ভাটির দেশে ধনেশ্বর নামে এক সওদাগর ছিলেন। তার এক পুত্র, আর এক কন্যা। কন্যার নাম কাজলরেখা। দশ বছরে পা দিতেই কন্যার আর রূপ ধরে না। কাজল রেখার বয়স যখন ১০ বছর তখন তার ছোট ভাই রত্নেশ্বরের বয়স চার বছর। পিতা ধনেশ্বরের ছিল জুয়া খেলার অভ্যাস। জুয়া খেলতে গিয়ে এক সময় তার সব ধন সম্পদ হারিয়ে যায়। সওদাগরীর ১২ ডিঙা ভরা ধন-দৌলত সব ফুরিয়ে যায়। ফকির হয়ে সে দেশে দেশে ঘুরতে থাকে। অর্থাভাবে সে তার ১০ বছরের কন্যা কাজলরেখাকে বিয়ে দিতে পারে না। তখন এক সন্ন্যাসী এসে ধনেশ্বরকে একটি শুকপাখি এবং একটি মূল্যবান আংটি দিয়ে বলে- এই শুকপাখির কথা মতো কাজ করলে সে তার সব হারানো সম্পদ ফিরে পাবে।
শুকপাখির কথা মতো কাজ করে সওদাগর তার সব হারানো সম্পদ ফিরে পায়। এদিকে কাজলরেখা ১১ বছরে পা দিয়েছে। তার বিয়ে নিয়ে সওদাগর অস্থির হয়ে ওঠে এবং শুকপাধির কাছে কাজলরেখার ভবিষ্যত জানতে চায়। শুকপাখি বলে, তার কপালে দুঃখ আছে। এই মেয়ের যার সাথে বিয়ে হবে সে একজন মৃত ব্যক্তি। তাই মেয়েকে ঘরে না রেখে বনবাসে পাঠানো দরকার। সবশুনে ধনেশ্বর বিলাপ করতে থাকে কিন্তু কোন উপায় নেই শুকপাখির কথা মান্য করা তার জন্য অপরিহার্য।
ধনেশ্বর একটা নৌকা নিয়ে কাজলরেখাকে সহ বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বের হয়। লৌকা যখন গভীর জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করে কাজলরেখার মনে তখন সন্দেহ জাগে। এদিকে কাজলরেখার জল পিপাসা পায়। জঙ্গলের মধ্যে একটা ভাঙা মদিরের পাশে নৌকা রেখে তার বাবা ধনেশ্বর জলের সন্ধান করতে থাকে। মন্দির দেখে কাজলরেখার কৌতূহল জাগে। সে মন্দিরের দরজায় হাত দিতেই, দরজা খুলে যায়। কাজলরেখা মন্দিরে প্রবেশ করার পরই আবার মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও কাজলরেখা দরজা খুলতে পারে না। ধনেশ্বর জল নিয়ে এসে মেয়েকে না দেখে ডাকাডাকি করতে থাকে।
কাজলরেখা মন্দিরের ভেতর থেকে বাবার ডাকে সাড়া দেয়। কিন্তু সে মন্দির থেকে বের হতে পারে না। কাজলরেখার বাবা ধনেশ্বরও অনেক চেষ্টা করে দরজা খুলতে পারে না। দরজা ভাঙার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। কাজলরেখার বাবা জানতে চায়-ভেতরে সে কী দেখছে?
কাইন্দা কাজলরেখা বাপেরে কয়,
এক আছে মৃত কুমার সে যে শুইয়া রয়।
মৃত কুমারের সারা দেহেই সূঁচ ফুটানো এবং তার মাথার পাশে ঘি’য়ে ভেজা বাতি জ্বলছে। ধনেশ্বর বুঝতে পারে-শুকপাখি তাকে এই কথাই বলেছিল। সওদাগর বলে-
সওদাগর ডাইক্যা কয়,
পরানের ঝি তোমার কপালে দুঃক্ষু
আমি করবাম কী।
ধনেশ্বর জানিয়ে দেয়- ওই মৃত কুমার ই তার স্বামী।
বনের মধ্যে মৃত মানুষের পাশে কাজলরেখাকে ফেলে আসতে তার বাবার বুক ফেটে যায়। কিন্তু অসহায় পিতা নিরুপায় হয়ে ঐখানে মেয়েকে রেখে আসে। একসময় সেই মন্দিরে এক সন্ন্যাসীর আগমন ঘটে এবং সন্ন্যাসীর ছোঁয়ায় মন্দিরের দরজা খুলে যায়। কাজলরেখা সন্যাসীর পা ধরে কাঁদতে থাকে। সন্যাসী তাকে অভয় দিয়ে বলে, মৃত কুমার একজন রাজার ছেলে। তার গায়ে যেগুলো সূঁচ ফোটানো আছে সেগুলো তুলে তার দেওয়া গাছের পাতার রস রাজকুমারের চোখে মেখে দিলেই তিনি প্রাণ ফিরে পাবেন। সন্যাসী সাবধান করে দিয়ে বলেন, কোনোভাবেই রাজকুমারের কাছে নিজের পরিচয় দেওয়া যাবেনা তাহলে রাজকুমার মারা যাবে। প্রয়োজনে শুকপাখি তার পরিচয় তুলে ধরবে তবুও নিজে থেকে পরিচয় দেওয়া যাবেনা। এই বলে সন্যাসী মন্দির ত্যাগ করে।
কাজলরেখা সন্ন্যাসীর কথা মতো ৭ দিন ৭ রাত ধরে বসে বসে মৃত রাজকুমারের সূঁচ তুলতে থাকে। এই ৭ দিন তার গোসল করা হয়নি। তাই চোখের সূচ খোলার আগে কাজলরেখা পুকুরে স্নান করতে যায়। সেখানে স্নান করার সময় এক লোক কাজলরেখার কাছে পেটের দায়ে তার ১৩/১৪ বছরের মেয়েকে বিক্রির প্রস্তাব দেয়। মেয়েটিকে কাজল রেখা তার হাতের কঙ্কনের(চুড়ি) বিনিময়ে কিনে নেয় এবং নাম রাখে কঙ্কন্দাসী। কাজলরেখা সরল বিশ্বাসে কঙ্কনদাসীকে বলে- মন্দিরে এক মৃত রাজকুমার আছে। তার চোখের সূচ খুলে পাতার রস দিলেই সে প্রাণ ফিরে পাবে। কাজলরেখা কাঞ্চনদাসীকে মন্দিরে গিয়ে পাতার রস ঠিকঠাক করে রাখতে বলে। কিন্তু কঙ্কনদাসী মন্দিরে রাজকুমারের চোখের সূচ খুলে পাতার রস দিতেই রাজকুমার জেগে উঠে। রাজকুমার চোখ খুলতেই কঙ্কনদাসী তাকে বিয়ে করতে বলে এবং রাজকুমার তাকে বিয়ে করবে বলে প্রতিজ্ঞা করে।
ঠিক সেই মুহুর্তেই স্নান সেরে কাজলরেখা মন্দিরে প্রবেশ করে। কাজলরেখাকে দেখে রাজকুমার তার পরিচয় জানতে চায়। কঙ্কনদাসী মিথ্যা করে বলে- কঙ্কনে কিন্যাছি ধাই নাম কঙ্কনদাসী। সন্ন্যাসী কাজলরেখাকে নিজের পরিচয় দিতে বারণ করায় কঙ্কনদাসীর এই প্রতারণায়ও কাজলরেখা নিজের পরিচয় গোপন রাখে। এভাবে কঙ্কনদাসী হয়ে যায় রাণী আর কাজলরেখা হয়ে যায় তার দাসী। কাজলরেখা যাতে রাজকুমারের কাছে নিজের পরিচয় নিতে না পারে সেজন্য কঙ্কনদাসী সবসময় তার দিকে খেয়াল রাখে। কিন্তু কাজলরেখার রূপ আর আচার আচরণে মুগ্ধ হয় রাজকুমার। রূপে গুণে মুগ্ধ হয়ে সূচ রাজকুমার কাজলরেখাকে মনের গোপন কথা খুলে বলে-
তোমার সুন্দর রূপলো কন্যা চান্দ লাজ পায়, তাড়াইয়ো না কন্যা মোরে লো আমার প্রাণ যায়।
অন্যদিকে নকল রাণীর স্বভাব-চরিত্র, কথা-বার্তা, আচার-আচরণে বিরক্ত হয়ে মনের দুঃখে রাজা দেশ ভ্রমণে যায়। দেশ ভ্রমণে বের হওয়ার সময় রাজকুমার নকল রাণীর কাছে কী কী লাগবে তা জানতে চায়। নকল রাণী বেতের কুলা, কাঠের ঢেকি, পিতলের নথ আনতে বলে। অন্যদিকে রাজা কাজলরেখার জন্য কী আনবে তা জানতে চাইলে কাজলরেখা একটি ধর্মমতি শুকপাখি আনতে বলে। নকল রাণীর চাওয়া জিনিসপত্র খুব সহজে পেয়ে গেলেও কাজলরেখার শুকপাখি পেতে রাজার বেশ বেগ পেতে হয়। অনেক কষ্টে একটা শুকপাখি সংগ্রহ করে রাজা দেশে ফেরেন। এদিকে রাজার অনুপস্থিতিতে নকল রাণীর হুকুমে মন্ত্রী রাজ্য চালাতে গিয়ে রাজ্যের ক্ষতি হয় এবং শেষ পর্যন্ত কাজলরেখার পরামর্শে সেই বিপদ থেকে রাজ্য উদ্ধার পায়। এটা জানতে পেরে নকল রাণী সম্পর্কে রাজার মনে গভীর সন্দেহ সৃষ্টি হয়।
রাজা ও তার মন্ত্রী মিলে নকল রাণী ও কাজলরেখাকে রান্নাবান্না ও আঁকাআঁকির বিভিন্ন বিষয়ে পরীক্ষা করেন এবং কাজলরেখা কোন উচ্চ বংশের মেয়ে বলে প্রমাণিত হয়। এদিকে কাজলরেখার রূপে গুণে মুগ্ধ হয় রাজকুমারের বন্ধু। কাজলরেখাকে পাওয়ার জন্য সে মরিয়া হয়ে উঠে। নকল রাণীর সাথে সে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কাজলরেখার চরিত্র খারাপ- এটা প্রমাণ করার জন্য তারা কাজল রেখার শোবার ঘরের সামনে গোপনে সিঁদুর লাগিয়ে দেয় এবং রাজার বন্ধু সেই সিঁদুরের উপর চারটি পদচিহ্ন রেখে আসে। এসব দেখে রাজার মনে সন্দেহ হয়। রাজা কাজলরেখার কাছে এর কৈফিয়ত চায়। কাজলরেখা শুকপাখিকে সাক্ষী মানে। শুক পাখি বলে-
কপালে কইরাছে দোষ পড়িয়াছে দোষে,
কলঙ্কী বলিয়া কন্যায় দেও বনবাসে।
রাজকুমার তার বন্ধুর মাধ্যমে কাজলরেখাকে একটা দ্বীপ চরের মধ্যে নির্বাসনে পাঠায়। রাজকুমারের বন্ধু এই সুযোগে কাজলরেখাকে গভীর সমুদ্রে নিয়ে মনের গোপন কথাটি বলে এবং বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কাজলরেখা তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে সে বেপরোয়া হয়ে উঠে এবং নৌকা ঘুরিয়ে তার বাড়ির দিকে কাজলরেখাকে নিয়ে যেতে শুরু করে। অসহায় কাজলরেখা এই সময়ে প্রার্থনা জানায়- সতী নারী হই যদি সমুদ্রে দেউক চরা। কাজলরেখার প্রার্থনায় সমুদ্রে চর জাগে এবং সেই চরে ঐ নৌকা আটকে যায়। রাজার বন্ধু উপায়ান্তর না দেখে কাজলরেখাকে সেই জনমানবহীন চরে নামিয়ে দেয়। কাজলরেখাকে নামিয়ে দিলে নৌকাটি ভেসে উঠে সেই চর থেকে ছুটে যায় এবং রাজার বন্ধু তাকে একা রেখে নিজ গৃহে ফিরে যায়। এদিকে রত্নেশ্বরের বাণিজ্য জাহাজ ঝড়ের কবলে পড়ে সেই জনমানবহীন চরে এসে আটকে যায়। এই শুন্য চরে কাজলরেখাকে দেখে সবাই বিস্মিত হয় এবং কাজলরেখাকে তেলে রত্নেশ্বর বাড়িতে নিয়ে আসে।
কাজলরেখার কাছে এই বাড়ি চিরচেনা মনে হয় এবং সে নীরবে কাঁদতে থাকে। কাজলরেখার কাছে মনে হয়- দীর্ঘ ১২ বছর পর সে আর পিতৃগৃহে ফিরে এসেছে। কিন্তু সে কিছু বলে না। রত্নেশ্বর কাজলরেখার রূপে মুগ্ধ হয় এবং কাজলরেখাকে সে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাব শুনে চমকে উঠে কাজলরেখা। বলে- বংশ পরিচয় জানা ছাড়া কাউকে বিয়ে করতে নেই। এ পরিচয় জানার জন্য সে সূচ রাজার কাছ থেকে শুকপাখি নিয়ে আসতে বলে। রত্নেশ্বর অনেক ধন-সম্পদসহ লোক পাঠায় শুকপাখি আনার জন্য। অন্যদিকে কাজলরেখাকে নির্বাসন দিয়ে সূচরাজার পাগলপ্রায় অবস্থা। সে দেশে দেশে কাজলরেখার সন্ধান করতে থাকে। রত্নেশ্বরের ধন সম্পদ ভর্তি নৌকা সূচ রাজার দেশে পৌছালে সম্পদের লোভে কঙ্কনদাসী শুকপাখিটি তাদের কাছে বিক্রি করে দেয়। শুকপাখি পেয়ে রত্নেশ্বর সারা দেশে ঢাক ঢোল পিটিয়ে দেয় যে- শুকপাখি কাজলরেখার বংশ পরিচয় বলবে এবং শর্তমতে সে কাজলরেখাকে বিয়ে করবে।
শুকপাখি কর্তৃক কাজলরেখার বংশ পরিচয় বলার এই আয়োজনে সূচ রাজাও এসে হাজির হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে শুক পাখির কথা শুনে রত্নেশ্বর বুঝতে পারে- কাজলরেখা আসলে তার হারিয়ে যাওয়া বোন। আনন্দে এবং একই সাথে লজ্জায় রত্নেশ্বর কাজলরেখার পা ধরে ক্ষমা চায় । পরে সূচ রাজার সাথে মহা ধুমধামে কাজলরেখার বিয়ে হয়। বিয়ের পর সূচ রাজা নিজের রাজ্যে ফিরে কঙ্কনদাসীকে বলেন- ভাটির রাজা রত্নেশ্বর তাদের বাড়ি লুট করতে আসবে এবং সেজন্য একটা গর্ত করে কঙ্কনদাসীর সব সম্পদ সেই গর্তে লুকিয়ে রাখতে বলে। কঙ্কনদাসী তার সম্পদ রক্ষার্থে সবার আগে গর্তের মধ্যে প্রবেশ করলে রাজার ইঙ্গিতে রাজার লোকজন কঙ্কনদাসীকে মাটি চাপা দিয়ে দেয়। এরপর সূচরাজা ও কাজলরেখা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।