বগুলার বারমাসী
প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা - চতুর্থ খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন
বগুলার বারমাসী , “কিবা লিখি কিবান , পড়ি আমার নাই থাকে সে মনে। কলম তুল্যা দেওরে বন্ধু লিখন কারণে॥ মন হইল ছনরে ভন বন্ধুরে হাতে নাইরে বল। খিম সাগরে আইল কাল জোয়ারের জল রে বন্ধু কাল জোয়ারের জল ঘর আন্ধাইর বন্ধু, ঝিমিঝিমি রাতি। কলম তুল্যা দেওরে বন্ধু রাখরে মিনতি।” “একবার দুই ন! বার তিন বারের বেলা। এনয় এনয় কন্যা তোমার কলম ফেলা॥ আসমানেতে চান্দরে তারা ঝিলিমিলি জ্বলে। দূরের বাতাস আইসে ভাইস্যা উদাম নদীর কূলে॥ গয়িন বনের পঙ্খীরে কন্যা পাখালী তার ভিজা। দূরে বাজায় বাঁশের বাঁশী রাখালিয়া রাজা ॥ সত্য যদি করলো কন্যা সত্য কর তুমি। তবেত লিখনীর কলম তুল্যা দিবাম আমি॥ সত্য যদি করলো কন্যা চান্দ তারা চাইয়া। তবেত লিখনীর কলম দিব গো তুলিয়া ॥” “কি সত্য করিব কুমার কিছুই না জানি। আমার বিয়ার কথা লোকে কানাকানি ॥ বাপে বিয়া দিতরে চায় দুষ্মন কুমারে। রাজার ঘরে যাইতে বন্ধু আমার মন নাই সে সরে বনে থাকি বনের পাখী আসমানেতে উড়ি। কোন্ পন্থে যাইব বন্ধু বুঝিতে না পারি ॥ দুষ্মন রাজার পুত্র যৌবন মাগিল। এত দিনে জীবন যৌবন আমার কাল যে হইল ॥ শুন শুন সাধুর পুত্র আমার মিনতি। কলম যে তুলিয়া দেওরে তুমি পরাণ-পতি ॥ আইজের নিশির চন্দ্রে তারা সাক্ষী করি আমি। জীবনে মরণে বন্ধু তুমি মোর স্বামী ॥ না চাই না চাইরে বন্ধু রাজ রাজ্য পাটে। বিরক্ষ তলায় শুইব তোমায় লইয়া বুকে ॥ না চাই না চাইরে বন্ধু রত্ন অলঙ্কারে। বনে আছে বনের ফুল তুল্য। দিও মোরে ॥ খাট পালঙ্গেরে বন্ধু কোন্ বা আমার কাম। যোগল চরণে তোমার যদি পাইরে স্থান ॥ আজি রাইতে সত্যরে বাণী হেলা নয়রে ফেলা বাপেরে কইব আজ সত্যের যত কথা ॥ কলাবনের পাখীরে বিয়ার গান গাও। রজনী পোয়াইলে পাখী কোন বা দেশে যাও ॥ নদীর কূলে থাকরে পবন নদীর কূলে বাসা। সাক্ষী হইও তোমরা সবে আমার মনের আশা ॥ আমার মনের আশারে বন্ধু এই না পুষ্পের মালা। তোমার গলায় বন্ধু দিলাম এহি মালা ॥ বাপে নাই সে জানে বন্ধু নাই সে জানে মায়। এক জানে চান্দ তারা আর সে জানে বায়॥” ( ১—৪৬ ) ঢোল ডুম্বুর বাজে সানাই রইয়া রইয়া। সাধুর পুত্রর সঙ্গে অইল সুন্দর কন্যার বিয়া ॥ ( বণিক্-কুমারের সমুদ্র-যাত্রার প্রাক্কালে ) “শুন শুন পরাণ-পতিগো আমার কথা লইও। ঝড় তুফানেতে ডিঙ্গা কিনারায় লাগাইও ॥ শুন শুন প্রাণের পতি আমার মাথা খাও। দক্ষিণা সায়র বানে ১ নাই সে ধর নাও ॥ উত্তর মযালেরে ২ বন্ধু বেশী দূর না যাইও। পাহাড়িয়া নদীর বাঁকে নৌকা না বাহিও ॥ পূর্ব্ব সায়রের বন্ধু নাই সে কূল কিনারা। দুরেত রাক্ষসের বাসা প্রাণে যাইবা মারা ॥ বিপদে পড়িলে বন্ধু দুর্গার নামটি লইও। বচ্ছরের মধ্যে বন্ধু গিরেত ফিরিও॥ তুফানে পড়িলেরে ডিঙ্গা মনসা স্মরণ। অগতির গতি প্রভু দেব নারায়ণ॥ দেবতা সকলে বন্ধু রাখুন তোমারে। কহিতে কান্দয়ে কন্যার দুই আঁখি ঝরে॥” মাথায় তুল্যা লইল কন্যা যাত্রা কালের বাতি। বিদায় করিতে কন্যা যায় প্রাণপতি॥ দুই আখখিঁ ঝরে কন্যার শাওনের ধারা। সর্প যেমন নিজ মণি করিল পাঙ্গুরা॥ ধান্য দুর্বা রাখে কন্যা গলুইয়ের উপরে। জুড়িয়া দুখানি হাত পূজে মনসারে॥ দীপ ধূপ দিয়া করে ডিঙ্গার সাজন। জোকার করিল কন্যা মঙ্গল কারণ॥ ধুয়াইয়া পতির পাও কেশেতে মুছায়। এক বচ্ছরের লাগ্যা পতি করিল বিদায়॥ ভাটি গাঙ্গর উজান বাতাস উড়াইল পাল। বিদায় হইল সাধুর ডিঙ্গা হৃদয়ে দিয়া শাল॥ (৪৬–৭৪) (৩) শয়ন মন্দিরে কন্যা থাকে একেশ্বরী। উঠা পড়া করে মন চিন্তা হইল ভারি॥ খাট আছে পালং আছে পুষ্পের বিছানী। বাছিয়া লইল কন্যা ভূমি শয্যাখানি ॥ অঙ্গের যত সোণারে দানা খুলিয়া ফালায়। খালি মন্দিরে নিশি কেমনে পোহায় ॥ পুষ্পে না আদুরে কন্যা সোহাগেতে মানা। বেগরে ছাড়িল কন্যা আরাম থানাপিনা ॥ কৈাইল ১ ডাকে বনের ঘরে কাঁপে গাছের পাতা। পুষ্প ভারেতে আল্যা ২ পড়ে মালতীর লতা ॥ চাম্পা গাছেত দেখ পুষ্প সারি সারি। যৈবন হইল বাসি কান্দে সাধুর নারী ॥ “রতন মন্দির ঘর শূন্য যে করিয়া। এন ৩ কালে বন্ধু মোর গেল যে ছাড়িয়া ॥ আর কতদিন ধইরা রাখি নারীর যৈবন। আর কতদিন বাইন্ধা রাখি অবুলার ৪ মন ॥ পাখী যদি হইতাম বন্ধুরে যাইতাম উড়িয়া। কোন সায়রের বুকে বন্ধু ডিঙ্গা যায় রে বাইয়া ॥ কালবরণ ভমরারে রূপার বরণ আঁখি। কও কও বন্ধুর কথা কয় ভাইরা শুনি ॥ উড়িয়া যাওরে বনের পঙ্খী নজর বহুত দূরে। আমার বন্ধুর দেখা পাইলা কোন গয়িন ৫ সায়রে ॥ শুনরে পবনা তুমি আমার মাথা খাও। সংসার ঘুরিযা তুমি ভরমিয়া বেডাও ॥ আসমানের চন্দ্র সুরুজ দুই আখ্থি জলে। কোন দেশে গিয়াছে বন্ধু এই নিশির কালে॥ ( ৭৪—১০০ ) ( ৪ ) ভোর হইল কালনিশা কুঞ্জে ফুল ফুটে। হেনকালে আইল দূতী লিখন লইয়া হাতে॥ কার লিখন কে পাঠাইল ত্বরিত অইয়া। সারা নিশির অঙ্গের ধূলা কন্যা লইল ঝাড়িয়া॥ বন্ধু বুঝি এতদিনে পাঠাইল লিখন। লিখন পড়িল কন্যা করিয়া যতন॥ রাজার পুত্র লিখছে লিখন গায়ে দিল কাঁটা। যৈবন মাগিছে কন্যার দুষ্মন রাজার বেটা॥ আস্তেব্যস্তে কয় দূতী “কন্যা লো, মোর কথা ধর। আজি নিশি যাইবেনি কন্যা জোর মন্দির ঘর॥ সোনার যৈবনে কন্যা অঙ্গে ধূলা মাটি। পালঙ্গে বিচ্ছাইয়া দিব ঐ না শীতলপাটি॥ সোনার যৈবন কন্যা লো নাই সে আভরণ। সোণায় বান্ধাইয়া দিব চিক্কনী যৈবন॥ বাগে আছে চম্পার কলি গন্ধে আমোদিয়া। দাসীগণে তুলে ফুল মালাটি গাথিয়া॥ সোণার বাটা ভইরা দিব পান আর চুণে। রাজরাণী অইয়া কন্যা থাকিবা যতনে॥ গন্ধের তৈল সারি সারি লো কন্যা তোমার লাগিয়া। সেহিত তৈল দাসীগণ দিব অঙ্গেত মাখিয়া॥ চাচর চিকণ কেশে বাইন্ধা দিব বেণী। যতনে থাকিবা মুখে অইয়া রাজরাণী॥ আজু যে ফুটে সোনার ফুল কাইল অইব বাসি। সুবন্ন অধরে কন্যা না থাকিব হাসি॥ নারীর বৈবন লো কন্যা জোয়ারের পানি। একবার লাগিলে ভাটি বেরথা টানাটানি॥” “শুন শুন আলো দূতী কইয়া বুঝাই তোরে। মোর পরাণ পতি নাই সে দেখ ঘরে॥ বরত কইরাছি আমি শুন দিয়া মন। রাজপুত্রে দিও আমার এই সে লিখন॥ বুঝাইয়া শুনাইয়া কইও আমার যত কথা। বুঝাইয়া শুেনাইয়া কইও দুখের বারতা॥ বড় দুঃখ দেয় মোরে শাশুড়ী ননদী। তাদের দুঃখের দায়ে নিরালায় কাঁদি॥ ধরিতে না পারি বৈবন হইল বিষম কাল। শাশুড়ী ননদী ঘরে হইল জঞ্জাল॥ চিত্তে ক্ষেমা দিয়ারে দূতী বচ্ছর গুয়ায়। এই কথা বুঝাইয়া বইল রাজার ছাল্যায়॥ এক বচ্ছর ব্রত মোর ভূমিত শয়ন। পর পুরুষের মুখ না করি দর্শন॥ খাট পালঙ্ক ছাড়ছি জমিনে বিছানা। সম্ভোগবিভোগ দবব কইরাছি বজ্জনা॥ ধূলায় পাত্যাছি শয্যা ব্রতের কারণ ॥ পুষ্প তুলিতে মানা এক বছর কাল। রাজপুত্রে কইও দূতী আমার এই হাল ॥ সিনান করিতে নাই অঙ্গে ধূলাবালি। এক বছর পরে ফুটব আমার যৌবন কলি ॥ পরেত যাইব দূতী তাহার মন্দিরে। লিখন লইয়া দূতী যাও তুমি ঘরে ॥” ( ১০০-১৫০ ) ( ৫ ) লিখন লইয়া দূতী হইল বিদায়। খালি ঘরে শুইয়া কন্যা করে হায় হায় ॥ “দুস্মন রাজার পুত্র কি জানি কি করে। একেলা কেমনে আমি থাকি শূন্য ঘরে ॥ নিরাশা দিলে না জানি করে কোন কাম। পতির উপরে বুঝি বিধি হইল বাম ॥ দুরন্ত বনের বাঘা শীকারেতে আশা। কি জানি ভাঙ্গিয়া দেয় আমার সুখের বাসা ॥ বার বছরের লাগ্যা পতি পাঠাইল বিদেশে। আলুফা আচানকা দব্ব মিলব কোনবা দেশে ॥ বিধি যদি সদয় হওয়ে আসে ছয় মাসে। বিধি যদি নিরদয় আর না হইব দেখা। গলায় তুলিয়া দিব কাটারির লেখা ॥” ( ১৫০-১৬৪)turn_on_metadata_from_gcs_to_drive = true; turn_on_photo_metadata_viewer = true; এই মত কান্দিয়া কন্যার একমাস যায় । সুমুখে আগুন মাস আইল নয়া বায় ॥ মন্দিরে আসিতে দেখ দূতীর হইল মানা । কবুতরা আনে লিখন শূন্যে আনাগোনা ॥ এইতনা আগুন মাসরে শীতে হিস্ফিস । বায়েতে আলিয়া পড়ে নয়া ধানের শীষ ॥ ঘরে আইল নয়ারে ধান্য জয়াদি জোকারে । অর্ঘ্য দেয় কুলের নারী ঘরের লক্ষ্মীরে ॥ আমি অভাগী নারীর চিতে হাহাকার । কণ্ঠে নাই সে ফুটে আমার জয়ের জোকার ॥ দয়া কর লক্ষ্মীমাতা দয়া কর তুমি । কাল বিয়ানে উইঠ্যা দেখি ঘরে আইছে সুয়ামী ॥” “শুন শুন সাধুর কন্যালো শুন কই তোমারে । প্রাণের কথা বল্যা দিও এইনা কইতরা রে ॥” “শুন শুন রাজপুত্র শুন মন দিয়া । এই মাস থাক তুমি চিতে ক্ষমা দিয়া ॥” ( ১৬৪—১৮০ ) আইল দারুণ পৌষ্যরে পৌঁষে অন্ধকার । উত্তইরা বাতাসে আমার গায়ে আইল জ্বর ॥ ঘরে নাই সে প্রাণের পতি ঘর অন্ধকার। শূন্য বুক ফাট্যা উঠে দুঃখের হাহাকার ॥ কুয়ায় ১ ছাইল দেশ অন্ধ হইল আঁখি। কাইল বিয়ানে উঠ্যা যদি সুয়ামীরে দেখি ॥ “শুন শুন সুন্দর কন্যা কহি যে তোমারে। আর কতদিন আর কতকাল তাড়াইবা মোরে ॥” “শূণ্যে আইয়ে শূণ্যেত যাইরে তোমার কৈতরা। এই মাস থাক কুমার চিতে ক্ষেমা দিয়া ॥ মন হইল ভারা সারা প্রাণ হইল খালি। শাশুড়ী ননদী হইল দুই চক্ষের বালি। শাশুড়ী ননদী দেয় দুরাক্ষর গালি ॥” ( ৮ ) “এহিতনা মাঘ মাস শীতে কাঁপে হাড়। ভূমিতে পাতিয়া শয্যা কান্দি জারে জার ২। ছিঁড়িয়া মৈলান ৩ হইল অগ্নি পাটের শাড়ী। বৈদেশী হইয়াছে বন্ধু অভাগীরে ছাড়ি ॥ খাট আছে পালং আছে লেপ তুলা ভরা। একতিলা ৪ বন্ধু মুখানি না যায় পাণ্ডুরা ॥ বন্ধু যদি থাকত গিরে’ পালঙ্কে শুইয়া। পোহাইতাম দিঘল নিশি তারে বুকে লইয়া॥ মাটি হওরে মাটির দেহা তোমার কিবা কাম। সোয়ামীর সোয়াগ্য। ছিলাম সোয়ামীর পরাণ॥ এন সুয়ামী যদি ছাইড়া গেল মোরে। মুছাইয়া দুই আখি কেবান লইব উরে॥” “শুন শুন সাধুর কন্যা শুন দিয়া মন। তিন মাস গত হইল চিত্ত উচাটন॥” “শুন শুন রাজার পুত্র কহিযে তোমারে। একদিন যাইবাম তোমার শয়ন মন্দিরে॥ যৈবন হইল বাসি চিত্ত উচাটন। এহি দুখখু সহি কেবল ব্রতের কারণ॥ (১৯৩—২১৬) ( ৯ ) এহিতনা ফাগুন সকল মাসের রাজা। রূপে ভইরা গন্ধে ভইরা পুষ্পকলি তাজা॥ নয়া বসন নয়ারেভূষণ পরে বিরঙ্কলতা। তারা কি বুঝিবে হায় অভাগীর কথা॥ মদন বসন্ত কালে যেহি দিকে চাই। পরাণ বন্ধুরে আমার দেখিতে যে পাই॥ ফুলে বন্ধু কুলেরে বন্ধু ভমরার বোলে। ধরিতে ছুইতে নারি কেবল ভাসি আঁখি জলে॥ নাসিকায় পাই গন্ধ কানে শুনি কথা। এহি দুঃখ দিল মোরে দারুণ বিধাতা॥” “শুন শুন সাধুর কন্যা শুন দিয়া মন। চারিমাস হইল গত চিত্ত উচাটন॥” “শুন শুন রাজার পুত্র শুন মন দিয়া। এহি মাস থাক তুমি চিতে ক্ষমা দিয়া॥” (২১১—২২৫) ( ১০ ) “আইল চৈতের হাওয়া মন হইল পাগলা। অঙ্গ জ্বলিয়া যায় মদনের জ্বালা॥ ক্ষণে উঠি ক্ষণে বসি ক্ষণে নিদ পারি। ক্ষণে ক্ষণে স্বপ্ন দেখি বন্ধু আইল বাড়ি॥ পালঙ্কে বসিয়া বন্ধু কোলে নিল মোরে। মুখেত রাখিয়া মুখ চুম্বিল আমারে॥ দ্বিতীয় পওর ১ নিশি বন্ধু দিল আলিঙ্গন। তিতিয় পওরে হইলাম নিদ্রায় মগন॥ অলস অবশ অঙ্গ দেহায় বল নাই। চতুথ পওরে বন্ধু জাগিয়া না পাই॥ দারুণ কোইলার ডাকে নিদ্রা যে ভাঙ্গিল। স্বপ্নেত আসিয়া বন্ধু কোথায় লুকাইল॥ সাড়ীর আইঞ্চলে খুঁজি খুঁজি মাথার কেশে। বুকে আছে পরাণ বন্ধু সুমুখে নাই সে আসে॥” “শুন শুন সুন্দর কন্যা কহি যে তোমারে। পঞ্চ মাস গতৈক যদি কত ভাড়াও মোরে॥” “বছরের অর্ধেক গত কুমার মন কর থির। নয়া বছরে যাইম তোমার মন্দির॥” (২২৫—২৪৩) ( ১১ ) “পরথম বৈশাখ মাসরে নয়। বছর পরে। অদিষ্টে বিধাতা জানি কি লিখ্যাছে মোরে॥ লীলারী বাতাসে অঙ্গ না হয় শীতল। ঘুসির আগুন যেমুন রইয়া রইয়া জ্বলে॥ কাল ধৈবন কাল রাখিতে না পারি। ভুমিত পাতিয়া শুই অগ্নি-পাটের সাড়ী॥ বন্ধু যদি আইত দেশে কিসের বরত পালি১। যতনে গাখিতাম মালা নয়া পুস্প তুলি॥ পুস্পবনে আনিতাম ভ্রমরে বান্ধিয়া। আইজ নিশি যায় মোর কান্দিয়া কান্দিয়া॥” “শুন শুন সুন্দর কন্যা লিখন লিখি তোরে। ছয়মাস গত হইল কত ভাড়াও মোরে॥ রূপের যমুনা নদী আজিকে উজানী। দিনে দিনে ভাটি ধরবে নাই সে থাকবে পানি॥” “এওমাস যায় কুমার—কুমার আরে শান্ত কর মন। আর কিছু কাল গেলে হবে অবশ্য মিলন॥” (২৪৫—২৫৯) ( ১২ ) “এহিতনা জ্যৈষ্ঠ মাসারে গাছে নানা ফল। জীবন যৌবন মোর সকলই বিফল॥ জলটুঙ্গি ঘর মোর পইড়া আছে খালি কেমুন দুম্মনে মোরে দিল এমুন গালি ॥ যদি ঘরে থাকৃত বন্ধু কোলেতে লইয়া। জলটুঙ্গি ঘরে নিদ্রা যাইতাম শুইয়া ॥” “শুন শুন সুন্দর কন্যা কহি যে তোমারে। এওমাস গত হইল কত ভাড়াও মোরে ॥” “কালপূর্ণ হইতে রে কুমার পঞ্চমাস বাকী। সবুরে ফলিবে মেওয়া আশার আশে থাকি ॥” ( ১৩ ) “আষাঢ় মাসেত গাঙ্গরে বহিছে উজানী। শুকনা নদীতে আইল জোয়ারের পানি ॥ দেয়ায় ডাকে ঘন ঘন মেঘে শীতল পানি। পিয়াসে তাতিয়া মরি অবুলা দুক্ষিনী ॥ এই মেঘে নাইরে পানি আমার লাগিয়া। অথথির পাতা টইল্যা পড়ে আসমান চাহিয়া ॥ বিধি নিদারুণ অইল তাই যত দুঃখু যায়। আষাঢ়ের ভরা নদী এমুনে শুকায় ॥ শুন শুন বিধুব দেওয়াবে ডাকে কাঁপে মাটি। দিনে দিনে যৌবন গঙ্গা ধরিলেক ভাঁটি ॥ কইও কইও মনের কথা প্রাণবন্ধুর কাণে। মরিল দুক্ষিনী কন্যা মরিল পরাণে ॥” “শুন শুন সুন্দর কন্যা আর নাই সে তাড়াও। ত্বরিত উত্তর দিও আমার মাথা খাও ॥ গোপনে পাঠাইলাম কন্যা সোণার চৌদোলা। যতনে রাখ্যাছি কন্যা মাণিক্যিরমালা ॥” (স্বগত) “হায়রে দুষ্মন কুমার কি কহিলি কথা। তোমার দেওয়া মণিমুক্তা বন্ধুর পায়ের ধূলা ॥” (প্রকাশ্যে) “শাস্ত কর কুমার আরে শান্ত কর মন। অল্প কালে হবে কুমার অবশ্য মিলন ॥” (২৬৯—২৮৯) ( ১৪ ) শাওন ১ বাওনা ২ মাস আথাল পাথাল ৩ পানি। মনসা পূজিতে কন্যা হইল উয্যোগিনী ॥ কান্দিয়া বসাইল ঘট আপনার গিরে। প্রাণপতি ঘরে আইসে মনসার বরে ॥ চাচর চিক্কণ কেশে গিরটি ৪ মাজ্জিল। নূতন পিটালি দিয়া আলিপনা দিল ॥_ পঞ্চনাগ আঁকে কন্যা শিরের উপরে। মনসা দেবীরে আঁকে অতি ভক্তিভরে॥ শির নোয়াইয়া করে শতেক পন্নতি। “বর দাও মনসা গো ঘরে আইওক পতি।” “শুন শুন সুন্দর কন্যা কহি যে তোমারে। সিপাই লস্কর যাইবে আনিতে তোমারে॥” “শুন শুন রাজার কুমার শান্ত কর মন। ব্রতকাল শেষ প্রায় অবশ্য মিলন॥” (২৮৯—৩০২) (১৫) “ভাদ্র মাসের চান্নি দেখ গাঙ্গের তলা দেখে। ঠেকিয়া রহিল ডিঙ্গা কোন বা নদীর পাকে॥ আমারে দেখিতে বন্ধুর নাই কি লহে মন। এমন নিদয়া বন্ধু হইল ক্যামন॥ পাল উড়ে পাল পড়ে দূর গাঙ্গের বুকে। এই বুঝি আইল বন্ধু স্মরিয়া আমাকে॥” অগ্নি পাটের শাড়ী কন্যা খুলিয়া লইল। ভরা ডিঙ্গা লইয়া বন্ধু বুঝি দেশেতে ফিরিল॥ ধান্য দুব্বা লইল বাছি অর্ঘিতে যায় ঘাটে। এন কালে আইল কৈতর কন্যার নিকটে॥ “শুন শুন সুন্দর কন্যা শুন দিয়া মন। বিফল হইল তোমার অঙ্গের সাজন॥ সাধুর নন্দন কন্যা আর না যাইব দেশে। ডুব্যাছে ডিঙ্গার লোক আবঙ্গের দেশে ॥” “শুন শুন রাজার পুত্র শুন দিয়া মন। অকূলে ডুবুক ডিঙ্গা লইয়া যতেক ধন ॥ সুয়ামী ডুবিয়া মরুক কোন দুঃখু নাই। তোমার মতন রাজা সুয়ামী যদি পাই ॥” (৩০৩—৩২১) ( ১৫ ) “আশ্বিন মাসেত হায়রে দুর্গা পূজা দেশে। অবশ্যি আইব পতি দুর্গারে পূজিতে ॥ তুল্যা রাখি পদ্মর ফুল তুল্যা রাখি পাতা। কি দিয়া পুজিব বন্ধু জগতের মাতা ॥ ফুটিল সিঙ্গার। ফুল গন্ধে ভায় ভরা। এও ফুল অইল বাসি শুকায় নদীর ধারা ॥ এও মাসে বন্ধু মোর না আইল গিরে। কার্ত্তিক অইলে গত কেঃ রাখিবে মোরে ॥” “শুন শুন সুন্দর কন্যা নাইসে দেওগো ফাঁকি। বচ্ছর গোয়াইতে দেখ এক মাস বাকি ॥ ফইর্যা আইলে নাগর তোমার বান্ধিয়া মারিব। আগুন মাসেত কন্যা তোমায় বিয়া যে করিব ॥ মণিমুক্তা দিয়া লো কন্যা করিবাম সাজন। হীরায় গড়িয়া দিবাম যত আভরণ ॥” “শুন শুন রাজার পুত্র কহি যে তোমারে। পতিষ্টার ‘ কাল পুন্ন ২ হইল নিকটে ॥ স্বামীরে মারিবা কুমার দুঃখু নাই তায়। রাজা সুযামী যদি ভাগ্যেতে মিলায় ॥” বগুলা সুন্দরী কান্দে হইয়া হারা-দিশ্ । কেশেত চাপাই বান্ধে কাল জহর বিষ ॥ বরতের যত আয়োজন করে রাজার বেটা। লাগিবেক একশত কালা ধলা পাঠা ॥ মেষ মহিষ আর জোড়া কবুতর ॥ কত যে লাগিব তার লেখা জোখা নাই ॥ “কার্তিক মাসেত কুমার চিত্ত উচাটন। বৈদেশে সাধুর পুত্রের হইয়াছে মরণ ॥ চৌদল পাঠাইও কুমার নিশি দুপহরে। কালুকা যাইব কুমার তোমার মন্দিরে ॥” ( ৩২১—৩৪৯ ) ( ১৭ ) লিখন লইয়া কৈতরারে শূন্যে দিয় উড়া। জালেত হইল বন্দী ননদিনী খাড়া ॥ “নিলাজ অসতী নারী কি কহিবাম তোরে। গলায় কলসী বাইন্ধা যাহ জলের ঘাটে ॥ তুষের আগুন জ্বালি নিজেরে পুড়াও। এমনি কলঙ্কী মুখ জগতে দেখাও ॥” ঘরের চিকল বন্ধ বন্দী হইল নারী। পিঞ্জরায় বন্দী হইল উড়ন্ত কৈতরী ॥ এন কালেতে সাধুর ডিঙ্গা লাগিলেক ঘাটে। দেশেত পড়িল সাড়া বাদ্দিভাণ্ড বাজে ॥ ভরা ডিঙ্গা ছাইড়া উঠে সাধুর নন্দন। শীতল মন্দিরে যায় ত্বরিত গমন ॥ “শুনলো প্রাণের কন্যা বগুলা সুন্দরী। এক বছর গত হইল তোমারে না দেখি ॥ কেমনে পরাণ ধরি বৈদেশেতে বাসা। দারুণ রাজার পুত্র করিল নিরাশা ॥ তাড়াইয়া তাড়াইয়া মোরে পাঠায় বৈদেশে। আর না থাকিম এমুন রাজার দেশে ॥ দুয়ার খোলো কন্যা আইলাম ঘরে ॥” ননদী আসিয়া কয় সাধুর নন্দনে ॥ “কলঙ্কে ছাইল দেশ দাদা নাহিক উপায়। তোমার ঘরের নারী তোমারে তাড়ায় ॥” পিঞ্জরা খুলিয়া পত্র ভাইয়েরে দেখাইল । দেখিয়া সাধুর পুত্র আগুন জ্বলিল। ভরা ডিঙ্গায় উঠাইয়া কন্যারে দিল বনবাস। কান্দে বগুলা কন্যা না পুরিল আশ ॥ ( ৩৪১—৩৭৫ ) ( ১৮ ) “বনে থাক বনের বাঘরে খাও মোর মাথা। না কইও না কইও বন্ধে আমার যত কথা ॥ শুনিলে পরাণ বন্ধু দুঃখ পাইব ভারি। বিনা দোষে ছাড়ে পতি আপনার নারী॥ পতির কোন দোষ নাইরে যত দোষী আমি। বান্ধিয়া রাখিলাম বিষ না খাইলাম আমি॥ দুষ্মন রাজার পুত্র মারিব পতিরে। তেহি সত্য করিলাম তাহার গোচরে॥ মরিতাম খাইয়া বিষ কি করিত মোরে। দেশ ছাইড়া পরাণ পতি যাইত বহুদূরে॥ আমি যে মরিতাম হায়রে কোন দুঃখ নাই। পরাণে বাঁচিত বন্ধু দুষ্মনের ঠাঁই॥ সাক্ষী হইও তরুলতা তোমরা সকলে। আমার যতেক কথা বন্ধু নাহি জানে॥ সাক্ষী হইও চান্দ সুরুজ সাক্ষী হইও তোমরা। বগুলা কন্যার গান যত দুঃখুভরা॥” কান্দিয়া কাটিয়া কন্যার দুঃখের দিন যায়। আর এক রাজার পুত্র পথে পাইল তায়॥ (.৩৭৫—৩৯৪ ) ( ১৯ ) জোরেত ধরিয়া তারে লৈল নিজ দেশে। কন্যা বলে আমার যে এক ব্রত আছে॥ ব্রতের যতেক বেশ অঙ্গে বিদ্যমান। কন্যায় কয় “রাজার পুত্র রাখ আমার মান॥ বার মাস গেছে ব্রত প্রতিষ্ঠার কাল। নাইসে ভাইঙ্গ ব্রত মোর না ঘটাও জঞ্জাল॥” “তোমার বরত করতে কন্যা কোন কোন দবব লাগে।” “মেষ লাগে মইষ লাগে আর কৈতর লাগে॥ কালাধলা পাঠা লাগে আর শবরী কলা। এক লক্ষ সোণার চাম্পায় গাইথ্যা দিবা মালা॥ সব্ব-সুলক্ষণ এক সাউধের নন্দন। তাহারে আনিয়া দিবা ব্রতের কারণ॥” কত কত সাধুর পুত্র ডিঙ্গা বইয়া যায়। যারে দেখে ধইরা আনে রাজার কুটালায়॥ দেখিয়া কন্যার রূপ রাজা উদামা পাগেলা। যাহা কয় কন্যা রাজা নাহি করে হেলা॥ “এই সাধুতে আমার কাম নাহি হয়।” লইক্ষ লইক্ষ সাউধের পুত্র বন্দী হইয়া রয়॥ একদিন কন্যার তবে আশা যে পূরিল। আপন সোয়ামীরে কন্যা বন্দিত করিল॥ উজানি pani বাইয়া সাধু ঘুরে নানা দেশে। জানিয়া শুনিয়া সাধু কন্যারে উরদিশে॥ বেনিজ্জি বিফল সাধুর মন হইল পাগেলা। নানা দেশে ঘুইরা মরে জোয়াইরা চিলা॥ কন্যা কয় “অন্য জনে আর নাই সে কাম।” যত যত সাধুর পুত্রে দিল মুক্তি দান॥ আইল ব্রতের দিনরে কার্তিক মাস যায়। লিখনে লিখিয়া কন্যা স্বামীরে জানায়॥ নিশি দুপর কালে কন্যা কোন কাম করে। স্বামীরে লইয়া কন্যা ডিঙ্গার কাছি ছাড়ে॥ পুবাল বাতাসে কন্যা উড়াইল পাল। পতি লইয়া ছাড়ে ডিঙ্গা উত্তর ময়াল ॥ ঘুমতনে ১ উঠ্যা দেখে রাজার রাজ্যবাসী লোকে। পলাইয়া গেছে কন্যা আপনার দেশে ॥ (৩৯৪—৪২৭)