এক যে ছিল বাদশা। নাম তার বাহরাম। অন্য সব বাদশার মতোই তারও ছিল গোলাভরা ধান, ধনসম্পদে পরিপূর্ণ ভাণ্ডার আর এক রাজ্য প্রজা। তবে এই বাদশা অন্যদের মতো অত নিষ্ঠুর নন। তার মনে বড় দয়ামায়া। তাইতো যে যখন এসে তার দুয়ারে দাঁড়ায়, যা কিছু চায়– তিনি সাতপাঁচ না ভেবেই তাই দিয়ে দেন। এ বাদশাহ এক অনন্য দানবীর। তবে এই দানের স্বভাবই জীবনে দুর্ভাগ্যও বয়ে এনেছে তার। সবার সাথে ভালো করেও বাদশাহের কপালে ভালো দিন ফুরিয়ে এসেছিল। আর সেই দুর্দিনের দূত ছিল আর কেউ নয়, বাদশাহের দুয়ারে এসে দাঁড়ানো এক ফকির।
একদিন এসে সেই ফকির বাদশাকে বললো– “শুনেছি আপনি মহা দানবীর। যে যা চায়, তাই যেন পায়। আমার প্রার্থনা কি কবুল হবে, দয়াময় বাদশাহের দ্বারে?”
স্বভাব বশে বাদশাহ ফকিরকে বললেন, “নির্ভয়ে চাও কী চাইবে তুমি। আমার আয়ত্তে থাকলে নিশ্চয়ই তা পাবে জানি।”
ফকির জানালো তার ইচ্ছাখানা, শুনে সভাসদ সকলের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেলো– “বাদশাহি কিংবা ইমান, বেছে নিন দুয়ের এক। বাকিটুকু হোক এই ফকিরের দান।”
বাদশাহি দিলে ইহকালে দুঃখ-কষ্টে দিন কাটাতে হবে। কিন্তু ইমান? সে যে পরকালেরও সবচাইতে বড় সম্পদ। ধার্মিক বাদশা নিজের বুকে পাথর চাপা দিয়ে জানিয়ে দিলেন ফকিরকে, “ইহকাল জানি না তবু পরকাল জানি– তুলিয়া লও তুমি মোর বাদশাহী।”
এই বলে বাদশা সব চাবিকাঠি, ধনসম্পদ ফকিরের কাছে সঁপে দিয়ে পরিবারসমেত যাত্রা করলেন জঙ্গলের দিকে। খাওয়া নাই, দাওয়া নাই। নাই কোনো বাদশাহী চিহ্ন। শুধু আছে দারিদ্র্য আর ক্ষুধা। শাহজাদারা না খেতে পেয়ে অস্থির, পথের ক্লান্তিতে ক্লান্ত। বাদশাহের বেগম ছেলেদের কষ্ট দেখে আর থাকতে পারেন না। তাই তিনি হাতের সোনার বালা নিয়ে চললেন কোনো এক সওদাগরের খোঁজে। মনে আশা, বালা দুটো বেচে অন্তত ছেলেদের জন্য খাবার যোগাড় করতে পারবেন। কিন্তু নদীর কিনারে গিয়ে কোনো সওদাগর মিললো না। মনের দুঃখে সেখানেই কাঁদতে বসলেন বেগম। আর তক্ষুনি দেখতে পেলেন, নদী বেয়ে আসছে এক জাহাজ। তাতে বোঝাই সওদাগরের মালপত্র। মনে একটু আশা জাগলো বেগমের। এগিয়ে গেলেন তিনি। ওদিকে রূপসী বেগমকে দেখে জাহাজী সওদাগরের মনে জাগলো কুচিন্তা। তাই সে ফন্দি আঁটলো, যেভাবেই হোক এই নারীকে ভুলিয়ে জাহাজে তুলতে হবে। তাই বালা বেচতে এসে যখন টাকা চাইলেন বেগম, তখন তাকে বালার দাম দেবার ছলে জাহাজে তুলে নিলো সওদাগরের দল। বেগম জাহাজে উঠতেই জাহাজ দিল ছেড়ে। বেগম বুঝতে পারলেন, কী ভুলই না করেছেন! কিন্তু এখন তো আর ফেরার পথ নেই।
ওদিকে বাদশাহ আর শাহজাদাদেরও অবস্থা ভালো নয়। বেগমের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অনেকটা সময় কেটে গেল। তখন তারাও তার খোঁজে অন্য এক দিকে রওনা দিল। সামনে এলো নদীর পাড়। কিন্তু পার হবে কী করে? সামনে ছোট্ট একটা ডিঙ্গা, এতে তিনজন কোনোভাবেই ওঠা যাবে না। বাদশা তখন ছোট ছেলেকে ডিঙ্গায় তুলে গেলেন নদী পার হতে, এদিকে বড় ছেলেকে বেঁধে গেলেন গাছের সাথে নলখাগড়ার লতা দিয়ে। কিন্তু বিধিবাম! অভাগা যেদিকে যায়, নদীও শুকায়ে যায়। বাদশার কপালও তেমনি মন্দ। ছোট শাহজাদাকে রেখে ফেরার পথে, ডিঙ্গা গেল ডুবে। নদীর দুই ধারে দুই ছেলে, মাঝনদীতে ডুবছেন বাবা– ওদিকে মা বন্দী এক দুষ্ট সওদাগরের জাহাজে!
এভাবেই দুইদিন কেটে গেল। বাদশা কোনোমতে জীবন ফিরে পেয়েছেন, নদীতে ডুবে যাননি এখনো। কূল খুঁজে পেয়ে তার মনে চিন্তা এলো ছেলেদের নিয়ে। ছেলেদেরও ভাগ্য তখন অন্য বাঁক নিয়েছে।
বড় ছেলেটি তো গাছে বাঁধা অবস্থায় সেই প্রথম থেকেই কেঁদে মরছিল। তাকে এসে বাঘ তুলে নিয়ে গেল। আর সেই বাঘ থেকে শাহজাদাকে রক্ষা করলো এক সাহসী শিকারী। আর ছোটটিও আশেপাশে কাউকে না পেয়ে কেঁদে শেষ। তার কান্না শুনে দয়া হলো এক জেলে-জেলেনীর। এক শিকারী বাড়ি নিয়ে গেল বড় ভাইকে, ছোট ভাই সঙ্গী হলো মাছধরা জেলের। বাদশাহী ভাগ্য যাদের, তাদের আজ ঘরবাড়ি হলো শিকারী আর জেলের ঘরদোর।
ছেলে-বউ সবাইকে হারিয়ে পাগলপারা বাহরাম বাদশা। এদিক-ওদিক খুঁজে মরে, কাউকেই আর দেখতে পান না। ঘুরতে ঘুরতে একদিন তিনি পৌঁছলেন এক আজব শহরে। নাম তার খোররাম। সদ্যই সেখানকার রাজা মারা গেছেন, রানি এখন কিছুই ঠাওর করতে পারছেন না। উজিরের কাছে বুদ্ধি চাইলেন। উজির তখন হুকুম দিলেন, “ছেড়ে দাও রাজার পাগলা হাতি– যাকে পাইবে, তাকেই করবে রানির সাথী।” এভাবেই রাজা খোঁজা হচ্ছিলো খোররাম শহরে। ভাগ্যের সে কী অদ্ভুত পরিহাস, তখনই এক ভাগ্যহারা বাদশা ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাজ্যছাড়া হয়ে। পাগলা হাতি ঘুরতে ঘুরতে এসে থামলো সেই পাগল বাদশারই সামনে। মাথা হেলিয়ে, শূঁড় দুলিয়ে তুলে নিলো বাহরাম বাদশাকে– রাজ সিংহাসনে। রানি, রাজ্য, প্রজা, ধনসম্পদ সবই পেলেন বাদশাহ– শুধু হারালেন তার আসল পরিবারকে। তবে রাজ সিংহাসনেরও সে কী কম জাদু? রাজা যেন সবই ভুললেন আগের কথা। সুখেই করতে থাকলেন রাজ্যশাসন।
রাজার সেই যে দুটো ছেলের কথা মনে আছে? যারা পরে হলো শিকারীর ছেলে, জেলের ছেলে? তারাও বড় হয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে তারা এখন রাজার বাড়িতেই চাকরি করে। কিন্তু কেউ কাউকে চিনতে পায় না, অচেনা ভাবেই চলে-ফেরে। তবে নিজের কাজের গুণে তারা হয়ে উঠেছে রাজবাড়ির সবচাইতে বিশ্বস্ত কর্মচারী।
আগের খোররাম বাদশার বন্ধু ছিল এক সওদাগর, যে দেশ-বিদেশে জাহাজ ভিড়িয়ে বাণিজ্য করে। সে বহুদিন পর দেশে ফিরছে। ফেরার পথে ভাবলো, “একবার বন্ধুর সাথে দেখা করে গেলে বেশ হয়!” কিন্তু এসে দেখলো, বন্ধু বহুদিন আগেই মারা গেছে। তবে এখনকার রাজাও মন্দ নয়। তার বিশাল যত্ন-আত্তি করলো। রাজার বাড়ি আয়োজন হলো বিশাল গান-বাজনার। জমলো আলিশান মজলিস।
মজলিসে সায় দিয়েও একটু ইতস্তত করলো সওদাগর– “কিন্তু নতুন বন্ধু, আমার জাহাজে যে আছেন বিবি! তাকে ফেলে কী করে…” অভয় দিলেন নতুন রাজা, “কুছ পরওয়া নেহি! তুমি কোনো চিন্তাই করো না। আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত দুই কর্মচারীকে এক্ষুনি তোমার বিবির পাহারায় পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুমি মৌজ-মাস্তি করো।”
রাজবাড়িতে চললো জলসা-আনন্দ, ওদিকে দুই ভাই না জেনেই পাহারা দিতে চললো সওদাগরের বিবিকে। সেখানে গিয়েও তারা জাহাজের লোকজনের সাথে জুড়ে দিলো বিশাল গল্প। সুখের, দুঃখের। সেই যে ছোটবেলার বাদশাহীর, ফকিরের ভিক্ষা। সবশেষে বাবা-মাকে হারানোর গল্প। এই গল্পেই ভাইয়েরা চিনলো নিজেদেরকে। জড়িয়ে ধরলো দুই বাদশাহপুত্র। আড়াল থেকে সব শুনছিলেন সওদাগরের বিবিও। তিনিও আর কেউ নন, তাদেরই হারিয়ে যাওয়া মা– বাদশাহের বেগম। মা-ছেলের মিলন হলো। তিনজনে সুখের কান্না কাঁদছে, এমন সময় রাজার লোক এসে ধরে নিয়ে গেল তাদের। এ বড় অপরাধ, সওদাগরের বিবির সাথে এ কী ব্যবহার?
তখন দুই ভাই রাজার কাছে শুরু করলো তাদের বিস্তারিত কথা। কীভাবে তাদের জীবনের সুতো গেছে ছিঁড়ে, পরিবারের সবাই কীভাবে আলাদা হয়েছে ভাগ্যের কবলে। যত শোনে, রাজা তত বেশি কাঁদে। যতই অন্যের রাজ্য শাসন করুক, অন্যের রানির সাথে সংসার করুক– নিজের বউ-ছেলেকে কি আর ভোলা যায়? সবই মনে পড়লো তার। আর সওদাগর? সে তখন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে, এই তো কিছুক্ষণ পরেই শূলে চড়ানো হবে।