সে বেশ অনেকদিন আগের কথা। ছোট্ট এক গাঁয়ের ধারে বাস করতো এক রাখাল বালক আর তার মা। গরু-ভেড়া চড়িয়ে কোনোমতে তাদের দিন কেটে যাচ্ছিল। একদিন রাখালের বড় ইচ্ছে করলো পিঠা খাবে। কিন্তু মায়ের কাছে গিয়ে বলতেই মা মুখ ঝামটা দিয়ে বললো– “দিন আনতে দিন খাই, পিঠা বানাতে কতকিছু চাই! কোথায় পাই, কোথায় পাই?” মায়ের কথা শুনে সে তক্ষুনি জবাব দিলো, “তুমি ফর্দ লিখে দাও। আমি সবকিছু নিয়ে আসছি। এরপর তুমি আমায় পিঠা বানিয়ে দিও।” যে-ই কথা সে-ই কাজ। মা বাজারের ফর্দ হাতে ধরিয়ে দিলো–
“পিঠার জন্য এনো চিনি,
হবে তার দানা মিহি।
পিঠার জন্য এনো দুধ,
যেন কেউ না দেয় তাতে মুখ।
পিঠার জন্য চাই যে চালের গুঁড়া,
এনো না যেন চালের কুঁড়া!”
কিন্তু রাখালের কাছে তো একটি পয়সা নেই, সে এতসব জিনিস আনবে কীভাবে? পয়সা না থাকলেও অবশ্য রাখাল বালকটির বুদ্ধির শেষ ছিল না। তাই সে অন্য ফন্দি আঁটলো।
গরুর পাল নিয়ে সে হট হট করে পৌঁছে গেল ধানক্ষেতে। ঘাসের জায়গায় গরুরা সব খেলো ধানের ছড়া। ক্ষেতের অনেকখানি ধানগাছ সাবাড় করে দিয়ে রাখাল তাদের নিয়ে বাড়ি ফিরলো। এরপর গরুদেরকে খুব জোরে জোরে মারতে লাগলো, যাতে করে তারা সব খাবার উগড়ে দেয়। এরপর সেই উগড়ে দেয়া খাবার পরিষ্কার করে রাখালের মা চাল বাছলো, চাল শুকোতে দিয়ে কুটনায় কুটলো। তবেই হলো চালের গুঁড়া।
এবারে তো দুধ চাই। কিন্তু গরু তো তার নিজের নয়, চাইলেই দুধ দোয়াতে পারবে না– উল্টো ধ্যাতানি খেতে হবে মনিবের কাছে। তাই এজন্য রাখাল আরেক বুদ্ধি করলো। গাঁয়ের উঁচু ঢালের দিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে, ওখানে গিয়ে একটা জায়গায় খুব ভালো রকম পানি ফেলে কাদা কাদা করে রাখলো। যাতে কেউ এদিক দিয়ে গেলেই পা পিছলে পড়ে। শয়তানি কম জানতো না রাখাল। দুয়ে দুয়ে চার মিলে গেল এক্কেবারে। এই পথ দিয়ে যখনই গাঁয়ের গোয়ালা দুধ নিয়ে যাচ্ছিল, রাখালের তৈরি করে রাখা ওই কাদামাখা গর্তে পা হড়কে গেল। দুধের পাত্র ভেঙে চৌচির। ওদিকে গোয়ালার চোখ ফাঁকি দিয়ে রাখাল তার দুধের পাত্র ভরে নিলো। তারপর ‘তাইরে নাইরে না’ গেয়ে বাড়ি গেল, মায়ের কাছে দুধ জমা দিয়ে ঠিক একইরকম শয়তানি করে চিনি নিয়ে এলো। মাও খুব খুশি। ছেলে তার একেবারে লায়েক হয়েছে। কী সুন্দর সব জিনিস যোগাড় করে আনলো, এবারে খুব ভালোমতো পিঠা বানিয়ে দেয়া চাই।
পিঠা সব রাখাল একাই সাবাড় করলো। খালি একটি বড় পিঠা সে সরিয়ে রাখলো। কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে মাঠের একখানে ভালো করে খুঁড়ে, সেই পিঠাখানা পুঁতে দিলো। কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই পিঠা থেকে চারা গজালো, পিঠার মস্ত বড় গাছ হলো। গাছের প্রতি ডালে ডালে আমের মতোই ঝুলে আছে সরেস একেকটা গরম গরম পিঠা। ব্যস, সারা জীবনের জন্য রাখালের আর পিঠা খাওয়ার চিন্তা নেই। এই ভেবে খুশিতে বাক বাকুম হয়ে যখন গাছের নিচে পা দোলাচ্ছে, তখনই সেখানে উদয় হলো এক থুত্থুরে বুড়ি। বুড়ি আসলে ডাইনি ছিল। রাখাল সে কথা জানতো না।
“ও ছেলে, আমাকে একটা পিঠা দাও না!”
রাখালের কাছে এখন অনেক পিঠা। তাই আর কিপ্টেমি করলো না।
“তা বুড়িমা, পিঠা তো দিব– কিন্তু নেবে কীসে করে?”
“এই যে, আমার হাতে দাও।”
“কিন্তু পিঠা যে বড় গরম। তোমার হাত পুড়ে যাবে।”
“তাহলে এই যে, এই আমার মুখে পুরে দাও।”
“আহা বুড়িমা, তুমি কিচ্ছু বোঝো না! পিঠা যে গরম। তোমার মুখ পুড়ে যাবে।”
তখন বুড়ি আস্তে করে একটা বড় থলে বের করে বললো, “বাবা, তাহলে এই থলেতে ভরে দাও পিঠাখানা। আহা কী সুন্দর গন্ধ! কতদিন একটা পিঠা খাই না।”
বুড়ির মিষ্টি কথা শুনে রাখাল যে-ই না একটা পিঠা পেড়েছে, থলেতে ভরতে যাবে এমন সময় বুড়ি কপাত করে তার ঘাড়খানা ধরে থলেতে পুরে ফেললো আস্ত রাখালকেই। রাখাল কিছু বোঝার আগেই কম্মো সাবাড়। এরপর ডাইনি বুড়ি মনের সুখে বনের পথে গান ধরলো বিকট সুরে–
“হাঁউ মাঁউ কাঁউ–
বলি, শুনছো নাকি কেউ?
একটা মানুষ যদি পাও,
ওমনি ধরে গাপুস গুপুস,
আজকে হবে হাপুস হুপুস!”
এমনি গান গাইতে গাইতে বুড়ির বড় তেষ্টা পেয়ে গেল। ডাইনি হলে কী হবে, আগের দিন আর নেই। বড় জলদি হাঁপিয়ে যায়। থলেটাকে তাই এক গাছের নিচে রেখে বুড়ি গেল পানি খেতে। এই সময়েই বনের পথ ধরে একদল রাখাল যাচ্ছিল। বুড়ির থলেটা দেখে ভালো কিছু পাবে ভেবে যেই না তারা থলের মুখ খুলেছে, ওমনি দেখে এ যে তাদেরই বন্ধু। তক্ষুনি বন্ধুকে উদ্ধার করে নিয়ে গেল রাখালের দল। আর বুড়ির থলেতে ভালো করে পুরে দিয়ে গেল কংকর, নুড়ি পাথর, কাঠের টুকরা এমন সব আবর্জনা। বুড়ি তো বাড়ি গিয়ে সবাইকে বললো,
“আজ তাগড়া একটা মানুষ ধরে এনেছি। রাতের খাবারটা যা জমে যাবে না!”
কিন্তু কই, থলের ভেতর তো শুধু নুড়ি পাথর আর কংকর। ডাইনি বুড়ি খুব খেপে গেল। যে করেই রাখালটাকে শায়েস্তা করতে হবে। পরের দিন সে আবার গেল সেই পিঠা গাছের কাছে। রাখালকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাজিও করিয়ে ফেললো পিঠা দেয়ার জন্য। কিন্তু বুড়ি কি আর সত্যি পিঠা খেতে চায়? তার নজর তো রাখালের দিকে। যেই না রাখাল পিঠা থলেতে ভরে দেবে, বুড়ি আবারো ঘাড় ধরে হিড়হিড় করে তাকে থলেতে ঢুকিয়ে ফেললো। রাখাল ভাবলো, এইবার আর নিস্তার নেই।
সেই থলে বাড়িতে নিয়ে বুড়ি তার ছেলেবৌকে বললো, “আমরা সবাই বাড়ি ফেরার আগেই ভালো করে ধুয়ে-কেটে রান্না করে রাখবে। এসেই যেন খাবার পাই।” রাখার থলেতে বসে সব কথা শুনলো। আর মনে মনে ফন্দি আঁটলো। যেই না ডাইনির ছেলেবৌ ছোট ডাইনি থলেটা খুলেছে, ওমনি রাখাল বললো– “ছি, ছি তোমার দাঁত কী বিচ্ছিরি! এমন দাঁত দেখে তোমার বর পালিয়ে যাবে।” ছোট ডাইনিটা ছিল খুবই বোকাসোকা। অমনি সে নিজের দাঁত ঢেকে বললো, “তোমার মতো অত সুন্দর সাদা ঝকঝকে দাঁত হবে কেমন করে? বলে দাও না ভাই।” রাখাল তখন বললো, এ আর এমন কী! এক্ষুনি এক কড়া তেল গরম করতে দাও আর একটা চোঙা নিয়ে আসো।
এরপর চুলায় তেল গরম হতে থাকলো, আর রাখার তার পরের পাঁয়তারা ভাবতে থাকলো। তেল যখন একেবারে টগবগ করে ফুটে উঠেছে, রাখাল তখন ভুলভাল বুঝিয়ে ছোট ডাইনির মুখে চোঙা দিয়ে সবখানা তেল ঢেলে দিলো। সেই গরম তেলে ছোট ডাইনি জ্বলেপুড়ে গেল। তারপর তাকে ধুয়েটুয়ে, ভালোমতো রান্না করে তার সব গয়না-কাপড় পরে রাখাল বড় ডাইনির অপেক্ষা করতে লাগলো। রাত্তিরে যখন সবাই খেতে বসলো, তখন সবাইকে তাদের ঘরের বৌয়ের মাংসই খাইয়ে দিল। কেউ বুঝলোও না। সবাই ভাবলো, এ সেই পাজির পা ঝাড়া রাখাল ছেলের মাংস।
খাওয়া শেষে ছোট ডাইনির ছদ্মবেশে রাখাল বালক আর ডাইনি বুড়ি মিলে গেল নদীর ধারে হাত ধুতে। হাত ধোয়া শেষ হতে না হতেই রাখাল ঝাঁপ দিয়ে নদীতে পড়ে গেল। ডাইনি বুড়ির চক্ষু চড়কগাছ!
“ও বৌ, যাসনে। নদীতে কুমির আছে। যাসনে।”
রাখাল তখন মুখ ঘুরিয়ে বললো, “হতচ্ছাড়ি বুড়ি, কে তোর বৌ! দেখগে পেটের মাঝে, কী আছে!”
এই বলে রাখাল এমন জোরে সাঁতার কেটে বাড়ি চলে গেল, কুমিররাও আর তার খবর পেলো না। আর সে ডাইনি, এমন জব্দ হলো যে আর ভুলেও কোনোদিন পিঠা গাছের আশপাশ দিয়ে যায়নি।