Cover illustration for বেহুলা-লখিন্দর

বেহুলা-লখিন্দর

CATEGORY
Bengali Folktale

BASED ON THE BOOK

বাংলা কিংবদন্তী

by আসাদুজ্জামান জুয়েল

সে বহুকাল আগের কথা। সমুদ্রপথে বণিকেরা তখন ব্যবসায় খুব লাভ করছে। চম্পাই নগরে থাকতো এমনই এক বদমেজাজী আর দুঃসাহসী বণিক। নাম তার চাঁদ সওদাগর। লোকে তাকে চাঁদ বেনে বলেও ডাকে। এই চাঁদ সওদাগর ছিল মহাদেব, মানে দেবাধিদেব শিবের বিশাল ভক্ত। অন্য কাউকে যেন তোয়াক্কাই করতো না সে।

ওদিকে কৈলাসে শিবের সাথে বিবাদ বেঁধেছে সর্পদেবী মনসার। মনসার মনে বেজায় দুঃখ। পিতা তাকে দেবীর মর্যাদা দিলেও এখনো পৃথিবীর মানুষ তাকে পূজা করে না। অন্যদিকে মনসাকে সাফ করে বলে দিয়েছেন মহাদেব, “মর্ত্যে পাবে আমার প্রিয় ভক্ত চাঁদ সওদাগরের দেখা। তার পুজো আনতে পারলে তবেই তোমাকে মর্ত্যলোকেও দেবী বলে মান্য করা হবে।” যেই কথা, সেই কাজ। মনসাও আঁটঘাট বেঁধে বেরিয়ে পড়লেন পৃথিবীর উদ্দেশে। লক্ষ্য একটাই– “নিতে হবে চাঁদ সওদাগরের পুজো, হতে হবে মর্ত্যলোকের মানুষের দেবী।” কিন্তু চাঁদ সওদাগরও যে সহজ লোক ছিল না। আশেপাশের এলাকায় তার মতো জেদী লোক একটিও খুঁজে পাওয়া যায় না। আর যাই হোক, মনসাকে সে পুজো দেবে না। শিব থেকে সে পেয়েছে ‘মহাজ্ঞান’ মন্ত্র। সেই মন্ত্রবলে মনসা যতবারই পূজা নিতে আসেন, চাঁদ সওদাগর তার সকল জল্পনা-কল্পনা বানচাল করে দেন। মনসা একদিন ছলে-বলে-কৌশলে সেই মন্ত্রখানা হাত করে নিলেন সওদাগরের কাছ থেকে। হারিয়ে গেলো রক্ষাকবচ। ধন্বন্তরী নামে চাঁদের এক বাল্যবন্ধু ছিল, তার ছিল অলৌকিক সব শক্তি। এই ধন্বন্তরীর সাহায্যে এই যাত্রা রক্ষা পায় চাঁদ, কিন্তু মনসার কোপানলে ধ্বংস হয়ে যায় ধন্বন্তরী।

বাড়িতে ফিরতি পথে সমুদ্রে ঝড় উঠলো। চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা মধুকর ভেসে গেলো জলে। অর্থ-বিত্ত সবই হারালো সে। হারালো সঙ্গীসাথী সবাইকে। শুধু প্রাণখানা সাথে নিয়ে পথে পথে সে ঘুরতে লাগলো ফকির হয়ে। তবু চাঁদের জেদ, মনসাকে কিছুতেই পূজা করবে না সে। সে যে মহা শিবভক্ত! অন্যের পূজা করে কী করে? অনেক সাধনা করে আবার শিবকে তুষ্ট করে, বর পেলো চাঁদ সওদাগর। মহাদেবের আশীর্বাদে ধীরে ধীরে সবকিছু ফিরে পেতে থাকলো সে। সংসারে আবার দেখা দিলো সুখের দিন। চাঁদ আর সনকার কোল আলো করে জন্ম নিলো সপ্তম পুত্র লখিন্দর। ছয় ছেলেকে তো সওদাগর আগেই হারিয়েছে। রইলো বাকি এক। ছোট্ট ছেলে লখিন্দর। সেই একই সময়ে উজানীনগরের আরেক ধনী পরিবারে, চাঁদ সওদাগরেরই বন্ধু সয়া বেনের ঘরে জন্ম হলো ফুটফুটে সুন্দর এক কন্যার। তার নাম রাখা হলো বেহুলা। ছোটবেলা থেকেই বেহুলা-লখিন্দর একে অন্যের সাথে হেসেখেলে বেড়ায়। দুই পরিবারেও ভারি ভাব-ভালোবাসা।

দুজনেই যখন বড় হয়ে উঠলো, বেহুলার সাথে বিয়ে ঠিক হলো চাঁদ সওদাগরের সর্বশেষ জীবিত পুত্র লখিন্দরের। হিন্দু বিয়ের আগে তো কুষ্ঠি-ঠিকুজি মিলিয়ে দেখা হয়। বেহুলা-লখিন্দরের বিয়ের আগেও এর অন্যথা হলো না। কিন্তু বিধি বাম! কুষ্ঠির এমনতর ফলাফল আগে কেউ দেখেনি যে। ভাগ্যগণনা করে জানা গেছে যে বিয়ের রাতেই সাপে কাটবে তরুণ যুবা লখিন্দরকে, কিন্তু বিধবা হবার কথা লেখা নেই বেহুলার ভাগ্যে। তবে কী করা যায়? সাতপাঁচ ভেবে এই বিয়ে দেয়াই ঠিক কাজ ভাবলো সকলে। আর এমনিতেও বর-কনে দুজনেই মনসাকে খুব ভক্তি করে। হয়তো দেবী দয়া করবেন।

কিন্তু দেবীর রাগ হার মানালো স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালকে। বিয়ের রাত এলো অবশেষে বেহুলা-লখিন্দরের। চাঁদ সওদাগর দেবীকে পরাস্ত করতে আরেক ফন্দি আঁটলো। ছেলে, ছেলেবৌর জন্য সে এক দক্ষ কারিগরকে দিয়ে তৈরি করালো লোহার বাসরঘর। যাতে থাকবে না একটি ফাঁকফোঁকরও। সাপে যে কাটবে, সাপ আসবে কোনদিক দিয়ে?

কিন্তু সওদাগরের এই চক্রান্ত জানতে দেরি হলো না মনসারও। যে কারিগর এই ঘর বানাবে, তারই স্বপ্নে আসলেন দেবী। কারিগরকে ভয় দেখিয়ে বললেন, সেই ঘরটিতে যেন একটি সুতা প্রবেশের মতো ফাঁক রাখে সে। কারিগর ভাবলো, এক সুতা জায়গা দিয়ে কীইবা হবে? দেবীর কথাও রাখা হলো। সওদাগরের কথাও। দুই কথাই রাখতে গিয়ে, নিজের প্রাণটাও বাঁচাতে গিয়ে কারিগর দেবীর কথামতো কাজ সারলো। তৈরি হলো লৌহবাসর। চারদিকে শীতল লোহা। আর মাঝখানে নবদম্পতি। সুতার মতো দেহ নিয়ে, সুতানাগ হয়ে দেবী মনসার দূত কালনাগিনী সেই বাসরে প্রবেশ করলো। ঘুমন্ত লখিন্দরকে ছোবল মারলো সে। প্রাণ হারালো লখিন্দর।

সকালে ঘুম থেকে উঠে বেহুলা দেখে পাশে শুয়ে আছে মৃত স্বামী। কী করবে সে এখন? ওদিকে সাপে কাটলে গাঁয়ের লোকে কলাগাছের ভেলায় ভাসিয়ে দেয়। লখিন্দরকেও তাই করলো। কিন্তু বেহুলা জেদ ধরলো, সেও যাবে সাথে। শুধু লখিন্দরের সাথেই যাবে না, বরং দেবলোকে গিয়ে ফিরিয়ে আনবে স্বামীর প্রাণ। সেই ভেলায় লখিন্দরকে পাশে নিয়ে বেহুলা বয়ে চললো ছয়মাসের দীর্ঘ এক সফরে। পথে আসে বহু বাধা-বিপত্তি। কিছুই তাকে থামাতে পারে না। স্বামীকে বাঁচানোর শপথে সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

এমনই করে, ছয় ছয়টি মাস পর বেহুলার ভেলা এসে থামলো নিতার ঘাটে। অনেকে তাকে আদর করে মা নেতো বলেও ডাকে। তিনি ভাগ্যক্রমে ছিলেন দেবী মনসারই পালক মা। পালক কন্যার অভিশাপে এমন বিপদে পড়েছে এই সতীসাধ্বী বেহুলা, দেখে বড় মায়া হলো মা নেতোর। বেহুলাকে তিনি বললেন, ”এসো আমার সাথে। তোমাকে আমি নিয়ে ইন্দ্রের সভায়। সেখানে গেলে নিশ্চয় তোমার স্বামীর প্রাণ ফিরে পাবে।” এরই মাঝে পচন ধরেছে লখিন্দরের শরীরে। সেই পচাগলা দেহ নিয়েই মা নেতোর সাহায্যে বেহুলা পৌঁছে গেলো স্বর্গলোকে, দেবরাজ ইন্দ্রের সভায়। সেখানে সে এতই ভালো নাচলো যে উপস্থিত সকলে মুগ্ধ হয়ে গেলো। কেনই বা হবে না, আগের জন্মে বেহুলা যে ছিল স্বর্গেরই নর্তকী! আগের জন্মে তার নাম ছিল উষা, আর লখিন্দর ছিল স্বর্গ-নর্তক অনিরুদ্ধ। এই জুটিকে মা মনসা পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন তার জন্যই পুজো আনতে। দেবতার লীলা বোঝা বড় ভার!

এ জন্মে বেহুলার সৎসাহস আর ভালোবাসার কাছে হার মানতে হয় স্বয়ং দেবী মনসাকেও। তিনি একটি শর্তে চাঁদ সওদাগরের মৃত ছয় পুত্র ও লখিন্দরের প্রাণ ফিরিয়ে দেন। মনসার পূজা করতে হবে মহাজেদী চাঁদ সওদাগরকে। তবে সওদাগরও ভাঙবে, কিন্তু মচকাবে না। এমনিতেও মনসা অনেক ক্ষতি করেছে তার। এত সহজে কীভাবে ভুলবে সে? তাই পূজার শর্তে রাজি হলেও সেই পুজো সে দিলো, উল্টো হাতে। দেবীর মনে রাগ হলেও দয়ার কমতি নেই। তিনি মাফ করে দিলেন সওদাগরকে। সেই উল্টো হাতের পুজো নিয়েই ফিরলেন দেবলোকে। সেই থেকে মনসা শুধু স্বর্গের নয়, হলেন মর্ত্যেরও দেবী।

এখনো চট্টগ্রামে আছে চাঁদ সওদাগরের দিঘি, বগুড়ায় আছে বেহুলা-লখিন্দরের সেই অভিশপ্ত বাসরের ধ্বংসস্তুপ। পুরাণের ইতিহাস পুরনো হয়ে গেলেও নতুন সুরে এখনো পৃথিবীর লোকে স্মরণ করে বেহুলার পতিপ্রেম আর চাঁদ সওদাগরের জেদের কথা, ভেলায় ভাসানো আবহমান বাংলা নারীর লড়াইয়ের গল্প।