Cover illustration for চলনবিলের রবিনহুড

চলনবিলের রবিনহুড

CATEGORY
Bengal Legend

BASED ON THE BOOK

বাংলা কিংবদন্তী

by আসাদুজ্জামান জুয়েল

ইংরেজদের উপহার হিসেবে নিয়ে যেতে খোঁজা হচ্ছে সাধারণ ঘরের মেয়েদের। শুধু কি সাহেব? সাথে বহু সান্ত্রী-সিপাই আছে, সবাইকে খুশি করতে হবে– জমিদারের চ্যালারা এই কাজেই নিযুক্ত আছে। সদ্য বিয়ে হয়েছে একটি মেয়ের, তার যাবার কথা ছিল শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু কপাল এমনই মন্দ, তাকে নৌকায় করে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে জমিদারের চর। উদ্দেশ্য মোটেও ভালো নয়। কাছারিবাড়ির ঘাটে নৌকা ভিড়বে, এমন সময় কোত্থেকে যেন সেখানে উদয় হলো এক বাইশ ছিপের নৌকা। দুর্ধর্ষ বর্শার আঘাতে এই নৌকাটি ভেঙে খানখান হলো।

“হলো কী? হলো কী?”

সকলে ভীষণ অবাক। এমনকি সেই হতভাগী মেয়েটিও। তখন সামনে এসে দাঁড়ালো এক ডাকাত। তাকে দেখেনি অনেকেই, কিন্তু নাম শুনেছে সবাই। মেয়েটিকে নির্ভয় দিয়ে সে বললো, “ভয় পেও না বোন। আমার নৌকায় ওঠো।” তারপর সেই নৌকা তীরের চেয়ে দ্রুত গতিতে ছুটলো, গিয়ে দাঁড়ালো মেয়েটির বাবার কাছে। হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন তিনি– “সবাই তোমাকে যুগ যুগ ধরে মনে রাখবে।”

সময়টা উনিশ শতকের শেষভাগ। দেশের সবদিকে তখন টালমাটাল অবস্থা। আন্দোলনে, আলোড়নে জনগণ জেগে উঠছে। শাসক-শোষিতের মধ্যকার ভারসাম্য নড়ে যাচ্ছে। আর এই অস্থির সময়েই পাবনার ‘নলকা’ গ্রামে এলো এক রবিনহুড। সে চলন বিলের রবিনহুডই বটে। ধনীর সম্পদ কেড়ে নিয়ে গরিবের মাঝে বিলি করে দেয়া এই দস্যুকে আর কোন নামই বা মানাবে? নাম তার নিজেরও একটা ছিল। মহর খাঁ।

লোকে এও বলে, মহর খাঁর সাথে নাকি একদল ভূত-প্রেত বাস করে। আর নইলে যেখানে সেখানে অমন ভূতের মতো হামলে পড়তে পারে নাকি?

বাংলা

তিন কূলে মহরের কেউ ছিল না। জমিদারের অত্যাচারে তার ভিটেবাড়িটিও একদিন নিলামে নেই হয়ে যায়। এরপর কোনো কূলকিনারা না পেয়ে মহর যায় এক পীরের মুরিদ হতে। বেশ কিছুদিন সেখানে থাকলো, তবু মনের অশান্তি আর দূর হয় না। চারদিকে তখন গরিবের উপর ধনীর শোষণ-নিপীড়ন। এসব দেখে মহরের মন কেমন করে। সে কিছু একটা করতে চায়। কিন্তু সোজা আঙুলে ঘি বের হবার মতো অবস্থা তখন নেই। মহর ঠিক করলো, ধনীর সম্পদ কেড়ে নিয়েই গরীবকে সাহায্য করবে সে। পীরের কাছে সব কথা খুলে বললো। পীর তাকে সাবধান করে দিলেন, আর যাই করুক, কখনো যেন নিরীহ মানুষের ক্ষতি না করে। পীরের দোয়া নিয়ে মহর খাঁ নিজের অভিযানে বেরিয়ে পড়লো–

“হারিয়েছি অনেক কিছুই, তাই আর হারানোর কথা ভাবি না। তবে আমি কোনোদিন কোনো অনাথ, গরীবের ভাত মারবো না কোনোদিন। লুট করে যখন যা অর্থ পাব, সবই বিলিয়ে দেব গরীবের জন্য। নিয়মিত শিরনি দেব পীরের মাজারে।”

মহর গিয়ে প্রথমেই ভর্তি হলো এক লাঠিয়ালের দলে। প্রতিবাদ করতে হলে, আগে তো যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। তাই বহুদিন ধরে লাঠি চালানো শিখলো, তালিম নিল অস্ত্রশিক্ষারও। এভাবেই মহর যখন বেশ অনেকটা পটু হয়ে উঠেছে, তখন একদিন দেখা হলো এক অত্যাচারী জমিদারের সাথে। জমিদার তার দলবল নিয়ে গানবাজনা করতে করতে এগিয়ে চলেছে নদীপথে, সাথে নাচছে বাঈজীর দল। তক্ষুনি এক বাইশ দাঁড়ের ছিপনৌকা এসে হঠাৎ আক্রমণ করলো। সেই দস্যুদলের ‘হারেরেরেরে’ ধ্বনি শুনে গান-বাজনা, নাচ সবই থেমে গেল। জমিদারের বরকন্দাজ গিয়ে পড়লো সোজা জলের মধ্যে। সোনাদানা কিছুই চাইলো না জমিদার দল, চাইলো শুধু জমিদারকে। একা ডেকে বের করে আনা হলো– আর তারপরই মাথায় লাঠির আঘাত। মুহূর্তও দেরি না করে জলের মধ্যে তলিয়ে গেল জমিদার। সেই থেকে শুরু, এরপর আর থামেনি মহর খাঁর অভিযান।

শুধু এই জমিদারই নয়। তল্লাটের সকল অত্যাচারী জমিদারই ভয় পেতে শুরু করে মহর খাঁকে। নৌকা লুট হয়ে যাওয়া, কাছারিবাড়িতে এসে খাজনা তুলে নিয়ে তারপর গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দেয় মহর খাঁ। আর যে জমিদারের পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছে বলে মনে হয়, তাকে প্রাণে মারতেও পিছপা হয় না এই দুঃসাহসী দস্যু। নিজের কপাল পুড়েছে জমিদারের কারণে, তাই জমিদারদের উপর রাগ তার কমেনি জীবনেও। গরিবদের রক্ষাকর্তা হয়েই বাকিটা সময় কাটায় মহর। বিনিময়ে পায় এক ফেরারী জীবন, এক পলাতক ভাগ্য।

মহর খাঁর পেটা শরীর। নিয়মিত চর্চায় দিন দিন আরো দক্ষ হয়ে চলেছে সে। চোখে যেন তার আগুন জ্বলে। মহর খাঁ যার দিকে সেই দুটো চোখ দিয়ে তাকাতো, তারা নিমেষেই হতবিহব্বল হয়ে যেত।

জমিদারদের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে সে। তাই তার পেছনে প্রায়ই তখন জমিদারের দল তন্ন তন্ন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফলে নিতে হয় ছদ্মবেশ। একবার সাধারণ যাত্রীর ছদ্মবেশে খেয়াপার হচ্ছিল মহর, নৌকায় দেখতে পেল এক গরীব বামুনকে। বামুন চোখের জল মুছছে আর খেয়া পাটনীকে বলছে, “জানো মাঝি, মেয়ের বিয়ে দেব বলে যজমানদের কাছে সাহায্য চাইতে গেছিলাম। কিন্তু তেমন কিছুই জুটলো না। কী হবে, ভগবানই জানেন!” মহরের সাথে ছিল তার প্রধান সাগরেদ নসু। দুয়ে মিলে বামুনের সাথে গল্প জুড়ে দিল। কথায় কথায় বামুন বললো, মহর খাঁর গল্প। তারা শোনে আর হাসে।

এমনি করেই খেয়া পার হলো। পার হবার পর মহর সেই ব্রাহ্মণটিকে ডেকে বললো, “মেয়ের বিয়ে নিয়ে করো না। এই নাও পাঁচশো টাকা। আর বিয়ের দিন বাকি সবকিছু পৌঁছে যাবে দইয়ের হাঁড়িতে করে।”

দেখতে দেখতে বামুনের মেয়ের বিয়ের তারিখ এলো। সকাল থেকেই চিন্তায় অস্থির বাবা– অচেনা লোকের কথায় ভরসা করে মেয়ের কপাল পুড়বে না তো? কিন্তু না, মহর ডাকাত কথা দিয়ে কথা রাখতে জানে। তবে ব্রাহ্মণ তো মহরকে চেনে না। শুধু তার নাম শুনেছে, আর শুনেছে দাপিয়ে বেড়ানো সব আক্রমণের কথা। ওসব কথা শুনলেও ভয়ে বামুনের গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বামুন দেখলো, দই নিয়ে গোয়ালারা এসেছে। এর মধ্যে তিনটি পাতিল আলাদা করে রেখে দিল তারা। একজন গোয়ালা বললো, “এই যে সব টাকা বুঝে নাও। ভালো করে মেয়ের বিয়ে দাও।” এই বলে সে চলেই যাচ্ছিল, কী যেন ভেবে একটু ফিরে এসে বললো, “কর্তা, তোমার মেয়েটিকে একটু দেখতে পারি? আমারও একটা বোন ছিল। কলেরা রোগে তাকে হারিয়েছি।” সব শুনে ব্রাহ্মণ বললো, “আমার মুখ রক্ষা করলে তুমি। একটি মিষ্টি অন্তত মুখে দাও। তোমার নাম কী বাবা?” গোয়ালাবেশে দস্যু উত্তর দিল, “আমার নাম মহর ডাকাত, যার নাম শুনলে এ তল্লাটে লোকে ভয়ে কাঁপে। চলি কর্তা।” ব্রাহ্মণের জীবনে এমন আশ্চর্য ঘটনা আর ঘটেনি। এমনই অদ্ভুত চরিত্র ছিল মহর খাঁ, বাংলার রবিনহুড।

“মহর খাঁর ডরে– প্রাণ থাকে না ধড়ে।”

কিন্তু সাধারণ লোকের ভয় পাওয়ার কোনো কাজ মহর খাঁ করতো না, করতে চাইতও না। তার রাগ ছিল জুলুমবাজদের প্রতি। যারা লোককে ঠকিয়ে খায়, শুধু টাকার জন্য মানুষকে পায়ের নিচে রাখে– তাদেরকে শাস্তি দেয়াই ছিল তার আসল লক্ষ্য।

মহর খাঁ যেখানেই যায়, যা-ই করে, সে তার পীরের মন্ত্র কখনো ভুলে যায়নি। তাইতো যখন ইচ্ছে অদৃশ্য হবার শক্তিও আছে তার। ব্রিটিশ রাজত্বে মহরকে ধরার চেষ্টা বহুবার করা হয়েছে, প্রায় সময়ই সে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যেত। একবার তাকে হাতে-পায়ে ভালোমতো শেকল পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল কড়া এক দারোগা, কিন্তু তখুনি তাদের চোখকে ফাঁকি দেয়ার ব্যবস্থা করলো মহর। পুলিশকে বললো, “একটু আমার শেকলটা ধরে রাখুন না, জেলে যাবার আগে ভালো করে একটু গোসল করে যাই।” এই বলে নদীতে ডুব দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় দস্যু মহর। এরপর বহুদিন তার আর দেখা মেলেনি।

ডাকাতের দশদিন আর পুলিশের একদিন। শেষমেশ ধরা পড়লো মহর। আইনমতে অপরাধের সংখ্যা তো আর মহরের নামে কম লেখা ছিল না। খাজনা লুট, দস্যুবৃত্তি, জমিদারদের আক্রমণ, হত্যা– এসবের জন্য পাবনা সদরকোর্টে মহরের নামে কেস উঠলো। কিন্তু কোনো অপরাধীর জন্য এমন মানুষের ঢল কমই দেখা গেছে। পুলিশ, জজ আর জমিদারসমাজ ছাড়া সকলেই যেন চেয়েছিল, মহর মুক্তি পাক। কিন্তু তেমনটা হয়নি। শাস্তি হিসেবে মহর খাঁর যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হলো। এরপর কবে সে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছে, সে খবর আর জানা যায়নি। হয়তো সেই দ্বীপেই একাকি মহর খাঁ সারাজীবনের হিসেব-নিকেশ মিটিয়েছিল, কিংবা পীরের মন্ত্রবলে উধাও হয়ে গিয়েছিল। মহর দস্যুর গল্পটা এমনই ধোঁয়াশায় মাখা, রহস্যঘেরা।