Cover illustration for চন্দ্রমুখী পুঁথি

চন্দ্রমুখী পুঁথি

CATEGORY
Puthi Literature

BASED ON THE BOOK

চন্দ্রমুখী

by মুহাম্মদ খলিল

আগেতে আল্লার নাম মনেতে করিআ।।

চন্দরমুখির কথা শুন মন দিআ

মিছির নগরে রাজা নামে পুরবেশ্বর।।

তান ঘরে হইলা পুতরু গুলশুনাহর

গন্দরব্ব নগরে রাজা নামে বড় শুখি।।

তান ঘরে হইলা কইনা নামে চন্দরমুখী

রাজার কুমার একদিন হরিণ শিকারে বনে গেল। সেখানে গিয়ে একখানা হরিণ দেখে সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল, শিকারের কথা আর মনে থাকলো না। তখন হরিণের রূপ ছেড়ে বেরিয়ে এলো রাজকুমারী চন্দ্রমুখী। কুমারের রূপ দেখে সেও মন দিয়ে বসলো। যাবার বেলায় বলে গেল, “আমি গন্ধর্ব নগরের রাজকুমারী। আমার নাম চন্দ্রমুখী। যদি আমায় পেতে চাও, তাহলে আমার রাজ্যের খোঁজে এসো।” এই বলে কোথায় ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেল চাঁদের আলো ছড়ানো চন্দ্রমুখী।

এরপর রাজকুমারকে আর দেখে কে! প্রিয় বন্ধু উজিরকুমার জগম্বরকে সঙ্গে করে তক্ষুনি বেরিয়ে পড়লো গন্ধর্বনগরের উদ্দেশে। বেস কয়েকদিন সময় লাগলো। এরপর ক্লান্ত পায়ে যখন তারা পৌঁছুলো নতুন রাজ্যে— তখন মনে হলো, এত সুন্দর জায়গা তারা আগে কখনো দেখেনি।

প্রতি বাড়িতে গানবাজনায় ভরপুর। লোকের ঘরে ঘরে দুধ, দই, ঘিয়ের গন্ধে ম ম করছে। কেউ এখানে এক কাপড় দুবার পরে না—- এমনই প্রাচুর্য সে রাজ্যের।

এক মালিনীর বাড়ি গিয়ে তারা উঠলো বিশ্রাম নেবার জন্য। সেখানে মালিনী বেশ আদর-যত্ন করলো। এরপর তারা মালিনীকে বললো তাদের পাঁয়তারার কথা। তারপর মালিনীর ফন্দিতে এক বিশাল সুড়ঙ্গ খোঁড়া হলো রাজকুমারীর শোবার ঘরে। গভীর রাতে গুলশুনাহর সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে দেখতে গেল চন্দ্রমুখীকে। দেখে, শুয়ে আছে বিশাল এক রত্নখচিত পালঙ্কে। চারিদিকে দাসীদের ছড়াছড়ি। সুড়ঙ্গ দিয়ে এসেছিল, তাই বড় পিপাসা পেয়েছিল। সামনে জলের পাত্র দেখে এক ঢোকে সব জল খেয়ে নিল। এরপর একটু সাহস করে সে পালঙ্কের এক কোণে বসলো। পানের বাটা থেকে তিন-চারটে পানও খেল রাজকুমার, আর এই পুরোটা সময়ই সে দু চোখ ভরে দেখলো রাজকুমারীকে।

চন্দর জিনি মুখ খানি মনির মতন

রতন ওলংকার গলে করে ঝলমল।।

রাত তখন প্রায় ভোর ভোর। হঠাৎ করে নড়ে উঠলো রাজকুমারী। এই দেখে গুলশুনাহর ভোঁ দৌড় দিয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকে গেল, কেউ বুঝতেও পারলো না। কিন্তু রাজকুমারীর ঘুম ভাঙার পর মনে হতে থাকলো, তার পালঙ্কে কেউ বসেছিল নিশ্চয়ই। তখন সে উঠে দাসীদের জিজ্ঞেস করলো, “কে এসেছিল আমার ঘরে, এমন করে ঘুমের ঘোরে?” তখন একজন দাসী মুচকি হেসে জবাব দিল, “কুলুঙ্গিতে পানি নেই, পানের বাটায় পান নেই। কে এসে সব নিয়ে গেল বলো– রাজকুমারীর ঘুমখানাও?”

রাজকুমারীকে চিন্তিত দেখে তখন আরেক দাসী বলে উঠলো, “এমন প্রাচীর ডিঙিয়ে কি আর সাধারণ মানুষ আসতে পারে? নিশ্চয় সে কোনো জ্বিন কিংবা পরী।”

সে রাত এমনি এমনি গেল। পরের রাতে রাজার কুমার আবার এলো ঘরে। চুপিচুপি, সুড়ঙ্গ দিয়ে। কিন্তু এবারে রাজকুমারী ঘুমায়নি। ঘুমের ভান করে পড়ে ছিল, যাতে হাতেনাতে চোর ধরতে পারে। যখনই রাজকুমার পানি খেয়ে, পানের বাটা নিয়ে পালঙ্কে বসলো, তখনই একটুখানি চোখ খুলে রাজকুমারী দেখলো। এরপর দ্বিতীয়দিনে রাজকুমারের সাহস বেড়েছে। সে হাতখানা এগিয়ে নিয়ে যেই না চন্দ্রমুখীর আঙুলের আংটিতে ধরেছে, ওমনি জেগে উঠলো রাজকুমারী। খপ করে ধরে ফেললো রাজকুমারের হাত— “কে তুমি অচিন নন্দন, কোথা হতে এলে? কী চাই তোমার বলো, তুমি কাদের বাড়ির ছেলে?”

সেক্ষণে রাজকুমার একে একে সব কথা খুলে বললো। বনের হরিণ, হরিণের কুমারী— ভিনদেশে চলে এসে মালিনীর বাড়ি; কিছুই বাদ গেল না।

মন তো দেওয়া-নেওয়ারই কথা ছিল, তাই সময় বেশি লাগলো না। মন গললো চন্দ্রমুখীরও। রাজার মেয়ে, রাজার ছেলে– বিয়ে দিতে কারো আপত্তি হবারও কথা না। তাই বেশ ধুমধামেই বিয়ে হলো দুজনার। বাজলো সানাই, বাদ্যি-বাজনা, প্রজাদের হরহামেশাই মাফ হয়ে গেল কত না খাজনা। এরপর থেকে গুলশুনাহর থাকে গন্ধর্বনগরের রাজমহলে, বন্ধু উজিরকুমারের সঙ্গেও তেমন একটা দেখাশোনা হয় না। তার সমস্ত দুনিয়া জুড়ে শুধু চন্দ্রমুখীরই জাদু ছেয়ে থাকে।

কিন্তু রাজকুমারীকে পেয়ে ছেলে তার বাড়িঘর ভুলে গেলেও বাপমা কি আর পারে? গুলশুনাহরের বাবা, রাজামশায় পুরবেশ্বরের তো দিন কাটে খেয়ে না খেয়ে। সবদিকে ছেলের খোঁজে লোক পাঠিয়ে দিয়েছেন। বেশ অনেকদিন পর খবর পেলেন, ছেলে নাকি গন্ধর্বনগরে! সৈন্যসামন্ত নিয়ে ছুটলেন ওদিকেই। ওখানে গিয়ে দেখেন, মালিনীর বাড়িতে শুধু একা উজিরকুমার জগম্বর। রাজাকে দেখে তার পায়ে পড়ে কাঁদে উজিরের ছেলে। বলে, “রাজামশায়, বড্ড ভুল হয়ে গেছে আমার রাজকুমারের কথা শুনে। কী এক মায়ায় পড়েছে বন্ধু আমার, আমার সাথেও মাসের পর মাস দেখা নেই– কথা নেই।”

এই কথা শুনে রাজা কিছু লোকজন জগম্বরের কাছে রেখে দেশে ফেরত গেলেন। বলে গেলেন, যদি ছেলে ফিরে আসে— তবে তাকে নিয়ে যেন চটজলদি বাড়িতে ফেরে সে।

আরো কয়েক মাস এমনি করেই গেল। মালিনীর বাড়িতে পড়ে থাকলো জগম্বর আর আর রাজার লোকজন। অনেকদিন পর গুলশুনাহরের খেয়াল হলো বন্ধুর কথা। মন টানলো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। এসে দেখে, তার বাবার রাজ্যের লোকজন বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। বন্ধুর সাথে এতদিন পর দেখা হলো। অনেক গোপন কথাই বেরিয়ে এলো। উজিরকুমার বুঝতে পারলো, বন্ধু যে কথা ভেবে এত প্রেমের টানে এখানে এসেছিল— তাতে বুঝি কিছুটা ভাটা পড়েছে। চেহারায় আগের সেই পাগলামি নেই, চোখ আগের মতো ঝলমল করে উঠছে না।

তখন সুযোগ বুঝে আলাপের এক পর্যায়ে রাজকুমারকে জগম্বর বললো, “একটা কথা বলি বন্ধু, কিছু মনে করো না। কী এমন এই রাজকুমারী– তার জন্য তুমি নিজের বাপ-মা, ঘরবাড়ি, নিজের রাজ্য ছেড়ে এখানে পড়ে আছ? চন্দ্রমুখী ছাড়া এখানে তোমার কেইবা আছে?” প্রথমে গাঁইগুঁই করে তারপর কান্না কান্না মুখে রাজকুমার বললো, “কী করে ছাড়াই এ মায়া আমি? সারা দিনরাত সে আমায় এক পলকের জন্যও চোখের এদিক-ওদিক করে না। এই যে এসেছি, তাও কত ফন্দি করে। রাতে ঘুমালে সে আমাকে বেঁধে রাখে, আর নয়তো নিজের হাতের আঙুল আমার মুখে রেখে দেয়। পালানোর উপায় নেই বন্ধু। যেতে তো আমিও চাই। কিন্তু কীভাবে?”

এই বলে গালে হাত দিয়ে দুই বন্ধু বসে থাকলো। ঘড়িতে সময় এগোতে লাগলো। রাজকুমারেরও চন্দ্রমুখীর কাছে ফিরে যাবার সময় হয়ে এলো।

কী মনে হয় পাঠক আপনাদের? রাজকুমার গুলশুনাহর কি গন্ধর্বনগর থেকে পালিয়ে নিজের রাজ্যে যেতে পারবে? জগম্বর কি তাকে সাহায্য করবে? আর চন্দ্রমুখী— সেইবা এত সহজে রাজকুমারকে যেতে দেবে?

বন্ধুর কাছ থেকে ফেরার পর থেকেই রাজকুমার গুলশুনাহর ফন্দি করতে লাগলো, কীভাবে পালানো যায়। কী অদ্ভুত বিধির খেলা— একদিন যার জন্য ঘরদোর ছেড়ে বিবাগী হয়েছিল, আজ তাকেই মনে হয় গলার কাঁটা। তাইতো সে বন্ধুকে বলে রাত্রেবেলা ঘাটে নৌকা বেঁধে রাখতে। চন্দ্রমুখী ঘুমিয়ে পড়লে চুপিসারে সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে সে চলে যাবে মহলের বাইরে। আর ফিরবে না।

যে-ই ভাবা, সেই কাজ। সে রাতেই চন্দ্রমুখী ও গন্ধর্ব নগরের রাজমহল ছেড়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল ভিনদেশী রাজকুমার গুলশুনাহর, সাথে বন্ধু জগম্বর।

এদিকে সকালে ঘুম থেকে উঠে চন্দ্রমুখীর তো যায় যায় দশা। কোথায় তার প্রাণপ্রিয় বর? রাতের আঁধারে সে কি এতই ঘুমিয়েছে যে একটু টেরও পেল না— চলে গেছে তার গুলশুনাহর?

আহা পতি পরানেশ্বর

চন্দর জিনি রুপ তর

পেরম ঝাটি দিআ গেলে বুকে ।।

না দেখি বন্দু আর মুখ

হিআ মর টুক টুক

ওনাথিনি করি গেলাএ মরে।

যে সুড়ঙ্গ দিয়ে রাজকুমার পালিয়েছিল, সেই সুড়ঙ্গপথেই চন্দ্রমুখী রওনা দিল। ছিঁড়ে ফেললো গায়ের সব গয়নাগাটি, সুড়ঙ্গে পড়ে রইল গজমতির মুক্তা। মালিনীর বাড়ি গিয়ে সে রাজকুমারের খোঁজ করে জানতে পারলো, অনেক আগেই এ বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে দুই বন্ধু।

চন্দ্রমুখী পাগলের মতো বেশ নিয়ে কোনোমতে নদীর পাড়ে গেল, গিয়ে দেখে একটা নৌকা যাচ্ছে কিনারার ধার দিয়ে। অনেক কেঁদেকেটে, মাঝিকে বুঝিয়েশুনিয়ে সে নৌকায় উঠলো। নৌকায় সে এক দরবেশের রূপ নিল, যাতে কেউ না বুঝতে পারে সে আসলে কে। এরপর এক ঘাটে নৌকা ভিড়লো। সেখানে চন্দ্রমুখীর দেখা হলো তার বর— রাজকুমার গুলশুনাহরের সাথে।

তারে দেখি জুবরাজ পুছিল বচন।।

কথা হনে আইশ ভাই দরবেশ লইখন।

তখন চন্দ্রমুখী তাকে বললো, “আমার নাম শাহা শইক্কা। আমি এতদিন গন্ধর্বনগরে ভিক্ষা করে খেতাম। আজকে আমি শুনতে পেলাম, কে যেন নদীর পাড়ে কান্না করছে। সে কান্না শুনে নিজেকে আর থামাতে পারলাম না, চলে এলাম এইখানে।”

তখন যুবরাজ হাত জোড় করে দরবেশরূপী চন্দ্রমুখীকে বললো, “দয়া করে আমার ডিঙায় আসুন হুজুর। আমিও বড় একা, মনের ব্যথায় বাঁকা।”

চন্দ্রমুখীকে সে বলতে লাগলো, তার নিজেরই কথা—

চন্দরমুখি নামে এক রাজার নন্দিনি।।

পরম শুন্দর কইনা ভুবন মুহিনি

কাহারে কহিমু আমি তাহার বাখান।।

তিরভুবনে নাই দেখি তাহার শমান

তাহার শনে ছিল মর ওনেক পিরিতি।।

শইত্ত ভংগ হইআ হইল এতেক দুরগতি

এ কথা শুনে শাহা শইক্কা বললো, এমন ভালো রাজকন্যাকে ছেড়ে সে কোথায় চলেছে একা একা? কী ছিল রাজকুমারী দোষ, কী তার অভিযোগ?

তখন রাজকুমার বললো, সবই তার বন্ধুর দোষ। সেই তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে চন্দ্রমুখী থেকে দূরে নিয়ে এসেছে। এ কথা শুনে ওদিকে জগম্বর মুচকি মুচকি হাসে, আর তাকে দেখে চন্দ্রমুখীর বুক জ্বলে যায়। চন্দ্রমুখী শাহা শইক্কার বেশে কুমারকে বলে, “কেঁদো না বাছা, আমি বলছি তোমাকে, নিশ্চয়ই তোমার প্রিয় চন্দ্রমুখীর সাথে দেখা হবে।

এরপরে গুলশুনাহর নিজের রাজ্যে গেল। সেখানে তাকে ফিরে পেয়ে রাজ্যের সকলে আনন্দে মেতে উঠলো। চারদিকে বাদ্য বাজছে, চারদিকে আলোর রোশনাই। এরপরে রাজা মশায় ছেলেকে এক ইন্দ্রের এক পরীর সঙ্গে বিয়ে দিলেন। তখন রাজকুমার বললো, “আমার সঙ্গে শাহা শইক্কাও যাবে।” কিন্তু চন্দ্রমুখীকে বাইরে রেখেই রাজকুমার ইন্দ্রের আবেশ্বরীর সঙ্গেই থাকলো। তখন চন্দ্রমুখী একলা এক ঘরে গিয়ে দরবেশের বেশ খুলে বললো। সাজতে লাগলো এক নতুন সাজে। তারপর সে একা একা বসে কাঁদতে লাগলো।

নএআনে কাজল পএরে শিরেতে শিন্দুর।।

দুই পাএ শুভে তান চরনে নেপুর

এই মতে চন্দরমুখী শিংগার করিআ।।

বিলাপ করিআ কান্দে পালংগে বশিআ

সকালে কুমার ঘুম থেকে উঠে দরবেশের খোঁজ নেয়। কিন্তু পায় না। তারপর গিয়ে দেখে ঘরের কোণে চন্দ্রমুখী কাঁদছে। এরপর দুজনে মিলে কাঁদতে কাঁদতে নিজের জীবন দিয়ে দিল। ওদিকে ঘুম থেকে উঠে আবেশ্বরী রাজকুমারকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু কোথাও সে নেই। তারপর মহলের এক কোণে সে এসে দেখে, দরবেশ তো নয়— এ এক সুন্দরী রাজকুমারী, অন্যদিকে রাজার কুমার গুলশুনাহর। দুজনেরই ধড়ে প্রাণ নেই। প্রেমের শোকে মরেছে একসাথে। এই না দেখে আবেশ্বরী বুক ফেটে কান্না করতে লাগলো। তার কান্নার শব্দ শুনে রাজ্যের লোক জড়ো হলো। তখন সেও কাঁদতে কাঁদতে সেখানেই মারা গেল।

এরপর রাজামশায়ের বহু প্রার্থনাতে খোদার দয়ায় তিনজনের প্রাণ ফিরে আসে। এরপর রাজকুমার গুলশুনাহর, চন্দ্রমুখী ও ইন্দ্রের আবেশ্বরী— এরা তিনজনে মিলে একসাথে থাকে। কিন্তু তার পরে গুলশুনাহর চন্দ্রমুখীকে নিয়ে পালিয়ে যায় গন্ধর্ব মগরে। রাজা-রানি মেয়ে আর মেয়েজামাইকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে বাস করতে থাকে। মহলে পড়ে থাকে আবেশ্বরী। তার কান্নায় মহলের দেয়ালও মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে। আর কোনোদিন তার সাথে রাজকুমারের আর দেখা হয়নি।