Cover illustration for সোনার আনিস

সোনার আনিস

CATEGORY
Bengali Folktale

BASED ON THE BOOK

Bangla Academy Folklore Sangrahamala Volume 90

by Unknown

এক যে ছিল রাজা। রাজা ছিলেন বড় মহৎ আর দয়ালু। তার রাজ্যে ঘোড়াশালে ঘোড়া, হাতিশালে হাতি, রাজকোষে ছিলো হিরে মুক্তো পান্না চুন্নি। তবু রাজার মনে বড় দুঃখ। এত ক্ষমতা, এত প্রাচুর্য, এত সম্পদ, কিন্ত তাঁর যে কোন সন্তান নেই! সন্তানের আশায় রাজা একে একে সাত রাণী বিয়ে করলেন। আফসোস! বিধি তাঁর প্রতি সদয় হলোনা। বছরকে বছর যায়, সন্তানের জন্য রাজ্যের হেন বৈদ্য নেই, হেন সন্নাসী নেই যার কাছে রাজা ধরনা দেননি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়না। হতাশায়, ক্ষোভে, রাজা সমাধানের খোঁজে বনে বেরিয়ে পড়লেন। রাণীরা বাধ সাধলেন, কিন্তু রাজা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। রাণীদের চোখের পানি উপেক্ষা করে তিনি এক কাপড়ে বনে চললেন।

মাসের পর মাস গেল, রাজা ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একদিন গভীর ধ্যানে থাকা এক মুনির সন্ধান পেলেন। মুনির সামনে হাটুঁ গেড়ে বসে রাজা বললেন, “আমায় দয়া করুন বাবা। আমার মনে কোন শান্তি নেই। বছরের পর বছর সন্তানের আশায় পাগলপ্রায় আমি আজ রাজা থেকে পথের ভিখিরিতে পরিণত হয়েছি। আমি ভিক্ষা চাইছি বাবা, আমায় এর সমাধান দিন”। মুনি বলল, “খবরদার! তুই আমার ধ্যানে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিস। যা এখান থেকে, নইলে আমার অভিশাপে তোর অনিষ্ট হবে বলছি”। রাজা তবু অনুনয় বিনিনয় করতে লাগলেন। অবশেষে রাজার আন্তরিক অনুরোধে মুনির মন গলল। তিনি বললেন, “তবে শুন, এই বনের গভীরে আছে এক জাদুকরী কলাগাছ। এই গাছ থেকে সাতটি কলা নিয়ে তোর রাণীদের খেতে দিবি। কিছুদিনের মধ্যেই তাদের কোল আলো করে ছেলেসন্তান আসবে। তার বদলে তোকে মূল্য দিতে হবে। বারো বছর সময় পাবি, এরপর তোর একজন ছেলেকে আমি নিয়ে যাবো”। রাজা মুনির প্রস্তাবে চমকে গেলেন। কিন্তু কী আর করেন, ভাবলেন, একটি সন্তানের মূল্যে হলেও ছয়টি সন্তান তো পাবেন তিনি। মুনির কথামতো জাদুর কলাগুলো নিয়ে প্রাসাদে ফিরে গেলেন।

ক্রমে ক্রমে বারো বছর পার হলো। রাজা সাতজন ফুটফুটে রাজপুত্রের বাবা হলেন। ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আনিস তাঁর সবচেয়ে প্রিয়তম। কিন্তু হায়! কপালের লিখন, যায় না খন্ডন। মুনি তার পাওনা নিতে এসে আনিসকেই পছন্দ করলেন। রাজা কী আর করেন, ভগ্ন হৃদয়ে দুজনকে বিদায় দিলেন।

বেশ কিছুদিন হাঁটার পর মুনি আনিসকে নিয়ে বনের মধ্যে একটি নির্জন জায়গায় পৌঁছালেন। সেখানে কেবল একটি বটগাছ ও তার পাশে একটি কুটির। তারা যখন কুটিরে প্রবেশ করলো, তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গিয়েছে। মুনি আনিসকে তার ঘুমানোর জায়গা দেখিয়ে দিলো। ক্লান্ত আনিস তখনই শুয়ে পড়লো। কিন্তু ঘুমানো তো দুরের কথা, সারারাত সে বিভিন্ন বন্য জীবজন্তুর ডাকে ভয়ে কাঠ হয়ে রইলো। মুনি তাকে বললো, “ভয় পেওনা। এই কুটিরটি জাদুমন্ত্রবলে সুরক্ষিত। জীবজন্তুরা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবেনা”। মুনির কথায় আনিস আশ্বস্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেল।

রাত কেটে ভোর হলো। সকালে ঘুম ভেঙ্গে আনিস দেখলো, মুনি তার আগেই উঠে বটগাছের নিচে ধ্যানে মগ্ন। সে ভাবলো, “ভালোই হলো। আজ তাহলে কুটিরের আশপাশটা একটু ঘুরে আসি”। যেই ভাবা সেই কাজ, আনিস কুটিরের পাশের বনে ঢুকে পড়লো। কিছুক্ষণ হাটাঁর পর সে একটি খালি জায়গায় নিজেকে আবিষ্কার করলো। আনিস অবাক হয়ে দেখলো জায়গাটিতে অনেকগুলো মড়ার খুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। “নিশ্চয়ই এই জঙ্গলে একটি মানুষখেকো বাঘ রয়েছে”, আনিস ভয়ে ভয়ে চিন্তা করলো। হঠাৎই সে শুনলো কে যেন তাকে ডাকছে, “আনিস”। আনিস আশেপাশে অনেক খুঁজেও কাউকে পেলোনা। “আনিস, এদিকে এসো”, আবারো সেই গায়েবি কন্ঠ বলে উঠলো। এবার আনিস বুঝতে পারলো পাশেই মাটিতে পড়ে থাকা একটি খুলি থেকে আওয়াজটি আসছে। সে এগিয়ে গিয়ে বললো, “কে আপনি? আমায় কেনো ডাকছেন?” খুলিটি উত্তর দিলো, “আমি তোমারই মত এক মানুষ ছিলাম। মুনির খপ্পরে পড়ে আজ আমার এ হাল। প্রতি বছর মুনি পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলো থেকে মানুষ ধরে এনে দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি দেয়। এভাবেই সে তার জাদুক্ষমতা বজায় রাখে”। খুলির কথা শুনে বালক রাজপুত্র কেঁদে উঠলো। হায়! তার কী হবে? মুনি যে সামনে তাকেই বলি দেবে! খুলিটি আনিসকে শান্তনা দিয়ে বললো, “চিন্তা কোরো না, বাঁচতে যদি চাও তবে আমার কথা মন দিয়ে শুনো”।

বলির দিন মুনি আনিসকে পাশের একটি তেলের পুকুরে গোসল করে আসতে বললেন। মুনির কথামতো আনিস সে জায়গায় পৌঁছে দেখলো সেখানে দুটি পুকুর, একটি তেলের ও একটি দুধের। খুলির পরামর্শ মেনে আনিস তেলের পুকুরে না নেমে দুধের পুকুরে গোসল করলো। কুটিরে ফেরত আসার পর আনিসকে দেখে মুনি বুঝতে পারলো তার সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। “তবে রে”, বলে যেইনা মুনি তাকে ধরতে যাবে, অমনি আনিস দ্রুত পাশ কাটিয়ে মুনিকেই কুটিরে বন্দি করে ফেললো। এরপর সে খুলির কথামতো জঙ্গলের মধ্যে মুনির গোপন মন্দির থেকে তিনটি জিনিস সংগ্রহ করলো, একটি জিয়ন পাথর, একটি গায়েবি টুপি ও তেলেশমাতি আংটি।

তারপর আনিস কাছের এক কুয়ো থেকে এক বালতি পানি নিয়ে জীয়ন পাথরটি ধুলো। তারপর সে খুলিগুলো যেখানে পড়ে ছিলো সেখানে গিয়ে পানিটি চারিপাশে ছিটিয়ে দিতেই! পড়ে থাকা হাড়গোড়গুলো কাঁপতে শুরু করলো। দেখতে দেখতেই হাড়গুলোয় চামড়া মাংস লেগে জলজ্যান্ত মানুষ হয়ে উঠলো। মুনির বলি হওয়া সব মানুষ আবার প্রাণ ফিরে পেলো। এভাবে প্রাণ বাঁচানোর জন্য খুলিটির ঋণ শোধ করে আনিস বাড়ির পথ ধরলো।

পথিমধ্যে বালক রাজকুমার একটি নদীর পাড়ে বিশ্রাম করতে থেমে ঘুমিয়ে পড়লো। ঘোড়ার খুরের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে সে দেখলো, আকাশ থেকে নেমে আসছে এক রথ। রথটি নদীর ধারে থেমে দাড়ালে তা থেকে নামলো সাতটি অপরুপ সুন্দরী পরী। তারা নদীতে গোসল করতে এসেছে। পরীদের চমকে না দিতে আনিস তার গায়েবি টুপি পরে অদৃশ্য হয়ে গেল। পরীদের দেখে, তাদের সৌন্দর্যে আনিস মুগ্ধ হয়ে গেল। বিশেষ করে সবচেয়ে ছোট পরীটির দিক থেকে সে তো চোখ ফিরাতেই পারছিলো না। মোহমুগ্ধ আনিস ভুলবসত পরীটির দিকে এগোতেই পরীটির সঙ্গে ধাক্কা লেগে যায়। পরীর হাতের পানি আনিসের মুখে এসে পড়তেই আনিস দৃশ্যমান হয়ে উঠলো। পরীরা একজন মানুষকে এভাবে তাদের গোসলে উঁকি দিতে দেখে যথেষ্ট রাগান্বিত হলো। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে, পরীদের রীতিমতে কোন মানুষ কোন পরীর হাতের পানি পান করলে তারা দুজন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই অনিচ্ছা সত্বেও তারা আনিসকে নিয়ে তাদের রাজ্যে ফিরে গেলো। তাদের বাবা, পরীরাজ্যের রাজা এ বিয়েতে খুবই অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি এ বিয়ে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। আনিসকে তার যোগ্যতা প্রমাণ করার জন্য পরীরাজ বিভিন্ন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করলেন। তেলেশমাতি আংটি জোরে আনিস সহজেই সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলো। অবশেষে রাজা হার মানলেন। ধুমধাম করে দুজনার বিয়ে দিয়ে নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করলেন। তখন আনিস তার নতুন বউ ও শ্বশুরকে তার জীবনের গল্প খুলে বললো। আনিসের কথা শুনে পরীরাজার তার প্রতি মায়া হলো। তিনি তার রাজরথে করে জামাই আর মেয়েকে আনিসের বাবা-মার কাছে ফেরত পাঠানোর আদেশ করলেন।