সে বহু বহুকাল আগের কথা। তখনো মানুষ আর পশুপাখির ভাষা আলাদা হয়ে যায়নি। যোগাযোগে উভয়ই ছিল সমান। উ ক্লিউ নামের ময়ূরেরও তখন আর সাধারণ দশটা পাখির মতোই ধূসর পালক ছিল। তবুও ময়ূরের অহঙ্কারের কোনো কমতি ছিল না। সকল পাখির মধ্যে সে ঘাড় উঁচু করে ঘুরে বেড়াতো– এক রাজকীয় স্বভাবে। আর এ অতি গর্বের পেছনে কারণ ছিল অন্য পাখির চেয়ে উঁচুতে থাকা পুচ্ছ আর লম্বা লেজ। সেই পুচ্ছ আর লেজ দুলিয়ে দুলিয়ে সে অন্য পাখিদের সঙ্গে যারপরনাই দাপট দেখাতো। প্রতিবেশী হিসেবেও ময়ূর খুব একটা সুবিধের ছিল না। কেননা নিচু অঞ্চলে বসবাসকারী পাখিদের সাথে সে তার বিশাল দেহের জন্য দেখা-সাক্ষাৎই করতে পারতো না। তার যাতায়াত ছিল শুধু বড় বড় পাখিদের সম্মেলনে। আর এইসব ধনী পাখিরাও ময়ূরকে একটু বেশিই মাথায় উঠিয়ে রাখতো, যাতে করে ময়ূরের নিজের সম্পর্কে ধারণা দিনদিন তার পুচ্ছদেশকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছিল।
একদিন পাখিদের দরবারে কথা উঠলো– নীল জগতের রূপসী দেবী কা স্নাগির কাছে কে নিয়ে যাবে জঙ্গলের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা? কে হবে সমগ্র জঙ্গলের প্রতিনিধি? দেবী সকলের জীবনে তার উজ্জ্বল আলো নিয়ে এসেছেন, তাই তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতেই জঙ্গলবাসীদের এই সিদ্ধান্ত। সভার এক পর্যায়ে প্রতিনিধি বাছাই করা হলো সেই দাপুটে ময়ূর– উ ক্লিউকেই।
উ ক্লিউ কিন্তু মহা ধাড়িবাজ ছিল। শুধু জঙ্গলের প্রতিনিধি হয়েই সে যাচ্ছিল না। বরং দেবীকে পটিয়ে তার সাথে বিয়ের মতলব করে সে তার পুচ্ছ দুলিয়ে যাত্রা করলো। ইচ্ছে, থেকে যাবে অতি মায়াময় নীল জগতেই। পাখিরা সামনাসামনি যতই তাকে তোষামোদ করুক, কেউই তার এই কথাকে পাত্তা দেয়নি। গোপনে সবাই উ ক্লিউকে নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগলো। কেননা কেউই ভাবেনি, অত বিশালবপু পাখি হয়ে ময়ূর উড়ে যেতে পারবে আকাশের পানে! সে তো কখনো গাছ ছেড়ে উপরেই ওড়েনি! কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ময়ূর মহাশয় উড়তে লাগলো। উড়তে উড়তে সকলের দৃষ্টিসীমানা ছাড়িয়ে সে উধাও হয়ে গেল। দমকা বাতাসের ঝাপটায় উ ক্লিউ ভাসতে থাকলো, আর একসময় পৌঁছে গেল কা স্নাগির প্রাসাদে– সেই কা স্নাগি, যে কিনা সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে মহান। সেই প্রাসাদে দেবী একাই থাকতেন। একা থাকাই তার ভাগ্যে লেখা ছিল। তাই মাঝে মাঝেই কারো সঙ্গের জন্য তার মনটা কেমন করে উঠতো। তাই উ ক্লিউ যখন সেখানে গেল, তাকে পেয়েও দেবী খুশি হয়ে গেলেন। অত্যন্ত সমাদরে গ্রহণ করলেন আগন্তুক ময়ূরকে। উ ক্লিউর মনের কথা জেনেও তার আনন্দের অন্ত থাকলো না–
“আমাকে আর একা থাকতে হবে না। এই মহান পাখিটি আমার এখন থেকে সবসময় আমার সাথেই থাকবে।”
কথায় আছে, কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না– স্বভাব যায় না ম’লে! উ ক্লিউ পৃথিবীর ধুলোমাটি ছেড়ে আকাশে উড়েছিল ঠিকই, কিন্তু ধরাধামের দুষ্ট স্বভাব তাকে ছেড়ে কোথাও যায়নি। সে তখনো সেই অতি পরিচিত স্বার্থপর স্বভাবের পাখিই রয়ে গেছে। বরং আরাম আর বিলাসী জীবন তাকে আরো আত্মকেন্দ্রিক, আরো আত্মম্ভর করে তুললো। সে প্রতিদিন কা স্নাগির সবটা মনোযোগ, সব সুবিধা চাইতো। দেবী তো স্বভাবে আগে থেকেই ভীষণ উদার, সকলের প্রতিই উজাড় করে দেন– নিজের সঙ্গীর প্রতি কি আর অন্যথা করবেন?
কা স্নাগি বা সূর্য মূলত পৃথিবীর সবাইকে উষ্ণ আলো দিয়ে, তাপ দিয়ে নিরাপদে রাখতেন। কিন্তু উ ক্লিউ জীবনে আসার পর থেকে তার পুরোটা সময়ই গেল ময়ূরের সেবা করতে করতে। দেবী আর প্রাসাদ ছেড়ে কোথাও যেতে পারলেন না। ওদিকে পৃথিবীর অবস্থা হলো জরাজীর্ণ। জঙ্গলের সব পাখি নীরব হয়ে গেল, তাদের পালক ঝরে গেল– থেমে গেল কলকাকলি আর গানও। বৃষ্টিদেবতা উ স্লাপ এসে সব পাখির সব সুখের নীড় ভেঙে দিলো। ছোট ছোট পাখির ছানারা মারা গেল। অতিবৃষ্টি তবু কোনো দয়ামায়া করলো না। ওদিকে ঘন কুয়াশা হয়ে ধানক্ষেতের উপর নিয়ে এলো কালো মেঘের ঘনঘটা। কোনো ফসলই পাকলো না। ঝড় এসে গাছ উপড়ে ফেললো, চারিদিকে বিরান ভূমি হয়ে গেল– পাখিরা খাদ্যহীন, গৃহহীন হয়ে এদিক ওদিক উড়ে বেড়াতে লাগলো। পাখিদের আর্তি শোনারও কেউ থাকলো না।
এই সময়ে জঙ্গলবাসীরা আশ্রয় নিলো মানবসভ্যতার– কেননা পৃথিবীতে তখনো মানুষই সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী ভূমিকায় রয়েছে। সবকিছু বুঝেশুনে মানুষ তাদেরকে জানালো, এসবই হচ্ছে কা স্নাগির প্রাসাদে উ ক্লিউর বসবাসের কারণে। সেই দুষ্টু, স্বার্থপর ময়ূরের কারণেই দেবী নিজের কর্তব্য ঠিকভাবে পালন করছেন না। আর তাই আগের মতো মর্ত্যলোকে আলোও ছড়াচ্ছেন না। কোনোভাবে যদি ময়ূরটিকে আবার জঙ্গলে ফেরত আনা যায়, তাহলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে– একেবারে আগের মতো। কিন্তু কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায় তাকে?
তখন জঙ্গলের ধারে কা সাবুই নামে এক চতুর মহিলা বাস করতো। তার ছিল এক সরিষা বাগান। সেসময়ে খুবই গরিবী হালে দিন কাটাচ্ছে। এদিকে জঙ্গলে দুর্ভিক্ষের ফলে পাখিরাও হরহামেশা তার জোগাড় করা সব বীজ খেয়ে যাচ্ছে, ফসল আর উঠতে দিচ্ছে না। পাখিরা এবারে এলো কা সাবুই কাছেই, উ ক্লিউর ব্যাপারে কিছু সাহায্য চাইতে।
কা সাবুই বললো, “আমি ১৩ চন্দ্রের মধ্যেই ফিরিয়ে আনব সেই ময়ূরযুবকটিকে। কিন্তু আমার দুটি শর্ত আছে। পাখিরা যাতে আমার বাগানের বীজ না খায় এবং অন্য কেউ খেতে এলে– তাদেরও দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়! আমি বেচারি খুবই দুঃখে আছি।”
পাখিদের সাথে শলা-পরামর্শ করে এক অদ্ভুত ফন্দি আঁটলো কা সাবুই। দিনের পর দিন মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে সরিষা বপনের ক্ষেতটাকে কা সাবুই গড়ে তুললো এক সুন্দরী নারীর রূপে। ছড়িয়ে দিলো সবচেয়ে ভালো বীজগুলো। ওদিকে পাখিরা দেখতে থাকলো, দেখতেই থাকলো। আর অপেক্ষায় দিন গুনলো। সরিষা ক্ষেতের অনেক যত্ন নিলো সে। একদিন সময় হলো। গাছে সবুজ সুন্দর পাতা হলো, হলুদ ছোট্ট সরিষা ফুল এলো। ভরে গেল চারপাশ। ক্ষেতটি দূর থেকে দেখতে মনে হলো যেন স্বর্ণে লেপা এক অতীব রূপসীর দেহ। সকলে খুবই অবাক হলো, কা সাবুইর প্রশংসাও করলো– কিন্তু কেউই বুঝতে পারলো না, কাহিনীটা কী!
ওদিকে আকাশভূমিকে উ ক্লিউ ইচ্ছেমতন চলে যাচ্ছে, জ্বালিয়ে যাচ্ছে সূর্যদেবীকে। দেবীও মায়াভরে তাকে দেখেশুনে রাখছেন। কিন্তু সব উজাড় করে দিতে দিতে দেবীর নিজের সৌন্দর্যই ম্লান হয়ে গেছে। এখন তাকে ভীষণ মলিন দেখায়। এখন আর উ ক্লিউর কা স্নাগিকে আগের মতো মনে ধরে না। তার এখন প্রায়ই মনে পড়ে পুরনো ঘরের কথা, সঙ্গীসাথীর কথা। একদিন এসব ভেবে ভেবে সে আকাশে চড়ে বেড়াচ্ছিল, তখনই দেখতে পেল পৃথিবীর এক চেনা স্থান। খুব জ্বলজ্বলে হয়ে আছে। একটু ভালো করে তাকাতে সে বুঝলো, অন্তত তার কাছে মনে হলো– “ঐ মাটিতে শুয়ে আছে পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর রমণী, স্বর্ণে লেপা দেহ– জানো কি তারে কেহ?” তাকে দেখেই লোভী উ ক্লিউর মন গেল গলে। এখন আর সূর্যদেবীর বা নীল জগতের প্রতি কোনো আগ্রহই রইলো না। সে শুধু চায়, সেই স্বর্ণদেহীকেই!
এরপর উ ক্লিউ আর নীল জগতে থাকতে চাইলো না। সে সবকিছু ফেলে শুয়ে থাকতে চাইলো মাতৃভূমির মাটিতে– কথা বলতে চাইলো তার নিজের ভাষায়, নিজের সঙ্গীদের সাথে। একদিন এমন এলো, উ ক্লিউর ঘরের প্রতি টান আর বাধা মানলো না– সঙ্গিনীর মনে দুঃখ দিয়ে সে বললো, “এইবার আমি জঙ্গলে ফিরতে চাই।”
দুঃখে বুক ফেটে গেলো সূর্যদেবীর। তিনি সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছিলেন এই ময়ূরটিকে। কিন্তু তার বহু চেষ্টা সত্ত্বেও উ ক্লিউ থামলো না। তার গতি দুর্বার, তাকে থামানো ভার! যতই ময়ূর সামনে এগোয়, দেবী তার পিছু পিছু ছোটেন। দেবীর কান্নার মুক্তা স্পর্শ করে ময়ূরের পুচ্ছদেশ। একে একে সেইসব পালকে রং লাগে রঙধ্নুর। কিছু অশ্রু হয়ে যায় চোখ ধাঁধানো সব দাগ, যা লেগে থাকে ময়ূরের লেজে। আজো খাসিয়ারা এই দাগকে বলেন, ‘উম্মাত কা স্নাগি’। অর্থাৎ, সূর্যের অশ্রু! এই অশ্রু দিয়েই কা স্নাগি, উ ক্লিউকে চিরতরে নিজের করে নিলেন। সে যেখানেই যাক, নিজের পুচ্ছই তাকে মনে করিয়ে দেবে তার প্রিয়তমার কথা– যে থাকে আকাশপানে, যার সাথে দেখা হয় শুধু নয়নে নয়নে।
এবারে ঘরের ময়ূর ঘরে ফিরে এলো। জঙ্গলের সবাই তার সুন্দর পালক আর পুচ্ছ দেখে বিস্ময়ে স্বাগত জানালো। উ ক্লিউ তখন সবাইকে জিজ্ঞেস করলো, “কই সে সোনায় লেপা যুবতী? বলো আমায়, বলো জলদি!” সব পাখি তো হাসিতে কুটিপাটি। এই তাহলে ছিল কা সাবুইয়ের বুদ্ধি? লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেল উ ক্লিউর। ওদিকে জগতের সব সমস্যাও মিটলো।
বলা হয়, প্রতি সকালেই ময়ূর ঘাড় উঁচু করে আকাশের পানে তাকায়– শুভেচ্ছা জানায় প্রিয় দেবী কা স্নাগির আগমনকে। আর যখন সূর্যালোক হয়ে প্রতি সকালে দেবী ধরাধামে আসেন, রঙিন পাখা মেলে ময়ূরের আনন্দ প্রকাশেই তার সবটুকু সুখ লেখা থাকে।