সে বহুকাল আগের কথা। টুঙ্গির শহরে বাস করতো সোনাভান নামের এক রাজকুমারী। পুরুষের দুনিয়ায় তার আছে বিশাল এক রাজত্ব। হাতি-ঘোড়া-লস্কর-প্রজা সবই ছিল তার রাজ্যে। শক্তিতে-দর্পে সে কারো চেয়ে কম যায় না। তাই নিজের শক্তি নিয়ে সোনাভানের ছিল যারপরনাই গর্ব। একদিন সে তার উজিরকে ডেকে বললো, “বলো তো উজির- এমন কেউ আছে দুনিয়ায়, যে পারবে জিততে যুদ্ধে আমায়?” তখন উজির একটু ভয়ে ভয়ে নাম নিলো হানিফার। হযরত আলীর ছেলে সে, রসুলের নাতি। সেই মহাবীর হানিফার নাম শুনেই সোনাভান তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো- এক্ষুনি সে যাবে মদিনায়, হানিফার সঙ্গে যুদ্ধ করে জিতে নেবে ময়দান। উজির-নাজির যতই তাকে থামাক, সে থামার পাত্রী নয়। ওদিকে হানিফার স্বপ্নে খবর হয়ে গেছে- আসবে সোনাভান বিবি তার সঙ্গে লড়তে, মদিনা শহরে! সবার আগে খবরখানা নিজের মাকে বলে হানিফাও ঘোড়ার পিঠে জিন বাঁধলো। মুখে দিল সোনার লাগাম। ঘোড়াকে সাজিয়ে-টাজিয়ে সে টগবগ করে ছুটলো সোনাভান বিবির কাছে।
সোনাভান মেয়ে বলে হানিফা ভাবে, সে আর কী যুদ্ধ করবে এমন! গিয়ে তো কয়েক মিনিটেই তাকে হারিয়ে দিতে পারবে সে। আসলে মেয়ে হয়েও সোনাভান বাদশাহী করে, একথা হানিফা মানতে পারে না।
মদিনায় গিয়ে হানিফা হাসান-হোসেনের বাড়িতে থাকে, বিবি ফাতেমার সঙ্গে স্বপ্নের খবর নিয়ে গল্পটল্প করে। সকলেই তাকে বলে, এই লড়াইয়ে জিত তারই হবে। জয়ের চিন্তায় মশগুল হানিফা যে=ই না ঘুমুতে গেল, তখনই তার স্বপ্নে দেখা দিল অতুলনীয়া রূপসী- সোনাভান বিবি।
“সোনাভান নাম মেরা ছিনু আরামেতে
তোমার ছুরত আমি শুনিনু কানেতে।
সেই হৈতে দেল মেরা আছে বেকারার-
থাকিতে না পারি আইনু দেখিতে দীদার।
কাম অনলেতে পুড়ে হইনু ছারখার।
সর্ব্বাঙ্গ জুড়াও মোর করীয়া বেভার,
নহেত মরীব পুড়ে আসক আগুনে।”
স্বপ্নের মধ্যে লড়াইয়ের বদলে এমন মিষ্টি প্রেমের প্রস্তাব পেয়ে তো হানিফার মাথা মোটামুটি খারাপ হয়ে যাওয়ার অবস্থা। তখন সে স্বপ্নের মধ্যেই সোনাভানকে বলে, বিয়ে করলে তবেই তাদের প্রেম পূর্ণতা পাবে। কিন্তু হায়, তাদের মিষ্টিমধুর আলাপ শেষ হবার আগেই হানিফার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম থেকে উঠে চারদিকে খুঁজে সে কোথাও সোনাভানের হদিস পেলো না। তখন সে ঠিক করলো, টুঙ্গির শহরে গিয়েই শাহজাদীর খোঁজ করবে সে। কিন্তু সে তো রাস্তা চেনে না। অনেকদিন এদিক ওদিক ঘুরে সে যখন ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তখনই দেখা মিললো এক আশ্চর্য পীরের। সেই পীর হানিফাকে বাতলে দিলেন সোনাভানের শহরের হদিস। পীরের বলে দেওয়া সেই রাস্তা ধরে, “ছয়রোজ রাতদিনে, ছয়মাসের রাহা গুনে, গেল মর্দ্দ টুঙ্গির সহর।” নতুন এই শহরে গিয়ে, হানিফার চোখে পড়লো সোনাভান বিবির বাদশাহী মহল।
“সহরে ফিরিতে জায়, মহলে দেখিতে পায়
ভালো ঘর দেখে খুসি মন।
গাঁথিয়াছে পাথরেতে, সোনা রূপার থাম তাতে
রক্ত কাঞ্চন দিয়া তায়।”
সেই অদ্ভুত সুন্দর মহলের বাইরে, গাছের তলায় বসে ছিল এক থুত্থুরে বুড়ি। সেই বুড়ি সোনাভানের খুব বিশ্বস্ত লোক ছিল। বাজার-টাজার করে দেওয়া, নানান ফুট-ফরমাশ খাটা, এই ছিল তার কাজ। কিন্তু অত বুড়ো বয়সে কি আর ওসব সয়? তাইতো হানিফা ফন্দি করে বুড়িকে টাকার লোভ দেখালো। বললো, সোনাভানের সঙ্গে যদি বুড়ি তার বিয়ে দিতে পারে- তাহলে তাকে আর কোনো কাজই করতে হবে না। সঙ্গে পাবে অষ্ট অলঙ্কার, তাড়বালা, বাজুবন্দ, গলায় হাঁসুলি। বুড়ির বয়স কম হয়নি, তবু লোভের কমতি নেই।
সীতাহার, পায়েতে পাসলি- নাকে নথ, কানে বালা, গলার হার আর হাতে সোনার চুড়ির কথায় সে যেন এক কথাতেই মেনে গেলো। এরপর শুরু হলো সোনাভানকে মানানোর ফন্দি-ফিকির। কিন্তু সোনাভানের একটাই শর্ত- যে তাকে যুদ্ধের ময়দানে, লড়াইয়ে হারাতে পারবে, তাকেই সে মেনে নেবে বর হিসেবে। তখন বুড়ি আস্তেধীরে জানায় যে এক অচেনা যুবক এসেছে টুঙ্গির শহরে। মহলে বাইরে সে পথ চেয়ে বসে আছে। ইচ্ছে তার সোনাভানকে বিয়ে করার। সোনাভান তখন বুড়িকে ফের পাঠায় সেই যুবকের পরিচয় জানতে। পরিচয় জেনে তো বুড়ির মাথায় হাত! এ তো মুসলমানের ছেলে, সোনাভান যে বামুনের মেয়ে।
“বুড়ী বলে সোনাভান সোনে সে খবর।
আলির ফরজন্দঘর মদিনা সহর।
হানিফা তাহার নাম রছুলের নাতি।
হাছেন হোছেন ভাই মোছলমান জাতি।”
এরপর বুড়ি আবার ইনিয়ে-বিনিয়ে হানিফা তাকে কী কী পুরস্কার দেবে, সেকথাও বলতে থাকে। বুড়ির এই ঘটকালির কথা শুনে সোনাভান মনে মনে খুবই চটে যায়। তখন সে তার দাসীদেরকে ডেকে বলে, “দাসীগণ! শোনো দিয়া মন! এই দুষ্টু বুড়িকে তোমরা এমন পুরস্কার দাও, যার চিহ্ন সে সারাজীবন শরীরে নিয়ে বেড়াবে।” এই কথা শুনে দাসীরা আর দেরি না করে, সক্কলে মিলে বুড়িকে দেদারসে চড়-ঘুষি মারতে থাকে, কেউ কেউ অতি উৎসাহ পেয়ে নিয়ে আসে লাঠি-সোঁটা। এরপর বুড়ির মাথা ন্যাড়া করে, মুখে চুনকালি মেখে, কপালে বিশাল এক কল্কিপোড়া দাগ দিয়ে মহলের বাইরে বের করে দিলো।
বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে কোথায় আর যাবে, গিয়ে হাজির হলো হানিফার কাছে। বললো, “বড় ভালো কাজে পাঠিয়েছিলে আমাকে ভাই- এখন আমি কী করে খাই?” বুড়িকে দেখে হানিফার মন কেঁদে উঠলো। আহা রে, তারই জন্য আজ বেচারি বুড়ির এই হাল! তখন নিজের হাতের আংটিখানা খুলে বুড়িকে দিয়ে বললো, “যাও বুড়িমা। এই দিয়ে বাজার করে খাও। ভাগ্যে থাকলে একদিন তুমি বাদশাহী করবে। আর কেঁদো না। যাও।”
বুড়িকে পাঠিয়ে দিয়ে হানিফা তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে! তবে রে সোনাভান- এত দুঃসাহস এই বিবির!
বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হানিফার রাগে যেন ইট-সুড়কির রাস্তাও কেঁপে ওঠে। এমন সময় সোনাভানের দাসীরা কলসি কাঁখে যাচ্ছিল জল আনতে। তাদের দেখে হানিফা জিজ্ঞেস করলো, “কোথা থেকে এলে গো, কোথাই বা যাবে?” দাসীরা যখন জবাবে সোনাভান বিবির নাম নিলো, তখন হানিফাকে কে দেখে! মনে হলো এক পাহাড় বারুদের মাঝে কেউ যেন দেশলাই জ্বেলে দিয়েছে। সব দাসীর কলসি আছাড় মেরে ভেঙে ফেললো। আবার কাউকে কাউকে এমন মার দিল যে তারা কোনোমতে কেঁদে পালালো। দাসীরা গিয়েই এক দৌড়ে রাজকুমারীকে খবর দিল, এমন এক অদ্ভুত যুবক এসেছে এ শহরে- যে সোনাভানের নাম শুনলেই রেগে আগুন হয়ে যায়!
সব খবরাখবর শুনে সোনাভান ঠিক করলো, এইবেলা তাকে যুবকের সামনে যেতেই হবে। বড্ড বাড় বেড়েছে। মাথার চুল বাঁদিকে খোঁপা করে সোনাভান গায়ে পরে নিলো লোহার বর্ম। হাজার মণের গদা তুলে নিলো হাতে। ত্রিশ মণ জল, বিশ মণ দুধ নিয়ে আসে দাসীরা। দুধে-জলে মিশিয়ে পঞ্চাশ মণ জল পান করে, সঙ্গে আশিমণ খাবার খেয়ে এবার সে পুরোপুরি প্রস্তুত যুদ্ধের ময়দানের জন্য।
ভয়ংকর সাজ করে রাগে আগুন হয়ে, সোনাভান দাঁত কড়মড় করে এগিয়ে চললো হানিফার কাছে। তার ঘোড়া এমন জোরে ছুটতে লাগলো যে আশপাশের লোকে ভাবলো বুঝি ঝড় এসেছে। ঝড়ই বটে- এ যেন রূপ আর গুণের সঙ্গে শক্তির এক আশ্চর্য তুফান! এ তুফানের গন্তব্য একটাই- হানিফা।
রেগেমেগে সোনাভান তো গেল হানিফার সঙ্গে দেখা করতে। ইচ্ছা তার লড়াই করার। কিন্তু হানিফা তখন তাকে যাচ্ছেতাই গালিগালাজ শুরু করে। হানিফা তাকে বলে, তার মেয়ে হয়ে সে এভাবে যুদ্ধের ময়দানে চলে এসে মোটেও ভালো কাজ করেনই। হানিফা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সোনাভান তার কোনো কথাই কানে তোলে না, বরং উল্টো তাকে অপমান করতে থাকে। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে লড়াই বেঁধে যায় এবং শক্তিতে-বীরত্বে হানিফাকে হারিয়ে দেয় সোনাভান। এরপর সে হানিফাকে দুই হাতে তুলে এত দূরে ছুঁড়ে দেয় যে তার আর খোঁজ মেলে না। হানিফার এমন করুণ অবস্থা থেকে খোদা জিবরাইলকে পাঠান এর সুরাহা করতে। জিবরাইল এসে তাকে নিরাপদে পৌঁছে দেয় মদিনা শহরে। যদিও এ বিষয়ে হানিফা কিছুই জানে না। জানবেও বা কী করে? সে যে ঘোর অচেতন।
জ্ঞান ফেরার পর হানিফার সব কথা এক এক করে মনে পড়লো আর লজ্জায় তার কান কাটা যাওয়ার যোগাড় হলো। বীরপুরুষ হয়ে এক নারীর কাছে পরাস্ত হবার ঘটনাটা কোনোভাবেই সে সহ্য করতে পারছিল না। শেষমেশ সে ঠিক করে- আবার যাবে টুঙ্গির শহরে। সাক্ষাৎ করবে সোনাভান বিবির সঙ্গে, কপালে যা আছে— তাই ঘটবে।
“এয়ছা জোরে চলে মর্দ্দ কিছুই না মানে।
ছয় মাসের পথ মর্দ্দ গেল ছয় দিনে।”
এইমতো কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো ঘোড়ায় চড়ে হানিফা টগবগিয়ে ছুটতে থাকে টুঙ্গির শহরে- সেইখানে, যেখানে সোনাভানের বাস। শহরে প্রবেশ করেই হানিফা এমন জোরে জোরে হাঁক ছাড়তে থাকে যে হাতি-ঘোড়া-মানুষ-উট সকলে ভয়ে কেঁপে ওঠে। আওয়াজ পৌঁছায় সোনাভানের কাছেও।
“সোনাভান বৈসে ছিল তক্তের উপরে
বেহোস হইয়া বিবী জমিনেতে গেরে।
থোড়া ঘড়ি বাদে কিছু হোস হৈল তারে
কহিল কী অবতার আইল সহরে।”
উজির তখন চুপি চুপি বললো, “সেই যে হানিফা মর্দ্দানা! আপনি যাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন মদিনা বহরে, সেই তো ফিরে এলো টুঙ্গির শহরে।” একথা শুনে সোনাভানও কোমর বেঁধে প্রস্তুত হয় আরেকটি লড়াইয়ের জন্য। ময়দানে গিয়ে দেখে, হানিফা এবার আরো বেশি প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। তার পায়ে আশি মণ ওজনের সোনার কড়া, মাথায় দশ মণ লোহার টোপর। পুরো গায়ে জড়িয়ে আছে ষাট মণ ওজনের লোহার বর্ম। সোনাভান তাকে চেনেও না চেনার ভান করে বলে,
“সোন বিদেশি ছওয়ার।
কোথা হৈতে আইলে তুমি কি নাম তোমার।”
হানিফা তখন আরো দশগুণ বিদ্রূপ করে তাকে বলে,
“বিবী নাই চেন তুমি—
হানিফা আমার নাম, তোমার সওয়ামি।”
হানিফার মুখে এমনতর কথা শুনে তো সোনাভান রেগেই আগুন। তার রাগ দেখেও হানিফা থামে না। সে বলতে থাকে, “কেন তুমি স্বপ্নে এসে আমাকে দেখা দিলে? কেনইবা ডেকে আনলে আমাকে এই অচেনা টুঙ্গির শহরে? এখন তুমি আমাকে চিনতেও পারছো না! মনে বুঝে দেখো বিবী কে হলো বেহায়া?”
“দুই জোনে হুড়াহুড়ী মস্ত হাল হৈয়া
রাত্র দীন করে জঙ্গ কিছু নাহী খায়।”
এইভাবে কেটে গেল আট আটটি দিন। কেউই কাউকে হারাতে পারে না, চলে সমানে সমান। একটা সময় সোনাভান হানিফার কাছে গিয়ে বলে, “এই লড়াই বৃথা, কেন বাড়াও অযথা কথা?” কিন্তু হানিফা তাতেও মানে না। সে তার শক্তি নিয়ে বড়াই করে বলে, সে কক্ষনো কারো কাছে হারবে না। এ কথা শুনে খোদার রাগ হলো। তিনি হানিফাকে সাজা দিতে চাইলেন। তাই সোনাভানের কাছে সে আর জিততেও পারলো না। এই অবস্থায় সোনাভান তাকে টেনে নিয়ে গেল শিবমন্দিরে। তার ইচ্ছা, হানিফাকে সে দেবতার কাছে বলি দেবে।
“সোনাভান বলে ঠাকুর করি নিবেদন
হানিফা এহার নাম আলির নন্দন।
ভাই দোন এমামের নাতি রছুলের,
নরবলি দিতে আমি আনি এ খাতের।”
কিন্তু শিব-কালী কেউই হানিফার বলি নিতে চাইলেন না। অতএব সোনাভান ক্লান্ত হয়ে হানিফাকে বগলদাবা করে আবার নিয়ে চললো ময়দানে। তারপর তাকে মাটিতে ফেলে বুকের উপর চড়ে বসলো, গলায় ধরলো ছুরি। এইবারে হানিফার পৌরুষ একটু কমলো। সে আল্লা-খোদার নাম নিয়ে জোরে জোরে কাঁদতে থাকলো। বান্দার কান্না দেখে খোদার মন গললো। তাই সোনাভান যতই গলায় ছুরি চালায়, হানিফার গায়ের একটি লোমও বাঁকা হয় না। হানিফার অনুরোধে জিবরাইল গিয়ে বিবি ফাতেমার স্বপ্নে দেখা দিয়ে সব খবর জানালো। খবরখানা পৌঁছাতে দেরি হলো না। খবর পেয়েই হানিফার পিতা-মাতা-ভাই-বেরাদর সকলে মিলে ছেলেকে বাঁচাতে চললো টুঙ্গির শহরে।
সকলে লড়াইয়ের ময়দানে পৌঁছে দেখলো, হানিফা পড়ে আছে মাটিতে। তাকে তুলে নিয়ে সকলে মদিনায় গেল। মদিনায় গিয়ে সুস্থ হতে হতে বেশ কিছুদিন সময় কাটলো। গায়ে একটু জোর পাবার পরই হানিফা আবার মায়ের কাছে বায়না ধরলো, সে ফের যাবে টুঙ্গির শহরে লড়াই করতে। তবে এবারে একা নয়। সঙ্গে ভাইদেরকেও নেবে। মায়ের কাছে অনুমতি নিয়ে হানিফা রওয়ানা হলো সোনাভান বিবির শহরেতে। ভাই-বেরাদর আগে আগে, হানিফা চলে পিছে পিছে।
এইবারে হানিফা সোজা চলে যায় সোনাভানের মহলে। গিয়ে সে সোনাভানকে এই বলে ভয় দেখায় যে আগেরবার খোদার অভিশাপের কারণে সে হেরে গেছে। এইবার সে আর কাউকে ছেড়ে কথা কইবে না। সে এবারে পণ করে এসেছে, সোনাভানকে বিয়ে করে তবেই সে শান্ত হবে।
কিন্তু এবারো লড়াইয়ে সোনাভানের জিত হলো। হানিফা যাতে তাকে আর না জ্বালিয়ে মারে, সেজন্য সোনাভান এক অদ্ভুত ফন্দি করে। বিশাল এক লোহার সিন্দুক এনে তাতে হানিফাকে পুরে ফেলে, এরপর সিন্দুকে তালা মেরে হানিফাকে সে ভাসিয়ে দেয় সমুদ্রের মাঝখানে।
“দরিয়ার মধ্যেতে হানিফা ভাসি জায়
কান্দিবে মদিনার লোক কোরে হায় হায়।”
মাঝদরিয়ায় এসে শেষমেশ খোয়াজ খিজির এসে সিন্দুকটি নিজের কোলে তুলে নেন। হানিফাকে তিনি ভরসা দেন এই বলে যে স্বয়ং খোদা তাকে পাঠিয়েছেন, হানিফার মৃত্যু এই সমুদ্রে হবে না- ভয় নেই।
“জানিবে আমার নাম খোয়াজ খেজের
আমার কোলেতে আছ ভাবনা কিসের।”
ওদিকে বিবি ফাতেমা স্বপ্নাদেশে জেনে গেছেন পুত্রের দুর্দশার কথা। তার দুই চোখ বয়ে ঝরে চলে জল। আলি আর ফাতেমা মিলে সোনাভানের দুর্নাম করেন আর ছেলের জন্য চিন্তা করেন। চিন্তায় চিন্তায় তারা যখন রওজা মোবারকে গিয়ে ইবাদত করতে থাকেন, তখন এক গায়েবি আওয়াজ এসে হানিফার সব খবর তাদেরকে জানায়।
“মহাম্মদ হানিফা গেল টুঙ্গীর সহরে
হানিফা লড়িতে ছিল সোনাভানের সাতে।
হানিফারে ধোরে বিবী ভরে সিন্দুকেতে—
সিন্দুকে ভরিয়া তারে ফেলে দরিয়ায়।
কহর দরিয়ায় বিচে ভাসিয়া বেড়ায়
ছালামতে আছে মর্দ্দ আল্লার দোওয়ায়।
টুঙ্গীর সহরে গিয়া ঠেকিয়াছে দায়
হাছেন হোছেন শুনে করে হায় হায়।”
হানিফার আগের তিন বিবী তখনো ছিল ঘরে। প্রথমজন মল্লিকা, যে কিনা সোনাভানের সম্পর্কে তুতো বোন হয়। দ্বিতীয় সোমর্ত্তভান। আরে সবচেয়ে ছোটজন জৈগুন বিবি। এরা সকলেই ছিল বীর যোদ্ধা। হাসান-হোসেন মিলে বুদ্ধি করে, সোনাভানের সঙ্গে এই তিন বিবিকে লড়াইয়ে পাঠাবে। নারীর সঙ্গে যুদ্ধ নারীই জিততে পারবে। বিবি ফাতেমার কাছে অনুমতি নিয়ে এইবেলা মল্লিকা, সোমর্ত্তভান আর জৈগুন মিলে পাড়ি দিয়ে টুঙ্গির সহরে।
“টুঙ্গীর সহরে সবে খসিহালে জায়
গায়েতে আছিল জত অষ্ট অলঙ্কার।
কাপড়ে বান্দিয়া সবে রাখে জে জাহার।
খানাপানি ছেড়ে জায়, না করে আরাম।
রাত্রদিন রাহে চলে না করে মকাম।
তিন বিবী জায় এরা হয়ে একস্তর।
তুফান চলিল জেন টুঙ্গির সহর।”
বহু আলাপ-পরামর্শ করে তিন বিবি গিয়ে প্রথমে হানিফাকে দরিয়ার পাড়ে গিয়ে খুঁজে বের করে। খোয়াজ খিজির বিবিদের ডাকাডাকি শুনে আর থাকতে না পেরে তাদের হাতেই সিন্দুক তুলে দেন। পরে বিবিরা মিলে হানিফাকে সিন্দুক থেকে উদ্ধার করে। এরপরে সকলে মিলে যায় সোনাভানের মহলে। মল্লিকা সম্পর্কে কুটুম্ব, তাই সে আগে আগে চলে। দুজনের মধ্যে টানা বাইশ দিন লড়াই হয়। এ চড় মারে তো ও গলা টিপে ধরে। বাইশদিন পর এসে জৈগুন সুন্দরী মল্লিকাকে বলে,
“আর না লড়িবে তুমি সোনাভানের সাত
লড়িতে জাইব আমি জা করে খোদায়।
চুল ধরে লিয়া ওছে জাব মদিনায়।”
এইমতো হাঁকডাক দিয়ে জৈগুন এসে দাঁড়ায় সোনাভানের সামনে। তারা দুইজনে টানা আটদিন লড়াই করে।
“রাত্রদিন আটরোজ গোজারিয়া জায়
রাত্রদিন লড়ে দোন হয়ে গলাগলি।”
এই সময়ে এসে লড়াইয়ে যোগ দেয় সোমর্ত্তভান। বাঘিনীর মতো গর্জে উঠলো সে সোনাভানের উপর। কিছুক্ষণ যুদ্ধের পরই সে সোনাভানকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেললো। ততক্ষণে জৈগুন সুন্দরী গিয়ে হানিফাকে নিয়ে এসেছে যুদ্ধের ময়দানে। হানিফা কেঁদেকেটে মল্লিকাকে বললো, “যার জন্য এত দুঃখ, তাকে খুন করলে কেমন করে হবে?” মল্লিকা গিয়ে সোমর্ত্তভানকে এ কথা জানায়। তখন সোমর্ত্তভান, সোনাভানকে প্রস্তাব দেয়- সে যেন হানিফার সঙ্গে বিয়ে করে, আর নয়তো তার হাড়গোড় ভেঙে চুরমার করে দেবে। সোমর্ত্তভানের রাগ দেখে সোনাভানের বড় ভয় করে। সে তখন বিয়েতে
বাধ্য হয়ে রাজি হয়।
এই খবর শুনে হানিফার খুশি আর কে দেখে? এতদিনের ইচ্ছে তার পূরণ হয়েছে। সে তক্ষুনি বিয়ের ব্যবস্থা করে ফেললো। ফকিরের বেশে ফেরেশতা এসে বিয়ে পড়িয়ে দিল।
সোনাভানের মহলের সেই যে পাহারাদার বুড়িকে মনে আছে? সেই বুড়ির হাতে সোনাভানের রাজত্ব সঁপে দিয়ে হানিফা তার কথা রাখলো।
“বাদসাই করো গো বুড়ী তক্তপর বৈসে।
আমরা চলীয়া যাই আপনার দেশে।
সোনাভানে লয়ে সবে করিল গমন।
মদীনা সহর গীয়া দিল দরশন।”
এরপর…এরপর আর কী? “তামাম হইল পুথি শুন সর্ব্বজন।