মলয়ার বারমাসী
প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা - চতুর্থ খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন
মলুয়ার বারমাসী ( ১ ) আদিতে বন্দনা করলাম প্রভু সত্যনারায়ণ। এক বৃক্ষ এক ফল ছিষ্টির পত্তন ॥ সত্যনারায়ণ প্রভো অগতির গতি। তাহার চরণে করি শতেক পন্নতি ॥ বরমা বিষ্ণু বন্দি গাইলাম লক্ষ্মী সরস্বতী। কৈলাশ পর্বত বন্দি গাই হর আর পার্বতী ॥ স্বর্গেত বন্দিয়া গাইলাম দেবী সুরধনী। মর্ত্যেত বন্দিয়া গাই আমি পতিত পাবনী ॥ শিবের জটায় ছিল যাহার বসতি। ভগীরথে আনল গঙ্গা অনেক করিয়া স্তুতি ॥ চাইর কোনা পৃথিবী বন্দুম আগুন আর পানি। তেত্রিশ কোটী দেবেরে বন্দি জানি বা না জানি ॥ আর বন্দি পার বন্দি বন্দি তরুলতা। জন্মদাতা বন্দি গাইলাম মাও আর পিতা ॥ মায়ের দুটি তন বন্দুম অক্ষয় ভাণ্ডার। শত জনম গেলে মানুষ শোধিতে নারে ধার ॥ চন্দ্র বন্দুম সূর্য্য বন্দুম তারা দুটি ভাই। গ্রহ তারা বন্দি গাই লেখা জোখা নাই ॥ বারে বারে বন্দি গাই ওস্তাদের চরণ। মিনতি করিয়া বন্দি সভার চরণ ॥ কিবা গাই কিনা গাই আমি অন্ধমতি। নিজগুণে ক্ষমা কর মোরে সভাপতি ॥ আর বার বন্দি নাই সভার চরণ। আমার সভাতে আইস সত্যনারায়ণ ॥ আইস মাগো সরস্বতী কণ্ঠে কর ভর। তুমি হইলা তাল যন্ত্র আমি মাত্র ভর ॥ ছারি না ছারম মাগো না যাও অন্যথা। বেইরা রাখব যোগল চরণ ছাইরা যাইবা কোথা ॥ এই বেলা বন্দনা থইয়া আসল গাওয়া গাই। আমারে করিও কৃপা যত মমিন ভাই ॥ সভা কইরা বইছ ভাইরে হিন্দু মুসলমান। তোমার জবাবে আমি অধমের ছেলাম ॥ ( ১—৩২ ) ( ২ ) ধন বিত্তে সদাগর গো ও ভালা নবরঙ্গ পুরে। তাহার খেতিমা কথা জানাই সভার আগে ॥ চৌদ্দ ডিঙ্গা ঘাটে বাঁধা রাখে সদাগর। জলের উপরে যেমন ভাসিছে নওগর ॥ ধনদৌলত আছে কত লেখাজোখা নাই। গজমতি লক্ষ্মী ঘরে দুঃখু কিছু নাই ॥ এক কন্যা আছে সাধুর লক্ষ্মীর সমান। বাপ মায়ে রাখ্যাছে তার মলয়া সে নাম ॥ চন্দ্রের সমান কন্যা দেখিতে সুন্দর। আইন্ধার করিয়া আলো রূপের পশর ॥ নবম বছর কন্যা কুলের পরদীপ। ইহারে দেখিয়া সাধু গণে বিয়ার দিন ॥ সিন্দুর বরণা ঠোঁট দেখিতে সুন্দর। সদাগর ভাবিয়া মরে কোথায় যুগ্য বর ॥ শিরেত চাচর কেশ মেঘের সমান। কোথা সে রাজার বেটা কারে দিব দান ॥ মুখখানি দেখি কন্যার যেন চন্দ্রকলা। কার গলে দিব কন্যা আপন বিয়ার মালা ॥ ভাবিয়া চিন্তিয়া সাধু কোন্ কাম করে। বাণিজ্য করিতে যায় বৈদেশ নগরে ॥ চৌদ্দ ডিঙ্গা সাজাইল তৈল সিন্দুরে। মাঝি মাল্লা লইয়া সাধু যায়ত সফরে ॥ চৌদ্দ খানি নয়া পাল মাস্তুলে তুলিল। বৈদেশ নগর পানে পক্ষী উড়া দিল ॥ সামন্ত নগর বামে নয়া রাজার দেশ। সেই দেশে করয়ে সাধু পাত্রের উরদেশ ॥ উত্তর ময়ালে দেখে ভানু রাজার দেশ। তথায় না মিলে সাধু করিল উরদেশ ॥ দক্ষিণ ময়ালে দেশে ক্ষীর নদী সাগর। তথায বসতি করে সাধু দণ্ডধর ॥ সে দেশের সাধুপুত্র দেখিতে কেমন। দেখিয়া না হইল সাধুর মনের মিলন ॥ পূর্ব্ব পশ্চিম সাধু ঘুরিয়া দেখিল। কন্যার যোগ্য বর তবু খুঁজিয়া না পাইল ॥ তবে সাধু নিতিমাধব চিন্তিত হইল। পশ্চিম ময়াল ছাড়ি ডিঙ্গা ফিরাইল॥ আরবার পূর্ব্ব দেশে করিল গমন। ছয় বছর গোয়াইল সাধু কন্যার কারণ॥ ( ১-৩৮ ) ( ৩ ) সাধুর সফর কথা এইখানে থুইয়া। দেশেতে ঘটিল কিবা শুন মন দিয়া ॥ হারমাদ ডাকাইত এক নবরঙ্গপুরে। ডাকাইতি করিয়া বেটা খাইত নগরে ॥ ধর্ম্মের নহিক ভয় যারে তারে মারে। নরহত্যা ব্রহ্মহত্যা সদাকাল করে ॥ একদিন রাইতের নিশা হার্য্যা কোন্ কাম করিল। লইয়া চল্লিশা সাইথ পুরিধান বেড়িল ॥ ভাঙারের যত ধন লইল কাড়িয়া। হীরামণ মাণিক্য যত লইল বাছিয়া ॥ বাণিজ্য করিয়া সাধু পৃথিবী নগরে। যত যত ধন পায় সাধু আনে নিজ ঘরে ॥ সেই সব ধনের কথা লেখা জুখা নাই। পরেত করিল কিবা শুন যত ভাই ॥ অন্দর কোটাতে দেখে হার্য্যা একটি মাণিক। অন্ধকারে বাতি যেমন জ্বলে ঝিকিমিক্ ॥ পালকে শুইয়া কন্যা লক্ষ্মীর সমান। রূপের তুলনা নাই জগতে বাখান ॥ এরে দেখ্যা পাগল হার্য্যা কোন্ কাম করিল। ঘুমন্ত কন্যারে তবে বুকে তুল্যা লইল ॥ মায়ের কান্দনে কন্যা চক্ষু মেল্যা চায়। মায়ের বুকের ধন চুরে লইয়া যায় ॥ ( ১—২২ ) ( ৪ ) পাইলা বনের মাঝেরে দারাক সারি সারি। সেই বনে বসতি করে হার্য্যা নাইক ঘর বাড়ী ॥ কুটিয়া বানাইয়া হার্য্যা মাটির না তলে। সেইখানে আছে হার্য্যা লইয়া দল বলে ॥ সাধুর যতেক ধন কুটিতে লুকাইল। নও না বছরের কন্যা তথায় রাখিল ॥ এক বছর দুই বছর তিন বছর যায়। মাও বাপের কথা হার্য্যা কন্যারে ভুলায় ॥ কান্দন কাটি করে কন্যা তাহারে লইয়া। মায়েরে দেখিব বলি ফাটে তার হিয়া ॥ যে দেশের যত দ্রব্য দেখ চুরি কইরা পায়। ভাল ভাল বনের ফল কন্যারে বিলায় ॥ পালকিয়া পালায় যেমন পিঞ্জরের পাখী। কন্যারে পালনা করে সেই মত দেখি ॥ পুত নাই সে কন্যা নাই সে হার্য্যার বুকে হইল দয়া। পরের ধন লইল হার্য্যা বুকেত তুলিয়া ॥ কত কত বছর যাইল এমনি করিয়া। তারপর হইল কিবা শুন মন দিয়া ॥ ( ১—১৮ ) থল কুলের ভুমা রাজা ক্ষমতা অপার। হাতী ঘোড়া লোকজন আছে বহুতর ॥ ছিপাই লস্কর যত লেখা যোখা নাই । ধন দৌলত রাজার গুণ্যা না বাড়াই ॥ মন্তের না বালু যত আসমানের তারা। সেই মতন রাজার ধন গুণ্যা না পাই সারা ॥ থল বসন্ত নামে ছিল রাজার কুঙার । देखিতে সুন্দর রূপ কাৰ্ত্তিক কুমার ॥ যেই দেখে সেহি জনে রূপেরে বাখানে। রাজপুত্রের রূপ দেখ চন্দ্রকলা জিনে ॥ প্রথম যৌবন পুত্র যে পুরী উজ্জ্বলা। রাজা শিখায়ৈছে তারে নানা শাস্ত্রকলা ॥ এক দিনের কথা সবে শুন দিয়া মন। শিকারে যাইবা কুমার কর্যাছে মনন ॥ “শুন শুন পিতা ওগো কহি যে তোমারে। শিকারে যাইব আমি পাইলা বনের মাঝে ॥” শুনিয়া বনের কথা রাজার লাগে চমৎকার। বাঘ ভালুক যত আছে লেখা নাই সে তার ॥ রাজপরী দলে দলে ভ্রমে তথায়। সেই বনে যাইতে পুত্রে মানা করে মায় ॥ তবেত রাজার পুত্র মানা না শুনিল। লোকলস্কর লইয়া কুমার শিকারে মেলা দিল ॥ মঞ্চের না ধূলা কুড়া আসমানেতে উড়ে। পাইলা বন বেইড়া লইল রাজার লস্করে ॥ ( ১—২৪ ) ( ৬ ) একদিন হইল কিবা শুন দিয়া মন। ডাকাতি বাহারে গেল হার্যার লোকজন ॥ শূন্য কুটি পাইয়া না কন্যা কোন্ কাম করিল। আলোক ডেঙ্গাইয়া কন্যা বনে বাহিরিল ॥ চারি দিকে দেখে কন্যা দাড়াক সারি সারি। প্রথম যৌবন কন্যা চলে একেশ্বরী ॥ চাইর দিকে দেখে কন্যা পশুপক্ষী চরে । চাইর দিকে ফুটে ফুল দেখে সুবিস্তরে ॥ ময়ূর ময়ূরী কত উইরা বৈসে ডালে। বনের পশু পাইয়া কন্যা আস্তে মস্তে চলে ॥ ( ১—১০ ) ( ৭ ) “কে তুমি সুন্দর কন্যা বনে একেশ্বরী। মনুষ্য নহত কন্যা কিবা রাজপরী ॥ কেবা তোমার মাতা পিতা কেবা তোমার ভাই। পরিচয় কথা কহ কন্যা শ্রবণ জুড়াই ॥ নয়ন জুড়াই কন্যা তোমার রূপ দেখি। কোথান হইতে আইলে তুমি কার পিঞ্জরার পাখী ॥ কার বুক খালি সে করিয়া বনেতে বেড়াও। পরিচয় কথা কন্যা আমারে জানাও ॥” “বাপ মোর সদাগর নবরঙ্গপুরে। নিত্যি মাধব নাম জানাই তোমারে ॥ মাও মোর কাঞ্চনমালা আর কেহ নাই। মায়ের কোলেতে কুমার সুখে নিদ্রা যাই ॥ দুরন্ত দুষ্মন হার্যা কোন্ কাম করিল। মায়ের বুক কর্যা খালি আমারে লইল ॥ মায়ের আঁখির জল হইল বুঝি সার। সেই হইতে আছি গো কুমার বনের মাঝার ॥ বনের ফল খাই কুমার ভূয়েত শয়ন। অবুঝ মায়ের লাগ্যা ঝরে দুই নয়ন ॥ ছয় বচ্ছর গত হইল মানুষ নাইসে দেখি। আজি মাত্র দেখিলাম বনের পশুপাখী ॥ শুন শুন রাজার কুমার কহি যে তোমারে। শীঘ্র কইরা যাহ কুমার ফির্যা আপন ঘরে ॥ দুরন্ত দুষ্মন হার্যা যদি লাগল পায়। আমার মায়ের মতন কাইন্দা মরব মায় ॥ দয়ামায়া নাই হার্যার নিদয়া পাষাণ। লাগল পাইলে তোমার বধিব পরাণ ॥” থলবসন্ত কুমার কহে “কন্যা মন কর লো দড়। বহির বনেতে আমার আছয়ে লস্কর ॥ হের দেখ ঘোড়া গোটা পবন সমান। তরয়ালে কাটিয়া লইব হার্যার পরাণ ॥ শুন শুন সুন্দর কন্যা আমার কথা ধর। আমার না সঙ্গে তুমি চল নিজ ঘর ॥ মাও বাপ কাইন্দা কন্যা লো তোর অন্ধ করেছে আঁখি। এমন সুন্দর রূপ কভু না চোখে দেখি ॥ ছয় বৎসর গেছে লো কন্যা তারা আছে বা না আছে। নবরঙ্গপুরের কথা আমার জানা আছে ॥ পরিচয় কথা কন্যা কহি যে তোমারে। থলভূমের ভূমা রাজা আমি পুত্র তার ॥ বনেত আইলাম কন্যা করিতে শিকার। শিকার না পাই কন্যা ঘুরিয়া বিস্তর। বিধি মিলাইল নিধি বনের ভিতর ॥ চল চল সুন্দর কন্যা আপন দেশে চল। জুড়িয়া রহলো কন্যা আপন মায়ের কোল ॥ তোরে থইয়া কেমনে যাইব আমার রাজ্যদেশ। ঝাড়িয়া বান্ধলো কন্যা আপন মাথার কেশ ॥” ( ১-৪৬ ) ( ৮ ) রাজার পুত্র পাগল হইল রাজা ভাবিয়া না পায়। সাধুরে ডাকিয়া রাজা বৃত্তান্ত জানায় ॥ তবে সাধু কহে রাজা আমার কথা ধর। এহি কন্যা না করিব তোমার পুত্রের ঘর ॥ বয়সে বয়সী কন্যা মন গেছে তার। থলভূমের রাজপুত বসন্ত কুমার ॥ তবেত শুনিয়া রাজা গোস্বায় জ্বলিল। কোটালে ডাকিয়া রাজা সাধুরে বান্ধিল ॥ ( ১-৮ ) রাত্রি নিশাকালে কন্যা কোন্ কাম করে। পতিরে বাঁচাইয়া সতী কন্যা গেল সুয়ামীর ঘরে ॥ রাজ্যেত বাজিল ডঙ্কা আনন্দ অপার। বাজিল বিয়ার বাদ্য জয়ত জোকার ॥ তবেত ভূমানা রাজা কোন্ কাম করিল। যত যত রাজগণে নিমন্ত্রণ দিল ॥ আইরা রাজা পাইরা রাজা রাজা ধনেশ্বর। থলকুলে আই—তারা পাইয়া নিমন্তন ॥ পূর্ব্ব হইতে আইল রাজা নামে লম্বোদর। দক্ষিণ দেশের রায় রাজা গদাধর ॥ পশ্চিম হইতে আইল মন্ত অধিকারী। যার ধন রক্ষা করে কুবের ভাণ্ডারী ॥ উত্তর হইতে আইল রাজা চন্দ্রকেতু নাম। পৃথিবী জুড়িয়া যার ধনের বাখান ॥ মধ্যম ময়াল হইতে আইল রাজা মল্লশাট। হীরা মাণিক্য দিয়া যে বাইন্ধাছে ঘাট ॥ কত কত রাজা আইল লেখাজোখা নাই। গোপনেতে আইল রাজা দুম্মন বলাই ॥ নবরঙ্গপুর হইতে বলাই আসিয়া। যুক্তি করে বলাই রাজা রাজা সবে লইয়া ॥ কোথাকার হইতে আইল রাজা কেবা মাতাপিতা। ভাল করিয়া নাইসে জানি সেই কন্যার কথা ॥ বনেত করিয়াছে বসতি কন্যা দশ না বচ্ছর। যৌবনের কালে কন্যা রহিল একেশ্বর ॥ পরীক্ষা দেহুক কন্যা এহি সভা স্থানে। কিবান পরীক্ষা কথা করহ বিচার। রাজাগণ মিল্যা যুক্তি করে আরবার ॥ গোপনে বলাই রাজা সকলে বুঝায়। আমার যুকতি বাক্য শুন যত রায় ॥ বাণিজ্যের ধন ভাইরা ডিঙ্গা লইয়া যাও। সমুদ্রে সাঙরে নিয়া তাহারে ভাসাও ॥ দাড়ী নাইসে মাঝি নাইসে ডিঙ্গা ফিরা আইসে ফেরে। তবে জানি সতী কন্যা তুল্যা লহ ঘরে ॥ গলুইয়ে লাখের বাত্তি দেওত জালায়া। উজলা বাওয়ারে বাত্তি যায়ত নিভিয়া ॥ তবে জান এহি কন্যা অসতী সমান। বিচার করিয়া তার কাট নাক কাণ ॥ রাজঘোড়া ছাইরা দেন বনের মাঝারে। বিনীত সুওয়ারে ঘোড়া ফিরিব নগরে ॥ সেই ঘোড়া আইসে যদি নগরে ফিরিয়া। সোহাগে কন্যারে লহ ঘরেতে তুলিয়া ॥ বনেতে হারাই পঙ্গু ঘোড়া নাইসে ফিরে। রাক্ষুসী জানিয়া কন্যা পাঠাও বনবাসে ॥ গুড়িকাডা চম্পা বিরক্ষে যদি ধরে ফুল। তবে জান এহি কন্যা সীতা সমতুল ॥ অজরা চম্পা না গাছে পুষ্প নাহি ধরে। তিল দণ্ড এহি কন্যা না রাখিহ ঘরে ॥ খাঁচায় না পোষাপাখী উড়াও বাহিরে। উড়িয়া আসুক পাখী আপন পিঞ্জরে ॥ তবে জানি সতী কন্যা ঘরে তুল্যা লইও। ঘোড়ের মন্দির মাইঝে যতনে রাখিও ॥ যদি দেখ পোষা না পক্ষী ফিরা নাই আসে। রজনী না পোহাইতে দিব বনবাসে ॥ ঘরের কপিলা গাই দুগ্ধ যদি শোষে। এক দণ্ড এহি কন্যায় না রাখিও বাসে ॥ যতেক পরীক্ষার কথা রাজা সে জানিল। বাণিজ্য ভরিয়া ডিঙ্গা সায়রে ভাসাইল ॥ পরীক্ষার কাল দেখ উতুড়িয়া যায়। ঘাটে নাইসে ফিরে ডিঙ্গা কি হইল হায় ॥ রাজ-ঘোড়া গেল বনে আর না ফিরিল। বিষতীর খাইয়া ঘোড়া জীবন ত্যজিল ॥ গুড়িকাটা বিরেকে কবে ধরে চাম্পাফুল। গোপনে বলাই রাজা বুঝাইয়াছে ভুল ॥ পোষানিয়া টিয়াপাখী উড়িয়া পলায়। চিন্তিত হইয়া রাজা করে হায় হায় ॥ কপিলার নালে দেখে রক্তধারা বয়। এরে দেখ্যা হইল রাণীর পরাণ সংশয় ॥ নিবিয়া লাখের দীপ হইল অন্ধকার। এই কন্যা ঘরে দেখ রাখা নাই সে যায় ॥ পৃথিবীর রাজাগণ একমত হইল। অভাগী মলয়া কন্যা বনে পাঠাইল ॥ দুঃখের কপাল কন্যা কত দুঃখ পায়। দেশেতে পৌছিল খবর কাইন্দা মরে মায় ॥ (১—৬২) ( ১০ ) কান্দে মলয়া কন্যা চক্ষে বহে ধারা। কোথায় রইলা পরাণ পতি দেওত মোরে দেখা॥ যত যত রাজগণ দুষ্মন হইল। কলঙ্কী বলিয়া মোরে বনে পাঠাইল॥ আইল আইল ফাল্গুন মাসরে গাছে নানা ফুল। গন্ধতৈল দিয়া নারী বান্ধে মাথার চুল॥ নবীন যৈবন ভারে হাল্যা পড়ে গাও। শরীল দহিয়া বয় পবনের বাও॥ গাছে গাছে সোণার কোইল রঙ্গে হুলা গায়। খঞ্জনা নাচিয়া পড়ে খঞ্জনীর গায়॥ কুক্ষণে দুষ্মন হার্যা মায়েরে ভাঙ্গাইয়া। কুক্ষণে বনের মাঝে আনিল হরিয়া॥ কুক্ষণে ছাড়িলাম বাস আমি অভাগিনী॥ কোথার তনে আইলা পুরুষ সোণার বরণ। বনের অতিথি দিলাম জীবন যৌবন॥ স্বপনের দেখা যেমন স্বপনে মিলায়। বন বাহুরিয়া ঘোড়া শুন্যেতে মিলায়॥ দুই আঁখি বুজিয়া রহিলাম কুমারে ধরিয়া। কোন রাজার পুরে আইলাম অদিষ্টিরে লইয়া॥ আইল আইল চৈত্রি মাসরে বসন্ত দারুণ। যৌবনের বনে মোর লাগিল আগুন॥ পুষ্প যেমুন পাগল হইয়া সম্ভাষে ভ্রমরে। যাচিয়া দিলাম মধু ভিন্ন দেশী কুমারে॥ সোনার পুরী পাইলাম শ্বশুরা শাশুরী। কামটুঙ্গী ঘরে শুইয়া নিদ্রা হইল ভারী॥ মলয়ের হাওয়া বয় কোকিলা করে গান। বন্ধুর মুখেতে তুল্যা দেই ছুয়া পান॥ গাথিয়া ফুলের মালা বন্ধুরে পরাই। পুষ্পের শীতলা শেষে শুইয়া নিদ্রা যাই॥ আচমকা স্বপন যেন সকলি ভুলায়। স্বপনের দেখা যেমুন স্বপনে মিলায়॥ বেলাত হইল ভারি নিদ নাহি টুটে। এক দুই তিন করি চৈত্র মাস কাটে॥ আইল বৈশাখ মাসের গ্রীষ্ম নিরদয়। আগুন মাখিয়া অঙ্গে ভানুর উদয়॥ বন্ধু কয় কামটুঙ্গি ছাড়লো সুন্দরী। চলিতে চলেনা পদ যৌবন হইল ভারী॥ আস্তে বেস্তে চলিলাম জলটুঙ্গি ঘরে। বিছান শীতলপাটি পালঙ্ক উপরে॥ শীতল চন্দন বন্ধু মাথে সৰ্ব্ব গায়। বন্ধুর উরেতে শুইয়া সুখে দিন যায়॥ এই দিন স্বপ্নের মত স্বপনে মিলাইল। এক দুই তিন করি বৈশাখ কাটিল ॥ জ্যৈষ্ঠ মাসেত দেখ দুঃখের বিবরণ। পৃথিবীর রাজগণে পাঠায় নিমন্ত্রণ॥ সুখের স্বপন মোর এখন কাটিল । দারুণ পরীক্ষা কাল সুমুখে আসিল ॥ প্রাণপতি বন্দি মোর হইল দৈদেশে । তরাসে কাঁপিল পরাণ জানিয়া হুতাসে ॥ ধরিয়া অতিথের বেশ বন্ধুরে বাঁচাই । যত কষ্ট দিল মোরে দুষ্মন বলাই ॥ বাহুরিয়া ডিঙ্গা দেখ ঘরে নাই সে ফিরে । রাজঘোড়া মইল বনে খাইয়া বিষতীরে ॥ বনবাসে আইলাম বন্ধুরে ছাড়িয়া । দৈচ্ছতে কান্দিল পরাণ বিভুইয়ে পড়িয়া ॥ কোথায় রৈলা পরাণ পতি কারে কহি কথা । বারমাসী কাহিনী মোর শুন তরুলতা ॥ বনের ময়ূরী আর ডালের পক্ষিনী । তোমরা বইসা শুন মোর দুঃখের কাহিনী ॥ অচিনা বনের রাজ্য কোন্ দিকে যাই । কলঙ্কী কন্যারে রাখে এমন সুহৃদ নাই ॥ মাও বাপ এমন কালে রহিল জানি কোথা । দুঃখের লাগিয়া কন্যায সৃজিল বিধাতা ॥ গলায় তুলিয়া দিব ঘাসুনার ফাঁস । কঙ্ক কয় না ছাড় কন্যা আপন পরাণ আশ ॥ বাঁচিয়া থাকিলে হবু বন্ধুর দরশন । সুমুখে আষাঢ় মাস থির কর মন ॥ আইল আষাঢ় মাস ঘন ডাকে দেওয়া। পাটুনী পাটিয়া ধরে নয়াগাঙ্গে খেয়া॥ নদীতে যৌবন ভারি কূল ভাঙ্গি চলে। যতেক সাধুর ডিঙ্গা উড়াইল পাল॥ পুবেত গর্জিয়া দেয়া পশ্চিমে মিলায়। বিরক্ষ তলে থাক্যা কন্যা রজনী গুয়ায় ॥ কান্দে মলয়া নারী চক্ষে বহে পানি। বনে বনে কাইন্দা কন্যা ফিরে উন্মাদিনী॥ বিরক্ষ ডালে বসিয়ারে ময়ূরা পেখম ধরে। তা দেখ্যা পড়য়ে মনে কন্যার জলটুঙ্গি ঘরে॥ শয্যায় শীতল পাটী গায়েত চন্দন। একে সঙ্গে আর পড়ে বন্ধুর বাহুর বন্ধন॥ আউলা কেশ ঝাড়িয়া বান্ধে কন্যা পূর্ব্ব কথা সুরি। আমার না সোণাবন্ধু কে করিল চুরি॥ শুন বিরক্ষ কহিরে কথা দুঃখু বারণ। তোমার তলায় যেন আমার মরণ॥ মরিলে অভাগী কন্যা যদি দেখা পাও। আমার দুঃখের কথা বন্ধুরে জানাও॥ কঙ্ক কহে নাহি সে ছাড় কন্যা জীবনের আশ। সুমুখে আসিল তোমার ওইনা শাওন মাস॥ আইল আইল শাওন মাসের ঘন বরিষণ। দেওয়ার গর্জন শুন্যা কাঁপে নারীর মন॥ উলকিয়া ফিনকি ঠাডা আসমান ভাইঙ্গা পড়ে। চমকাইয়া বেসুরা নারী আপন স্বামী ধরে॥ গলায় সাফলার মালা আর শীতল পাটি। ভালত বিছায়া শয্যা করি পরিপাটি ॥ বিভোলা বন্ধেরে লইয়া ঘুমে অচেতন । এইকালে মলয়ার দুঃখ বিবরণ !! ভাঙ্গিয়া গাছের ডাল ধরিয়াছে শিরে । দুরন্ত বাদলা বর্ষ্যা অঙ্গ বাইয়া ঝরে ॥ ভিজা চুল ভিজা বস্ত্র মাটিত শয়ান । এত দুঃখেতেও কেন না বাইরায়রে পরাণ ॥ কঙ্ক কহে কন্যালো না ছাড় তার আশ। সুমুখেতে ভাদ্রমাস চান্নির পরকাশ ॥ আইল আইল ভাদ্রমাস রাত্রিখানা ছোট । অভাগী মলয়া কন্যার নিদ নাই সে মোট ॥ ভাদ্রের নিরল চান্নি নদী নালা ভাসে। বাণিজ্য করিয়া সাধু ফিরে আপন দেশে ॥ কেমুন জানি আছে বাপ কেমুন জানি মাও। অঙ্গ শীতলিয়া বায়রে নদীর শীতল বাও ॥ সেই বাওয়ে জ্বলে অঙ্গ দহেত পরাণী। কি জন্য রাখ্যাছি পরাণ কিছু ত না জানি ॥ আশ্বিনে শুকাইয়া দরিয়া মন্দ পড়ব পানি। ডুবিয়া মরিতে কন্যা ছুটে পাগলিনী ॥ কঙ্ক কহে ওলো কন্যা নিজেরে বাঁচাও। বাঁচিলে অবশ্য দেখা পাবে বাপ মাও ॥ আইল আশ্বিন মাস দুর্গাপূজা দেশে। ভাগ্যবানে পুজে দুগগা অশেষে বিশেষে ॥ বাপর বাড়ী দুগ্গাপূজা কিছু মনে পড়ে। শৈশবের যত সুখ গেল কোন্ ফেরে ॥ যত সুখ ছিল ভালে তত দুঃখ আইল। সোনার না রাজ্যপাট কাড়ি খেদাইল ॥ রাজার ছাওয়াল মোর হইল সোয়ামী। বনেতে কান্দিয়া আজি পোহাই রজনী ॥ বিষ গাছ বিষ ফল কন্যা বনেতে বিছরায় । এমুন দুঃখের পরাণ রাখা হইল দায় ॥ কঙ্ক কয় কন্যা তুমি না হও উতালা। দুঃখের করিয়া লহ আপন গলার মালা ॥ সুখ পাইতে চাও কর দুঃখের ভজনা। আইল কার্ত্তিক মাসরে আসমান উজল। নিয়ারে জ্বলিয়া মরে জলের কমল ॥ সোনার কমল বনরে হইল উজার। আমার সুখের আশা হইল ছারখার ॥ নদীতে ডুবিয়া মরি নদীত শুকায়। বিষফল খাইতে গেলে পরাণ না যায় ॥ বস্ত্র হইল জীর্ণ শীর্ণ কেশ হইল ঝারা। গাছের না পাতা হইল কন্যার অঙ্গ জোরা ॥ দুই নয়ানে বহে ধারা কন্যা কান্দিয়া পোহায়। ছোট বেলা ছোট দিন কার্ত্তিক মাস যায় ॥ আইল আগুন মাস জ্বলিল আগুনি। শিশিরে দহিল অঙ্গ কাতর হইল প্রাণী ॥ শুন শুন তরুলতা আমার দুঃখের কথা। দুঃখের লাগিয়া মোরে সৃজিল বিধাতা ॥ ঘর নাই দুয়ার নাই সে বিরক তলায় বাস। এই মতে কাইন্দা কন্যার যায় দশ মাস ॥ সুমুখে দারুণ শীত অঙ্গে বাস নাই। দারুণা শীতের কাল কিমতে কাটাই ॥ দুঃখিনী দুঃখের কপাল কাইন্দা কঙ্কে কয়। সাওরে বিছায়া শেষ কন্যা নিয়ারে কি ভয় ’ ॥ এই পথে চললো কন্যা পাবে বন্ধুর দেখা। সুমুখেতে পৌষা আন্দি অন্ধকারে ঢাকা ॥ পুষমাসেতে কন্যা কান্দিয়া আকুল। চাকুলীর আঁশ কন্যা রুক্ষু মাথার চুল ॥ দুই নয়ানে ধারা বহে কন্যা কান্দে বনে বনে। কান্দিতে কান্দিতে গেল কাঠুরীর থানে ॥ মাঘ মাসেতে কন্যার দুঃখ হইল ভারী। বন ছাইরা নগরেতে চলিল কাঠুরী। উদাস বনেতে কন্যা থাকে একেশ্বরী ॥ দারুণ মাঘের শীতে অঙ্গে পড়ে ঢাকা। এনকালে হার্যার সঙ্গে আরবার দেখা ॥ ( ১—১৫৮ ) ( ১১ ) যত যত রাজগণ সভা কইরা বসে। হার্যারে বান্ধিয়া কুমার আনে নাগপাশে ॥ বন বিচরিতে কুমার ঘোড়ায় চড়িল। যতেক লস্কর তার সঙ্গেত চলিল ॥ কোথায় রহিল লোক লস্কর শূন্যে ঘোড়া ছুটে। আর বার যায় ঘোড়া গহীন বনের মাঝে ॥ ( ১—৬ ) ( অসমাপ্ত )