Cover illustration for দস্যি মেয়ে মাণিকতারা

দস্যি মেয়ে মাণিকতারা

CATEGORY
Bengali Folktale

BASED ON THE BOOK

বাংলার পুরনারী

by দীনেশচন্দ্র সেন

ব্রহ্মপুত্রের নদের ধারে এক বন্দর। নাম তার গঞ্জের হাট। মাঝে মাঝেই গঞ্জের হাটের কাছে, জলের মধ্য থেকে কেমন যেন একটা রাগী আওয়াজ শোনা যেত। সে গর্জন শুনে আশপাশের লোকে বলতো, “ওই যে শোনো বহ্মদত্যি (ব্রহ্মদৈত্য) ডাকছে! কেন যে ক্ষেপেছে, কে জানে।”

সপ্তাহে এক দিন অন্তর তিন দিন এ হাট বসে। হাটবারে লোকের যে কী ভিড় হয়— তা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা মুশকিল। এই হাটের কাছেই বিশু নামে এক নাপিত বাস করতো। সঙ্গে তার পরিবার। নাপিতের পেশায় আয়-রোজগার এমনিই কম, ওর উপর বিশু নাপিতের কাজ তেমন করতো না। আবার বংশানুক্রমে পাওয়া দারিদ্র্য— বিশুর দিনকাল কখনোই খুব একটা ভালো যেত না। ঘরের চালে ফুটা দিনদিন বেড়ে চলতো, উঠানের বেড়া রোজই আরেকটু করে ভেঙে যেত। বিশুর ঘরে বর্ষার দিনে ভেসে যেত জলে— যেন তা নিজেই ছোটখাটো এক ব্রহ্মপুত্র। তাই অগত্যা উপায় না পেয়ে বিশু তার বউ-বাচ্চা নিয়ে ভিক্ষে করতো।

বিশুর পুত্রভাগ্য খারাপ কি ভালো, এ নিয়ে ভাবতে গেলে বহু বিজ্ঞজনেও বিপদে পড়বেন। কেননা তার চার চারটি ছেলে ছিল। কপালগুণে একজন নিয়েও তার সুখ নেই। বড় ছেলে বসু তো জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দস্যিপনা করে বেড়ায়, আয়-রোজগার দূরের কথা শান্ত হয়ে বসতেও সে পারে না। মেজো ছেলে কুশাই দিনদুপুরে নদের জলে সাঁতার কাটতে গিয়ে সেদিনই মারা গেল। সেজ ছেলেকে টেনে নিয়ে গেল হাঙ্গরে— আর ছোট ছেলে গাছের মগডাল থেকে পড়ে বেশ কিছুদিন ভুগেটুগে শেষমেশ সেও মারা গেল। বেঁচে রইল যে, তাকে নিয়ে বাপ-মার এমনিও কোনো আশা নেই। পুত্রশোকে পাগলপারা হয়ে বিশু নাপিতও নিজেকে সেই ব্রহ্মপুত্রের জলেই ঠেলে দিল। স্বামীর মৃত্যু দেখে বিশুর বউও তারই পথে যাবে ভেবেছিল। কিন্তু সবেধন নীলমণি বাসুর কথা ভেবে সে ঘরে ফিরে এলো। এখন ঘরে শুধু দুই মা-ছেলে। আর কেউ নেই।

বাসুর এখন বিশ বছর বয়স। সঙ্গী হয়েছে সে পাশের বাড়ির কানু মুচির। দিনভর উদাস কানুর পিছে পিছে ঘুরে বেড়ায় সে।

বিশ বছইরা জোয়ান হৈল সেই বাসু ছোঁড়া।
পাড়ায় পাড়ায় ঝোপ জঙ্গলে লাফায় যেন ঘোড়া।।

সাকরেদ হৈল বাসু নাপিত ওস্তাদ কানু কোচ।
মানুষ গরু কেউ মানে না ফুলাইয়া ফিরে মোচ।।

তবে কেউ যে কথা জানতো না, তা হচ্ছে কানুর চরিত্র খুব একটা ভালো ছিল না। সেও গরিব ঘরের ছেলে। তাই চুপচাপ সে জলদি কীভাবে ধনসম্পদ উপার্জন করা যায়, সে চিন্তাতেই থাকতো। এক রাতে সে বাসুকে ডেকে নিয়ে গেল, এক বড়লোক বামুন-বামুনিকে মাঝনদে ডুবিয়ে দেবার জন্য।

“বুঝলে বাসু ভাই, এই বুড়ো-বুড়ির সব টাকা-পয়সা সব মেরে দিয়ে দুই ভাই মিলে বাড়ি নিয়ে যাব।”

বাসু বললো, “কিন্তু মাঝনদে যদি আমরাও ডুবে যাই?”

“আরে পাগল, আমি কি না জেনেবুঝে একথা বলছি নাকি? আমি আজ সকালেই শম্ভু জেলের কাছ থেকে একটা লম্বা দড়ি নিয়ে এসেছি। ওই দড়ির এক মাথা বাঁধা আছে গাঙ্গের পাড়ের বড় শিমুল গাছে। ওই দড়ি ধরেই আমরা বেঁচে যাব।”

কানুর কোনো কথাই বাসু ফেলে না। একথাও মেনে নিল। দুজনে মিলে বামুন দম্পতিকে মেরে তাদের সবকিছু নিয়ে পালালো। সকালবেলা মায়ের কাছে বাসু মেলে ধরলো তার এক রাতের উপার্জন—

সোনার মালা– বাজু আছে আর আছে বুকের পাটা
সোণার হাঁস গাঁথা আছে, কান খোঁচানী কাঁটা।।

নথে আছে চুনি মণি আর মুক্তা ঝুল মূল।
গোন্ডা বাইশেক তাবিজ আছে আর যে বকফুল।।

চন্দ্রহার, সূরুজহার, রূপার বাকখাড়ু।
চরণপদ্মে বাঁধা আছে গুজরী দুই গাছ সরু।।

“ও মা! এ যে কোনো রানীর সাজ!” চোখ কপালে ওঠে বাসুর মায়ের।

“এ আর এমন কি! আরো দেখো, মা!”

সুলতানী মোহর কাছে, বাদশাই গোরে টাকা।।
খইরকা মুষ্টি আর আছিল আগুনপাটের শাড়ী।
সোণার বাটী, আভের কাঁকুই, সোণার আছাড়ি।।

বাসুর মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কোথায় পেলি এ সাত রাজার ধন, বাবা?”

সব কথা জানার পর তার মাথায় হাত পড়লো। এ ছেলে যে সর্বনাশ করেছে। এ দিন দেখার জন্যই কি সে নদের জলে নিজের প্রাণ না দিয়ে ছেলের কাছে থেকে গিয়েছিল? এমনি হা-হুতাশ আর বিলাপ করতে থাকে বাসুর মা। দিনে দিনে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। মায়ের অবস্থা বেগতিক দেখে বাসু তিনকড়ি কবিরাজকে ডেকে আনে। কবিরাজ লম্বা ফর্দের পথ্য বলে দেয়। বাসুর তো এখন টাকার অভাব নেই, সে সবই আনে, মাকে খাওয়ায়। কিন্তু তার মায়ের আর বাঁচার ইচ্ছা ছিল না। সে সন্ধেবেলা ইষ্টনাম করে শেষ নিঃশ্বাসটি ফেলে। মনে নিয়ে যায় ছেলের জন্য অনেক আফসোস।

মা মরার পর বাসুর যেন কোনো পিছুটানই রইলো না। দিনভর কানুর সঙ্গে একে ওকে লুটে বেড়ায়। ধর্মের কোনো ভয় নেই তার, আছে শুধু অকর্মের চেষ্টা। একদিন কানু বাসুকে বললো, “টাকা-পয়সা তো কম কামালে না। এবার একটা বিয়েথা করো!” এই বলে কানু আবার তার জন্য একটি মেয়েও দেখে আসলো। তিন ক্রোশ দূরে মাইন্দা গাঁয়ে সে মেয়ের বাস। সাধু শীলের কন্যা, নাম তার মাণিকতারা।

৩০০ টাকা পণ দিয়ে বোশেখ মাসের পাঁচ তারিখ বাসুর সঙ্গে মাণিকতারার বিয়ে হলো। তার সঙ্গে নাইওরী এলো ভাগ্নি পঞ্চু— তিনকূলে তার কেউ নেই, মাসিই তার সব। ভেঙে পড়া সংসার আবার একটু একটু করে জোড়া লাগা শুরু হলো মাণিকতারা আর পঞ্চুর আগমনে।

কিন্তু নতুন বউ অবাক হয়ে দেখে, বর যেন কী ভাবনায় মশগুল। অনেক কষ্টে তার মুখ থেকে শেষমেশ কথা বের করা গেল—

“তোমাকে বা তোমার বাবাকে বললে যদি আমার সঙ্গে বিয়ে না দিতেন, তাই ভয়ে বলিনি এ কথা।

নাপিতের ছেলে— নাপিত আমি নই। ডাকাতি, চুরি, লুটতরাজ আর করি অরাজকতা।”

এ কথা শুনে মাণিকতারা তো হেসেই কুটিপাটি।

“ও মা, এ আর এমন কী কথা! তুমি ঘর চালানোর জন্য যা-ই করো, তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই গো।”

দুজনের সংসার ভালোই চলে। ডানপিটে মেয়ে মাণিকতারা প্রায় দিন তীর-ধনুক দিয়ে বাসুকে হরিকেল পাখি শিকার করে, রান্না করে খাওয়ায়। আর বাসু যা হীরে-জহরত যা পায়, তা এনে বউকে পরায়।

বাসু আর কানুর শত্রু ছিল আরেক ডাকাত। নাম তার কালু সর্দার। একদিন ছলে-বলে কালু সর্দার কানুকে ধরে নিয়ে গেল। বাসু আর মাণিকতারা দুজনেই খুব চিন্তায় পড়ে গেল। বাসু তার বউকে বড় ভরসা করে—

“তুমিই পারো, একটা বুদ্ধি বের করে আমার কানু ওস্তাদকে রক্ষা করতে!”

তক্ষুনি মাণিকতারা ফন্দি আঁটলো, সে আর তার ভাগ্নি পঞ্চু মিলে নর্তকী সেজে কালু সর্দারের বাড়ির সামনে গিয়ে তাকে ফাঁদে ফেলবে। কালুর ছেলে দুলু শেখ মাণিকের ফাঁদে পড়লো। অতঃপর তাকে জিম্মি করে, কালু সর্দারের কাছে কানুর প্রাণ ফেরত চাইলো তারা।

ছেলের চেয়ে তো আর শত্রুর প্রাণ বড় নয়। কালু সর্দারও মানে মানে কানু দাদাকে ফেরত দিল। বাসু আর মাণিকতারা মিলে তাকে আচ্ছা করে হরিকেলের মাংস খাওয়ালো। দুই ভাইয়ের ডাকাতদলে যুক্ত হলো সাধু শীলের মেয়ে— নাম তার মাণিকতারা।