Cover illustration for মালঞ্চমালা

মালঞ্চমালা

CATEGORY
Bengali Folktale

এক যে ছিল রাজা, নাম তার চন্দ্র। রূপকথার অন্য সব দুখী রাজার মতো তারও ছিল সেই একই পুরনো দুঃখ। রাজ্য-প্রজা-ধনসম্পদ সবই আছে কাড়ি কাড়ি, নেই শুধু ঘর আলো করা একটি সন্তান। সন্তান কামনায় রাজা তাই বিশাল এক যজ্ঞের আয়োজন করলেন। তিন দিন তিন রাত উপোস করে যজ্ঞের ফলও পেলেন। যজ্ঞে আদেশ হলো, রাজবাগিচায় যে আমগাছে একসাথে দুটো ফল পাওয়া যাবে, সেই ফল খেয়েই উপোস ভাঙতে হবে। তবে একটি শর্ত আছে, বাঁয়ের ফলটি রানি খাবেন– ডানের ফল রাজার যাবে পেটে। যে-ই কথা, সে-ই কাজ। উপোসের পর চতুর্থ দিবসে রাজদুয়ারে এলো পক্ষীরাজ। বাগিচার দিকে ছুটলো পথের ধুলো। কিন্তু বাগানে গিয়ে ঘটলো এক বিপদ। রাজা তো নয়, কেউই ফলগুলো পাড়তে পারছে না। সেই ফলও কোনো সাধারণ আম নয়– ছিল যজ্ঞের প্রসাদ।

“কচি পাতার নিচে কাঁচা সোনার বরণ,

দুই ফল– এক বোঁটা।”

রাজা হুকুম দিলেন, জোড় বোঁটা রেখে আম দুখানা পাড়তে হবে। “পারো তো পাবে রাজার গায়ের শাল, নইলে চড়বে শূল।” এমন কথা শুনে আর কেউ তেমন সাহস করতে না পারলেও রাজবাড়ির কোটাল এগিয়ে এলো। বিড়বিড় করে কীসব পাঁচখানা মন্ত্র পড়ে, ‘হেঁইয়ো’ বলে সে এক মস্ত বড় ঢিল ছুঁড়লো আমের গায়ে। মন্ত্রেই সিদ্ধি লাভ। সকলে বলে উঠলো,

“আহা মন্ত্রের কী জোর!

রাজা পেলেন ফল

কোটাল– রাজার গায়ের শাল।”

সবই ঠিক ছিল। ঝামেলা বাঁধলো বাগিচা থেকে রাজবাড়ি যাবার পথে। পক্ষীরাজে উঠেই রাজা বোঁটাখানা ছিঁড়ে ফেললেন, আম দুখানা সাজিয়ে রাখলেন। কিন্তু ঘোড়ার পিঠে সাজিয়ে রাখা ফল কি আর ঠিক থাকে? ফল অদল-বদল হলো। কেউই বুঝতে পারলো না। ওদিকে রাজবাড়িতে রানি বসে আছেন, যজ্ঞের ফল খাবেন বলে। রাজা গিয়ে সাততাড়াতাড়ি তার হাতে তুলে দিলেন ডানদিকের ফল, নিজে খেলেন বাঁদিকেরটি। যজ্ঞের আদেশ ভুল হলো। কিন্তু কেউই জানতে পেলো না।

এইমতো দশমাস দশদিন কেটে গেল। রাজা-রানির ঘরে যেন পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে এলো এক রাজপুত্তুর। আঁতুরঘর থেকে আলোতে রাতকে দিন মনে হয়। আঁতুরঘরের বাইরে পাহারা দেয় দাসী মালিনী, রাজ্যের সব গপ্পো শুনিয়ে রানিকে ঘুম পাড়ায়। ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসিদের জাদুতে সবার চোখে ঘুম আসে। আর তখনই ভাগ্যদেবতারা আসেন রাজপুত্রের ভাগ্য গণনা করতে। কিন্তু এসে দেখলেন, বিধি বাম! ডান-বামের দোষে যে রাজপুত্রের আয়ু গেছে কমে। মাত্র বারো দিন বাঁচবে এই শিশু, এই লেখা আছে তার রাজকপালে। দেখে দেবতারাও ভীষণ দুঃখ পান, কিন্তু করার কীইবা আছে? মনের দুঃখে চৌকাঠ ডিঙোতে যাবেন তিন সাক্ষী তারা, তখনই মালিনীর সাথে ঠেকে গেল পায়ের আঙুল। মালিনী ছিল রাজা-রানির বড় বিশ্বস্ত। রাজপুত্রকেও প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। দেবতাদের সে জোর করলো, ভাগ্যখানা তাকে বলে যেতেই হবে! দেবতা ভাগ্য বললেন, রাজ্যের সব আলো গেল নিভে। রাজা-রানি শোকে পাথরে হয়ে গেলেন। হাতিশালের হাতি ছুটে গেল, ঘোড়াশালের ঘোড়া মরে গেলো। পক্ষীরাজও ভুলে গেল নাইতে-খাইতে। রাজ্যের সকলের এমনই দুঃখ দেখে স্বর্গের দুয়ারও কেঁপে যায়। একে একে কেটে গেল সাত সাতটি দিন। আর মাত্র পাঁচদিন বাকি রাজপুত্রের আয়ু। এমনই ঘোর দুঃখের দিনে এক জ্যোতিষী ব্রাহ্মণ এসে দাঁড়ালেন রাজদুয়ারে– সব কথা শুনে তিনি একটা বুদ্ধি দিলেন। বললেন, যদি লাভ হয়, তবে এতেই হবে–

“সাতদিনের বর হবে, বারো বৎসরের কনে

এই মতে হয় যদি রাজপুত্রের বিয়ে।”

তবেই খণ্ডাবে ভাগ্যদোষ।

শুনে রাজ্যের সবখানে তাড়া পড়ে গেল, খোঁজ করা হলো দেশে-দেশান্তরে। কোথায় আছে বারো বছরের রাজকন্যা? খুঁজে পাওয়া গেল না কাউকেই। তবে রাজকন্যা না মিললেও মিললো কোটালকন্যা। সেই যে কোটাল, আম পেড়ে দিয়েছিল– এ তারই মেয়ে। নাম মালঞ্চমালা। তার পায়ে নুপূর ভোমরা বাজে, হাঁটার পথে ফুল ফোটে। হাত দুটি হাঁসের গলা, ঢেউ তরঙ্গ চুল, নাক বাঁশি, স্বর্ণশশী স্বর্ণ– একেবারে সোনার বরণ, সোনার প্রতিমা। রূপে যার চাঁদও লজ্জা পায়, রাজপুত্র চন্দ্রমাণিকের বউ হবে এই কন্যা।

তিন সত্য জিজ্ঞেস করে মালঞ্চ হলেন রাজার ঘরের বউ। কিন্তু কপালের লিখন, তবু না যায় খণ্ডন। বাসরঘরেই রাজপুত্রের প্রাণ গেল। রাগে-দুঃখে রাজা বেয়াই কোটালের গর্দান নিলেন। ওদিকে সদ্যবিধবা মালঞ্চকে মাথা ন্যাড়া করে ঘোল ঢেলে রাজ্য ঘোরালেন, তারপর তার দুই চোখ উপড়ে নিলেন।

সব শাস্তি ভোগ করে, রাজার কাছে দান চেয়ে মালঞ্চ তার শিশু বরটিকে নিয়ে গেল চিতার মধ্যিখানে। বৃষ্টির জলে চিতা ভিজে যায়। ভূত আসে, প্রেত আসে– কাউকে সে কাছেও ঘেঁষতে দেয় না। ঠায় বসে থাকে বরকে কোলে নিয়ে। দৈত্য-দানো, শ্মশানের বুড়ো-বুড়ি সকলে বলে, “ও মালঞ্চ, বরটাকে দে না! আরাম করে খাই।” কিন্তু মালঞ্চ কারো কথা শোনে না। চিতায় বসে থাকে। মালঞ্চ যে যমকেও পরোয়া করে না, দূর থেকে এসে ফিরে ফিরে যায় কালদূত-শালদূত।

বেশ কতক্ষণ সময় যায়। সময়ের হিসেব থাকে না। হঠাৎ করে সেখানে উদয় হলো মালঞ্চেরই মতো দেখতে একখানা ফুটফুটে মেয়ের। সে এসে হাসিতে ঢলে পড়ে, চুল এলাইয়া দেয়। মালঞ্চকে ডেকে বলে, “ও মালঞ্চ, তুই আমার সখী! বনের ওষুধ পাতা দিয়ে তোর বরকে জ্যান্ত করি।” মালঞ্চের মেয়েটিকে একদম বিশ্বাস হয় না। সে বলে, “দূর হ রাক্ষসী!” কিন্তু মেয়েটি রাক্ষসী ছিল না, হয়তো কোনো দেবীই ছিল। কিংবা জাদুকরী। তার পরিচয় জানা যায় না। কিন্তু তারই কীর্তিতে মালঞ্চ আবার চোখে দেখতে পায়, তার কাটা হাত-পা, চুল সব ফিরে আসে। ধীরে ধীরে শিশু বর চন্দ্রমাণিকও হাত-পা নেড়ে ওঠে। মালঞ্চ দেখে, আর অবাক হয়।

ছোট্ট বরকে নিয়ে মালঞ্চ এগিয়ে চলে। কিন্তু কোথাও জনমানুষের বসতি পায় না। রোদের তাপে গা পুড়ে যায়, মালঞ্চ আঁচল দিয়ে ঢেকে রাখে চন্দ্রমাণিককে। ঝড়ে সবকিছু উড়ে যায়, মালঞ্চ বুকের সাথে জাপটে ধরে রাখে তার প্রাণপ্রিয় বরকে। এমনি করেই একদিন তারা এসে পড়ে এক গহীন জঙ্গলে। সেখানে দেখা হয় এক বাঘের সাথে। বাঘ তো বাঘের মতোই, এসে ‘হালুম’ করে চড়াও হলো। ইচ্ছে, শিশুটিকে খাবে। মালঞ্চও কি কম যায়? চিতা থেকে স্বামীকে ফিরিয়ে এনেছে, বাঘের হাতে দিবে না কি? সে বলে, “দেখ বাঘ। ইনি আমার স্বামী। একে খেয়ে তোমার কি আর পেট ভরবে? তুমি আমাকে খাও।” এমন কথা শুনে বাঘের মনে দয়া হলো। সে তখন মালঞ্চ আর চন্দ্রমাণিককে নিয়ে গেল নিজের বাড়ি। সেখানে বাঘিনীর সাথে তার বড়ই সুখের সংসার। মালঞ্চ বাঘকে মামা ডাকে, বাঘিনীকে মামি। তারাও নিজের সন্তানের মতো করেই পালতে থাকে দুজনকে। এমনি করে পাঁচ বছর গেল। তখন মালঞ্চ বললো, “মামা-মামি, এবার আমায় বিদায় দাও।” চোখের জলে ভাসিয়ে দিয়ে বাঘ-বাঘিনী মালঞ্চকে বিদায় দিল। মালঞ্চ এসে পৌঁছালো এক মরা বাগানে, যার দখিনদিকে দুধবর্ণ রাজার বাড়ি। বাগানে পা রাখতেই ভোমরায় ভরে গেল চারদিক, গাছে গাছে ফুল-লতা-পাতায় ভরে উঠলো। ফুলের গন্ধে ম ম করে উঠতেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সেই বাগানের মালিনী– “কে গো মা তুমি? তোমার স্পর্শে বাগানে সুগন্ধ! এসো, ঘরে এসো।”

সেই থেকে মালিনীর ঘরেই তাদের বাস। নিজের পরিচয় খুলে বলে না মালঞ্চ, ভয় হয়– যদি আবার রাজার রোষানলে পড়ে। তার চেয়ে এই ভালো। চন্দ্রমাণিক বড় হয়, পাঠশালায় যায়। মালঞ্চ আর তাকে দেখা দেয় না। মনে ভয়, যদি মা বলে ডাকে! মালঞ্চ রান্নাবান্না করে দেয়, সেই খাবার মালিনী নিয়ে খাওয়ায়। এইভাবেই কাটে সাত সাতটি বছর। দুধবর্ণ রাজার দেশে রাজার ছিল সাত পুত্র, এক কন্যা। নাম তার কাঞ্চনমালা। চন্দ্রমাণিক যে পাঠশালায় পড়তে যায়, রাজার ছেলেমেয়েও সেইখানেতেই। চন্দ্রমাণিকের গুণের শেষ নেই, তা দেখে রাজার ছেলেরা হিংসেয় জ্বলে মরে। কিন্তু কাঞ্চনমালার মনে অন্য কথা, চন্দ্রমাণিকের রূপে-গুণে সে প্রায় পাগলপারা। সে শুধু খাতায় লেখে, গুনগুন করে গান গায়। সবটাই চন্দ্রমাণিকের কথা–

“হাতে চন্দ্র পায়ে চন্দ্র তার, কপালে চন্দ্র জ্বলে

কত শত উদয় চন্দ্র গো, তার বদন কমলে।”

পাঠশালার সব পরীক্ষা শেষ হলো। শেষ পরীক্ষা ঘোড়দৌড়েও চন্দ্রমাণিক রাজার ছেলেদের হারিয়ে দিল পক্ষীরাজ ছুটিয়ে। কিন্তু যেই জয়ের মালা দেবার সময়– ওমনি ঘটলো এক আশ্চর্য ঘটনা। রাজপুরীর সোনার চূড়ায় স্বর্ণকলসের পাশে বসে কাঞ্চী, মানে কাঞ্চনমালা। সেইখান থেকে নিজ হাতে বোনা একখানা সুগন্ধী মালা ছুঁড়ে দিল বাতাসে, সেই মালা এসে পড়লো চন্দ্রমাণিকের গলায়। রাজকন্যা মালা দিয়েছেন, এখন আর কী করা? মনে হিংসে থাকলেও সাত ভাই মিলে তাকে নিয়ে গেল রাজসভায়। কিন্তু কেউ তো আর জানে না, এ যে রাজার পুত্র– মালিনীর নয়। দুধবর্ণ রাজার ভীষণ রাগ হলো। রাজকন্যা হয়ে মালির ছেলের গলায় মালা? ঘোর অনর্থ! গলায় মালা দিয়েছে, তাই বিয়ে হলো ঠিকই। তিন দিন তিন রাত আনন্দ-উল্লাসের পর চতুর্থ দিবসে চন্দ্রমাণিককে গলায় শিকল পরিয়ে বারো বছরের শাস্তি দেয়া হলো। চাঁদের ছেলেকে নিয়ে গারদের পুরলো।

ওদিকে পক্ষীরাজের কাছে মালঞ্চ সব খবর পায়। সে তার সরোবরের পাড়ে ধুলায় লুটায়। আকাশের চাঁদ তার দুঃখে একেবারে মেঘে ঢেকে যায়। শোনা যায়, বাংলাদেশেই আছে সেই সরোবর– টাঙ্গাইল-সাভারের প্রান্তসীমায় এক দুঃখিনী কোটালকন্যার স্মৃতি বিজড়িত, রূপকথার গন্ধ মাখা ‘মালঞ্চকন্যার দিঘি’।

কূল-কিনারা না দেখে মালঞ্চ পক্ষীরাজকে ডেকে বলে, “বারো বৎসর অপেক্ষার এই বুঝি ফল?” মনের দুঃখ মনে চাপা দিয়ে মালঞ্চ চিঠি লিখতে বসে। কাকে? তার শ্বশুর মহারাজকে। ছেলের খবর বাবাকে জানানো দরকার বটে।

“বারোদিন ছিল আয়ু, আজ পূর্ণ বারো বৎসর। দুধবরণ রাজার ঘরে চন্দ্রমাণিক পাবে রাজবর। রাজকন্যা কাঞ্চনমালা অতি মালাবতী। তার সাথে হইল বিবাহ, ঘুচিল দুর্গতি।”

চিঠিখানি পক্ষীরাজের কাছে দিয়ে মালঞ্চ উঠান ভাসিয়ে কাঁদতে বসে। কিন্তু আসল খবর মালঞ্চের কানে তখনো যায়নি। সে ভেবে বসেছে, স্বামী তার সুখে সংসার করছে রাজকন্যার সাথে। কিন্তু গারদের পোরার খবরটা তো সেও জানে না, তার সাথী পক্ষীরাজও না। মনে দুঃখ নিয়ে মালঞ্চ বাপের বাড়ি যাবে বলে বেরিয়ে পড়ে। মনে মনে ভাবে–

“যে সায়রে পাইলাম হীরা, যে দেশেতে হারাইলাম বাপ–

সেই দেশের সায়রের জলে ঘুচবে আমার মনস্তাপ।”

চলার পথ কাঁটায় ছেঁড়া, কাঁকরে ভরা। পথে যেতে যেতে জঙ্গলে এসে দেখা হয়ে গেল বাঘ-বাঘিনী মামা-মামির সাথে। বাঘ তো সেই দেশের সব খবরই জানে, সে মালঞ্চকে জানালো– “গলার মালা? রাজার রাজন্যার বিয়ে যদি মালিনীর ঘরে, তবে সেই বর বারো বৎসর গলায় শিকল পরে। এই দেশের এই নিয়ম।”

সব কথা শুনে মালঞ্চ ভাবল, চন্দ্রমাণিককে তারই রক্ষা করতে হবে। এই ভেবে সে গেল দুধবর্ণ রাজার সেই কারাগারে, যেখানে বারো বছরের জন্য বন্দী হয়ে আছে রাজার ছেলে। গলায় তার বিয়ের মালা নয়, আছে লোহার শক্ত শেকল। মালঞ্চ সেখানে গিয়ে দিনরাত এক করে দেয়, দাঁতে কাটতে যায় লোহার শিকল। সম্ভব কিছু নয়– তবু রূপকথায় যেন সবই হয়।

“এক প্রহরে আটটি করে দাঁত যায়– কাটা হয় শিকলের এক পরত।

চার প্রহরে কাটা হলো চার পরতের বাঁধন।”

চন্দ্রমাণিক ঘুম থেকে উঠে দেখলো, সে মুক্ত। মালঞ্চ যে সেখানে পড়ে রয়েছে, সেদিকে তার খেয়াল হলো না।

এইবারে মালঞ্চর মামাবাড়ি, মানে জঙ্গলের বাঘদের পালা। তারা এসে দুধবর্ণ রাজার দেশ একেবারে উজাড় করে দিল। রাজবাড়ির ঠাঁটকটক, ঘোড়া-হাতি, কিছুই খেতে বাকি রাখলো না। বাকি থাকতো না হয়তো রাজা-রানিও। শুধু মালঞ্চের অনুরোধে রাজকন্যা কাঞ্চনমালা, মানে কাঞ্চীকে ছেড়ে দেয়া হলো– সঙ্গে রক্ষা করা হলো রাজ পরিবারকেও। একটাই কথা মালঞ্চের, স্বামী থাকুক সুখে!

দাঁত নেই, রাজা নেই, বাড়ি নেই, ঘর নেই– মালঞ্চের তবু মনে সুখ, চন্দ্রমাণিক ছাড়া পেয়েছে! বহু বছর পর রাজা ফিরে পেলেন রাজপুত্রকে। আনন্দে আর তর সয় না। এক্ষুনি চলা হোক নিজেদের রাজ্যে। পালকি, ঘোড়া, চৌদোলা সবই ঠিক করা হলো। কিন্তু হায়, মালঞ্চ? মালঞ্চের খবর কেউ রাখে না। দুখিনী মালঞ্চ সব শেষে পড়ে রয় রাস্তার ধারে। তার সঙ্গী শুধু বাঘ-বাঘিনী, আর দুধ রাজার দেশের মালিনী। তারা সকলে এসে মালঞ্চকে ওঠায়, সান্ত্বনা দেয়।

ওদিকে রাজা কাঞ্চনমালা আর চন্দ্রমাণিককে নিয়ে ঢোল-ঢাক বাজিয়ে রাজ্যে ফেরত গেলেন। মালঞ্চও পিছু পিছু গেল। মাঝে মাঝে ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে আসে, বর আর তার নতুন বউ কেমন আছে! এমনি করে একদিন সে ধরা পড়ে গেল। চন্দ্রমাণিক তার পরিচয় জানতে চাইল। এত বছর ধরে যে পরিচয় লুকিয়ে রেখেছে, সেই পরিচয় এখন জানাতে হলো। কিন্তু পরিচয় জেনে কোনো লাভ হলো না– তক্ষুনি রাজার পাইক-পেয়াদা এসে অভাগী কোটালকন্যাকে ধরে নিয়ে গেল। আরো একবার রাজ্য থেকে তাকে জোর করে বের করে দিল। মালঞ্চ রাজ্যের বাইরে পা রাখতেই রাজ্যে দেখা দিল অশান্তি। দেউড়ি ভেঙে পড়ে, আকাশে এই তারা খসে যায়– ওইখানে আগুন লাগে। এমনকি রাজপুত্রের ঘরে একে একে সাতটি ছেলে হয়, কারোই আয়ু বেশিদিন থাকে না। মালঞ্চ যে পথে হেঁটে যায়, সেই পথে শুধু ফুল ফুটে– সুবাসে ভরে যায়।

এমন করে অনেকগুলো দিন কাটলো। মালঞ্চ এখন গহীন জঙ্গলে নিজের মতো থাকে। রাজবাড়ির কাছেও আসে না। কিন্তু রাজবাড়ির সাথে তার পোড়া কপাল বাঁধা– এত সহজে কি আর ছেদ হয়? একদিন মহারাজ শিকারে বেরোলেন। শিকারের মাঝপথেই তিনি পথ হারালেন। যেদিকেই যান, মনে হয় এ যেন গোলকধাঁধার চক্কর। পথে ঘুরতে ঘুরতে রাজা ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। হাঁটু গেড়ে বসে বড় করুণ স্বরে বলতে লাগলেন, “জল, একটু জল!”

জঙ্গলের একখানা জীর্ণ কিন্তু বড় সাজানো-গোছানো কুটির থেকে বেরিয়ে এলো একটি অতি সুন্দর মেয়ে। তাকে দেখলেই যেন মনের তৃষ্ণা কমে যায়, মন শীতল হয়। ধীরে ধীরে এসে সে মহারাজকে এক পাত্র হিমশীতল জল খেতে দিল। ওটুকু পেয়ে মহারাজ বড়ই সন্তুষ্ট হলেন, বললেন, “কে তুমি মা? আমায় এই ঘন জঙ্গলে জল খেতে দিলে? তোমাকে আগে কখনো দেখিনি।”

মিষ্টি হেসে মালঞ্চ নিজের পরিচয় দিল রাজাকে। তার মধ্যে যেন এত দুর্দশার পরও কোনো কলুষতা নেই। লজ্জায় রাজার মাথা হেঁট হয়ে গেল। তিনি তক্ষুনি তাকে রাজ্যের যুবরানি করে নিয়ে যেতে চাইলেন। মালঞ্চ তখন জানালো, এখন বনেই তার ঘরবাড়ি। মহারাজ কিছুতেই মালঞ্চকে ছাড়তে চাইলেন না। আগের সব পাপকাজের ক্ষমা চেয়ে বললেন, এইবারে তাকে সাথে যেতেই হবে! তখন মালঞ্চ গেল বনের মাঝে, মামা-মামি আর মালিনী মাসির কাছে বিদায় চাইতে। এত বছর পর তার অপেক্ষার পালা শেষ হয়েছে। মালঞ্চের মনে আনন্দ ধরে না। আর সেই আনন্দে মালঞ্চ সকল মরার উপর সপ্ত ঘিয়ের বাতির তেল ছিটিয়ে দেয়। রাজ্যের সকলে এক এক করে আবার জীবিত হয়ে ওঠে। গাছে গাছে ফুল ফোটে, পাখি গায়। মালঞ্চের ছোঁয়ায় দেশে বারোমাস বসন্ত আসে। মালঞ্চের হাতে যেন জিয়নকাঠি-মরণকাঠি।

রাজ্যের লোকে ভাবতে বসে, এ কি রাক্ষসী, নাকি দেবী? সাতপাঁচ ভাবে তবু মালঞ্চের রূপে-গুণে সবাই মুগ্ধ হয়। মালঞ্চ হয় চন্দ্রপুরের ঠাকুরানি। মালঞ্চের মনে এতই দয়া, সে কাউকে তাড়িয়ে দেয় না। তবে সেই যে কাঞ্চী, তাকেও সে বের করে দেয়নি। তাকে পাটরানি করে রেখেছে। শোনা যায়, সকলে মিলে তারা বেশ ভালোই আছে। মাঝেমধ্যে বাঘ মামা জঙ্গলের ফলফলাদি নিয়ে ভাগ্নিবাড়ি বেড়াতে আসে।