Cover illustration for কমলা সুন্দরী

কমলা সুন্দরী

CATEGORY
Bengal Legend

BASED ON THE BOOK

উত্তরবঙ্গের কিংবদন্তি

by হুমায়ূন রহমান

৮ম শতাব্দীর শেষ দিকের কথা। বিশাল গৌড় সাম্রাজ্যে ভাঙন ধরে তখন চারিদিকে ছোট রাজ্যের উত্থান ঘটেছে। এসময় পুন্ড্রনগরের হর্তাকর্তা ছিলেন রাজা জয়ন্ত। প্রজাদরদী রাজাকে প্রজারাও খুব ভালোবাসতো।

ওদিকে একের পর এক রাজ্য জয় করে এবার গৌড়ের দিকে এগিয়ে আসছেন কাশ্মীররাজ বিনয়াদিত্য জয়াপীর। তিনি পুন্ড্রনগরে ঢুকলেন রাজ্য দখল করে নিতে। কিন্তু আক্রমণের আগে একটু যুদ্ধের ক্ষেত্রটা ভালো করে বুঝে নিতে চান। তাইতো রাতের অন্ধকারে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন ছদ্মবেশে। কেউই তাকে চিনতে পারছে না। তিনিও রাজ্যের হালচাল বুঝে যাচ্ছেন।

এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে জয়াপীর এসে দাঁড়ালেন স্কন্ধমন্দিরের আঙিনায়। সেখানে নাচ হচ্ছে, আশেপাশের সবাই মুগ্ধ দৃষ্টিতে সেই নাচ দেখছে। দেখবে নাইবা কেন? এ যে রাজ্যের সবচাইতে নামিদামি নর্তকী কমলা সুন্দরীর নাচ।

“তোমরা দেখো গো আসিয়া…

কমলায় নৃত্য করে থমকিয়া থমকিয়া!”

জয়াপীরও যোগ দিলেন তাদের সাথে। নাচের মুদ্রার সাথে ঘুঙুর বাজছে, বেজেই চলেছে। এমন এক সময় ঘুঙুর থামলো। নর্তকী এক খিলি পান সাজিয়ে তা তুলে দিলেন জয়াপীরের হাতে। রাজার স্বভাব, ছদ্মবেশেও তা চাপা পড়লো না। রাজার মতোই তার হাত থেকে পান নিলেন জয়াপীর। ব্যস! কমলা বুঝে গেল তার আসল বেশ। যদিও কাউকে বললো না সে। এক দেখাতেই জয়াপীরকে এত ভালো লেগেছে, তাকে বিপদে ফেলতে চায় না কমলা।

সেই রাতেই চুপি চুপি দেখা করলো তারা দুজনে। কমলার তার রাজ্যের প্রতি ভালোবাসার কোনো হিসেব নেই, এদিকে জয়াপীর সেই রাজ্যেরই শত্রু। তবু মন কি আর বারণ মানে? দুজনের মধ্যে ভালোবাসা যেন পুন্ড্রনগরের আকাশে সেদিন পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে আলো ছড়ালো। আর নর্তকী কমলা ফেঁসে গেল দেশপ্রেম ও ব্যক্তিপ্রেমের মাঝখানের এক শাঁখের করাতে। দুদিকেই লোকসান, দুদিকেই হারানোর বেদনা। কী করবে সে? কিছুই জানে না। শুধু জয়াপীরের চোখের দিকে তাকিয়ে সে শোনে এক আদিম ঘুঙুরের বাজনা।

ভাগ্যের কী লিখন, জয়াপীর যখন এ রাজ্যে ঢুকেছেন, ঠিক সেই সময়টাতেই রাজ্য জুড়ে এক বলশালী সিংহের দাপট। ছেলেবুড়ো সকলেই প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে। সিংহের ভয়ে রাজ্য জুড়ে কেউ ভালোমতো চলতে ফিরতে পারে না– পাছে পশুরাজ খাজনা মনে করে প্রাণখানা নিয়ে চম্পট মারে! এ বিপদের কোনো সমাধান না পেয়ে রাজা জয়ন্ত ঘোষণা করে দিলেন, যে এই সিংহকে বধ করতে পারবে– তার সাথেই দেবেন রাজকন্যার বিয়ে।

জয়াপীরের কানে এই খবর এখনো যায়নি। দেশ ও জয়াপীর, উভয়কে বাঁচাতে কমলা এক ফন্দি আঁটলো। জয়াপীরকে গিয়ে সে বললো, “এই সিংহকে মারতে পারে এমন লোক এ রাজ্যে আপনি ছাড়া আর কেউ নেই। আপনি সদয় রাজা, সিংহের হাত থেকে আমার দেশকে রক্ষা করুন!” কমলার কথা তো ফেলতে পারে না, তাই জয়াপীর এগিয়ে গেলেন। তার ইচ্ছে, সিংহ বধের পরই সাততাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাবেন।

সিংহকে কাবু করতে তার বেশি সময় লাগলো না। কিন্তু তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, কমলা তার নাম লেখা আংটিখানা সিংহের মুখে ছুঁড়ে মারলো। তখন বাঁকা হাসি হেসে জয়াপীর বললেন, “এই বুঝি দেশের শত্রুকে ধরিয়ে দেবার বুদ্ধি?” কমলা তার জবাবে কিছুই বললো না, শুধু কেঁদে বুক ভাসালো। এই দেখে জয়াপীরেরও মায়া হলো। সে রাতে তিনি আর নিজের রাজ্যে ফিরে গেলেন না।

সকাল হতেই ধুন্ধুমার অবস্থা। রাজ্যজুড়ে শোরগোল, সিংহ মারা পড়েছে! সিংহ বধ করেছে যে সাহসী বীর, তার খোঁজও মিলেছে। সে আর কেউ নয়, ‘কাশ্মীররাজ জয়াপীর!’ এবার আর কী– রাজা খুঁজে আনলেন আরেক রাজাকে। মনের খুশিতে মেয়ে কল্যাণ দেবীর হাত তুলে দিলেন জয়াপীরের হাতে। বিয়ের বাদ্যি-বাজনায় রোশনাই হলো পুন্ড্রনগরের রাত। ওদিকে স্কন্ধমন্দিরের আঙিনায় একটিও বাতি জ্বলেনি। নর্তকীর পায়ে আজ ঘুঙুর নেই। এলো কেশে সে লুটিয়ে রয়েছে। দেশ ও প্রেম– দুটোই বাঁচলো। শুধু মন ভাঙলো কমলা সুন্দরীর। যদিও পরে একবার জয়াপীর এসেছিলেন তার সাথে দেখা করতে। শোনা যায়, এই স্কন্ধমন্দিরেই কমলা সেদিন মালা পরিয়ে দিয়েছিলেন জয়াপীরের গলায়।

মহাস্থান থেকে দুই মাইল দক্ষিণে এগিয়ে গেলে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে পাওয়া যাবে স্কন্ধমন্দির। যদিও মন্দিরের ইট-পাথর, নকশা কিছুই নেই। এখন আছে শুধু ধ্বংসাবশেষ। অনেকে একে ‘স্কন্ধের ধাপ’ বা ‘কার্তিকের ধাপ’ নামেও চেনে। ‘করতোয়া মাহাত্ম্য’ ও ‘রাজতরঙ্গিনী’ – এই দুই বইতে এ স্থানের কথা পাওয়া যায়। এই মন্দিরটিতে প্রায় সন্ধ্যাতেই নাচগানের আসর বসতো। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, বাংলার প্রথম নাটকগুলোও এখানেই মঞ্চায়িত হতো।