বহুকাল আগে যখন রাজা শুক্রদেব ত্রিপুরায় রাজত্ব করতেন তখন তাঁর রাজ্যে ভূতেরা অবাধে ঘুরাফেরা করত। একদিন তাঁর এক গুপ্তচর তাঁর কাছে এসে বলল,
“হে মহারাজ! আপনার রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকরা ভূতের দ্বারা অতিষ্ঠ হয়ে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাচ্ছে। মহিলারা যখন স্নান করে তখন ভূত তাদের জলের বালতিতে গর্ত করে ফলে তারা স্নান করতে পারেনা। খাবারের সময়, ভূত প্রস্রাব এবং মল দিয়ে তাদের প্লেট নষ্ট করে দেয়। এমনকি ঘুমের মধ্যেও ভূত তাদের চুল নিয়ে টানাটানি করে। আর যখন তারা অলস সময়ে কোনো কাজ করেনা, তখন দুষ্টু আত্মারা অবিরাম তাদের সুড়সুড়ি দেয়। দয়া করে এ সমস্যার কিছু করুন মহারাজ। দয়া করে কিছু করুন।”
মহারাজঃ “কেনো! স্থানীয় গভর্নর এই সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু করেননি?” (রাগান্বিতভাবে রাজা জিজ্ঞাসা করলেন।)
গুপ্তচরঃ তিনি তার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, মহারাজ। কিন্তু যতবার কোনো উদ্যোগ নিতেন, ভূতেরা তাদের লোকদের দিকে পাথর ছুড়ে মারত।
একথা শুনে রাজা শুক্রদেব তাঁর সমস্ত মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং তাঁর সেনাপতিদের একত্রিত করে একটি সভা ডাকলেন। তিন দিন এবং তিন রাত ধরে আলোচনা করে সবাই সমাধান খুঁজে। হায়, এটা সত্যই যে ভুতের সঙ্গে যুদ্ধ করা নিরর্থক। সব আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হয় যে, তারা সাহায্যের জন্য জনগণের মধ্যে একটা ঘোষণা দিবেন। তারপর গোটা রাজ্য জুড়ে একটি ঘোষণা জারি করা হলো। ”
যে ভূত থেকে সবাইকে মুক্তি দিতে পারবে, তাকে রাজার উপদেষ্টাদের মধ্যে সর্বোচ্চ পদ দেওয়া হবে। তিনি সুন্দরভাবে পুরস্কৃত হবেন এবং রাজ্যের ইতিহাসের বইগুলিতে তার এই মহান কাজটি অমর হয়ে থাকবে।”
সেই ঘোষণা ভূতের কানেও পৌঁছে গেল। ভুতেরা সিদ্ধান্ত নিলো,
তাঁরা ৭ দিন অপেক্ষা করে দেখবে কে তাঁদের বিরুদ্ধে আসার সাহস করে। আর ৭ দিন শেষ হয়ে গেলে তারা পুরো রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।
সাহায্যের আহ্বানে সাড়া দিয়ে একজন দক্ষ তান্ত্রিকের সেখানে আবির্ভাব ঘটে। আট দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত সত্ত্বাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তার জাদুকরী ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েছেন। তিনদিনের যাত্রার পর তিনি রাজপ্রাসাদে পৌঁছান। তান্ত্রিক রাজাকে ভূতের ক্ষতি করতে সক্ষম একটি বিশেষ ঔষধের পরামর্শ দিলেন। এই ঔষধটি তৈরি করতে তার প্রয়োজন ছিল প্রতিটিতে সাত মণ করে- সরিষা, চাল, ছাই, গমের তুষ এবং হলুদ। রাজা খুব তাড়াতাড়ি এইসব উপাদানগুলো সংগ্রহ করলেন এবং সমস্ত রাজ্যে ঔষধটি ছড়িয়ে দিলেন। মন্ত্র-যুক্ত ঔষধটি ভূতদের মধ্যে প্রচন্ড যন্ত্রণার সৃষ্টি করেছিল। ভূতেরা দুর্বল হয়ে গেলে, তান্ত্রিক ত্রিপুরা রাজ্যের সাতটি অঞ্চলের গভর্নরদের কাছে সাতটি যাদুকরী তাবিজ পাঠায়। যতক্ষণ গভর্নররা তাবিজটি পরতেন, ততক্ষণ তাদের অঞ্চলে থাকা সমস্ত ভূত তাদের দাস হয়ে থাকতো।
সময় ঘুরে গেলো, রাজ্যের গভর্নররা ভূতদের উপর ক্ষমতা চালাতে লাগলো। গভর্নররা ভূতদের কাজে লাগিয়ে সমস্তকিছু সম্পাদন করতেন। ভূতেরা জমি চাষ করত, কাঠ কেটে রাস্তা পরিষ্কার করত। ফলে মানুষ কৃষকেরা নিজেদের হাতে পর্যাপ্ত অবসর সময় পেয়ে যায়। একদিন, একটি ভূতকে কাছের নদী থেকে গভর্নরের জন্য জল আনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অন্য রাজ্যের একটি মহিলা ভূত তখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। বেচারা ভূতকে কাজ করতে দেখে সে অবাক হল। জিজ্ঞাসা করার পর ভূতটি তাকে পুরো ঘটনা খুলে বলল। মেয়ে ভূতটি ছেলে ভূতের জন্য করুণা অনুভব করল। সে তাকে একটি বোতল দিয়ে সেটি তার গভর্নরের কাছে নিয়ে যেতে বলে। সেই বোতলের পানি পান করার সাথে সাথে গভর্নর নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। মহিলা-ভূতটি তখন নর্তকীর রূপ ধারণ করে। নেশাগ্রস্ত গভর্নরকে প্রলুব্ধ করে তার হাত থেকে তাবিজটি খুলে ফেলে। সাথে সাথে ভূতেরা তাদের দাসত্ব থেকে মুক্তি পায়। অন্য রাজ্যের ভূতেরাও এভাবে তাদের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়।
ভূতেরা তখন প্রতিজ্ঞা করে যে তারা আর নিজেদেরকে ঝুঁকিতে ফেলবে না। তাই তারা রাজ্য ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু যাওয়ার আগে তারা রাজ্যের লোকেদের কানে এই নেশাজাতীয় পানীয়ের রেসিপি ফিসফিস করে বলে যায়। ত্রিপুরা লোককাহিনী অনুসারে, এভাবেই অ্যালকোহল তৈরি হয়েছিল। সেই সময় থেকে, মদ্যপান মানুষকে এতটাই গ্রাস করেছে যে মানুষেরা আর কখনও ভূতের জন্য হুমকির কারণ হয় না।