Cover illustration for হাড়ং-হুড়ং গুহার কিংবদন্তি

হাড়ং-হুড়ং গুহার কিংবদন্তি

CATEGORY
Bengal Legend

BASED ON THE BOOK

বাংলা কিংবদন্তী (দ্বিতীয় কিস্তি)

by আসাদুজ্জামান জুয়েল, রুদ্র কায়সার

আজ থেকে ৭০০ বছর আগের কথা। বর্তমান সিলেট তখন গৌড় রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং শ্রীহট্ট নামে পরিচিত ছিল। সেসময় এ অঞ্চলের রাজা ছিল গৌড় গোবিন্দ।

আদিকাল থেকেই জাদুটোনার জন্য এ রাজ্যটির বিশেষ খ্যাতি ছিলো। রাজা নিজেও জাদুটোনা জানতেন। ধর্মীয় দিক থেকে সে ছিল ভীষণ গোঁড়া এবং অন্য ধর্মের প্রতি ছিল অসহিষ্ণু। রাজার কড়া নির্দেশ ছিল তার রাজ্যে কোনোভাবেই গো-হত্যা করা চলবে না।

রাজা একদিন তার অন্দরমহলের বারান্দায় আরাম করার সময় একটি কাক উড়ে এসে বসলো বারান্দার রেলিঙয়ের ওপর। ঠোঁটে ছিল এক টুকরো মাংস। সেই মাংসের টুকরোটি পড়লো গিয়ে গৌড় গোবিন্দের সামনে। টুকরোটি যে গরুর মাংসের তা বুঝতে দেরী হলোনা রাজা গোবিন্দের। পেয়াদা ডেকে নির্দেশ দিলেন গরুর মাংসটির উৎস খুঁজে বের করতে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ধরা পড়লো অপরাধী। সেই অপরাধী হলো টুলকিকরের অধিবাসী শেখ বুরহানুদ্দিন। সন্তানহীন বুরহানুদ্দিন স্রষ্টার কাছে বহু মানতের পর বৃদ্ধ বয়সে একটি পুত্র সন্তান লাভ করেছিলেন। সেই সন্তানের আকিকা দিয়ে রাজার কড়া নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গোপনে একটি গরু জবেহ্ করেছিল। আর সেটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার জন্য ।

গো-হত্যার অপরাধে বুরহানুদ্দিনকে বন্দী করে নিয়ে আসা হলো রাজদরবারে। বিচারে তাকে দোষীসাব্যস্ত করে তার ডানহাতটি কেটে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হলো । তার নিষ্পাপ শিশুপুত্রটিকেও হত্যার নির্দেশ দিলেন নির্দয় রাজা । নির্দেশমতো কেটে ফেলা হলো বুরহানুদ্দিনের ডানহাত। হত্যা করা হলো তার শিশুপুত্রকে। এমন ঘোরতর অন্যায়ের বিচার চেয়ে শেখ বুরহানুদ্দিন হাজির হলো সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের দরবারে। বুরহানুদ্দিনের মুখ থেকে সবটা শুনে সুলতান ভীষণ ব্যথিত হলেন। তিনি নিজের ভাতিজা সিকান্দার খান গাজীকে নির্দেশ দিলেন অত্যাচারি রাজা গৌড় গোবিন্দের রাজ্য আক্রমণ করে তাকে পরাজিত ও বন্দী করতে।

পর পর দুবার আক্রমণ করেও গৌড় গোবিন্দের জাদুশক্তির কাছে হার মানতে হলো। ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হলো সিকান্দার খান গাজীকে । সুলতান তখন তার সিপাহশালার সৈয়দ নাসিরুদ্দিন শাহকে পাঠান গৌড় গোবিন্দকে শায়েস্তা করার জন্য। সৈন্য নিয়ে গৌড় গোবিন্দের রাজ্য আক্রমণের উদ্দেশ্যে নাসিরুদ্দিন শাহ অগ্রসর হলে, পথিমধ্যে সোনারগাঁওয়ের কাছে হযরত শাহ জালালের সাথে দেখা হয়। তার কাছ থেকে বুরহানুদ্দিনের সাথে ঘটা হৃদয় বিদারক ঘটনাটি শুনে হযরত শাহ জালালও মর্মাহত হন এবং নিজের অনুসারীদের নিয়ে এই অভিযানে অংশগ্রহণ করেন।

হযরত শাহ জালাল সুলতানের সৈন্যদলের সঙ্গে শ্রীহট্টের উদ্দেশ্যে রওনা হোন। ব্রহ্মপুত্রের তীরে পৌঁছে দেখলেন নদী পার হবার সব ব্যবস্থা রাজা আগেই বন্ধ করে দিয়েছেন। তখন হযরত শাহ জালাল নামাজ পড়ার জায়নামাজটি ব্যবহার করে নিজের সঙ্গীসাথীদেরকে নিয়ে নদী পার হয়েছিলেন। কিন্তু নদীর মাঝামাঝি পৌঁছতেই রাজার জাদুকরেরা তাদেরকে উদ্দেশ্য করে অগ্নিবাণ ছুড়তে থাকে। হযরত শাহ জালালও নিজের অলৌকিক ক্ষমতার প্রয়োগে অন্ধকার জালের সৃষ্টি করে প্রতিহত করেন শত্রুদেরকে। শাহ জালাল সঙ্গীদেরকে নিয়ে বরাক নদীর পাড়ে পৌঁছেও জায়নামাজ ব্যবহার করে নদী পার হন।

রাজা গৌড় গোবিন্দ যখন দেখলো তার পরাজয় সুনিশ্চিত তখন তিনি তার রাজ্যের কাছে অবস্থিত “হারং হুরং” নামের একটি সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেন। সেই সুড়ঙ্গকে ঘিরে সেসময় খুব ভয়ংকর লোকশ্রুতি প্রচলিত ছিলো। সুড়ঙ্গটি ছিলো ৩৩ কোটি দেবতার বাসস্থান। পূর্বে এর মধ্যে যেই গেছে, কেউ জীবিত ফিরে আসেনি। সেজন্য লোকজন এর ধারেকাছেও যেতো না। উপায় না পেয়ে রাজা এই সুড়ঙ্গ পথেই পালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। ভেতরে প্রবেশের পর রাজা সেখানে অবস্থিত ৩৩ কোটি দেবতার প্রত্যেককে ১টাকা করে দক্ষীনা দেন এবং এভাবে তিনি সেই সুড়ঙ্গপথে পালিয়ে যান।