সে অনেক আগের কথা। এক গ্রামে, এক গরিব দিনমজুর বাস করতো। বড়োই অভাবে যেত তার দিনকাল। যার কারণে সে বিয়ে করতে পারেনি।
দিনকাল পেরোতে থাকলে, তার বয়সও বেড়ে যায়, আর বিয়ে করার সময়ও চলে যায় ।
সে কারো সাথে মেশা তো দূরের, ঘর ছেড়ে কোথাও যাওয়ার সময় পেত না। কারণ, সে একটা ঘরের বউ এর মতন সারাদিন জল তোলা, রান্না-বান্না করা, বাসন মাজা, কাপড় কাঁচা, যা আছে, সবই করতো।
তাই সে একদিন, মনের দুঃখ মেটাতে এক ভালো ছুতারের কাছে গিয়ে একটা সুন্দর কাঠের মহিলার মূর্তি বানাতে দিলো।
মূর্তিটি বানানো শেষ হলে, সে অবাক হয়, কারণ, কাঠের মূর্তিটি দেখতে একটি জীবন্ত সুন্দরী মহিলার মতন লাগছিলো।
এরপর থেকেই, লোকটা এই কাঠের মহিলাকে নিজের বৌ ভাবতে শুরু করে।
এমনকি সে নিজে নিজেই কাঠের বউয়ের সাথে কথা বলত, ”শুনছো বউ, এক ছিলিম তামাক সাজিয়ে নিয়ে এসো। বউ রান্না শেষ হয়েছে?” কিন্তু পরে নিজেই তামাক সাজাত, নিজেই, “হ্যাঁ, শেষ হয়েছে ” - বলে ভাত বেড়ে নিত।
তার পরে একদিন!
লোকটা তার বন্ধুর সাথে দেখা করবে বলে বের হবে। আর বেরুবার আগে কাঠের বউ কে বললো,”আমার জন্য রান্না করে রেখো বউ।”
সে পরে ঘর থেকে বেরিয়ে পরে। আর পথেই দেখা হয়ে যায় তার পুরোনো বন্ধুর সাথে।
যেহেতু দুই বন্ধুর অনেকদিন পর দেখা, তাই তারা অনেক গল্প বিনিময় করলো।
এরই মাঝে বন্ধু বুড়ো লোকটাকে জিজ্ঞেস করলো,“বিয়ে টা করেছিস তো?”
লজ্জায় লোকটা উত্তর দিলো,“হ্যাঁ, করেছি।”
বন্ধু - “আমাদের কেন জানাওনি?”
বুড়ো - “বুড়ো বয়সে বিয়ে করেছি তো, তাই লজ্জায় তোদের জানাইনি।”
বন্ধু - “ঠিক আছে বন্ধু, আজ তোর নতুন বউকে দেখে চলে আসি, চল।”
দুই বন্ধু ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বুড়ো লোকটা মনে মনে ভাবলো,“আজ আমি বন্ধুর কাছে খুব লজ্জা পাব।” আরও বললো,“হে ঈশ্বর, আমাকে লজ্জার হাত থেকে উদ্ধার কর।”
পরে দু’জনে ঘরের দুয়ারের সামনে এসে দাঁড়ালে, বুড়ো লোকটা তার বন্ধুকে দাঁড়াতে বলে যাতে, সে তার বউকে অতিথি আসার আগাম বার্তা দিতে পারে।
আর এ বলে সে ঘরে ঢুকলো।
ঘরে ঢুকতেই সে অবাক। কারণ, কে যেন তার কাপড় সব ধুয়ে উঠোনের রোদে মেলে দিয়েছে। সে ভাবলো হয়তো পাড়ার দিদিরা, বোনেরা তার কাজ করে দিয়েছে।
“ঘরে কে আছেন?” বলে সে কোনো সাড়া শব্দ পেলনা।
পরে এক মিষ্টি কণ্ঠের আওয়াজ শুনে সে ঘরে ঢুকেই দেখে, তার কাঠের বউ নেই। বরং, সেখানে ছিল এক সুন্দরী যুবতী মহিলা। মহিলার সঙ্গে কথা বলে রহস্যটা জেনে বুড়ো খুব খুশি হল।
এরপর বন্ধুকে ঘরে আনলেই, তার চোখ পরে যায় বুড়োর কচি যুবতী বউয়ের উপর। সে মনে মনে খুবই হিংসে করছিল। তাই সে একটা ফন্দি আটে। বুড়োর বউকে হাত করে নিজের বউ করবে।
আর তাই সে প্রস্তাব দিলো,”বন্ধু, আমরা একে অপরকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াবো। খাওয়ার পর, আমন্ত্রিত বন্ধু প্রথমে যে পছন্দের জিনিসে হাত রাখবে, সেটা তাকে দিয়ে দিতে হবে। রাজি তো?”
বুড়ো তো সহজ-সরল, তাই রাজি হয়ে যায়। আর খুশি মনে বুড়োর বন্ধু বাড়ি চলে যায়।
শর্ত মোতাবেক, বুড়োর বন্ধু তাকে খাওয়াতে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে। খাওয়ার পর বুড়ো তার বন্ধুর সোনা-রুপা রাখা সিন্দুকে হাত দিলে, সেটা বন্ধু বুড়োকে দিয়ে দেয়।
পরের পালা ছিল বুড়োর। সেও তাই করলো। কিন্তু বন্ধুটা ঠিক মতন কিছু খাচ্ছিলোনা। আড়চোখে শুধু বুড়োর বউকে দেখছে, আর ইনিয়ে-বিনিয়ে কাছে রাখার চেষ্টা করছে। যেন এই খাওয়া হল, আর এই বউ এর হাত ধরে বুড়োর কাছে, যুবতী বউকে চেয়ে নিবে।
বুড়োর বউওতো চালাক কমনা। সে এটা টের পেলো।
আর দুই বন্ধুর খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই সে জানালা দিয়ে একটা মই এনে রাখলো। আর বুড়োকে চোখের ইশারায় কি করতে যাচ্ছে তা জানালো।
বুড়োর বন্ধু খেয়ে, হাত-মুখ ধুয়ে, ঘরে ঢুকে, প্রথমেই বুড়োর বউকে তন্য তন্য করে খুঁজতে লাগলো। দেখলো বউটা ঘরের উপরে বিমে বসে আছে।
যেইনা বন্ধু মই বেয়ে বুড়োর বউয়ের হাত ধরবে ধরবে, অমনি, বুড়ো লোকটা হাসতে হাসতে বললো,”আরে বন্ধু, তোর পছন্দের জিনিস বুঝি মই? গরিব বলেই হয়তো কম দামের জিনিসে হাত দিয়েছিস। ঠিক আছে, শর্ত মেনে মইটা তোকে দিয়ে দিলাম, কাজে লাগবে।”
বুড়োর এই কথা শুনে, বন্ধু তার জ্ঞানে আসলো।
চরম অপমানে বন্ধুটা সেই মই নিয়ে বাড়ি গেলো। আর এদিকে বুড়ো লোকটা বন্ধুর দামি সোনা-দানা পেয়ে, তার সেই কাঠের বউকে নিয়ে মহাসুখে বাকি জীবন কাটালো।