পূর্ণপাঠ

আবদুল আলী গারুলী ও নিবারণ সুন্দরীর পুথি

সায়ের — মুন্সী মোহাম্মদ ইউনুছ

প্রশস্তি

পয়ার॥ প্রথমে প্রনাম করি প্রভু কর্তার॥ ছায়া নাই কায়া নাই শূন্যের আকার॥ হস্ত নাই পদ নাই নাহি তার শির॥ অখণ্ড মহিমা প্রভুর নির্মল শরীর॥ নাহি খায় অন্ন দানা নাহি যায় ঘুম॥ কি হালেতে চলে বান্দা সদায় মালুম॥ চুরি কি ডাকাতি কিম্বা করে জেনাকারী॥ এক দৃষ্টে দেখে আপে আল্লাবারী॥ বান্দাকে করিয়া পয়দা প্রভু নিরাঞ্জন॥ দুনিয়ায় ভেজিয়া দিল বন্দেগী কারণ॥ বদেতে নারাজ প্রভু নেক কামে রাজি॥ সেখানে না খাটিবে দুনিয়ার ফেরেব বাজি॥ তিলে তিলে হিসাব লইবে আল্লা সাই॥ ঐ সময় কান্দিলে বান্দা উপায় বুদ্ধি নাই॥ সময় থাকিতে কর আখেরের কাজ॥ জাতে আল্লা রাজি থাকে না হয় নারাজ॥ প্রভুর প্রশংসা এবে রহিল ধারণ॥ মা বাপ ওস্তাদের কথা শুন দিয়া মন॥ নতশিরে নমস্কার ওস্তাদ চরণ॥ কাব্যতে জার যতে পাইল স্মরণ॥ জনক জননী পদ বন্দি বহুবার॥ তাদের চরণে মোর শত নমস্কার॥ মোহাম্মদ ইউনুছ কহে মন করি ভীত॥ ক্ষমিবে জানিলে দোষ বালক চরিত॥ আমি অতি মূর্খ মতি বিদ্যা বুদ্ধি হীন॥ ছোট কালে পাঠশালাতে পড়েছি কত দিন॥ বিদ্যা বুদ্ধি হীন কিন্তু মূর্খ পণ্ডিত॥ সায়েরী করিতে ইচ্ছা মনেতে বাঞ্ছিত এই পর্যন্ত ক্ষান্ত দিনু এই সব বাণী॥ প্রভু স্মরি আরম্ভিনু কেচ্ছার কাহিনী॥

কেচ্ছা-আরম্ভ

ধূয়া—শুন সাধু ভাই॥ আবদুল আলীর গুণের সীমা নাই॥ প্রভুর নাম আরাধিয়া, রছুলের নাম মনে লিয়া, আবদুল আলীর গান লইয়া চলিলাম দুটি ভাই॥ আবদুল আলী নাম খানি, বাড়ী ছিল বাল্পা কাটি, রূপে গুণে পরিপাটি, সমান কেহ নাই॥ বয়েস যখন বৎসর কুঁড়ি, হাওয়া খায় অশ্বে চড়ি, বরিশাল জিলাতে গেল তামাসা॥ তাহার নাই॥ সেথা যাই কিবা করে, সহর ঘুরিয়া ফিরে, আচম্বিতে ঘাড়ওয়ালের এক দলে পড়ে যাই॥ পাহারূয়া ঘাড়ওয়াল তারা, নিত্য কর্ম্ম সর্প ধরা, শত শত সর্প রাইখেছে খাঁচাতে আটকাই॥ দাঁড়াইয়া আইলা চন্দ্রপোড়া, দুধরাজ তিলইক্কা বড়া, পানক শঙ্খিনী কত লেখা জোখা নাই॥ ঘাড়ওয়ালের এক মেয়ে ছিল, বয়স পনর ষোল, আসি চেয়ে চুল ঝাড়ে চিরুণী লাগাই॥ যেনছা মেয়ের মুখের ছটা, নারঙ্গী হ্রদের গোটা, হুর পরী মোহ যায় থাকুক গোসাই॥ কপালে তিলকে ফোঁটা, জানু সম কেশের জোটা, আকুলার আছে কন্যা বিবাহ হয় নাই॥ মায়ের দুর্লভ ধন, নাম রাখে নিবারণ, আচম্বিতে আবদুল আলীর নজর পড়ে যাই॥ নিবারণকে চক্ষে দেখি, পলক না মারে আখি, প্রেম বান হৃদে আসি বিন্ধিলেক সাই॥ আবদুল আলী যেই স্থানে, নজর করে নিবারণে, দুই জনের দৃষ্টির প্রেম চক্ষের আসনাই॥ দু-জন দুইখানে রহে, ছটফট অঙ্গ দহে, ভঙ্গ প্রেমে কদাচিত রঙ্গ লাগে নাই॥ কহে কবি হীন মতি, চৌপদীতে দিতে ইতি, আবদুল আলীর বিবাহ কথা

পয়ারে জানাই॥

পয়ার॥ এইখানে আবদুল আলী ভাবে মনে মনে কি রূপে মিলন হবে নিবারণের সনে॥ ভাবিয়া চিন্তিয়া এক বুদ্ধি করে সার॥ সর্পের কুণ্ডলী বিনা নাদেখি বিস্তার॥ তামাম দিবস ভরি খাড়া ছিনু এথা॥ একজন ঘাড়ওয়ালের নাহি পাই কথা॥ শত জন মধ্যে এক নাহি পুছে বাত্॥ কেমনে করিব প্রেম নিবারণের সাথ॥ এবলিয়া প্রভু নাম স্মরণ করিয়া॥ সর্প সব বন্ধ করে কুণ্ডলী ফুঁকিয়া॥ সে সময় দিনমনি লুকায়ে অন্তরে॥ রাত্রি ভর রহে আবদুল দোকানীর ঘরে॥ প্রভাতে ঘাড়ওয়াল সব করে কোন কাম॥ সর্প ঝুড়ি কান্ধে লিয়া চলিল গেরাম সর্প নাচ বায়ানা যাব যেইখানে হৈল॥ ঝুড়ি হইতে সাপ নিকলিতে না পারিল॥ সরম পাইয়া সবে আসিল ফিরিয়া॥ সবে মিলে করে যুক্তি নিরাল্লা বসিয়া॥ জেন্দেগী ভরিয়া সর্প নাচাইয়া খাই॥ আজি কেনে সবের এই দশা হইল ভাই॥ নছিবের দোষে কহে এক জন॥ আর ২ জন বলে তাহা না হবে কখন॥ কলা যে বিদেশী এক মোদের মকাম॥ সারাদিন খাড়া ছিল তার এইকাম॥ এইকথা শুনি সবে বিশ্বাস করিল হেনকালে আবদুল আলী আসিয়া পৌঁছিল॥ ঘাড়ওয়ালেরা দেখীলেন অলীল নজরে॥ কেহ বলে মার ধর বিদেশীর তরে॥ বুদ্ধিমন্ত জনে বলে না কহ এমন॥ এই জন সামান্য না হবে কদাচন॥ তাঁর দ্বারা হয় যদি মোদের বিহিত॥ তথাপি তাহার নষ্ট না করা উচিত॥ এই কহি ঘাড়ওয়ালেরা করে কোন কাম॥ আবদুল আলী নিকটেতে পৌছিল তামাম॥ ছালাম আলেক দিয়া পুছিল খবর॥ কোথা হৈতে আসিয়াছ কোথা তেরা ঘর॥ উচ্চ কাষ্ট চোকি নিয়া বসিবার দিল॥ পান তামাক দিল বহু সম্ভাষা করিল॥ নিজ হস্তে আবদুল আলীর পৃষ্ঠ যে দোলায়॥ কেহ ২ দাঁড়াইয়া পাঙ্খা করে গায়॥ যত ঘাড়ওয়ালেরা সব খেদমতে রহিল॥ বহু প্রেম করি পরে খানা খেলাইল॥ তাঁর পরে আবদুল আলী পুছিল খবর॥ কি জণ্যে আমাকে এত করহ আদর॥ ঘাড়ওয়াল বলিল তাহা হুজূরে জানাই॥ কল্য যে আপনি এসে ছিলেন এই ঠাই॥ সে হইতেই আমাদের সর্প রাজ যত॥ নাচে ক্ষান্ত হইয়াছে কুণ্ডলীর মত॥ আমরা ঘাড়ওয়ালা সর্প নাচাইয়া খাই হুজুরের নিকটে কসুর মাফ চাই॥ সর্প রাজ করে দেহ সাবেক প্রকার যাহা চাহ তাহা দিব করিনু করার॥ আবদুল আলী আইল মেহমান হইয়া॥ এক জন না পুছিল আমার লাগিয়া॥ সেই জণ্যে বহু গোসা হইল মোর মন॥ কুণ্ডলীতে বন্ধ করি যত সর্পগণ॥ ঘাড়ওয়ালেরা বলে কর অপরাধ মাফ॥ মেহেরবাণী করে ভাল করে দেহ সাপ॥ আবদুল বলেন তবে শুনহ খবর॥ নিবারণের সঙ্গে যদি দেও সয়ম্বর কুণ্ডলী হইতে সর্প করিব খালাস॥ এবে মনস্তাপ ব্যক্ত করহ সম্পাস সবে বলে এই বাতে হইলাম রাজি॥ কিন্তু মত হয় কিনা আপনার মরজি॥ নিবারণকে দিব দ্বিধা ক্ষতি কিছু নাই॥ কোথায় পাইব মোরা এমন জামাই॥ এই কথা বলা করি সকলে মিলিয়া॥ আবদুল আলী সনে দিল নিবারণের বিয়া॥ রঙ্গে চঙ্গে সমাধা হইল শুভ কাজ॥ কুণ্ডলী হইতে মুক্ত করে সর্পরাজ॥ দিন মনি লুকাইয়া রজনী হইলা॥ আবদুল আলী নিবারণের বাসরে পৌছিল॥ নিবারণ আছিলেক পন্থ তাকাইয়া॥ হেনকালে আসিয়া পৌছিল প্রাণ প্রিয়া॥ দোহাকার রূপে দোহে আছিল মগন॥ নিমিষে হইয়া গেল প্রিয়ার দর্শন॥ মধু পানে উন্মত্ত আছিল তার মন॥ তার দ্বিগুণ বৃদ্ধি ছিল নিবারণ॥ শুইল পালঙ্গে যাই কন্যা কোলে করি॥ কানাই পাইল যেন রাধিকা সুন্দরী॥ - ছয়ফল মূল্লুক যেন পাইল লাল মতি॥ রত্ন হেন পদ্ম যেন কন্য পদ্মাবতী॥ সেই মত আবদুল আলী পায় নিবারণ খুসিতে ভুঙ্গিতে হইয়ে তুষ্ট হইল মন॥ এইমতে দুইমাস গত হইয়ে গেল॥ আবদুল আলী নিবারণ কহিতে লাগিল॥ কহিয়া বলিয়া দোহে বিদায় হইল॥ আবদুল আলী নিবারণ দেশেতে পৌছিল॥ আবদুল আলীর মায়ে যদি পাইল খবর॥ পুত্র বধূ দেখে বুড়ি খোসাল অন্তর তুষ্ট হইয়ে পুত্র বধূ তুলি লৈল কোলে॥ লক্ষ লক্ষ চুম্ব দিল শ্রীকণ্ঠ কপালে॥ পুত্র বধূ লয়ে বুড়ি খোসালে রহিল॥ এই রূপে এক সাল গুজারিয়া গেল॥

সর্পের গান আরম্ভ

চিতং মিল॥ আবদুল আলী নিবারণ, খুসি খোসালিতে দোন থাকে হামেহাল, দেখনা বিধিয়ে কিবা ঘটায় জঞ্জাল॥ শুন যত গুণীগণ করিয়ে খেয়াল॥ একদিন নিবারণে, শুয়ে ছিল তুষ্ট মনে, বিছানার উপর॥ স্বপনেতে দেখে এক সর্প অজাগর॥ কহিতে লাগিল সর্প নিবারণ গোচর॥ নিবারণ তোমাকে বলি, তোমার পতি আবদুল আলী, জ্ঞানে সর্প ধরিতে, পাইয়া খালি দক্ষিণ মুখি থাকি ঝাড়াতে॥ দৌল্ল। একটা পাঠা, নিবে আমায় ধরিতে॥ এমন স্বপন দেখে, নিবারণ শুয়ে শয্যাতে, চমকি উঠয় আচম্বিতে, দেখে আবদুল বলে হায়রে হায়॥ কি জণ্যেতে প্রিয়ম্বিনী কাঁপে সর্ব্ব গায়॥ শান্ত হয়ে নিবারণে কহে আবদুলের স্থানে॥ শুন দিয়া মন, যেইমতে আসি সর্পে দেখাইল স্বপন, একে২ আদি অন্ত কহে নিবারণে॥ এত শুনি আবদুল আলী, প্রভুর নাম নাহি বলি, দর্প করে কয়, পাঠা বলি চাহে সেই কোন সর্প হয়॥ পাঠা নাদি ধরব সাপ তাতে কিবা হয়॥ দাড়ি মাঝি ডাকি তখন বলে নৌকা কর সাজন, যাব সর্প ধরিতে, অধিন বলয় তোমার মৃত্যু নিকটে॥ প্রভু নাম পাশরিলা মরণের পথে॥

আবদুলের মায়ের বিলাপ

ধূয়া—বাছারে তোরে, মায়ে নিষেধ করে॥ আবদুলেরে যেওনা দুঃখিনীর বাছা, তোরে মায়ে নিষেধ করে॥ সর্প ধরিতে যারে আবদুল চড়িয়া নৌকায়॥ পাষাণ হৃদে মারি কান্দে আবদুল আলীর মায়॥ যেওনা যেওনা বাছা সর্প ধরিবার॥ ছটফট করে যেন কলিজা আমার॥ এক মায়ের এক পুত্র নির্দ্ধনীর ধন॥ তোমায় ছাড়িয়া মায়ে ত্যজিব জীবন॥ বারে বারে যাওরে নিমাই নাহি করি মানা॥ আজি কেন মায়ের মনে প্রবোধ মানে না॥ নাহি যাও বাছা ধন মায়ের কথা শুনি॥ আজিকার মহিম ক্ষেন্ত কর যাদু মনি॥ এইমত কান্দি কান্দি বুঝায় তার মায়ে॥ কিছুতেই না মানিল মায়ের কথারে

চিত্তৎ মিল॥ তেরশ পন্নর সনে, মাঘ মাসে আট দিনে, বরিশাল জিলায়, বরিশালের অন্তর্গতে ঘটনা উদয়॥ কহিতে সেসব কথা প্রাণে নাহি শয়॥ সে-সব কথা বলিতে, বাসনা হইল মনেতে; শুনেন সর্ব্ব জন, কর্ণ লাগাইয়া শুনেন সে-সব কথন॥ কিরূপে সে আবদুল আলী হইতেছে মরন॥ বাড়ী ছিল ঝালপা কাটি, রূপে গুণে পরিপাটি, এক বিবি ছিল তার, সত্তর খানি নৌকা ছিল তার আজ্ঞা কার॥ সর্প ধরা বিনে তারগো না ছিল কারবার॥ মাঘ মাসের আট রোজেতে, লোক জন লইয়ে সাথে সর্প ধরিতে, সত্তর খানি নৌকা লই গেল পাটুয়াখালিতে॥ লোকজন রাখি আবদুল উঠিল কূলেতে॥ জননী ও নিবারণে, দাড়ি মাঝি সর্ব্বজনে রাখিয়া নৌকায়, একেলা চলিল আবদুল সে সর্প যথায়॥ সর্পের ঘাড়া দেইখে পরে নিরখিয়ে চায়॥ কোথ্বায়রে ডাকচ্ছ সর্প, করিয়া মহা দর্প, এখন রহিলে কোথায়॥ ছত্রিশ রাগিণী আবদুল বাণীতে ফু কয়॥ শুনিয়া সে বাণীর সুর, সর্পে অন্তরে ফুলায়॥

পয়ার॥ সর্প উঠা মন্ত্র ফুকে বাণীর ভিতর॥ ঘাঁড়ার সম্মুখে আবদুল কহে বারেবার॥ আগে তুমি নিবারণকে দেখাইছ স্বপন॥ আমায় দেখিয়া কেনে রহিলে গোপন॥ দোলা পাঠা আনিয়াছি তোমার লাগিয়া॥ ঘাড়া হইতে উইঠে একবার যাও দেখা দিয়া॥ শীঘ্র আস ঘাড়া হইতে না করিও ভয়॥ না উঠিলে ঘাড়া খুদি ধরিব নিশ্চয়॥ একেত ছিরের বাত আর বিনার সুর॥ শুনি উঠে মহা সাপ যুক্তি করি চূর॥ কবি বলে আবদুলেরে বিধি হৈল বাম॥ ঘাড়া হইতে অঙ্গ ফুলাই উঠে সঙ্কুরাম॥

চিত্তং মিল॥ কোম্পানীর ইঞ্জিলের কলে, বল চিপিলে ধুয়া চলে সোং শব্দ ভয়ঙ্কর, সেইমত উঠে সর্প করি চূর্ণকার॥ শুনিয়া সে শব্দ আবদুল কাঁপে থরং॥ হু হুঙ্কার করি সর্পে, মাথা তুলে মহা দর্পে, চক্ষু মেলি চায়, এক মুটি ধলা মারে সে সর্পের মাথায়,॥ নাহি মানে ধলাঁ পড়া অমনি সে পেচায়॥ পেচাপেচি বিষম পেচি, হাড় মাংশ লিল খেচি, আবদুল বলে হায়রে হায়, কোথা রৈলে মা জন্মী সর্পে মোরে খায়॥ কোথা রৈল নিবারণ এসনা ত্বরায়॥ সোয়া হাত সর্প ছিল, পাচত্রিশ হাত হইয়া গেল, নামে শঙ্কররাম সতর জোড়া বাশের সঙ্গে অমনি পেচায়॥ ডলকে ডলকে রক্ত পড়ে সে বাশের গোড়ায়॥ আবদুল আলীর বিলাপ।

পয়ার॥ আহারে পাপিষ্ট সর্প দুষ্ট দুরাচার॥ বন্ধ সঙ্গে দর্প করি হইলাম সংহার॥ নিবারণের সঙ্গে কত করিলাম জেদ॥ মরণ কালে না শুনিলাম মায়ের নিষেধ॥ কৈয়রে পবন যাই জননীর কাছে॥ তোমার পুত্র আবদুল আলী সর্পে ধরিয়াছে॥ কোথায় রৈল ইষ্ট মিত্র কোথায় বন্ধুগন॥ কোথায় রৈল সতর খানি নৌকার মহাজন॥ কোথায় রৈল দাড়িমাবি কোথা লোক জন॥ নিদানে পাইয়া সর্পে বধিল জীবন সিমাল ধুতি জরীর টুপি কোথায় চেকন॥ কোথায় রৈল অঙ্গের ভূষন কোথায় নিবারণ॥ মনেতে আশঙ্কা করি মোরে খাইবার॥ এখন যদি নিবারণ পায় সমাচার॥ কখন খাইতে না পারিবে কদাচন॥ এতবলি আবদুল আলী জুড়িল কান্দন॥ নছিবেতে ছিল সর্পের দংশতে মরণ হায়ং কোথায় রৈল গুণের নিবারণ॥ কৈয়রে পবন তোমার পুত্রের মরণ॥ তালাশ করিয়া তারে আনো এইক্ষণ॥ এইমতে বিলাপিয়া কহে প্রভুস্থান॥ হেনকালে খবরুয়া আইল একজন॥

চিত্তং মিল॥ কাটাখালীর তমিজুদ্দিন, তাঁর ভাই মফিজদ্দিন, সে রুশ কাটিতে যায়, এক ফোটা রক্ত পড়ে তমিজুদ্দিনের গায়॥ এহাল দেখে ধায় তমিজ সাপরিয়া যথায়॥ আরও রক্ত বাশের গোড়ায়, দেখিয়া উপরে তাকায়, নজর করে চায়, সর্পের পেচে দেখে এক মানুষ তথায়॥ পেচাইয়ে ধরেছে সাপে বাশের আগায়॥ দেখি সেই মহা সাপে, তমিজুদ্দির অঙ্গ কাপে, ভয়েতে পালায়, নদীর কিনারে থাকে ডাকে সাপুড়ায়॥ সাপের মুখে একজন মানুষ মারা যায় সাপেরাং ভাই ডাকি, তোগো এক জন মানুষ নাকি, আজি সাপে ধরে খয়ার॥ একথা শুনিল কেবল আবদুল আলীর মায়॥ কি হৈল কি হৈল বলি এগো ভূমিতে লুটায়॥ জননীর দোসরা বিলাপ।

পয়ার॥ যুবে এই কথা মায়ের কর্ণেতে শুনিল॥ আত্মঘাতি হৈয়ে মায়ে ভূমিতে পড়িল॥ কি শুনিলাম কি শুনিলাম ওরে যাদু মণি॥ কে কহিল কে কহিল মোরে এই বাণী॥ কেনে যাদু মায়ের কথা করিলে অবোধ॥ কে নিল কে নিল মায়ের প্রাণের আবদুল॥ কে নিল কে নিল মোর চক্ষের আঞ্জন কি হৈল কি হৈল মোর নয়ানের ধন॥ কে নিল কে নিল মায়ের নয়ানের জ্যোতি॥ কে নিল কে নিল মায়ে হব আত্মঘাতি॥ কে নিল কে নিল মায়ের বুক কৈরে খালি॥ কেমনে দংশিলে সাপ মায়ের আবদুল আলী॥ নিবারণের বিলাপ।

চিতং মিল॥ এমত বিলাপি করে, ধৈর্য্য ধরাইতে নারে, আবদুল আলীর মায়, পোঁড়ামুখি কপাল তোর মন্দ হইয়ে যায়॥ গোস্বা হইয়ে নিবারণের লাথি মারে গায়॥ ছিল ঘুমেতে, শ্বাশুড়ীর পৃষ্ঠাঘাতে, অমনি উদ্দিশ পায়॥ ঘুমের ঘোরে শ্বাশুড়ীয়ে কি জন্যে জাগায়॥ কান্দি কান্দি কহে কথা আবদুল আলীর মায়॥ নিবারণ ভাল কপাল দোষে, পতি তোর সর্পে দংশে, কহিনু তোমায়॥ নছিব হইল মন্দ দংশে শঙ্খরায়॥ কি করগো নিবারণ শুয়ে বিছানায়॥

পয়ার॥ এক লাথি দুই লাথি তিন লাথি পর॥ চৈতন্য লাভিত কন্যা নিবারণ সুন্দর॥ কি হৈল কি হৈল বলি কান্দে উভরায়॥ আহা বিধি বজ্রাঘাত পড়িল মাথায়॥ কেমন সর্পে খায় জানি পতি প্রাণ ধন॥ আহা প্রভু দুখিনীয়ে ত্যাজিব জীবন॥ সে সর্পের দংশন পাইলে মারিতাম কাছাড়ি॥ আহা বিধি হইলাম বুঝি কাঞ্চন রাড়ি॥ এমত বিলাপি কন্যা কান্দে উভরায়তাহা তৈল সিন্দুর মাথে দিয়ে আরশি ধরি চায়॥ সিতায় সিন্দুর হইলেক মলিন আকার॥ হায় হায় পতি বিনে জীবন অশার॥ আবদুল শোকেতে কান্দয় নিবারণ॥ পশু পক্ষী কান্দে আর পারা পরশিগণ॥

চিতং মিল॥ শোগেতে মউজ উইঠ্যে, নিবারণের হৃদ্র ফাটে, বলে শ্বাশুড়ীর সদন, স্বামী আদর্শনে করব গরল ভক্ষণ॥ বিদায় দেহ জননী মা যাব পতীর দর্শন॥ পাগলিনী মত কান্দে, কেশ বেশ নাহি বান্ধে, কান্দে উভরায়, দোল্লা পাঠা লিয়া গেল সে সর্প যথায়॥ সাপের পেছে দেখে পতি বাশ জুড়ার আগায়॥ নিবারণ সেখানে গেল, দৌল্লা পাঠা বলি দিল, সর্প নামের পর, চতুরদ্দিকে লোক খাড়া কাতারে কাতার॥ হায় হায় করে কেহ কান্দে জারেজার॥ একের মুখে একে শুনি এক, ধেয়ে এল শত লোক, সে সর্প চাইতে, কুল বধু যুবা মেয়ে আইল দেখিরত॥ উকি মারি দেখি আবদুল সর্পের পেচেতে॥ থাকুক পুরুষ যত, রমণীগণ শত শত, এল ধাতা ধাই এক বধু কহে একে জামিনালো রাই॥ সর্পের গাছে মানুষ তোলে এমন শুনতে পাই॥ এক বধু লগী করতে, লোটা হাতে বাহিরেতে, আসি শুনতে পাই, গাছের গোড়ায় লোটা রাখি লোক চলিল ত্বরায়॥ কত বধু ধেয়ে এল বস্ত্র নাহি গায়॥ হাজারে হাজারে লোক, আসি জমা হইলেক, দেখে আবদুলের মরণ, কেহ কান্দে কেহ ধন্ধে অজ্ঞান যেমন॥ কেহ হইল হুশ হারা কেহ ভয়ে কম্পমান॥ সরস্বতী আসর যেন, চারিদিগে লোকগণ, মধ্যে গায় গান সেইরূপ খাড়া লোক মধ্যে স্বামীর বিচ্ছেদ ধ্বনি খোকাকুলি মন॥

পয়ার॥ তার পরে নিবারণ করে কোন কাম॥ করিয়া মোহিনী বস্ত্র পড়িল তামাম॥ মন্ত্র পড়ি ঘিগাজ কড়ি জমিনে ফালায়॥ ভোঁ শব্দ কড়ি২ উঠিল ত্বরায়॥ কড়িকে বলিল ধ্বনি আগে ছিলে যার॥ আগে ছিলাম তব পিতার এখন তোমার॥ মোর যদি হবে কড়ি কহি বারে বার॥ মস্তকে কামড়ি ধর সর্প শঙ্কুরার॥ এতশুনি সেই কড়ি কুদিয়া চলিল॥ সর্পের মস্তকে সেই কামড় মারিল॥ নড়িতে চড়িতে সর্পের শক্তি না রহিল॥ ষোল পেচি লেজ ক্রমে খসাইতে লাগিল॥ থেকে কড়ি সর্পের মুখে মারহ ঠোকর॥ নিদানে সে দুষ্ট সর্প হইল কাতর॥ আপন লেজের পেচ খসাইয়া লয়॥ পঁয়তাল্লিশ হাত সাপ ছিল সোয়া হাত হয়॥ গড়াইয়া দুষ্ট সর্প মাটিতে গিরিল॥ আবদুল আলী বাশের ঝাড়ে আটক রহিল॥ কেহ যাই আবদুলেরেরে নিল নামাইয়া॥ নিবারণ রাঁখে সর্প পাতিলে ভরিয়া॥ যেই বাশ পরে সর্প উঠাইয়া ছিল॥ সেই বাশে ডাল ভাঙ্গি পিঠেতে লাগিল॥ সাপ কাটা তন্ত্রে ঝাড় ফুকে ঘনে ঘন॥ বহুক্ষণ ঝাড় ফুকে কিছু হুশ হন॥

থানায় এজহার ও পুলিশের তদন্ত। নিদারুন স্বামীকে নিয়ে, নাসিকাতে হাত রাখিয়ে, শ্বাস ধইরে চায়, কিঞ্চিৎ বিলম্বে তার, কিছু নিশ্বাস পায়॥ দশটি টাকা দিয়ে নিল আরজি থানায়॥ দারগা জিজ্ঞাস করে, মৈল বেটা কি প্রকারে, কহিল মোরে সাপ কাটা রুগি এই কহিল তারে॥ একথা হীরালাল বাবু বিশ্বাস না করে॥ সাপ কাটা লাশ হইলে, হাত পাও কেন তাঙ্গিলে, সত্য কৈরে কও, অনাছক কথা কেন কহিয়া বাড়াও॥ পষ্ট ভাবে কথা বৈলে সম্মান নিয়ে যাও দেখ চিনা বেত দিয়া, ফাট্টাইয়া দিব টিয়া, বুঝিবে পাছে, স্বামী মেইরে বলছে মাগি সর্পে কাটাইছে॥ এসব কথা নাহি খাটে পুলিশের কাছে॥ এত শুনি নিবারণে, ভয় পেয়ে মনে মনে, বুদ্ধি কৈল সার, দশ টাকা গোপনে দিল হাতে দারগার॥ ঘুস পেয়ে হীরালালে কহিল সভার॥ নিবারণের জবান বন্দি, শুনি সব কথার সন্ধি, চলে ঘটনার স্থান, তদন্ত করিয়া পরে আসে তুরমান॥ উপরে লিখিয়া দিল সর্পে কাটা মরণ॥

উভয়ের বিলাপ

চিতং মিল॥ সেথা হইতে নিবারণে, পতি লয়ে নিজ স্থানে, কেন্দে যায়, উচ্চস্বরে ধরি কান্দে শ্বাশুড়ীর গলায়॥ হেলায় হারাইনু আমি পতি স্বামীরায়॥ আবদুল আলীর মায়ে বলে, কেন বিধি দেখাইলে, পুত্রের চন্দ্র মুখ, পাষাণে মারিয়া মাথা ফাটালে বুক, কোথায় চেল্লাছ বাচা আমায় দিয়ে দুঃখ, এক পুত্র ছিলা তুমি, রূপে গুণে মহানামী, দুঃখিনীর ধন, বিদেশে আশিয়া বাছার হইল মরণ॥ এত শুনি কান্দে যত নৌকার মহাজন॥ বধূ শ্বাশুড়ী কান্দে, কেশ বেশ নাহি বান্ধে, করে হায় হায় আহা বিধি, কিবা দুঃখ ঘটালে আমায়॥ কি দোষে শ্বাশুড়ীগো আমার নছিব টইলে যায়॥ এইমতে বিলাপিয়া সর্পের পাতিল হাতে লইয়া, কহিল বচন, আমার পতিকে সর্প কৈরাছ দংশন॥ দেখ পতির দাদ তোমায় করিব সোহন॥ শুন কহি ওরে পাপ, তব চেয়ে বুড় সাপ, নিজ গুণেতে দর্প চূর্ণ করি লাথি মারি মুণ্ডেতে॥ সেই জনের স্বামী মারা যায় তোর হাতে॥ শত পঞ্চ ভাবে তাহা, হিসাবেতে হয় যাহা, তোমার মুখেতে, উঠাইয়া নিব আমি নিজ গুণেতে॥ খণ্ড তোমার মুণ্ড কৈরব পরেতে॥ এমত বড়াই কৈরে কহে কথা সে সর্পেরে, একে নাহি ভার, অহিন বলয়ে গুণ না লাগিবে আর॥ আরশে থাকিয়া আল্লা হইল বেজার॥ নিবারণে বলে সর্প, কোথায় রে তোর মহাদর্প, রহিল এখন॥ একা পতিকে পাই, করেছ দংশন॥ মন্ত্র ফুকি করে অঙ্গে দিল নিবারণ, তখনে যাইয়া কড়ি, আবদুল আলী সর্পের মুণ্ডে বসে চড়ি, কি কর্রে তখন॥ ঘনে ঘনে মন্ত্র ফুকে গুণের নিবারণ, দেখনা কি হাল ঘটায় প্রভু নিরাঞ্জন॥ .

পয়ার॥ . তার পরে কিবা হয় শুন গুণিগণ॥ কড়ি প্রতি আদেশ করিলু নিবারণ॥ কড়িকে বলিলে তুমি আগে ছিলে কার॥ পূর্ব্বে ছিলু তব পিতার এখন তোমার॥ মোর যদি হও তুমি হইলাম খুসি॥ শত পঞ্চ অংশে যাহা লও শীঘ্র চুসি॥ হুকুম পাইয়া কড়ি করিল পালন॥ নিবারণ মন্ত্রপাঠে ফুকে ঘনেঘন॥ প্রভুর আদেশ রদ হইবার নয়॥ আজাজিল তরে প্রাণ হুকুম করয়॥ যাওরে সয়তান তুমি নিবারণের দেলে॥ যত মন্ত্র ভুলাইয়া দেহ এক কালে॥ আমার ভরসায় বেটি না করিল কাজ॥ এখন তাহারে আমি কি দিব লাজ॥ আজাজিলে সয়তান লই প্রভুর আদেশ॥ নিবারণের শরীরেতে করিলে প্রবেশ॥ গাও মুণ্ডে সর্প মুখ একত্র করিল॥ সে সময় আজাজিল মন্ত্র ভুলাইলু॥ ঘুরাই ফিরাই মন্ত্র পড়ে বারে বার॥ কোন মতে না পারে পড়িতে পুনঃবার॥ কড়ির দংশনে সর্প আছিল হয়রান॥ মন্ত্র ভুলনেতে সর্প পাইল আছান॥

চিতং মিল॥ মন্ত্রের জোর না পাই কড়ি, সর্পের মুণ্ড দিল ছাড়ি কড়ি গড়াইয়া পড়য়॥ খালাস পাইয়া সর্প ভরিল গোস্বায়॥ দেখনা কি হাল পয়দা করিল খোদায়॥ গোস্বা হৈয়ে সেই সাপ, শ্বাস ছাড়ে অগ্নি তাপ, ভয়ে নিবারণ, হায়ে মুখে সদা পাগলের লক্ষণ॥ সমকালে পাশরিলা প্রভুর স্মরণ॥ গোস্বায় সে শরায়ে, অগ্নি শমশের হৈয়ে, লইয়ে মুখে আকাশে উঠিল, লই আবদুল আলীকে॥ আচম্বিতে বজ্রশেল পড়িল বুকে॥ নিবারণ সেই ঘড়ি, আচম্বিতে ভূমে পড়ি, পতির কারণ॥ আহা বিবি এই বুঝি অদৃষ্টে লিখন॥ হারাধন দিয়ে পুনঃ নিলে কি কারণ॥ এই তোর ছিল মনে, কেড়ে নিলে পতি ধনে, প্রভু নিরাঞ্জন॥ এপোড়া যৌবন আর রাখি কি কারণ॥ স্বামী বিনে কামিনীর বিফল জীবন॥ হায় বিবি কি করিলে, দুঃখানলে ভাসাইলে নাহি দেখি কূল॥ অধিন বলয় তোমার, দিশা হৈল ভুল, যার পাশে কান্দ তুমি সে বিপক্ষের মূল॥ জননীর তেসরা বিলাপ। চিতং’মিল॥ কেহ যাই খবর পৌছে, আবদুল আলীর মায়ের কাছে, কহিলেক যাই॥ তোমার পুত্র নিল সর্পে শূন্যেতে উড়াই মূচ্ছাঘাত ভূমে পড়ি লুটাইয়া॥ হায় কেরে বুড়ি, মাথায় মারে সোটার বাড়ী, উন্মত্তর প্রায়॥ এমনি ললাটে লিখে ছিলে বিধাতায়, মাতা রেখে পুত্র আগে স্বর্গে চলে যায়॥ নিবারণের কেঁদে বলে, শ্বাশুড়ীর ধরি গলে, প্রাণ ফাটে যায়॥ কোথা গেলে পাব আমি বাকা শ্যামরায়, কোথা নিল দুষ্ট না জানি নিশ্চয়॥ -

পয়ার॥ এইখানে এইকথা রহিল বারণ॥ আবদুল আলীর কথা কিছু শুন গুণিগণ॥ আবদুল আলীকে নিয়া সর্প দুরাচার॥ ধুলাদি নগরে গিয়া হইল নমুনার॥ গৃহস্থের বধূ এক সেই নগরের॥ ঝাড় কাশ করিতে আছিল উঠানের॥ মেঘের গর্জ্জন মত কম্পিত মেদিনী॥ শুনিয়া আকাশ পানে দেখে সেই ধনি॥ শূন্যে দেখে অজাগর-মনুষ্য তার মুখে॥ দেখি বধূ শ্বাশুড়ীকে ঘনে ঘনে ডাকে॥ দেখগো শ্বাশুড়ী আসি করিয়া নজর॥ মুখেতে মানব শূন্যে উড়ে অজাগর॥ তাওনিয়া যত নারী ধাইয়া আসিল॥ হায়ঃ শব্দ মুখে বলিতে লাগিল॥ কাহার বাচাকে জানি সর্পে নিয়ে যায়॥ হায় জানি কেমনে রহিয়াছে তার মায়॥ অবলা কালেতে বধূ মা বাপের ঘর॥ মিয়াজির নিকটে শিখিয়াছিল মন্তর॥ আচম্বিতে সেই কথা হইল স্মরণ॥ শ্বাশুড়ী নিকটে বধূ কহিল তখন॥ শুনগো শ্বাশুড়ী আমি তোর পায়ে ধরি॥ আপনার হুকম হইলে লামাইতে পারি॥ এইকথা শ্বাশুড়ীয়ে যখন শুনিল॥ খুসি হৈয়ে বধূ প্রতি হুকম করিল॥ হুকম পেয়ে মন্ত্র পাঠে হস্তের তুড়ি দিয়া॥ মৃত্তিকাতে তিন বারি মারিল কসিয়া॥ উর্দ্ধমুখি মৃত্তিকাতে ধুম জ্বালাইল॥ সেই সহরেতে সর্প লামিয়া আসিল॥ সর্প পাড়ি মারিলেক অজাগরের গায়॥ পঁয়তাল্লিশ হাত সর্প ছিল সোয়া হাত হয়॥ ফের সর্প পড়িয়া দিল সেই ধনি॥ চুঙ্গল হইতে মুখ উঠায় তখনী॥ পুনঃবার সর্প মারে বিধী নেক্কার॥ দংশঘাতে মুখে বিষ করিল আহার॥ তার পর সর্প রাজ বিদায় হইল॥ দণ্ড চারি বাদে আবদুল উঠিয়া বসিল॥ সকলে বলিল তারে কিবা তোর নাম॥ কোন জাতি হও তুমি কোথায় মোকাম॥ একথা শুনিয়া আবদুল কান্দিয়া উঠিল॥ আদি অন্ত সব কথা প্রকাশ করিল॥ বিধীকে ডাকে মা মিয়াকে ডাকে বাপ॥ দাওয়া পানি করে বিধী যেমন এনছাফ॥

পতি অদর্শনে নিবারণের খেদ

ধুয়া—বন্ধু আড়নয়নে ও নাথ আড়নয়নে ও তারে আড়নয়নে দেখিলাম না।

ত্রিপদী॥ অবলা কালেতে নাথ, বিয়া হৈল তোমার সাথ, এক দিন না বঞ্চিনু সুখে॥ মা বাপের ঘরে ছিন্নু, পতির কি ধন না বুঝিনু, একে মোর জীবন গেল দুঃখে॥ তুমি নাথ দূর দেশ, আমি নারী তনু শেষ, ভাবিতে ভাবিতে হয় ক্ষয়॥ মনে কহে কিবা করি, আত্মঘাতি হৈয়ে মরি, বিষ খেয়ে মরিব নিশ্চয়॥ আহা সর্প দুষ্ট মতি, কোথা লুকাইলে পতি, তাহা নাহি জানি অভাগিনী॥ নিষ্ঠুর তোমার মন, কেড়ে পতি প্রাণ ধন, দুঃখিনীরে কল্পে কাঙ্গালিনী॥ একবার বাশ গছে, অভাগিনী যায় পৌঁছে, নামাইনু পেয়ে বড় দুঃখ॥ ফের তুলি আকাশেতে, কোথায় নিলা আচম্বিতে, নাহি দেখি পতি প্রাণ মুখ॥ এমত আক্ষেপ মনে, কান্দে সতী নিবারণে, মুখে সদা করে হায় হায়॥ কোথা রৈল প্রাণ প্রিয়া, অভাগিরে পাশরিয়া, মন দুঃখে বারমাসী গায়॥

নিবারণের বারমাসী

চিতং মিল॥ প্রথম মাঘ মাসে, মোর পতি সর্পে দংশে, দুঃখে গেল মাস॥ নূতন নূতন যুবতীরা মন অভিলাষে, স্বামী পাশে থাকে খোসে মোর সর্ব্বনাশ॥ এই ত জাড়ার দিন, যুবতী রমণী গণ, জুরাজুরী হয়॥ গোয়ায় তারা পতি কোলে লই, আমি দুঃখি পোড়া মুখি, পতি ঘরে নাই॥ আইলরে ফাল্গুন মাস, মোর পতি দূর দেশ, আছে কিনা নাই॥ আরশি ধরি চাহে সিন্দুর মলিন হয় নাই॥ মাঘে সর্পে নিচে দিবে, ফাল্গুনে পৌঁছাই॥

পয়ার॥ চৈত্র মাসে শ্বাশুড়ীগো হালিয়ার বনে বিচ॥ আনগো কোটরা ভরি খাইয়া মরি বিষ॥ একেত রবির জ্বালা প্রচণ্ড অনল॥ সমুদ্রেতে ঝাপ দিলে না লাগে শীতল॥ এইত বৈশাখ মাসে সুশাগ নালিতা॥ সব লোকে খায় সাগ মোর হস্তে তিতা॥ অঙ্গে পাখা নাই পতি পাশে উড়ি যায়॥ বান্ধব নাহিক কেহ সংবাদ পাঠাব॥ জ্যৈষ্ঠ মাসে খায় সবে আম কাঁঠাল রসে॥ কারে লইয়া খাব আজি পতি নাই দেশে॥ আমিত অবলা নারী পতি ঘরে নাই॥ রজনী কাটাই আমি কার মুখ চাই॥ আষাঢ়েতে নব জল খালে আর বিলে বন্ধু নাই ঘরে কেবা জল ঢালে॥ অবলা কালেতে মোর না পুরিল আজ॥ হায় নাথ অভাগিনী সমূলে নাশ॥ শ্রাবণ মাসে পতি স্বামী নয়া-নবীন খায়। মোর কপালে মন্দ পতি সর্পে নিয়ে যায়॥ আহারে পাপীষ্ঠ সর্প দুষ্ট দুরাচার॥ কোথা নিয়ে রেখে পতিকে আমার এইত ভাদ্র মাসে গাছে পাকা তাল॥ যোগের যোগিনী হইয়া হস্তে লইব থাল॥ হস্তে থাল লই আমি ভিক্ষা মার্গি খাব॥ যথায় গেছে প্রাণ নাথ তথায় চৈলে যাব॥ আশ্বিন মাসেতে নাথ বরিযার শেষ॥ না আসিল প্রাণ বন্ধু না পুরে আবেশ॥ কার্তিক মাসে অবলার প্রাণ নহে স্থির॥ সমস্ত রজনী কান্দি চক্ষে বহে নীর॥ হেন কালে কেবা আসি কহিল বচন॥ থাকহ ধৈর্য্য ধরি ওরে নিবারণ॥ পৌষ মাসে তোমার পতি আসিবে নিশ্চয়॥ মন বাঞ্ছা হবে পূর্ণ নাহি কিছু ভয় এত শুনে খুসি প্রাণে গায় হৈল বল॥ কৃষিয়ে পাইল যেন বরিযার জল॥ শিশুয়ে পাইল হাতে পুর্ণিমার চাঁদ॥ অন্ধজনে পায় যেন পুনঃ চক্ষু দান॥ অঘ্রাণ পৌষ কাটে ধনি হস্তেতে গুনিয়া॥ এই মাস বাদেতে আসিবে প্রাণ প্রিয়া॥ সাজ শয্যা করি এথা রহ নিবারণ॥ আবদুল আলীর কথা কিছু শুন দিয়া মন॥ মুলাদি নগরে থাকে যাহার মোকাম॥ দাওয়া পানি করি কিছু পাইল আরাম॥ একসাল সেই খানে গুজরে যখন॥ মাতা বধুর কথা তার হইল স্মরণ॥ গৃহস্তগো বধু যাকে মাতা ডেকে ছিল॥ কহিয়া সভাকে আবদুল বিদায় হইল॥ এই মতে কিছু দিন গুজারিয়া যায়॥ আপনা বাড়িত আবদুল আসিয়া পৌছায়॥ নিবারণে দেখি স্বামী মাতা পুত্রের মুখ॥ কান্দিয়া কাটিয়া সবে পাশরিল দুঃখ॥ মোহাম্মদ ইউনুছ কহে ছালাম আমার॥ ভুল চুক মাফ চাই ওয়াস্তে আল্লার॥ সমাপ্ত।

পত্র লিখিবার ঠিকানা

এম, আবদুল লতিফ, আবদুল হামিদ। চক বাজার, ঢাকা।