Cover illustration for বাঁদর বউ

বাঁদর বউ

CATEGORY
Indigenous Folktale

BASED ON THE BOOK

Tribal Folk Tales Of Tripura

by D.K. Tyagi

পাহাড়ের প্রান্তে এক গাঁয়ে বাস করতো এক জুমচাষী পরিবার। গাঁয়ের মোড়লকে সেখানে ‘নারান’ নামে ডাকতো সকলে। সেই নারানের ছিল এক নয়, দুই নয়— সাত সাতটি ছেলে। কিন্তু তার কোনো ছেলেরই বিয়ে হয়নি। নারানেরও বেশ বয়স হয়ে গেছিল। তাই সে ভাবলো, একসাথে সাত ছেলের বিয়ে দেবে। বুড়ো নারান সব ছেলেকে ডেকে বললো, “আমার মরার আর বেশিদিন বাকি নেই। এখন তোমাদের জন্য গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে আমি বউ খুঁজতে পারব না। তাই তোমাদের জন্য একটা স্বয়ম্বর সভা করব।”

বউ খুঁজে আনার দিনক্ষণ ঠিক হলো। নারানের সব ছেলে তীর-ধনুক নিয়ে হাজির হলো। বড় ছেলেকে নারান বললো, “দেখাও তোমার তীরন্দাজি।” বড় ছেলে অনেক দূরে একটা তীর ছুঁড়লো। সেই তীর গিয়ে যে বাড়ির চালায় পড়েছে, সে বাড়ির মেয়েকে বড় ছেলের জন্য ঠিক করা হলো। ঠিক একইভাবে বাকি পাঁচ ছেলের বউও যোগাড় হলো। কিন্তু ঝামেলা হলো গিয়ে একেবারে ছোট ছেলের সময়ে। বেচারা তীরন্দাজিতে তেমন একটা ভালো ছিল না। ভাইদের দেখে দেখে যা কিছু শিখেছে, তাও এতদিনে ভুলতে বসেছে। ভয়ে ভয়ে সে একটা তীর ছুঁড়লো ঠিকই— কিন্তু সেই তীর কোনো বাড়িতে পড়লো না। গিয়ে বিঁধলো একটা মরা গাছের উপর। সেই গাছে থাকতো একটি বাঁদর। এই অবস্থা দেখে নারান খুবই খেপে গেল। ছোট ছেলেকে রেগে গিয়ে বললো, “তুই গাঁয়ের বাইরে গিয়ে তোর বাঁদর বউকে নিয়ে থাক। এদিকে আর ফিরেও আসবি না।” নারানের বউয়ের আবার ছোট ছেলের জন্য খুব মনের টান। সে বললো, “আমিও আমার ছেলে আর ছেলেবউয়ের সাথে গাঁয়ের বাইরে গিয়েই থাকব। থাকো তুমি তোমার বাড়িঘর নিয়ে।”

সেই থেকে নারানের বউ, তার ছোট ছেলে আর বাঁদর ছেলেবউ মিলে একসাথে গাঁয়ের বাইরে এক কুটিরে থাকে। পরিবারের অন্যদের সাথে তাদের কোনো আসা-যাওয়া নেই।

নারানের বয়স আরো বাড়তে থাকলো। একদিন সে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে গেল। তার মনে হলো, সে আর কয়েকদিনের মধ্যেই হয়তো মারা যাবে। তখন সে সব ছেলেকে, এমনকি ছোট ছেলেকেও ডেকে পাঠালো। সবাইকে সে বললো, “আমি বোধহয় আর বেশিদিন নেই। মনের বড় খায়েশ, ছেলেবউয়ের হাতে ভালোমন্দ কিছু খাব। কাল সবাই নিজেদের বউকে বলবে, তাদের সবচেয়ে ভালো রান্নাটা করে আনতে এই বুড়ো শ্বশুরের জন্য।”

ছোট ছেলে বাড়ি ফিরে দুঃখ করে তার মাকে বললো সব কথা। সে ভাবলো, তার বউ তো বাঁদর। বাঁদর কি আর মানুষের খাবার রান্না করতে পারে? থাক। দরকার নেই। কিন্তু বাঁদর বউ যে আসলে জাদু জানতো, সেকথা তারা কেউ বোঝেনি। সে আড়াল থেকে সব কথা শুনে মুচকি হাসলো।

শ্বাশুড়ি আর বর ঘুমিয়ে পড়লে বাঁদর বউ জাদু করে একটি সুন্দরী মেয়ের বেশ নিলো। এরপর সে রাতভরে দারুণ সুস্বাদু সব খাবার রান্না করে সেগুলো কয়েকটি পাত্রে সাজিয়ে তার বরের কাছে রেখে দিয়ে আবার বাঁদরের রূপ নিয়ে তার পাশে ঘুমিয়ে পড়লো। নারানের ছোট ছেলের তো সকাল সকাল চক্ষু ছানাবড়া! সে সেই খাবার নিয়ে গেল তার বাবার কাছে। সব ছেলেবউয়ের খাবারের মধ্যে নারানের ভালো লাগলো বাঁদরবউয়ের রান্না।

“এত সুন্দর খাবারের ঘ্রাণ আমি বাপের জন্মে পাইনি!”

এরপর নারান আবার সব ছেলেকে বললো, “বউদের বলো আমার জন্য সুন্দর পোশাক বানাতে। আমার বড় খায়েশ, মরার আগে বউদের হাতে তৈরি কাপড় পরে মরবো।”

ছোট ছেলে তার মাকে এসে এ কথা বললো। আর মনে মনে ভাবলো, “বাঁদর বউ রান্না করতে পারে। কিন্তু কাপড় বুনতে কি আর সে পারে? না না। থাক।”

কিন্তু বাঁদর বউ আড়াল থেকে আবার সব কথা শুনে ফেললো। রাতে শ্বাশুড়ি আর বর ঘুমালে সে স্বর্গে তার মায়ের কাছে বেড়াতে ছিল। আসলে এই বাঁদর মেয়েটি ছিল স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের মেয়ে। কোনো এক অভিশাপে তাকে পৃথিবীতে বাঁদরের বেশে থাকতে হচ্ছে।

মায়ের কাছে গিয়ে সে সুন্দর সব জরিওলা, সুতার কাজ করা কাপড় নিয়ে বাড়ি ফিরে এসে বরের পাশে রেখে দিয়ে চুপটি করে শুয়ে পড়লো। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে নারানের সাত নম্বর ছেলের তো মাথা খারাপ হবার দশা। সে তাড়াতাড়ি স্বর্গ থেকে আসা সেসব পোশাক নিয়ে বাবার কাছে গেল। অন্য সব ছেলেবউর আনা কাপড়ই নারানের গায়ে বসলো না। সবগুলোই ছোট হলো। তখন সে ছোট ছেলের কাছে কাপড় চাইল। স্বর্গ থেকে আনা সেই পোশাকে কী যে দারুণ কারুকাজ ছিল! জায়গায় জায়গায় পশুপাখির ছবি আঁকা, সোনালি-রূপালি জরির নকশা করা। আর আকারেও বেশ বড়সড়।

সেই কাপড় গায়ে দিয়ে আরামে নারানের চোখে জল এলো। তখন সে বললো—

“কালকে তোমরা সবাই ছেলেবউদের নিয়ে আসবে। মরার আগে আমি তাদেরকে দেখে যেতে চাই।”

ছোট ছেলে বাড়ি ফিরে এ কথা মাকে বলার সময়, বাঁদর বউ আড়াল থেকে সব শুনে আবারো মুচকি হাসলো। রাত্তিরে সে তার মায়ের কাছ থেকে এক জাদুর আংটি নিয়ে এলো। সেই আংটির জাদুবলে সে রাতারাতি তাদের কুটিরকে বানিয়ে ফেললো সোনার রাজমহল। পাইক-পেয়াদা, হাতি-ঘোড়া সবই হলো। রাত কাবার হবার আগেই সে নিজের বাঁদর ছাল ছুঁড়ে ফেলে হয়ে উঠলো স্বর্গের অপ্সরী, ইন্দ্রের রাজকন্যা।

পরের দিন শ্বশুর, বর ও বাকি সবার সামনে সে নিজের আসল রূপে হাজির হলো।

সকলের চোখ ধাঁধিয়ে গেল তার সৌন্দর্যে। তখন সে মিষ্টি স্বরে বললো,

“আমি আজ আপনাদের আমার সত্যি গল্প শোনাব। এতদিন শ্বশুরমশায় আমাকে নিজের করে নেননি, তাই আমিও লুকিয়ে ছিলাম। আমি আসলে স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের মেয়ে। আমি স্বভাবে খুব দুষ্টু ছিলাম তাই বাবা আমাকে রাগ করে প্রায়ই বাঁদর বলতেন। একদিন বাবা এত রেগে গেলেন যে আমাকে অভিশাপ দিয়ে বসলেন— “তুই বাঁদর হয়ে পৃথিবীর এক মরা গাছে থাকবি। কোনোদিন কোনো মানবসন্তানের সাথে বিয়ে হলে তবেই তোর এই অভিশাপ খণ্ডাবে।” পরে বাবার রাগ কমলেও শাপের জোর কমেনি। তাইতো আমি মরা গাছে বাঁদর হয়ে ঝুলে থাকতাম।”

একথা শুনে নারান হাত জোড় করে ছেলেবউর কাছে ক্ষমা চাইল। এবার ধুমধাম করে ছোটছেলের বিয়ে দেয়া হলো। এরপর সকলে মিলে ছোটবউয়ের সেই মহলে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো। মাঝে মাঝে তারা বেয়াইবাড়িতে স্বর্গেও বেড়াতে যায়!