সে বহু বহুকাল আগের কথা। হিন্দুস্তানের বাদশা ছিলেন আজর শাহ। তার হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়ায় টগবগ করে। প্রজাদের তিনি নিজের সন্তানের মতোই দেখেন, কিন্তু হায়— রাজার নিজের কোনো সন্তান ছিল না। নিঃসন্তান হবার দুঃখে বাদশা সারাক্ষণ চিন্তায় চিন্তায় কাহিল হয়ে থাকতেন। এভাবেই একদিন চিন্তার জ্বালা-যন্ত্রণায় তিনি একদিন মনের দুঃখে বাদশাহী ছেড়ে জঙ্গলে চলে গেলেন।
বাদসাহির পোশাক সব ফেলিল খুলিয়া।।
ফকিরের লেবাছ লিল তছবি গলে দিয়া
জঙ্গলে গিয়ে বাদশা ফকিরের মতো ঘুরতে থাকেন। সেখানে তার দেখা হয়য় এক পীরের সঙ্গে।
আচানক পির এক পৌছিল আসিয়া
সবুজ পোষাক ছিল বদনে তাহার।।
পিটের উপরে কুজ আছিল তাহার*
এই পীর এককালে ডাকাত ছিল। লোকের জানমাল লুটে খেত। সে জীবনে এত পাপ করেছে যে এ বয়সে এসে সে খোদার বন্দেগিতে নিজেকে লুটিয়ে দিয়েছে। বাদশার কাছে পীর নিজের জীবনের পাপের কথা বলতে লাগলো আর আফসোস করতে লাগলো।
সে বাদশাকে আরো জানালো, তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতেই— খাজা খিজিরের হুকুমে সে এখানে এসেছে। তাই তার গায়ে সবুজ পোশাক। বাদশাকে সে জানাতে চায় তার ভাগ্যের কথা। সন্তান পেতে হলে তাকে আরেকটি বিয়ে করতে হবে। কাকে বিয়ে করলে তার উদ্দেশ্য সফল হবে, সে কথাও বাতলে দিলেন। সে খোতন বাদশার মেয়ে, নাম সোমুন রোখ।
শুরূত জামাল বিবি দেখিতে গুলফাম
তাহাকে করিলে সাদি হুকুমে খোদার।।
আওলাদ হইবে তেরা সোন নামদার।
এ কথা শুনে দুশ্চিন্তা ছেড়ে দিয়ে বাদশা সেই বুড়োকে সাথে নিয়ে চললেন তার বাদশাহীতে। পরের দিন দুয়ে মিলে আলাপ-আলোচনা করে খোতন বাদশাকে চিঠি পাঠালেন—
সুনহে খোতন শাহা, খেয়াল করিবে লেখা পরে
তোমার জে শাহাজাদি; আমাকে দেহনা সাদি।
বাদশার পয়গাম নিয়ে উজির যাবেন আরেক বাদশার কাছে। সে কী আয়োজনের বাহার। দেখে লোকের চোখ টাটায়।
গোলাম খেদমতগার নৌকর চাকর।।
জা হয়য় দরকার লেহ দুরের সফর
ভাল ভাল ঘোড়া লেহ পছন্দ করিয়া।।
মালমাত্তা জয়াহের লেহনা বান্ধিয়া।
সেইসঙ্গে আছে বাদশার জন্য মূল্যবান সব উপহার। এইসব নিয়ে, লোক-লস্করসমেত উজির আর খোজেস্তা পীর গেলেন খোতন বাদশার রাজ্যে। বাদশা তো আজর বাদশার খবর শুনে আনন্দে আত্মহারা। আয় হায় এও কি কপালে ছিল, আজর বাদশা হবে তার মেয়ের জামাই? উজির-আজমকে খোতন বাদশা যারপরনাই মেহমানদারি করলেন। কিন্তু আজর বাদশার কোনো জবাব তিনি দিলেন না। এমন করে একে একে দুই দুইটি মাস কেটে গেল। উজর একসময় একটু বিরক্ত হয়েই এসে বললেন,
“গোজরিল দুই মাস আইনু হেথায়
মেহের করিয়া মুঝে করনা বিদায়।”
তখন খোতন বাদশা তার উজিরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে বিয়ের সরঞ্জাম তৈয়ার করতে শুরু করলেন। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কনের সাজের সামগ্রী এলো। আজর বাদশাকে ফিরতি উপহার দেওয়ার জন্য ঘোড়াশালে নতুন ঘোড়া এলো, তাতে আবার সোনার জিন চড়লো। জরি-চুমকি দিয়ে সবার জন্য নতুন কাপড় হলো। হেঁশেলে নতুন সোনার বাসন। আর বিদায়কালে শাহজাদী সোমুন রোখের সাজের সে কী বাহার— আহা বড়ই চমৎকার!
সের পরে সিতা পাটী, বান্দিলেন খুব আটি,
ঝাপটা দিল উপরে সিতার
চৌদানি কান বালা,
গলে হার পুস্পমালা, চিক দিল উপরে সবায়।।
লোটনে বান্দিল খোপা;
তাহে গন্দরাজ চাঁপা,
জরির মোবাব জড়া তায়
এইভাবে বাদশাহের সঙ্গে সোমুন রোখ বিবির বিয়ে হলো। নতুন বেগমকে নিয়ে বাদশা মহলে গেলেন। ওদিকে তার যে বড় বিবি— নাম তার জালালা। নতুন বিবিকে দেখে তার মনে বড় হিংসা হলো। কী করে বাদশা-বিবির মধ্যে ঝামেলা পাকানো যায়, দিনরাত সে তাই নিয়ে ভাবতে লাগলো। জালালা বিবির এক দাসী ছিল। সেই দাসীর সঙ্গে মিলে জালালা ষড়যন্ত্র করতে লাগলো রোখ বিবিকে নিয়ে।
জালালা বিবির কাছে এক তেলেছমাতি গাছের ছাল ছিল। সেই ছাল ধুয়ে যদি কাউকে পানি খাওয়ানো যায়, সে নাকি তৎক্ষণাৎ পাগল হয়ে যায়। নতুন বউ যখন বাহারি ভোজে খেতে বসলো, তখন জালালা বিবি সেই ছাল ধোয়া পানি তার শরবতে মিশিয়ে দিল। সেই শরবত খেয়ে সোমুন রোখ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। দাসীরা সকলে চেষ্টা-চরিত্র করেও তার জ্ঞান ফেরাতে পারলো না।
অনেকক্ষণ পর বিবির জ্ঞান ফিরলেও সে কারো সাথে কথা কয় না, মাথা তুলে চায় না। এমনকি খোদ আজর বাদশা এলেও সে ফিরে তাকায় না। নতুন বিবির এমন হালত দেখে বাদশার দুঃখে বুক ফেটে যায়। বহু হাকিম-বৈদ্য আসলো, কিন্তু কেউই তেমন কায়দা করে উঠতে পারলো না। এর মধ্যে এক গরীব প্রজা এসে হাত জোড় করে বাদশার দরবারে জানান দিল—
কান্ধার সহর আছে পশ্চিম উত্তরে
সেই সহরেতে আছে এক যে ফকির।।
প্রজাটি বললো, সেই ফকিরের কাছে গেলে নিশ্চয়ই বাদশার বেগমের অসুখ ভালো হবে। এ কথা শুনে বাদশার উজির আজম প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলেন। হাশেম আর কাসেম নামে দুইজনকে তিনি ঠিক করলেন দরবেশের কাছে যাওয়ার জন্য। রাস্তা চলার খরচ আর দুইখানা তেজী ঘোড়া নিয়ে দুজনে পাড়ি দিল। রাস্তা ভালো চেনে না, কিন্তু তাদের মধ্যে উৎসাহের কমতি নেই। চলতে চলতে পাহাড়ের এক চূড়ায় একজন বুড়ো তাদেরকে দরবেশের কাছে পৌঁছানোর পথ বাতলে দিল।
সামনে যাইয়া যবে দুই রাহা পাবে।।
ডাহিনের রাহে দিয়া চলিয়া যাইবে।
এই রাস্তা দিয়ে দুইদিন ধরে গেলে তবে পাওয়া যাবে কান্ধার শহর। বুড়োর কথামতো চলে হাশেম ও কাশেম শেষমেশ পৌঁছালো সেই শহরে। দরবেশের দেখাও পেলো। দরবেশ তাদেরকে বললেন তার দুই মুরিদের কথা। দানাদে আর রৌসন জমির— এই তাদের নাম।
উত্তর পাহাড়ে আছে নাম সুভোসাম
দানাদেল সেই পাহাড়ের গাছ তলে।।
বসিয়া আছেন সদা আপনার হালে
চাল্লিশ বৎসর সেথা আছেন বসিয়া।।
খাওয়া পেওয়া নাহি আর নিদ্রা নাহি তার।।
অন্যদিকে—
দোছরা মুরিদ মেরা সোন তার হাল।।
রাত্রদিন আছে তার পানির খেয়াল।
তাইতো সে কুলছুম সাগরের ধারে, পশ্চিমের দিকে রাতদিন বসে থাকে।
এই দুজনকে আনতে পারলেই সমাধান মিলবে, একথা শুনে হাশেম-কাশেম ঠিকানা নিয়ে আবার রাস্তা চলতে লাগলো। যাবার সময়ে দরবেশ নিজের দুই আঙুল থেকে দুখানা আংটি খুলে দুজনকে দিলেন। বললেন, যেকোনো বিপদে কাজে লাগবে। আরো দিলেন দুইখানা রুটি আর দুই কুঁজো জল। খোদার দয়ায় এতে কখনো খাবার ও পানির অভাব হবে না তাদের— এমনই দোয়া করে দিলেন দরবেশ। এ এমন রুটি, যার অর্ধেক খেলেই পেট ভরে যাবে কিন্তু রুটি কখনো শেষ হবে না। আর কুঁজোর পানি যেন কুয়ার পানি। তল খুঁজে পাবে না কেউ।
হাশেম গেল দক্ষিণে, পশ্চিমে গেল কাশেম। চলতে লাগলো যার যার পথ। খিদে পেলে রুটি ছিঁড়ে খায়, পিপাসা লাগলে কুঁজো থেকে পানি নিয়ে খায় আর একটু একটু করে এগিয়ে যায়।
বহু রঙের বনজঙ্গল, ময়দান পেরিয়ে হাশেম দেখা পেল পাহাড়ি পীরের। অন্যদিকে কাশেমের সঙ্গে পথের মাঝখানে দেখা হয়ে গেল কোহকাফ নগরীর এক দৈত্যের সঙ্গে। সে তাকে সাহায্য করলো কুলসুম দরিয়ায় যেতে। সাধারণ মানুষের পক্ষে যে পথ এক বছরের, তা নিমেষের মধ্যে পাড়ি দিয়ে দৈত্য পৌঁছে দিল তাকে।
দুই পীরই উজিরের পাঠানো দুই দূতের মাথায় হাত দিয়ে তাদেরকে বশ করে ফেললেন। দুজনে দুইদিকে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকলো।
দরবেশ মশায় সবই জানেন, দেখেন। তিনি তখন তার এক শিষ্যকে ডেকে বললেন, হাশেম-কাশেম আর তার দুই পীর শিষ্যকে নিয়ে সে যেন পৌঁছে যায় আজর শাহের বাগানে। এরপর দরবেশও এক তুড়িতে জাদুবলে পৌঁছুলেন সেই বাগানে।
আজর শাহের সেই বাগানের নাম ছিল ফেরদৌসি। ফেরদৌসি বাগানে যেন চাঁদের হাটবাজার বসলো পীর-ফকিরের। উজির তো দেখেই খুশি। কথামতো কাজ করেছে দুই জওয়ান। তখন বাদশাহকে খবর দেয়া হলো– হাশেম, কাশেম গিয়ে দরবেশকে ধরে এনেছে!
বাদশা আর দেরি না করে তার নতুন বিবিকে নিয়ে গেলেন বাগানে, দরবেশের কাছে। দরবেশ তাকে দেখেই বললেন, “ও কিছু নয় বাদশা। তোমার বিবিকে কেউ জাদু করেছে। তাইতো সে কারো সাথে কথা কয় না, কারো দিকে ফিরে চায় না।” এরপর দুই পীরকে তিনি বলে দিলেন, বিবিকে আলাদা মহলে রাখতে। সেখানে শুধু বিবি থাকবে, বাদশা থাকবে আর থাকবে দুই পীর।
দরবেশের আদেশমতো সেই মহলে নিয়ে একখানা পর্দার আড়ালে বিবিকে রাখা হয়। পর্দার এপাশ থেকে দরবেশের দুই মুরিদ গল্প শোনাতে শুরু করে।
তারা সোমুন রোখকে শোনায় এক ভবঘুরের কথা। নাম তার মালেক। একবার ঘুরতে ঘুরতে মালেক গিয়ে পড়লো এক আজব আজিম শহরে। সে শহরে আছে চারখানা ফটক। সাদা পাথরের বড় বড় মহল আছে সেখানে, আর আছে সরোবরে বাহারি পদ্ম। সে শহরের আবহাওয়া আর সবকিছু এতই সুন্দর যে মালেক আনন্দে মেতে উঠলো।
বহু কাল আগে দামেস্ক শহরে ছিলেন হাসেন শাহা নামে এক ন্যায়পরায়ণ বাদশা। সেই বাদশারই ছেলে এই ভবঘুরে মালেক। মালেকের রূপ যেন একেবারে ইউসুফ নবীর মতো ঝলমলে— একবার চোখ পড়লে কেউ ফেরাতে পারে না। কথায় আছে, মালেককে দেখে নাকি বেহেশতের হুরপরীরাও লজ্জা পেত। বিদ্যাবুদ্ধি, অস্ত্রশস্ত্র চালনায় মালেকের জুড়ি মেলা ছিল ভার। বাবা-মায়ের চোখের মনি, শাহজাদা মালেক।
একদিন বাদশা অসুখে পড়ে মারা গেলেন। মারা যাওয়ার আগে তিনি তার ভাইয়ের কাছে ছেলেকে সঁপে দিলেন। আর বলে গেলেন, “তোমার মেয়ের সঙ্গে মালেকের বিয়ে দিও ভাই।” ভাই তার কথামতোই কাজ করলেন। মালেকও চাচার কথা মেনে চল। তার অনুমতি ছাড়া একটি কদমও ফেল না।
একদিন চাচার অনুমতি নিয়েই মালেক জঙ্গলে শিকার করতে গেল। সাথে পাইক-বরকন্দাজ, সবই আছে। কিন্তু জঙ্গলের অদূরে একটি বাগান দেখে মালেক একা একা সেখানে চলে গেল। সেখানে গিয়ে তার দেখা হলো পরীদের রানী গেতি আফরোজের। পরীদের রানীর আলোয় আলোকিত হয়ে যায় পুরো বাগিচা। সিংহাসনে বসে সে সকল পরীদের শাসন করে।
গেতি আফরোজের কাছে খবর গেল, বাগানে এসেছে এক আদমসন্তান। সে খবর দিল, নিয়ে আসা হোক তাকে এক্ষুনি। যখন মালেক এসে পরীদের রানীর কাছে দাঁড়ালো, তখনই চোখে চোখে কী যেন হলো— বাগানের আলো যেন আরো শতগুণ বেড়ে গেল। এক মানবসন্তান প্রেমে পড়লো পরীর দেশের রানীর। রানীরও মনের অবস্থা কিছু আলাদা নয়। তার এক প্রিয় পরী ছিল, তারই উজিরানী। নাম তার রুহ আফজা। মালেক আর রুহ আফজাকে নিয়ে আফরোজ শুরু করলো এক মেহফিল। সেই মেহফিলে দারুণ সব খাবার-দাবার, জমরুদের পেয়ালা— আরো কত কী।
এমনি করেই,
হাশিতে খেলিতে দিন গুজারিয়া গেল।।
আফতাব চলিল ছিয়া আসিয়া পৌছিল।
কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও গেতি আফরোজের একটা শর্ত ছিল। শাহজাদা যেন কোনোভাবেই তাকে স্পর্শ না করে। কিন্তু শাহজাদার মন উচাটন। এত আনন্দের মাঝে শর্তের কথা মনে থাকে না। ভুলবশত সে গেতি আফরোজকে স্পর্শ করলো এবং তখন রানী রেগে আগুন হয়ে গেল। রাগের বশে শাহজাদাকে সে জাদুবলে কবুতরে রূপ দিল। মালেক কবুতরের বেশে পরীর রানীর মহলে বসে থাকে, ছাদ থেকে তাকিয়ে দেখে নিচের দুনিয়া। কিছুদিন সেইমতো থেকে পরীদের রানী যখন তাকে আর তেমন পাত্তা দিল না, তখন সে কষ্ট করে উড়তে উড়তে নিজের রাজ্যে গেল।
একদিন কবুতরবেশী মালেকের উপর তার বউর নজর পড়লো। সে দাসীকে ডেকে বললো, “ও দাসী, এমনতর কবুতর তো আগে কখনো দেখিনি হে! এ কবুতর আমার চাই।” সে কবুতর ধরে আনার পর সকল দাসী বলতে লাগলো, “কবুতরের মাংস খুব মজা। চলুন বেগম, আমরা কবুতরকে জবেহ করি।”
কবুতর জবাই করতে মালেকের চাচার হাতে দেয়া হলো। নাম তার দানেশ। এই চাচা মালেককে খুব ভালোবাসতো। কবুতরটি হাতে নিয়েই তার মন কু ডাকলো। সে সবাইকে ডেকে বললো, “এতগুলো মানুষ, এক কবুতরে কি আর হয়? তোমাদের কি কারো আমার ভাস্তে মালেকের কথা মনে পড়ে না? সেই যে সে গেল— আর এলো না। কে জানে কোথায় আছে বেচারা।”
এ কথা শুনে মালেকের বউ মনের দুঃখে কবুতরটিকে উড়িয়ে দিল আকাশে। এরপর সে উড়ে বেড়ালো এখান থেকে ওখানে। নিজের বউও তাকে চিনতে পারলো না, হায়রে মালেক মোহাম্মদ!
কিন্তু মালেক জানত না, তার দানেশ চাচা ঠিকই চিনেছে নিজের ভাস্তেকে। দানেশ চাচা জাদুর মাজুন খাইয়ে কবুতর থেকে দানেশকে মানুষের রূপে ফিরিয়ে আনলো।
মালেক ঘরে ফিরে এলো ঠিকই। কিন্তু মনের মধ্যে তার এখন বাস করে গেতি আফরোজের স্মৃতি। পরীদের রানীর সাথে কাটানো সময়গুলো সে কিছুতেই ভুলতে পারে না। আবার সে ফিরে যায় গেতি আফরোজের কাছে। কিন্তু কপালের লিখন না যায় খণ্ডন— আবারো মালেক সেই ভুল করে আর গেতি আফরোজ রেগেমেগে লাল হয়ে যায়। এবার জাদুবলে তাকে মোরগ বানিয়ে ছেড়ে দিল।
আবার সে উড়তে উড়তে গেল নিজের বাড়িতে। চাচা দানেশ এবার আগে থেকেই প্রস্তুত জাদুর মাজন নিয়ে। ভাতিজাকে সে আবার ফিরিয়ে আনলো আদমের বেশে। তবে এবারে চাচা অনেক রেগে গেল মালেকের উপরে—
বারে বারে মানা করি নাহি শুনে বাত।।
এরূপে হারাবে জান জানিনু নেহাত।
গেতি আফরোজ পরি কোহেবাবেলেতে।
এই লাড়কা পড়িয়াছে তাহার ফান্দেতে।
কিন্তু তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে কি কোনো লাভ আছে? সে যে মন দিয়ে বসে আছে তার পরানের ‘গেতি পিয়ারী’কে। গেতির মনেও একই ভাব, কিন্তু পরী হয়ে মানুষের সঙ্গে ভাব-ভালোবাসা করায় নিজের আত্মীয়-স্বজনই তাকে কটু কথা শোনায়।
আবার ফিরে গেল মালেক, তার প্রেয়সীর কাছে। পরীদের দেশের উজির এসে কতশত বোঝালো গেতি আফরোজকে। কিন্তু এইবেলা তার মন বড়ই নরম হয়ে আছে মালেকের জন্য—
কেমনে ছাড়িব আমি এহার সহব্বত।।
জেজন আমার তরে করে মহব্বত।
আশপাশের সবার কোনো কথাই কানে না নিয়ে পরী আর আদমের প্রেম ভালোই চলতে থাকে। এমনি করে অনেকগুলো দিন কেটে যাবার পর মালেক একদিন বাড়ি ঘুরতে গেল। সাথে নিয়ে গেল পরীর দেওয়া এক টগবগে তেজী ঘোড়া।
বাড়িতে গিয়ে সকলের সাথে দেখা হলো। বউ, চাচা, পাড়া-পড়শি, ঘরের লোকজন। সকলে মিলে মালেকের কাছে একটাই কথা শুনতে চায়— “আমি তোমাদের ছেড়ে আর কোথাও যাব না।” প্রথমে গাঁইগুঁই করলেও মালেক পরে বাধ্য হয়ে মিথ্যে আশ্বাস দেয় তাদেরকে। আর মনে মনে ভাবে, আর দুটো দিন থেকে নিই— তারপর দেখা যাবে!
একদিন চাচা মালেককে নিয়ে যায় বাদশার দরবারে। সেখানে বাদশা মালেকের কাছে বড় আদর-টাদর করে একখানা আবদার করলো—
গেতি আফরোজ নাম যেই পরি জাত।।
মহব্বত করেন পরি তোমাকে নেহাত।।
কহিনু তোমাকে জাহা দেলের মুরাদ
কোন উছিলায় আমি দেখিব পরিকে।।
এ কথা শুনে মালেক মুচকি হেসে বাদশাকে অভয় দিল। চিন্তা নেই। মালেকই সব ব্যবস্থা করবে বাদশার সঙ্গে পরীদের রানীর সাক্ষাতের। সে রাতেই মালেক ঘোড়াশাল থেকে ঘোড়া নিয়ে রওনা হয়ে গেল পরীস্থানের উদ্দেশে। পেছনে পড়ে রইল তার বেগম, চাচা আর বাকি সকলে। গেতি আফরোজের কাছে গিয়ে সে বাদশাহর দাওয়াত দিল। গেতি আরো এককাঠি সরেস— সে নিজেই বাদশাহকে দাওয়াত দিয়ে বসলো। বেশ কয়েক দফা খবর চালাচালির পর সে দাওয়াতে বাদশার আসা স্থির হলো। তখন গেতি একটু ভয় পেয়ে গেল। হোক না আদম সুরত, তবু তো বাদশাহ! তখন সে তার বাপ-মায়ের কাছে চিঠি লিখে পাঠালো, যাতে এই দাওয়াতে তাকে সাহায্য করতে তার ছোট দুই বোনকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গেতি আফরোজের দুই বোনের নাম ছিল মেহের আঙ্গেজ ও সোর আঙ্গেজ। মেয়ের উপর রেগে থাকলেও বাবা-মায়ের মন গললো। পাঠালেন দুই বোনকে সাজিয়ে-গুছিয়ে।
নানা রঙ্গ সাজবাজ করে দোহাকারে
আর দশ বিস পরি খাওয়াছ গোলাম।
গেতি আফরোজের এত বিশাল আয়োজনে সন্তুষ্ট হলেন বাদশা ফরখোন্দা সাহা। এরপর বাদশাও একদিন গেতিকে তার মহলে দাওয়াত দিলেন। দুই দাওয়াতেই গেতির আগেপিছে ছিল মালেক। দাওয়াত শেষে মালেক আবার গেতির সাথে একটু মাত্রা ছাড়িয়ে গেল।
তখন গেতি মালেককে রাগের চোটে গরু বানিয়ে দিল। লাল কাপড় গলায় বাঁধা বেশ সুন্দর গরুটিকে দেখে প্রথম নজরেই চিনে ফেললো চাচা দানেশ— “তোকে কতবার না করেছি এমন বেয়াকুফি করতে?” কিন্তু এবারে আর চাচার কাছে কোনো জড়িবুটি কিংবা মাজুনি ছিল না। ভাতিজা পড়ে রইল পরীর উঠানে।
শে বুটির ভেদ কথা করি জে জিকির
জে বুটিতে হয় এই মাজুন তৈয়ার।।
সরনদীপ নামের এক অদ্ভুত পাহাড়ে পাওয়া যায় এই গাছ। সে পাহাড় ছাড়া কোথাও না মেলে এর হদিস। তক্ষুনি উজির আর বাদশা মিলে ঠিক করলো, দুজন সাহসী যুবককে পাঠাতে হবে সেখানে। তারাই পারবে নিয়ে আসতে মালেকের চিকিৎসার খোঁজ।
যেই কথা, সেই কাজ। পাঠানো হলো দুই ভাইকে। তারা কখনো উঁচুনিচু রাস্তায়, কখনো পাহাড়ের ঢালে তো কখনো নীল সমুদ্রের পাড়ে হেঁটে বেড়ায়। এমন করে অনেকদিন যাওয়ার পর তাদের কাছে ধরা দিল সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত সরনদীপ পাহাড়।
তাড়াতাড়ি থলে থেকে ছুরি বের করে সেই মোমের মতন নরম দেখতে জড়িবুটি কেটে নিল এক ভাই। অন্য ভাই তা থলেতে ভরলো। এরপর তা নিয়ে সোজা চলে এলো দানেশ উজিরের কাছে। আবার সেরে উঠলো মালেক। পতঙ্গের যেমন আগুনের মাঝে ঝাঁপ দেয়াতেই নিয়তি, তেমনি মালেকও খুঁজে ফেরে ঝাঁপ দেয় পরীস্থানের অনলে।
মান-অভিমান, মনের মহল ভাঙা-গড়া সবই হয়। মালেক বারবার একই ভুল করে, একইভাবে সাজা দেয় গেতি আফরোজ। একইভাবে আবার তারা মিলে যায় একে অপরের সঙ্গে— মধুর মিলনে। এই গল্পের কোনো শেষ হয় না। মনে হয় যেন সময়ের চেয়েও পুরনো এই গল্প।
দানাদেরলের মুখে মালেক আর গেতি আফরোজের গল্প শুনতে শুনতে সমন রোখ বিবি তা-ই ভাবছিল।
এইবেলা সোমনরুখ বেগমকে গল্প শোনাতে লাগলো রওশন জমির— আমাদের গল্পের দ্বিতীয় পীর।
এক শহরের সত্তর জন লোক মিলে যাচ্ছিল কাফেলায়। সকলে মিলে এক বিশাল ময়দানে পৌঁছবার পর সেখানে শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। কেউ কোনো উপায় না পেয়ে এদিক-ওদিক দৌড়াতে শুরু করলো। কিন্তু এর মধ্যে উনসত্তর জনই মারা পড়লো বজ্রাঘাতে। বেঁচে রইলো কেবল একজন। আর সে ছিল খোদ রওশন জমির।
সঙ্গীদের মৃত্যু দেখে সেই মুসাফিরের বুক ফেটে কান্না আসে। তার কান্নায় আসমান-জমিন যেন ফেটে চৌচির হয়ে যায়। তখনই সেখানে দেখা দিল এক বিশাল আজদাহা, মানে অজগর সাপ। সে এসে পথিককে তার শরীর দিয়ে পেঁচিয়ে ধরলো। বেচারা পথিক ভাবলো, সাপের পেটে যাওয়াই বোধহয় তার ভাগ্য। সে চুপচাপ বসে থাকলো। আর কিছু বললো না। কিন্তু হাজার হাত লম্বা সেই সাপ তাকে না খেয়ে পিঠের উপর নিয়ে ছুটতে শুরু করলো।
হাজার হাত লম্বা ছিল ওজুদ তাহার
উচাইতে বিশ হাত সোন বেরাদার
পিটের উপরে মুজি লইল তুলিয়া
দক্ষিন তরফে মুঝে চলিল লইয়া।
আজদাহা রওশনকে নিয়ে এক পাহাড়ের নিচে গেল। সেখানে গিয়ে তাকে ইশারা করলো, ভেতরের গর্তে প্রবেশ করতে। ভয়ে ভয়ে রওশন সেখানে ঢুকতেই বেরিয়ে এলো বিশাল আকৃতির এক কাঁকড়া বিছা। এত বড় যে আজদাহা, সেও ভয়ে থরথর কাঁপতে লাগলো। কাঁকড়া বিছাকে দেখে আজদাহা উল্টো রাস্তায় দৌড়ানো শুরু করলো। তখন রওশন জমির সাপের ইশারায় বুঝতে পারলো, এই বিছা আসলে আজদাহার শত্রু। আর তাকে মারতেই এখানে রওশনকে নিয়ে এসেছে সে।
পিঠের তীর ধনুক হাতে নিলো রওশন জমির। এক তীরে বিচ্ছুকে সে দুই ভাগে ভাগ করলো।
আজদাহা হইল খুসি হাজারে হাজার।।
মারা গেল দুরাচার দুসমন আমার।
তখন আজদাহা আবার রওশন জমিরকে পিঠে তুলে নিয়ে সেই গর্তের মধ্যে দিয়ে ছুটতে লাগলো। অনেকক্ষণ পর তারা এসে দাঁড়ালো এক অদ্ভুত সুন্দর মহলের সামনে।
পাকিজা মাকান এক দেখিনু চাহিয়া
আফতাব হইতে হবে রৌসন জিয়াদা।
সে মহলের গায়ে থরে-বিথরে সাজিয়ে রাখা হাজার রকম মণি-মুক্তা, হীরে-জহরত। আজদাহার নির্দেশ দিল “যত পার ধন-সম্পদ বেঁধে নাও হে মুসাফির।” কিন্তু মুসাফিরের মনে কোনো লোভ ছিল না। সে অন্যের সম্পদ চায় না। সে বরং হাত জোড় করে আজদাহাকে বললো,
“এ মালে মেরা নাহি প্রয়োজন
এখোন হইল কাজ কহি জে তোমারে।।
গার হৈতে বাহির করিয়া দেহো মোরে
আপনা কাজেতে আমি জাইব চলিয়া।।
আজদাহা তখন মুসাফিরকে আবার সেই গর্ত থেকে বের করে দিল। পথে পথে উদ্দেশ্যহীনের মতো সে আবার হাঁটা শুরু করলো। এই সময়ে তার দেখা হলো এক বুড়ো পীরের সঙ্গে।
“কোথায় যাচ্ছ তুমি রওশন জমির?”
পীর তার নাম জানেন দেখে মুসাফির বড়ই অবাক হলো।
পীর আসলে গায়েবী জাদু জানেন। আজদাহার কথা, কাঁকড়া বিচ্ছু হত্যা— সব খবরই রাখেন তিনি। তিনি রওশনকে জানালেন, আরো ছয়মাস পরে একই কাজ করতে আবার আসতে হবে তার। কারণ সেই কাঁকড়া বিছের বউ এখনো জীবিত আছে। সে গিয়ে আজদাহার বাড়িতে যারপরনাই বিপদ ডেকে আনবে। ছোট দুইটি বাচ্চা আছে আজদাহার ঘরে। তাদেরকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে রওশনকেই। তবে এখন সে চাইলে আবার তার কাফেলায় ফেরত যেতে পারে।
ফের আমি পুছিলাম সেই বুড়া পিরে।।
কাফেলা আমার আছে বল কতো দূরে।
বুড়ো পীর জানালেন, পনের দিনের রাস্তা চলতে হবে তাকে। তবে আজদাহা তাকে সেখানে পৌঁছে দিবে দুই তিন মুহূর্তের মধ্যে। একথা বলতে না বলতেই আবার সেই আজদাহা এসে হাজির হলো রওশনকে নিয়ে যেতে। কাফেলায় গিয়ে রওশন দেখে, কাফেলার জাঁকজমক সেই আগের মতোই আছে। সর্দার বসে রয়েছেন তারই অপেক্ষায়।
সেই সরদার আবার রওশনকে এক অদ্ভুত গল্প শোনাতে লাগলো। গেতি আফরোজের পুঁথি এমনই, একের ভেতরে অন্য গল্পের মেলা!
শহরের নাম হামদান। হামদান শহরে বাস করতো এক দয়ালু সওদাগর, নাম তার ইয়াকুফ। সবসময় হাসিখুশি, লোকে তাকে খুব পছন্দও করে। সেই সওদাগরের ছেলের নাম ছিল জরিউন। বয়স তার ষোল। এইটুকুনি বয়সেই জরিউনের গায়ে এমন শক্তি যে হাতির শুঁড় ধরে পুরো দশ চক্কর লাগিয়ে দিতে পারে। তীরন্দাজি, তলোয়ারবাজি— ত্রিসীমানায় জরিউনের জুড়ি মেলা ভার।
শক্তিতে খুবই পারদর্শী হলেও, সওদাগরের ছেলেটি স্বভাবে ছিল বড় বেহিসাবী। তাইতো বাপ-মা যখন মারা গেল, তখন সে বাপের জমানো সব ধন-সম্পদ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই খরচ করে ফেললো। এরপরে পড়লো মহা বিপদে। চারিদিকে তার পাওনাদারের ছড়াছড়ি, কোথাও মুখ দেখানো মুশকিল হয়ে গেল।
ইয়াকুফ সওদাগরের ছেলে বলে এ মুল্লুকে তার কিছু সম্মান বাকি ছিল। তাই এখানে দিনমজুরি করতে তার লজ্জা লাগলো। কোনোমতে নিজেকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে ঠিক করলো, অন্য মুল্লুকে গিয়ে সে মজুরি করবে। এই বলে জরিউন রোম নগরের দিকে যাত্রা শুরু করলো। সেখানকার বাদশাহের কাছে গিয়ে হাত জোড় করে কাজ ভিক্ষা চাইলো।
তবে জরিউন সওদাগরের ছেলে, তার ভাবসাবই আলাদা। ভিক্ষা চাইলেও মনে হয় যেন পাওনা আদায় করতে এসেছে। বাদশাহকে সে জানান দিল— কাজ তার চাই, তবে বেতন এক হাজার আশরাফির কম হলে চলবে না! এ কথা শুনে বাদশা তাকে এক রাত থাকার কথা বলে ভেতরমহলে গেলেন। সেখানে গিয়ে বেগম আর শাহজাদীর সঙ্গে শলা-পরামর্শ করলেন।
“ভিনদেশী এক যুবক এসেছে। কাজ করতে চায় বাদশাহীতে— শর্ত একটাই, চাই হাজার আশরাফি!”
একথা শুনে তেমন কিছু না ভেবেই শাহজাদী জবাব দিল, “এত বেতন যে চাওয়ার সাহস রাখে আব্বাজান, তার নিশ্চয়ই আছে অনেক সম্মান!”
মেয়ের কথা শুনে বাদশাহের ভ্রু কুঁচকে যায়। তার মনে হয়, নিশ্চয়ই এ যুবকের সাথে তার মেয়ের কোনো যোগাযোগ আছে। নইলে অপরিচিত যুবকের পক্ষে তার এত কীসের মায়া? বাদশাহী মেজাজ তো। কখন কার উপর বিগড়ে যায়, কেউ বুঝতে পারে না। বাদশাহ মেয়ের উপর খেপে গিয়ে বললেন— “তবে রে! এই ছিল তোর মনে? এক্ষুনি তোকে ভিনদেশী যুবকের হাতে তুলে দিব। থাকিস তারই সনে।”
কপালগুণে কাজ খুঁজতে গিয়ে বিবি জুটে গেল জরিউনের। বিবিকে নিয়ে সে বেরিয়ে গেল সফরে। একদিকে তো নেই কাজটাজ কিছু, সাথে আবার নতুন বউ। কোথায় যাবে, কী করবে— জরিউন কিছুই বোঝে না। দুজন মিলে ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ায়। তবে তার গায়ের শক্তি তো আর কমে যায়নি। পথে সে তীর-ধনুক দিয়েই মেরে ফেললো দুইখানা বাঘ আর বিশাল মাপের একটি হাতি। সেই পথে তারা পৌঁছে গেল খোর্শেদাবাদ নামের এক নগরে।
বাঘের নখর আর হাতির মাথার গজমোতি— এই দুই বস্তু নিয়ে জরিউন সে রাজ্যের বাদশার কাছে হাজির হলো। বাদশা তাকে আর রোমের শাহজাদিকে থাকার জন্য একখানা ছোট মহল গড়ে দিলেন আর জরিউনকে বানালেন তার উজির আজম।
জরিউনের গল্প শেষে রওশন জমির ফিরে আসে নিজের কাহিনীতে—
চলতে চলতে আমি গিয়ে পৌঁছুলাম এক আজব শহরে, যেখানে এক পায় সকলে হাঁটে-ফেরে, চলে। রওশন জমিরের দুই পা দেখে তারা তাকে বন্দী করে নিয়ে যায়। সে সময় তাকে বাঁচাতে এসেছিল সেই অদ্ভুত সাপ— আজদাহা। আজদাহা আবার তাকে পিঠে করে নিয়ে যায় পাহাড়ের ভেতরে থাকা অন্ধকার গর্তে, যেখানে অপেক্ষা করে আছে কাঁকড়া বিচ্ছুর বউ।
আছেন সেই বুড়ো পীরও। পীর আর আজদাহা মিলে রওশন জমিরকে পাঠালো এক দৈত্যের খোঁজে। শর্ত একটাই, তলোয়ারের ঘায়ে মেরে ফেলতে হবে সেই দুষ্টু দৈত্যকে। দৈত্যের খোঁজে গিয়ে রওশন জমিরের সাথে দেখা হয়ে যায় এক শাহজাদির, চৌদ্দ বছর ধরে সেই দৈত্যের মহলে বন্দি হয়ে আছে সে।
দামেস্কের সাহাজাদি নাম জরিপোশ।।
দৈত্য যখন সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরলো, তখন বুড়ো পীরের দেওয়া তাবিজ দিয়ে রওশন জমির তাকে বশ করলো। এরপর তাকে হত্যা করে শাহজাদীকে দৈত্যের কবল থেকে মুক্ত করে আনলো। বহুদিন পর খোলা বাতাসে শ্বাস নিলো জরিপোশ। ফিরে গেল বাবা-মায়ের কাছে।
ওদিকে দানাদেল পীরের গল্পের সেই গেতি আফরোজ আর মালিক মহম্মদ মান-অভিমান করতে করতে, একদিন ঠিকই শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে এক হয়ে যায়।
এই গল্পগুলো শুনতে শুনতে সমুন রোখ বিবি এ কথা, ও কথা জিজ্ঞেস করে। সে অবাক হয় মালিক মহম্মদের একই রকম ভুল আর গেতি আফরোজের একই রকম শাস্তির কথা শুনে। তার চোখ কপালে ওঠে— যখন বাদশাহ তার মেয়েকে অচেনা যুবকের হাতে কোনো কথা ছাড়াই তুলে দেয়। সে অবাক হয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করে আর দুই পীর মুচকি হাসে। সব গল্প ফুরোলে দুই পীর মিলে বাদশাহের কাছে গিয়ে বলে,
“গল্পের কী তেলেসমাতি— জানেন তো হুজুর! গিয়ে দেখুন, বিবি একদম ভালো হয়ে গেছেন।”
অতঃপর গল্পের ভেতরের, বাইরের সব রাজা-রানি, বাদশাহ-বেগম, পীর— এমনকি আজদাহার ছোট দুই ছেলে, সবাই মিলে সুখে-শান্তিতে বাস করতে থাকে। ভালো থাকে পরিস্থানের রানী, ভালো থাকে আদম সুরত শাহজাদা-শাহজাদী।