সে বহুকাল আগের কথা। এক দেশে এক বাদশা ছিলেন। স্বভাবে ভালো, প্রজাদের প্রিয়। কিন্তু বাদশার ঘরে বহুদিন ছেলেপুলে হয় না। পরে আল্লা-খোদার ইবাদত করে, বহুদিন অপেক্ষার পর তার সন্তানভাগ্য খুললো। বাদশাহের তিন বেগমের কোলে একে একে ঘর আলো করে এলো বাদশাহীর তিন শাহজাদা। নাম তাদের ফিরোজ শাহ, নওরোজ শাহ ও বাহরাজ শাহ। কিন্তু বেচারার কী মন্দ কপাল। ছেলেরা একটু বড় হতে না হতেই পড়লো এক অদ্ভুত অসুখে। কী সেই অসুখ, কেউ তার নাম না জানে। দূর দূরান্তের হাকিম-কবিরাজ এসে শত চেষ্টা করেও বাদশাহকে সারাতে পারলো না। সবাই ফিরে গেল। শেষমেষ দূরদেশের ইউনান রাজ্য থেকে এসে পৌঁছালো এক আশ্চর্য হাকিম। অন্য হাকিমের মতো সে দাওয়াই দেয় না, চিকিৎসা করে না। তবে জানায় বাদশাহের ভালো হওয়ার এক ওষুধের নাম। কিন্তু সে ওষুধ তার কাছে নেই। সোজা বাদশাহকে বলে দিল হাকিম, “একমাত্র গুল-এ-দেওগান্ধাই পারে আপনাকে সারাতে।”
“গুল-এ-দেওগান্ধা? এ কী বস্তু? আগে তো শুনিনি নাম, এনে দাও– তথাস্তু!”
“সে এক আশ্চর্য ফুল। এতে আছে যেকোনো অসুখ সারিয়ে দেওয়ার জাদু।”
বহু লোককে পাঠানো হলো বহু দূর দেশে, একটাই কথা— শুধু খুঁজে আনতে হবে আশ্চর্য সেই কবিরাজি ফুল। কিন্তু বিধি বাম! কেউই সফল হলো না এই দুঃসাহসী অভিযানে। কেউ কেউ ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলো, কারো বা নিশানাই মিললো না আর। তখন বাদশাহ আলমপনা অস্থির হয়ে খবর দিলেন তার বড় ছেলেকে। ফিরোজ বড় শাহজাদা। দিনরাত সে ধনুকে তীর টানে– তীরন্দাজি, পালোয়ানি করে। রাজ্যের সবদিকেই তার যাতায়াত। গায়ে জোর যেমন, তেমনি মাথায় তীক্ষ্ণ বুদ্ধি। বাদশাহের এমন দুরবস্থা দেখে সেও দিনদিন মুষড়ে পড়ছিল। বাদশাহের মুখের দিকে চেয়ে সে বলে উঠলো–
“আমি নিয়ে আসব গুল-এ-দেওগান্ধা।”
এরপর শুরু হলো এক অদ্ভুত অভিযান। অদ্ভুত ফুলের খোঁজে দিনরাত পথচলা। দেওগান্ধার পথে ফিরোজ শাহের ঘোড়া টগবগ করে এগিয়ে চললো— ধুলায় ধুলায় মেখে গেল চারপাশ। চারদিকে শুধু একটাই নাম— গুল-এ-দেওগান্ধা, গুল-এ-দেওগান্ধা! সুবাস যেন তার স্বর্গ থেকে আসা, দেখতে যেন সে চাঁদের চেয়ে বেশি খাসা। কিন্তু অত সহজ ছিল না জাদুকরী এই ফুলের দেখা পাওয়া। খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে ফিরোজ গিয়ে পৌঁছলো এক অচিন শহরে। সেখানে এক বিধবা বুড়িমার বাড়িতে সে আশ্রয় নিল। বুড়ি তাকে বড় আদর করে রাখলো কিন্তু বুড়ি সবসময় বড় ভয়ে ভয়ে থাকে। বুড়িমার ভয় দেখে ফিরোজ জিজ্ঞেস করে— “কী তোমার চিন্তা, বলো বুড়িমা?” তখন ফিরোজ জানতে পারে, সে রাজ্যে বিশাল এক বাঘের আতঙ্কে সবাই ভয়ে থরোথরো কাঁপে। বুড়িরও সেই একই চিন্তা। ফিরোজ সবার বড় শাহজাদা– ছোটবেলা থেকে পালোয়ানিতে তার তুলনা হয় না। সাহসেও সবসময়ই সিনা টান টান করে থাকে সে। তাই বাঘের কথা শুনে খুব একটা ঘাবড়ালো না ফিরোজ। বরং বুড়িমাকে অভয় দিয়ে সে বেরিয়ে পড়লো বাঘের সঙ্গে লড়াই করতে। যে বাঘকে রাজ্যের আর কোনো বীর যোদ্ধা কাবু করতে পারেনি, তাকে ফিরোজ শাহ এমন নাস্তানাবুদ করলো যে তাকে বন্দী করে নিয়ে গেল সে রাজ্যের বাদশাহের দরবারে। বাদশাহ তার উপর এতই খুশি হলেন যে তার কন্যা— শাহজাদী মেয়মুনার বিয়ে দিতে চাইলেন ফিরোজ শাহের সঙ্গে। খুব ধুমধাম করে বিয়ে হলো। মেয়ে-জামাইকে এক বিশাল মহল গড়ে দিলেন বাদশাহ। কিন্তু ক’টা দিন যেতে না যেতেই ফিরোজের মনে বাবার অসুখের কথা, গুল-এ-দেওগান্ধার জন্য তার অভিযানের কথা মনে পড়ে গেল। বাদশাহের কাছে সব কথা খুলে বললো সে। এরপর বাদশাহের থেকে অনুমতি নিয়ে ফিরোজ হাতি-ঘোড়া-সওয়ারি নিয়ে পাড়ি দিল আরেক রাজ্যে। কিন্তু ফিরোজের এমনই কপাল– সেখানকার শাহজাদীও এক দেখাতেই তার প্রেমে পড়ে গেল। কিন্তু তার গুল-এ-দেওগান্ধার অভিযানের কথা শুনে তাকে যেতে দিল শাহজাদী। বলে দিল, তার বিরহে মন পুড়বে বহুদিন। এদিক ওদিক পথ ঘুরে এরপরে ফিরোজ শাহ গিয়ে পড়লো ফারিয়াব রাজ্যের আদমখোর শাহজাদীর মহলের সামনে। প্রতিদিন তাকে একটা করে মানুষ খোরাক দিতে হয়, নইলে সে রাজ্যের সব লোককে একে একে গিলে খাবে। ফিরোজ শাহকে মহলের সামনে দেখে লোকে তাকে বারবার মানা করলো, “ওদিকে যেও না! গেলেই আমাদের শাহজাদী তোমাকে খেয়ে ফেলবে।” কিন্তু ফিরোজের সাহস আর কৌতূহলের কোনো সীমা ছিল না। এমন অদ্ভুত শাহজাদীর কথা শুনে সে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে মহলে চলে গেল। সেখানে গিয়ে সে দেখতে পেল, দিনের বেলা শাহজাদী ঘুমিয়ে থাকে শান্ত হয়ে। কিন্তু রাত হলেই তার নাকের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে এক বিশাল অজগর। ফিরোজ বুঝতে পারলো, সব দোষ ওই অজগরের– সেই প্রতিদিন একটা করে মানুষ খায়। সাতপাঁচ না ভেবে তক্ষুনি তলোয়ারের এক ঘায়ে ফিরোজ অজগরকে মেরে ফেললো। সাহস আর বুদ্ধির জোরে সেই শাহজাদীকে জাদুর হাত থেকে রক্ষা করে ফিরোজ এগিয়ে গেল তার অভিযানে। এত এত রাজ্য ঘুরেও সেই কাঙ্ক্ষিত ফুলের খোঁজ পেল না সে। ক্রমেই ক্লান্তি তার উপর ভর করে ফেলেছে। পথ চলতে চলতে এবার সে গিয়ে ঢুকলো এক গহীন বনে। গাছের তলায় জিরোতে বসে দেখা হলো এ আশ্চর্য সুন্দরীর সাথে। নাম তার হোমা ইউন। টানা টানা চোখের তার রাজ্যের শান্তি। লোকে বলে, সে নাকি পাখির ভাষাও বুঝতে পারে। বনের মধ্যে, সবুজের মাঝে হোমা ইউনের রূপ যেন যেকোনো মহলের শাহজাদীর চেয়ে বেশি মনে হয় ফিরোজের। ফিরোজের বহু দূর পথের ক্লান্তি দূর করে দিল হোমা ইউনের সঙ্গ। চাঁদনি রাতে তারা একে অপরের সঙ্গে কথা কয়, একে অপরের মনের ভার হালকা করে। কিন্তু এতকিছুর পরও হোমা ইউনের একটি গোপন কথা ফিরোজ তখনো জানতো না। আর তা ছিল, গুল-এ-দেওগান্ধার হদিস। এতদিন সে যে ফুলের জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে পথে পথে ঘুরেছে, সেই ফুল। হোমা ইউন জানে সে ফুলের কথা। জাদুর এ ফুলের ভালো-মন্দ দুই দিকই জানা আছে তার। গুল-এ-দেওগান্ধার জাদুতে যেমন আছে রোগ সারানোর মন্ত্র, তেমনি আছে বিপদের নিশানা। দুষ্টু লোকের হাতে এ ফুল পড়লে ধ্বংস অনিবার্য। তাই হুমা ইউন চুপ থাকে। কাছে থেকে খেয়াল করে ফিরোজ শাহকে। বুঝতে চেষ্টা করে, ফিরোজ কেমন লোক। তার হাতে গুল-এ-দেওগান্ধা হলে ভালো হবে না খারাপ? এই প্রশ্ন হুমা ইউনকে তাড়া করে বেড়ায়। এরই মাঝে তাদের সম্পর্ক গাঢ় হতে থাকে।
গুল-এ-দেওগান্ধা কয়েক বছর পর পর ফোটে। তাকে রক্ষা করে রাখে যত দেও-দানো, অলৌকিক সব শক্তি। যেই এ ফুলে হাত দিয়েছে, কাউকে ফিরে পাওয়া যায়নি। এমনকি যে ক’জন ভাগ্যগুণে ফিরতে পেরেছে, তারাও কেমন বদলে গেছে। এমনই জাদুকরী এ ফুল। ফুলের কথা ভেবে ভেবে ফিরোজ শাহ চোখের জল ফেলে। এভাবেই কেটে গেল বেশ কিছুদিন। আস্তে আস্তে ফিরোজের উপর বিশ্বাস করতে লাগলো হুমা ইউন। একদিন চাঁদনি রাতে তার হাতে হাত রেখে সে বলে দিল সেই গোপন কথা— হদিস জানালো গুল-এ-দেওগান্ধার। কিন্তু তার বদলে একটাই শর্ত তার। কথা দিতে হবে ফিরোজকে, যতটুকু খুব জরুরি দরকার, তার বাইরে ফুল তোলা যাবে না। নইলে ঘোর বিপদ। ধ্বংসের পথ থেকে আটকাতে পারবে না কেউ। হুমা ইউনের কথা মাথা পেতে মেনে নিলো ফিরোজ। পরদিন সকালে তারা দুজনে মিলে যাত্রা শুরু করলো। বহু উঁচু-নিচু পথ, নদী-নালা পেরিয়ে তারা একটি পাথরের দেয়ালের সামনে আসলো। সেই দেয়ালের গায়ে রূপালী পাতার গাছ বেয়ে উঠেছে। আর অনেক উপরে দেখা যায়, চূড়ার মধ্যে বসে আছে রাজকীয় ভঙ্গির গুল-এ-দেওগান্ধা। ফিরোজ কোনোদিন এত সুন্দর কিছু দু চোখে দেখেনি। এ ফুলের হালকা সোনালী আভা যেন ভোরের প্রথম রোদের মতো সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে চারদিকে। মন মাতানো গন্ধ যেকোনো সুগন্ধিকে হার মানায়। কিন্তু এত সুন্দর রূপ যে ফুলের, তার দিকে হাত বাড়াতেই এভাবে মাটি কেঁপে উঠলো কেন? ফিরোজ ভয়ে শিউরে ওঠে, কিন্তু বীরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তখন তার মনে হলো ফুলের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসছে ভয়ংকর হুঙ্কার– কেমন যেন অন্ধকার ছায়া গজিয়ে উঠছে চারদিকে। সে ছায়া থেকে জন্ম নিলো ভয়ংকর কালো আর লম্বা এক সাপ। সেই ছিল গুল-এ-দেওগান্ধার পাহারাদার। কেউ ফুলের দিকে এগোলেই সে ফোঁস করে ওঠে। ফিরোজ বুঝতে পারলো, কেন লোকে এ ফুলের কাছে এলে উধাও হয়ে যায়। তক্ষুনি কোমর থেকে তলোয়ার বের করে সে তার ফণা কেটে ফেললো। এরপর তলোয়ারের আগাটা সোজা চোখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। লড়াইয়ে পাহারদার সাপটিকে একেবারে পরাস্ত করে আস্তে আস্তে ক্লান্ত হাতে ফিরোজ গুল-এ-দেওগান্ধার একটিমাত্র পাঁপড়ি আলতো করে ছিঁড়ে নিল। প্রয়োজনের চেয়ে একটুও বেশি নেবে না, কথা দিয়েছিল হুমা ইউনকে। ফিরোজের সততা দেখে মুগ্ধ হলো হুমা ইউন। তাকে অবিশ্বাসের আর কোনো পথই খোলা রইল না। তখন সে খুলে বললো তার জীবনের আরেক রহস্য। যার থেকে এতদিন পালিয়ে রয়েছে সে— “আমি এক শাহজাদী। কিন্তু আমাকে ডাইনি বলে আমার নিজের লোকরাই আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। সবাইকে ছেড়ে আমি এই জঙ্গলে এসে বাসা বেঁধেছি। আপন বলতে কেউ নেই তাই গুল-এ-দেওগান্ধাই আমার একমাত্র বন্ধু।” হুমা ইউনের এ কথা শুনে ফিরোজের ভারি রাগ হলো। সে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করলো, হুমা ইউনের হারানো সম্মান সে ফিরিয়ে দেবে। তবে এর আগে তার বাবার চিকিৎসা করা দরকার। তাই এক হাতে গুল-এ-দেওগান্ধার ঝলমলে পাঁপড়ি আর অন্য হাতে হুমা ইউনকে নিয়ে সে ফিরে চললো বাড়ির পথে। রাজ্যে ঢুকতে না ঢুকতেই সকলে ছুটে এলো— “শাহজাদার জয় হোক! শাহজাদার জয় হোক!” গুল-এ-দেওগান্ধার ছোঁয়া পেয়ে বাদশাহের হারানো জ্যোতি ফিরে এলো। বুজে যাওয়া চোখ মেলে তিনি চাইলেন। কেটে গেল চেহারার ফ্যাকাশে ভাব। সেরে উঠলেন তিনি। থমকে গেল পুরো দরবার— সত্যিই তবে, জাদুই ফিরিয়ে দিলো বাদশাহকে! হুমা ইউন আর ফিরোজের বিয়ের বাদ্যি বেজে উঠলো। মহলের সকলে ফুলে ফুলে সেজে উঠলো। ঝলমলে রোশনাই চারদিকে। বিয়েতে সবাই বেশ খুশি, কিন্তু হুমা ইউনের একটি অদ্ভুত শর্তে সবাই কানাঘুষা করতে লাগলো।
“বিয়ের আগে আমি একবার একা গুল-এ-দেওগান্ধার কাছে যেতে চাই।”
কারো কথায় কান না দিয়ে ফিরোজ শাহ পৌঁছে সেই জাদুকরী ফুলের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসলো তার হবু বউকে। এরপর জঙ্গলের বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলো। বেশ কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলো হুমা ইউন। এরপর রাজ্যের সকলের সামনে গিয়ে সে ঘোষণা দিল— “গুল-এ-দেওগান্ধার পাহারাদার আর নেই, তাই সে দরজা বন্ধ করে দিয়ে এলাম। কোনো লোভী মানুষের হাতে যাতে এ ফুল না যায়। শুধুমাত্র সৎ ও সত্য লোকের মনই যেতে পারবে এই ফুলের কাছে। ততদিন পর্যন্ত উধাও হয়ে যাবে তার হদিস।” এই বলে ফুলেরই মতো মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে ফিরোজের হাত ধরে বিয়ের উৎসবে শামিল হলো হুমা ইউন। তবে এখনো কেউ কেউ বলে, গুল-এ-দেওগান্ধা এখনো তার সোনালি আভায় মাঝরাতে দেখা দিয়ে যায় হুমা ইউনকে।