সে বহুকাল আগের কথা। নদীর ধারের এক সাম্রাজ্য, আর তার রাজকন্যার নাম ছিল উষাবতী। পাল বংশে প্রথম দিকের রাজা বানরাজ, তারই কন্যা উষাবতী। বানরাজের শৌর্য-বীর্য, ধন-সম্পদ সবই ছিল অফুরন্ত। রাজকন্যা উষাবতীরও রূপ-গুণের কমতি নেই।
স্বর্ণবর্ণের উষাবতী, তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তির শক্তি। তাকে দেখলেই যেন মন ভালো হয়ে যায়, এমনই তার জাদু। তবে উষাবতীর মনে জাদু করে রেখেছিল এক অদেখা যুবরাজ। নাম তার অনিরুদ্ধ। সখীদের সঙ্গে তার কথা বলে বলে তিনি বিরহে দিন কাটান। তার বড় ইচ্ছে করে, যুবরাজ অনিরুদ্ধ এসে যেন তাকে জয় করে নিয়ে যান!
একদিন সকালে যখন নদীর জলে সূর্যের প্রথম সোনালী রশ্মি এসে গঙ্গার জলে পড়লো, সখীদের নিয়ে উষাবতী স্নান করতে গেলো। গায়ে সুগন্ধি মেখে, চন্দনে সাজলো সারা দেহ। চুলে মেখে নিলো কস্তুরীর নির্যাস। দাঁতে নিমের গুঁড়ো। বাতাসে তখন নিমফুল আর চন্দনের সুগন্ধে ম ম করছে। জাফরানি রঙের শাড়ি পরে স্বর্ণদেহী রাজকন্যা যখন জলে নামলো, তাকে দেখে মনে হলো মর্ত্যের কোনো দেবী।
তবে মানবরূপী এই দেবকন্যার জন্য ভাগ্য লিখে রেখেছিল অদ্ভুত এক গল্প।
তার স্নানের ঘাট দিয়ে, ভোরের সেই কুয়াশার মধ্যিখানে তখন এক যুবাপুরুষ নৌকা নিয়ে যাচ্ছিল। আসলে সে পথ হারিয়েই এ ঘাটে এসে পড়েছে। উষাবতীর খিলখিল হাসি আর জলকেলী দেখে সে থমকে দাঁড়ালো। নৌকার গতিও কমে গেলো আচমকা। উষাকে দেখে আর চোখ ফেরাতে পারলো না যুবক। সেখানেই থেমে গেলো। যুবক নিজেও কম সুদর্শন নয়। কোঁকড়ানো চুল আর অসম্ভব সুন্দর চোখ দুটো নিয়ে সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। দুজনের চোখে চোখে এবেলা চারচোখ হলো। এরপর হয়তো আরো অনেক কিছুই হতে পারতো, কিন্তু বেরসিক প্রহরীরা অচেনা নৌকা দেখে খুব জোরেশোরে ধমক দিতে লাগলো।
উষাবতী তাদের থামালো। নিজেই গেলো যুবকের সাথে কথা বলতে।
“কে আপনি? কোত্থেকে এসেছেন? বানরাজকন্যার জলকেলীতে বাধা দেওয়ায় আপনার শাস্তি হতে পারে, জানেন?”
“বানরাজকন্যা! আমি নিতান্তই দুঃখিত। পথ না হারালে এমনটা হতো না।”
“খুব পাকা অভিনেতা দেখছি!”
“রাজকন্যা, আপনি বোধহয় যুবরাজ অনিরুদ্ধের নাম শোনেননি। শুনলে এমন কথা বলতেন না।”
যুবরাজকে তক্ষুনি থামিয়ে দিয়ে রাজকন্যার সোজা জবাব- “খুব শুনেছি! তিনি এখানে থাকলে আপনার মতো অভদ্র লোককে কঠিন শাস্তি দিতেন।”
অনিরুদ্ধ ছিলেন খোদ শ্রীকৃষ্ণের নাতি। এক যোদ্ধা যুবরাজ- চরিত্রে মহৎ ও উদার। কিন্তু উষাবতীর পিতা বানরাজের চরম শত্রু। তা জানা ছিল সকলেরই। তাই যুবক মুচকি হেসে বললো, “পিতার শত্রুর প্রতি এমন মহানুভবতা সত্যিই চমৎকার!” এই হাসি দেখে উষাবতীর মনে সন্দেহ হলো। সে আর দেরি না করে জিজ্ঞেস করে ফেললো, “মাফ করবেন যুবক। সত্যি করে বলুন তো, আপনিই কি অনিরুদ্ধ?” তার এ আকুলতা দেখে যুবক আবারো একটু হেসে বললো, “অনিরুদ্ধের প্রতি আপনার এত আকুলতা টের পেলে বানরাজ যে আপনাকেও শাস্তি দিতে পিছপা হবেন না রাজকন্যা। এর চেয়ে আমাকে বরং ছদ্মবেশেই ফিরে যেতে দিন।”
এরপর শুরু হলো এক গভীর প্রেমকাহিনী। অনিরুদ্ধ ফিরে গেলেন নিজ রাজ্যে। তবে পায়রা দিয়ে চিঠি চালাচালি হতে লাগলো প্রতিদিন। গ্রীষ্মের শুকনো পাতায় যেমন আগুন ধরে যায়- তেমনি তাদের মনেও প্রেম আগ্নেয়গিরি হয়ে আলো ছড়াতে লাগলো। অনিরুদ্ধের কবিতা, উষাবতীর আকুলতা- দুয়ে মিলে আর অপেক্ষার তর সইতে পারছিল না। উষাবতী প্রায় চিঠিতেই তাকে বলতো, “এসো, আমাকে জয় করে নিয়ে যাও!” তবে অনিরুদ্ধ শুরুতেই যুদ্ধে না গিয়ে বানরাজের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি লিখলো। সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব। কিন্তু বানরাজ দু চোখে দেখতে পারতেন না তাকে। চরম অপমান করে ফিরিয়ে দিলেন সে প্রস্তাব। তখন উষাবতী অনিরুদ্ধকে বোঝালো, যুদ্ধ ছাড়া গতি নেই আর দুজনার মিলনের।
যুবরাজ যুদ্ধে গেলো। একবার নয়, টানা দুইবার হেরে যাওয়ার পর সে আর লজ্জায় রাজকন্যার কাছে মুখ দেখাতে পারলো না। কিন্তু রাজকন্যা তখনো আশা ধরে আছে- চিঠি পাঠিয়েছে, “আবার চেষ্টা করো। আমাদের প্রেমের জন্য হাজার যুদ্ধও শূন্য বরাবর।” এমন উৎসাহ পেয়ে যুবরাজ আবার চেষ্টা করে। তবে এবার সে সাহায্য নেয় চন্দ্রগুপ্তের কাছে। কিন্তু এরপরও যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে থমকে যায় অনিরুদ্ধ। সেনাপতি গোয়াসিন এসে বলে, “যুবরাজ! বানরাজ্যের এত সৈন্য। এত ছোট রাজ্য, কিন্তু সেনায় ছেয়ে গেছে ময়দান।” যুবরাজ নিজেও ঘাবড়েছে, কিন্তু সেনাপতিকে আশ্বাস দেয় সে। “ ওরা সব কি আর পেশাদার সৈন্য? শত্রুকে ভয় দেখাতে অনেকসময় প্রজারাও যুদ্ধের সাজে আসে। যুদ্ধকৌশল ওরা তেমন জানে না, সেনাপতি।”
সেনাপতি গোয়াসিন ছিল খুবই চতুর এবং যুবরাজের প্রতি বিশ্বস্ত। চন্দ্রগুপ্তের গ্রিক রণকৌশল থেকে সে অনেক কিছুই শিখেছে। তাই শত্রুদের ঠেকাতে সে একটা বিশাল চালাকি করলো। চারদিন চাররাত জেগে থেকে সে পাথর খুঁড়ে একটি বিশাল ষাঁড় তৈরি করলো। এরপর সেটাকে নদীতে ভাসিয়ে দিলো বানরাজের সৈন্যদের তাঁবুর সামনে।
এরপর পঞ্চমদিন যখন গোয়াসিন যুদ্ধযাত্রা শুরু করলো, ততক্ষণে বানরাজের সৈন্যরা কিছুদূর এগিয়ে দেখে সেই বিশাল ষাঁড় ক্ষতবিক্ষত হয়ে জলে ভাসছে। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি শুরু করলো, “এ জলে বিষ আছে! এ জল তো খাওয়া যাবে না।” এভাবেই গুজব ছড়িয়ে গেলো আর সৈন্যরা জলাভাবে মরার ভয়ে যুদ্ধ ছেড়ে পালালো। আর ছত্রভঙ্গ সেসব সৈন্যের উপর আছড়ে পড়ে গোয়াসিনের সৈন্যদল । অতঃপর যুদ্ধে জয় হলো অনিরুদ্ধের।
এবারে উষাবতীকে কাছে টেনে অনিরুদ্ধ বললো, “কোনো রাজা- কোনো যুদ্ধ, কোনো সমুদ্রই আর আমাদের মাঝে আসতে পারবে না।” সেই থেকে প্রেম ও যুদ্ধের, ছলনা ও জয়ের সেই গল্প রয়ে যায় দিনাজপুর জেলা পরিষদের পুরনো ভবনের সামনে থাকা সেই পাথরের ষাঁড়টির মধ্যে। আজো কেউ কেউ বিশ্বাস করে, এই সেই ষাঁড়, যা আড়াই হাজার বছর আগে ভেসে গিয়েছিল নদীতে। মিলিয়ে দিয়েছিল এক রাজকুমারীর সঙ্গে ভিনদেশী যুবরাজের মন।