চন্দ্রাবতীর রামায়ণ
প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা - চতুর্থ খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন
চন্দ্রাবতীর রামায়ণ প্রথম পরিচ্ছেদ ( ১ ) লঙ্কার বর্ণনা সাগরের পারে আছে গো কনক ভুবন। তাহাতে রাজত্ব করে গো লঙ্কার রাবণ॥ ২ বিশ্বকর্ম্মা নির্ম্মাইল গো রাবণের পুরী। বিচিত্র বর্ণনা তাহার গো কহিতে না পারি॥ যোজন বিস্তার পুরী গো দেখিতে সুন্দর। বড় বড় ঘরগুলি গো পাহাড় পর্ব্বত॥ ৬ সাগরের তীরে লঙ্কা গো করে টলমল। হীরামণ মাণিক্যিতে গো করে ঝলমল॥ ৮ বড় বড় পুষ্কুণী গো বান্ধ্যা চারিধার। সোণায় রূপায় বান্ধাইল ঘাট অতি চমৎকার॥ ১০ স্বর্গপুরে আছে যথা ইন্দ্রের নন্দন। সেইমতে লঙ্কাপুরে গো অশোকের বন॥ ১২ দিন রাইতে ফুটে ফুল গো অশোকের বনে। লঙ্কায় ফুটিলে গন্ধ গো ছুটে তিরভুবনে॥ ১৪ এক দিনে ফুটি ফুল গো বছরে না বাসি। তা দিয়ে সাজান করে গো যতেক রাক্ষসী॥ ১৬ বারমাস ফলে বৃক্ষে গো অমৃত রসাল। পাক্না ফলের ভরে গো ভাইঙ্গা পড়ে ডাল॥ ১৮ রাতিতে প্রদীপ জ্বালে গো না নিতে দিবসে। নিশিদিন কাটে সবে গো গীত-বাদ্য-রসে॥ ২০ পক্ষী যদি উড়ে যায় গো যায় দুই সারে। চন্দ্র সূর্য্য গো দূর হইতে নমস্কার করে॥ ২২ বড় বড় ঘরগুলি গো পাহাড় পর্বত। তাহাতে বসতি করে গো রাক্ষসেরা যত॥ ২৪ সোণায় ছাইয়া ঘর গো রূপায় দিছে বেড়া। জমিনে থাকিয়া ঠেকে গো আসমানেতে চূড়া॥ ২৬ রাবণের কেলিগৃহ গো তাহার মাঝখানে। চান্দেরে বেড়িয়া যেন গো শোভে তারাগণে॥ ২৮ হাজার-দুয়ারী ঘর গো আবে ঝিলিমিলি। সোণার কপাট মধ্যে গো রূপার দিছে খিলি॥ ৩০ হীরামণ মাণিক্য দিয়া গো করেছে সাজন। এমন সুন্দর ঘর গো নাহি তিরভুবন॥ ৩২ রূপেতে রূপসী যত গো রাক্ষস-কামিনী। পারিজাত ফুলে তারা গো বিনাইয়া বান্ধে বেণী॥ ৩৪ মণি-মাণিক্যেতে কেউ গো চাঁচর কেশ বান্ধে। বায়ু সুরভিত হয় গো শ্রীঅঙ্গের গন্ধে॥ ৩৬ হীরামণ-মাণিক্য গো অঙ্গে পায় লাজ। দণ্ডে দণ্ডে ধরে তারা গো নব রঙ্গের সাজ॥ ৩৮ সোণার পালঙ্কে তারা গো শুইয়া নিদ্রা যায়। দেবের অমৃত তারা গো সুখে বৈস্যা খায়॥ ৪০ বিচিত্র সুবর্ণ লঙ্কা গো নির্মাণিল বিশাই ১ । এমন বিচিত্র পুরী গো তিরভুবনে নাই ॥ ৪২ বড়ই দুরন্ত রাজা গো দেবে নাই ডরে। অমর হইয়াছে দুষ্ট গো বিরিঞ্চির বরে ॥ ৪৪ ইন্দ্র আদি দেবতাগণ গো রাবণে করে ডর। কেবল তাহার বৈরী গো নর আর বান্দর ॥ ৪৬ ধামায় মাপিয়া তারা গো তুলে রত্নধন। এমন বৈভব কারো গো নাই তিরভুবন ॥ ৪৮ বিত্ত-বৈভব তার গো বর্ণনা না যায়। হীরামণ-মাণিক্য তারা গো তলইয়ে শুকায় ॥ ৫০ একদিন রাবণ রাজা গো পাত্র মিত্র লইয়া। যুক্তি করে দশানন গো লঙ্কাতে বসিয়া ॥ ৫২ রাবণের স্বর্গ জয় করিতে গমন স্বর্গ জিনিতে রাজা গো করিলেক মন। লইয়া রাক্ষস-সৈন্য গো করিল গমন ॥ ২ বড়ই দুরন্ত সেই গো রাক্ষসের সেনা। স্বর্গের দুয়ারে যাইয়া গো দিল সবে হানা ॥ ৪ দেবরাজে বার্তা গিয়া গো জানাইল চরে। আইল রাবণ রাজা গো স্বর্গ জিনিবারে ॥ ৬ ইন্দ্রাদি দেবতা সবে গো চিন্তিত হইল। রাক্ষসের রোলে স্বর্গ গো কাঁপিয়া উঠিল ॥ ৮ একে ত রাবণ রাজা গো সাক্ষাৎ শমন। যার সম বীর নাহি গো এহি তিরুভুবন ॥ ১০ কাটিলে না কাটে মুণ্ড গো আগুনে না পুড়ে। এমনি হইয়াছে দুষ্ট গো বিরিঞ্চির বরে ॥ ১২ স্বর্গ ছাইড়া পলাইল গো যত দেবগণ। ইন্দ্র যমে লইল রাজা গো করিয়া বন্ধন ॥ ১৪ পারিজাত বৃক্ষ ছিল গো ইন্দ্রের নন্দনে। ডালে মূলে উপাড়িয়া গো লইলা রাবণে ॥ ১৬ ঐরাবত হস্তী লইলা গো উচ্চৈঃশ্রবা ঘোড়া। কাইড়া লইয়া পুষ্পক রথ গো শূন্যে দিল উড়া ॥ ১৮ মণিমুক্তা লইলা কত গো না যায় গণন। ঝাইড়া মুইছ্যা লইলা রাজা গো ভাণ্ডারের ধন ॥ ২০ দেবকন্যাগণে লইল গো রাজা রথেতে তুলিয়া। হরষিতে চলে রাজা গো জয়লক্ষ্মী লইয়া ॥ ২২ ইন্দ্রাদি দেবতাগণে বন্দী করি গো লয়। স্বর্গপুরী শ্মশান হইল গো চন্দ্রাবতী কয় ॥ ২৪ ( ৩ ) রাবণ কর্তৃক মর্ত্য ও পাতাল বিজয় পরে ত চলিল রাজা মরত ভুবন। মর্ত্যেতে আছিল শুন গো যত রাজাগণ ॥ ২ বিনাযুদ্ধে সকলে গো মাগিল পরিহার। পাতালপুরে চলে রাজা গো করি মার্ মার্ ॥ ৪ পাতালে বাসুকী আদি গো যত নাগগণ। বিনাযুদ্ধে আসি সবে গো লইলা শরণ। ৬ পরে ত চলিল রাজা গো গহন কাননে। যথায় তপস্যা করে গো যত মুনিগণে॥ ৮ রাজকর চায় রাজা গো ঘূর্ণিত লোচন। জটাচুলে ধরিয়া সবে গো করে বিরম্বন ১॥ ১০ কপীন সম্বল তারা গো ফল মূলাহারী। রাবণের পায়ে পড়িয়া গো যায় গড়াগড়ি॥ ১২ দয়ামায়া নাহি গো দুষ্ট রাবণের মনে। নানামতে বিরম্বনা গো করে মুনিগণে॥ ১৪ কুশাগ্রে চিরিয়া বুক গো রক্ত সবে দিল। মুনির রক্ত কর লইয়া গো কৌটায় ভরিল॥ ১৬ লঙ্কায় চলিল রাজা গো হরষিত মন। মন্দোদরী রাণীর আগে গো দিল দরশণ॥ ১৮ রক্ত-কটরা খুলি গো রাণীর হাতে দিল। চিন্তিত হইয়া রাণী গো রাবণে পুছিল॥ ২০ “কিবা ধন আনিয়াছ গো কটরায় ভরিয়া।” রাণীরে কহিলা রাজা গো সান্ত্বনা করিয়া॥ ২২ “সতত আমার বৈরী গো যত দেবগণ। অমর হইয়াছে সবে গো অমৃত কারণ॥ ২৪ ইন্দ্র যমে আনিয়াছি গো লঙ্কায় বান্ধিয়া। সবারে মারিব গো এই বিষ খাওয়াইয়া॥ ২৬ যত্ন করি এই কৌটা গো তুল্যা রাখ ঘরে।” এত বলি রাবণ রাজা গো চলিলা বাহিরে॥ ২৮ ( ৪ ) সীতার জন্মের পূর্ব্ব-সূচনা রাজ্য করে রাবণ রাজা গো পাত্র মিত্র লইয়া। সীতার জনম-কথা গো শুন মন দিয়া ॥ ২ চন্দ্র হইতে জ্যোতি রাজা গো করিয়া হরণ। মটূকে রাখিল করি রাজা গো শীর্ষের আভরণ ॥ ৪ সূর্য্য হইতে কাড়ি লইল গো সহস্র কিরণ। কুড়ি চক্ষে ভরি রাখে গো জ্বলন্ত অনল ॥ ৬ দেবতা তেত্রিশ কোটি গো আইল লঙ্কাপুরে। করযোড়ে দণ্ডাইল গো রাবণের ডরে ॥ ৮ কেহ ঝাড়ুদার কেহ গো বাগানের মালী। দেবের উপরে রাক্ষস গো করে ঠাকুরালী ॥ ১০ কুবের হইলাসি গো রাজার ভাণ্ডারী। একাদশ রুদ্র হইল গো শিয়রের পরী ॥ ১২ দ্বাদশ আদিত্য হইল গো শিরে ছত্রধর। দেবতা হইয়া পবন গো চুলায় চামর ॥ ১৪ বরুণ আসিয়া রাজার গো চরণ পাখালে। লঙ্কাপুরে পারা ’ দেয় গো শমন কোটালে ॥ ১৬ অশ্বশালে থাকি ইন্দ্র গো কাটে ঘোড়ার ঘাস। চন্দ্র সূর্য্য আলো দেয় গো বার তিথি মাস ॥ ১৮ গন্ধর্ব্বপুরেতে যত গো গন্ধর্ব্ব-কুমারী। বলেতে আনিয়া রাজা গো আনে নিজ পুরী ॥ ২০ সাত শত দেবকন্যা গো রাজা রথেতে তুলিয়া। শূন্যরথে করি আনে গো লঙ্কায় হরিয়া ॥ ২২ বলে ছলে পড়ি কেহ গো পাপিষ্ঠে ভজিল। ঝাঁপাইয়া সাগরজলে গো কেউ বা মরিল॥ ২৪ অশোক কাননে রাজা গো হরষিত মতি। দেবকন্যী সঙ্গে কেলি গো করে দিবারাতি॥ ২৬ হীরা মণি মুক্তা আদি গো যত আভরণে। আপনি মদন রতি সাজায় রাবণে॥ ২৮ চেড়ী গিয়া বার্তা কয় গো মন্দোদরী আগে। “এতকাল রাণী তুমি গো আছিলা সোহাগে॥ ৩০ দেবকন্যা সহিত রাজা গো অশোক কাননে। কেলি করে নিরন্তর গো হরষিত মনে॥” ৩২ এহি কথা শুনিলেন গো মন্দোদরী রাণী। অভিমানে দরদরি গো চক্ষে বহে পানি॥ ৩৪ বহুবল্লভ মন্দোদরী গো জানিয়া রাবণে। কটরায় আছিল বিষ গো পড়িলেক মনে॥ ৩৬ “যে বিষ খাইয়া মরে গো দেবতা অমর। আমি কেন নাহি খাই গো সেই কাল জ্বর॥” ৩৮ ( ৫ ) मंदোদরীর গর্ভসঞ্চার ও ডিম্ব-প্রসব এতেক ভাবিয়া রাণী গো কি কাম করিল। কৌটায় আছিল বিষ গো মুখে তুলি দিল॥ ২ দৈবের নিবন্ধ কভু গো না যায় খণ্ডানি। বিষ খাইয়া গর্ভবতী গো হইলেন রাণী॥ ৪ একমাস দুইমাস গো তিনমাস গেল। দশমাস দশদিনে গো পূর্ণিত হইল॥ ৬ বিষেতে অবশ অঙ্গ গো বদন হইল কালা। ভূমিতে শুইল রাণী গো কাল বিষের জ্বালা॥ ৮ দিন যায় রাত্রি আসে গো শনির বারবেলা। এমন কালে রাণী এক গো ডিম্ব প্রসবিল॥ ১০ চরে গিয়া বাৰ্ত্তা তবে গো জানায় রাবণে। ডিম্ব প্রসবিলানি রাণী গো অতি অলক্ষণে॥ ১২ এহি কথা রাবণ রাজা গো যখনি শুনিল। গণক আনিতে রাজা গো চর পাঠাইল ॥ ১৪ পাঞ্জি পুঁথি লইয়া গণক গো আইল রাজার পুরে। খড়ি পাতি গণক তবে গো লাগে গণিবারে॥ ১৬ “অবধান কর আজি গো রাক্ষসের নাথ। সুবর্ণ লঙ্কার শিরে গো হইল বজ্রাঘাত॥ ১৮ এই ডিম্বে কন্যা এক গো লভিল. জনম। তা’ হইতে রাক্ষস-বংশ গো হইবে নিধন॥ ২০ আর এক কথা শুশ গো রাক্ষসের পতি। কন্যার লাগিয়া বংশে গো না জ্বলিবে বাতি॥ ২২ দৈবের নিবন্ধ কভু খণ্ডান না যায়। আপনি মরিবে রাজা গো এই কন্যার দায়॥ ২৪ রাক্ষসের রক্ষা নাই গো গণিলাম সার। সুবর্ণের লঙ্কাপুরী হৈল ছারখার॥” ২৬ এহি কথা রাবণ রাজা গো শুনিল যখন। কুড়ি চক্ষে অগ্নি ছুটে গো জ্বলন্ত নয়ন॥ ২৮ কেহ বলে ‘কাট ডিম্ব’ গো কেহ বলে ‘ভাঙ্গ।’ ‘অনলে পুড়াইয়া’ কেউ গো বলে ‘কর সাঙ্গ॥’ ৩০ এই কথা অন্তঃপুরে গো শুনিলেন রাণী। অন্তরে জ্বলিল যেন গো জ্বলন্ত আগুনী॥ ৩২ কান্দিল মায়ের পরাণ গো এহি কথা শুনি। দরদর করি রাণীর চক্ষে বহে পানি ॥ ৩৪ বনের পশুপক্ষী যারা গো সন্তানে রাখে বুকে। তারাও ঝুরিয়া মরে গো পুত্র-কন্যার শোকে ॥ ৩৬ কান্দিয়া রাবণে রাণী গো জানাইল বারতা। “নষ্ট না করিও ডিম্ব গো রাখ মোর কথা ॥ ৩৮ না ভাইঙ্গ না পুইর ডিম্ব গো আমার মাথা খাও। যদি নাই রাখ ডিম্ব গো সায়রে ভাসাও ॥” ৪০ রাণীর কথায় রাবণ গো কি কাম করিল। পঞ্চজন কারিগর গো ডাকিয়া আনিল ॥ ৪২ বানাইল কৌটা এক গো সন্ধান করিয়া। তাহাতে ভরিল ডিম্ব গো যতন করিয়া ॥ ৪৪ সোণার কটরা মধ্যে গো রূপার খিল দিয়া। সায়রে ভাসাইল ডিম্ব গো ভবানী স্মরিয়া ॥ ৪৬ ঘনাইয়া আইল সন্ধ্যা গো রবি বসে পাটে। এমন সময় লাগ্ল ডিম্ব গো জনক ঋষির ঘাটে ॥ ৪৮ মাধব জালিয়া ও সতা জাল্যানী মিথিলা নগরে ছিল গো মাধব জালিয়া। জাল বায় মাছ ধরে গো ঘাটে দেয় খেয়া ॥ ২ নগরের মাঝে মাধব গো সবার দীনহীন। হাটের চাউল ঘাটের পানি গো দুঃখে যায় দিন ॥ ৪ পিন্ধনে কাপড় নাই গো পেটে নাই ভাত। রাত্রদিন ভাবে সতা গো শিরে দিয়া হাত॥ এক সুখ কপালে তার গো লিখিলা বিধাতা। আছিলা ঘরের নারী গো সতী পতিব্রতা॥ সতা নামে নাম তার গো জনম-দুঃখিনী। স্বামীর সুখেতে সুখী গো দুঃখেতে দুঃখিনী॥ জাল বাইয়া আইসে মাধব গো কাদা ভরা পায়। ধুয়াইয়া মুছাইয়া সতা গো ঘরে লইয়া যায়॥ দারুণ গরমে মাধব গো ছটফট করে। তালের পাখা লইয়া সতা গো অঙ্গে বাতাস করে॥ মাঘ মাসেতে দুঃখ গো শীতের রজনী। আপন অঞ্চলে পাতে গো স্বামীর বিছানী॥ ক্ষুদকণা যা’হা থাকে গো খাওয়ায় স্বামীরে। পাতের প্রসাদ সতা গো খায় ভক্তিভরে॥ পাতালতার ঘরখানি গো ভাঙ্গা বেড়া তায়। স্বামী বুকে লইয়া সতা গো সুখে নিদ্রা যায়॥ এমন যে দুঃখ তবু গো কপালের না দোষে। স্বামী লইয়া থাকে সতা গো মনের সন্তোষে॥ উবাসে কাবাসে দিন গো গত হইয়া যায়। দারুণ বিধাতা গো মুখ তুলিয়া না চায়॥ ছেঁড়া পাটের শাড়ী গো কোমরেতে বেড়ি’। মাছের ঝাঁপি মাথায় সতা গো ফিরে বাড়ী বাড়ী॥ মলিন বয়ান গো সতার ঘামে ভিজে কেশ। হাসিমুখে কহে কথা গো নাহি ভাবে ক্লেশ॥ একদিন মাধব গো কোমরে বান্ধি ডোলা। জাল বাইতে যায় গো মাধব তিন-সন্ধ্যাবেলা॥ বাহিতে বাহিতে গো জাল রজনী আইল। মাচ নাহি পায় গো মাধব চিন্তিত হইল॥ ৩২ দৈবের নির্বন্ধ কথা গো শুন মন দিয়া। আরবার গো জাল ফেলে মনসা স্মরিয়া॥ ৩৪ তাড়াতাড়ি করি মাধব গো টানে জালের দড়ি। জালেতে ঠেকিয়া উঠে গো সোণার কটরি॥ ৩৬ চন্দ্রাবতী কহে “মাধব গো ঘরে ফইরা যাও। পোহাইল দুঃখের নিশি গো সুখে বৈস্যা খাও॥” ৩৮ বাড়ীতে আসিয়া মাধব গো তিন ডাক দিল। শীঘ্রগতি হইয়া সতী গো ঘরের বাহির হৈল॥ ৪০ আজি বুঝি গো দোনা মাছ পাইলেন পতি। শীঘ্র ক’রে জ্বালে সতী গো আন্ধাইর ঘরে বাতি॥ ৪২ মাধব কহে বিধি কিবা গো লিখিল কপালে। কাণা কড়ির মৎস্য আজগো না পড়িল জালে॥ ৪৪ কাণে কাণে কয় গো মাধব শুনে বা না শুনে। কি জানি পাড়ার লোক গো গোপন কথা জানে॥ ৪৬ আস্তে ব্যস্তে কৌটা মাধব গো দিল সতীর হাতে। সুবর্ণ কটরা সতী গো তুই্ল্যা লইল মাথে॥ ৪৮ কাঠালের পিড়িতে গো সতী আসন পাতিল। যতন করিয়া গো তথি কটরা রাখিল॥ ৫০ জয়াদ্ভি জোকার দিয়া গো মঙ্গল জানায়। পঞ্চ সিন্দুরের ফোটা গো দিল কৌটার গায়॥ ৫২ ধান্য দুর্বা আলপনা গো কৈল বিধিমতে। আম্র শাখে রাখে ঘট গো জল ভরি তা’তে॥ ৫৪ পঞ্চ গাছি সইলতা ১ দিয়া গো জ্বালে স্মৃতের বাতি। ধূপ ধুনা জ্বালাইয়া গো করিল আরতি ॥ ৫৬ সাষ্টাঙ্গে ভূমিতে পড়ি গো করিল প্রণাম। সতার গৃহেতে হইল গো লক্ষ্মী অধিষ্ঠান ॥ ৫৮ পোহাইল দুঃখের নিশি গো আইল সুখ ভোর। আজ হইতে হইল সতার গো সকল দুঃখ দূর ॥ ৬০ গোয়ালেতে বন্ধ্যা গাভী গো কামধেনু হইল। সরু শস্য ধানে চাউলে গো উভরা ভরিল ॥ ৬২ ক্ষেতে যদি গো বীজ ফেলে দোনা শস্য ফলে। এখন হইতে মাধব আর গো নাহি যায় জালে ॥ ৬৪ মাছের ডুলি মাথায় সতা গো না যায় বাড়ী বাড়ী। ‘রাম-লক্ষ্মণ-শাঁখা’ পরে গো মাধবের নারী ॥ ৬৬ ‘গঙ্গাজল-শাড়ী’ পরে গো পিন্ধন বাহার। কোমরে বেড়িয়া পরে গো পাটের পসার ॥ ৬৮ কাঞ্চন সরা বাটায় গো সুখে পান গুয়া খায়। ফুলের মাচায় শুইয়া গো সুখে নিদ্রা যায় ॥ ৭০ পাড়াপড়শীরা সবে গো করে কানাকানি। এই না আছিল সতা গো জনম-দুঃখিনী। ৭২ সতা বলে “পাড়াপড়শী গো থাক আশার আশে। কপালে থাকিলে গো সুখ একদিন আসে ॥” ৭৪ ( ৭ ) ডিম্ব লইয়া সতার জনক-মহিষীর নিকট গমন একদিন রাত্রে গো সতা দেখিল স্বপন। সে বড় আশ্চর্য্য কথা গো শুন সখীগণ ॥ ২ আড়াই প্রহর রাত্রি গো সতা শুইয়া নিদ্রা যায়। চান্দের আলোক গো তার ঘুরে আঙ্গিনায় ॥ ৪ কৌটা হইতে গো এক কন্যা বাহির হইয়া। মা মা বলি ধরে গো সতার গলা জড়াইয়া ॥ ৬ আশ্চর্য্য রূপসী কন্যা গো! যেন পুষ্পডালা। উজ্জল করিল গো গৃহ সাক্ষাৎ কমলা ॥ ৮ ধরিয়া সতার গলা গো কহে ধীরে ধীরে। “আমারে লইয়া যাও গো জনক রাজার ঘরে ॥ ১০ বাপ মোর জনক রাজা গো রাণী মোর মাও। কালি প্রাতে মোরে লইয়া গো রাণীর কাছে যাও ॥” ১২ ভোর না হইতে গো সতা সকালে উঠিয়া। সুবর্ণ কটরা লইল গো অঞ্চলে বান্ধিয়া ॥ ১৪ গত নিশির স্বপ্নের কথা গো রাণীকে কহিল। অঞ্চল খুলিয়া কৌটা গো রাণীর হাতে দিল ॥ ১৬ রাণী বলে “কিবা দিব গো ইহার বদলে।” গজমোতি হার এক পরায় সতার গলে ॥ ১৮ ধামায় মাপিয়া দিলা গো রত্নাদি কাঞ্চন। সতা বলে “এ সকলে কোন প্রয়োজন ॥ ২০ তোমার রাজ্যেতে বসি গো জন্ম-কাঙ্গালিনী। আছয়ে মিনতি এক গো শুন রাজরাণী ॥ ২২ স্বপ্ন যদি সত্য হয় গো কন্যা জন্মে ইতে। আমার নামেতে গো কন্যার নাম রাইখ্যো সীতে ॥” ২৪ এত বলি সতা তবে গো বিদায় হইল। সুবর্ণ কটরা রাণী গো যতনে রাখিল ॥ ২৬ শুভদিনে শুভক্ষণ গো পুর্ণিত হইল। ডিম্ব ফুটিয়া গো শিশু ভূমিষ্ঠ হইল ॥ ২৮ofos_bengali_modern_literature_v1_000627.png{“box_2d”: [78, 86, 959, 874], “label_categories”: [“paragraph”]}noneasrawtext_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [79, 81, 957, 856], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [78, 83, 959, 860], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [80, 81, 959, 857], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [80, 81, 959, 857], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [80, 81, 958, 857], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [80, 81, 958, 857], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [80, 81, 958, 857], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [80, 81, 958, 857], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories[“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories”: [“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_v1_000627.png{“box_2d”: [81, 80, 958, 858], “label_categories[“paragraph”]}none_ocr_bengali_book_page_images_ সব্বসুলক্ষণা কন্যা গো লক্ষ্মীস্বরূপিণী। মিথিলা নগর যুড়ি গো উঠে জয়ধ্বনি ॥ ৩০ জয়া দি জোকার দেয় গো কুলবালাগণ। দেবের মন্দিরে গো বাদ্য বাজে ঘনে ঘন ॥ ৩২ স্বর্গে মর্ত্ত্যে জয় জয় গো সুর নরগণে। হইল লক্ষ্মীর জন্ম গো মিথিলা ভবনে ॥ ৩৪ সতার নামেতে গো কন্যার নাম রাখে সীতা। চন্দ্রাবতী কহে গো কন্যা ভুবন-বন্দিতা ॥ ৩৬ রামের জন্ম পুণ্যকথা এক চিত্তে শুন গো দিয়া মন। যে রূপে জন্মিলা গো প্রভু রাম নারায়ণ ॥ ২ এক অংশ নারায়ণ গো চারি রূপ ধরি। জন্ম লইলেন আসি গো অযোধ্যা নগরী ॥ ৪ রাজ্য করে দশরথ গো অযোধ্যা নগরে। প্রজাগণে পালে রাজা গো পুত্র সমাদরে ॥ ৬ অপুত্রক ছিলা রাজা গো! দুঃখযুক্ত হিয়া। একে একে করিলেন গো তিনখানি বিয়া ॥ ৮ কৌশল্যা কৈকেয়ী আর গো সুমিত্রা ঠাকুরাণী। রাজার আছিল এই গো তিনজন রাণী ॥ ১০ বশিষ্ঠেরে লইয়া রাজা গো করয়ে মন্ত্রণা। পুত্রের লাগিয়া করে গো যজ্ঞ আরম্ভণ ॥ ১২ নানাদেশ হইতে গো ডাকি আনে মুনিগণে। যজ্ঞ করে দশরথ রাজা গো পুত্রের কারণে ॥ ১৪ যতেক যজ্ঞের ফল গো হইল নিষ্ফল। আটকুরা রাজার ভাগ্যে গো না ফলিল ফল ॥ ১৬ একদিন দশরথ গো বড় দুঃখ মন। যোড়মন্দির ঘরে যাইয়া করিল শয়ন ॥ ১৮ কপাটেতে খিল দিয়া গো অনাহারে রয়। মনদুঃখে হইল রাজার গো জীবন সংশয় ॥ ২০ একদিন দুইদিন গো তিনদিন গেল। মন্দিরের কপাট রাজা গো মুক্ত না করিল ॥ ২২ দৈবের নির্ব্বন্ধ কথা গো শুন দিয়া মন। আচম্বিতে আইল তথা গো মুনি একজন ॥ ২৪ অতিদীর্ঘ জটাভার গো পড়ে ভূমিতলে। ললাটে চন্দন তিলা গো তারা যেন জ্বলে ॥ ২৬ হস্তেতে তালের যষ্টি গো কান্ধে বাঘছাল। মুনিরে দেখিয়া গো ভয় লাগে দ্বারপাল ॥ ২৮ দুয়ারে খাড়াইয়া মুনি গো তিন ডাক মাইল। মুনির বচনে রাজা গো দুয়ার খুলিল ॥ ৩০ পাদ্য অর্ঘ্য দিয়া দিল গো বসিতে আসনে। তাতে না বসিয়া মুনি গো বসে কুশাসনে ॥ ৩২ রাজারে জিজ্ঞাসে মুনি গো কিসের কারণ। এহি মতে অনশনে গো ত্যজিছ জীবন ॥ ৩৪ দুঃখের কথা কয় রাজা গো মুনির চরণে। সান্ত্বনা করেন মুনি গো মধুর বচনে ॥ ৩৬ অকাল অমৃত ফল গো খুলি ঝুলা হইতে। আস্তে ব্যস্তে দেয় মুনি গো দশরথের হাতে ॥ ৩৮ এই ফল দেও নিয়া গো কৌশল্যা রাণীরে। এই ফলে পাবে গো পুত্র দেবতার বরে ॥ ৪০ ফল লইয়া দশরথ গো অতি ধীরে ধীরে। শীঘ্রগতি চলে রাজা গো কৌশল্যার মন্দিরে ॥ ৪২ ফল লইয়া দিল রাজা গো কৌশল্যার হাতে। রাজারে দেখিয়া রাণী গো উঠে চমকিতে ॥ ৪৪ মুনির বৃত্তাত্ত রাজা গো বলে সমুদয়।
-
-
-
- ॥ ৪৬ ফল পাইয়া কোশল্যা গো আনন্দিত হিয়া। সোণার কটরা মাঝে গো রাখিল তুলিয়া ॥ ৪৮ সরলা কৌশল্যা দেবী গো কি কাম করিল। মুনির দেওয়া ফল রাণী গো তিন ভাগ কৈল ॥ ৫০ এক ভাগ নিজে খাইল রাণী গো আর দুই ভাগ লইয়া। সুমিত্রা কৈকেয়ীর ঘরে দিল গো পাঠাইয়া ॥ ৫২ কিছুকাল পর শুন গো দৈবের ঘটন। গর্ভবতী হইল ক্রমে গো রাণী তিন জন ॥ ৫৪ অযোধ্যা নগরে উঠে গো জয়াদি জোকার। শুনি নাগরিয়া লোকে গো লাগে চমৎকার ॥ ৫৬ ঢাক ঢোল বাজে রঙ্গে গো নাচে প্রজাগণ। ভাণ্ডার খুলিয়া সবে গো করে ধন বিতরণ ॥ ৫৮ ব্রাহ্মণেরে দিলা রাজা গো ধনরত্ন দান। দুগ্ধবতী গাভী দিলা গো সহিত রাউথ্যাল ॥ ৬০ এক দুই তিন করি গো পঞ্চমাস গেল। গর্ভের লক্ষণ গো ক্রমে প্রকাশ হইল ॥ ৬২ জ্যেঠি খুড়ি মিলি সবে গো সাধ খাওয়াইল। জয়রবে অযোধ্যাপুরী গো ভরিয়া উঠিল ॥ ৬৪ অলস হইল গো তনু মুখে হাই উঠে। সোণার পালঙ্ক ছাড়ি গো ভূমে পড়ি লুটে ॥ ৬৬ পোড়া মাটি খায় গো ঘুমে ঢুলে দু’নয়ন। চন্দ্রাবতী কয় গো এই গর্ভের লক্ষণ ॥ ৬৮ দশমাস দশদিন গো পূর্ণিত হইল। সর্ব সুলক্ষণ শিশু গো ভুমিষ্ঠ হইল ॥ ৭০ সুবর্ণ কাটরীতে গো ধাই নাড়ী ছেদ করে। জ্যাদি জোকার পড়ে গো কৌশল্যার মন্দিরে ॥ ৭২ দূতে গিয়া বার্তা কইল গো দশরথের আগে। হিরা মণ মাণিক্য দিয়া গো রাজা পুত্রমুখ দেখে ॥ ৭৪ সুগন্ধি চন্দন যত ছিটায় গো রাজপথে। শিশু দেখতে রাজগণ গো আইল শুন্য রথে ॥ ৭৬ নেতের পতাকা উড়ে গো প্রতি ঘরে ঘরে। বলিদান বাদ্যভাণ্ড গো দেবের মন্দিরে ॥ ৭৮ আম্রশাখে পূর্ণ কুম্ভ গো তীর্থজলে ভরি। হুলাহুলি কুলাকুলি গো দেয় কুলনারী ॥ ৮০ যতেক নাটুয়াগণ করে গো নাচগান। আনন্দেতে তুলপার গো করে পুরীখান ॥ ৮২ মঙ্গল চণ্ডিকা পুজে গো দেবী সুবচনী। বনদুর্গা পূজা করে গো ডরাই ডাকুনী ॥ ৮৪ শীতলা-ষষ্ঠীর পুজা গো করে বিধিমতে। মনসাদেবীরে পুজে গো নেতার সহিতে ॥ ৮৬ যাটিহারা দিন ’ দেখি গো নামকরণ কৈল। গণিয়া বাছিয়া নাম গো পুরবাসী থৈল ॥ ৮৮ কৌশল্যা রাখিল নাম গো কাঙ্গালের ধন। দশরথ নাম রাখে গো অযোধ্যা-ভূষণ ॥ ৯০ রাজ্যবাসী নাম রাখে গো রাম রঘুবর। পুরনারী নাম রাখে গো শ্যামল সুন্দর ॥ ৯২ ধ্যানেতে জানিয়া গো বশিষ্ঠ তপোধন। নাম রাখে গো রামচন্দ্র কমল-লোচন ॥ ৯৪ করকোষ্ঠী হেতু গো রাজা গণকে ডাকিল। পুঞ্জি পুঁথি হাতে লৈয়া গো গণক আইল ॥ ৯৬ খড়ি পাতি সাত পাঁচ গো ঘর যে আঁকিয়া। গণক কোষ্ঠীর ফল গো কহিল ভাবিয়া ॥ ৯৮ “জোর ভূরো দীপ্ত আঁখি গো সূর্য সম জ্বলে। রাজটীকা আছে গো ঐ শিশুর কপালে ॥ ১০০ আগুনে না পুড়িবে গো শিশু জলে নৈব তল। ধনুকধারী হবে শিশু গো বলে মহাবল ॥ ১০২ ইন্দু তুল্য পরাক্রান্ত গো রাজ্য অধিকারী। মরিবে ইহার বাণে গো ত্রিজগতের বৈরী।” ১০৪ সপ্তম ঘরেতে গণক গো শূন্য যদি দিল। গোপন ঘরের কথা গো গোপনে রাখিল ॥ ১০৬ গোপন ঘরের কথা গো রাখিল গোপনে। কপালের দোষে রাম গো যাইবেন বনে ॥ ১০৮ ফলিবে সে ব্রহ্মশাপ গো পুত্রের কারণ। এই পুত্র লাগি গো রাজা ত্যজিবে জীবন ॥ ১১০ এইরূপ জন্মিলেন গো রাম রঘুপতি। কৌশল্যা মায়ের পদে গো ভনে চন্দ্রাবতী ॥ ১১২ প্রথম পরিচ্ছেদ সমাপ্ত দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ সীতার বারমাসী ( ১ ) সাত পাঁচ সখী বইসা গো জোড়-মন্দির ঘরে। এক সখী কহে কথা গো জিজ্ঞাসে সীতারে॥ ২ তুমি যে গেছলা গো সীতা এই বনবাসে। কোন্ কোন্ দুঃখ পাইয়াছিল। গো কোন্ কোন্ মাসে॥ ৪ “আমার দুঃখের কথা গো কহিতে কাহিনী। কহিতে কহিতে উঠে গো জ্বলন্ত আগুনী॥ ৬ জনম-দুঃখিনী সীতা গো দুঃখে গেল কাল। রামের মতন পতি পাইয়া গো দুঃখেরি কপাল॥ ৮ এক ত দিনের কথা গো শুন সখীগণ। চাইর বইন আছি গো মোরা মিথিলা ভুবন॥ ১০ আনন্দে কাটযে দিন গো শৈশবের বেলা। মায়ের কোলেতে থাকি গো করি খেলাধুলা॥ ১২ বাপের আছিল পণ গো আচরিত কথা। যে ভাঙ্গিবে শিবের ধনু গো তারে দিব সীতা॥ ১৪ কত রাজা আইল গো গেল সীমা-সংখ্যা নাই। ধনুক ভাঙ্গিতে পারে গো সাধ্য কারো নাই॥ ১৬ একদিন রাত্রে আমি গো দেখিলাম স্বপন। শিয়রে বসিয়া প্রভো গো কমল-লোচন॥ ১৮ ‘উঠ উঠ জানকী গো কত নিদ্রা যাও। আমি রামচন্দ্রে ডাকি গো আঁখি মেইল্যা চাও॥ ২০`of বহুদূর দেশ হইতে গো আইলাম মিথিলা ভবন। ভাঙ্গিব শিবের ধনু গো করিয়াছি পণ॥ ২২ রজনী প্রভাত হইল গো ভাঙ্গিল স্বপন। নয়নে লাগিয়া রৈল গো শ্যামল বরণ॥ ২৪ দুর্ব্বাদল শ্যাম তনু গো সঙ্গেতে লক্ষ্মণ। আজি বুঝি সত্য হইল গো নিশার স্বপন॥ ২৬ সঙ্গেতে আসিল তার গো বিশ্বামিত্র মুনি। যজ্ঞস্থলে গেলা প্রভু গো রাম রঘুমণি॥ ২৮ মিথিলার লোকে দেখে গো বলে অতঃপর। যেই জন দেখে বলে গো সীতার যোগ্য বর॥ ৩০ চন্দ্র সূর্য্য দুই ভাই গো নর-বেশ ধরি। পণে উদ্ধারিতে বাপে গো আইল বুঝি পুরী॥ ৩২ আজানু-লম্বিত বাহু গো মুনির ইঙ্গিতে। ভাঙ্গিল শিবের ধনু গো যেন অলক্ষিতে॥ ৩৪ জয় জয় শব্দ হইল গো মিথিলা ভবন। নৃত্যগীত করে যত গো সহচরীগণ॥ ৩৬ মন্দ বর ধন্ধ লাগে গো কেউ বলে কালী। কেউ বলে মেঘের গায়ে গো শোভিছে বিজলী॥ ৩৮ হাস্য পরিহাসে দেখ গো রজনী পোহায়। সীতারে লইয়া প্রভো গো অযোধ্যাতে যায়॥ ৪০ আর ত দিনের কথা গো শুন মন দিয়া। এই মতে প্রভোর সঙ্গে গো অভাগিনীর বিয়া॥ ৪২ অযোধ্যা নগরে আছি গো হরষিত মন। শুইয়া প্রভুর কোলে গো দেখিলাম স্বপন॥ ৪৪ সিংহাসনে বসি প্রভু গো কমল-লোচন। তার পাছে দাণ্ডাইল গো ভাই তিনজন॥ ৪৬ চামর চুলায় কেউ গো শিরে ছত্র ধরে। যথাৰিধি তিন ভাই গো পদসেৰা করে৷ ৪৮ এর মধ্যে আর দিন গো দেখিলাম স্বপন। রামচন্দ্র রাজা হবে গো অযোধ্যা ভুবন ॥ ৫০ স্বপন সফল হইল গো কালি অধিবাস। মন্থর৷ কুমন্ত্র দিয়া গো ঘটায় সর্বনাশ ॥ ৫২ রামচন্দ্র রাজা হবে গো পইরা তিলক ছটা। ৰিমাতা কৈকেয়ী তারে গো পইরায় বাকল জটা ॥ ৫৪ শরতের চান্দ যেন গো মেঘেতে ডুবিল। সোণার অযোধ্যা পুরী গো অন্ধকার হইল॥” ৫৬ ( ২ ) “বৈশাখ মাসেতে দিন রে অরণ্য প্রবেশ। শিয়র জটা প্রভু রামের গো সন্ন্যাসীর বেশ ॥ ২ জৈষ্ঠ মাসেতে দিন রে রবির বড় জ্বালা। হাটিয়া যাইতে প্রভুর গো ৰদন হৈল কালা ॥ ৪ পাষাণে ঠেকিল পদ গো রক্ত পড়ে ধারে। দুঃখিত হইয়া প্রভো গো সীতার অঙ্গে বাতাস করে ॥ ৬ পদ্মপত্রে জল আনে গো ঠাকুর লক্ষ্মণ। কতক্ষণ প্রভুর কোলে গো ছিলাম অচেতন ॥ ৮ ঘুরিতে ঘুরিতে আইলাম গো আমরা তিনজন। গোদাবরী নদীর কুল গো পঞ্চবটী বন ॥ ১০ এইখানে রঘুনাথে গো কহিলা লক্ষ্মণে। কুটির বান্ধিয়া গো বাস করি এইখানে ॥ ১২ লতাপাতা দ্বিয়া গো কুটির বান্ধিল লক্ষ্মণ। কুটির-মধ্যে মোরা গো থাকি দুইজন ॥ ১৪ বৃক্ষতলে দাণ্ডাইল গো দেবর লক্ষণ। ধনুহাতে দিবা নিশি গো রহে জাগরণ ॥ ১৬ দেবরের গুণ আমি গো না পারি কহিতে। অরণ্য ভাঙ্গিয়া গো ফল তুলি দেয় হাতে ॥ ১৮ রসাপ বনের ফল গো পাতার কুটির পাইয়া। অযোধ্যার রাজ্যপাট গো গেলাম ভুলিয়া ॥ ২০ লক্ষণ কানন হইতে গো আনি দেয় ফল। পদ্মপত্রে আনি আমি গো তমসায় জল ॥ ২২ চরণ ধুইয়া প্রভুর গো তৃণ শয্যা পাতি। মনের আনন্দে কাটি গো বনবাসের রাতি ॥ ২৪ কি করিবে রাজ্যসুখ গো রাজ সিংহাসনে। শত রাজ্যপাট আমার গো প্রভুর চরণে ॥ ২৬ ভোরেতে উঠিয়া মালা গো গাঁথি বনফুলে। আনন্দে পরাই মালা গো প্রভু রামের গলে ॥ ২৮ সুন্দর দীঘল প্রভুর গো বাহু উপাধান। প্রত্যেক রজনী সীতার গো এমতি সয়ান ॥ ৩০ মৃগ ময়ুর আর গো বনের পশুপাখী। সীতার সঙ্গের সঙ্গী গো তারা সীতার দুঃখে দুঃখী ॥ ৩২ শুকসারী ছিল দুই গো পঞ্চবটী বন। বনে হইল প্রতিবাসী গো তারা দুইজন। ৩৪ কভু বা শুনায় গান গো শুক আর সারী। কানন বেড়ায় গো প্রভু রামের গলা ধরি ॥ :৬ কায়ার সঙ্গেতে যেমন গো ছায়ার স্ফুরণ। পর্ব্বত-কাননে ঘুরি বেড়ায় গো তিনজন ॥ ৩৮ আর ত দিনের কথা গো শুন সখীগণ। কপালে আছিল সীতার গো এতেক বিড়ম্বন ॥ ৪০ ( ৩ ) “পোহাইল সুখের নিশি গো আমি অভাগিনী। বঞ্চিয়া প্রভুর সাথে গো সুখের রজনী ॥ ২ গগনেতে হইল বেলা গো দণ্ড তিন চারি। সে দিনের দুঃখ কথা গো কহিতে না পারি ॥ ৪ কুটিরের বাইরে বসি গো আমরা দুইজন। তরুতলে বসিয়াছেন গো দেবর লক্ষণ ॥ ৬ বসিতে বসিতে মোর গো ঘুমে ঢুলে আঁখি। অলস নয়নে গো প্রভুর চান্দমুখ দেখি ॥ ৮ উরু উপাধান গো প্রভু পাতিল তখন। অঞ্চল পাতিয়া গো আমি করিলাম শয়ন ॥ ১০ এমন সময়ে এক গো সোনার হরিণী। কুক্ষণে নজর পড়ে গো মুই অভাগিনী ॥ ১২ মেঘের অঙ্গেতে যেমন গো বিজলীর ঝলা। চলিছে সোণার মৃগ গো বন করি উজলা ॥ ১৪ প্রভুরে কহিলাম আমি গো যুড়ি দুই পাণি। এত যে হইবে গো নাহি জানি অভাগিনী ॥ ১৬ ‘এমন সুন্দর মৃগ গো কভু দেখি নাই। সোণার হরিণ ধরি গো দেহ ত গোঁসাই ॥ ১৮ শুকনা লতায় বান্ধি গো কুটিরের দ্বারে। যাবৎ না মানে পোষ গো রাখিব ইহারে ॥ ২০ অযোধ্যাতে যাব মোরা গো এই মৃগ লইয়া। বনের চিহ্ন রাখ গো প্রভু ইহারে ধরিয়া ॥’ ২২ হাতে ধনু উঠিলেন গো কমল-লোচন। নাগপাশ অস্ত্র লইয়া গো করিয়া যতন ॥ ২৪ ‘হরিণ ধরিতে আমি গো চলিলাম বনে। সীতারে রাখিও লক্ষ্মণ অতি সাবধানে॥’ ২৬ এত বলি প্রভু রাম গো করিলা গমন। কতক্ষণ পরে শুনি গো প্রভুর ক্রন্দন॥ ২৮ ‘কোথারে লক্ষণ ভাই গো শীঘ্র কইর্যা আইস। রাক্ষসের হাতে মোর প্রাণ হইল নাশ॥’ ৩০ শুইয়াছিলাম আমি গো বসিলাম উঠিয়া। আর বার কহে প্রভু গো লক্ষ্মণে ডাকিয়া॥ ৩২ ‘শুন শুন দেবর গো আমার মাথা খাও। প্রভুরে রক্ষিতে তুমি শীঘ্র কইর্যা যাও॥’ ৩৪ হাতেতে ধনুর শর গো চলিলা লক্ষ্মণ। চিন্তায় আকুল প্রাণ গো পবন-গমন॥ ৩৬ একাকিনী বনমধ্যে গো আমি অভাগিনী। ভুজঙ্গ চলিল যেমন গো এড়াইয়া মণি॥ ৩৮ এত দুঃখ ছিল সীতার গো যদি জানিতাম। মৃগ ধরিবারে প্রভুর গো সঙ্গে যাইতাম॥” ৪০ ( ৪ ) “শিবশঙ্কর নাম গো লইয়া আচম্বিতে। দণ্ডাইল যোগী এক গো আসিয়া দ্বারেতে॥ ২ দণ্ড-কমণ্ডলুধারী গো অঙ্গে মাখা ছাই। দুয়ারে আসিয়া বলে গো ‘ভিক্ষা কিছু চাই॥’ ৪ ‘কি ভিক্ষা দিব গো আমি শুনহ গোসাঞ। শূণ্যগৃহে একাকিনী গো প্রভু সঙ্গে নাই॥ ৬ আজি যদি থাকতাম আমি গো অযোধ্যা ভবনে। ধামায় মাপিয়া গো দিতাম রত্নাদি কাঞ্চনে॥’ ৮ যোগী বলে ‘ধনে মোর গো নাহি প্রয়োজন। ঘরে আছে বনের ফল গো তাই কর দান ॥ ১০ ক্ষুধায় অবশ অঙ্গ গো আইলাম তব দ্বারে। অতিথে না দিলে ভিক্ষা গো যাই তবে ফিরে ॥’ ১২ একটি বনের ফল গো অঞ্চলে বান্ধিয়া। কুটিরের বাহির হইলাম গো ভাবিয়া চিন্তিয়া ॥ ১৪ আমি কি গো জানি সখি কালসর্পবেশে’। এমনি করিয়া সীতায় গো ছলিবে রাক্ষসে ॥ ১৬ প্রণাম করিনু আমি গো পড়িয়া ভূতলে। উড়িয়া গরুড় পক্ষী গো সর্প যেমন গেলে ॥ ১৮ রথেতে তুলিল মোরে গো দুষ্ট লঙ্কাপতি। দেবগণে ডাকি কহি গো দুঃখের ভারতী ॥ ২০ অঙ্গের আভরণ খুলি গো মারিনু রাক্ষসে। পর্বতে মারিলে ঢিল গো কিবা যায় আসে ॥ ২২ কতক্ষণ পরে গো আমি হইলাম অচেতন। এখনো স্মরিলে কথা গো হারাই চেতন ॥ ২৪ জাগিয়া দেখিনু আমি গো আছি লঙ্কাপুরী। আমারে বেড়িয়া পাশে গো বসি যত চেড়ী ॥ ২৬ অশোক-কাননে গো বাস আমি অভাগিনী। সেইদিন সাজিলাম গো যৌবনে যোগিনী ॥ ২৮ বস্ত্র অলঙ্কার ত্যজি গো নিদ্রা ও আহার। রাক্ষসের গৃহে থাকি গো করি অনাহার ॥ ৩০ কান্দিয়া নয়ন গলে গো মৈলান হইল কেশ। দিবানিশি জাগে প্রভুর গো সন্ন্যাসীর বেশ ॥ ৩২ paglini হইল সীতা গো নাহি কিছু জ্ঞান। প্রভুরে দেখিতে শুধু গো রাখিলাম প্রাণ ॥ ৩৪ মরণে বাসনা নাই গো চরণ পাইবার আশে। সীতার চক্ষের জলে গো অশোক-বন ভাসে ॥” ৩৬ ( ৫ ) “আষাঢ় মাসেতে দিন রে ঘন বরিষণ। তর্জ্জিয়া গর্জ্জিয়া আসে গো যত দেয়াদণ ॥ ২ মেঘে তত নাইকো পানি সীতার চক্ষে যত জল। কান্দিয়া ভিজাই আমি গো অশোকের তল ॥ ৪ বিষ খাই জলে ডুবি গো বুঝিতে না পারি। সান্ত্বনা করিয়া রাখে গো সরমা সুন্দরী ॥ ৬ শ্রাবণ মাসেতে আমি গো দেখিনু স্বপন। হইল প্রভুর সঙ্গে গো সুগ্রীব-মিলন ॥ ৮ ভাদ্রে স্বপন দেখি গো দিবসে জাগিয়া। অশোকের ডালে পক্ষী গো বসিল উড়িয়া ॥ ১০ পক্ষী নয় পক্ষী নয় গো প্রভু রামের চর ১। বীর হনুমান বৈসে গো ডালের উপর ॥ ১২ কত ভাবে কত মতে গো সীতারে বুঝায়। প্রাণ ত বুঝে না গো সীতার হইল বড় দায় ॥ ১৪ রামের অঙ্গুরী বীর গো দেখাইল মোরে। অঙ্গুরী দেখিতে সীতার গো অশ্রু পড়ে ধারে ॥ ১৬ পাইল রামচন্দ্র গো সীতার বারতা। তারপর শুন গো সীতা-উদ্ধারের কথা ॥ ১৮ আশ্বিন মাসেতে সীতা গো দেখিলা স্বপন। বনেতে করেন প্রভু গো অকাল-বোধন ॥ ২০ রাবণ বধিতে প্রভু গো পূজেন অম্বিকায়। সীতার দুঃখের দিন গো এইরূপে যায় ॥ ২২ কার্ত্তিক মাসেতে দিন রে ছোট হইল বেলা। কান্দিয়া কাটাই দিন গো বসিয়া একেলা ॥ ২৪ নয়নের জলে মোর গো নদী বইয়া যায়। সুখের বারতা আইস্যা গো সরমা জানায় ॥ ২৬ কান্দিতে কান্দিতে সীতার গো অস্থিচর্ম্ম-সার। এত দুঃখ ছিল বিধি গো কপালে আমার ॥ ২৮ অগ্রহায়ণ মাসেতে শুনি গো বৃক্ষ আর পাথরে। দুরন্ত সাগর, আসি গো, বান্ধিল বানরে ১ ॥ ৩০ পোষ মাসেতে দিন রে পৌষ অন্ধকার। বানর-কটকে ঘিরে গো লঙ্কার চারিধার ॥ ৩২ মাঘ মাসেতে আমি গো দেখিনু স্বপন। রণে মরে ইন্দ্রজিত গো রাবণ-নন্দন ॥ ৩৪ স্বপন সফল হইল গো লঙ্কা ছারখার। সাগরের কূলে শুনি গো রাক্ষসের হাহাকার ॥ ৩৬ ফাল্গুন মাসেতে আমি গো দেখিনু স্বপনে। সবংশে মরিল রাবণ গো শ্রীরামের বাণে ॥ ৩৮ স্বপন সফল হইল গো দুঃখের দিন যায়। বানর-কটক শুনি গো রামগুণ গায় ॥ ৪০ চৈত্র মাসেতে সীতার গো দুঃখ হইল দূর। পোহাইল দুঃখের নিশি গো আইল সুখ ভোর॥ ৪২ অন্ধেতে পাইল যেমন গো নয়নের মণি। তেমতি দুঃখিনী সীতা গো পাইল রঘুমণি॥ ৪৪ সীতার বারমাসী কথা গো দুঃখের ভারতী। বারমাসের দুঃখের কথা গো ভনে চন্দ্রাবতী॥ ৪৬ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ সমাপ্ত তৃতীয় পরিচ্ছেদ সীতার বনবাসের পূর্ব্ব-সূচনা ( ১ ) সুখ-বসন্তের কথা গো শুন সখীগণ। রতন-মন্দিরে বসি গো কৌশল্যা-নন্দন ॥ ২ উপরে চান্দোর টাঙ্গায় গো নীচে শীতল পাটি। রামসীতা বসিলেন গো হাতে পাশার কাটি ॥ ৪ আবের পাখায় বাতাস গো করে সখীগণ। কৌতুকে করেন রাম গো প্রেম-আলাপন ॥ ৬ গুয়া পান খায় কেহ গো হাসে খলখলি। চান্দেরে ঘেরিয়া যেন গো তারার মণ্ডলী ॥ ৮ সুবর্ণের গুটিতে গো ঘর সাজাইয়া। রামচন্দ্র খেলে পাশা গো সীতারে লইয়া ॥ ১০ লক্ষ্মীর সহিত পাশা গো খেলে নারায়ণে। ইন্দ্র যেন খেলে পাশা গো শচীরাণী সনে ॥ ১২ মদনের সহিত পাশা গো খেলে যেন রতি। হরের সহিত কিংবা গো খেলায় পার্ব্বতী ॥ ১৪ হাসিয়া কহিছে তবে গো সহচরীগণ। “এক কথা শুন রাম গো কমল-লোচন ॥ ১৬ হার-জিত হবে যেই গো আগে কর পণ। হারিলে জিতিলে কিবা গো দিবে কোন্ জন ॥” ১৮ শ্রীরাম বলেন “পাশায় গো আমি যদি হারি। হস্ত হইতে দিব খুলে গো রতন-অঙ্গুরী ॥ ২০ জানকী হারিলে বল গো দিবে কিবা পণ।” সখীগণ বলে “দিবে গো প্রেম-আলিঙ্গন ॥” ২২ লাজে অধোমুখী গো সীতা পড়িলেন ঢলি। পত্রের ভারেতে যথা গো চম্পকের কলি ॥ ২৪ পড়িল পাশার দান গো খেলিতে খেলিতে। হারিলেন রামচন্দ্র গো সীতাদেবী জিতে ॥ ২৬ হাসিতে হাসিতে তবে গো যত সহচরী। সীতারে বেড়িল গো রামে দিয়া টিটকারী ॥ ২৮ জোর করি শ্রীরামের গো অঙ্গুরী খসাইয়া। সীতার অঙ্গুলে সখী গো দিল পরাইয়া ॥ ৩০ “পুরুষ হইয়া হারে গো রমণীর সনে।” তিরস্কার করে রামে গো মিষ্ট আলাপনে ॥ ৩২ ছয় তিন কাঁচাগুুঁটি গো পাকা যে হইল। এইবার সীতাদেবী গো পণেতে হারিল ॥ ৩৪ হাসিয়া শ্রীরাম ক’ন গো সহচরীগণে। “প্রতিজ্ঞ-পালন কথা গো আছে কিনা মনে ॥” ৩৬ আড়িকুলা করি তবে গো যতেক সঙ্গিনী। শ্রীরামের কুলে দিলা গো জনক-নন্দিনী ॥ ৩৮ চুম্বন করিয়া সীতায় গো বলেন রঘুবর। “যাহা ইচ্ছা মনোমত গো বাছি লও বর ॥” ৪০ চন্দ্রা কহে পোহাইল গো সুখের রজনী। সাবধানে মাগ বর গো জনক-নন্দিনী ॥ ৪২ ধীরে ধীরে ক’ন সীতা গো রামের গোচরে। “মনের বাসনা প্রভু গো কহি যে তোমারে ॥ ৪৪ বহুদিন হইতে মোর গো আশা ছিল মনে। আর বার বেড়াইব গো পুণ্য-তপোবনে ॥ ৪৬ তমসা নদীর কথা গো সদা পড়ে মনে। রাজহংসী খেলা করে গো কমল-কাননে॥ ৪৮ তালের ডালে নাচে গো ময়ূরাময়ূরী। সোণার হরিণী ছিল গো মোর সহচরী॥ ৫০ প্রতি নিশি স্বপ্ন দেখি গো মুণিকন্যাগণে। তোমার সঙ্গেতে যেন গো বেড়ীই বনে বনে।” ৫২ চুম্বন করিয়া রাম গো কহেন সীতারে। “আজ নিশি কর বাস গো রতন-মন্দিরে॥ ৫৪ কালি প্রাতে আশা তব করিব পুরণ। লক্ষ্মণ সহিতে তোমা গো পাঠাইব বন॥” ৫৬ চন্দ্রা কহে দৈব দুঃখ গো না যায় খণ্ডনি। কি বর মাগিলে গো হায় জনক-নন্দিনী॥ ৫৮ (২) শয়ন-মন্দিরে একা গো সীতা ঠাকুরাণী। সোণার পালঙ্কোপরি গো ফুলের বিছানী॥ ২ চারিদিকে শোভে তার গো সুগন্ধি কমল। সুবর্ণ-ভৃঙ্গার ভরা গো সরযুর জল॥ ৪ নানাজাতি ফল আছে গো সুগন্ধে রসিয়া। যাহা চায় তাহা দেয় গো সখীরা আনিয়া॥ ৬ ঘন ঘন হাই উঠে গো নয়ন চঞ্চল। অল্প অবশ অঙ্গ গো মুখে উঠে জল॥ ৮ উপকথা সীতারে গো শুনায় আলাপিনী। হেন কালে আসিল তথায় গো কুকুয়া ননদিনী॥ ১০ কুকুয়া বলিছে “বধূ গো মম বাক্য ধর। কিরূপে বঞ্চিলা তুমি গো রাবণের ঘর॥ ১২ দেখি নাই রাক্ষসে গো শুনিতে কাঁপে হিয়া। দশমুণ্ড রাবণ রাজা গো দেখাও আঁকিয়া॥” ১৪ মূর্চ্ছিতা হইল সীতা গো রাবণ-নাম শুনি। কেহ বা বাতাস দেয় গো কেহ মুখে পানি॥ ১৬ সখীগণ কুকুয়ারে গো করিল বারণ। “অনুচিত কথা তুমি গো বল কি কারণ॥ ১৮ রাজার আদেশ নাই গো বলিতে কুকথা। তবে কেন ঠাকুরাণীর গো মনে দিলে ব্যথা॥” ২০ প্রবোধ না মানে গো কুকুয়া ননদিনী। বার বার সীতারে গো্বলয়ে সেই বাণী॥ ২২ সীতা বলে “আমি তারে গো না দেখি কখন। কিরূপে আঁকিব আমি গো পাপিষ্ঠ রাবণ॥” ২৪ যত করি বুঝান সীতা গো কুকুয়া না ছাড়ে। হাসিমুখে সীতারে গো সুধায় বারে বারে॥ ২৬ বিষলতার বিষফল গো বিষগাছের গোটা। অন্তরে বিষের হাসি গো বাধাইল লেঠা॥ ২৮ সীতা বলে “দেখিয়াছি গো ছায়ার আকারে। হরিয়া যখন দুষ্ট গো লয়ে যায় মোরে॥ ৩০ সাগর-জলেতে পরে গো রাক্ষসের ছায়া। দশ মুণ্ড কুড়ি হাত গো রাক্ষসের কায়া॥” ৩২ বসি ছিল কুকুয়া গো শুইল পালঙ্কেতে। আবার সীতারে কয় গো রাবণ আঁকিতে॥ ৩৪ এড়াতে না পারে সীতা গো পাখার উপর। আঁকিলেন দশমুণ্ড গো রাজা লঙ্কেশ্বর ॥ ৩৬ শ্রমেতে কাতর সীতা গো নিদ্রায় ঢলিল। কুকুয়া তালের পাখা গো বুকে তুলি দিল॥ ৩৮ ( ৩ ) কালসাপিনী কুকুয়। গো কালকুটে ভরা। সীতার সুখ দেখতে নারে গো এম্নি কপালপোড়া ॥ ২ কুরূপা কুৎসিতা সে যে গো ক্রুর ও মুখরা। শিখায়ে পালিয়ে বড় গো কইর্যাছে মন্তরা ॥ ৪ কৈকেয়ীর কন্যা সে যে গো ছোট ভরতের। রাজার ঘরে বিয়া হইয়া গো কপালের ফের ॥ ৬ শ্বশুর শাশুড়ী তার গো দুই চক্ষের বালি। পাড়ার লোকেরা ডাকে গো নিন্দুক কুন্দলী ॥ ৮ বাতাসে করিয়া ভর গো পাতয়ে কুন্দল। ঔষধ খাওয়াইয়া করছে গো স্বামীরে পাগল ॥ ১০ দেবর ভাসুরে খেদায় গো দিয়া বেড়াবাড়ি। পরের কলঙ্ক গাইয়া গো ফিরে বাড়ী বাড়ী ॥ ১২ পরের কলঙ্ক কথায় গো কুকুয়া দশমুখ। স্বামী-স্ত্রীতে কোন্দল বাধায় গো দেখিতে কৌতুক ॥ ১৪ সধবা হইয়। কুকুয়। গো কাৰ্য্য-দোষে রাঁড়ী। দশ বচ্ছর ধইর্যা কেবল আছে বাপের বাড়ী ॥ ১৬ রাম-সীতার সুখ তার গো পরাণে না সয়। অন্তরে বিষের ধার গো হেসে কথা কয় ॥ ১৮ বসে আছেন রামচন্দ্র গো রত্ন-সিংহাসনে। উপনীত হইল গিয়া গো শ্রীরামের স্থানে ॥ ২০ কালনাগিনী যেমন গো ছাড়িয়া নিশ্বাস। দণ্ডাইল কুকুয়। গো শ্রীরামের পাশ ॥ ২২ নয়নে আগুনি তার গো ঘন শ্বাস বহে। তর্জ্জিয়া গর্জ্জিয়া তবে গো শ্রীরামেরে কহে ॥ ২৪_ “শুন শুন দাদা ওগো কহি যে তোমারে। বলিতে পাপের কথা গো বাক্য নাহি সরে॥ ২৬ সীতা ধ্যান সীতা জ্ঞান দাদা গো সীতা চিন্তামণি’। প্রাণের চাইতে অধিক তোমার গো জনক-নন্দিনী॥ ২৮ বিশ্বাস না কর কথা গো না শুনিলে কাণে। অসতী নিলাজ সীতা গো ভজিল রাবণে॥ ৩০ কি কব সীতার কথা গো কহিতে লাগে ভয়। পড়িলে তোমার কোপে গো জীবন সংশয়॥ ৩২ রূপসী দেখিয়া দাদা গো আপনি মজিলে। রঘুবংশে কালি দিতে গো সীতারে আনিলে॥ ৩৪ এক নয় দুই নয় গো পূর্ণ দশ মাস। আছিল তোমার সীতা গো রাবণের পাশ॥ ৩৬ বলিলে রাবণের কথা গো সীতার চক্ষে বহে ধারা। মুখ ফিরাইয়া কান্দে দাদা গো তোমার নয়ন-তারা॥ ৩৮ সংসার না বুঝ দাদা গো তুমি ত সরল। অমৃত ভাবিয়া দাদা গো পাইলে গরল॥ ৪০ জানিয়া পুষ্পের মালা গো দাদা পরিলে গলায়। সময় পাইয়া কালনাগিনী গো দংশিল তোমায়॥ ৪২ চণ্ডালে ছুঁইলে ফুল গো না লাগে পূজায়। কুকুরের উচ্ছিষ্ট অন্ন গো লোকে নাহি খায়॥ ৪৪ বিশ্বাস না কর দাদা গো দেখহ আসিয়া। তোমার সীতা নিদ্রা যায় গো রাবণ বুকে লইয়া॥” ৪৬ হরিণী মারিতে যেমন গো বাঘিনী ধায় রড়ে ২। শীঘ্রগতি পশে দুইয়ে সীতার মন্দিরে॥ ৪৮ পঞ্চমাসের গর্ভ সীতা গো অলসে ঘুমায়। অঙ্গুলি হেলাইয়া কুকুয়া গো রামেরে দেখায় ॥ ৫০ শিরেতে হানিল বাজ গো বাক্য নাহি সরে। চলিয়া গেলেন রাম গো আপন মন্দিরে ॥ ৫২ বিষবাণ বান্ধিল গো শ্রীরামের পরাণে। সর্ব্বনাশের কথা সীতা গো কিছুই না জানে ॥ ৫৪ বনেতে আগুন জ্বলে গো সায়রে ছোটে বান ’। উন্মত্ত পাগলপ্রায় গো বসিলেন রাম ॥ ৫৬ রাঙ্গা জবা আঁখি রামের গো শিরে রক্ত উঠে। নাসিকায় অগ্নিশ্বাস ব্রহ্মরন্ধ্র ফুটে ॥ ৫৮ যে আগুন জ্বালাইল আজ গো কুকুয়া ননদিনী। সে আগুনে পুড়িবে সীতা গো সহিত রঘুমণি ॥ ৬০ পুড়িবে অযোধ্যাপুরী গো কিছু দিন পরে। লক্ষ্মীশূন্য হইয়া রাজ্য গো যাবে ছারখারে ॥ ৬২ পরের কথা কাণে লইলে গো নিজের সর্ব্বনাশ। চন্দ্রাবতী কহে রামের গো বুদ্ধি হইল নাশ ॥ ৬৪ ( অসম্পূর্ণ ) .
-
-