Cover illustration for মাথিনের কূপ

মাথিনের কূপ

CATEGORY
Bengal Legend

BASED ON THE BOOK

বাংলা কিংবদন্তী

by আসাদুজ্জামান জুয়েল

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। সারা বাংলাদেশকে এই দুই প্রান্তে মাপা হয়। এরই একটিতে বসে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত থানা ইনচার্জ ধীরাজ ভট্টাচার্য বসে বসে ফেলে আসা দিনের কথা ভাবছে। আহা! কী সুন্দর দিনই না কেটেছে একসময়। মঞ্চ দাপিয়ে বেড়ানো সেইসব অভিনয়, রাতের পর রাত ধরে রিহার্সাল। এমনকি দুয়েকটি সিনেমায় অভিনয়ও করেছে সে। আর আজকে জীবিকার খোঁজে পুলিশি কায়দায় এসে বসতে হলো এই সুদূর টেকনাফে।

জীবনে বহু পেশা সে ধরেছে আর ছেড়েছে। এমনই অস্থির স্বভাব তার। বহু অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ তার এ জীবন তাকে কোথায় কোথায় যে নিয়ে যায়! এখানে একটা আধপাকা ঘরে তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। এমনিতে তেমন একটা কাজ নেই, থানার পুরনো অফিসার হরিনাথ বাবুই বেশিরভাগ কাজ সামলান। তাই ধীরাজের কাছে অফুরন্ত সময়। সকালে বিকালে ঘরটির জানালায় মুখ রেখে সে বাইরের জগৎটা দেখে।

এমনই একদিন হাজারটা হাবিজাবি কথা ভাবতে ভাবতে একদিন সকালে সে দেখতে পেল, স্থানীয় রাখাইন মেয়েরা থানার সামনের কুয়ো থেকে খাবার পানি নিয়ে যাচ্ছে। চুলে তাদের পাহাড়ি ফুলের খোঁপা। নাফের জল সমুদ্রের সাথে মিশে নোনতা হয়ে যায় তাই সকাল সকাল তারা এখান থেকেই জল তুলে নেয়, জানালেন হরিনাথ বাবু।

পরদিন ভোরে খুব জলদি ঘুম ভেঙে আবার জানালার বাইরে চোখ রাখে ধীরাজ। দিন ভালো করে ফোটার আগেই যেন ফুটে উঠেছে একটি ফুল। আশেপাশে কেউ নেই। একা একটি মেয়ে মন দিয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের পানে। খোঁপায় রঙ-বেরঙের ফুল গোঁজা, বাঙালি চেহারার আদলে গড়া রাখাইন সেই মেয়েটিকে দেখে ধীরাজের মন কেমন করে। চোখে চোখ পড়ে, হয় কিছু হাসি বিনিময়। মেয়েটি প্রতিদিনের মতোই পানি সংগ্রহ শেষে চলে যায়। আর সঙ্গে করে নিয়ে যায় ধীরাজের আনচান করা মন।

পরে ধীরাজ জানতে পারে, মেয়েটির পরিচয়। এখানকার জমিদারবাবুর মেয়ে মাথিন। প্রতিদিনই ভোরবেলা সে সবার আগে জল তুলতে আসে। অমনি করেই একে অপরের সঙ্গে চলে চোরাদৃষ্টির খেলা। ধীরে ধীরে কথাও জমে। একে অন্যকে ভালোবেসে ফেলতে দেরি হয় না ধীরাজ ও মাথিনের। ধর্ম, জাতি আর দেশের দূরত্ব— তবু মন এসব কোনো বাধাই তো মানে না। তাই বড় জলদি চিরচেনা প্রেমের জোয়ারে ভাসতে থাকে দুজনে। ধীরাজ যেহেতু সরকারি অফিসার, পুলিশের লোক— তাই এ সম্পর্কে মাথিনের পরিবার বা সমাজের দিক দিয়ে তেমন আপত্তি যে ছিল, তাও নয়। তাই ধীরাজকে বিয়ের স্বপ্ন দেখতে থাকে মাথিন। তার মনে হয়, তাদের সুন্দর একটা ঘর হবে। দুজনে মিলে সুখে-শান্তিতে সেখানে থাকবে।

ধীরাজও মাথিনের চোখে চোখ রেখে বলে, “দেখো, শিগগিরই আমরা বিয়ে করব। তুমি আমাকে ভোলো না যেন।”

স্বপ্ন দেখতে দেখতে বেশ কিছুদিন বেশ ভালোই কাটে দুজনের। কিন্তু তারপরই ঘটে এক অনর্থ। ধীরাজের বাবা টেলিগ্রাম করেছেন, জলদি যেতে হবে কলকাতায়। মাথিনকে কিছু না জানিয়েই সে কলকাতায় ফেরত যায়।

ধীরাজ তার কথা না রাখলেও কিন্তু মাথিন তাকে ভোলেনি। দিনের পর দিন তার অপেক্ষায় তাকিয়ে রয় সেই জানালার গরাদের দিকে। কিন্তু ধীরাজ আর আসে না। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে মাথিনের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। একদিন ধীরাজের পথের দিকে চেয়ে চেয়ে সে দুনিয়ার মায়া ছেড়ে দেয়। এই অল্প বয়সেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সহজ-সরল মাথিন। ধীরাজের খোঁজ জানা যায়নি। হয়তো আফসোস হয়েছিল তার। হয়তো দুদিনের ভালোবাসাকে মোহ ভেবে ভুলে যেতে চেয়েছে। হয়তো বহু বিভেদে প্রেমের হাল ধরা তার কাছে বড় শক্ত মনে হয়েছে।

তবে মাথিন রয়ে গেছে সে প্রেমের সাক্ষী হয়ে। তার নামটি জড়িয়ে গেছে সেই জল আনার স্থানটির সঙ্গে। এখনো সেই পাতকুয়াটিকে লোকে ডাকে, মাথিনের কূপ বলে। বহু পর্যটকের আনাগোনা হয়, ফলে মাথিন ও ধীরাজের নাম আর গল্পটি লেখা আছে সেখানে। এমনকি ছবিও আছে সেই ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকের।