বহুকাল আগে গদাধর নামের এক জেলে বাস করতো। স্ত্রীকে নিয়ে ছোট্ট ঝুপড়ীতে বাস করতো আর মধুমতী নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাতো। শীঘ্রই তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হয়। আরো একটা নতুন মুখের আগমনের জন্য আনন্দের সাথে সাথে দুঃশ্চিন্তা ও হয় তার ভরণপোষণের।
ঋতুর পালাবদলে গ্রীষ্মের পর আসে বর্ষা। ভরা বর্ষা মৌসুম হলো মাছ ধরার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। তাই সেই সময়কে সামনে রেখে জেলে পাড়ার সবার মতো গদাধরও ব্যস্ত হয়ে পড়ে নদীতে মাছ ধরতে যাবার আগের বিভিন্ন প্রস্তুতিগুলো সম্পন্ন করে নিবার জন্য। তার স্ত্রী গদাধরকে নিষেধ করে নদীতে যেতে। সে মনে করে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সে মারা গেলে স্বামী গদাধরকে আর কখনোই দেখতে পাবে না। কিন্তু গদাধর স্ত্রীকে অভয় দিয়ে, একটা ভালো দিন দেখে পাড়ার অন্যান্য জেলেদের সাথে মধুমতী নদীতে নৌকা ভাসায়।
এদিকে এক এক করে বাকি জেলেরা ঘরে ফিরে এলেও স্বামী গদাধর আর ফেরেনা। দিন গড়িয়ে সপ্তাহ, সপ্তাহ গড়িয়ে মাস। এভাবেই শেষ হয়ে যায় পুরো বর্ষা। একদিন জেলেরা এসে গদাধরের স্ত্রীকে জানায় যে, নদীতে ঝড়ের কবলে পড়ে গদাধরের নৌকাটি ডুবে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও গদাধরকে কোথাও পাওয়া যায়নি। এভাবেই অকালে প্রাণ হারায় গদাধর। গদাধরের স্ত্রী একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। অসময়ে বিধবা হওয়া গদাধরের স্ত্রী তার সদ্যজাত সন্তানের নাম রাখে নদের চাঁদ। স্বামীকে হারিয়ে এবার সন্তান নদের চাঁদকে নিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে সে।
মায়ের পরমস্নেহে বেড়ে উঠা নদের চাঁদ শিশু, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পন করে। সে ও তার বাবার মতো নদীতে মাছ শিকার করতে যেতে চায়। কিন্তু তার মা চায় না সে নদীতে মাছ ধরতে যাক। বরং সে চায়, তার ছেলে বিয়ে করে সংসারি হোক, জমিতে খেতি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করুক। তার মা জেলে পাড়ার অনিন্দ্য সুন্দরী সরলার সাথে ছেলের বিয়ে ঠিক করে। সরলার বয়স তখন তেরো। তার বাবা-মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলে তারাও রাজী হয়ে যায়। কিন্তু এক রাতে কাউকে কিছু না বলে গৃহত্যাগী হয় নদের চাঁদ। পা বাড়ায় অজানার পথে। নদের চাঁদ নিরুদ্দেশ হবার পর থেকে তার মা রাতদিন শুধু অশ্রুপাত করে কাটাতে শুরু করে। রাতদিন অনবরত কাঁদার ফলে একসময় তিনি অন্ধ হয়ে যান।
এভাবে কেটে যায় দশটি বছর। সবাই ধরে নেয় গদাধরের মতো তার ছেলে নদের চাঁদও আর কখনো ফিরে আসবেনা। কিন্তু সবার ধারণাকে মিথ্যা করে দিয়ে একদিন ঠিকই আবির্ভূত হয় সে। মায়ের অন্ধত্বের জন্য অনুতপ্ত চাঁদ মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে এত বছর পর নিজের সন্তানকে ফিরে পেয়ে বৃদ্ধা মায়ের আনন্দ আর ধরে না।
ছেলেকে বাড়িতে রাখার উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি করে ছেলের বিয়ে দিয়ে দেন সরলা নামের সেই মেয়েটির সাথে। স্ত্রীর সারল্য আর মিষ্টি মুখের প্রেমে পড়ে সংসারের মায়ায় আটকে যায় নদের চাঁদ। ভোরবেলা যায় মাঠে কাজ করতে। বাড়ি থেকে গামছায় করে নিয়ে যাওয়া গুঁড়-মুড়ি দিয়েই দুপুরের খাওয়া সারে। সন্ধ্যায় ফিরে আসে বাড়িতে। এরপর রাতে খাবার খেয়ে বউয়ের সাথে গল্প করতে বসে। মা বৌকে নিয়ে তার দিনগুলো এভাবেই কাটতে থাকে।
সরলা একদিন তার স্বামীর কাছে নিরুদ্দেশ হবার দশ বছর সম্পর্কে জানতে চায়। নদের চাঁদ সেকথা এড়িয়ে গেলেও তার স্ত্রী নাছোড়বান্দা। অবশেষে বাধ্য হয়েই মুখ খোলে চাঁদ। স্ত্রীকে শোনায় এক অদ্ভুত দেশ কামাখ্যার গল্প। যেখানে সে গত দশ বছর কাটিয়ে এসেছে। সেখানকার মানুষেরা জাদু জানে। চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে । মানুষকে তারা বাঘ, শিয়াল, গাধা, ভেড়া বানিয়ে ফেলতে পারে এক পলকেই। নিজেরাও ধারণ করতে পারে বিভিন্ন জন্তুজানোয়ারের রূপ। এটুকুতেই শেষ নয়, ওরা মরা মানুষকে জীবিত করতে পারে বলে জানায় চাঁদ। সরলা সেসব গল্প শুনে চমকে উঠে। এসব কথা কাউকে না বলার ব্যাপারে চাঁদ তার স্ত্রীর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেয়।
সেদিনের পর থেকে চাঁদ তার স্ত্রীকে কামাখ্যার বিভিন্ন গল্প শোনায় । কথায় কথায় একদিন সে ভীষণ অদ্ভুত একটি গল্প শোনায়। কামাখ্যায় মানুষ মন্ত্রবলে কুমিরের রূপ ধারণ করতে পারে। একথা শুনে অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে তার স্ত্রী।
একসময় সে তার স্ত্রীকে জানায়, কামাখ্যায় থাকাকালে সে এক মহিলার কাছে কুমির হবার বিদ্যা শিখেছে। নিজের গুরুর গল্পও স্ত্রীকে শোনায়। সে কোথায় থাকে, নাম, তার ক্ষমতা সবকিছু বিস্তারিতভাবে সরলার কাছে খুলে বলে। একথা শোনার পর সরলা তার স্বামীকে কুমির হতে বলে বায়না ধরে। কিন্তু তার কথায় রাজী হয় না চাঁদ। আবারও অভিমান করে স্ত্রী। চাঁদের সাথে কথা বলাও বন্ধ করে দেয়। নিরুপায় চাঁদ স্ত্রীর প্রস্তাবে রাজী হয়। তাকে জানায় রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে কুমির হয়ে দেখাবে।
মধ্যরাত। এক পাত্র জল নিয়ে ঘরের ভেতর হাজির হয় নদের চাঁদ। মন্ত্র পড়ে পাত্রটিতে ফুঁ দেয় সে। স্ত্রীকে জানায় মন্ত্র পড়ে সে কুমিরে পরিণত হবে। এরপর কুমিরের গায়ে মন্ত্রপূত জল ছেটালেই পুনরায় আবার মানুষ হয়ে উঠবে। তারপর খাটে উঠে কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে চাঁদ । সরলা উৎসুক হয়ে খাটের পাশে অপেক্ষা করে তার স্বামীকে কুমিরের রূপে দেখার জন্য। কিছুক্ষণ পর কাঁথার নিচ থেকে বেরিয়ে আসে কুমিররূপী চাঁদ। চাঁদের এই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে ভয়ে আঁতকে উঠে তার স্ত্রী সরলা। চিৎকার করে উঠে ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে যায় সে। আর তখনই তার হাত থেকে জলপাত্রটি মেঝের ওপর পড়ে যায়।
অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে চাঁদ তার স্ত্রীকে পালিয়ে যেতে দেখে। ঘর থেকে বের হয়েই, বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেয় সরলা। ততক্ষণে শুকনো মাটির মেঝে সব জল শুষে নিয়েছে। তবু নদের চাঁদ ভেজা মাটিতে গড়াগড়ি দিতে থাকে নিজের মানুষরূপ ফিরে পাবার আশায়।
এদিকে ঘরের দুয়ারে বসে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে সরলা। চিৎকার শুনে এগিয়ে আসে নদের চাঁদের মা। শাশুড়িকে পাওয়া মাত্র জড়িয়ে ধরে সবটা খুলে বলে সে। সবটা শোনার পর চাঁদের মা সিদ্ধান্ত নেয় যে করে হোক কামাখ্যা থেকে সেই মহিলা গুরুমাকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবে, যার কাছ থেকে চাঁদ জাদুবিদ্যা শিখেছে।
চাঁদের বৃদ্ধ মা তার পুত্রবধূকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে কামাখ্যার উদ্দেশ্যে। এদিকে ঘরের ভেতর বন্দী অবস্থায় তিন দিন পড়ে রয় চাঁদ। একসময় ক্ষুধার যন্ত্রণায় অতিষ্ট হয়ে উঠে কুমিররূপী চাঁদ। ক্ষুধার যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়ে ঘরের নড়বড়ে দরজা ভেঙে বাইরে বেরিয়ে এলে তখনই বিপত্তি ঘটে। এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। সবাই তেড়ে আসে কুমিররূপী চাঁদের দিকে। আর কোনো উপায় না দেখে চাঁদ নেমে যায় মধুমতী নদীতে। বসবাস করতে শুরু করে সেখানেই।
এদিকে এক মাস তেরো দিন পর কামাখ্যা থেকে চাঁদের সেই গুরুমাকে নিয়ে ফিরে আসে তার মা আর বউ। সাধিকা চাঁদকে পুনরায় মানুষ করার উদ্দেশ্যে ছুটে যায় মধুমতীর তীরের সেই ঘাটটিতে, যেদিক দিয়ে চাঁদ নদীতে নেমে গিয়েছিল।
চাঁদের গুরুমা যখন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে চাঁদকে ডাকে, কুমিররূপী চাঁদ তখন গুরুর ডাকে সাড়া দিয়ে ডাঙায় উঠে আসে। তখন তার মুখে ছিল বেশ বড়োসড়ো একটা ইলিশ মাছ, যার অর্ধেকটা ইতোমধ্যে সে খেয়ে ফেলেছে। গুরুমা বুঝতে পারে যে, কুমিররূপী চাঁদ আহার করা শুরু করে দিয়েছে। তারপক্ষে এখন আর কিছুই করা সম্ভব নয়। চাঁদ আর কখনোই মানুষরূপে ফিরে আসতে পারবে না।
এরপর থেকে নদের চাঁদের স্ত্রী নদী পাড়ে বসে অশ্রু বিসর্জন করতে থাকে নিজের করা ভুলের জন্য। একসময় তার পক্ষে সবকিছু অসহনীয় হয়ে উঠলে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সে আত্মহত্যা করে। আর চাঁদের মা প্রতিদিন মধুমতী নদীর তীরে গিয়ে ছেলের নাম ধরে ডাকলেই ডাঙায় উঠে আসতো কুমিররূপী চাঁদ। মায়ের হাতে খাবার খেয়ে আবার সে ফিরে যেত মধুমতী নদীতে।
আজও ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার মানুষের মুখে মুখে এই কিংবদন্তীটি শোনা যায়। বোয়ালমারীতে আজও নদের চাঁদের নামে রয়েছে স্কুল, ডাকঘর ও গ্রাম।