও। তিনি নিশ্চই বাবাকে বোঝাতে পারবেন।”

কোটাল তা-ই করলো। কামোদরা তার মায়ের পায়ের কাছে পড়ে কাঁদতে লাগলো। কিন্তু রাণী কর্কশভাবে বললেন, “পাখিটা ছেড়ে দিলে কেন? রাজার কথার উপর আমার কথা নয়।” রাজপুত্রের মন ভেঙে গেলো। বাবা-মা কেউই তাকে একটা সুযোগ দিলেন না। তখন কোটাল রাজপুত্রকে বনে নিয়ে গেল।

তখন কামোদরা নিজের প্রাণ বাঁচাতে শেষ চেষ্টা করলো। কোটালকে সে বললো, সে শেষ একবার হ্রদে স্নান করতে চায় এবং মৃত্যুর আগে কৃষ্ণের কাছে নিজের মুক্তির জন্য প্রার্থনা করতে চায়। কোটাল রাজা-রানির মতো অত নিষ্ঠুর ছিল না। সে রাজি হলো।

রাজপুত্র স্নান করলো। তারপর কয়েক ফোটা গঙ্গাজল হাতে নিয়ে তর্পণ শুরু করলো। তারপর স্মরণ করলো তার মাতা, পিতা, বান্ধব, সহপাঠীদের। শেষে বেঙ্গমার কথা স্মরণ করলো।

এই প্রার্থনা শুনে সত্য নারায়ণের বোধোদয় হলো। তিনি দেখলেন বেঙ্গমা তার প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়ায় এখন রাজুপত্রের প্রাণ যায় যায়। পীর ক্রুব্ধ হয়ে বেঙ্গমাকে ভর্তসনা করলেন, “বেয়াদব, পালিয়ে গেছ, এদিকে কি বিপদে ফেলে গেছ। তোমার কারণে কামোদারা এখন শিরশ্ছেদ হতে চলেছে। আমি আদেশ দিচ্ছি, এখুনি যাও এবং তাকে তোমার পিঠে করে এখানে নিয়ে আসো।”

বেঙ্গমা সাথে সাথে উড়াল দিল এবং রাজপুত্রকে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল। দেখে সবার মধ্যে হাহাকার পড়ে গেল। কিন্তু রাজা-রানি আগের মতোই নির্বিকার রইলেন। নগরের জনগণ অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলো রাজপুত্রের জন্য। ওদিকে পক্ষীরাজ কামোদরাকে পিঠে নিয়ে উড়তে উড়তে যেন স্বর্গের কাছে পৌছে গেল। তারপর গেল পশ্চিম দিকে, বনের গভীরে। সেখানে একটা ভাঙাচোরা বাড়ি দেখতে পেয়ে কামোদরাকে সেখানে নামিয়ে দিল আর বললো, “যতখন আমি খাবার নিয়ে ফিরে না আসি তখন এখানেই থেকো।”

কামোদরা বললো, “আমার আর কীইবা করার আছে? তুমি হয়তো আবার উড়ে চলে যাবে আর ফিরবে না।”

পাখি কামোদরাকে আশ্বস্ত করে উড়াল দিল খাবারের সন্ধানে। কাছেই ছিল আরেক রাজ্য, যার রাজা ছিলেন রাজা বীরবর। তার রাজধানীতে ঢুকে এক মিষ্টির দোকান থেকে বেঙ্গমা কিছু মিষ্টান্ন নিয়ে উড়াল দিল। ফেরার পথে রাজদুর্গের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় নিচে তাকিয়ে সে রাজকন্যাকে দেখতে পেল। সূর্যমণি নামের সেই রাজকন্যা আসলেই ছিল সূর্যোদয়ের মতো সৌন্দর্যময়। পাখি মনে মনে ভাবতে লাগলো, এই সুন্দরী মেয়ের সাথে কামোদরার বিয়ে দেওয়া যায় কীভাবে।

খাবার খেয়ে রাজপুত্র তৃপ্ত হবার পর বেঙ্গমা তাকে সূর্যমণির কথা বললো। শুনেই কামোদরা অস্থির হয়ে গেল। কিন্তু প্রাসাদ ইন্দ্রজালে ঘেরা। তারা ঢুকবে কীভাবে? অনেক ভেবে বেঙ্গমা উপায় বের করলো। সে নিজের জাদুশক্তি দিয়ে ইন্দ্রজাল ভেদ করে রাজপুত্রকে নিয়ে একদম রাজকুমারীর ঘরে পৌঁছে গেল।

ঘুমন্ত সূর্যমণিকে রাজপুত্র স্পর্শ করলো না, পাছে তার ঘুম ভেঙে যায়। শুধু তাকে মন ভরে দেখেই সে রাতে ফিরে এলো।

দু’দিন পর আবার বেঙ্গমার পিঠে চড়ে রাজপুত্র গেল। মণিমুক্তাখচিত একটি দীপ জ্বলছিল রাজকন্যার শিয়রে। রাজপুত্র সেদিনও তাকে জাগালো না, শুধু তাকে রাত ভরে দেখলো। তার মনে হলো, ও চলে গেলে রাজকন্যা জানবে কীভাবে– কামোদরা এসেছিল? তখন সে নিজের চাদর রাজকন্যার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে এলো। ভোরে ঘুম থেকে উঠে সূর্যমণি অবাক হয়ে গেলেন গায়ের সেই নীল পোশাক দেখে।

এদিকে প্রাসাদে নিয়ম ছিল রোজ সকালে পরিচারিকাগণ রাজকুমারীর ওজন মাপতো। সেদিন সকালে দেখা গেলো রাজকুমারীর ওজন দৈনিক ওজনের দ্বিগুণ। পরিচারিকারা অবাক হলো। সূর্যমণি বললো, “বাড়ন্ত তরুণীর ওজন নিয়মিত বাড়বে এটাই স্বাভাবিক, যাও তোমরা।”

দিন কেটে গেলো। সেই রাতে কামোদরা যখন এলো, রাজকুমারী তখন জেগে। তাকে দেখে রাজকুমারী খুব রেগে গেলো। “কে তুমি? কার পুত্র? কোথায় তোমার দেশ?” কামোদরা তার সব দুঃখের কাহিনী তাকে খুলে বললো। তখন রাজকুমারীর মনও গলে গেল।

এর পর থেকে প্রতি রাতেই বেঙ্গমার পিঠে চড়ে কামোদরা এসে রাজকুমারীর সাথে দেখা করে। পীরের অলৌকিক ক্ষমতার কারণে অন্য কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পেলো না।

এদিকে একদিন সূর্যমণি সন্তানসম্ভবা হলো। খবর পেয়ে রাজবাড়িতে হৈচৈ পড়ে গেলো, কিন্তু সূর্যমণি সব কথা অস্বীকার করলেন। রক্ষীকে তিনদিনের সময় দেয়া হলো, কে আসে সূর্যমণির কাছে– খবর নিতে হবে।

বৈষ্ণব ফকিরের ছদ্মবেশ ধরে দুইদিন পুরো শহর তন্নতন্ন করে খুজে রক্ষী হয়রান হলো। অবশেষে সে এক রাতে রাজকুমারীর শয়নকক্ষের চতুর্দিকে সিঁদুরের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিল।

সে রাতে কামোদরা আসতেই সূর্যমণি তাকে সতর্ক করে দিল আর বললো ফিরে যেতে। কামোদরা তার কথা শুনলো। ওদিকে ঘরে ঢুকতেই তার পোশাক সিঁদুরে মেখে গেল। ভোরে রাজপুত্র ফিরে গেল বনের গভীরে। কিন্তু কাপড় থেকে সিঁদুরের দাগ দূর করার জন্য সে এক ধোপার কাছে কাপড়গুলো দিয়ে এলো।

এদিকে বুদ্ধিমান রক্ষী ঠিকই ছুটলো ধোপার বাড়ি, যেখানে দরজার কাছেই রাখা ছিল কামোদরার কাপড়। যখন সন্ধ্যেবেলায় কামোদরা এলো ধোয়া কাপড় নিতে, ধোপার ছদ্মবেশ নিয়ে তখন দাঁড়িয়ে ছিল রক্ষী স্বয়ং। কামোদরা বন্দী হলো।

রাগে জ্বলে উঠলেন রাজা। তিনি কামোদরার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেন। সূর্যমণি কপাল চাপড়ে কাঁদতে লাগলো।

এদিকে হ্রদের তীরে পৌঁছার পর কামোদরা রক্ষীর থেকে কিছু সময় চেয়ে নিলো মৃত্যুর পূর্বে শেষবার প্রার্থনার কথা বলে। তারপর হ্রদে নেমেই সে বেঙ্গমাকে ডাকলো। পক্ষীরাজও ঠিক এসে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে গেল। আর যাবার পথে তারা রাজকুমারী সূর্যমণিকেও তুলে নিয়ে গেল।

বেঙ্গমার সাহায্যে তারা দুজনে গিয়ে বনে বাসা বাঁধলো। ছোট্ট এক সুখের সংসার। একদিন সূর্যমণির এক বিশেষ আম খেতে ইচ্ছা করলো। কামোদরা বললো, “আমি নগণ্য মানুষ, কোথায় পাবো এই ফল?” সব শুনে বেঙ্গমা বললো, “আমি কথা দিচ্ছি, ‘তোমার জন্য এই আম আমি নিয়ে আসবো। ভয়ের কিছু নেই। সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে লঙ্কা দ্বীপ থেকে বারো দিনে আমি ফিরবো। এখানেই থাকো তোমরা।”

উড়ে উড়ে সেই লংকা দ্বীপে গিয়ে বেঙ্গমা ঐ আম পেল। নিজে একটা খেলো আর দুটো নিয়ে ফেরার পথ ধরলো। পথে পড়লো চন্দনদ্বীপ।

কিন্তু বহুদিন পার হয়ে গেলেও তার আর খোঁজ পাওয়া গেল না। সূর্যমণি আর কামোদরা তার চিহ্ন ধরে খুজতে খুজতে চন্দনদ্বীপে গিয়ে অবশেষে তাকে পেল। চন্দনের বনে পড়ে ছিল বেঙ্গমার মৃতদেহ, আর পাশে তাদের জন্য আনা দুটো আম।

শোকার্ত রাজপুত্র গঙ্গাজলে বেঙ্গমার দেহ স্নান করিয়ে তার এবং তার সাতপুরুষের আত্মার মুক্তির জন্য পিণ্ডদান করলো।

বেঙ্গমার আনা সেই ফল খেয়ে রাজকুমারীর ঘরে ১০ মাস ১০ দিন পর জন্ম হলো এক ফুটফুটে পুত্রসন্তানের। নাম রাখা হলো বীরবর, সূর্যমণির পিতার নামে।

তারা তিনজন নদীতে ভাসমান এক কলাগাছের ভেলায় চড়ে বসলো। এক নেপালি ইঁদুর ভেসে যাচ্ছিল। কামোদরা বললো, সে এটা তুলে নিয়ে পালবে। সূর্যমণি মানা করলো। কিন্তু কামোদরা কথা শুনলো না। আসলে পীরের কেরামতি সে বোঝেনি। এই ইঁদুর ছিল পীরের পাঠানো। ইঁদুর ভেলার ভেতর এমনভাবে ছিদ্র করে ফেললো যে ভেলা তিন টুকরা হয়ে তিনজনকে তিন দিকে নিয়ে গেল।

কামোদরা ভেসে গেল উত্তরের দেশে, সেখানে গিয়ে সে এক আখের বাগানে কাজ নিল। সূর্যমণি গিয়ে পৌছলো এক মালির বাগানে। মালিনী তাকে নিজের বাড়িতে তুলে নিল। আর তাদের পুত্রকে এক বাণিজ্যফেরত বণিক উদ্ধার করে নিয়ে গেল।

গঙ্গাধর নামের সেই বণিকের বাড়িতে সে আদর-যত্নে বড় হতে লাগলো, যেমন কৃষ্ণ প্রতিপালিত হয়েছিলেন পালকপিতা নন্দের গৃহে। এভাবে পাঁচ বছর কেটে গেলো।

ঐ বণিকের জমিজমার পূর্ব অংশেই ছিল ঐ মালির বাড়ি। সেখানে দিনরাত কাজ করা সূর্যমণি একদিন তার ছেলেকে দেখলো এক সুন্দরী গৃহকর্ত্রীর সাথে। স্তব্ধ সূর্যমণি কেবল রামনাম স্মরণ করে কাঁদতে লাগলো।

সত্যপীর সূর্যমণির সামনে হাজির হয়ে বললেন তার সন্তানের কাছে যেতে। আরো জানালেন, কামোদরা শহরে এক ময়রার বাড়িতে আছে।

সূর্যমণি তখন গিয়ে তার ছেলেকে সব খুলে বললেন। মনে অনেক প্রশ্ন নিয়ে ছেলেটা ছুটলো বণিকের কাছে। জিজ্ঞেস করলো, বাবা, সত্যি করে বলতো, “আমার আসল মা-বাবা কে?”

বণিক বুঝতে পারলো সত্যিটা বলার সময় এসেছে। দুঃখের সাথে সে ছেলেটাকে নদীতে পাওয়ার কাহিনী বললো। ছেলে তখন তার আসল মায়ের কাছে যেতে চাইলো। বণিকের কষ্ট দেখে ছেলে তাকে কৃষ্ণ আর যশোদার কাহিনী বললে সে শান্ত হলো। তাও মনে অনেক দুঃখ নিয়ে বণিক ছেলে বিদায় দিল।

ছেলেটা তার জন্মদাত্রী মা সূর্যমণির কাছে গিয়ে বললো, “চলো, এখন আমরা বাবার খোঁজে যাই।”

এদিকে সত্য নারায়ণ সেই ভোররাতে কামোদরার স্বপ্নে এসে তাকে বললেন পরদিন সকালে এক নির্দিষ্ট গাছের তলায় মিষ্টির পসরা নিয়ে বসতে এবং এক উৎসবের সময় সে তার স্ত্রী-পুত্রের সাথে আবার মিলিত হবে।

ভোরে কামোদরা স্বপ্নাদেশমতো কাজ করলো। এদিকে তার স্ত্রী-পুত্র ঐ পথেই আসছিল। অবশেষে সবাই একত্র হলো। তারপর সূর্যমণির কথামতো কামোদরার নিজ দেশে তারা রওনা দিল। পথে পার হলো রাজা বীরবাহু, কৃষ্ণকেতু, বিশ্ববিজয় এবং বীর মহাজেতার রাজ্য।

যখন রাজা তার ছেলেকে দেখলেন, তার আনন্দ যেন স্বর্গ স্পর্শ করলো। রাজ্য জুড়ে আনন্দ-উৎসব হলো।

তারপর সত্যপীরের পূজার প্রস্তুতি হলো। এলেন কুলীন পুরোহিতরা, ব্রাহ্মণগণ। স্বর্ণ আর পান পাতার সমাহারে সজ্জিত হলো পূজার স্থান। চিনি, ফুলের মালা, দুধ, গুড় এবং মিষ্টি কলা আনা হলো বিপুল পরিমাণ। অতঃপর সিরনি তৈরি করা হলো। শংখ ফুঁকে, ঢোক করতাল বাজিয়ে উদযাপন হলো। ব্রাহ্মণগণ বেদ পাঠ করে পূজা সম্পন্ন করলেন।