Cover illustration for কুসুম বিবির পালা

কুসুম বিবির পালা

CATEGORY
Bengali Folktale

সে অনেককাল আগের কথা। রোম শহরে তখন বাস করতেন শেরশাহ নামে এক নিঃসন্তান বাদশা। তার মহলে আবার একটি নয়, ছিলেন একে সাতটি রানি। সবচেয়ে ছোট যে রানি, তার নাম ছিল কুসুম। নিঃসন্তান বাদশার ঘরের এই ছোট রানি যখন গর্ভবতী হলেন, তখন তার প্রতি বাদশার আদর অনেক বেশি বেড়ে গেল। বাকি ছয় রানি এজন্য কুসুমকে সহ্য করতে পারতেন না। সন্তান প্রসবকালে বড় রানি দাইমার সঙ্গে চক্রান্ত করে বিবি কুসুমের বাচ্চার জায়গায় রেখে দেন একটি কাঠের পুতুল- যেন কুসুমই সেই কাঠের পুতুল প্রসব করেছেন। আর বাচ্চাকে নিয়ে যাওয়া হলো বড় রানির মহলে। রানি দাইমাকে তক্ষুনি আদেশ করলেন, “এই শিশুকে আমার চোখের সামনে থেকে নিয়ে যাও, তাকে হত্যা করো কোনো ধারালো অস্ত্রের ঘায়ে”। কিন্তু দাইমার মনে ছিল অনেক মায়া। তিনি শিশুটিকে হত্যা না করে, তাকে নিয়ে রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন।

ওদিকে, শ্যামসুন্দর নগরের উজির কলেন্দরের ঘরেও কোনো সন্তান নেই। দাইমা শিশুটিকে নিয়ে কলেন্দরের বাড়িতে গিয়ে শিশু বিক্রির প্রস্তাব জানান। দাইমা উজিরকে বলেন, “শিশুটির বাবা নেই, আর প্রসবকালেই মা মারা গেছে। শিশুটির দায়িত্ব এখন আমার– কিন্তু আমার পক্ষে সম্ভব না একে মানুষ করা।” সবটা শুনে উজির তার উজিরানীদের সঙ্গে আলাপে যান। উজিরানীরা বলেন, “বাচ্চা রাখতে পারি এক শর্তে– কিনে দাও দুগ্ধবতী গাভী! সেই দুধ খাবে শিশু, হবে না কোনো ক্ষতি।” এ প্রস্তাবে দাইমা সহ উজির রাজি হয়ে যান। এদিকে ঢাকঢোল পিটিয়ে উজির পুরো রাজ্যে ঘোষণা দেন, তার পুত্রসন্তান হয়েছে।

এদিকে কালু নামের এক দাস গিয়ে শেরশাহকে খবর দিলো, তার ছোট বেগম কুসুম একটি কাঠের পুতুল প্রসব করেছে। বাদশা সেকথা বিশ্বাস না করে প্রথমে তার বড় ছয় বেগমের কাছে শুনতে যান। তারা সকলেই এক এক করে জানায়, কথাটা সত্যি। বাদশা একথা শুনে রেগে গিয়ে রানি কুসুমকে বন্দী করে রাখেন আর রাজ্যময় ঘোষণা করেন, পরদিন সকালে রাজসভায় এর বিচার হবে।

পরদিন সকালে কুসুমকে শিকলে বেঁধে রাজসভায় নিয়ে যাওয়া হয়। কুসুম রাজসভায় বললো, “নয় কোনো কাঠের পুতুল, জন্মেছিল এক পুত্র– জানে সকল শত্রুমিত্র। আসকান নামের ছেলে আমার, আসমান ফাটে তার জন্য।” কিন্তু শিশুটি কাছে না থাকায় বাদশার তিরষ্কার শুনতে হলো কুসুমকে। কুসুম স্বামীর পায়ে পড়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করলো। কিন্তু বাদশা কুসুমের গায়ের অষ্ট-অলংকার কেড়ে নিলেন। তারপর কালুকে বললেন কুসুমের চুল কেটে- মাথায় ঘোল ঢেলে, সেই কাঠের পুতুল গলায় ঝুলিয়ে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করতে। সেইসাথে বাদশা বিবি কুসুমকে ১২ বছর বনবাসের আদেশও দিলেন। বাদশার আদেশ অনুযায়ী সেটাই করা হলো। বিবিকে পাঠানো হলো গহীন বনে।

কুসুম বনে হাঁটতে হাঁটতে রাত নেমে এলো, তার মনে ভয় হলো- এবার এই ঘন জঙ্গলে তাকে বাঘে খেয়ে ফেলবে। তখন সে কিছুদূর সামনে টিমটিম করে একটি আলো জ্বলতে দেখতে পেলো। ভাবলো, আজকের রাতটা ওখানে কাটিয়ে কাল সকালে চলে যাবো। কুসুম বাড়িটির সামনে গিয়ে বাড়িওয়ালাকে একটা রাত থাকার জন্য প্রার্থনা করে। বাড়িওয়ালা রাজি হয় একটি শর্তে। সে যেন ভোর হবার আগেই আবার এখান থেকে চলে যায়। কুসুম সেখানে রাতটা কাটিয়ে ভোরে রওনা হলো তার বাবার বাড়ির উদ্দেশে। সেখানে পৌঁছে কুসুম তার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে তার বনবাসে আসার সব কথা খুলে বললো। কিন্তু কুসুমের বাবা মেয়েকে বাড়িতে উঠতে দিলেন না। ভাগ্যের পরিহাসে নিরুপায় আজ বাদশার বেগম! কী আর করা, তখন সে যায় তার ভাইয়ের বাড়িতে। কিন্তু হায়, কিন্তু সেখানেও কুসুমের জায়গা হলো না। বিতাড়িত হলো সে। তখন মনের দুঃখে বনের মধ্যে চলে গেলো কুসুম বিবি। বনে গিয়ে কুসুমের প্রসব করা সন্তান আসকানের নাম বলে কাঁদতে লাগলো। বনে ছিলো নয় লক্ষ বাঘ, তারা আসকানের নাম শুনে সেখানে কুসুমকে তালপাতা, বেলপাতা দিয়ে ছোট কুঠুরি বানিয়ে দিলো থাকার জন্য। আর কুসুম ভিক্ষা করে যেটুকু পেতো, তা দিয়েই কোনোভাবে দিন কাটতো।

দেখতে দেখতে বারো বছর পার হলো– বারো শীত, বারো বসন্ত। কিন্তু নাড়ির টান কি ভোলা যায়? একদিন বনের পথ দিয়েই বিদ্যালয়ে পড়তে যাচ্ছিল ছোট্ট আসকান। বনের মধ্যে কুসুমের দেখা পেলো সে। কুসুমকে দেখেই মন থেকে তার ডাক বের হলো, “মা!” পুত্রহারা মায়ের ব্যথা বুকে নিয়ে কুসুম তাকে বলে, “এসো বাবা, মায়ের দুধ খেয়ে যাও”। আসকান অবিরাম ধারায় তৃপ্তি নিয়ে কুসুমের দুধ পান করতে লাগলো, আর এদিকে স্কুলের সময় শেষ হয়ে গেলো। দুগ্ধপান শেষে, কুসুম আসকানের কাছে খাবার প্রার্থনা করে এবং তার জন্মপরিচয় জানতে চায়। আসকান তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়, সে তার মার থেকে জেনে এসে বলবে আর সঙ্গে খাবারও নিয়ে আসবে।

আসকান সেই দাইমাকে তার আসল জন্মপরিচয় জিজ্ঞেস করলে দাইমা তাকে সব কথা বলে দেয়। আসকান কাঁদতে কাঁদতে চলে যায় সেই বনে, কুসুমের কাছে। বারো বছর পর মা-ছেলের দেখা হয়ে দুজনেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। তারপর আসকান, তার মা কুসুমকে নিয়ে চলে যায় বাদশা শেরশাহের দরবারে। সেখানে এত বছরের লুকোনো সব সত্য প্রকাশিত হয় এবং বাদশা শেরশাহ বড় রানির মৃত্যুদণ্ড দেন। তিনি তার কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করেন।

অবশেষে সবার মিলন হয়। বাদশা শেরশাহ বিবি কুসুম ও পুত্র আসকানকে নিয়ে সুখে রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। এখানেই শেষ হলো কুসুম বিবির পালা।