বেশ অনেককাল আগের কথা। টাঙ্গাইলের ভোনার পাড়া গ্রাম। সময়টা ঠিক কত সাল, ঠাওর করা যায় না। তবে সেখানে হৈ-চৈ পড়ে গেছে এক লোককে নিয়ে। সে নাকি গিয়েছিল কোঁচার মুল্লুকে। তবে থাকতে পারেনি।
“যাইমু রে যাইমু কোঁচার মুল্লুকে–
ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং তুলিয়া
সুখে বসিয়া খাইমু রে।”
কোঁচার মুল্লুক– সে এক অদ্ভুত মুল্লুক। সেখানে দূর সীমানায় কোনো পুরুষের দেখা মেলে না। যেখানে যাওয়া যায়, সেখানেই শুধু নারী আর নারী। কিশোরী-তরুণী, অশীতিপর বৃদ্ধা, সবাই আছে। নেই শুধু পুরুষের দল।
লোকটি যখন ফিরে এলো, গ্রামের সবাই জড়ো হলো তার আশেপাশে।
“কী হয়েছিল ভাই?” “সে কেমন দেশ, কোঁচার মুল্লুক?”
হাঁফ ছেড়ে বেঁচে লোকটি বসে। একটুখানি জিরিয়ে নিয়ে বলে অদ্ভুত সেই দেশের গল্প। সে যখন কোঁচার মুল্লুকে গিয়েছিল, তখনো তার জোয়ান বয়স। গ্রামের এদিক ওদিক ঘুরেফিরে, পাঁতার পাশি বাজিয়ে পিরিতের গান গায়। একবার সেই গাঁয়ে এলো বেদেদের নৌকা। নৌকাভর্তি বেদেনির দল। খাদা নাকের সুন্দরীরা সাপ খেলা দেখিয়ে বেড়ায়– তাদের চোখের দিকে চাইলে যেন মনে হয়, সেইখানে ভালোমতো ডুব দিলে দুনিয়ার দুয়েকটা রহস্যের আসান করা যাবে। গাঁয়ের বধূ, গাঁয়ের মেয়েদের চাইতে তাদের আচরণ একবারেই আলাদা। আলাদা তাদের চলাফেরার ধরনও। কয়েকজন বেদেনির একটা করে স্বামী, সেই স্বামী আবার দিনভর নৌকায় পড়ে পড়ে ঘুমোয়। অন্যদের এখনো বিয়ে হয়নি।
বেদেনিদের তাতে কিছু আসে-যায় না। তারা খেলা দেখায়, তাবিজ দেয়ার কথা বলে সবাইকে পাগল করে রাখে। সবকিছুর তাবিজ আছে তাদের কাছে। নতুন বিয়ে হওয়া বরের মন পাবার মন্ত্র জানে তারা। ভবঘুরে বরকেও বশ করতে পারে। পারে আরো অনেক কিছুই– “বিষ ঝাড়ি, বেদনা ঝাড়ি, দাতের পোক খুলি, ভূত ছাড়াই, প্রেত ছাড়াই, বাড়ি বন্দি, মন বন্দি।”
বেদেনির দলে তাবিজ নেবার লোক ছাড়াও বেশি ভিড় করতো উৎসাহী জোয়ান ছেলের দল, যাদের তেমন কোনো কাজ ছিল না। তাই এ মৌসুমে বেদেনিদের দেখাই তাদের মূল কাজ। তেমনই একটি ছেলে ছিল আজকের এই লোকটি। নাম তার রঙী-ঢঙী। আসল নাম কি গাঁয়ের লোকে দিয়েছিল, সে তারাই ভালো জানবে। তবে তার চোখে পড়ে চোদ্দ বছরের এক বেদেনী মেয়ে– এক যার মুখের মাঝে শাপলারাঙা বরণ, চোখের মাঝে চাঁদ ঝিকিমিকি খেলে। সেই চিরল চোখের তরুণ সাতপাঁচ কিছু না ভেবে মন দিয়ে বসলো সেই মেয়েটিকে, যার হাসিতে গাঙের জলের ছলছলানি বাজে।
কয়েকদিন ধরে এই চললো। চোখের কারসাজি, বাজলো হাতের বাঁশি। বাঁশির সুরে পিরিতের গান বাজে, রঙী-ঢঙীর মনেও বিজলী নাচে। দিনের পর দিন সে বেদেনীদের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তেমন কিছুই বলে না, শুধু ভাবগতিকে বুঝিয়ে দেয় মনের কথা। একদিন সন্ধ্যাবেলা তার সেই পছন্দের মেয়েটি কাছে এলো– নাম তার শুক্লা চতুর্দশী, একেবারে পূর্ণিমার আগের রাতের মতোই ঝলমলে। এসে থাকে পান খেতে দিল, সেইসাথে গলায় বেঁধে দিল এক মাদুলী। সেই জাদুর পান আর মাদুলীতে রঙী-ঢঙীর বড় ঘুম পেয়ে গেল। দিশা হারালো সে। শুধু মনের মধ্যে আরো বেশি করে আঁকা হলো শুক্লার মুখখানা। রঙী-ঢঙী হয়ে গেল এক পাগল দেওয়ানা। তাকে সাথে নিয়েই বেদেনীর দল নৌকা ভাসিয়ে দিল। দিন গেল, রাত গেল। সপ্তাহ, মাস। সময়ের কোনো হিসেব নেই, কতদিন ধরে নৌকা ভেসে চলেছে। যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের কিনার, নৌকা ছুঁয়ে যায় সব উজানই। আস্তে আস্তে রঙী-ঢঙীর একটু হুঁশ হয়। চারপাশে তাকিয়ে দেখে, সব দৃশ্য পালটে গেছে। মানুষগুলো আকারে কেমন ছোট ছোট। সবাই কথা বলে আজব এক ভাষায়, নাম তার ‘কিলিমিলি ইলিমিলি’। সে কিছুই বোঝে না। শুধু দেখে সুন্দর সব মেয়ে ঘুরেফিরে, একটিও পুরুষ নেই সেখানে। সেই দেশেতেই নৌকা ভিড়ালো বেদেনীর দল। নামার পর তার হাতে ধরিয়ে দেয়া হলো এক গ্লাস শরবত। বিশেষ এই শরবত আনা হয়েছে জাদুর দেশ কামরুপ কামাখ্যা থেকে। তন্ত্রমন্ত্র করা এ শরবত। শরবত খেতেই রঙী-ঢঙীর শরীরে একশো ঘোড়ার শক্তি এসে গেল, যৌবনের এমন ঢল সে আগে কখনো পায়নি। সেই রাতেই মালা বদল করে তার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল সর্পিনী শুক্লা চতুর্দশীর। সব্বাইকে গিয়ে শুক্লা জানিয়ে এলো, “শোনো শোনো সকলে– শোনো দিয়া মন, বলি তোমাদের একখান খবর।” বিয়ের রাতে নতুন বউ এত জাঁকজমক করে সবাইকে বিয়ের খবর জানাচ্ছে? এমনটাও হয় নাকি? অবশ্য এই বেদেনীর দলের সাথে আসার পর থেকে সবকিছুই তো নতুন নিয়ম। নতুন দেশ।
“এক সুন্দরী হাটে যায়,
দুই সুন্দরী রান্ধে–
তিন সুন্দরী পাশে বইসা
আউলা চুল বান্ধে রে–
আউলা চুল বান্ধে।”
বিয়ের পর থেকে তাই দিনকাল খারাপ যায় না রঙী-ঢঙীর। সারাদিন খায়দায়, আরাম করে। নিজের ইচ্ছেমতো পাতার বাঁশি বাজায় আর ঘুমায়। আর চেয়ে চেয়ে দেখে নতুন দেশের রঙ-ঢঙ। মাঝে মাঝে তাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও গর্তে লুকিয়ে থাকতে হয়। ভূমিকম্পে যখন জমিন থরথর করে কেঁপে ওঠে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে গর্তে পুরে রাখে। যখনই দূর থেকে কোথাও বাঘ ডেকে ওঠে, তাকে আবার গিয়ে থাকতে হয় গর্তের মধ্যিখানে। গর্তে থাকতে তার একদম ভালো লাগে না– তবু কী করবে? গর্তে না থাকলে নাকি তার পুরুষত্ব নষ্ট হয়ে যাবে। মাঝেমধ্যে অনুমতি নিয়ে বাইরে যায়, তবে বউ তাকে একা ছাড়ে না। পাছে অন্য কেউ ছিনিয়ে নেয়? এ দেশে কি আর ভালো পুরুষ আছে?
বউ-শ্যালিকা, শ্বাশুড়ি সবাই পান খায়। কথায় কথায় লম্বা পিক ফেলে। গান গায়, কথাও বলে– সবই ইলিমিলি কিলিমিলি ভাষায়। একবার হাটের দিন। সবাই গেছে হাটে, তাকে রেখে গেছে বাড়িতে। আর এই সুযোগে রঙী-ঢঙী একটু বেরিয়ে পড়লো। উঠানের ধারটায় একটা সুন্দর হরিণ দেখে তার পিছু নিতেই দেখতে পেলো এক প্রকাণ্ড বকুল গাছ, নিচে পুকুরে নাইতে নেমেছে এক সুন্দরীর দল। তাকে দেখেই সবাই হৈ হৈ করে উঠলো। নিজেদের মধ্যে তাকে দেখিয়ে বোধহয় বলাবলি করতে লাগলো, “ভাঁটির দেশের বর গো, ভাঁটির দেশের বর!” স্নানটান সেরে উঠে এসে তারা ইশারায় বললো, “চলো আমাদের সাথে।” বলে কোনো সম্মতির অপেক্ষা না করেই তাকে মোটামুটি টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল তাদের বাড়িতে। এও সেই একই রকম– তার শ্বশুরবাড়ির মতো। সেখানে নিয়ে তাকে কড়া পাহারায় রাখা হলো। কোনোভাবেই বাইরে যেতে দিবে না। উঁচু মাচাংয়ে উঠিয়ে রেখে মই সরিয়ে রাখে। যার দিকে তাকায়, সে-ই ইশারায় কাছে ডাকে। রঙী-ঢঙীর ভয় করতে থাকে।
আদর-যত্নের কম করে না তারা তার জন্য। তবু তার বড় ভয় করে।
এক সুন্দরী চরকা কাটে, অন্যজন সেলাই করে। লুঙ্গি বানায়, ফতুয়া বানায়। কোনো কাজ করতে বলে না কেউ রঙী-ঢঙীকে। তারা সকলে শুধু খাইয়েদাইয়ে তাকে একেবারে পোষা কুকুর-বেড়ালের মতো করে তুললো। যখন ইচ্ছে আদর করে, যখন ইচ্ছে মাচাংয়ে তুলে রাখে। এমনি কয়েকদিন গেল। ওদিকে তার শ্বশুরবাড়িতে তো জানাজানি হয়ে গেছে। তারা আবার দলবল নিয়ে ছুটে এলো এই বাড়িতে। এসে ইলিমিলি কিলিমিলি ভাষায় ভালোই ঝগড়াঝাঁটি হলো। এরপর তারা রঙী-ঢঙীকে কব্জা করে নিয়ে চললো বাড়িতে। ভাবেসাবে বুঝিয়ে দিল, ঘর থেকে পালিয়ে যাওয়ায় মোটেই খুশি হয়নি তারা। এইবার ঘরে নিয়ে পাহারা আরো শতগুণ বেড়ে গেল। দিনেরাতে খাও-দাও, আর রাতে কামরূপ কামাখ্যার সঞ্জীবনী সুধা পান করো। ওদিকে বৌয়ের ঘরে প্রতি বছর অন্তর যমজ মেয়ে হচ্ছে। ঘর ভরে যাচ্ছে মেয়েতে। এ দেশে ছেলে শিশু জন্মায় না, তাইতো ভিনদেশীকে নিয়ে এত টানাটানি।
কয়েক বছর কাটতে কাটতে রঙী-ঢঙীর ঘোর কাটলো। এইভাবে জীবন কাটিয়ে দিতে সে মোটেও পারবে না। কাজ নেই, কর্ম নেই। শুধু ওদের কেনা গোলাম হয়ে থাকা। সেই যে গাঁয়ে মনের সুখে ঘুরে বেড়াতো, এখানে তা আর হচ্ছে কই? পালাবার ফন্দি করলো সে।
সুযোগও চলে এলো শিগগিরই। একদিন বৌয়ের সাথে হাটে গেছে। দেখা হয়েছে সেই সুন্দরীদের সাথে, যারা তাকে তুলে নিয়ে গেছিল। বৌ যখন অন্যদিকে কেনাকাটায় ব্যস্ত, সে তাদের ডেকে ইশারায় বললো, “যাবে নাকি আমার দেশে? ওখানে অনেক পুরুষ পাবে।” এমন প্রস্তাব শুনে ইলিমিলি কিলিমিলি ভাষায় আনন্দে মেতে উঠলো তিন সুন্দরী। ঠিক করা হলো, আজ রাতেই নৌকা ঠিক করা হবে– পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে রঙী-ঢঙী। তার বৌয়ের ঘরে তখন ছয়টি মেয়ে। সবাই মিলে রাতে যখন ঘুমাচ্ছে, সুযোগ বুঝে সে বেরিয়ে পড়লো রাতের অন্ধকারে। মাচাং থেকে কোনোমতে নেমে ভোঁ দৌড়, একেবারে ঘাটে! সুন্দরীরা এলো। তারপর এগিয়ে চললো নৌকা।
দু চারদিন পর দেখা দিল আরেক মুল্লুক। কোঁচার মুল্লুক রেখে এসেছে বহু দূরে। ধীরে ধীরে পুরুষের সংখ্যা বাড়তে থাকলো, নৌকার সুন্দরীরা হাঁ করে তাকিয়ে রইলো আর নিজেদের মনে গল্প জুড়তে লাগলো। হঠাৎই খেয়াল হলো— এ যে ভাঁটির দেশ! এত এত বছর পর নিজের দেশ দেখে, রঙী-ঢঙীর মনে আনন্দ আর ধরে না। রাত্রিবেলা ঘাটে নৌকা বেঁধে বেদেনীর দল আশপাশের লোকদেরকে ভোলানোর চেষ্টা করছে, এমন সময় রঙী-ঢঙী পালিয়ে গেল। নিজের বাড়ি নিজের ঘর– যার নাম পরমেশ্বর।
এইটুকু গল্প শুনে নড়েচড়ে বসলো সবাই। যেন বিশ্বাস হতে চায় না। এরই মধ্যে কৌতূহলী এক ছোঁড়া জিজ্ঞেস করে বসলো, “তা এখন কী করবে ভাই?”
“করব কী আর? অনেক মন্ত্র শিখে এসেছি কোঁচার মুল্লুক থেকে। শ্বশুরবাড়ি বলে কথা। ধরে নাও, আমি এখন থেকে এই গ্রামেরই ওঝা।”
তার মুখের হাসি দেখে ভয় লাগে গ্রামবাসীর। এ যেন তাদের চেনা সেই রঙী-ঢঙী নয়। বয়স অনেকটা বেড়ে গেছে, যেন বুড়োই হয়ে গেছে এই ক বছরে। তবু তার চোখে ঘোর, চেহারায় ঘোর– সবই কোঁচার মুল্লুকের কেরামতি!