Cover illustration for জসমত খাঁ

জসমত খাঁ

CATEGORY
Bengali Folktale

BASED ON THE BOOK

রংপুর গীতিকা

by বদিউজ্জামান

এক দেশে এক রাজা ছিল। নাম তার জসমত রাজা। রাজার বয়স টয়স কম হয়নি। তা রাজা একদিন দেওয়ানকে ডেকে বললো, “বুঝলে দেওয়ান, আমার রানি বুড়ি হয়ে গেছে। বুড়ো বয়সে আমার মন যে কচি। তাই বড় সাধ হয়েছে— আরেকটা বিয়ে করব। পাঁচ রাজার ধন দিব তোমাকে। জলদি আমার জন্য মেয়ে খুঁজে দাও। আমার মাথায়, পায়ের কাছে, ডানে আর বামে– বেশি না, এই চারটি নতুন রানি হলেই চলবে।” রাজার কথা শুনে দেওয়ানের চোখ কপালে ওঠে– বুড়ো রাজা বলে কী! তখন সে রাজার থেকে পালানোর উদ্দেশ্যে বললো, “রাজামশায়, আপনি গুনে গুনে আমাকে ছয়টি মাস সময় দিন। আমি ঠিক আপনার জন্য রানি নিয়ে আসব।” এই বলে সে দিল দক্ষিণ মুলুকে পাড়ি। মনে মনে বলে— “অমন পাগল রাজার দেশে আর কে ফেরে!” দক্ষিণ মুলুকে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা হলো এক পাগলের সঙ্গে। পাগলকে দেখে মনে হলো, সে ভালো ঘরের লোক। রাজা-রাজড়ার বাড়ির ছাপ আছে তার মাঝে। দুইজনে খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তখন সে পাগলকে বললো, ভাই তুমি কোত্থেকে এসেছ এখানে? তখন সে বলে, সে এক রাজার মন্ত্রী। তাদের রাজার লাঠি ধরার বয়েসে বিয়ের শখ হয়েছিল। তারই জন্য সাত রানি খুঁজতে এসে আজ সে নিজেই পাগল হয়।

মোর আজা পাগোল বটে গো

বুড়া বয়োস ধরে,

নাটি ধরিয়া হাটে বা আজা গো।

সাতজোন ম্যায়া তার ঘরে।

আরো সাতজোন চায় সেই আজায় গো

বিয়া করিবারে।

দুই দেওয়ানে মিলে খুঁজতে হবে দুই রাজার এগারো জন রানি। অঙ্ক বড় সহজ নয়। দুইজন মিলে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরতে থাকে। এই সময়ে তাদের একটি মেয়ের সাথে দেখা হয়। মেয়েটি দুই পাগল দেওয়ানকে বলে, “ভাই, তোমাদের বাড়ি কোথায়? কেইবা আছে বাড়িতে?” তখন দেওয়ানরা কন্যাকে বলে তোমরা এগারো কন্যা মিলে কাল আমাদের বাড়ি নেমন্তন্ন খেতে এসো। তাহলেই জেনে যাবে কোথায় আমাদের বাড়ি, কে আছে সেখানে। পরেরদিন বাতাসে ভেসে ভেসে সেই এগারো কন্যা চলে এলো দেওয়ানবাড়িতে। আসার পর তাদেরকে দেওয়ানরা শরবত খেতে দিল। শরবত খেতে খেতে গল্পগুজব চললো। এক পর্যায়ে একটি কন্যা জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা তোমাদের কি বউ আছে? তোমাদের দেশে বিয়ের নিয়ম কী?” তখন এক দেওয়ান বুদ্ধি করে বলে, “আমাদের দেশে বিয়ের নিয়ম হচ্ছে কেউ যদি নিজের হাতে শরবত বানিয়ে কোনো কন্যাকে খেতে দেয়, আর তা সে খেয়ে ফেলে— তবেই বিয়ে হয়ে যায়, আর কন্যাকে চলে যেতে হয় তার বরের বাড়ি। তখন এগারো কন্যা মিলে হায় হায় করতে থাকে। দেওয়ানরা আসলে জানতো না, এই এগারো কন্যা ছিল পরীস্থানের পরী। মানুষের সাথে বিয়ে হলে তারা আর কখনো পরীস্থানে যেতে পারবে না— এই দুঃখে এগারো পরী মিলে আকুলি-বিকুলি করে কাঁদতে থাকে। ওদিকে দুই পাগল রাজার দুষ্ট দেওয়ান মিলে তাদের দেখে আর একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হাসে। এগারো কন্যার শাড়ির আঁচল গেরোয় বেঁধে টেনে নিয়ে চললো এক দেওয়ান, অন্যজন তার পিছে পিছে পাহারা দেয়। এমনি করে হাঁটতে হাঁটতে তারা এসে পৌঁছুলো তায়েপ শহরে। সেখানকার বাদশা— শাহা এমরান। তার বাড়িতে আছে অপূর্ব রূপসী কন্যা, নাম সোনাভান। এই দেওয়ানরা যেদিন তায়েপ শহরে গেছে, সেদিনই দুপুরবেলা সোনাভান তার দাসীর সঙ্গে সরোবরে নাইতে নামলো। দেওয়ানদের নজরে পড়লো সোনাভান আর তার দাসী। তখন এক দেওয়ান অন্যজনকে ডেকে বললো, “দুই রাজার জন্য এগারোজন কন্যা, আমাদের দুজনের ভাগ্যে একজনও নেই। দেখো না বন্ধু, দুই কন্যা কেমন হাসছে-গাইছে, সরোবরেতে নাইছে।” তখন পৌষের হাড়কাঁপানি শীত। এর মধ্যে দুই দেওয়ান গিয়ে সোনাভান আর তার দাসীর কাপড়-চোপড় নিয়ে পালিয়ে গেল। অনেকক্ষণ ধরে সোনাভান দেওয়ানের কাছে অনুরোধ করলো। কিন্তু তাদের চরিত্র এতই খারাপ কথা তো শুনলোই না বরং তাদেরকে হাঁটুজলে আসতে বললো। সেই সময়ে গেরোতে বাঁধা এগারো কন্যা বুঝতে পারলো, এই দেওয়ানদের চরিত্র মোটেও ভালো না আর বিয়ের কথাও ভুলভাল বুঝিয়েছে। তখন তারা বাতাসে ভর করে উড়ে গেল। জাদুর মাধ্যমে কন্যারা সোনাভানকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। দেওয়ানরা কিছুই করতে পারলো না। দুজনে মিলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলো আর মাথা চুলকাতে লাগলো। একজন বলে, “মেয়ে মানুষের বুদ্ধি!” তো আরেকজনে একটু গলা চড়িয়ে বলে, “তা আর বলতে!” এরপর তাদের রাজার উপর রাগ ওঠে–

“অমন বুড়ো বয়সে তোমারই বা কচি মেয়ের শখ কেন বাপু?”

“ভীমরতি, ভীমরতি।”

এমন করে শাপ-শাপান্ত করে দুই বন্ধু মিলে গাছের তলায় বসে থাকে। আর ভাবতে থাকে, এরপরে কী করবে। এতদিন যে কাজে বেরিয়েছিল, তা কি শেষ করতে পারবে? নাকি এমন নিরুদ্দেশ হয়ে— বাড়িঘর ছেড়ে, রাজার মহল ছেড়ে এমন করেই জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরবে? এমন সময় হাসির শব্দ শুনে দুজনে চমকে ওঠে। তাকিয়ে দেখে, সেই সরোবরে হাসতে হাসতে কারা যেন একজন আরেকজনকে পানি ছুঁড়ে মারছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখে— সেই তো হারিয়ে যাওয়া এগারো কন্যার দল! কিন্তু যখনই দেওয়ানরা পরীকন্যাদের ধরতে গেল, তখনই একেকজন পানির নিচে পাতালের মধ্যিখানে হারিয়ে গেল। সেই হারিয়ে যাওয়া কন্যাদের পিছু করতে যেই দেওয়ানরা পানির মধ্যে ডুব দিল, অমনি সাঁই সাঁই শব্দে গিয়ে পড়লো অন্যরকম এক দুনিয়ায়। সেই পাতালের দেশে গিয়ে দেওয়ানরা দেখে, চারদিকে যা দেখা যায়– সবই সোনার তৈরি। বাড়িঘর, ঝোপঝাড়-জঙ্গল সবই কেন সোনালি আলোয় ঝলমল করছে দেখে তো দেওয়ানদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। নতুন এই রাজ্যে এসে যেদিকেই যায়, খালি মেয়ে আর মেয়ে। মেয়েরা দোকানে বসে ব্যবসা করছে– হাটেমাঠে কাজ করছে আর ছেলেরা দোকান থেকে জিনিসপাতি কিনে বাড়ি ফিরছে। মেয়েরা নাপিতের কাজ করছে। খয়বর রাজার রাজ্যের এই অবস্থা দেখে পাগল দেওয়ান হেসেই মরে। পেটে খিদে পেলে পাগল গেল এক দোকানে জিনিস কিনতে, কেউ তাকে খেতে তো দিলই নাবরং তার বদলে দুটো কান মলা দিল। এসব দেখে সে দেওয়ান ভয়ে বড় কাবু হলো। বাজারে গিয়ে যখনই সে খাবারের খোঁজ করে, তখনই কেউ না কেউ এসে কান মলা দিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর তো এমন অবস্থা— যে দুটো মেয়ে এসে তাকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে গেল তাদের মহলে। সেই যে কী মহল। দেখে মনে হয় যে রাজার বাড়ি।

বেটি ছাওয়া দুই জোনে নিয়া গ্যালো

মহোলেরো পরে

সোনার খাট উপার পালং

ঝলমল ঝলমল করে।।

সেই মহলে নিয়ে দুজনে মিলে তাকে টানাটানি শুরু করলো। পাগল কেঁদেকেটে যতই ছাড়া পেতে চায়, তারা আরো শক্ত করে ধরে। তখন পাগল চিৎকার করে সেখানে লোক জড়ো করলো। ও মা লোকের কী অদ্ভুত বিচার। সব কথা শুনেটুনে গ্রামের মোড়ল এসে বললো–

দুই ভাগ করিয়া ইরাক

মাজোতে নাও কাটি।

এ কথা শুনে পাগল মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়লো। তখন এক থুত্থুরে বুড়ি তাকে দয়া করে বাড়িতে নিয়ে গেল। বললো, “বোসো বাছা– বলি তোমাকে, শোনো খয়বর রাজার কথা।” খয়বর রাজার ঘরে ছিল পাঁচ রাজকন্যা। কেউই বিয়েথা করেনি। সেই পাঁচ মেয়ের কাছে কাছে আছে পাঁচটি দুর্লভ মোহর। সেই পাঁচ মোহরের নাম ছিল পাঁচফুল। পাঁচফুলের ভেতরে আছে সেই রাজকন্যাদের যৌবন। তাইতো তারা কখনো বুড়ি হবে না। পাগল দেওয়ানকে বুড়ি বুদ্ধি দেয়— “তুমি গিয়ে সেই মোহর নিয়ে পালাও, কন্যা পিছু পিছু যাবে।” পাঁচজন কন্যার সাথে থাকবে তিন দাসী। এদের সবাইকেই তুলে নিয়ে যাওয়ার বুদ্ধি দেয় দুষ্টু বুড়ি। যেই কথা, সেই কাজ। পাগল দেওয়ান গিয়ে চুপি চুপি চুরি করে নিয়ে যায়। মোহর চুরির খবর পেয়ে রাজকন্যারা সব পাগলপারা হয়ে দৌড়াতে থাকে এদিক-ওদিক। “মোহর কই? মোহর কই?” এই ধ্বনিতে চারপাশ কেঁপে ওঠে। হঠাৎ একজন তাকিয়ে দেখে, নদীর ওই পারে, এক গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে সেই পাগল দেওয়ান। আর মুচকি মুচকি হাসছে রাজকন্যাদের দেখে। তখন সে রাজকন্যাদের ওই পারে ডাকলো।

সতার দিয়া আইসে কইন্যা দরিয়ারো পাড়ে,

তাকে দ্যাকি পাগোল ব্যাটা নাইগচে হাসিবারে।

অন্যদিকে সেই যে আরেক দেওয়ান ছিল, সেও গিয়ে তিন কন্যাকে ধরে নিয়ে এলো এইভাবে ফন্দি করে পাগল দেওয়ান তার সঙ্গী দেওয়ানকে নিয়ে আটজন রাজকন্যাকে বন্দী করলো। ভাবলো, এইবার দেশে নিয়ে যাবে রাজকন্যাদের, নিজেই হবে রাজা। সবাই মিলে জঙ্গল দিয়ে যাচ্ছে, আট কন্যা রেগেমেগে অস্থির। কেউ চুলের কাঁটা ফেলে দেয় তো কেউ গায়ের গয়না। সেই জঙ্গলে ছিল এক বিশাল দানব, নাম তার ছামদুন দেও।

সেই জংলোতে আচিল অ্যাক

ছামদুন দেও নাম

চাইরটা মাতা আটটা চউক শোন দিয়া মন।

রাজকন্যারা এতই সুন্দর ছিল যে ছামদুন দেও তাদের পিছু পিছু দৌড়াতে লাগলো। তখন পাগল দেওয়ানদেরকে কন্যারা বললো, “হাঁ করে দেখছো কী! দানবের সঙ্গে যুদ্ধ করো। নইলে ও আমাদের সবাইকে নিয়ে যাবে।” এই কথা শুনে কন্যাদেরকে এক জায়গায় রেখে দেওয়ানরা দানবের কাছে গেল— আর এ সুযোগে পরীদের দেশের পাঁচ রাজকন্যা, তাদের তিন দাসীকে নিয়ে আকাশে-বাতাসে উড়ে গেল।
ওদিকে দানবের সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা দেওয়ানদের ছিল না। ওরা শুধু কুবুদ্ধিতেই পারদর্শী, শক্তিতে নয়। তাই দানবকে দেখে ভয়ে তারা মরার মতো মাটিতে পড়ে থাকলো। দানবেরও বুদ্ধিসুদ্ধি তেমন একটা ছিল না, সে দুটো মানুষকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে ভাবলো— “যা বাবা! আমাকে দেখেই মরে গেল! কী কলজের জোর এদের।” দানব চলে গেল। দেওয়ান দুজন উঠে বসলো। এরপর আবার তাদের রাজকন্যাদের কথা মনে পড়ে গেলে জোরে জোরে কান্না করতে লাগলো। সেই জঙ্গলে ছিলেন এক বিশাল মুনি। আঠারো বছর ধরে তিনি এই জঙ্গলে ধ্যান করছেন। এতদিনে কোনো মানুষের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। তাই হঠাৎ করে মানুষের কান্না দেখে তিনি ধ্যান ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। দেওয়ানরা তাকে সব কথা খুলে বললো। তখন তার মনে হলো, এই মানুষ দুটো আসলে দানবের খোরাক। ওদেরকে নিয়ে যাওয়া তার বোধহয় ঠিক হবে না। তখন তিনি দুজনকেই বেঁধে নিয়ে গেলেন তার আশ্রমে। দানবও মানুষের গন্ধ শুঁকে আবার হাজির হলো। তখন মুনি একটু বিপদেই পড়লেন অবশ্য।

ওপোনীত হইলো দানোব মুনিরো সামোনে

মুনি কয় হায় রে আল্লা

ঠেকিনু বেপোদে,

মানুষ হয়া মাইনষোক দেইম ক্যামনে

দারুণ জমের হাতে।

এইবারে মুনি আর দানবের মধ্যে দারুণ যুদ্ধ বাঁধলো। এ বলে আমায় দেখ, তো ও বলে আমায়। এমনি করে সাতদিন সাতরাত যুদ্ধ চলার পরে অষ্টম দিনে এসে— আটদিন কার কালে দানোব

এ গজ্জন করিলো,

কমোর ধরিয়া মুনির

শুন্নোত ফিকিয়ায় দিলো।

দউড়াইতে নাগিলো মুনি

শুন্ন মুকো হয়া—

দ্যাকিয়া আল্লার জিবরিল ধরিল হাত বাড়েয়া।

জিবরাঈল যখন মুনিকে বাঁচাচ্ছেন, সেই ফাঁকে দুই পাগল দেওয়ানকে বগলদাবা করে দানব নিয়ে চলেছে নিজের বাড়িতে। সেই জঙ্গলেরই পাশে ছিল একাব্বর বাদশার রাজ্য— নাম তার হরিপুর। সেখানেই গল্পে এলো নতুন মোড়।

অ্যাকাব্বর নামোতে বাশশা

হরিপুর শওরে

মেহের চাদ বুলিয়া কইন্যা

আচিলো তার ঘরে।

সেই মেহেরচাঁদকে ছামদুন দেও একদিন তার বাগান থেকে ফুলেরই মতো তুলে এনেছিল। সেই থেকে মেহের বন্দী আছে দানম্বের মহলে। একে একে কেটে গেছে এগারো বচর দশ মাস। আর দুই মাস গেলে দানব তাকে মেরে ফেলবে– এমনটাই ঠিক করা আছে। দুই পাগল দেওয়ানকেও ছামদুন সেখানেই নিয়ে এলো ধরে। দানব এসে মেহেরকে বললো– দিনে আইতে কানদিস কইন্যা

মাইনষোক না দ্যাকি–

আনিয়া দিনু সেই মানুষ

দ্যাকিয়া হওরে খুশি।

দানব আর দেওয়ানরা তখনো জানে না, সেই যে জঙ্গলের মুনি— তিনিও পিছু পিছু এসেছেন দানোবের মহলে। তফাত থেকে দেখেছেন সবই। আল্লা খোদার নাম নিয়ে মুনি দৌড়ে এলেন। হাতে নিলেন এক বিশাল ছোরা। তাই দিয়ে দানোবের একটা একটা করে সব মাথা কেটে ফেললেন। কিন্তু মুনির মনে কী ছিল, তা কেউ বোঝেনি এখনো। এখানে এসেই মুনির নজর পড়েছে মেহেরের দিকে। তাইতো দানবকে মারার পর তিনি চললেন পাগল দুটোকে খতম করতে। তাহলেই তার রাস্তা ফাঁকা। কিন্তু দুই পাগল আর এক মুনি। লড়াইটা ঠিক সমানে সমান হলো না। কোনোভাবেই কব্জা করতে পারছেন না মুনি মশায়। ওদিকে মেহের বসে বসে মজা দেখছে। দানোবের ভয় তার গেছে। এ কয়টা মানুষ আর কী করবে তাকে?

মোনে মোনে ভাবে কইন্যা

বসিয়া তপাতে,

আহা আল্লা মাবুদ মওলা এই আচিল কপালে।

যা আচে কপালোত মোর

যাইবে গুজারিয়া,

ছাড়িয়া পাগোলের দল

যামো পলাইয়া।

এই বলে মুনি-পাগলকে মারামারিতে ফেলে রেখে মেহের পালিয়ে গেল দূর দেশের জঙ্গলে। সেই জঙ্গলে তার দেখা হলো এজমাল কুমার নামের এক রাজকুমারের সাথে। তার সঙ্গে বিয়ে করে মেহের ভাবলো, এইবারে কপালে বুঝি একটু সুখ আছে তার। কিন্তু এজমাল কুমারের ঘরে আগে থেকেই এক বউ ছিল, যে কিনা মেহের চাঁদকে হিংসা করে করে আর তার ক্ষতি করতে চায়। বেশ কিছুদিন যাবার পর এজমাল আর মেহেরের ঘরে সোনার পুতুলের মতো একখানা রাজপুত্র হলো। কিন্তু সতীন রাবেয়া আগে থেকেই বুদ্ধি করে রেখেছে। কালা জাদু করে সে সেই ছেলেকে নিয়ে ফেলে দিল নদীর মধ্যিখানে। ওদিকে মেহের ছেলের শোকে দিনরাত খালি কাঁদে। কিন্তু সেই যে পরীরা ছিল— যারা পালিয়ে গেছিল পাগল দেওয়ানদের হাত থেকে, তারা এখনো দুনিয়ার উপর নজর রাখে। রাজপুত্রকে পানিতে পড়তে দেখে তারা এসে বাঁচালো। কিন্তু তারা কোনোদিন মায়ের কোলে রাজপুত্রকে ফিরিয়ে দিয়েছিল কি না— সে কথা আর জানা যায় না। জানা যায় না পাগল দুই দেওয়ান কিংবা মুনির কথাও। এজমাল অথবা মেহের চাঁদের সংসার কেমন দুঃখে কেটেছিল, তা হয়তো কিছুটা আন্দাজ করা যায়। কিন্তু সব গল্পের শেষে কি আর সব ঠিক হয়ে যায়? তবে জানা যায়, হাজেরা পরী নামে এক দয়ালু পরী সেই রাজপুত্রকে নিজের বাচ্চার মতোই পেলেপুষে বড় করে।