Cover illustration for চুরি যাওয়া বামুনের বউ

চুরি যাওয়া বামুনের বউ

CATEGORY
Bengali Folktale

BASED ON THE BOOK

Bengali Household Tales

by William McCulloch

এক গাঁয়ে থাকতো এক বামুন, আর এক কায়স্থ। দুজনের বাড়ি পাশাপাশি ছিল। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বও ছিল ভীষণ। বামুনের ঘরে দিন আনতে দিন খাই অবস্থা। কায়স্থের ঘরে চাল-ডালের অত একটা অভাব নেই, তবে তারও অবস্থা খুব বেশি ভালো নয়। বিয়েথা হয়নি কারুরই।

একদিন বামুন বন্ধু বললো, “এভাবে আর কতদিন বলো? ভাবছি বিয়ে করব। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হলে কেইবা আমার কাছে মেয়ে বিয়ে দেবে? এই গরিবি দশা কি কোনোদিন যাবে!” কায়স্থ বন্ধুও তার সাথে গলা মিলিয়ে বললো, “তাইতো ভাবি। আমাদেরকে এ পাড়ায় কি আর কেউ মেয়ে দেবে! অন্য ফন্দি করতে হবে বুঝলে। অন্য গাঁয়ে গিয়ে চলো দেখি কিছু করা যায় কি না।” বামুন প্রথমে না মানতে চাইলেও পরে বন্ধুর কথায় রাজি হলো। কায়স্থ বললো, “তোমায় বেশি কিছু মাথা খাটাতে হবে না। আমি যেভাবে বলি, তাই করো।”

পাঁজি দেখে এক শুভদিনে দুই বন্ধু বেরিয়ে পড়লো দূর গাঁয়ে, কনের খোঁজে। সারাদিন হেঁটে ক্লান্ত হয়ে শেষে নতুন এক মহল্লায় এলো তারা। ওখানে এক বড় পুকুরের পারে বটগাছের নিচে বিশ্রাম নেয়ার সময় বেশ কয়েকটি মেয়েকে জল নিতে আসতে দেখলো দুইজনে। এর মধ্যে একটি মেয়েকে বামুনের মনে ধরলো। বন্ধুকে জানাতেই সে পাশের একটি দোকানে গেল খোঁজখবর নিতে। সে দোকানি ছিল মহা বাচাল। এক কথা জানতে চাইলে সে বলে দশ কথা। দোকানির ধান ভানতে শিবের গীত কাজে লেগে গেলো। ওর কাছ থেকেই কায়স্থ বন্ধুটি জানতে পারলো,

“ও মেয়ে বাপু রমেশ চক্কোত্তির। বড় পোড়াকপালি মেয়ে বাছা। সেই যে বর বিয়ে করে রেখে গেল, এ জন্মে আর টোপর তুলে মুখ দেখালো না। ও বরের চেহারাও দেখেনি বাড়ির কেউ। তবে শুনেছি রানিগঞ্জে আরো এক ঘর করেছে। সাধে কি আর বলি, মেয়েখানা বড়ই পোড়াকপালি!”

কায়স্থ বন্ধুটি ছিল ভীষণ চালাক। ভাবলো, এই বেলা দোকানির থেকে আরো কিছু জেনে নেয়া যাক–

“তা সে বরটির পরিচয় কিছু জানতে পারি? এই আমরা রানিগঞ্জ দিয়েই যাব তো, একটু খোঁজখবর নিয়ে এলাম নাহয়।”

“তা বাবা, তোমাদের দেখেই বুঝেছি ভদ্দরনোকের ছেলে। চক্কোত্তির মেয়ের জামাইর নাম হচ্ছে রামলোচন মুখুজ্জে। শুনেছি সে নাকি বড় বাবুর আপিসে কেরানির চাকরি করে। “

এই সব খবর শুনে, দোকানির হুঁকোয় টান দিয়ে দুই বন্ধু চললো চক্রবর্তীবাড়ি। কায়স্থের চিকন বুদ্ধি ছিল, ও বাড়ি গিয়ে বামুন সাজবে রামলোচন– আর সে হবে তার চাকর। এতদিন বাদে আসার জন্য বেশ একটা মিথ্যে গল্প ফেঁদে নিলো দুজনে মিলে।

“ও চক্কোত্তি মশায়, বাড়ি আছেন নাকি?”

“কে ভাই, তোমরা?”

“ও মা, এ যে আপনার মেয়েজামাই গো! বলি, চিনতে পারছেন না বুঝি?”

এরপর জামাই ভেবে মেয়ের বাড়িতে অনেক আদর-যত্ন হলো। কিন্তু কনের মনে সন্দেহ হলো। তাই সে পুরোপুরি বিশ্বাস করলো না। তবু বাপ-মায়ের কথা ভেবে সে চুপটি করে রইলো আর খালি কাঁদতে থাকলো। ওদিকে বেশ কয়েকদিন নকল শ্বশুরবাড়িতে আপ্যায়ন পেয়ে দুই বন্ধু বাড়ি ফেরার কথা ভাবলো। বাইরে পালকি এলো, সাথে চার বেহারা। পালকিতে করে বউ নিয়ে মাঝরাস্তায় গিয়ে কায়স্থ বন্ধুটি বললো, “তুমি কিন্তু আগে আমার জন্য বউ খুঁজে দেবে। এরপর সংসার করবে। মনে থাকে যেন। আমার জন্য এমন ভালো একখানা বউ আনতে হবে।” পালকির আড়াল থেকে বামুনের বউ সব শুনতে পেলো। তার মনের সন্দেহ আরো পাকাপোক্ত হলো। এরা দুজন যে কেউই আসল পরিচয় দেয়নি, তাও বুঝতে পারলো।

ফন্দি এঁটে দুই বন্ধু মিলে পালকির বেহারাদেরকে পালকিসহ ফেরত পাঠিয়ে দিল। এরপর বামুন বউ নিয়ে বাড়ি গেল। নতুন বউ দেখে বামুনের মা বড় বামুনি, পাড়া-পড়শি সকলেই আনন্দে মেতে উঠলো। আর চুরি করা বউ এত সহজে তাদের কথা মেনে নিল দেখে দুই বন্ধুও একেবারে ঝাড়া হাতপা হয়ে আনন্দে গা ভাসালো। কিন্তু বউয়ের মাথায় তখন চলছে অন্য পাঁয়তারা। কয়েকদিন যাবার পর যখন সবাই মিলে বউটিকে একেবারে সুলক্ষণা, সুনিপুণা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রশংসায় ভাসিয়ে দিচ্ছে– তখন কায়স্থ বন্ধু এসে বললো, “এবার চলো আমার বউ খুঁজতে যাই।” বামুনও তক্ষুনি রাজি। কেননা বন্ধুকে দেয়া কথার প্যাঁচে পড়ে বউয়ের সঙ্গে তার ভালো করে মেলামেশাও হচ্ছে না। এবার আর তারা পাঁজি-টাজি দেখলো না। বামুনবউয়ের কাছে সংসারের সব চাবিকাঠি তুলে দিয়ে বেরিয়ে পড়লো তাইরে নাইরে করে।

ওদিকে ওরা দুজন যেতে না যেতেই বামুনবউ ঘর থেকে যা যা দামি জিনিস দুয়েকখানা আছে, আর বিয়েতে উপহার পাওয়া টাকা-পয়সা সবকিছু আঁচলে বেঁধে ঘরে আগুন লাগিয়ে বেরিয়ে গেলো। ঘরের মধ্যে বুড়ি বামুনি পুড়ে ছাই হলো। বউ ফিরেও তাকালো না।

ওদিকে দুই বন্ধু মিলে কোনো ব্যবস্থাই না করতে পেরে গাঁয়ে ফিরে এসে দেখতে পেলো, কোথায় ঘর– কোথায়ই বা সেই নতুন বামুনবউ? এমন দুর্দশা দেখে কায়স্থ বন্ধু নাকে খত দিয়ে বললো,

“অমন অসৎ পথে আর যাব না ভাই।

নয়তো আমার ঘরও পুড়ে হবে ছাই!”

আর গাঁয়ের লোকে কান্নাকাটি করে বললো, “আহা রে সুন্দর বউ আর ভালো শ্বাশুড়ি– দুজনেই গেছে স্বগগে!” আসলে তো স্বর্গে নয়। বউ পালিয়ে গেছে তার বাপের বাড়ি। ওখানে গিয়েও সে সত্যি কথা বললো না। বানিয়ে বানিয়ে বললো, তার শ্বাশুড়ি মারা গেছে তাই সঙ্গে বর আসেনি। ক’টা দিন সে এখানেই থাকবে। বাপ-মাও ভোলাভালা। সব কথা মেনে নিলো।

ওদিকে মায়ের শ্রাদ্ধ করে বামুন ভাবলো, একবার বউর বাপের বাড়ি ঘুরে আসবে। ও মা, গিয়ে তো দেখে অন্য ঘটনা। তার বউ দিব্যি ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। কপাল ভালো, শ্বশুরবাড়িতে কিছু বলে দেয়নি। বামুন ভাবলো, আরেকবার ভাগ্যটা ঘোরে কি না– দেখা যাক।

বউও কম যায় না। একবার ছলচাতুরি করে তাকে নিয়ে গেছিল বামুন, এইবার বামুনের ছেলেকে সে আরো কঠিন শাস্তি দেবে। তাইতো সে তাদের গাঁয়ের বুড়ি দাইমা থেকে ধুতরোর বিষ যোগাড় করে রেখেছে। যেই না বামুন তার ঘরে আসবে, ওমনি দুধের পেয়ালায় মিশিয়ে সে বিষ খাইয়ে দেবে। যেই ভাবা সেই কাজ। রাত্তিরে বামুন এলো তার নকল বউয়ের কাছে। ভাবলো, যদি কোনোমতে আবার তাকে ফিরিয়ে নেয়া যায়। বামুন সারাদিন কিছুই খায়নি। সারা রাস্তা হেঁটে এসেছে। এবার এতই দেরি হয়েছে যে শ্বশুরবাড়ির কেউ কিছু খেতেও দেয়নি। তাই দুধের পেয়ালাখানা দেখে তার আর তর সইলো না। এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেললো। কিছুক্ষণ পরই বিষে নীল হয়ে গেল বামুনের শরীর।

আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বামুন বউ এবার লাশটাকে ভালোমতো পুরনো সব শাড়ির মধ্যে পেঁচিয়ে ফেলতে গেল জঙ্গলের ধারের শ্মশানে। নিজে পরলো লাল টুকটুকে রেশমি শাড়ি। যেই না লাশ নিয়ে সে জঙ্গলে গেছে, কোত্থেকে ঝোড়ো বাতাস বইতে লাগলো। মাঝে মাঝে বিজলি চমকাচ্ছে। ঝিঁঝিঁর ডাক আরো তীব্র হচ্ছে। আকাশে মেঘে মেঘে ডাক বাড়ছে। বামুনবউ শ্মশানে আটকা পড়ে গেল। শ্মশানের পাশেই ছিল এক দল ডাকাত। এমন ঝোড়ো রাতে বামুনবউকে আবছা আলোয় দেখতে পেয়ে তারা ভাবলো– “এ তো সাক্ষাৎ কালীমা!” সবাই মিলে হাত জোড় করে তার কাছে মানত করলো, সোনার জিব গড়িয়ে দেবে। বামুনবউয়ের তো আর বুদ্ধির শেষ নেই। তৎক্ষণাৎ এমন সুযোগ পেয়ে সে ডাকাত সর্দারের দিকে তাকিয়ে বললো, “আমি তোদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছি। এই যে, নে তোদের পুরস্কার!” এই কথা বলে কালীর বেশ ধরে সে বরের পুঁটলি বাঁধা লাশটা ছুঁড়ে দিলো। এরপর সেখান থেকে হাওয়ার বেগে পালিয়ে বউটি আবার তার বাপের বাড়ি চলে গেল। বাপের বাড়ির লোকজন যখন বরের কথা জিজ্ঞেস করলো, তখন সে জবাব দিলো, তার বর কাজ খুঁজতে বিদেশ-বিভূঁই গেছে। আর তাকে বলে গেছে, এখানেই থাকতে।

এরপর থেকে আর কোনোদিন বামুনের মেয়েকে কেউ কক্ষনো জ্বালায়নি। এমনকি সেই যে আসল বর, রামলোচন– তারও কোনো খবর মেলেনি। আর ও গাঁয়ের কায়স্থ বন্ধুটি আজো মাঝে মাঝেই তার বামুন বন্ধুকে খুঁজে বেড়ায়। যদি কখনো ভুল করে চক্কোত্তিবাড়িতে চলে আসে, তার যে কী দশা হবে– তা কি আর সে জানে?