বহুদিন আগে আচিক আসংয়ে জারং নামে এক লোক বাস করতো। লোকটা খুব কর্মঠ ছিল। জঙ্গল থেকে কাঠ কাটতো, বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কাটতো- বাজারে গিয়ে সেগুলো বিক্রি করতো আর পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় বাজারপাতি করতো।
জারংয়ের বউ খুব সুন্দরী ছিল, ছেলেটাও একেবারে যেন রাজপুত্তুর। পৃথিবীতে যেকোনো কিছুর চাইতে জারং সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতো তার ছেলে আর বউকে। তাই তাদেরকে খুশি করার জন্য সে তার সাধ্যমতো যতটুকু পারতো, সবই করতো। কখনো কখনো সাধ্যের চেয়ে বেশিও করার চেষ্টা করতো। আর ছেলে-বউয়েরও এমন স্বভাব হয়েছিল যে কিছু চাইলে সেটা না এনে দেয়া পর্যন্ত মুখ ভার করে থাকতো। অল্পে সন্তুষ্ট হতো না তারা।
একদিন রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে ঝলমলে পূর্ণিমা রাতে জারং তার পরিবারের সাথে উঠানে বসে আছে, এমন সময় আকাশের চাঁদটাকে দেখে তার ছেলে আঙুল তুলে কেঁদে উঠলো- “বাবা, আমাকে চাঁদ এনে দাও না! আমি চাঁদ নিয়ে খেলবো।” বাবা তাকে অনেক করে বোঝালো, চাঁদ কি আর ছেলের হাতের মোয়া যে চাইলেও পাওয়া যাবে? চাঁদ বহু দূরের জিনিস। কিন্তু বাপের আদরে ছেলে আগে থেকেই বিগড়ে আছে, তাই সেও জেদ ছাড়লো না। “চাঁদ চাই- চাঁদ চাই” বলে পাড়া মাথায় করলো। ছেলের এমনতর কান্না দেখে মায়ের আর ভালো লাগছিল না। সে তখন জারংকে এসে বললো, “তুমি কি চাও আমাদের ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে মরে যাক? তুমি চাইলে কি আসলেই চাঁদটা এনে দিতে পারো না? তুমি চাইলেই তো চাঁদ পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য লম্বা একটা মই বানাতে পারো।“
বউয়ের কাছ থেকে এমন কঠিন কথা শুনে জারংয়ের মন খারাপ হলো। তার বোধবুদ্ধিও লোপ পেলো। সেও ভাবলো, সত্যিই তো- চাইলেই কি চাঁদে ওঠার জন্য একটা মই বানানো যায় না? এ কথা ভেবেই জারং বেরিয়ে পড়লো, চাঁদে চড়ার মই বানাতে। অনেক গাছ-কাঠের টুকরা, বাঁশের ঝাড় জড়ো করলো। যত লোহা-লক্কড় সব এনে বিশাল স্তুপ বানালো। অত উঁচুতে উঠবে, মইটা শক্ত হওয়া চাইত তো! এরপর সে তার ভাইপোকে নিয়ে শুরু করলো মই বানানোর কাজ।
দিনের পর দিন ধরে মই তৈরির কাজ চললো।
জারংয়ের আর কোনোদিকে মন নেই। প্রায়ই সে নাইতে ভুলে যায় তো খেতে ভুলে যায়। বউ-ছেলেরও তার দিকে খেয়াল নেই। ছেলের শুধু চাঁদ চাই, আর বউ চায়- ছেলের খুশি। জারংয়ের কথা কেউ ভাবে না।
এমনি করে মই বানানো হচ্ছে। জারং উপরে উঠছে একটু একটু করে। একদিন সে দেখতে পেলো, তার বানানো মই এবার মেঘ ছুঁয়েছে। মনে তার বড় আশা হলো, এবার তাহলে চাঁদ পেড়ে আনা যাবে! তখন সে নিচে অপেক্ষা করা তার ভাইপোকে চিৎকার করে বলতে থাকলো, “আরো বাঁশ আনো! আরো বাঁশ আনো!” কিন্তু অত দূর থেকে ভাইপো আর বউ ভালো করে তার কথা বুঝতে পারলো না। ওরা ভাবলো, জারং বুঝি চাঁদ হাতে পেয়ে গেছে- তাই মই নিচে নামাতে বলছে। তখন ভাইপো জলদি গিয়ে বিশাল একটা দা দিয়ে মইয়ের বাঁধনটা খুলে দিল। অমনি সাঁই সাঁই করে বিশাল লম্বা মই মাটিতে এসে পড়লো। আর জারং? সে তো বাতাসের তোড়ে কোথায় গিয়ে উধাও হয়েছে। কেউ তার লাশটাও খুঁজে পেল না।
বহুদিন ধরে তারা একই জায়গায় অপেক্ষা করলো, কবে জারং হাতে চাঁদ নিয়ে ফিরে আসবে। কিন্তু কীসের চাঁদ, কোথায় বা জারং! জারং তো এতদিনে মরে ভূত। অনেকদিন অপেক্ষার পরও তাই জারং যখন এলো না, তখন তার বউ মুখ ঝামটা দিয়ে বললো- ও নিশ্চয়ই চাঁদের দেশে পালিয়েছে। এই বলে তারা জারংয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে, তার রোজগার করা টাকাকড়ি দিয়ে আরামসে দিন কাটাতে লাগলো।
সেই যে চাঁদে চড়ার মই বানিয়েছিল জারং, তার পড়ে যাওয়া অংশ থেকে নাকি জাজোং কাদোরাম নামের এক পাহাড় হয়েছে। এখনো আচিক আসং থেকে সেই পাহাড়ের চূড়া দেখা যায় আর লোকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে করে সেই হতভাগা জারংয়ের কথা।
চাঁদে চড়ার সিঁড়ি
Folktales of the Garos - Dewan Sing Rongnuihu
Indigenous Folktale