Cover illustration for আনারসের কলি কইন্যা

আনারসের কলি কইন্যা

CATEGORY
Bengali Folktale

বৈরাট শহরে ছিল এক শাহজাদা, নাম তার এমরান। একদিন সে স্বপ্নে দেখে এক অপূর্ব সুন্দরী কন্যাকে। সেই থেকে এমরানের নাওয়া নেই, খাওয়া নেই– মনে শুধু বাজে একই গান। কিন্তু সেই কন্যাকে পাওয়া অত সহজ নয়, কারণ তার বাস কোনো মহলে নয়। কন্যাটি থাকে দূরদেশে, এক আনারসের মাঝে। আনারসের মধ্যিখানে বিরাট এক প্রাসাদ, কন্যাকে ঘিরে চৌদ্দখানা পর্দা। আনোয়ার কলি কইন্যার দীঘল চুল মাটিতে বিছায়, আর তা দেখে সকলে মাটিতে লুটায়। কিন্তু কেউই তার কাছে যেতে পারে না। পর্দার একেক পরতে থাকে একেক রকমের পাহারা। পাহারার প্রাচীর ভেদ করে আনোয়ার কলি কইন্যার কাছে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। লোকে বলে, পশুপক্ষী দূরের কথা– এক ঝটকা বাতাসও নাকি সেই অন্ধকার পুরীতে যেতে পারে না। শুধু কি কইন্যা নিজে? কইন্যার দাসীরাও দেখতে একেকজন হুরপরীর মতো সুন্দর।

দাসীর পাওয়োত পেন্দেয়া দিচে

কাচা থানের সোনা রে।

চাইরো পাকে পঞ্চ দাসী

যেন জইলবার নাইগচে হুরপরী।

সেই অদ্ভুত প্রাসাদের অদ্ভুত কইন্যার কথা ভেবে ভেবে এমরান একদিন ঘরবাড়ি সবই ছেড়ে দেয়। দেশ থেকে যায় দেশান্তরে, ঘুরতে থাকে পাগল হয়ে। একদিন এমনি ঘুরে ঘুরে সে গিয়ে পৌঁছায় এরান রাজ্যে, সেখানকার রাজার নাম ভানু উদাস। ভানু উদাসের ঘরে ছিল এক রাজকন্যা। সেই রাজকন্যার নজরে পড়লো এমরান। কেউ জানতো না, রাজকন্যা বিয়েথা করেনি, ঘরের মধ্যে বসে শুধু জাদুটোনা করে। এমরানকে দেখে তার এতই ভালো লেগে গেলো যে নদীর ঘাটে গিয়ে সে জাদু করে এমরানকে তার খোঁপার কদম ফুলের মধ্যে আটকে রাখলো। এরপর এমনি কয়দিন কাটলো। রাজকন্যা কদম ফুল নাড়েচাড়ে, আর আনন্দেতে হাসে। সেই নদীর সানবাঁধানো ঘাটের উপর দিয়ে প্রায়ই ওড়াওড়ি করতো এক মহা বুদ্ধিমান কাক, নাম তার ঢাল কাউয়া। রাজকন্যার হাসি দেখে নদীর ঘাটে ঢাল কাউয়া বুঝতে পারে, কোনো একটা গণ্ডগোল আছে! তাই একদিন সে রাজকন্যার খোঁপা থেকে সেই জাদুটোনা করা কদম ফুলখানা ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। এমরানকে হারিয়ে রাজকন্যা তখন পাগলপারা। রাজার কাছে গিয়ে আর্জি দেয়– যেমন করেই হোক, সেই কাককে ধরে দিতে হবে। ভানু উদাস রাজা তার মেয়েকে খুবই ভালোবাসতেন, একেবারে চোখে হারাতেন। মেয়ের এমন দুঃখ দেখে তিনি রাজ্যময় ঢুলী পাঠিয়ে দিলেন—

বদ রাজার বদ কথা,

শুনে নাও সকলে–

কাউয়া মারিবারে রাজা

হুকুম করি দিছে রে।

কেউ যদি কাক না মারে, তবে তাকে শূলে চড়ানো হবে– এমন কথাও ঢালাও করে বলে দেয়া হলো। রাজ্যময় লোকে ভয়ে কাঁপতে লাগলো, আর সবাই মিলে কাক খুঁজতে বেরিয়ে গেল।

ঢুলীর সেই ঢোলের আওয়াজ গেছে ঢাল কাউয়ার কানেও। সে কদম ফুল নিয়ে সেই তখন থেকে উড়েই যাচ্ছে। কোথাও একটু বিশ্রাম নেয়ার যো নেই, রাজ্যের সবখানেই তাকে মারার জন্য দাঁড়িয়ে আছে লোক। কেউ তাকে ঝাঁটার বাড়ি মারে তো কেউ ঢিল ছুঁড়ে মারে। কিন্তু কেউই ঢাল কাউয়াকে ধরতে পারে না। সে উড়ে যায় সবার উপরে উপরে। রাজা রেগেমেগে সব প্রজাকে শূলে চড়ালেন। কাউকে ছাড়লেন না। সারা রাজ্যে একটি মানুষও আর বাকি নেই। তখন রাজার হুঁশ ফিরলো–

হায় হায়, এক কাকের খোঁজে আমি

করলাম কী যে পাগলামি!

প্রজাবিহীন এ রাজ্য নাকি,

কেমনে আমি এ রাজ্যে থাকি?

রাজকন্যাকে দেখে রাজা আরো তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। এক কাকের খোঁজে এই মেয়ে তার মাথা পাগল করে ছেড়েছে–

ক্যান রে বেটি হাটি গেলু

নদীর অইনা ঘাটে!

রাজা যেই রাজকন্যার চুলের খোঁপা ধরে টান দিতে চায়, রাজকন্যা দৌড়ে মহল ছেড়ে বেরিয়ে যায়। এ মহলে আর থাকা চলবে না তার। আর তখনই প্রজাবিহীন রাজ্যে তার দেখা হয়ে গেল সেই পলাতক ঢাল কাউয়ার সঙ্গে। কাককে দেখে রাজকন্যার চোখে জল, তার কাছেই তো আছে সাধের শাহা এমরান! কাকের তখন একটু মায়া হলো। সে তার পাখা মেলে দিয়ে রাজকন্যাকে আশ্রয় দিলো। রাজা খুঁজতে এলেও কাক তাকে রাজকন্যার হদিস কিছুই বললো না। ঢাল কাউয়ার পিঠে চড়ে রাজকন্যা দেশ ছেড়ে পালালো।

মরোনোর ভয় করি কইন্যা

পিঠে সওয়ার হইলো

বাতাসের সাথে কাউয়া

উড়িয়া চলিল রে।

এমনি করে ছয় বছর ধরে কাক উড়ে চললো, পিঠা তার জাদুকরী রাজকন্যা। ছয় বছর পর তারা গিয়ে থামলো আনারসের দেশে। ঢাল কাউয়া তখন রাজকন্যাকে বললো, “তুমি যাকে ভালোবাসো, সেই এমরানের মন কিন্তু আরেকজনের কাছে। সে ভালোবাসে আনারসের মধ্যে বাস করা আনোয়ারের কলি কইন্যাকে। তার কাছে নিয়ে গেলেই তোমার এমরান সুখী হবে।” এই কথা শুনে রাজকন্যার বুক ভেঙে গেলো। তবে সে রাজি হলো। কাক তখন তাকে আনারসের মহলে ঢোকার রাস্তা বাতলে দিলো,

সাত হাজার বেটি ছাওয়া

পাহারা দেয় রে তাকে

তার ভেতরে থাইক্যা কইন্যা

আনারসের ভেতোরে রে।

সাজিয়া গুজিয়া যা তুই সেটেই

হালিতে ঢুলিতে

শুতিয়া থাইক না যায়া

বেটি ছাওয়া গুলার মাঝে রে!

এই করে সেজেগুজে, কাঁচা সোনার থান গায় জড়িয়ে, পায়ে রুমঝুম নুপূর পরে রাজকন্যা গেল আনারস কন্যার দাসী হতে। ঢাল কাউয়া তাকে এমন এক ওষুধ সাথে দিয়ে দিল, যা শুঁকিয়ে দিলেই ঘুমিয়ে পড়বে সব পাহারাদার। সাতদিন ধরে ঘুম শেষে যখন তারা জেগে উঠলো, তাকিয়ে দেখে– সকল পর্দাই কে যেন কেটে চলে গেছে। আনারস পুরী একেবারে মুক্ত এখন! আসলে কেউ জানে না, ঢাল কাউয়ার সাহায্যে এরানের রাজকন্যা এসেছিল এই পুরীতে! যাবার আগে সে আনারসের কলি কইন্যার কাছে রেখে গেছে সাধের এমরানকে। তারা দুজনে ভালোই ছিল, কিন্তু কইন্যার সাথে এমরানকে দেখে সেনাপতি ভাবলো, এই বোধহয় আসল দোষী! আর কোনো কথা না শুনে তখনই সে এমরানকে মেরে ফেললো। এমরানের লাশ পড়ে রইলো আনারস মহলের মেঝেতে।

হাতোতে আছিল বন্দুক

গুলি ভরেয়া নিলে।

গুলি ভরেয়া এমরানকে

মারিয়া ফেলিলো রে।

এমরানের মৃত্যুর পর আনারসের কইন্যা হতভম্ব হয়ে গেল। সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। এই সুন্দর রাজার কুমার তার অন্ধকার জীবনে আনন্দ নিয়ে এসেছিল। তাকেও মরে যেতে হলো! মনের দুঃখে কইন্যা নিজের শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে সে চিঠি লিখতে বসে। বাতাসের কাছে দিয়ে বলে, “ঢাল কাউয়াকে পৌঁছে দিও।” দশখানা কথা লিখেছিল চিঠিতে, কিন্তু ভাগ্যের কী নিদারুণ পরিহাস! সেই দশ কথার একটি কথাই শুধু পৌঁছালো কাকের কাছে– তারা শুধু জানতে পেলো, এমরান আর বেঁচে নেই। হায়, কেউ জানতো না– এই ঢাল কাউয়া আসলে কে। আসলে ঢাল কাউয়া নিজেও এক সেনাপতির কন্যা। নাম তার জরিনা। এমরানের রাজ্যেই তার বাস ছিল। এমরানকে সে ছোটবেলা থেকেই খুব পছন্দ করে, কিন্তু কখনো বলতে পারেনি। এরানের রাজকন্যা যখন তাকে জাদুবশে কদমে আটকে ফেলেছিল, তখন তাকে উদ্ধার করতে সে কাকের রূপ নিয়েছিল! চিঠি পেয়ে জরিনা মাটিতে লুটায়। সে পণ করে–

আহারে আনারসি কইন্যা

আচিস কোন জাগাতে

চইদ্দো পদ্দা ছিঁড়িমু তোর

নউখেরো যুতাতে।

এরপর জাদুর কন্যা জরিনা একবার দুঃখে কাকের রূপ নেয় তো একবার সাপের রূপ। একেক রূপে দৌড়ে দৌড়ে সে যায় আনারসের দেশে। সবশেষে মানুষের রূপ নিয়ে সে তার শাড়ির আঁচলে বেঁধে আনারসখানা নিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর এক এক করে অগ্নিবাণ ছাড়ে আর ছারখার করে জ্বালিয়ে দেয় আনারসের মহল। পুরো দেশ জ্বালিয়ে দেয়ার আগে সে সেনাপতির ঘরে গিয়ে আনারসের কলি কইন্যাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে নিজে বাঁ হাতে করে। দেখতে পায়, মেঝেতে লুটিয়ে আছে এমরানের দেহ। তাকেও শাড়ির আঁচলে ভালোমতো বেঁধে নিয়ে সে যায় জাদুর বাগানে। ওখানে ছিল আব হায়াত নামে জাদুকরী এক ঝর্ণা– যার জল ছড়িয়ে দিলে মৃত মানুষ বেঁচে উঠতো।

আব হায়াতের পানি গাত

ছিটিয়ে যে দিল

আল্লার হুকোমেতে শা এমরান

উটিয়া বসিলো রে।

তখন ঢাল কাউয়া রূপ নিয়ে জরিনা আনারসের কইন্যা আর এমরানকে পিঠে নিয়ে শূন্যে উড়াল দিলো। ওদিকে আঁচলে বাঁধা আছে আনারস মহল। এমনি করে ছয় মাস ধরে উড়তে উড়তে তারা এসে পৌঁছালো নিজের রাজ্যে। সেখানে গিয়ে সে কাকের রূপ ছেড়ে দেয়।

চিনিতে পারিলো এমরান,

সেনাপতির বেটি হয়!

জরিনা কাঞ্চন বালি,

নাম ইয়ার হয় রে।

জরিনাকে দেখে এমরান বুঝতে পারলো সব কথা, জরিনার মনের ব্যথা। কিন্তু তার মনে যে এখনো সেই আনারসের কলি কইন্যার ছবি আঁকা– “কোথায় জরিনা, কোথায় আমার সেই আনারসি কইন্যা?”

তখন জরিনা তাকে সব খুলে বলে– “তোমাকে আমি ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসি। কিন্তু তুমি যেদিন আনারসি কইন্যার খোঁজে ঘরদোর ছেড়ে গেলে, আমি ভাগ্যগণনা করে দেখলাম– তার সাথেই তোমার ভাগ্য লেখা আছে। তাই আমি তাকে তোমার জন্য খুঁজে এনেছি। কত যে কষ্ট আমার মনে, তা আর নাইবা বলি। শুধু আমাকে তোমার দাসী করে রেখো, তবেই আমার জীবন সার্থক।”

সব কথা শুনে এমরানের মন গলে গেল। সে তখুনি কাজী ডেকে জরিনাকে বিয়ে করলো। এরপর সে বাগানে গিয়ে আনারসের মুখ কেটে তার আনারসের কলি কইন্যাকে বের করলো।

এরপর থেকে সেই রাজ্যের রাজা এমরান, রানি আনারসি কইন্যা আর সেই যে ঢাল কাউয়া– সে জরিনা রূপে থাকে মহলের দাসী হয়ে। সব গল্পে কি আর সবার জন্য সুখের সমাপ্তি লেখা থাকে?