Cover illustration for জাদুকরী আংটি ও জুম চাষী

জাদুকরী আংটি ও জুম চাষী

CATEGORY
Indigenous Folktale

BASED ON THE BOOK

Tribal Folk Tales of Tripura

by D. K. Tyagi

এক গায়ে থাকতো দুই বুড়ো-বুড়ি। তাদের ছিল দুই নাতি। ছেলে, ছেলের বউ নাতিরা ছোট থাকতেই মারা গেছে; দাদু-দাদীর হাতেই মানুষ তারা। নাতিরা বেশ শক্ত-সমর্থ, জুমক্ষেতে যায়, কাজ করে। বুড়ো-বুড়ি সারাদিন ধরে বসে থাকে, নাতিরা কখন খাবার নিয়ে আসবে, সেই অপেক্ষায়।

একদিন দুই নাতি মিলে কাজ করতে করতে অনেক ক্লান্ত হয়ে গেল। জঙ্গলের এখানে-ওখানে খাবার খুঁজলো, কিন্তু কিছুই পেলো না। পরে তারা একটি গাছে চড়ে এক ঘুঘুর বাসা থেকে চারটি ডিম দেখে একে একে সব ক’টি ডিম খেয়ে ফেললো। খেয়েদেয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পর তারা দাদীকে বললো, “জানো, আজ আমরা ঘুঘুর ডিম খেয়েছি! চার চারটে ডিম। ডিমগুলো খুবই মজা ছিল।” তখন বুড়ি রেগেমেগে জবাব দিল, “তা অতই যখন মজা ছিল তবে এই বুড়ো দাদীর জন্য একখানা ডিম আনলে না কেন বাছা? কতদিন হয়ে গেল ডিম চোখেও দেখি না।” বুড়ি গিয়ে বুড়োকেও চিৎকার করে করে সব বলে দিল।

এর পরের দিন ছেলে দুটো যখন জুমক্ষেতে গেল, তখন বুড়ো-বুড়ি মিলে ভাবলো, “নাতিরা তো ভালো কিছু পেলে তাদের খেতে দেয় না। তাহলে কী আর করা! ঘরের শূকরটিকে জবাই করে খেয়ে ফেলি।” যেই ভাবা, সেই কাজ। তারা ঘরের পালিত শূকরটিকে কেটে রান্না চড়িয়ে দিল। নাতিদের একটুও মাংস দিল না। বরং খাবার চাইলে তাদেরকে বাড়ি থেকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। ছেলে দুটো মনের দুঃখে গ্রাম ছেড়ে চলে গেল। থাকা-খাওয়ার জায়গা খুঁজতে খুঁজতে রাত হয়ে গেল। তখন তারা জঙ্গলেই রাত কাটাবে স্থির করলো। সারাদিন কিছু খাওয়া জোটেনি। তাই আগের দিনের মতো গাছে গাছে পাখির ডিম খুঁজতে লাগলো দুই ভাই। কোনো গাছেই কিছু পেল না, শুধু একটি বিশাল গাছের উপরে ছিল শকুনের বাসা। শকুন তখন বাইরে গেছে। বড় ভাই সেই গাছে উঠে অনেকগুলো ডিম দেখে বুভুক্ষুর মতো সব ডিমই খেয়ে ফেললো, শুধু শেষে একটি ডিম পড়ে ছিল- তাই নিয়ে নামতে থাকলো ছোট ভাইয়ের জন্য। কিন্তু গাছের ডালে পা আটকে গিয়ে ডিমখানা নিচে পড়ে ফেটে গেল।

গাছ থেকে নামতে না নামতেই যে ভাইটি ডিম খেয়েছিল, সে আস্তে আস্তে শকুনে রূপ নিলো। ছোট ভাইটি তা দেখে ভয়ে কান্না শুরু করলো। বড় ভাই তখন তাকে বললো, “কাঁদিস না ভাই। আমি যে এখন শকুন হয়ে গেছি। মানবসমাজে থাকতে পারব না। আমাকে এই জঙ্গলেই অন্য পশুপাখির সাথে থাকতে হবে। আমি বরং তোর জন্য থাকার একটা জায়গা খুঁজে দিই।” এই বলে সে উড়তে শুরু করলো, আর তার পিছু পিছু হেঁটে গেল ছোট ভাই।

অনেকক্ষণ পর তারা এক গরিব বিধবার জুমক্ষেতের সামনে এসে থামলো। বড় ভাই তখন বললো, “একটু পরই ক্ষেতের মালিক আসবে। তুই তার সাথেই থাকিস।” এই বলে শকুনরূপী ভাইটি উড়ে জঙ্গলে চলে গেল, ছোট ভাই একা থেকে গেল। ভাইটি কাঁদতে কাঁদতে ক্ষেতের পাশে গজানো কুমড়ো খেয়ে গাছের তলায় ঘাস বিছিয়ে ঘুমিয়ে গেল। ঘুমানোর পর সে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলো। দেখলো কে এক বুড়ো মানুষ তাকে এই জুমক্ষেতের পাশে থাকা বাঁশঝাড়ের নিচে মাটি খুঁড়তে বলছে- “এখান থেকেই পাবে এক মহামূল্যবান বস্তু। এই বস্তুটি তোমাকে সারাজীবন সাহায্য করবে। যাও ছেলে, মাটি খোঁড়ো।”

সকালবেলা ছেলেটি মাটি খুঁড়ে একটি দারুণ সোনার আংটি পেল। এ কোনো সাধারণ আংটি ছিল না। আংটিটি মানুষের মতো কথা বলতে পারতো- “দুনিয়ায় এমন কিছু নেই যা আমি পারি না। হুকুম করুন প্রভু।” ছেলেটি খুশিমনে আংটিটি পরে আবার জুমক্ষেতের কাছে গিয়ে বসলো। এরপর ক্ষেতের মালিক বিধবাটি এলে তার সাথে বাড়িতে থাকতে গেল। ছেলেটি তাকে মা বলে ডাকলো আর কথা দিল, সে ক্ষেতের যত্ন-আত্তি করবে, যা যা কাজ লাগে, সবই করবে। তাকে শুধু থাকতে দিলেই হলো।

জুমক্ষেত আর নতুন মায়ের সাথে ভালোই দিন কেটে যাচ্ছিল ছেলেটির। আংটির জোরে সে এতদিনে জুমক্ষেতে একটা গাইরিংও (টং ঘর) বানিয়ে নিয়েছে। দেখতে দেখতে ফসলের সময় এলো, তখন বিধবা এসে তাকে বললো, “বালা কামাদির পূজা করতে পারো কি না দেখো, তাহলে জুমের ভালো ফলন হবে। আমি তো গরিব মানুষ, গাঁয়ের পুরোহিতকে খাবারদাবার দিতে পারিনে, তাই সে আমার ক্ষেতে পূজাও করে না।” ছেলেটি আংটির সাহায্য নিয়ে বাহারি সব উপাচার নিয়ে এসে ক্ষেতে পুরোহিত ডেকে পূজা করালো। এরপর একে একে ফসল কাটা, ঘরে তোলা- সব কাজই সে খুব সুন্দর করে সম্পন্ন করলো। সে তার বুড়িমাকে দারুণ একটি ফলের লাংগা (ঝুড়ি) বানিয়ে দিল, আর বুড়িমা সেই ঝুড়ি নিয়ে গাঁয়ের এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলো। লাংগাটি দেখে গাঁয়ের মোড়লের বউয়ের খুব ভালো লাগলো। সে এসে বললো, “ও মা! অমন সুন্দর লাংগা কোথায় পেলে বুড়ি?” বুড়ি তখন বললো, “আমার পালক ছেলে বানিয়েছে। বলব তোমাকেও বানিয়ে দিতে?” একথা শুনে খুশি হয়ে মোড়লের বউ বুড়ি আর তার ছেলেকে বাড়িতে নেমন্তন্নও করলো। এমনি করেই ছেলেটি আর তার জাদুকরী আংটির জোরে গরিব বুড়ি সকলের চোখে বেশ নামিদামি লোক হয়ে উঠতে লাগলো।

ওদিকে মোড়লের ঘরে ছিল ছেলেটিরই বয়সী একটি রূপসী মেয়ে। বুড়িমার সেই মেয়েটিকে বড় মনে ধরেছে। তার ইচ্ছে, এই মেয়েটিই তার ঘরে বউ হয়ে আসুক। মোড়লের মেয়ে নিয়ে তাই সে চুপি চুপি একদিন জুমক্ষেতে হেঁটে যায় যাতে ছেলেটির উপর তার নজর পড়ে। তার ফন্দি কাজে লাগে। মেয়েটি প্রথম দেখাতেই ছেলেটির প্রেমে পড়ে, এরপর মোড়লকে গিয়ে জানায় যে সে এই ছেলেটিকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু মোড়লও সোজা লোক ছিল না, মেয়ে বিয়ে দেয়ার পর সে একটু বাজিয়ে দেখতে চায়। তাই পরের দিন সকালে সে ঘোষণা দিল, যে যুবক এক আঘাতে একটি শূকরকে হত্যা করতে পারবে এবং এক হাতে রান্না করে সবাইকে খাওয়াতে পারবে- তার সঙ্গেই হবে মোড়লের মেয়ের বিয়ে। এই বলে সে তার খামারে থাকা সবচেয়ে বড় আর জোরালো শূকরটিকে খুঁটির সাথে বেঁধে দিল।

একে একে গাঁয়ের সকল যুবক একত্র হলো। কিন্তু কেউই কাজটি করতে পারলো না। আসলে অত বড় শূকরের সাথে একলা পারা যায় নাকি? আবার এক হাতে রান্না! সে তো অসম্ভব ব্যাপার। সবাই যখন ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছে, তখন মোড়ল একটু টিটকিরি করে বললো, “হায় হায়! এ গাঁয়ে দেখছি একটিও শক্তিশালী যুবক নেই। তবে তো এবার আমায় অন্য গাঁয়ে খোঁজ করতে হবে।” এ কথা শুনে সেই যে পালক ছেলেটি, শকুন ভাইয়ের ছোট ভাই- তার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। তখন সে জাদুর আংটির সাহায্যে এক ঘায়ে শূকরটিকে বধ করলো। এক হাতে চামড়া ছাড়ালো। ধুয়েমুছে পরিষ্কার করলো। এরপর এক হাতেই সে মাংস রান্না করে সবাইকে খাওয়ালো।

এই দেখে মোড়ল তো খুশিতে ডগমগ। এতদিনে তার মেয়ের যুগ্যি বর পাওয়া গেছে বটে। তক্ষুনি গাঁয়ের ওচাইকে (পুরোহিত) ডেকে দুজনের বিয়ে পড়িয়ে দেয়া হলো। খুব জাঁকজমক আয়োজন করে তাদের উপর পবিত্র জল ছিটিয়ে দিল ওচাই। এরপর থেকে সেই গোপন আংটিকে সাথে নিয়ে, বুড়িমায়ের সঙ্গে আনন্দে দিন কাটাতে লাগলো ঘর থেকে বের করে দেয়া সেই কমবয়সী জুম চাষীটি। জীবনে যখনই সে কোনো সমস্যায় পড়েছে, জাদুর আংটি তাকে রক্ষা করেছে। মনে মনে আজো সেই স্বপ্নে দেখা বুড়ো লোকটির পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে।