Cover illustration for শার্দূল বিক্রম ও চন্দ্রমল্লিকা

শার্দূল বিক্রম ও চন্দ্রমল্লিকা

CATEGORY
Bengal Legend

BASED ON THE BOOK

মহাস্থানের কিংবদন্তি

by সাহিদা বেগম

সে বহুকাল আগের কথা। পুণ্ড্রবর্ধনে তখন রাজত্ব করছেন এক বীরপুরুষ রাজা, নাম তার শার্দূল বিক্রম। ‘শার্দূল’ শব্দের অর্থ বাঘ। বাঘের মতোই তেজ ছিল রাজার- তাই তার নামের আগে জুড়ে যায় এই শব্দটিও।

সবই ভালো ছিল রাজার। শুধু একটাই মনে দুঃখ। ছেলে জন্ম নিতে গিয়ে মারা গেছেন তার প্রাণপ্রিয় রানী সুভদ্রা। সুভদ্রার দুঃখে রাজা গহীন বনে শিকার করতে চলে যান। প্রকৃতির মাঝে দুঃখের দাওয়াই খোঁজেন।

একদিন এমন করেই গহীন জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে রাজার দেখা হয়ে যায় সে জঙ্গলের বিরাট দুই বাঘ-বাঘিনীর সঙ্গে। রাজা তো গিয়েছেন ছোটখাটো শিকারে। হাতে তার তীর-ধনুকও নেই পর্যন্ত। সবই সহচরদের কাছে। ওদিকে রাজা সবাইকে পেছনে ফেলে অনেকটা এগিয়ে এসেছেন, জঙ্গলের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন- একেবারে একা একা। হাতে তার একটি কুড়াল আর তলোয়ার। এমন অবস্থায় বাঘ-বাঘিনীর সামনে পড়াটা খুব একটা সুবিধের হলো না। বাঘ যখন রাজাকে আক্রমণ করলো তখন তিনি সেই কুড়াল আর তলোয়ার দুই হাতে নিয়ে লড়ে যেতে লাগলেন। শেষে জয় রাজারই হলো, তবে আহত হলেন তিনি। রাজমহলে ফিরে তার চিকিৎসা হয়ে সুস্থ হয়ে উঠলেও সেই বাঘ-বাঘিনীর ফেলে যাওয়া ক্ষতগুলো দগদগে দাগ হয়ে রয়ে গেল তার চেহারায়, পুরো শরীরে। রাজা বিক্রম দেখতে অনেক সুন্দর ছিলেন। নিজের রূপ নিয়ে মুগ্ধতাও ছিল তার। কিন্তু এ দুর্ঘটনার পরে তিনি আর আয়নায় তাকাতে পারেন না। নিজেকে কেমন অচেনা লাগে। দুঃখে-ঘেন্নায় তিনি চোখ ঢেকে ফেলেন। ধীরে ধীরে তার মনের অবস্থার প্রভাব পড়ে তার রাজ্যচালনাতেও। কেমন খিটখিটে হয়ে যেতে থাকলেন রাজা। সকলে তাকে দেখলেও ভয় পায়, আর তার রাগের আশেপাশেও আসতে চায় না কেউ।

এমন যখন অবস্থা, তখন পুণ্ড্রবর্ধনে কোত্থেকে যেন এসে হাজির হলো এক কাপালিক। গায়ে তার ছাই মাখা। মাথায় ভীষণ জটা। চোখ দুটো দেখে মনে হয়, এখনই তাকিয়ে ছাই করে দেবে সামনের মানুষটিকে। কাপালিক এসে ঘোষণা দিল, “রাজার গায়ের দাগ সরিয়ে দিতে পারি আমি। সবকিছুই আগের মতো হয়ে যাবে। বাঘের আঘাতের চিহ্নমাত্র থাকবে না।” এ কথা শুনে রাজদরবারের সকলে মনে একটু আশা ফিরে পেলো। আহা, তাদের রাজা যদি আবার আগের মতো হয়ে যায়- কী ভালোই না হবে!

কাপালিকের কথা মতো মাটি খুঁড়ে একটি কুয়ো বানানো হয়। তিনদিন তিন রাত ধরে কাপালিক ধ্যান করে, যজ্ঞ করে সেই কুয়োর পানিকে অলৌকিক করে তুললো। এরপর সেই কুয়োর পানিতে রাজাকে স্নান করানো হলো। তারপর কাপালিকের নির্দেশমতো মধু, নাগার্জুন- এমন বহু ওষধি গাছের লতাপাতার রস রাজার গায়ের দাগগুলোতে দেয়া হলো। কাপালিকের কথা মিথ্যে ছিল না। তার ধ্যানের জাদুই হোক আর প্রকৃতির স্পর্শে হোক- গুনে গুনে পনেরো দিনের মাথায় রাজা একদম সেরে গেলেন। গায়ে কোনো দাগ নেই। মুখের আগের মতোই সদাসুন্দর হাসি। প্রজারা যেন প্রাণ ফিরে পেলো।

কাপালিকের এমনতর উপকারের বদলে সে তেমন কিছুই নিল না। শুধু বললো- “আমাকে শ্মশানের পশ্চিম দিকে নদীর পাশে একটি কুটির গড়ে থাকার অনুমতি দিন রাজামশাই।” সে কাপালিক ছিল একেবারে সিদ্ধপুরুষ। সংসারের কিছুই তাকে স্পর্শ করে না। শোনা যায়, ঘন অমাবস্যার রাতে সে জ্বলন্ত চিতায় ঢুকে যায়। এরপর তাকে দেখা যায় আকাশের দিকে উড়ে যেতে। খুব ভোরে নাকি অনেকেই তাকে আবার সেই চিতার নিভু নিভু আগুনের মধ্যে শুয়ে থাকতে দেখেছে। এমনই মহা শক্তি ছিল তার। আর জঙ্গলের বাঘরা তো তার বড় ভক্ত। প্রায়ই এসে তাকে পাহারা দেয় শ্মশানের বাড়িটির উঠোনে। রাজা কাপালিকের প্রতি এতটাই কৃতজ্ঞ ছিলেন যে প্রায় প্রতিদিনই কাপালিকের সঙ্গে দেখা করে রাজ্যের বহু বিষয় নিয়ে আলাপ করতেন। কখনো কখনো পরামর্শও নিতেন।

পুণ্ড্রবর্ধন রাজ্যে এমন করেই দিন কেটে যাচ্ছিল। ওদিকে মা-হারা রাজপুত্র প্রতাপ দাসীদের কাছে বড় হচ্ছিল। রাজবাড়িতে সকলে কানাঘুষা করে- “এইবার রাজামশাই একটা বিয়ে করলে পারেন!” এ কথা রাজার কানেও যায়। তবে এ নিয়ে তিনি অত বেশি ভাবেন না, রাজ্যচালনায় মন দেন।

পুণ্ড্রবর্ধনের অধীনস্থ, দক্ষিণের এক রাজ্য ছিল শার্দূলপুর। সেখানকার রাজা চন্দ্রবাহাদুর বেশ অনেকদিন হলো সভাসদদের হাতে খুন হয়েছেন। এখন সেখানে রাজ্যচালনা করেন অতি রূপসী এক রানী। নাম তার চন্দ্রমল্লিকা। ফুলের মতোই মায়াবতী তিনি- আবার শাসনে দৃঢ়হস্ত। ঝামেলার বিষয় ছিল, শার্দূলপুরের প্রধানমন্ত্রী। তার নজর সবসময়ই ছিল রানীর দিকে। তাইতো রাজাকে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করে সে। একথা সকলে জানলেও কেউ তার বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারে না। ওদিকে চন্দ্রমল্লিকা সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকেন, কখন কী হয়। তাই এবার তিনি পুণ্ড্রবর্ধনের রাজার কাছে সাহায্য চাইলেন। গোপনে ডেকে পাঠালেন তাকে। নদীর মধ্যে এক বজরায় দেখা হলো তাদের।

চন্দ্রমল্লিকা তার কাছে সব কথা খুলে বললেন। শুধু প্রধানমন্ত্রী নয়, পার্শ্ববর্তী বহু রাজ্যের রাজার নজর তার এবং তার ছোট রাজ্যের দিকে। এর মধ্যে অন্যতম একজন হচ্ছেন ধনুর্দ্দেশ রাজ্যের রাজা শশাঙ্ক বিক্রম। কিন্তু তাদের কেউই সৎ নন। প্রজাবৎসল নন। কাউকেই চন্দ্রমল্লিকা মেনে নিতে পারছেন না। যে কেউ যেকোনো সময় অপহরণ করতে পারে তাকে। এমন অবস্থায় তিনি বিক্রমের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন।

চন্দ্রমল্লিকার আচার-আচরণ, রূপ-গুণ এতই মনোরম ছিল যে তার থেকে চোখ ফেরানো যায় না। রাজা বিক্রমও পারছিলেন না। যত কথা বলছিলেন, ততই জড়িয়ে যাচ্ছিলেন তার মায়ায়। সেদিন রাতের খাবারের আমন্ত্রণ জানালেন রানী। রাজপুত্রের জন্য দিয়ে দিলেন দারুণ সব উপহার। রাজা বিক্রম তার সেনাপতিকে রেখে গেলেন রানীর পাহারায়। ফিরে গেলেন নিজের রাজ্যে। কিন্তু সেখানে গিয়েও এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারলেন না চন্দ্রমল্লিকার আলোতে ভরা সেই মুখ- যা ফুলের মতোই যেন সুগন্ধি ছড়ায় চারপাশে। রাজা মনস্থির করলেন, বিয়ে করলে চন্দ্রমল্লিকাকেই করবেন- যদি তার অনুমতি থাকে। তিনি অন্য রাজাদের মতো জোর-জবরদস্তিতে বিশ্বাস করেন না। মনের উপর কি কারো জোর হয়! দু-তিন সপ্তাহ পরে বজরায় গিয়ে তিনি চন্দ্রমল্লিকাকে অনুরোধ করলেন রাজপ্রাসাদে এসে থাকতে।

ওদিকে চন্দ্রমল্লিকার মনের অবস্থাও একই। রাজা হয়েও এমন নম্র-ভদ্র কাউকে তিনি পাননি। রাজপ্রাসাদে এসে তার মনে হলো, এ তো নিজেরই ঘর। খুব সহজেই আপন করে নিলেন শিশু প্রতাপকে। মায়ের আদর দিয়ে ছেলেটির দুঃখ ভুলিয়ে দেবেন তিনি।

শ্মশানের সেই রাজবন্ধু কাপালিকের কাছে পরামর্শ নিয়ে বেজে উঠলো শার্দূল বিক্রম ও চন্দ্রমল্লিকার বিয়ের বাদ্যি। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই রাজা শার্দূল বিক্রম ধনুর্দ্দেশ রাজ্য আক্রমণ করে জয়ী হলেন। আর কোনো শত্রু রইলো না চন্দ্রমল্লিকার। অতঃপর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগলেন।