বীরনারায়ণের পালা
প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা - চতুর্থ খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন
বীরনারায়ণের পালা দারুণ আন্ধুক্যা নিশিরে আরে নিশি পরভাত হইল। হেনকালে বীরনারায়ণের আরে ভালা ঘুম না ভাঙ্গিল ॥ ঘুমন্তনে উঠতে বাধারে আরে হারুইলে টিক্ মারে। ঘরতনে বাহির হইতে বৈরীরে আরে ভালা দুষ্মনের হাচি পড়ে। যৈবন ডাঙ্গর বয়েস গো আর বীরনারাইণ জমিদারের বেটা। উজ্যাতাম করিয়া বাহির হারে আরে ভালা না মানিল বাধা ॥ উজ্যাতাম করিলে তেও সে রে আরে মনের মধ্যে সন্দে। আইজ দিননি পারয় তাররে আরে ভালা ছন্দে আর বন্দে ॥ ঘর বস্তা উঠবৈস করেরে আর না যায় ঘর ছাইড়ে। বাধা লইয়া উঠছে কুমার গো আর ভালা পড়ে নাকি ন ফেরে ॥ উসারা থাকিয়া কুমাররে আরে গণ্যা ফালায় পাও। উঠক বৈঠক নাইসে কাররে আরে ভালা নাই সে কার রাও ॥ বিয়ান গেল দুপুর গেল রে, আরে দুঃখ, না খাটিয়া। একেলা ঘরের পিড়াত রে আরে ভালা কেমনে থাকে বইয়া ॥ ভাটি বেইল বীরনারায়ণ গো আরে ফাফর হইয়া। ঘর না ছাইড়া বাইর হয় গো আরে ভালা ছুটা হাতে লইয়া॥ একেলা বাইর হইল কুমারে রে আরে সঙ্গে নাই সে কেউ। গাঙ্গের পাড় ধরিয়া চলেরে কুমার আরে দেখে গাঙ্গের ঢেউ॥ দরাম্যা গাঙ্গের পানিরে আরে পানি ভাটি বইয়া যায়। ভরা লইয়া সাউধের ডিঙ্গারে আরে ভালা পবনের আগে যায়॥ এক যায় আর আইরে গো আর তেও সে না ফুরায়। রঙ্গ বিরঙ্গের ডিঙ্গা দেখ্যা আরে ভালা চউখ না জুড়ায়॥ সেই সে সুন্দর তামসারে আরে কুমার দেখিতে দেখিতে। ঘুমাইয়া নারে কুমার গো আরে ভালা বিরক্ষের তলেতে॥ সাম যায় গুঞ্জরিয়া রে আরে সুরুজ বইছে পাটে। এন কালে সোণা কন্যারে আরে ভালা যায় জলের ঘাটে॥ মায়ের আহ্লাদী কন্যাগো আরে বাপের সোহাগী। ভরা কলসী উবরা কইরারে আরে ভালা যাইব জলের ঘাটে॥ ছুডু অতি সোণা কন্যার গো আরে এমুন লয় হইছে। সাম না গুজুরুনে কন্যাগো আরে ভালা জলেরে বাহির হইছে। মনের সুখেতে কন্যাগো আরে চাইয়া চাইয়া যায়। নানা ইতি শোভা দেখ্যা গো আরে ভালা ফির্যা ফির্যা চায়॥ পভাত বেইলের সোণা তেজগো আরে ঢাল্যা দিছে মুখে। সোণার অঙ্গে সোণার ঢেউ গো আরে ভালা ঝলকে ঝলকে॥ চলিতে চলিতে কন্যা গো আরে ডাইনে আর বায়। চৌদিকে নজর কন্যার গো আরে ভালা চাইয়া চাইয়া যায় ॥ চাইয়া চাইয়া যায় কন্যা গো আরে দেখিয়া নয়ানে। চান্দের উদয় যেমুন গো আরে ভালা সুরুজের হিতানে ১ ॥ যাইতে যাইতে কন্যা গো আরে গাঙ্গের ঘাটে গেলা। ঝুমুন্ত সুন্দর কুমারে রে আরে ভালা নয়ানে দেখিলা ॥ দেখিয়া সে কুমার কন্যারে আরে তরাস যে লাগে। যত দেখে তার আউস ২ রে আরে ভালা বলকিয়া ৩ ওঠে ॥ দেখিয়া দেখিয়া কন্যার রে আউস তেও সে না যায়। ঘুরাইয়া ফিরাইয়া চউখ রে আরে ভালা বারে বারে চায় ॥ আড় নয়ানে বার নয়ানে ৪ আরে নিউলিয়া ৫ দেখে। সাম গুঞ্জুরা রাইত হইছেরে আরে ভালা তেও সে না যায় ঘরে ॥ একেত বৈবনের ভার আর উছলে জ্বালা। সুন্দর কন্যা সোণার মন হইল উতালা ॥ মনের গোপন কথা কেউ নাই সে জানে। মনে মনে সপ্যা দিল কেবল জানে মনে ॥ মনেতে গুঞ্জিয়া ৬ মন আড় নয়ানে চায়। কি জানি ভাবিয়া কন্যা কান্দিয়া ভাসায় ॥ “এই ত সুন্দর কুমার জমিদারের বেটা। মুই নারী গিরস্থের ঝি হইছে বিষম লেঠা ॥ বাউন হইয়া চাইলাম আসমান ছুইতে। এই হেন মনের আশ না পারে পুরিতে ॥ মচ্ছি হইয়া চলিলাম উড়িতে আসমানে। মনেরে বুঝাইলে মন ধৈরজ না মানে ॥” ভাবিয়া চিন্তিয়া কন্যার চউখে বয় পানি। পাই বা না পাই তেও সে সপে পরাণ খানি ॥ সমুদ্দরের মধ্যে কন্যা মাণিক পলকে ডুবাইল । আউগ পাছ কিছু নাই যে মনেতে ভাবিল ॥ মনেতে গুঞ্জিয়া মন আড় নয়ানে চায়। নিরাশ হইয়া পুনি কান্দ্যা বুক ভাসায় ॥ মনের আগুনে কন্যা জ্বলে মনে মনে। কারে কইব দুঃখের কথা কে লইব পরাণে ॥ চউখ মুছিয়া কন্যা আক্ষি মেল্যা চায়। পিরথিমী গিলিয়া ধরছে আন্ধুকা নিশায় ॥ সন্ধ্যা গুঞ্জুরিয়া হইল বিষম অন্ধকার। মুইত যুবতী কন্যা কিবা কইব বাপ মায় ॥ এই না ভাবিয়া কন্যা খরপদে চলে। গাঙ্গের কেনার গিয়া নামে গাঙ্গের জলে ॥ ( ১—৭২ ) ( ২ ) সাউদের না ডিঙ্গাখানি গো আরে ডিঙ্গা ভাটী বাইয়া যায়। আন্ধাইর দেখিয়া সাধুরে আরে সাধু ঘাটেতে ভিড়ায় ॥ ঘাটেতে সুন্দরী কন্যারে আরে সাধু দেখে আড় নয়ানে। কন্যার লাগিয়া সাধু আরে সাধু উচাটন মনে॥ চৌদিকে চাইয়া সাধুরে আরে সাধু না দেখে লোকজন। কন্যার লাগিয়া সাধুরে আরে সাধু পরাণ কইল পণ॥ পানিত লাগিয়া কন্যারে আরে কন্যা কলসী বুড়ায়। পাছমুড় দিয়া সাধুরে আরে সাধু ধরিল কন্যায়॥ গুলিবন করিয়া ধরে রে আরে সাধু ডাকে লোক জন। একে একে লাম্যা আইলরে আরে পিঁপড়ার সার যেমন॥ একেলা অবুলা কন্যারে আরে সেই না বিপদে পড়িয়া। চিক্কাইর দিয়া কান্দে কন্যারে আরে কেউনি নেয় উদ্ধার কইরা॥ মুনিষ্যির গতাগম্ব নাই আরে ভাইরে গাঙ্গের পাড়ে। বিরথা কেবল কান্দন কাটিরে আরে কেবা কও শুনে॥ কন্যার কান্দনে ভাইরে আরে পান্তর ১ যায় গলিয়া। নিদারুণ সাউদের পুতরে আরে নেয় কন্যায় মুষ্টিপা দিয়া ॥ সেই সে চিক্কাইরে কুমাররে আরে কুমার ঘুম না ভাঙ্গিল। কন্যারে ধরিয়া সাধুরে আরে ডিঙ্গাও উঠিল ॥ এরে দেখ্যা বীরনারায়ণরে আরে কুমার মনে দুঃখু পায়। বৈদেশী সাধুর এগুনরে আরে সেদারাতি ২ জানায়॥ চৌদিকে চাহিয়া কুমাররে আরে কেউরে নাই সে পায়। একেশ্বর কি করিব রে আরে কুমার মনেতে ভাওয়ায়॥ সেদারতি করা সাধুরে আরে কন্যা যায় লইয়া। বিরথায় আমরার তবেরে আর জমিদারী কইরা॥ (১—৪৮) (৩) কন্যার কান্দনে কুমার বড় দুঃখু পাইল। চুপ চাপ গিয়া তবে ডিঙ্গাত উঠিল ॥ ডিঙ্গাত উঠিয়া সাধু ডিঙ্গা দিল ছাড়ি। দাঁড়ের টানেতে ডিঙ্গা যায় শূন্য উড়া করি ॥ ডিঙ্গা না ছাড়িয়া সাউদ কন্যার ধার যায়। মিঠান মিঠান কথা কহিয়া কন্যারে ফুসলায়। “শুনলো যৈবতী কন্যা ভরা গাঙ্গে জুয়ার। উছুল্যা পড়িয়া গেলে সগল অসার॥ ভাটী না ধরিতে কন্যা করলো তুমি দান। তোমার লাগিয়া কবুল এই জান পরাণ॥ আমি সে কাঙ্গাল কন্যা মিন্নতি যে করি। অধম জানিয়া যৌবন দান কর মোরে॥ এই সে ডিঙ্গার ভরা ৩ লাখ টেকার মুল। পিরথিমীর মাঝে কন্যা নাইসে আর তুল॥ তোমার হাতে সপ্যা দিবাম আছে যত ধন। সদায় বস্তা তোমার সেবিবাম চরণ॥ শত-বিশতে দাসী তোমার করব পদর্চ্চনা। হীরামতি জ্যার্য্যা দিবাম শরীল গয়না॥ সোণার পালঙ্ক দিবাম তোমার বিছান। মাটি না পাড়িব তোমার রাঙ্গা দুই চরাণ॥ হুকুম তামিল অইব সকলের আগে। দেবতা হেন তোমায় রাখিবাম মাথাতে॥” ফিরিয়া না চায় গো কন্যা কান্দে অবিরত। কথা নাই সে কয় কন্যা সাউদের সহিত॥ চউখ না মেলিয়া চায় থাকে দূরে বইয়া। মুখামুখি হইল সাউদ থাকে পাছদিয়া॥ শায়ণ মাস্তা ধারা যেমন চউখ অবিরত। বেগেরতা করিয়া সাধু করত চায় পিরীত॥ সাধুর যত কাণ্ড দেখ্যা কুমার পায় দৈছত। কি উপায় করবাইন কুমার হইলা ভাবিত॥ চুপাচুপ গিয়া কুমার হাতিয়ার পাতি যতে। এক এক কর্যা ফালাইল গাঙ্গের মধ্যেতে॥ বাছিয়া লইল কুমার ভালা রামদাও খানি। চোরের মতন আইল কুমার ডিঙ্গার পিছনি॥ পাছাত আইয়া কুমার কাটে কাড়ালীরে। কাড়ালীর সাজ ধইরা কুমার ডিঙ্গার কাড়াল ধরে কাড়াল ধরিয়া ডিঙ্গা ঠেকাইল চরেতে। না লড়ে না চড়ে ডিঙ্গা কি হইল আচম্বিতে॥ নাইয়া মাল্লা যত আছিল হিক পায়্যা টানে। বালুর কামুরে ডিঙ্গা লাগ্যাছে বিষমে॥ নাইয়া মাল্লা যত আছিল সকলে নামিল। হিয়া হৈল বল্যা সবে হিক পাইয়া টানিল॥ টানাটানি কর্যা ডিঙ্গা না পারে লড়াইতে। এরে দেখ্যা সাধু আস্যা নামিল চরেতে॥ এন কালে বীরনারায়ণ কোন্ কাম করে। দাখিল হইল গিয়া কন্যার গোচরে॥ দেখিয়া সে কন্যা সোণা কুমারে চিনিল। কুমারের দুই পায় বেড়িয়া ধরিল॥ গায়েত ধরিয়া কন্যা জুড়িল কান্দন। কুমার বলে উদ্ধার করবাম না কর চিন্তন ॥ এই কথা বলিয়া কুমার ডোঙ্গ নাও খুলিয়া। কন্যারে তাহার মধ্যে দিল উঠাইয়া ॥ বৈঠা আর রামদাও হাতে কুমার উঠিল। ভবানীর শরণ লইয়া ডোঙ্গ বাইছ নিল ॥ এরে দেখ্যা সাধু যায় করি মার মার। কুমার বুলে “আগু আইলে করিবাম সংহার ॥” রামদাও ভাঙ্গাইয়া কুমার খাড়ইল ডেঙ্গিতে। বৈঠা ধইরা কন্যা বায় মাইন গঙ্গিতে ॥ হাতিয়ার পাতি আনতে সাধু ডিঙ্গার মাঝে গেল। কই পাইব হাতিয়ার পাতি সকল বিফল ॥ মার মার বলিয়া যত নাইয়া মাল্লাগণ। ডেঙ্গি ধরিবারে তবে করিল গমন ॥ এক এক কর্যা সকলেরে করিল সংহার। এরে দেখ্যা সাধু না আগুয়ায় আর ॥ আইতে আইতে ভাইরে তিনপর রাত ভাটাইল। হেন কালে ডেঙ্গি আস্যা ঘাটেতে লাগিল ॥ (১-৬৬) ( ৪ ) সন্ধ্যাকাল সোণা কন্যা আইল জলের ঘাটে। একপর রাত গুয়াইয়া যায় না আইল বাড়িতে ॥ রাধারমণ বাপ বলে কি হইল সোণার। মায় বাপে চুপচাপ বিছড়ায় বারবার॥ কেউর ঠান এই কথা পরকাশ না করে। কলঙ্ক হইবে তবে যদি কয় পরেরে॥ বিছড়াইতে বিছড়াইতে তারা পরাণ পাইয়া। পাড়া পড়সি ডাক্যা কথা কয় যে খুলিয়া॥ আন্ধাইর ঘরের মাণিক কন্যা চুরে লইয়া গেছে। সগলে বাইর হইল তবে কন্যার তল্লাসে॥ মোটে মাত্রক এক কন্যা কান্দে রাধারমণ। কলঙ্কী বানাইল বুঝি কোন না দুষমন॥ রাধারমণ বুলে হায়রে কি হইল সোণার। লোকজন লইয়া যায় গাঙ্গের পাড়॥ গাঙ্গের পাড় গিয়া দেখে শুদা কলসী ঘাটে। কোথায় গেল সোণা কন্যা না পায় দেখিতে॥ মইরাছে মইরাছে বুঝি জলেতে পড়িয়া। আনইলে নিছে কুমিরে টানিয়া॥ পাতি পাতি কইরা তারা কন্যারে বিছড়ায়। কেউবা জলের মধ্যে কেউবা শুকনায়॥ বিছড়াইতে বিছড়াইতে তারার দুপুর রাইত ভাট্যাইল আর নাইসে পারে বড় পরাব পাইল॥ হেন কালে দেখে তারা চান্নির পশরে। সোণা কন্যা আর কুমার ডেঙ্গির মাঝারে॥ ডেঙ্গি তনে লাম্যা যেই ভূমিত খাড়াইল। কাওলা কাওলি ১ কর্যা সবে তাহারে ঘেরিল ॥ কুমার সগল কথা কইল বুঝাইয়া। রাধারমণ বুলে রাখছুইন সম্মান বাচাইয়া ২ ॥ আস্সি পশ্শি ৩ “বুলে মিছা ভাড়াইল সকলে। বেইজ্জাত কর্যা কুমার কাম কথার ছলে ॥ ঘর নাইসে তুলন যায় এই সে কন্যারে। দেশতনে বিদায় কর এই সে পাপেরে ॥” কেউ বুলে “খেদাইয়া দাও বিদেশ কর্যা পার ॥” কেউ বুলে “কাট্যা ভাসাও গাঙ্গের মাঝার। ছালাত ভরিয়া দেও মনডুবি করিয়া ॥” এই কথা বল্যা সবে ধরিবারে যায়। এরে দেখ্যা বীরনারায়ণ রামদাও ভাঙ্গায় ॥ এক হাতে ধরি কন্যায় আর হাতে মারে। যত ইতি লোক লস্কর পালায় তার ডরে ॥ (১—২৯) ( ৫ ) সোণা কন্যা কান্দি পড়ে বীরনারায়ণের পায়। “আমি অভাগীর কও কি হইবে উপায় ॥ আম্যিত অবুলী নারী না জানি পাপ মনে। বিধাতা’ বিবাদী হইলা কি আছে করমে ॥ জমিদারের পুত্র আপনে আপনের কিবা দুঃখ। বিনা দোষে কলঙ্কিনী, ফাট্যা যায় মোর বুক ॥” “উদ্ধার কর্যা আনছি তোমায় জানের আশা ছাড়ি। তোমার যে দুঃখু আমি সইতে না পারি॥ মনের কথা কইবাম কন্যা শুন দিয়া মুন। তোমারে দেখিয়া মন হইল উচাটন॥ তোমার যে চান্দমুখ যেমুন পউদের ফুল। আসমানের কালা মেঘ তোমার মাথার চুল॥ পত্যা তারার হেন তোমার দুই আখি। পউদের নাল হেন তোমার অঙ্গ দেখি॥ পরথম ধৈবন তোমার ফাট্যা বাইরায় রূপ। আমার চউখ না পরিছে তোমার হেন রূপ॥ এই রূপের লাগিল কন্যা হইয়াছি কাঙ্গালী। একেলা বসিয়া কন্যা থাকি নিরিবিলি॥ যত ইতি কন্যা মোর বিয়ার কারণে। কেউ না সে লাগিল হেন আমার মনে॥ তোমারে দেখিলাম কন্যা মনের মতন। তুমি যদি ঘুচাও কন্যা মোর মনের বেদন॥” “আপনে হইছুইন জমিদার, মুই গিরস্থের নারী। আপনের লগে মোর পীরীতি পউদ্দ পাতার পানি আপনি করবেন জমিদারী রাজপাটে বইয়া। মুই কলঙ্কিনীর পানে না চাইবাইন ফিরিয়া॥ দুই দিনের লাগ্যা কেনে আপদোষী হও। ক্ষেমা দিয়া যাউখাইন কুমার ধরি দুই পাও॥ মুই কলঙ্কিনী নারী ঘুরি বনে বনে। আনইলে ডুবিয়া মরি আপনের সামনে॥ মোর লাগিয়া আপনে কেনে হইবাইন আপদোষী। জমিদারের পুত্র আপনে করবাইন জমিদারী ॥ মুই কলঙ্কিনীর লাগ আপনের কেনে দুঃখ। মায় বাপে খেদাইব আদরের পুত ॥ রাজ্যতি ছাড়িয়া কেনে ঘুরবাইন ছনে বনে। সুখে রাজ্যতি করবাইন হরষিত মনে ॥ যাওখাইন যাওখাইন কুমার আপনে বাড়ীত চলিয়া। মুই কলঙ্কিনী নারী মরি দরিয়াত ডুবিয়া ॥” এই কথা বলিয়া কন্যা গাঙ্গে দিল মেলা। বীরনারায়ণ ফিরায় তারে পন্থে আগুলিয়া ॥ “শুন শুন কন্যালো আমার বেদন। তুমি ছাড়া মোর পরাণ শূন্য ময়দান ॥ তোমারে ছাড়িয়া কন্যা তিলেক না বাচি। তুমি যদি মর কন্যা আমি আগে মরি ॥ তোমারে লইয়া আমার নরকে রাজভোগ। তুমি বিনে স্বর্গ মোর হইব নরক-ভোগ ॥ নিদয়া হইয়া কন্যা যদি যাও ছাড়ি। খাড়ুইয়া দেখ আগে আমি ডুব্যা মরি ॥” এই কথা বলিয়া কুমার লামিল জলেতে। আঙাদিয়া ধরে কন্যা কুমারের দুই পায়েতে ॥ “তুমি মোরে জিউদান দিলা আর কলঙ্কের ডালী। আমি নারী কেমুন কইরা তোমার মরণ দেখি ॥ কিরপা করিলা যদি কলঙ্কিনীর পানে। সর্বস্ব ঢালিয়া দিলাম তোমার চরণে ॥ জীবন যৌবন আমার সকল ধনের সার। আইজ হতি এই সকলি সকল তোমার ॥ সাক্ষী থাক চান্দ তারা আর বিরক্ষগণ। তোমরা সাক্ষী থাক্য মুই সকল করলাম দান॥ মায়ে ছাড়ল বাপে ছাড়ল ছাড়ল সর্বজনে। কলঙ্কিনী বল্যা ছাড়ল পাড়াপড়শী জনে॥ মনে চিন্তে না জানি পাপ বিমুখ বিধাতা। আশ্রা দিয়া রাখলা মোরে তুমি যেন দেবতা॥” এই কথা শুনিয়া কুমার হরষিত হইয়া। পাওতানে উঠাইল কন্যা বুকেত রাখিয়া॥ আসমান তলে লাম্যা স্বরগ ভূমেতে আসিল। এই মতে বীরনারায়ণের বিয়া যে হইল॥ ভাবনা চিন্তা কিছু নাই তারার মনে। দোহে দোহা এক কায়া হইল মিলনে॥ ব্রহ্মাণ্ডের কথা তারা পাশরিয়া গেল। আউস মিটাইয়া দোহে দোহারে দেখিল॥ এর পর তবে তারার হইল চিন্তন। কেমুন কইরা দেশের মধ্যে করবাম বিচারণ॥ মায়ে বাপে পাইলে কাট্যা করব চাক চাক। কলঙ্কী বলিয়া সবে রটাইব দেশের মাঝ॥ যাই মোরা দোহে মিলি দেশ ছাড়িয়া। আপদ বালাই যত যাউক দূর হইয়া॥ সল্লা করিয়া দোহে ডেঙ্গিতে উঠিল। প্রেমের টানেতে ডিঙ্গা পক্ষী উড়া দিল॥ (১—৭৮) দুঃখের দারুণ নিশিরে আরে নিশি পোহাইতে না চায়। সারা নিশি কান্দ্যা গোয়ায় সোণার বাপ মায় ॥ আস্সি পশ্চি দলা হইয়ারে কুদাকুদি করে । “কুত্তার বাচ্চা জনম লইছে জমিদারের ঘরে ॥ জমিদারে আশ্রা দিয়া আরে ভালা রাখে পরজাগণে। ভুগা দিয়া খাইল সেত আপনে নিঝামানে ॥ জাতি আচার বিচার ধরমরে আরে ভালা সগল ডুবাইয়া। দেশের ইজুত মাইল মুখ না পুড়িয়া ॥ আইজ মাইল রাধারমণের রে আর কাইল মারে আর কারে। এমুন অবিচারের মধ্যে কেমনে ঘর গিরস্থি করে ॥” মাইয়া মাইনষে সল্লা করে রে “আরে মার সেই কুত্তারে। কাটিয়া দরিয়ায় ভাসা যা হয় হইবে পরে ॥” সগলে মিলিয়া তবে রে আরে সলকি বল্লম লইয়া। গাঞ্জের পাড় ধরিয়া যায় বিছুড়াইয়া বিছুড়াইয়া ॥ ঝাড় জঙ্গল্যা যত আছিলরে আরে ভাঙ্গা করল গুড়া গুড়া। বিছুড়াইয়া না পায় কোথা চল্যা গেছে তারা॥ বিছুড়াইতে বিছুড়াইতে তারারে আরে ভালা পরাবারে পায়। সেই না ক্ষুরধেতে তারার পিত্তি জ্বল্যা যায়॥ মনের দুঃখেতে ভালারে হাত পাঁচ ভাবে। আপন পুত্র জান্যা জমিদার সমুঠিয়া রাখছে॥ সল্লা যুক্তি কইর্যা তারারে আরে কুপিত হইয়া। ফুইদ করিবারে চায় বাপের কাছে গিয়া॥ কুপুত্রার কাণ্ড যতরে আরে ভালা বাপেরেরে জানায়। “এমন পুত্র আর কেউ হইলে গাঙ্গেতে ভাসায়॥ বিচার কর কাইল জমিদার গো বিচারের মালীক। আপুন পুত্র জান্যা নাইসে করবাইন বিপরীত॥” কুপুত্রের কথা যত বাপে শুনিল। রাগেতে গিরগির অঙ্গ কাঁপিতে লাগিল॥ আগুন হইয়া বাপে কটুয়ালে বুলে। “বীরনারায়ণ পুত্রে ধরিয়া আন সভার আগে॥ হাচা যুদি হয় কথা উচিত দণ্ড দিবাম। পুত্র বলিয়া নাইসে ঘুরা ঘাট্যা লইবাম॥ কুপুত্র থাকনের থাক্যা না থাকন ভালা। এমন পুত্র কেবুল হায়রে কুলের কালা॥” কটুয়াল ফিরিয়া আইয়া কয় বাপের আগে। “কাইল থাক্যা কুমারেরে কেউ নাইসে দেখে॥” হুকুম করলাইন জমিদার দেখত বিছুড়াইয়া। যেখানে পায় তারে আনিত বান্ধিয়া॥ জমিদার বিচারুইন মনে ‘মিছা নয় সে কথা। কাইল থাক্যা কোথায় সে গেছে কুপুত্রা॥ এইসে কুকাম না করিলে থাকিত বাড়িতে। তাইসে কাইল অতি ১ কেউ না পায় দেখিতে॥’ কটুয়ালরে ডাক্যা বাপে কয় তারা গোচরে। “বান্ধা আণ্যা হাজির কর যেখানে পাও তারে॥ কুপুত্রা কুলের কালি গেল কোন্ খানে। জীবমানে থাকলে সে না রাখব সম্মান। ধর্য্যা আণ্যা বলি দিলে শীতল হইব প্রাণ॥ কুপুত্র অতি জমিদারী যাইব রসাতলে। মুখ না দেখাইতাম পারবাম কোন কালে॥” লোক লস্কর যত সকলে ডাকিয়া। আপনে অতি জমিদার দিলাইন বুঝাইয়া॥ “বান্ধিয়া আনিবা তারে আমার গোচরে। যেখানে পাইবা মোর কুপুত্রারে॥ দেশে দেশে রাজ্যে রাজ্যে পাতি পাতি কইরে। যেখানে পাও ধইরা আনবা আমার গোচরে॥ বুঝাইয়া কই যদি এতে কর আন। জন বাচ্ছা সহিতে তরায় যাইব গর্দ্দান॥ মোর পুত্র বলিয়া যদি এতে কর আন । ভিটা খালি করবাম রাজ্জি হইব লানবান লোক লস্কর যত আছিল এই কথা শুনিয়া । কুমারের তল্লাসে যায় টডরস্থ হইয়া ॥ ( ১—৭০ ) এক রাজার মুল্লুক নারে দুই রাজার থৈয়া । সোণা কন্যায় লইয়া গেল তিন মুল্লুক ছাড়িয়া ॥ খিদায় করে টগবগ না পারে বাহিত নাও । ডিঙ্গা না ছাড়িয়া তারা টানে দিল পাও ॥ টানের মধ্যে উঠা তারা কোন্ কাম করে । অরণ্য জঙ্গলাত মাধ্যে পরবেশ করে ॥ জঙ্গলাত মেওয়া ফল পাক্যা রইছে গাছে । দুই জনে পেট ভইরা খাইল যত আছে ॥ মুনিষ্যির মেল নাই পশু পক্ষীর বাসা । এমুন জাগাৎ বসৎ করব কেউ না পাইব দিশা ॥ ঘর নাই দুয়ার নাই কোথায় কাটাব রাতি । ভাবনা চিন্তা নাই মন কেবল পিরীতি ॥ এক পহর বেইল থাকতে জঙ্গল বেড়ল আন্ধারে । বাঘ ভালুক যত ইতি বাহির হইল আঁধারে ॥ ডেরা ডেঙ্গরা কোথায় পাইব জঙ্গলার মাইঝে । বাঘ ভালুক হায়রে চৌদিকে ডুকারে ॥ বিছুড়াইতে বিছুড়াইতে এক গফর পাইল। এর মধ্যে দুইয়ে জনে পরবেশ করিল॥ গফরের মধ্যে এক জানোয়ার ঘুমাইয়া। এরে দেখ্যা পরাণি গেল যে উড়িয়া ॥ রামদাও খান বাহির করিয়া কুমার মাইল কুব। তিন ছেও দিল পরে দিয়া তিন কুব॥ বাহির করিয়া দেখে সিঙ্গি জানোয়ার। সাপ সাপ্যানা কইরা থাকে গফরের মাঝার ॥ বনের ফল খাইয়া তারার দিন যায়। হরিণা হরিণী যেমন সুখেতে গুয়ায় ॥ দিন রাইত প্রেমালাপে সদাই মাতুয়ারা। ভাবনা চিন্তা নাইসে মন পীরীতের পশরা ॥ মেওয়া ফল জুগাইয়া বীরনারাইণে আনে। সুখেতে বসিয়া তারা খায় দুই জনে॥ উনা ভাতে দুনা বল হইছে তারার গাও। বাঘ ভালুকের লগে তারার হইছে বাও ॥ জানুয়ার দেখ্যা তারা কিয়ার না করে। তারারে দেখিয়া জানুয়ারি যায় পথ ছাইড়ে ॥ এই সে না হালেতে তারার দিন যায়। রাজার পুত্র কাঙ্গাল হইল পীরীতের দায়॥ (১—৩৬) জমিদারের লোকজন দেশে দেশে ভ্রমণ করে ভাইরে কুমারের তল্লাসে। ঘর গেরাম জঙ্গলা সকল বিচরণ কৈলা না পাইলা সে কুমারের উদ্দিশে॥ না যায় ফিরিয়া ঘরে কহিছে সে জমিদারে জন বাচ্ছা সইতে তারার লইব গর্দ্দান। ভিটা করব খান ছাড়া দেশ গেলে কুমার ছাড়া রাজ্যির মধ্যে জ্বালাইব আগুন॥ আছিল যত লোক লস্কর ঘর গেরাম জঙ্গলার ভিতর কিছু নাই সে রাখিল বাকি। পাতি পাতি কইরা বিছড়ায় কুমারে সে না পায় বিছড়ায় তারা যথায় যায় দুই আখি॥ বিছড়াইতে বিছড়াইতে তারা নিশাতড়ি (?) হইল পার তেও সে না পাইল তারে। কেমুনে যাইব ঘর উদবিচ্ছ ১ পরাণ বড় লইব গর্দ্দান কইছে জমিদার॥ কেউ বুলে যাইবাম ঘরে কেউ ফির্যা মানা করে স্তিরি পুত্র কোন হালে আছে। স্তিরি পুত্র কি আর আছে জমিদারে গর্দ্দান লইছে আমরা কেরে মরি যদি জন বাচ্ছা গেছে॥ এই খান বসত কর ঘর গিরস্তি সুবিস্তর কাজ নাই ফিরিয়া ঘরেতে। ঘর গেলে পড়বা মারা ডাক্যা কনে আনবা বুড়া ২ বস্তি করা থাক এই জঙ্গলাতে॥ রাজার খেরাজ নাই গর্দ্দানের ডর না পাই নিশ্চিন্তা হইয়া থাকবা সুখে। বাপ দাদার ভিটা ছাড়িয়া পাপে মরবা পুড়িয়া কুবুদ্ধি করিয়া কেবুল ডাক্যা আন দুঃখে॥ এই জংলা বিছুড়াইয়া দেখ একবার দর হইয়া পাও কিনা পাও সে কুমারে। পরে বুদ্ধি ঠাওর কর্যা যাইবাম ঘর ফিরিয়া দেখবাম কিবা করে জমিদারে॥ ( ৯ ) বীরনারাইণ জুয়া আনে দুইজনে খায়। আর সম বস্তা দুইয়ে সুখেতে গুয়ায়॥ রঙ্গে ঢঙ্গে বস্তা তারা করে আলাপন। বনের ফুল দিয়া অঙ্গ করয়ে সাজন॥ দুষ্মন বালাই নাই কেউ নাইসে পীড়ে। জংলার মধ্যে ফিরে হরষ অন্তরে॥ জমিদারের লোক লস্করে আরে জাইরে জঙ্গলা বিছুড়াইয়া। বিরথা পেরাসনি পাইল কুমারে না পাইয়া॥ ঘুমত উঠিয়া কুমারে আরে কুমার আধারের তল্লাসে। ঘুরিতে ঘুরিতে আইল তারার আশে পাশে॥ ভাবিয়া চিন্তিয়া তারারে আরে ভাইরে বাড়ীত ফিরত চায়। এমন সময় দেখে কে যেন পথত দিয়া যায়॥ নজর কর্যা দেখে তারারে আরে ভালা কুমারের আলছা। বেকে বের্য্যা মিল্যা ধরে কুমারের কাছা॥ ধরিয়া দেখিল কুমারে এই সে বীরনারাইণ। হরষিত হইয়া তারা করে পরস্থান॥ ভূমিত লুটাইয়া হায়রে আরে কান্দে সে কুমার। আমার যে নারী আছে কি হইব তারার ॥ কথা নাই সে শুনে তারারে আরে ভালা করে পরস্থান। তোমরার লাগ্যা আমরার কেরে যায় গর্দান ॥ কুমাররে লইয়া তারারে আরে ভাইরে ঘর ফির্যা আইল। একলা যে সোণা কন্যা জঙ্গলায় রইল ॥ সোণাকন্যা জানে কুমার আধার জুগাইত গেছে। আজি কেনে অত বেইল ফির্যা না আইতেছে ॥ উঠ বইস করে কন্যা কুমারের লাগিয়া। এই মতে সারা দিনমান রহিল বসিয়া ॥ সন্ধ্যা কালে যখন জঙ্গল আন্ধাইরে ঘিরিল। কন্যা বুলে হায় হায় কুমার কোথায় রইল ॥ কোথায় জানি রহিল কুমার বুঝিতে না পারে। পুড়া মনের মধ্যে কত উঠে আর পড়ে ॥ রামদা হাত লইয়া কন্যা বিছড়ায় কুমারে। আউলা হইয়া না কন্যা জঙ্গলাত ফিরে ॥ বাঘ যুদি খাইত বন্ধে পইড়া থাকত হাড়। ছন্ন বংশ না পাই কিছু জঙ্গলার মাঝার ॥ আমার বন্ধু সেরা জোয়ান বাঘে ডরায় তারে। বুঝিবা পরীরা ধইরা লইয়া গেছে তারে ॥ আনইলে বন্ধু মোরে গেছে ফাকি দিয়া। আমি অভাগিনী সোণায় জঙ্গলায় ফালাইয়া ॥ যেখানে গেলারে বন্ধু সুখে থাক্য তুমি। তোমার দুঃখের কথা যেন কাণে নাইসে শুনি ॥ আসমান পাতাল দেখবাম বন্ধুরে বিছুড়াইয়া। দেশে দেশে ঘুরে কন্যা বন্ধুর লাগিয়া॥ ( বারমাসী ) হায়রে বন্ধু আমার নাই দেশে। আইলা না পরাণের বন্ধু রহিলা তুমি কোন্ দেশে হায়রে বন্ধু নাই দেশে॥ ফাল্গুন ত না মাসরে বন্ধু আরে ছুটছে মদন বাও। দিন যায় আনায় তানায়’ রাত না পোঁয়ায় রে॥ চৈতনা মাসরে বন্ধু আরে চ্যৈতালা বাতাসে। তাপিত বক্ষ শীতল না হয় গো আমার বন্ধু কোন্ দেশে রে॥ বৈশাখ না মাসরে বন্ধু আরে কুইলে কাড়ে রা। কাণে মধ্যে ঠাডা বাজেগো আমার বন্ধুর কথা মিঠা রে॥ জ্যেষ্ঠ না মাসারে বন্ধু আরে রইদের খর তেজ। তা অতি অধিক জ্বালা গো আমার বন্ধুর বিচ্ছেদ রে॥ আষাঢ় না মাসরে বন্ধু আরে ঘন মেঘের ধারা। দেহার মাঝে জ্বলছে আগুন গো আমার মন হইল আঈরা রে॥ শাওণ না মাসরে বন্ধু আরে ফুটছে পউদের ফুল। তুমি বন্ধু আইল্যা দিতাগো পিন্তাম ১ কাণে ফুল রে ॥ বন্ধুয়ার লাগি কন্যা ফিরে দাওনা হইয়া। কোথায় পাইবাম চেংরা বন্ধু কে দেখছ দেও কইয়ারে ॥ চারি যুগের বিরক্ষ তোমার জঙ্গলার মধ্যে আছে। আমার বন্ধু কোথায় গেল তোমরা নি দেখ্যাছরে ॥ জঙ্গলার পশুপক্ষী চিন মোর বন্দেরে। কোন্ দেশে গেলে আমি পাইবাম তারেরে ॥ আসমানেরে তারারে তুমি মিট মিটৈয়া হাস। আমার বন্ধুরে যাইতে তোমরা নি দেখ্যাছরে ॥ বাপ ছাড়লা মাও ছাড়লা আমার লাগিয়া। শেষ কাটালে কেনেরে বন্ধু গেলা ফাকি দিয়া ॥ আগে যদি জানতামরে বন্ধু যাইবা ছাড়িয়া। দরিয়াত ডুবতামরে বন্ধু গলাত কলস লইয়া ॥ (১—৫৯) (অসম্পূর্ণ) ইহার পর জমিদার বীরনারায়ণকে জল্লাদ দ্বারা বধ করিয়াছিলেন এরূপ শুনিতে পাওয়া যায়। সম্পূর্ণ পালাটি পাওয়া যায় নাই—সুতরাং প্রবাদটির সত্যতা সম্বন্ধে কিছু বলিতে পারা গেল না। মহীপালের গান কালিদাসের এই উপমাটী বাল্মীকিরামায়ণ হইতে গৃহীত। তথায় আছে— “কঞ্চুকেনেব মুক্তেন পন্নগং ধরণীতলে। করুণং রোদিমার্তানি প্রবেপন্তী ততস্ততঃ॥” কঞ্চুকমুক্ত সর্প যেমন ধরণীতলে পড়িয়া থাকে, তেমনি রাজমহিষীগণ কঁাপিতে কঁাপিতে ভূপতিত হইয়া কাঁদিতে লাগিলেন। কিন্তু মহাকবি কালিদাস ইহার চমৎকারিত্ব ও সৌষ্ঠব আরও অনেক বর্ধিত করিয়াছেন। তিনি ‘ত্বচং’ শব্দের পূর্বে ‘অভিনবাম্’ বিশেষণটি পদপ্রয়োগ করিয়াছেন। সর্পের জীর্ণ বা পুরাতন ত্বক্ যখন সদ্যপরিত্যক্ত হয়, তখন তাহা মসৃণ ও শুভ্র দেখায়;—বিছানায় পতিত সিত বস্ত্রের সহিত তাহার ঠিক্ সাদৃশ্য হয়। তদপেক্ষা চমৎকার সাদৃশ্য আর কি হইতে পারে? কালিদাস বাল্মীকি হইতে উপমাটি গ্রহণ করিয়া নিজ ক্ষমতাবলে তাহাকে উজ্জ্বলতর করিয়া তুলিয়াছেন। রামায়ণে সীতা-বিরহ-কাতর রামের বিলাপবর্ণনায়— “করী হৃতকরেণুর্ব কদলীং প্রমুখান্ গতাঁ। কম্পতে কদলীং দৃষ্ট্বা রামঃ সাঁতাং স্মরন্নপি॥” একটি হস্তিনী তাহার যৌথমধ্যে কদলীগাছগুলি ভাঙিয়া দিতেছিল;—কামার্ত হস্তী তাহাকে দেখিয়া যেমন কঁাপিতে থাকে, রামচন্দ্র সীতার উরুসাদৃশ্যা কদলী দেখিয়া সীতাকে স্মরণপূর্বক সেইরূপ কাঁপিতে লাগিলেন। কালিদাস ঠিক্ এইভাবটিই কুমারসপ্তমে অন্য প্রকারে উল্লেখ করিয়াছেন। মহাসতী উমার উরুদেশ সম্বন্ধে তিনি বলিতেছেন যে, রতিপতি মদন যদি উমার উরু দেখিতেন, তাহা হইলে কদলীস্তম্ভকে আর কামিগণের রূপোপমান বলিয়া কল্পনা করিতেন না;— “অত্যন্তপরাহত-কাঞ্চনেন দ্বৌ কদলীভেদেন কদলীস্তম্ভৌ।” —উমার উরুদ্বয় স্বর্ণকদলীর ন্যায় অতীব মসৃণ ছিল, তাহা দেখিলে কামদেবের সাধের কদলী-উপমা অপসারিত হইত। ঐ রামায়ণ হইতেই আর একটী বর্ণনা দেখুন। রাক্ষসরাজ রাবণ সীতাকে হরণ করিয়া হৃষ্টচিত্তে আকাশপথে প্রস্থান করিলেন;— “তূর্ণমাহৃত্য বৈদেহীং রাবণো রাক্ষসেশ্বরঃ। জগাম গগনং শ্রীমান্ দহমানঃ স্বকর্মণা॥” রাক্ষসরাজ রাবণ শীঘ্র জানকীকে হরণ করিয়া আকাশপথে প্রস্থান করিলেন। তিনি রূপবান্ হইলেও স্বকীয় কুকর্মহেতু অন্তরে দগ্ধ হইতে লাগিলেন। কালিদাস ইহারই প্রতিধ্বনি তুলিয়া রঘুবংশে লিখিতেছেন,— “রাবণোঽপি বলী সীতাং তূর্ণমাহৃত্য রাক্ষসঃ। জগাম গগনং শ্রীমান্ দহমানঃ স্বকর্মণা॥” শ্লোকের প্রথমার্ধে শব্দগুলির ঈষৎ পরিবর্তন করিয়া এবং দ্বিতীয়ার্ধ অবিকল রাখিয়া কালিদাস মহাকবি বাল্মীকির প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও পূজা নিবেদন করিয়াছেন। রঘুবংশের দ্বাদশ সর্গে এই শ্লোকটি দেখিতে পাওয়া যায়। ইহাকে অপরের ভাবগ্রহণ বা ‘চৌর্য’ বলা চলে না। ইহা পূজ্যপাদ বাল্মীকির প্রতি পরবর্ত্তী মহাকবি কালিদাসের ভক্তি-বিনম্র উপহার। কালিদাসের ‘মেঘদূত’ অমর কাব্য। বর্ষার প্রথম দিনে আষাঢ়ের নব মেঘ দেখিয়া অলকাপুরী হইতে নির্বাসিত কোন এক বিরহী যক্ষের কামার্ত বিরহ-বেদনার কি মনোরম বর্ণনা! বিরহবিধুরা প্রিয়ার নিকট কুশলবার্তা পাঠাইবার জন্য চেতনায় চেতন-জ্ঞানহীন বিরহী যক্ষ জড় মেঘকেই দূত নির্ব্বাচিত করিয়াছেন। কি অপূর্ব্ব সে কল্পনা! কি অনুপম তাহার রচনাশৈলী! মন্দাক্রান্তা ছন্দের কি করুণ ঝঙ্কার! সমগ্ৰ সংস্কৃত সাহিত্যে বা জগতের কোনও সাহিত্যে ইহার দ্বিতীয় তুলনা নাই। কিন্তু নিপুণ পাঠক লক্ষ্য করিবেন যে, এই ‘মেঘদূত’ কাব্যের পরিকল্পনাটি বাল্মীকিরামায়ণ হইতেই গৃহীত। সীতাহরণের পর সীতা অন্বেষণে প্রবৃত্ত রামচন্দ্র যখন মাল্যবান্ পর্ব্বতে আশ্রয় লইয়াছেন, তখন বর্ষা সমাগত। বিরহ-কাতর রামচন্দ্র মেঘের দিকে চাহিয়া লক্ষ্মণকে বলিতেছিলেন— “নীলমেঘাশ্রিতা বিদ্যুং স্ফুরন্তী প্রতিভাতি মে। স্ফুরন্তী রাবণস্যার্কে বৈদেহী তড়িতা যথা॥” কৃষ্ণ মেঘের কোলে চঞ্চলা বিদ্যুৎকে স্ফুরিত হইতে দেখিয়া রামচন্দ্র লক্ষ্মণকে বলিতেছেন,—রাবণের ক্রোড়ে জানকী যেন ঐরূপ কাঁপিতেছেন এবং বিদ্যুৎস্পর্শে যেন আমার মন দগ্ধ হইতেছে। কালিদাস এই সীতা-বিরহী রামের চিত্রটি যক্ষে আরোপ করিয়াছেন এবং হনুমান্ যেরূপ রামের অঙ্গুরীয়ক লইয়া লঙ্কায় গীতার নিকট দূতস্বরূপ গিয়াছিলেন, কালিদাসের যক্ষও ঐরূপ জড় মেঘকে সচেতন দূত বলিয়া কল্পনা করিয়া অলকাপুরীতে স্বকীয় প্রিয়ার নিকট কুশলবার্তা পাঠাইয়াছেন। তাহা কবি নিজেই মেঘদূতে স্বীকার করিয়াছেন। বর্ষামঙ্গলে যক্ষ মেঘের পূজা করিবেন, এই বাসনায় সুবর্ণ-কুসুমের অর্ঘ্য সাজাইতেছেন, এই বর্ণনায় কবি লিথিয়াছেন— “পত্যুঃ প্ৰীতঃ প্রীতিমুখ-বচনং স্বাগতং ব্যাজহার।” —“যক্ষ পরম প্রীতিভরে স্বাগত সম্ভাষণ করিয়া অতি মনোরম বাক্যে মেঘের অর্চ্চনা করিতে লাগিলেন। হনুমানকে মহাবীর রামচন্দ্র যেরূপ সমাদর করিয়াছিলেন, যক্ষও মেঘকে সেইরূপ পূজা করিলেন।” রামের চরিত্রে যক্ষচরিত্রের এবং হনুমানের চরিত্রে মেঘের অবতারণা করিয়া মহা কবি কালিদাস বাল্মীকির নিকট নিজ ঋণ মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিয়াছেন। রামায়ণে অযোধ্যাকাণ্ডে শ্রীরামচন্দ্র কৈকেয়ীর বরে যখন পিতৃসত্য পালনার্থ দণ্ডকারণ্যে যাইতে উদ্যত, তখন কৌশল্যার আক্ষেপোক্তি শ্রীমদ্ভাগবতে অন্য প্রকারে গ্রথিত হইয়াছে। কৌশল্যা দুঃখ করিয়া রামকে বলিতেছেন,— “যদি তে ন ভবেদ্রাজন্ মম গৰ্ভে সুতোঽনঘ। অপুত্রা বা প্রজানুস্যং নোহভবিষ্যতি মে দুঃখং॥” —হে বৎস! তুমি যদি আমার গর্ভে জন্মগ্রহণ না করিতে এবং আমি যদি অপুত্রা থাকিতাম, তাহা হইলে বন্ধ্যাত্বজনিত মনস্তাপ অপেক্ষা এ দুঃখ আমার অনেক সহ্য হইত। বন্ধ্যা মহিলার দুঃখ কেবল একটীই,—অপুত্রাতা। কিন্তু পুত্রবতী জননী যদি পুত্র হইতে বঞ্চিত হয়, তবে তাহার দুঃখের সীমা থাকে না। ভাগবতকার শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধে দেবকীর উক্তি প্রসঙ্গে কৌশল্যার উপরিউক্ত ভাবটীই প্রকাশ করিয়াছেন। কংস কর্তৃক দেবকীর পর পর সপ্ত পুত্র বিনষ্ট হইল। দেবকী শোকাতুরা হইয়া বলিতেছেন,— “অহো মে মন্দভাগ্যায়াঃ সুতাঃ কংসেন হানিতাঃ। অপুত্রত্বং বরং নারীণাং ন হ্যাপত্যবধং শুভং॥” আমি কি মন্দভাগ্যা! কংস আমার সদ্যোজাত পুত্রগুলিকে একে একে বিনষ্ট করিল! নারীদের পক্ষে অপুত্রা থাকা বরং ভাল, কিন্তু অপত্যবধ বা পুত্রহন্তার দুঃখ বড়ই সাংঘাতিক ও মর্মান্তিক। রামায়ণে বাল্মীকি অযোধ্যাকাণ্ডে একস্থানে অতি সত্য ও সুন্দর উক্তি করিয়াছেন— “ন চ সীতা ত্বয়া হীন। ন চাহমপি রাঘব। মুহূর্তমপি জীবেব জলন্মৎসারিবাঙ্কসি॥” রাঘব! তোমাকে ছাড়িয়া জানকী ক্ষণকালও বাঁচিবেন না এবং আমিও বাঁচিব না। আমাদের অবস্থা হইবে—জলহীন মৎস্যের মত। শৈশব হইতে শ্রীকৃষ্ণসহচরী রাধিকার কৃষ্ণ-বিরহে এই ভাবটীই রূপ পাইয়াছে বৈষ্ণবকবি চণ্ডীদাসের পদে— “বঁধু কি আর বলিব আমি। মরণ অধিক জনমে জনমে জীবন-মরণ তুমি॥ কোকিল কোকিলী যদি বা ত্যজয়ে বসন্ত সমেত রঙ্গ। তিল আধে যদি জল ত্যজে মীন তবু না ত্যজয়ে অঙ্গ॥” —মীন যদি জল ত্যাগ করে, মরণের সঙ্গে সঙ্গে জলের সম্বন্ধও চলিয়া যায়। কিন্তু রাধার কৃষ্ণপ্রেমের সম্বন্ধ ইহজীবনে ধরণীর ধূলায় শেষ হইবে না—জনমে জনমে শ্রীকৃষ্ণই রাধার পরমা গতি। সিতাবিলোপে বাল্মীকি রামায়ণে রাবণ কর্তৃক সীতা-হরণের পর রথের চিহ্ন, সীতার অলঙ্কারাদি দেখিয়া রাম বিলাপ করিয়া কান্দিতেছেন এবং বলিতেছেন,— “বাপ্য মে দুঃখমাসীদ্বৈ জানকীং প্রতি লক্ষ্মণ। ত্বযি কুপ্যেত ধৰ্ম্মাত্মা ভরতস্তু মহাবল ॥” লক্ষ্মণ! জানকীর হরণজনিত দুঃখ আমার তত অধিক নাই। মহাবল ধার্মিক ভরত যদি আমাকে সীতা রক্ষায় অসমর্থ বলিয়া তিরস্কার করে, তবে আমি মুখ দেখাইব কি করিয়া? কণ্বের তপোবন হইতে শকুন্তলা যখন পতি-গৃহে যাইতেছেন, তখন তপস্বী কণ্ব তপোবনের হরিণ, তরুলতাদিকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন—আজ শকুন্তলা পতিগৃহে যাইবেন, তোমরা সকলে ইহাকে বিদায় দাও। শকুন্তলা চলিয়া গেলেন। কণ্ব ঋষি কিছুক্ষণ শকুন্তলার যাত্রাপথের দিকে চাহিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন—বিদায় দিয়া আমার মন আজ শান্ত ও প্রসন্ন হইল। “অর্থো হি কন্যা পরকীয় এব তামদ্য সংপ্রেষ্য পরিগ্রহীতুঃ। জাতো মমায়ং বিশদঃ প্রকামং প্রত্যর্পিত্যাস ইবান্ধকাত্মা॥ —কন্যা পরের সামগ্রী। আজ তাহাকে উপযুক্ত পাত্রে দান করিয়া আমার অন্তরাত্মা শান্ত ও প্রসন্ন হইল। অপর রক্ষিত গচ্ছিত ধন যথার্থ অধিকারীর হস্তে প্রত্যর্পণ করিলে গচ্ছিত রার মনের সন্তোষ যেমন বৃদ্ধি পায়, শকুন্তলাকে পতিগৃহে পাঠাইয়া আজ আমার মনের ভার অপসৃত হইল। কণ্বের উক্তি বা ভাবটি বাল্মীকির উপরিউক্ত ভাবকে অতিক্রম করিয়া এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক সম্পদ লাভ করিয়াছে। কালিদাসের লেখনীস্পর্শে বাল্মীকির ‘সীতাহরণের দুঃখ’ এক মহত্তম ত্যাগের মূর্তিমতী শান্তিনিকেতনে পরিণত হইয়াছে। কবি ও কাব্য পরস্পর সাপেক্ষ। একের ভাব অন্যে গ্রহণ করেন; কিন্তু রূপদক্ষ মহাকবিগণের প্রতিভা-রসে সিক্ত হইয়া সেই পুরাতন রূপ বা ভাব অমূল্য অভিনবত্ব লাভ করে। কালিদাস মহাকবি বাল্মীকির নিকট প্রভূতপরিমাণে ঋণী এবং ঋণী হইয়াও তিনি বিশ্ব-সাহিত্যে আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল। পূর্বসূরী মহাজনগণের পথ অবলম্বন করিয়া কবি অনুগামী হন, কিন্তু পরবর্ত্তী কালে তাঁহার সার্থক সৃষ্টিই তাঁহাকে মহাকবি বা যুগান্তকারী স্রষ্টার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। মহাকবি কালিদাস সংস্কৃত সাহিত্যে তাহার এক উজ্জ্বলতম দীপশিখা। বাল্মীকিরামায়ণ বা রাম-চরিত অবলম্বনে পরবর্তী যুগে বহু কবি কাব্য, নাটক প্রভৃতি রচনা করিয়া যশোভাগী হইয়াছেন। মহাকবি ভবভূতি তাঁহার ‘উত্তররামচরিত’ নাটকে বাল্মীকিকে নমস্কার করিয়া লিখিয়াছেন,— “ইদং কবিভ্যঃ পূৰ্ব্বেভ্যো নমোবাকং প্রশাআস্যহে।” ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক তথ্য নির্ধারণের জন্য রামায়ণের দান অপরিসীম। ভারতবর্ষের সর্ববত্র ভারতের সীমানা নির্দেশ, নদী বা পৰ্ব্বতের অবস্থান প্রভৃতি নিখুঁতভাবে রামায়ণে চিত্রিত হইয়াছে। কিষ্কিন্ধাকাণ্ডে সুগ্রীব কর্তৃক কপিগণকে দিক্-বিদিকে সীতা অন্বেষণের জন্য পাঠাইবার সময় যে সমস্ত নদী, পৰ্ব্বত বা জনপদের নিখুঁত বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে, তাহা পাঠ করিলে বিস্মিত হইতে হয়। রামায়ণে ভারতবর্ষের নদী, পর্ব্বত ও বনরাজির বর্ণনা পাঠ করিলে ভারতবর্ষের ভৌগোলিক তত্ত্ব বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা জন্মে। রামায়ণের আদর্শেই ভারতবর্ষের শিক্ষা, দীক্ষা ও সমাজনীতি প্রবর্তিত হইয়াছে। রামায়ণ কেবল একখানি কাব্য নহে, ইহা সনাতন হিন্দুধর্ম্মের মর্মবাণী। এই রামায়ণ-বক্ষে ভারতীয় হিন্দুসমাজ সহস্র ঝঞ্ঝারাজির মধ্যেও সহস্রাধিক বৎসর যাবৎ স্বকীয় বৈশিষ্ট্য রক্ষা করিয়া সগৌরবে দাঁড়াইয়া আছে। রামায়ণের বাণী বা উপদেশ চিরকাল ভারতবাসীকে মুক্তির ও শান্তির পথের সন্ধান দিবে সন্দেহ নাই। এ বিষয়ে মহাকবি রবীন্দ্রনাথের গভীর উক্তিটি শ্রদ্ধার সহিত স্মরণীয়,— “রামায়ণ ও মহাভারত আমাদের দেশের জ্ঞান বা বুদ্ধি চর্চ্চার গ্রন্থ নহে, উহা আমাদের সমাজ-জীবনের ধ্রুবতারা।” ভারতের সমাজ-ধৰ্ম্মে রামায়ণের মহিমা কীৰ্ত্তন করিয়া মহাত্মা তুলসীদাস স্বপ্রণীত রামচরিতমানসে লিথিয়াছেন— “ধর্ম্মন দুসর সত্য সমানা। আগম নিগম পুরাণ বখানা॥” —বেদে, পুরাণে বা সংহিতায় সত্যধর্ম্ম তূল্য আর দ্বিতীয় কোন ধর্ম্ম নাই। ভগবান্ রামচন্দ্র সত্যেরই মূৰ্ত্ত বিগ্রহ। ‘ধৰ্ম্ম সংস্থাপনার্থায়’ রামচন্দ্রের এই ভবধামে আবির্ভাব। রাবণ ও তাহার অসুর-বৃত্তি বিনাশ করিয়া লঙ্কাধিপতি বিভীষণকে রাজ্যাভিষেক করিবার সময় রামচন্দ্র বিভীষণকে যে ধৰ্ম্মোপদেশ প্রদান করিয়াছিলেন, তাহা নিখিল জগতের নরনারীর পক্ষে চির-কল্যাণপ্রদ। বিভীষণ রামচন্দ্রকে পদব্রজে ও রণসজ্জাহীন অবস্থায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে দেখিয়া অত্যন্ত ব্যাকুল হৃদয়ে শ্রীরামের নিকট জিজ্ঞাসা করিলেন,— “নাথ ন রথ নহি তনু ত্রাহি ত্রাণা। কেহি বিধি জিতব বীর বলওয়ানা ॥” দেব! আপনার রথ নাই, অঙ্গে বৰ্ম্ম বা পদত্রাণ নাই; আপনি অতি বলবান্ অপরাজেয় রাক্ষসশ্রেষ্ঠ রাবণকে কি উপায়ে পরাস্ত করিবেন? শোকাকুল বিভীষণকে আশ্বস্ত করিয়া সর্ব্ববিদ্যাবিশারদ ভগবান্ রামচন্দ্র কহিলেন,—বিভীষণ! বাহ্যিক রথ বা বৰ্ম্মে প্রকৃত শত্রু বা অন্তর্শত্রু জয় করা যায় না। যে রথে বা রথী জয়যুক্ত হয়, তাহার রূপ অন্য প্রকার;— “তৌরথু আনহ সুনহু সখা বীর ধীর জহিঁ হোই। তেজ বল ধরম সুজানতা, সত্যশীল দৃঢ় রোই ॥” —হে সখা! যে রথে আরোহণ করিলে বীরেরা রণজয় করেন, সেই রথের প্রকৃতি ভিন্ন। ধৈর্য ও বীর্য তাহার দুই চক্র, সত্য ও শীলশীলতা তাহার ধ্বজা ও পতাকা, বল, বিবেক, ইন্দ্রিয়-সংযম ও পরোপকারবৃত্তি তাহার চারিটি অশ্ব এবং ক্ষমা, দয়া ও বৈরাগ্য তাহার সারথি। ঈশ্বরভক্তিই তাহার অভেদ্য কবচ এবং সন্তোষই তাহার তৃণীর। যে বীরপুরুষ এইরূপ ‘ধর্মমরথ’ আরোহণ করিয়া সংসার-সংগ্রামে প্রবৃত্ত হন, তাঁহার পরাজয় কখনও ঘটে না;— “মহা অজয় সংসার রিপু জিতি সকৈ সো বীর। জাকে যশ রথ হোই দৃঢ় সুনহু সখা মতিধীর ॥” —হে ধীরমতি বীর! যাহার এইরূপ ‘ধর্ম্ম-রথ’ বিদ্যমান, সে সংসার-সহোদর অপরাজেয় শত্রুকে অনায়াসে জয় করিতে পারে। রামায়ণের প্রধান চরিত্রগুলির আদর্শ ভারতীয় সংস্কৃতিতে এমন এক মহিমান্বিত রূপ লাভ করিয়াছে, যাহার তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সত্যসন্ধ পিতৃভক্ত রামচন্দ্র, আদর্শ পতিব্রতা সীতা, ত্যাগব্রতী পরম অনুগত ও বিশ্বস্ত সেবক লক্ষ্মণ এবং রাজ্যলিপ্সাহীন জিতেন্দ্রিয় ভরত ভারতীয় সমাজ-জীবনকে মহিমান্বিত করিয়া রাখিয়াছে। রামচন্দ্রের চরিত্রে আমরা একাধারে পাই—জগদ্বরেণ্য আদর্শ রাজা, শ্রেষ্ঠ স্বামী, কল্যাণকামী পুত্র এবং পরম হিতৈষী সুহৃদ। অনাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিয়া তিনি যে রামরাজ্যের পত্তন করিয়া গিয়াছেন, তাহা জগতের ইতিহাসে অক্ষয় তূণীরের মত চির-ভাস্বর থাকিবে। সীতা ভারতীয় ললনার আদর্শ-প্রতিমা। সাবিত্রী ও দময়ন্তীর অপূৰ্ব্ব সত্য ও দুঃখবরণ উপাখ্যানের মধ্য দিয়া নারীত্বের যে চরম বিকাশ ঘটিয়াছে তাহারও উত্তর-পৃষ্ঠা এই সীতামহিমা। লক্ষ্মণের অবিচলিত ভ্রাতৃভক্তি চিরকাল পরম পূজ্য আদর্শ বলিয়া পরিগণিত হইবে। স্বামী বিবেকানন্দ রামায়ণের আদর্শ চরিত্রগুলির বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে সীতা ও লক্ষ্মণকে ভূয়সী প্রশংসা করিয়া ভারতের সর্বাঙ্গীন মঙ্গলের উপাদানরূপে গ্রহণ করিয়াছেন। সংসার-সমুদ্র হইতে তরিত হইবার জন্য রামায়ণ এক পরম সেতু। মহর্ষি বাল্মীকি তাঁহার পবিত্র রামকথার উপসংহারে আশীবাদ করিয়া গিয়াছেন— “য শাতু রামচরিতে পঠতি শৃণোতি বা। স যাতি পরমাত্মানং রামং বিষ্ণুং সনাতনং॥” —যিনি এই পরমা পবিত্র রামচরিত পঠন ও শ্রবণ করিবেন, তিনি ধৰ্ম্মাধর্ম্মের ও পাপপুণ্যের পারে গমন করিয়া সনাতন চিজ্জ্যোতি পরমাত্মা ভগবান্ বিষ্ণুর পরমপদ লাভ করিতে সমর্থ হইবেন। সর্ব্বমঙ্গলময় আদিকবি বাল্মীকির পবিত্র রামায়ণ-কথা আচন্দ্র-তার্ক কীর্ত্তিত থাকুক এবং জগৎ-বাসীর মঙ্গল সাধন করুক। —ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ— । সমাপ্ত । _ মহীপালের গান চুয়া চন্দ্রে বাঁট্যারে লীলা বাসর কোটারা ভরে। আমলা মতি বাঁট্যারে লীলা আবের কোটারা ভরে॥ তোলা পানিতে নায়ারে বাপজান মাথা হয়েছে আটা। মহীপাল রাজা কেটেছে দীঘি আমি সেই দীঘিতে যাব॥ “কলঙ্কিনী লীলারে তুমি যেয়ো না দীঘির ঘাটে।” “কলঙ্কিনী লীলারে তুমি যেওনা দীঘির ঘাটে॥” বাপেরো মানা না শুনে লীলা চললো দীঘির ঘাটে। মায়েরো মানা না শুনে লীলা চললো দীঘির ঘাটে॥ আগে পাছে দাসী বান্দী মধ্যে চললো লীলা। আগে পাছে গোলাম নফর মধ্যে চললো লীলা॥ হাঁটু পানিতে নাম্যারে লীলা হাঁটু মঞ্জন করে। মাজা পানিতে নাম্যারে লীলা গাও মঞ্জন করে॥ বুক পানিতে নাম্যারে লীলা বুক মঞ্জন করে। খবুর্যার আগে খবর গেল মহীপাল রাজার কাছে॥ যে লীলার জন্মে রে মহীপাল তুমি ছয়মাস ভাঙ্গাছে নীয়ার। যে লীলার জন্মে রে মহীপাল তুমি ছয়মাস ভাঙ্গাছো রোদ। লীলার মাথার কেশরে মহীপাল দীঘির পানি ছাপিয়ে পরেছে কেশে বাজ্যা উঠছে রে মহীপাল কত রুই কাতলা। যে লীলার জন্মে রে মহীপাল ভাঙ্গ্যাছিল নীয়ার ॥ সেই লীলা আইছেরে মহীপাল তোমার সরোবরে। এক দীঘির ঘাটেরে মহীপাল সাঁতরে বাসরে ফেরে। বারে বারে ঘুর্যারে মহীপাল রাজায় চুল ধরিয়া রাখিল॥ কে ধরিল কে ধরিল আমার চুলের দুখে মল্যাম। বাপের মানা না শুন্য। আমি দীঘির ঘাটে মল্যাম॥ কলঙ্কিনী লীলা গো আমি কলঙ্কিনী হলাম। মায়ের মানা না শুনে আমার সকল সম্মান গেল॥ (১-২৬)