একসময় দেশে এক ডাকাত সর্দার ছিলো। নাম ছিল তার হুমরা ডাকাত। রাতের অন্ধকারে একবার হুমরা ডাকাত তার দলবল নিয়ে হানা দেয় সম্পদশালী এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে। লুটপাট চালিয়ে বের হয়ে যাবার সময় তার চোখ পরে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ছয় মাস বয়সী মেয়ের উপর। শিশুটির স্বর্গীয় সৌন্দর্যের কাছে তার অপহরণকৃত সব ধন-সম্পত্তি নিমিষেই তুচ্ছ হয়ে যায়। ব্রাহ্মণের চোখ ফাঁকি দিয়ে শিশুটিকে চুরি করে নিয়ে আসে সে।
গারো পাহাড়ের পর হিমানী পর্বত। এখানে গভীর এক বনে বাস করতো হুমরা ডাকাত। চুরি করে আনা শিশুটি তার কাছেই বড় হতে থাকে। মেয়েটিকে আনার পর থেকে হুমরার মধ্যে অনেক পরিবর্তন চলে আসে। সে ভালোবাসতে শেখে, এক সময় ডাকাতি করাও ছেড়ে দেয়। তখন জীবিকার তাগিদে সে যোগ দেয় বেদের দলে। হুমরা ডাকাত হয়ে যায় হুমরা বেদে।
চোখের পলকে কেটে যায় ১৬টি বছর। কন্যা সন্তানের উপচে পড়া রূপ হুমরার অন্ধকার ঘরকে আলোকিত করে রাখে। তাই পালক বাবা-মা রূপে-গুণে এই অতুলনীয় সুন্দরী মেয়ের নাম রাখে “মহুয়া সুন্দরী”। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সেই মেয়ে হয়ে যায় বেদের মেয়ে। হুমরা তাকে খেলা ও বেদের কৌশল শেখায়। মহুয়াও বাবার সাথে সাপ খেলা দেখায়।
বামনকান্দা গ্রামের জমিদারের ছেলে দেওয়ান নদের চাঁদ। বাবার আদেশে এক সন্ধ্যায় তিনি সভায় বসেন খোলা আকাশের নিচে। কিন্তু সভায় তার মন নেই, তাকিয়ে আছেন তারা ভরা আকাশের দিকে। তারই বিশ্বস্ত একজনের কাছে খবর পেয়েছেন এলাকাতে এক বেদের দল এসেছে, দলের সাথে এক অসম্ভব সুন্দরী মেয়েও এসেছে যার তুলনা বামনকান্দা তো দূরের কথা গোটা জমিদারীতেই নেই। তাই নদের চাঁদ সভাভঙ্গ করে অন্দরমহলে পৌঁছে মায়ের কাছে অনুমতির জন্য । যেহেতু জমিদার খুবই অবস্থাপন্ন ছিলেন তাই সকলের বিনোদনের জন্য তার প্রাসাদে প্রায়ই নাচ গান ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হতো। তাই মায়ের অনুমতি পেয়ে এবারও অনুষ্ঠানের জন্য আমন্ত্রণ করা হয় হুমরা বেদের দলকে।
আমন্ত্রণ পেয়ে হুমরা তার দলবল নিয়ে জমিদারের প্রাসাদে যায় সাপের খেলা দেখানোর জন্য। মহুয়ার খেলা দেখানোর কৌশল দেখে সবাই মুগ্ধ হয়। অন্যদিকে তাকে দেখা মাত্রই প্রেমে পড়ে যায় নদের চাঁদ। মহুয়াকে দেখার পর থেকে নদের চাঁদ সবসময় শুধু তার কথাই ভাবতে থাকে। সে বুঝে যায় যে, সে প্রেমে পড়ে গেছে। কিন্তু অনেকদিন দেখা নেই মহুয়ার। নদের চাঁদ ভাবে মহুয়া বুঝি তাকে উপেক্ষা করে যাচ্ছে। এক সন্ধ্যায় মহুয়ার পথ আগলে দাঁড়ায় নদের এবং কোনো দ্বিধাবোধ না করেই মহুয়াকে তার প্রেমের কথা জানায়। নদের চাঁদও ছিলো বেশ সুদর্শন যুবক। মহুয়ারও তাকে ভালো লেগে যায় এবং তারা একজন আরেকজনের প্রতি ভালোবাসার বন্ধনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
চৈত্র মাসের এক মধ্যরাতে হঠাৎ নদের চাঁদের ঘুম ভেঙে যায়। প্রিয় মহুয়ার কথা মনে করে তার প্রিয় বাঁশিটি হাতে নিয়ে বাজাতে শুরু করে। অন্যদিকে যখন মহুয়া এই বাঁশির সূর শুনতে পায় তখন সে বুঝতে পরে যে নদের চাঁদ তাকে ডাকছে। মহুয়া তখন পাগলের মতো করে ঘর থেকে বের হয়ে নদীর ঘাটে এসে দেখে নদের চাঁদ সেখানে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে। তখন মহুয়া এবং নদের চাঁদ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। জড়িয়ে থাকা অবস্থায় মহুয়া বলে “আমি বাবা-মা, ঘর-বাড়ি সব ছেড়ে তোমার সাথে অন্য কোথাও চলে যেতে চাই। আমি তোমার প্রেমে পাগল হয়ে গেছি।এক মুহুর্ত তোমাকে না দেখলে আমি পাগল হয়ে যাই।” মহুয়া এবং নদের চাঁদের প্রেম দূরে লুকিয়ে থেকে হুমরা বেদে সব দেখে ফেলে। অসম অবস্থানের প্রেম নিয়ে বেদের মনে জেগে ওঠে ভয় আর শঙ্কা। পরিস্থিতি এড়াতে সে গভীর রাতে মহুয়া আর দলবল নিয়ে পালিয়ে যায় গ্রাম থেকে।
ওদিকে মহুয়ার বিরহে চাঁদ ঠাকুরের পাগল প্রায় অবস্থা। তীর্থের নামে সে বেরিয়ে পড়ে মহুয়ার খোঁজে। এমন ভাবে নদের চাঁদ তিন মাস ধরে মহুয়াকে খুজে, কিন্তু কোথাও তার সন্ধান পায় না। পথে যাকেই পায় তাকেই মহুয়ার রূপের গঠন এবং খেলা দেখাবার পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞেস করে মহুয়াকে কোথাও দেখেছে কিনা। অগ্রহায়ণ মাসে যখন হালকা শীত পরে তখন অবশেষে কংস নদীর পাড়ে নদের চাঁদ মহুয়ার সন্ধান পেল। নদের চাঁদকে দেখে মহুয়ার যেন দেহে প্রাণ ফিরে এলো। সে খুশি মনে নদীর জল আনতে গেলো এবং সুন্দর সুন্দর রান্না করে নদের চাঁদকে খাওয়াতে লাগল। হুমরা বেদে এই দিকে নদের চাঁদের আগমনের কথা শুনে অনেক চিন্তিত হয়ে পড়ল। এক রাতে ঘুমন্ত মহুয়াকে সে জাগিয়ে বলল “১৬ বছর ধরে তোমাকে কত কষ্ট করে লালন পালন করেছি। তুমি কখনই আমার অবাধ্য হও নি। এক ভিনদেশী পুরুষ এসেছে আমাদের সুখ নষ্ট করতে, যেটা আমি কোনওভাবেই সহ্য করতে পারছি না।” এই বলে হুমরা বেদে মহুয়ার হাতে একটি ছুড়ি দিয়ে বলল, “ঘুমন্ত অবস্থায় নদের চাঁদের বুকের মধ্যে এই ছুড়িটা গেথে দিয়ে তাকে মেরে ফেলো।” কিন্তু বাবার আদেশের ওপর জিতে যায় মহুয়ার প্রেম। সে মারতে পারে না চাঁদকে, ডিঙা নৌকায় নদী পারি দিয়ে বনে পালিয়ে যায় তারা। এভাবে কাটে ছয় মাস।
নদের চাঁদ আর মহুয়া বনের মধ্যেই পেতে ফেলে সুখের সংসার। কিন্তু প্রেম যেখানে খরস্রোতা, ভাঙনও সেখানে মারাত্মক। একদিন সে বনেও হাজির হয় হুমরা বেদের দল। এবারও হুমরার সামনে দাঁড়িয়ে মহুয়ার হাতে বিষ লাগানো ছুরি তুলে দেয় চাঁদকে মারার জন্য। কিন্তু মহুয়া তো নদের চাঁদকে সত্যিকারের ভালোবেসেছিলো, সে কি করে মারবে তাকে? তাই ছুরিটি সে নিজের বুকেই গেঁথে দেয় এবং মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। এদিকে নদের চাঁদ নিজের প্রানের চেয়েও প্রিয় প্রিয়তমার এই আত্মত্যাগ সহ্য করতে না পেরে প্রেমের প্রতিদান সরূপ একইভাবে ছুরিটি তার বুকেও গেঁথে দেয়। দুজনই লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। চির বিদায় নেয় এ পৃথিবী থেকে। অবশেষে দুজনের মিলন হয় একত্রে মাটি চাপা পড়ে।