Cover illustration for শ্বেত রাজহস্তী, রাজকন্যা, রাক্ষস এবং অন্যান্য

শ্বেত রাজহস্তী, রাজকন্যা, রাক্ষস এবং অন্যান্য

CATEGORY
Indigenous Folktale

BASED ON THE BOOK

ত্রিপুরা লোককাহিনী

by প্রভাংশু ত্রিপুরা

অনেক অনেক বছর আগে নাকি মানুষ ও পশুপাখি একে অপরের কথা বুঝতে পারতো। একে অন্যকে কুটুম মানতো, তাই এ ওর কাছে মুখ ফুটে সাহায্যও চাইত।

এক বাড়ির গিন্নীর বাচ্চা হবে, ওদিকে তার বাড়ির গাইয়েরও বাচ্চা হবে। দুজনেই উঠানে। গিন্নী মাচায় বসে কাপড় বুনছে— এমন সময় তার হাত থেকে মাকুটা পড়ে গেল। তখন সে গাইকে বললো, “গাই দিদি, একটু মাকুটা এনে দাও না গো।” তখন গাই বললো, “বাপু, আমারো শরীরের অবস্থা তোমার মতোই। বড় আলসে লাগছে, কিন্তু তাও এনে দিতে পারি, যদি আমার একটা কথা শোনো!”

“কী কথা বলো দিকিনি।”

“হাঁ গা, তোমার বাচ্চার সাথে আমার বাচ্চার বিয়ে দেবে?”

মুখে কুটুম বলা এক জিনিস, আর সত্যি কুটুম্বিতা পাতানো আরেক। গাইয়ের কথা শুনে গিন্নী মনে মনে এক চোট হেসে নিয়ে বললো, “আচ্ছা সে দেখা যাবে সময় এলে। কার ছেলে হয়, কার মেয়ে হয়, দেখি না! তুমি মাকুটা এনে দাও, এইবেলা কাপড় বুনে নিই।”

গাই মাকু এনে দিল। শর্তের কথা গিন্নী ভুললেও তার মাথায় ঠিকই থাকলো। সময়মতো ভেতরবাড়ি আর গোয়ালঘর, দুখানেই বাচ্চা জন্মালো। গেরস্থের ঘরে ফুটফুটে এক মেয়ে, আর গাইয়ের ঘরে এক টগবগে ছেলে বাছুর। ছোট থেকেই বাছুরটি গেরস্থের মেয়ের পিছু পিছু থাকতো, সে খেলতে গেলে ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। গাঁয়ের লোকেরা এসব দেখে নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা করতো। দিনে দিনে দুজনেই বড় হয়ে উঠলো। বাছুর তখন বিশাল ষাঁড়। গাঁয়ের লোকে যখন মেয়েটিকে দেখে ফিসফাস করতো— “ওর তো ঐ ষাঁড়ের সঙ্গে বিয়ে হবে!” তখন মেয়েটি দৌড়ে পালিয়ে যেত। একদিন রাগের মাথায় মেয়েটি গাঁয়ের শেষ মাথায় একটি আমলকি গাছ ছিল, সেইখানে ফাঁসি নিল। ষাঁড়টি এ দৃশ্য দেখে মনের দুঃখে নিজের শিং দিয়ে গাছে বাড়ি মারতে মারতে সেখানেই মারা গেল। কিন্তু সেখানেই তাদের গল্পের শেষ হলো না। বহুদিন পর সেই আমলকি গাছে অদ্ভুত সুন্দর, বিশাল আকারের দুটো আমলকি একই বৃন্তে ঝুলে থাকলো। অমন আমলকি কেউ কখনো দেখেনি।

সেই মেয়ে আর ষাঁড়ের মৃত্যুর অনেকটা দিন পেরিয়ে গেছে। সে দেশের রাজা হাতির পিঠে চড়ে বিকেলবেলা ভ্রমণে বেরিয়েছেন। হঠাৎ তার চোখে পড়লো সেই আমলকি গাছে ঝুলে থাকা জোড়া আমলকির দিকে। হাত বাড়িয়ে তিনি আমলকি দুটো নিলেন রানির জন্য, কিন্তু কপালের লিখন না যায় খণ্ডন। তার হাত থেকে একটি আমলকি মাটিতে পড়ে গেল আর রাজার হাতি শুঁড় দিয়ে তুলে আমলকিটি খেয়ে ফেললো।

এর কয়েক মাস পর রানির ঘরে জন্মালো এক ফুটফুটে রাজকন্যা আর রাজার হাতির ঘরে এক তেজী শ্বেতহস্তীর ছানা। রাজমহলে বেড়ে ওঠে রাজকন্যা, আর হাতিশালে শ্বেতহস্তী। ছোট থেকেই শ্বেতহস্তী রাজকন্যা ছাড়া আর কারো কাছে যায় না। দুজনে মিলে সারাদিন ধরে খেলাধুলা করে, রাজকন্যাকে কারো কাছে যেতে দেখলেই শুঁড় উঁচিয়ে হাতি জোর স্বরে চিৎকার করে। একদিন শ্বেতহস্তী রাজকন্যাকে পিঠে নিয়ে রাজমহল থেকে বহু দূরে পালিয়ে গেল গোমতী নদীর উজানে, গহীন অরণ্যে। রাজকন্যার প্রথম প্রথম ভালো লাগলেও পরে তার বাড়ির জন্য মন কেমন করে। মনে মনে সে বাড়ি ফিরে যেতে চায়।

সে জঙ্গলেই বাস করতো এক বিকট রাক্ষস। রাজকন্যাকে দেখে সে ধরে নিয়ে নিজের বাড়িতে বন্দী করে রাখে। শ্বেতহস্তী আর তাকে খুঁজে পায় না। তবে সে নিজেও ওই জঙ্গলেই থেকে যায়।

ওদিকে রাজামশায় বুদুয়া আর রাঙ্গিয়া নামে দুই ভাইকে কাজে লাগালেন শ্বেতহস্তীকে বধ করে রাজকন্যাকে ফিরিয়ে আনার জন্য। দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট ভাই বুদুয়া ছিল বেশি সাহসী ও কাজেকর্মে পটু। কিন্তু বুদুয়া স্বভাবে বড়ই আলসে। তাই বড় ভাইকে বনের মধ্যে একটা মাচাঘর বেঁধে দিয়ে রাঙ্গিয়া প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাতি আর রাজকন্যার খোঁজে বেরিয়ে পড়তো। ওদিকে বুদুয়া বসে বসে ভালোমন্দ খেত, আর এদিক-ওদিক তাকাতো। একদিন সেই রাক্ষস এসে জঙ্গলের মাঝখানে মাচাঘর দেখে সব ভেঙেচুরে ফেলে আর বুদুয়ার জিব কেটে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দুইশো হাত দূরে।

ওদিকে রাঙ্গিয়া ঘুরতে ঘুরতে শ্বেতহস্তীর খোঁজ পায়। রাজার আদেশ মেনে সে হাতিকে মেরে ফেলে তার দুটো দাঁত নিয়ে মাচাঘরে ফিরে এসে দেখে এই অবস্থা। অনেক খুঁজে সে তার ভাই ও ভাইয়ের জিব পেল। তারপর সে দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করে বড় ভাইয়ের কথা বলার শক্তি ফিরিয়ে আনলো। বুদুয়া তাকে রাক্ষসের বাড়ির সন্ধান দিল।

রাক্ষসের বাড়ি ছিল এক বিশাল শিরপাং গাছের গোড়ার মধ্যে সুড়ঙ্গের ভেতর। বুদুয়াকে বাইরে বসিয়ে রাঙ্গিয়া সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে ভেতরে গেল। সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকে তার মনে হলো, এ তো আরেক নতুন দেশ! বাইরের জঙ্গলের সাথে এর কোনো মিল নেই। চারদিকে পাথরের বাড়ি। স্বচ্ছ জলের সরোবর। কিন্তু কোনো বাড়িতে মানুষের দেখা নেই। অনেক ঘোরার পর হঠাৎ দেখতে পেল, এক বিশাল পালঙ্কে বসে পরম সুন্দরী একটি মেয়ে কাঁদছে। তখন রাঙ্গিয়া বুঝতে পারলো, এই সেই রাজকন্যা— যার খোঁজে সে এতদিন ধরে ঘুরে মরেছে। রাজকন্যার কাছ থেকে সে জানতে পারলো, এই রাক্ষস সারাদিন বাইরে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় আর সন্ধ্যাবেলা ফিরে আসে। সন্ধ্যাবেলা রাক্ষস যখন ফিরে এলো, তখন সুড়ঙ্গের ভেতর বাহির কাঁপতে লাগল। তবে রাঙ্গিয়া এতে ভয় পেল না। সে আসল বীর। লোকে বলে, সে দেবতাদের ছেলে। তাইতো রাঙ্গিয়ার তরবারির এক কোপে মারা পড়লো রাক্ষস, মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারলো না।

ওদিকে রাঙ্গিয়াকে মনে ধরে গেল বন্দিনী রাজকন্যারও। দুজনে মিলে রাক্ষসপুরীর সকল মণিমুক্তা নিয়ে, বাইরে ঝিমাতে থাকা বুদুয়াকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে গেল রাজদরবারে। এতদিনের হারানো ধনকে ফেরত পেয়ে আর অমন রাক্ষসবধের কাহিনী শুনে রাজা-রানি আনন্দে আত্মহারা হলেন। রাজামশায় রাঙ্গিয়াকে পুরস্কারস্বরূপ দিলেন অর্ধেক রাজত্ব আর তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় রাজকন্যাকে।

অতঃপর তারা সুখে-শান্তিতে বাস করতে লাগলো, তবে এখনো মাঝে মাঝে হয়তো সেই রাজকন্যার মনে পড়ে যায় এই জন্মের, কিংবা তারও আগের জন্মের কোনো এক সঙ্গীর কথা— যে ষাঁড় কিংবা হাতি হয়ে বারবার দুনিয়ায় এসে মরেছে তারই জন্য। কিংব হয়তো রাঙ্গিয়া রাজার সঙ্গে সে এতই আনন্দে থাকে যে তাদের কথা বেমালুম ভুলে যায়।