বহুকাল আগে ভারতবর্ষে এক রাজা বাস করতেন। নাম তার হরিশ্চন্দ্র। রাজার স্বভাব এতই ভালো ছিল যে রাজ্যে রাজ্যে তার নামে মানুষ কিরে-কসম কাটতো। হরিশচন্দ্রের রানি ছিলেন মদনা। তাদের দুজনের সংসার আর রাজ্যের প্রজাদের নিয়ে ভালোই দিন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু ঘরে কোনো সন্তান না থাকায় দুজনেই বড় কষ্ট পেতেন।
একদিন দুজনে মিলে বিকেলবেলা বাগানে হাঁটতে হাঁটতে আবারো সেই নিঃসন্তান হওয়ার দুঃখ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। একে অন্যকে বলতে লাগলো, “কী হবে এই রাজ্যপাট নিয়ে, যদি বংশের বাতিই না থাকে?” এ কথা শুনে রানি চোখের জল ফেলতে লাগলো।
তখনই সে বাগানে দেখা দিলেন এক সন্ন্যাসী। পায়ে খড়ম, মাথায় লম্বা তিলক। আসলে ছদ্মবেশে সে সন্ন্যাসী ছিলেন খোদ ধর্মরাজ। ধর্মরাজ তাদেরকে আশীর্বাদ করে বললেন, “চিন্তা করো না। খুব শিগগিরই তোমাদের একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তান হবে। তার নাম রাখবে লুহিশ্চন্দ্র। তবে কথা দিতে হবে, এই ছেলেকে প্রয়োজন হলে ধর্মের নামে বলি দিতে হবে।” এই কথা বলে ধর্মরাজ চলে গেলেন। দশমাস দশদিন পর ধর্মরাজের গুণে তাদের ঘরে একটি ছেলে হলো। সে ছেলে দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি শক্তিশালী। স্বভাবে খুবই দুষ্টু। সারাদিন শুধু গুলতি ছোঁড়ে আর এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। ছেলের মুখ চেয়ে রাজা-রানি পুরো দুনিয়া ভুলে বসলেন। তাদের চার চোখের মণি হলো রাজপুত্র লুহিশ্চন্দ্র। বাপ-মায় আদর করে ডাকতো ‘লুই’।
একদিন লুহিশচন্দ্র খেলার ছলে গুলতি ছুঁড়ে মারে গাছে বসে থাকা এক পেঁচার গায়ে। পেঁচা ধর্মরাজের বাহন। কোনো অন্যায় না করে গুলতির আঘাত পেয়ে সে বড় মন খারাপ করলো। তখন সে ধর্মরাজের কাছে গিয়ে নালিশ করলো, “দেখুন তো প্রভু, হতচ্ছাড়া আমার কী দশা করেছে। আরামে বসে ছিলুম গাছের ডালে। অমনি দেখি গুলতি ছুঁড়েছে হরিশচন্দ্রের ছেলে।” এ কথা শুনে ধর্মরাজ মুচকি হাসলেন।
তিনি আবার এক সাধুর বেশ নিয়ে গেলেন হরিশচন্দ্রের রাজ দরবারে। সে কী দাপুটে বেশ, লোকে দেখে আর ভক্তিতে মাথা নুইয়ে ফেলে।
“মাথায় ধবল ছাতি থুঙ্গি পুঁথি কাঁখে।
দণ্ডকমণ্ডলুধারী পরব্রহ্ম ডাকে।।
কপালে উজ্জ্বল ফোঁটা শিরে শোভে জটা।
জলদে জড়িত যেন তড়িতের ছটা।।
পরি, রক্ত বসন আসন বাঘছাল।
চলিলা পুণ্ডরীকাক্ষ গলে অক্ষমাল।”
তখনকার দিনের রাজা-রাজড়াদের কাছে সাধুসেবা ছিল ধর্মসেবা। হরিশচন্দ্র তো এমনি ধার্মিক লোক। তিনি তাড়াতাড়ি করে সেই সাধুর সেবায় লেগে গেলেন। সাধু তখন আবদার করলেন, তিনি বহুদিন উপোস আছেন। রানি মদনার সুস্বাদু রান্না খেয়ে তবেই তিনি খুশি হবেন। এ কথা শুনে তো হরিশচন্দ্রের মনে আনন্দ আর ধরে না। তক্ষুনি তাকে খুব আদর-আপ্যায়ন করে ভেতরবাড়িতে নিয়ে গেলেন খাওয়া-দাওয়ার জন্য। কিন্তু এতশত ফলাহার, এতশত তরি-তরকারি, কিছুতেই মুখ রোচে না সাধুর। মুখ বাঁকিয়ে তিনি শুধু বলেন, “এসব কিছু আমার চাই না।”
“তবে কি চাই সাধুমশায়? দোহাই লাগে, বলুন একবার।”
“আমি মাংসাহারী। এক বিশেষ ধরনের মাংস না খেলে আমার মুখে কিছুই রুচবে না।”
“আহা, সে কথা আগে বলতে হয় তো। এক্ষুনি কচি হরিণ-পাঁঠা সব ধরনের ভালো ভালো মাংস এনে দিচ্ছি সাধুবাবাকে।”
এই বলে তার সামনে প্রস্তুত করা হলো বাহারি রকমের মাংসের শত ধরনের পদ। কিন্তু সে কী! সাধু যে এতেও বেজার। তিনি আরো মুখ ফুলিয়ে বসেন।
এমন অবস্থায় হরিশচন্দ্র আর মদনা পড়লেন বেশ বিপদে। এভাবে সাধুবাবাকে নাখোশ করলে তো আর হয় না। এসেছেন যখন, সেবা তো করতেই হবে। অনেক চেষ্টার পর সাধু শেষে মুখ খুললেন-
“বৃথা মাংস নাহি চাই, খাই যে মনের মত মহামাংস পাই।”
হরিশচন্দ্র ও মদনা দুজনেই বড় আগ্রহভরে জিজ্ঞেস করে ফেললেন, “কী সেই মহামাংস? কী সেই মহামাংস?”
সাধু তখন বুঝলেন, এতক্ষণে বাগে পেয়েছেন রাজা-রানিকে- “এত করে বলছিস যখন, তবে বলেই ফেলি। কিন্তু বাপ-মা হয়ে ও কাজ কি আর করতে পারবি?”
ভয়ে হাত-পা কাঁপতে থাকলো মদনার। কী বলতে চান এই অদ্ভুত সাধু?
সাধু বলেই চললেন, “বলছি বাপ-মা হয়ে কি সাধুসেবায় ছেলের মাংস কেটে রান্না করে খাওয়াতে পারবি? এইটেই আমি চাই।”
রাগে আগুন হয়ে উঠলেন যেন মদনা দেবী- “তবে রে ভণ্ড! সাধুর বেশ ধরে ডাকাত এসেছে আমার ঘরে। এক্ষুনি মজা দেখাচ্ছি তোকে।”
তখন সাধুবেশে ধর্মরাজ রাজা-রানিকে আরো ধিক্কার দেন। বলেন, “রাজা হয়েছো ঠিকই কিন্তু মানীর মান রাখতে জানো না। ছেলের মায়ায় অন্ধ হয়ে সাধুসেবা করতে ভুলে গেছ!”
ধর্ম তখন আস্তে আস্তে মনে করিয়ে দিলেন সেই পুরাতন সন্ন্যাসীর কথা। সন্ন্যাসীর দেওয়া বর আর পুত্রলাভের ভাগ্যের কথা। বলতে ভুললেন না রাজার করা সেই প্রতিজ্ঞার কথাও।
সব মনে পড়লো রাজা হরিশচন্দ্রের। মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন তিনি। কানে শুধু বাজছে নির্দয় সাধুর বলা সেই বিষে মাখা কথা- “জুড়াও লুয়ের মাংসে জঠর অনল।”
সাধুর এমন বিষবাক্য শুনে রাজা ছেলেকে কাটেন। রানি উনুনে আগুন দেন। এরপর ভালো করে রান্নার পর সাধুর পাতে তুলে দেওয়া হয় লুহিশচন্দ্রের মাংস।
“সুপক্ক সঝোল মাংস রূপার ডাবরে।
ঢালিয়া সোনার থাল ঢাকিল উপরে।
উড়ি চূর্ণের মাথার মজ্জায় তোলে বড়া
বুকের কলিজা ভাজে চড়াইয়া কড়া।
নাড়া ঝাড়া দিয়া ভাজে ঘৃত জব জব।
পরিপাটী মাংসের রন্ধন হৈল সব।”
কিন্তু সাধুর আছে আরেক শর্ত! এক পাতে নয়, তিন তিনটি পাতে সে মাংস-ভাত তুলে দিতে হবে। সাধুর সঙ্গে বসে খেতে হবে রাজা-রানিকেও। নিজের ছেলের মাংস খাবেন, এমন কথা কি কেউ এ জন্মে শুনেছে? কিন্তু রাজা-রানির উপায় নেই কোনো। মানতে হবে সাধুর কথা। অতঃপর তাই করলেন দুজনে।
কিন্তু এ কী! সামনে সেই খ্যাপাটে সাধু কোথায়? এ যে স্বয়ং ধর্মরাজ। মুচকি হেসে তাকিয়ে আছেন। ভক্তরা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। এইবেলা বর দেবার পালা।
“কী চাও?” - এ প্রশ্নের উত্তরে রাজা-রানি দুয়ে মিলে একটি কথাই বললো। ফিরিয়ে দিতে হবে তাদের বাছাধন লুইকে। তাকে ছাড়া এ জন্মে আর কিচ্ছুটি চাওয়ার নেই তাদের। এই রাজ্য, ধন-দৌলত, ঝকমারি জীবন- সবকিছুর বদলে শুধু কোল আলো করে থাকুক চাঁদের মতো- রাজা হরিশচন্দ্রের ছেলে লুহিশচন্দ্র।