Cover illustration for মায়ারশি

মায়ারশি

CATEGORY
Puthi Literature

BASED ON THE BOOK

মায়ারশি দুছরা

by হাজী ইয়াছিন

এক দেশে এক রাজা ছিল। নাম তার করিম শাহা। আশপাশের সব অঞ্চলেই তার নামডাক। প্রজারা তার গুণ বলতে বলতে রাতকে দিন করে, দিনকে রাত—এমনই তার পসার। একদিন করিম শাহার ঘরে এক ছেলে জন্ম নিল। সকলে মিলে তার নাম দিলো মনোহর শশী।

সেই ছেলে বড় হতে থাকলো আর রাজার মুখ আরো উজ্জ্বল হলো। হবে নাইবা কেন, নামের মতোই যে তার ছেলে চাঁদের আলো ছড়িয়ে বেরায় চারদিকে। তার রূপে-গুণে সকলেই মাতোয়ারা। সেই রাজপুত্র শিকার করতে খুব ভালোবাসে। একদিন রাতে ঘুমিয়ে সে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলো।

শপনে দেখিল গেছে করিতে শিকার।
তাহাতে উটিল গিআ শরবরের পার
শাহানে বান্দিছে ঘাট উত্তম পুকুরি।
চারি দিগে শখিগনে রাকিআছে ঘিরি।

সেই শান-বাঁধানো ঘাটে, সখীদের কোলাহলের মধ্যে, একখানা মশারির মাঝে রাজপুত্র মনোহর দেখতে পেল ভিনদেশী এক রাজকন্যাকে। গহীন পুরীর রাজকন্যা সে, উলা শাহার মেয়ে। নাম তার মাএআরশি—রূপ তার দেখে ভেঙে যায় হাতের আরশি! অমন কন্যাকে দেখার জন্য যেই না স্বপ্নে রাজপুত্র উঁকিঝুঁকি দেয়, অমনি সখীরা তাকে তাড়িয়ে দেয়। ঘুম ভেঙে যায় রাজপুত্রের। কিন্তু মন থেকে সরে না রাজকন্যার চাঁদবদন মুখখানা।

ছেলের আকুলি-বিকুলি অবস্থা দেখে বাবা বেশ চিন্তায় পড়লেন। জানতে চাইলেন, কী তার মনের ব্যথা। কুমার সবই খুলে বললো। সব কথা জেনেশুনে রাজা খবর দিলেন তার বিশ্বস্ত এক বৈষ্ণবীকে—নাম তার মহামতি, কাজে তার বড়ই গতি! মহামতির কাছে তিনি জানতে চাইলেন তার পুত্রের রাতের ঘুম হারাম করা সেই কন্যার কথা।

মহামতি সবই জানে। রাজাকে সে বলে, গহীন পুরীতে যাবার পথে কতই না বিপদে ভরা রাস্তা। সেখানে যাবার কথা ভাবলেও লোকের গা ছমছম করে। তবে হ্যাঁ, রাজকন্যা একখানা আছে—তার রূপ-গুণের কথা বলে শেষ করা যায় না, এমনই তার বাহার।

পরম শুন্দরি কইনা নতুনা জউবন।
আকাশের চন্দর জিনি মুখের বরন
গলেতে শুবিআছে নবগুঞ্জের মালা।
ওন্দকার ঘরে জেন পরদিব উজালা

সেই অদ্ভুত রূপসী কন্যার জন্ম নাকি মশারির ভেতর। বাইরের কেউই তাকে দেখতে পারে না। কন্যার যখন স্নান করতে ইচ্ছে করে, সেই মশারির মধ্যে করেই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় নদীতে, সমুদ্দুরে।

মহামতির কাছে সকল কথা জেনে রাজার কুমার ঠিক করলো, সে যাবে সেই গহীন পুরীতে। তাকে যেতেই হবে মাএআরশি রাজকন্যার কাছে। রাজাও ছেলের কথা শুনে বন্দোবস্ত শুরু করে দিলেন।

চারি ডিংগা শাজ কৈলা কুমারের শংগতি
এক ডিংগা শাজ কইলা দিদার বকশ নাম।
আর ডিংগা শাজ কইলা নামে শুআ বুলি।
আর ডিংগা শাজ কইলা নামে করনফুলি

এইমতো চারখানা ডিংগা সাজিয়ে রওনা হলো কুমারের নৌবহর। উদ্দেশ্য অচিন নগরী গহীন পুরী। কিন্তু চাইলেই তো সহজে গহীন পুরীতে যাওয়া যায় না। সেখানকার রাজা-রানী, রাজকুমারী এমনকি রাজ্যের নিয়ম-কানুনও অন্য দেশের মতন নয়। তাই মহামতি কুমারের কানে কানে বলে, রাত্রেবেলা সুড়ঙ্গ দিয়ে যেতে হবে গহীন পুরীর ভেতরে। সে পথও খুব একটা সহজ নয়। বহু রঙের ঘরের মধ্যে একখানা গোলাপি রঙের ঘর রয়েছে পুরীর মধ্যে। সেখানেই থাকে রাজকুমারী। খুঁজতে খুঁজতে রাজকুমার হাজির হলো মায়ারশির ঘরে। ঘুম ভেঙে অচিন পুরুষকে দেখে মায়ারশি তো অবাক।

দুয়ে মিলে অনেকক্ষণ লুকিয়ে লুকিয়ে গল্প হলো। দুজনেই দুজনকে মন দিয়ে বসলো। এবার রাজকুমারীকে নিয়ে যাবার পালা। কিন্তু মায়ারশি এভাবে লুকিয়ে বাড়ি ছেড়ে যাবে না। সে যায় রাজবহর, সে চায় সকলের অনুমতি। একথা শুনে রাজকুমারও খুশি। পরদিন সকাল সকাল বন্ধু-পরিজনকে নিয়ে, নিজের চারখানা ডিঙি টাঙিয়ে চলে এলো গহীন পুরীতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।

মায়ারশির জন্মের সময় রাজা-রানি তাকে আট ডিঙা ধন-সম্পদ দিয়েছিলেন। বিয়ের বহরে যোগ হলো তাও।

মাএআরশি জেই বালা লইলা জনম।
মাএ বাপে দিলা তানে আট ডিঙ্গা ধন
শেই শব ডিংগা কইনা লইয়া শাজাইআ।

রাজকুমার-রাজকুমারীকে এক করে দিয়ে মহামতি বৈষ্ণবী চলে গেল দেশ ভ্রমণে।

মহামতি বুলে বাছা জাও আপন ঘর।
ফকির দরবেশ আমি জাইমু দেশান্তর

নতুন বউ আর বন্ধুদেরকে নিয়ে রাজকুমার এসে পৌঁছাল এবারে এমন এক নদীর ধারে, যার তিনটি মোহনা। উজিরকুমার জানায়, এই তিন মোহনার আছে তিন মানে।

নদির বিচার করে উজিরের কুমার।
আমি জানি নদির মাজে জত শমাচার
উত্তর নদিএ গেলে আপনার দেশ পাএ।
পছিম নদিএ গেলে পুইনি কামাএ
দখিন নদিএ গেলে করে তবে পার।
নানা দুক ভুগ আছে তাহার মাজার

রাজকুমারের একেক উজির একেক দিকে যেতে চায়। এক উজির চায় দেশে ফিরে যেতে, এক উজির বলে পুণ্যের কথা। শেষমেষ এই করতে করতে তারা এসে গেল তিরপুনি বাজারে। প্রধান উজির বললো, “আহা বাণিজ্যের কী দারুণ সুযোগ! এইবেলা কিছু বাজার-সদাই করা যাক। এখানে বাণিজ্য করলে ডিঙি বেড়ে আরো বহুগুণ।” রাজকুমারও তার কথায় নেচে উঠলো। এ বেলা তার আর রাজকুমারীর কথা মনে রইলো না। ওদিকে কলঙ্কভয়ে রাজকুমারী মায়ারশি যেন গিয়ে জলে ডুবে মরে। সে একটানা রাজকুমারকে শাপ-শাপান্ত করতে থাকে।

কাগুতি করি মাএআ কান্দিআ কান্দিআ
মতি ভরম হইছে কুমার না চাও ফিরিআ
এই মতে কহে কথা বলে হাএরে হাএ।
আমি নারি ওভাগিনির কি হইব উপাএ

হায় নিষ্ঠুর রাজকুমার! ধিক, তারে শতধিক! সে যে তাকিয়েও না দেখে, মুখ ফিরিয়েও না চায়।
মায়ারশি তখন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলো, যেন বাণিজ্যে গিয়ে বুদ্ধিমান উজির কিনতে পায় মানিক-রতন। আর দুষ্টু উজিরের যেন বাণিজ্যে খুব লোকসান হয়। মায়ারশির প্রার্থনা মঞ্জুর হলো। কিন্তু রাজকুমার সেই উজিরের পায়তারা থেকে বাঁচতে পারলো না।

দুষ্টু উজিরের বুদ্ধিতে রাজকুমার যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটিয়ে বেড়ায়, তাকে দেখে লোকে ছি ছি করে। রাজামশায় করিম শাহা চর পাঠালেন, ছেলের খোঁজ নিতে। চর এসে দেখে, এ যে তাদের চিরচেনা সেই রাজকুমারই নয়, একেবারে ভোল পালটে গেছে। একবার, দুবার, তিনবার—এমন করে বারবার চর পাঠিয়ে শেষমেষ রাজা রাগের চোটে কুমারকে ধরে নেবার আদেশ দিলেন। আর যারা সঙ্গীরা ছিল, তারা রাজার বাহিনী দেখে ভয়ে জবুথবু হয়ে গেল। সবার আগে পালালো সেই দুষ্টু উজির। এরপর বাদবাকি সবে।

ওদিকে মায়ারশি এদিকে-ওদিকে একলা কেঁদে মরে। কে জানে, তার কপালে আর রাজকুমার মনোহরের সঙ্গে মিলন লেখা আছে কি না। হয়তো অপেক্ষার ফল সে পাবে, হয়তো পাবে না।