নষ্ট মানুষ
প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা - চতুর্থ খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন
নছর মালুম আরম্ভন পহেলা আল্লার নাম করিয়া স্মরণ। মাথা নোয়াইয়া বন্দম নবিজির চরণ ॥ তালমান নাহি জানি না চিনি আখর। মুল্লুকে মুল্লুকে ঘুরি নাইরে বাড়ি ঘর ॥ ওস্তাদে গাহিত গান আছিলাম দোহারী। মুখেমুখে শিখিয়াছি পদ দুই চারি ॥ ভাগ্যবানের বাড়িঙ গিয়া পালা গান গাহি। সকলর দোয়ার’ বলে নূনে ভাতে খাই ॥ বর্ষার বিরহ ধূয়া—ঘরের মধু পরে খায় ওরে লঙ্কাপোড়া বৈদেশিক বেড়ার ॥ ঝড় পড়েলে লোছালোছা উজানি উডের কই ওরে উজানি উডের কই ॥ এমন বরিষার কালে থাক্যম কারে লইরে ॥ কুহুম কুহুম ১ শীতরে পড়ের গায়ত দিলাম কেথা ২ ওরে গায়ত দিলাম কেথা। কন দাবাইয়ে ৩ যাইব আমার বুকের হাড্ডির ৪ বেথারে ॥ দেবায় ৫ ডাকে হারুম ধুরুম আছমান ভাঙ্গি পড়ে ওরে আছমান ভাঙ্গি পড়ে। এন্নিকালে একলা আমি কেমনে থাকি ঘরেরে ॥ টোবার ৬ পানি বাড়ি উট্টে বাড়ি উট্টে ফেনা, ওরে বাড়ি উট্টে ফেনা। দুঃখর কথা কারে কইয়ম কেহুত বুঝেনারে ॥ বীজানায় ৭ বাড়ে রোয়া ৮ আগা লক্ লক্ ওরে আগা লক্ লক্। পানির হোতৎ ৯ ভাসি গেইরে আমার বসর কালা সথরে আউল হইয়ে যতরে মাছ মেঘর পানি খাই ওরে মেঘর পানি খাই। খাইল্যা ১০ ঘরৎ কেম্তে আমি মনরে বুঝাইরে ॥ বাড়ীর পিছে ঝিঞা খেতি টুনি পক্ষীর বাসা। দিনৎ খায়রে চড়িবড়ি রাইতৎ তারার আশা ॥ দুমাসের লাগি गेला দুবছর যায়। বনর বাঘে না খাই মোরে মনর বাঘে খায় ॥ নারীর যৌবন জাইন্য জোয়ারের পানি। কুলে কুলে ভরে আবার ভাডাৎ ১১ টানাটানি ॥ দা কিনিয়া ন ধারাইলে জামার ১ ধরি যায়। খাইল্যা ভুঁইয়ে ২ দুন্যাইর ৩ যত আগাছা গাছায় ॥ পাতিলার ভাত ঠাণ্ডা হৈলে খাইতে মজা নাই। হেলি পৈলে সোণার হৈবন কি করিবা আ-ই ॥৪ ছাটিনের ৫ চুলি ৬ ছিল বুকে আঁটা আঁটি। সোণার অঙ্গ মৈলান হৈয়ে যৌবন হৈয়ে ভাটি ॥ হাতর বেকি ৭ হলস ৮ হইয়ে পড়ি পড়ি যার। ভাবনা চিন্তনা মোরে চুষি চুষি খার ॥ পাড়ার লোক নানান কথা দিতেছে লাগাই। মা বাপেতে নিত চায় তোমার খুন ৯ ছাড়াই॥ কন সাইগরের কুলে তুমি কন সাইগরের কুলে। কত কত ভরমরা যে বসিতে চায় ফুলে ॥ কার লাগিয়া কর তুমি এইনা কামাই রুজি ১০। সিঙাল চোরে ১১ হাতাই লই যার ঘরর আছল ১২ পুঁজি ॥ কার লাগি বৈদেশী হৈলা হেলারে কার লাগি। আমি যদি মরি তুমি হৈবা বধর ভাগী ॥ হাণ্ডার বৌ ১৩ ন হইয়মরে ন পুইয়মরে ১৪ হাণ্ডা। হদ ১৫ বাজাইয়া চাইয়ম আমার কোপাল কম্ং ১৬ ভাঙা ॥ আমিনা খাতুন কইন্যা বাপের এক ঝি। ছবছর খসম ছাড়া উপায় হৈব কি॥ হায়দর বাপের নাম মাঝির গাঁও বাড়ি। অতি কষ্টে দিন কাটে ঘরজার কাম করি॥ জাগাজমি নাইরে তার নাইরে হাল চাষ। দিনের রুজি দিনে খায় কন দিন উয়াস॥ কৈন্যারে দিছিলা বিয়া ভালা ঘর চাহি। ছবছর গত হইল কন পুশ্ল্যিস নাই॥ কন পুশ্ল্যিস নাইরে তার গেল ছবছর। ভৈনর পুত ভাগিনা দুলা নাম যে নছর॥ ভৈনর পুত ভাগিনা নছর তার কথা শুন। আমিনার কোপালে সেই লাগাইছে আগুন॥ আদিগুরি কথা এখন কহিয়া জানাই। ভাগিনা কেমনে হৈল ঝিয়ের জামাই॥ মার পেডে থাকিতে নছর বাপের এন্তেকাল বড় দুঃখে তার মায় কাটাইত কাল॥ পাঁচ না বছরের বসে মাও গেল ছাড়ি। সে হইতে নছর আলি থাকে মামুর বাড়ী॥ আমিনা হইতে নছর দুই বছরের বড়॥ বড় মহব্বত তারে করিত হায়দর॥ দুঃখ মি ১ করি আনে দুই আক্ত খায়। আমিনা নছর সদাই খেলিয়া বেড়ায়॥ সোয়ারীর ২ খোলে ৩ নছর নুকা বানাইয়া। পহিরর ৪ পানির মাঝে দিত ভাসাইয়া॥ এক সঙ্গে খেলা তারার এক সঙ্গে খাওন। কৈতর কৈতরীর মত তারা দোন জন॥ এক দুই তিন করি ষোল বছর যায়। যৌবন জোয়ারের জল আইল দরিয়ায়॥ গোলাপ ফুলের পরে ভরমরার মন। গোপনে বসিয়া তারা করে আলাপন॥ জবিনে রুইলে চারা বাড়ে দিনে দিনে। মাড়ির ভিতরের রস হিঁড়োতে ৫ চিনে॥ হাপে ৬ চিনে মণি আর বেঙে বাইরার ৭ পানি। আসকে মাসুক ৮ চিনে যখন টানাটানি॥ অল্পবয়সের যুবা ভেরল ভেরল ৯ গা। নছররে জামাই কৈল আমিনার মা॥ পুত নাই ক্ষেত নাই ঝিয়র উয়র আশা। দুদিল্যা দুনিয়ার মাঝে সকলি যে লাসা ১০॥ কাউয়ার ১১ বাসাৎ কোকিলার ছা ন মানিল পোষ ঘরবাড়ী ছাড়িল নছর নছিবের দোষ॥ বাপে ভাবে মায়ে ভাবে উপায় হৈব কি। শেষ কাডালে কারবা হাতে সঁপি যাইয়ম ঝি॥ এক দুই তিন করি গেল ছবছর। কন্তে গেল গই অভাগ্যার পুত ন পাইলাম খবর॥ ন পাইলাম খবরে তার কি হৈব উপায়। মোরা মৈলে আমিনারে কনে চাইব হায়॥ (৩) খুডি খুঁডি ধান খায় মনা আর চনা। গহিন পানির তলে মাছে খোঁড়ে খনা॥ চতুর সন্ধানী বঁধু হাঁড়ে মুরে মুরে। গাছের গোডা পাক ধরিলে পাইক পহল উড়ে॥ ফুলেতে থাকিলে মধু জানে সে ভ্রমর। মধু খাইতে চাহি বঁধূ করেরে ধড়ফড়॥ এছাক মিঞা আইসে সদাই হায়দরের বাড়ী। আমিনার প্রেম সাইগরে দিতে চায় পাড়ি॥ বাপ গেইয়া কামে কাজে মায়ে বাঁধের বাড়া। এই সময়ে এছাক মিঞা দুয়ারেতে খাড়া॥ পানের বিড়া আইনে ভাল নারিকেলের তেল। আমিনারে ডাকি কয় “ঘরর দুয়ার মেল্”॥ ইসারায় কয় কথা দুই চোগ লড়ে। ন মানে পরাণ তার মুখর লেউণ্ডা ঝরে ॥ হোক্কাতে তামুক আর পানের খিলি দিয়া। আমিনা বাহিরে আসে কথা না বলিয়া ॥ জাইল্যা যেমন ঘোলায় পানি জাল ফেলাইয়া দূরে। সেইনা মতে মন চোরা আশে পাশে ঘুরে ॥ পানির সঙ্গে তেল মিশেনা চিনির সাথে নুন। এছাকের সঙ্গে তেমনি আমিনা খাতুন ॥ (১—২০) ( ৪ ) গেরামের মাঝখানে এছাকের ঘর। নাম ডাগর মানুষ তারা মস্ত তোয়াঙ্গর ॥ চৌচালা ডেহেরিখানা উডান জুড়িয়া। চাইর দিকে গড় খন্দক গিরিডি ঘিরিয়া ॥ ভিতরে আটচালা ঘর উলুছনর ছানি। বড় পুকুর ছামনে তার দশ হাত গহিন পানি ॥ এছাকের ঘরে বিবি নাম ‘মেমাজান’। ছুরতে জিনিয়া লয় পুন্নমাসীর চ্যান ॥ বড় ঘরর মাইয়া ‘মেমা’ বড় ঘরর মাইয়া। সুখ ন পাইল ভমরা বঁধু ফুলর মধু খাইয়া ॥ যার সঙ্গে যার মজ্জে মন বাদ বিচার নাই। কোন জনে সুখ পায় মদ বেচি দুধ খাই ॥ আমিনারে নারাজ দেখি এছাকের মন। প্রেমের আগুনে আরও জ্বলে হামিস্কন ॥ এইত আগুনের জ্বালা ছেলর মতন ফুডে। ফুদিয়া নিবাইতে গেলে বেশী জ্বলি উডে ॥ একদিন এছাক মিঞা করিল কি কাম। হায়দারের নিকটে গিয়া কহিল তামাম ॥ কহিল মনের কথা যত আছে মনে। দিল যে ফাড়িয়া যায় আমিনার কারণে ॥ সাদি যদি করে মোরে আমিনা সোন্দরী। তোমরারে পালিবাম সারা জীবন ভরি ॥ আষ্টকানি জমি দিব শঙ্খ নদীর কুলে। ভরি ভরি সোণা দিব হাত কাণ চুলে ॥ দুঃখ মিন্নত ন করিবা বুড়া কালে আর। আমিনার কারণে তোমরা ন হৈবা লাচার ॥ এছাকের এই সব কথা শুনিয়া হায়দর। মাথার মাঝে হাত দিয়া ভাবিল বিস্তর ॥ ভাবিয়া চিন্তিয়া হায়দর জিজ্ঞাসৈ তখন। আমিনারে রাখিবা কি বান্দীর মতন ॥ এছাক বলিল—ইহা নয়া কথা নয়। নহিলে কুলের মান কেমন কৈরে রয় ॥ আষ্টকানি জমি দিব শঙ্খ নদীর কুলে। ভরি ভরি সোণা দিব হাত কাণ চুলে ॥ হায়দর বলিল আমি পুছার ১ করিয়া। তোমারে আমার কইন্যা দিবাম তবে বিয়া ॥ মায় আসি কৈল কথা আমিনার গোচরে। নীচের মিক্যা ২ চাইল কন্যা বুকে ৩ ধড়ফড় করে ॥ ন চাহিল মার মিক্যা ন ফুডিল ৪ মাত ৫। পেরেসানে ৬ তিন দিন ন খাইলরে ভাত ॥ (১—৪০) (৫) সেইত গেরামের গুণীন্ বুধা তার নাম। ঝারা ফুয়া ৭ আদি জানে বিতকিছ্য ৮ কাম ॥ গর্র্ভিতা খালাস হয় পানি পড়া খাই। বুধাগুণীর দোয়া তাবিজ আচানক দাবাই ॥ পুরুষ দেবানা ৯ হয় নারী ছাড়ে ঘর। পররে আপন করে আপনারে পর ॥ শনি মঙ্গল বারে যদি অমাবস্যা পায়। গাছের হিউর ১০ তুলি আনি অসুদ ১১ বানায় ॥ যুবতী নারীর লাগে খোঁড়ার ১২ আগার চুল। আর লাগে বাসি বিয়ার মুকুটের ফুল ॥ আঙ্গুলের নোেক ১৩ আর আঙ্কুলের কোনা। এসব জিনিষ দিয়া করে দারুটোনা ১৪ ॥ যত বদমাস আছে যত লুচ্চা আর। দিনে রাইতে ঘুরে তারা দুয়ারে বুধার ॥ কেহ পড়ায় হৈরর ১ তেল কেহ পড়ায় পান। কেহ দে বাইয়ন ২ মুলা কেহ দেরে ধান ॥ কেহ দেয় আনাজি কেলা ৩ কেহ কচ্চুর মাথি। ভেট বেয়ার ৪ লয় বুধা দোন ৫ হাত পাতি ॥ ওঝাগিরি ব্যবসা ভালা মাছে ভাতে খানা। দিনে জোটে মৈষর দই রাইতে দুধের ছানা ॥ সিন্দুক ভরা টাকা বুধার গোলায় আটকাট ৬ ধান ওঝাগিরি করি বেটা হৈছে জান্টুমান ৭ ॥ দেশ বৈদেশে হৈছেরে তার বড় নাম ডাক। বুধার কাছে একদিন আসিল এছাক ॥ মুখেতে সরম তার বুকে বেথা ভারি। আরে ঠারে কয়রে কথা মাথা লাড়ি চারি ॥ বুধা বলে শুনরে বাপ আইস্য কিয়র লাই ৮। কোন নারী দিয়াছে দিলে ৯ আগুন লাগাই ॥ এছাক বলিল আমার পাড়াল্যা হায়দর। হাটের উত্তরে যাইতে পথর মোড়ৎ ঘর ॥ তার কইন্যা আমিনারে খামখা ১০ যে চাই। বাঁচাও আমারে গুণী আগুন নিবাই ॥ পেডৎ ন যায় ভাত আমার মরির সদাই ভোগে’। শুতি’ পৈলে তারে ভাবি ঘুম ন আইয়ে চোগে ॥ বিষগোটা মৈষর হাল দশ দোন’ ভুঁই। টেঁয়া পৈছার লাগিয়ারে ন ভাবিও তুঁই ॥ গোলার ধান ইন্দুরে খায় নাইরে পুন্সিস’। আমিনার লাগি আমার মাথায় উঠে বিষ ॥ বুধা বলে শুনরে বাপ কালুকা ফজরে’। আমার পরিচয়ে যাইবা নজু তেল্যার ঘরে ॥ হৈর’ দিয়া যখন নজু ঘুরাইব ঘানি। পরথরের সাত ফোডা’ তেল দিবা তুমি আনি ॥ শনিবারে সেই তেল আমি দিব পড়ি। দেখিব কেমন কইন্যা আমিনা সোন্দরী ॥ (১-৪৪) ছবুর” মানেনা এছাক মানেনা ছবুর। সদাই পক্ষীর মতন করে উড় উড় ॥ ডলুয়্যা খালর” হোঁত’ হৈয়ে মন ডলুয়্যা খালের হোঁত। কন দিকদি কন্তে যাইব খুঁজি ন পায় পোঁথ’৩ ॥ দিলে নাই খোসালী ১ তার মুয়ৎ নাইরে মাত ২ বিলাইর মতন চুপ্পে চুপ্পে তোয়ায় ৩ ইন্দুর গাথ ৪ হায়দরের কাছে যাইয়া কৈল সমুদায়। আমিনারে হাত করিতে চিন্তিল উপায়॥ মায় বাপে ছুল্লা ৫ করি কি কাম করিল। খেসীর_৬ বাড়ীৎ যাইব বলি ঘরর বাহির হৈল॥ আমিনারে কৈল তারা কিছু নাহি ডর। ফিরিয়া আসিব মোরা হাজন্যার ৭ ভিতর॥ পৈরনতে ৮ তহমান ৯ কালা কোর্ত্তা গায়। মাথার উয়র টুবি দিয়া আনা ১০ ধরি চায়॥ মুখেত মাখিয়া দিল বুধার তেল পড়া। সাজিয়া মাজিয়া এছাক বাহির হৈল ত্বরা॥ গা আঁধারি ১১ হৈয়ে তখন সুরুজ লৈয়ে ঘর। দুতিয়ার ১২ চান দেখা যায়রে আচমানের উয়র॥ ধীরে ধীরে আসে এছাক চায় ফিরি ফিরি। একই বারে চলি আইল হায়দরের বাড়ী॥ দুয়ার রৈয়ে ধাঁধারে তার ঘরে নাইরে বাতি। আমিনা খাতুন কন্তে ১৩ গেইয়ে এই রাতি॥ ন আইল ন আইল কইন্যা ন আইলরে ঘরে। তেল পড়া মুয়ত দিয়া এছাক ভাবি মরে॥ চাডার মাঝে ন-আইল মাছ ন খাইল আধার। বনর হাতী ন পড়িল খেদার মাঝে তার॥ জাঁহির মাঝে ঝাড়র ডাহুক ন বাড়াইল গলা। মুড়ার বাঁদর ফাঁদৎ পড়ি ন খাইলরে কলা॥ সারা রাইত মোশার কামড় সহিয়া সহিয়া। ফজরে আপনার বাড়ীৎ গেল এছাক মিঞা॥ খাইবার বেলা আসি মা বাপ ঘর দেখে খালি। আমিনা রাখিয়া গেছে দোন কানর বালি॥ রঙ্গিনা ছাটিনের চুলি আর নাগর নথ। ফেলিয়া গিয়াছে কইন্যা ঘরর দুয়ারত॥ আড়াকাড়া তোতারে সেই আড়াকাড়া তোতা। হঁাজর বেলা কনবা দুঃখে উড়ি গেল গই কোথা॥ এখানে আমিনার কথা করিলাম বারণ। নছরের কথা কিছু শুন দিয়া মন॥ (১-৩৮) (৭) চাঁডিগা বন্দররের ছুলুপ নাম তার ‘রুম’। নছর আলী সেই জাহাজের হুশিয়ারি মালুম॥ দরেয়া জরিপ করি বাদসা ‘সেকান্দার’। জাহাজ চালাইবার লাগি বানাইলা ‘চাডর’। ‘হিরামন’ নামে এক তোতা ছিল তান্। সেই তোতা সাইগরের জানিত সন্ধান॥ কনখানেতে ডুবাচর কন্ঠে গহিন পানি। হিরামন নানান খবর দিত তানে আনি ॥ জাহাজী ছুলুপী যত আছে দুনিয়ায়। সেকেন্দরের ‘চাডর’ চাহি বাইছা’ বাহি যায় ॥ নছরপরথমে ছিল জাহাজের লস্কর। ভালামতে হেপয২ পরে করিল ‘চাডর’ ॥ আচমানের তারা চাহি চিনি লয় পথ। ভালামতে বুঝে নছর হাবার আলামত ৩॥ লস্কর হইতে নছর হইতে হইল মালুম। টৌঁয়া পৈছা জমাইয়ারে হাতত কৈল কুম ৪॥ মালুম হইয়া নছর করিল কি কাম। দক্ষিণ মুল্লুকে এক স্থাপন মোকাম ॥ অঙ্গী নামে সহর সে সাইগরের কুলে। সে সহরে নছর মালুম নানান কারবার খোলে ॥ আচানক দেশ সেই শুন কহি যাই। বেপরদা মাইয়া মাইনূসর লাজ সরম নাই ॥ মরদেরা রাঁধে ভাত নারী হাটে যায়। ভালা মাছ ছাড়ি তারা নাপ্পি পোঁচা ৫ খায় ॥ ওক৬ আসে এই না দেশের থানার কথা শুনি। আঁজিলা কেঁয়াল্লিশ (?) খায় তেলর মাঝে ভুনি৭ মাইয়া মাইনসর জেয়র জাতি বহুত বহুত দামি। এক পেঁচে কাপড় পিন্ধে আড়াই হাতর থামি৮ ॥ মাথার চুল বাবরি ছাঁটা এঙ্গি থাকে বুকে। খোঁড়ার ভিতর পানর খিলি ইসারাতে ডাকে ॥ রূপের ছটা বুকের গোটা নারাঙ্গির তুল। মাথার উয়র খুঁচি ধরে বেল কদম্বের ফুল ॥ কানর মাঝে সোনার নাধং রাস্তা দিয়া যায়। মুচকি মুচকি হাসি তারা পুরুষ ভুলায় ॥ নারীর রাজ্যে আইল যখন মালুম নছর। পিরিতির আগুনে দিল করে ধড়ফড় ॥ ‘মাফো’ নামে ‘পোয়াজা’ এক অঙ্গী সহর বাড়ী। ‘এখিন’ তাহার কইন্যা পরমা সোন্দরী ॥ ষোল বছর বয়স তার চাস্বা ফুলর রং। ঠমকে ঠমকে চলে কত রকম ঢং ॥ শুকনা মাছ বেচে ‘মাফো’ বড় সদাইগর। তার বাড়ীতে একদিন আইল নছর ॥ পানর খিলি বানায় ‘এখিন’ বাপর ঘরে বসি। চৈক্ষে করে ঝিলি মিলি মুখে প্রেম হাসি ॥ এদিক ঐদিক চাইতে কৈন্যার দুই চোগ লড়ে। আখির উয়র ভেল্কি দিয়া রসিক পাগল করে ॥ চাস্বার বরণ কইন্যার সোন্দর বদন। তার উপরে আসক হইল নছরের মন ॥ পিরিতির তিনটি আখর মর্মে লাগে যার। কিবা সরম কিবা ভরম কিবা লাজ তার ॥ দিনে রাইতে যায় নছর পোয়াজার বাড়ী। আমিনারে ভুলি গেইয়ে বাড়ী ঘর ছাড়ি॥ ভুলি গেইয়ে ছোড়কালের যত সুখ দুঃখ। ভুলি গেইয়ে আমিনার হাসিভরা মুখ॥ ভুলি গেছে ভাই বেরাদর, ভুলিছে সকল। ‘এখিনের’ রূপ তারে কৈরাছে পাগল॥ একদিন হাঁজর বেলা কি কাম হইল। মাফো সদাইগরের বাড়ীৎ নছর আসিল॥ কেহ নাই ঘরে আর এখিন একেলা। মস্কারি করিয়া দিল পানর বঁড়ু মেলা॥ এখিনের হাত তখন ধরিল নছর। পরবোধ ন মানে মন করেরে ধরফড়॥ জহরিয়ে জহর চিনে বাইন্যা চিনে সোণা। পিরিতিয়ে মন চিনে মন চিনে আপনা॥ ক্ষেতিয়াল চিনে ভূঁই মাঝি চিনে খাল। ওস্তাদ গাইনে চিনে কন্টা ভাল তাল॥ কারবারিয়ে ব্যবসা চিনে ধনী চিনে ধন। রসিক নাগর চিনে রমণী রতন॥ মালুম ছুয়ানী চিনে সাইগরের চর। এখিনরে চিনিলরে বিদেশী নছর॥ দেখিয়া শুনিয়া মাফো কি কাম করিল। সেই দেশের সরামতে তারার বিয়া দিল॥ মুড়ার কুল্যা গরু ১ আর গাঙর কুল্যা বাড়ী। মুছলমানের বিবি আর হেঁদুর গালর দাড়ি ॥ এ সকলের কোন দিন ন থাকে ঠিকানা। পত্য ২ ন করিও কেহ করি আমি মানা ॥ ফুলর মধু খায় নছর মুখে ট্যাগা মারে। ভুলি গেইয়ে জানের জান সেই আমিনারে ॥ (১—৮০) ( ৮ ) কন দেশেতে যাওরে মাঝি ভাড়ি গাঙ বাইয়া। মা বাপেরেরে কইও আমার নাইরের লাগিয়া ॥ আম ধরেরই থোবা থোবা কাটলে ধরে মুচি ৩। রাখি আইস্থি কধু লাউ ৪ গেইয়ে বুলি পুঁচি॥ বাপের বাড়ীর জোড় কলসী উপরে ঢাকনি। আমার পরাণে খোজের সেই কলসীর পানি॥ বাপর বাড়ীর করই গাছটা পাতা ঝুম ঝুম করে। মাবাপেরে কইও মাঝি নাইয়র নিত মোরে॥ দুষমনের লাগি আমি ছাইড়লাম বাপর বাড়ী। নছিবের দোষে আমার খসম্ থাকতে রাঁড়ি॥ ছোড় কালে পালি মা বাপ দিলা বড় দাগা। কি করিব শঙ্কর কুলর আট কানি জাগা॥ কি করিব সোনার জেয়র ৫ বুকে আমার ঘাও। মনের দুঃখ ন বুঝিল আমার বাপ আর মাও॥ কি করিব মৈষর হাল আর দোনাদোনি ভুঁই। বাড়াবাঁধি তোমরারে খাওাইতাম মুই॥ বূগর ছেল হাড়ি তোলতে দিলা আরো গাড়ি। বেচা পরাণ কেন্মে আবার লইয়ম আমি কাড়ি॥ অল্প বয়সের কালে পাইলাম বড় দাগা। এ কাল ধৈবন আমার রাইখতে ন পাইর জাগা॥ খাওনের চিজ নহে কাটিয়া খাইব। বেচিবার মাল নহে বাজারে বেচিব॥ বাটিবার ধন নহে দিব ঘরে ঘরে। ন বুঝিলা মাও বাপ ন বুঝিলা মোরে ॥ গাওর কুলৎ বসিয়ারে আমিনা সোন্দরী। মা বাপরে ভাবিয়ারে কাঁদে রাও ধরি॥ দুই মাস গত হৈল ছাড়ি বাপর ঘর। বহু দুঃখ পাইল কইন্যা ঘুরিল বিস্তর॥ কত গেরাম ছাড়ি আইস্থে কত নন্দি নালা। কত গণ্ডা লুচ্চা ছাঙ্গা দিয়ে কত জ্বালা॥ খোদায় ছরত দিয়ে ছরত হৈয়ে বৈরি। সস্তিপনা রাখি আইস্থে আমিনা সোন্দরী॥ সাইগরেতে ধায় নন্দি কনে দিব বান। হাত বাড়াইলে পায়ন ন যায় আচমানের চান॥ নারীর দৌলত সস্তিপনা রাইখতে যদি চায়। এমন পুরুষ কেহ নাই কাড়ি লৈয়া যায় ॥ (১—৩৬) ( ৯ ) ইলসা খালির কুলে আছে গফুরের বাড়ী। তার ঘরে আশ্রা ১ পাইয়ে আমিনা সোন্দরী ॥ আশীবছর উমর ২ তার বুড়া ক্ষেতিয়াল। হাঁজর বেলা ঘরে আসে কাঁধে লৈয়া হাল ॥ চোগর ভুরু পাইক্যে ৩ বুড়ার আরো বুগর কেশ। দেড় হাত লম্বা পাকনা দাড়ি দেখতে লাগে বেশ ॥ ঘরে আছে গুজা বুড়ি নাই দেখে চোখে। কনে রাঁধের ভাত ছালন ৪ মরে পেডর ভোগে ৫ ॥ গরু আছে মৈষ আছে গোলা ভরা ধান। দুনিয়ায় কিরপণ নাই বুড়ার সমান ॥ নছিবের দোষে গফুর হৈয়ে আটকুড়া। চরফু দিন ৬ ক্ষেতে তবু খাটে এই বুড়া ॥ পোষ্যিন ৭ আনিয়া এক পালাইলা তারে। খোদায় নারাজ হৈলে কে রাখিতে পারে ॥ মরিল পোষ্যিন পোয়া ৮ ভাঙিলরে বুক। গুজা বুড়ি লৈয়া গফুর পায় বড় দুঃখ ॥ এন্নিকালে ঘরে আসি আমিনা সোন্দরী। ধর্ম্মের বাপ ডাকে তারে দোন পায়ত ধরি ॥ নিজ্যের অবস্থার কথা একে একে কৈল। আমিনার উপরে তার মহব্বত হৈল। অকুলে ভাসিয়া কইন্যা পাইল কুলর লাগ। আঁধার ঘর রোশনাই করি জ্বলিল চেরাগ॥ রাঁধি বাড়ি ভালা মতে তারারে খাওয়ায়। বুড়া বলে পাইলাম কইন্যা আল্লার দোয়ায়। হাঁজর বেলা গরু বান্ধে কুড়া খল্লি দিয়া। হোক্কাতে তামুক ভরে বাপের লাগিয়া॥ দুই আক্ত নাস্তা বানায় সকাল বিকালে। ছেঁইচ্যা পান পাইয়া বুড়ি চুপ্প দিল গালে॥ আমিনা পরম সুখে আছে তারার ঘরে। মা বাপর লাগি তবু চোখর পানি ঝরে॥ (১-৩০) ( ১০ ) দক্ষিণ সাইগরে চর ‘পরীদিয়া’ নাম। সেই জাগাতে ছিল আগে পরীর মোকাম॥ আচ্মান হইতে পরী আসিত উড়িয়া। মানুষের সঙ্গে হৈতে কত পরীর বিয়া॥ ক্রমে ক্রমে হৈল কিবা শুন বিবরণ। নানান দেশের মানুষ চরে কৈল আগমন॥ ধাইয়া গেল যত পরী ন রহিল আর। মানুষের বস্তি হৈল বসিল বাজার॥ যত জাইল্যা ধরে মাছ বেমান সাইগরে। শুকাইয়া লয় তাহা পরীদিয়ার চরে॥ শুকটী মাছের আড়াং হৈল বেব্স হৈল ভারি। পরীদিয়ার চরে আসে যতেক কারবারি॥ অঙ্গী হৈতে মাফো পাইল এই জাগার খবর। শুকটী মাছ বেচা যায়রে আধা আধি দর॥ ‘পরীদিয়া’র ‘লাউথ্যা’ শুকটীর বড় নাম ডাক। মাফো ভাবে কেমন করে পাইবে তার লাগ॥ নছররে ডাকি মাফো কহিলা জামাই। কেমন কৈরে পরীদিয়ার ভালা লাউথ্যা পাই॥ ভাবিয়া চিন্তিয়া নছর কহিল তখন। সেইচরে আমি তবে করিব গমন॥ দহিনালী ও বয়ার পাইলে বার দিনের পাড়ি। মাসেকের মধ্যে আমি ফিরি আইস্যুম বাড়ী॥ ‘এখিনের’ কাছে যাইয়া কহিল নছর। মাসেকের লাগি যাইয়ম পরীদিয়ার চর॥ কন দুঃখ ন করিও আসিব ফিরিয়া। হাসিয়া কহিল এখিন—“ন করিও বিয়া॥” (১-২৬) ( ১১ ) দহিনালী হাবা বয় মাঘমাসের শেষ। অঙ্গী সহর হৈতে নছর আসে উত্তর দেশ॥ বাইশ পালের ছুলুপ সে হাঙ্কারিয়া যায়। ছুয়ানী লস্কর যত বাইছার সারিগায়॥ উত্তর মিক্যা আইয়ের জাহাজ ডানদিকেতে কূল। রঙ বেরঙের পাইখ দেখা যায় রঙ বেরঙের ফুল॥ বেমান দরিয়ার বামে মাঝে মাঝে চর। সেই চরেত স্নাইরকলের বন দেখাইতে মনোহর॥ ঝরি ঝরি পড়ে নাইরকল মাইনসে নাহি খায়। লাখে লাখে ফেনার মতন ভাসে দরিয়ায়॥ কন চরে ধূধূ বালু নাইরে কন গাছ। হাজারে বিজারে তায় কুমীরের বাস॥ মস্ত মস্ত আণ্ডা পাড়ি বালু ঝাপাই দিয়া। চাহিরেয়ে মেদী কুমীর উপরে বসিয়া॥ আরো কিছু পছিমেতে আছে এক চর। বেশুমার হাপ থাকে নাম কালন্দর॥ পেরাবনে বাঘ ভাল্লুক কত জানোয়ার। এক চরর খুন আর এক চরৎ হাঁছুরি হয় পার॥ কত চর কত বস্তি দেখিয়া দেখিয়া। নছরের ছুলুপ আইসের পক্ষী উড়া দিয়া॥ বার দিনের পন্থ তারা আইল ছয় দিনে। পরীদিয়া আসি নছর ভালা ‘লাউথ্যা’ কিনে॥ বোঝাই করিয়া জাহাজ ভাবিল নছর। উল্টা বয়ারে চলা হবে যে দুষ্কর॥ ভাবিয়া চিন্তিয়া মালুম কিনা কাম করে। ছুয়ানীরে কইল “বাইছা দিবা যে উত্তরে॥” তিনদিনের পন্থ আসি করিল লঙ্গর। মাঝির গাঁও গেরামের মাঝে গেল যে নছর॥ (১-২৮) নছুর চলিয়া আইল হায়দরের বাড়ি। শ্বশুর মরিয়া গেছে, আছে শাশুড়ি॥ পাড়ায় পাড়ায় বুড়ী ভিক্ষা মাঙ্গি খায়। বেগর খাওনে রৈলে কেহ ন জিগায়’॥ ছানি নাই বেড়া নাই ভাঙা সেই ঘর। আমিনা যে কন্তে গেইয়ে ভাবিল নছুর॥ বারমাস্যা বাইয়ন গাছ ফুইট্রে বাইয়ন ফুল। ভাঙা ঘরৎ বসি নছুর ভাবিয়া আকুল॥ বেলর মতন বেল চলি যায় কেহতন আইল। নছুর ভাবের—কেন আইলাম কন ভুতে যে পাইল॥ পরদেশে পরবাসে আমি না করিলাম মনে। লানছনে হৈল যে তারা আমার কারণে॥ আমিনারা কত কথা মনৎ উডিল তার। চোগর পানি বুগৎ পড়ি গড়াইয় গড়ায় যার॥ ন আইল ন আইল কেহ আঁধার হইয়া গেল। বাহির হইল নছুর বুগৎ লৈয়া ছেল॥ হাটে আসি এক ঘরে হৈল মোছাফির। একে একে যত কথা হইল বাহির॥ দুনিয়ার মাঝারে জাইন্য বিচার আচার নাই। নানান কথা কৈল মাইনসে জোড়াই তাড়াই ॥ কৈল তারা-আমিনার ছিল বেশ্যামতি। তাইয়ৈ লৈয়া মাবাপের যতেক দুর্গতি॥ তারারে ফেলাইয়া শেষে বজ্জাত সে মাইয়া। লোভৎ পড়ি কন দেশেতে গেইয়ে যে ধাইয়া ॥ কাঁদিয়া মরিল সেই বুড়া হায়দর। মাড়িতে পড়িয়া বুড়ী কৈল্প ধড়ফড় ॥ শুনিয়া এসব কথা নছর মালুম। দানাপানি ন খাইলরে ন গেলরে ঘুম ॥ ( ১৩ ) বাড়িল হাবার জোের ফাউন মাস্তাদিন। মোকামে ফিরিতে নছর করিল একিন ॥ দাড়ি মাল্লা কৈল্প মানা ন শুনিল কাণে। আউনে পড়ে যে ফেরুঙ নছিবের টানে ॥ বাহির দরেয়ায় যখন আসিল ছুলুপ। ঝাপটাইন্যা বয়ারে পড়ি হৈল ডুপ ডুপ ॥ একেত জোয়ারের ঠেলা জোরে বয় হাওয়া। হইল বিষম দায় দহিন মিক্যা যাওয়া ॥ আচমানে ডাকিল ডেয়া চমকে বিজলি। আইয়ের কালা কালা মেঘ দেওর মত চলি ॥ দাড়ি মাল্লা কাঁদি উদিল ছুয়ানী টেঙুল। ক্রমে ক্রমে বাড়ি যার গই হাবার বলাবল ॥ আচমানের অবস্থা দেখি মাথা নাহি থির। কেরামত করে বুঝি খোয়াজ খিজির ॥ নছর মালুম যাইয়া ধরিল ছুয়ান। সাইগরে উঠিছে ঢেউ মুড়ার সমান ॥ দুই দিকে জুড়ি ঢেউ আসে লহরিয়া। দাড়ি মাল্লা কাঁদি উড়িল বেনালে পড়িয়া॥ বদরের নামে কেহ ছিন্নি মানস করে। গুড়াগাড়ার ১ লাগি কেহ মাথা থাবাই মরে॥ সোর ২ চিক্কির ৩ মারি কেহ করে ধড়ফড়। ন দেখিলাম মাও বাপ ভাই বেরাদর॥ জানের পেয়ারা বিবির ৪ ন পাইলামরে দেখা। দরেয়ায় মউত ৫ ছিল নছিবেতে লেখা॥ গাঁজাখোরের সঙ্গে পড়ি খাইলাম বুঝি গাঁজা। ন পাইলাম গোর কাফন ন পাইলাম জানাজা॥ ছুড়িল পালের রশি ভাঙ্গিল মাস্তুল। জাহাজের মাঝে তখন পড়ে হুলুস্থুল॥ ছুডিল ছুডিল জাহাজ বাতাসের জোরে। এক্ই বারে লাগিলু গিয়া ‘গোবধ্যার’ চরে॥ পরছিম সাইগরে তখন কি কাম হইত। হার্ম্মাগ্যারা নুকানারা ৬ লুডিয়া লইত॥ টৈয়া পৈছা ৭ ধন দৌলত নিত সব কাড়ি। তেরিমেরী ৮ করিলেরে মাথাৎ দিত বাড়ি॥ বেনাম দরিয়ার মাঝে হার্ম্মাগ্যার ডর। চলিত ছুলুপ তাই করিয়া বহর॥ লাডি সোডা ছেল বল্লম কত কইব আর। বারুদ বন্দুক লৈত যত হাতিয়ার॥ কাঁইচার দক্ষিণ মুখে দিয়াঙ্গার পারি। সেইখান হইতে বাইছা দিত বদর শুমারি ॥ এ হেন সময়ে হায়রে কি কাম হইল। নছরের ছুলুপ আসি চরেতে ঠেঁকিল ॥ ‘গোবধ্যের’ চর সেই বড় বিষম জাগা। কত শত মাঝি মালুম পাইয়ে কত দাগা ॥ ঝড় তুফান থামি গেইয়ে ভাট্যাল বয়ার। ভাডার পানি গেইয়ে লামি রাইতর অন্ধকার ॥ ধূ ধূ বালুর চর সেই নাইরে এক গাছ খের। কনদিকদি যাইব নছর ন পার যে টের ॥ বালুর উযর উইট্টে ছুলুপ ন লড়ে ন চড়ে। পানি ন বাড়িলে হায় লামায় কেমন কৈরে ॥ ফজরে জোয়ার হৈব সেই আশাতে তারা। দুরফু রাইত বসি রৈল দিয়া যে পাহারা ॥ পাহারায় রৈল তারা খানাপিনা ছাড়ি। ভাইব্ত লায়িল কনমিক্যাদি কন্তে দিব পাড়ি রাইত আর নাইরে বাকী আচ্মান হৈয়ে ছাপ। পছিম দিকদি হার্ম্ম্যারা দিয়া বইস্থে থাপ ॥ গাওর চিলে ডাক মারিল সুরুজ উডের পুবে। ধীরে ধীরে আসি জোয়ার বালুচর ডুবে ॥ দূরে থাকি ডাকুর দল দূরমি ধরি চায়। দেখিয়া নছর মালুম করে হায়রে হায় ॥ দশবারজন আইলো তারা কালা জঙ্গি পরি। কারো গায় লালকোর্ত্তি মাথাতে পাগড়ি॥ কোমরেতে তলোয়ার হাতেতে বন্দুক। ছরদ ১ হইয়া গেল নছরের বুক॥ দাড়ি মাল্লা ছিল যত ছুয়ানি টেঙুল। হাত পা লাড়িতে তারার গায়ৎ নাইরে বল॥ ছুলুপে উড়িয়া ডাকু কিনা কাম করে। নছর মালুমের পরথম গলা চাবি ২ ধরে॥ গলা চাবি ধরি পরে মারিল চোয়ার। ডেরার ৩ মুখে পড়ি নছর করে হাহাকার॥ ছুয়ানী টেঙুল আদি ছিল যতজন। হেরে হেরে ৪ পেলাই রৈয়ে দেখে ডাকুগণ॥ একে একে সকলের বাঁধি হাত পাও। হার্ম্যাদ্যার নুকার মাঝে করিলা চড়াও॥ সিন্দুক খুলিয়া তারা পাইল বহুধন। বর্ম্মাদেশের সোণা পাইয়া খুসী হইল মন॥ পুড়ান্যা ৫ হইল জোয়ার ফুলি উডিল পানি। চরর থূণ ৬ নামাইল ছুলুপ ডাকাইতেরা টানি॥ ভিজা ‘লাউথ্যা’ ৭ পাইয়ে রৈদ ৮ বদ্ব ৯ উডের ভারি। শত শত গাভ কৈতরে লই যার ঝাপ্টা মারি॥ আঁয়াসের হক্কুন আইণ্যে আরো গাওর চিল। লাউথ্যা শুকটীর বেসাদ লইয়া ফেসাদ বাজিল নছরের ছুলুপ আর যত মাল ছিল। সকলি লইয়া ডাকু মোকামে চলিল॥ ( ১৪ ) আমিনার কথা এখন শুন কিছু কহি। খায় সুখে গফুরের মহব্বত লই॥ মরি গেইয়ে গুজা বুড়ী আর কেহ নাই ঘরে। ধর্ম্মের কইন্যার লাগি গফুর ভাবি ভাবি মরে॥ আমি যদি নাই থাকি কি হৈব উপায়। ধন দৌলত জাগা জমিন কনে চাইব হায়॥ ভাবিয়া চিন্তিয়া বুড়ো স্থির কৈল মন। আমিনারে ডাকি আনি কহিল তখন॥ তুিমত ধর্ম্মের কন্যা আমি ধর্ম্মের বাপ। এককথার লাগিয়া রে মনে বড় তাপ॥ জাগা-জমিন ধন দৌলত খাইবরে কনে। তোমাকে মা সাদি দিতে করিয়াছি মনে॥ এই যে দুনিয়া জাইন্য বড় ঠগের মেলা। ধনদোলত লৈয়া কেমনে থাকিবা একেলা॥ শুনগো ধর্ম্মের কইন্যা মোর কথা ধর। ভালা দুলা দিব আনি ফিরতূন সাদি কর॥ সাতবছর যার কোন ওয়াকিব ১ নাই। আর কদ্দিন বসিয়া তুমি থাকিবা তার লাই ২ ॥ কামিনের সরামতে হৈয়াছে তেলাক ৩ । শুনগো ধর্ম্মের কন্যা মোর কথা রাখ ॥ কয়বরে ডাকিছে মোরে শুন আমার মাও। কবুল জোয়াব দিয়া একিন পুরাও ॥ গফুরের কথা শুনি আমিনা সোন্দরী। বলিতে লাগিল কথা দোন পায়ত ধরি ॥ শুনগো ধর্ম্মের বাপ শুন আমার বাণী। তিয়াস ৪ নাই যে বুকে আর ন পিয়ম পানি ॥ মাবাপরে ছাড়ি আইলাম ছাইড়লাম বাড়ীঘর। সাদি দিতে চাইল বলি মাবাপ হৈল পর ॥ শুনগো ধর্ম্মের বাপ ধরি তোমার পাও। অভাগিনীর ভাঙাবুকে আর না দিয়ো ঘাও ॥ কইন্যার মন বুঝি গফুর আর কিছু না কৈল। লাঙল জুয়াল কাঁধৎ লৈয়া ঘরর বাহির হৈল ॥ বুড়া খেতিয়াল গফুর করে হাল চাষ। নানান জাতর নানান ক্ষেতি পায় বার মাস ॥ (১–৩৪) ( ১৫ ) গোপ্ত কথা কহি শুন একে একে সব। বানাউটি ৫ নহে ইহা---নহে মিছা গব ৬ ॥ অরাজক হৈল দেশে জঙ্গ ১ হৈল ভারি। দহিন মিক্যা ধাইয়ে মগ বাড়ীঘর ছাড়ি ॥ সোণারূপা ধনদৌলত মাডিতে গাড়িয়া। দহিন মিক্যা ধাইয়ে মগ চাঁডিগা ছাড়িয়া ॥ এক রাত্রি কি হইল শুন বিবরণ। গফুরের বাড়ীতে মগ দিলা দরশন ॥ এক ছাড়া ভিঁডা ২ আছে বাড়ীর উতরে। মগেরা আসিয়া সেই ছাড়া ভিঁডা কোড়ে ॥ দেখিয়া গফুর ক্ষ্যেত্যাল কি কাম করিল। লাডি চোডা হাতৎ লৈয়। ঘরর বাহির হৈল ॥ আমিনারে ডাকিয়ারে করে সাবধান। আজুয়। ৩ মগের হাতে হারাইলাম জান ॥ পোলাইয়া ৪ থাকরে মা মোচার ৫ উন্নর উডি। মগে যদি জাইন্তে পারে নিব তোমায় লুডি ৬ ॥ আশীবছরের বুড়া পাক্কাই পাক্কাই পড়ে ৭। আমিনা উডিল গিয়া মোচার উয়রে ॥ ধীরে ধীরে আইলো বুড়া লাডিট দিয়া ভর। মগে বলে—কেন বুড়া মিছা কর ডর ॥ বাপদাদার ভিঁডা ইহা এইখানে আমি। ছোডকালে খেইল্লাম কত মার কোলর খুন নামি ॥ বার ঘড়া সোণার মোহর ভিঁডার মাঝে রাখি। গেরাম ছাড়িয়া এখন নানার বাড়ীৎ থাকি ॥ বলিতে বলিতে মাডি কুড়িতে লাগিল। বার ঘড়া সোণার মোহর তুলিয়া আনিল ॥ বুড়ারে কহিল তারা লও দুই ঘড়া। এতদিন এই ধন দিয়াছ পাহারা ॥ পাইল বুড়া দুই ঘড়া সোণার মোহর। রাইতে রাইতে ধাইল রে মগ না হৈতে ফজর ১ ॥ আমিনার কাছে আনি পিতলের ঘড়া। ঢালিয়া দেখিল গফুর মোহরেতে ভরা ॥ হাপুতায় ২ পাইলে পুত বুগত বাজায়। নিধনীরে পাইলে ধন টিবিটিবি চায় ॥ বাপে ঝিয়ে যুক্তি করি কি কাম করিল। দোন ঘড়া সোণার মোহর মাড়িতে গাড়িল ॥ এইরূপে কিছুদিন হৈল গোজারণ ৩। গফুরের উপরে দিল মউতে ৪ ছমন ৫ ॥ সময় ফুরাইয়া গেছে নাই বেশী দিন। আমিনারে ডাকি গফুর জানাইল একিন ॥ শুনগো ধর্ম্মের কইন্যা শুন আমার বাত। আমার মিক্যা একবার বাড়াওরে হাত ॥ হাতে হাত দিল কইন্যা দোন চোগৎ পানি। বুড়া গফুর আমিনারে কাছে লৈল টানি ॥ শুনগো ধর্ম্মের কইন্যা শুন আমার মাও। কাঁদিয়া কেনরে তুমি আমারে কাঁদাও ॥ ন কাইন্দ ন কাইন্দ কইন্যা ন কান্দিয়ো আর। আমার যত ধনদৌলত সকলি তোমার ॥ আমাত ১ হইল গফুর হৈল চোগ খাড়ি। পাড়াল্যা মানুষে মিলি দিল তারে মাডি ২ ॥ ধর্ম্মের বাপের লাগি কাঁদে আমিনা সোন্দরী। কন্তে তুমি যাওরে বাপ আমারে পাসরি ॥ এতদিন ভুলিছিলাম আছল ৩ বাপ মাও। একেলা ফেলিয়া মোরে এখন কন্তে ৪ যাও॥ যেই গাছ ধরি আমি অভাগিনী নারী। দারুণ তুফানে সেই গাছ ফেলে যে উফারি ॥ ৫ বাপর ঘরৎ জন্ম লৈয়া ন পাইলাম রে সুখ। তুমি আরো ভাঙি দিলা আমার ভাঙা বুক ॥ এইরূপে কাঁদি কাডি দুই মাস যায়। আমিনার উপরে কুদিন ফেলাইল আল্লায় ॥ (১—৬০) (১৬) মাঝির গাঁও গেরাম হৈতে এছাক দুষমন। ভালামতে জানিলরে সব বিবরণ ॥ জানিয়া শুনিয়া এছাক কিনা কাম করে। এক্কৈবারে চলি আইল বুড়ীর গোচরে ॥ বুড়ী সেই আমিনার মা ভিক্ষা মাঙ্গি খায়। হাবিজাবি ৬ কথা তারে এছাক বুঝায় ॥ বুড়ীরে দায়দ ৭ করি সঙ্গেতে আনিল। আপনার বাড়ীৎ গিয়া খানাপিনা দিল ॥ ভালাভাল চ্যালন ১ দিল দুধ আর দই। দুই আক্ত খাইয়া বুড়ী দড় হই যারগই ২॥ এইরূপ খোরা ৩ দিন গেল গোজারিয়া। বুড়ীরে রাখিল এছাক তাজিম ৪ করিয়া ॥ আমিনা সোন্দরীর কথা তুলি একদিন। কত গব ৫ মারে এছাক রঙিন রঙিন ॥ বুড়ী বলে—শুনরে বাপ্ তাইরে দেইখতে চাই। লৈয়া আস আমিনারে তুমি একবার যাই ॥ এছাক বলিল—বুড়ী কেন কর ভুল। দরেয়া সাঁছুরি ৬ আমি ন পাইলামরে কূল ॥ আমি গেলে আমিনার হবে বড় রোষ। তাহার বেগানা ৭ হৈলাম নছিবের দোষ ॥” এইরূপে নানা কথা কহিয়া এছাক। ফন্দিমতে বুড়ীরে করিল ঠিক ঠাক ॥ হাঁজর ৮ বাত্তি ঘরে দিল আমিনা সোন্দরী। এ সমে ৯ নাইয়রী আইল মাহাফায় ১০ চড়ি ॥ কন আইল কন আইল বলি ভাবি মনে মনে। ধীরে ধীরে আইল কইন্যা বাহিরের উডানে ১১ ॥ মা বলিয়া বুড়ি তারে যখন ডাক দিল। আমিনা আসিয়া মারে বেড়াঁই ধরিল ॥ অঝোরে ঝরিল তার দুই নয়ানের পানি। চিয়নির ১২ উপরে মারে বসাইল আনি ॥_ বাপের মউতের কথা আরো মায়ের দুঃখ। শুনি অভাগিনী কইন্যার ফাড়ি গেলগই বুক॥ একে একে শুনি আরো যতেক খবর। আমিনা যে সারা রাইত কৈল ধড়ফড়॥ ফজরে উডিয়া বুড়ী খাইল থানাপিনা। বড় তরাজন ১ তারে করিলা আমিনা॥ বুড়ী বলে,—শুন কইন্যা আমার কথা ধর। মাঝির গাঁও গেরামে যাইয়া ফিরি বস্তি ২ কর॥ এক্লা ঘরে থাক তুমি ভালা নহে কাম। ফিরি চল যাই আবার আপনার মোকাম॥ আমিনা কহিল—মাগো ধরি তোমার পাও। কি খাইব যাইয়া মোরা সেই মাঝির গাঁও॥ খাইয়া দাইয়া বেচি ধান টাকা হয়রে জমা। মাঝির গাঁও গেরামে যাইয়া কি খাইব ওমা॥ আম পাই কাটাল ৩ পাই বারমাথ্যা ফল। কনে চাইব ৪ আমার এই গরু আর ছায়ল ৫॥ চাষকোরের ৬ কাম আছে গোলায় আছে ধান। চলি গেলে এই সব হৈবরে লানছান ৭॥ আমার সঙ্গে থাক তুমি ন যাইও আর। তোমার হাতে দিলাম তুলি সকল সংসার॥ খাওনের পরণের নাই টানথিজ ৮। পরাণে যাহা খোজে তুমি খাইও সেই চিজ ৯॥ বুড়ী রৈল কইন্যার ঘরে মন করি থির । মাঝির গাঁও হৈতে একদিন আইলো মোছাফির ॥ ফিসফিস্ কথা কহে বুড়ীরে গোপনে। কি যুক্তি করিছে তারা আমিনা ন জানে ॥ খাইয়া দাইয়া মোছাফির হইল বিদায়। রাতুয়ার কথা কহি শুন সমুদায় ॥ আমিনা সোন্দরী যখন ঘুমে অচেতন। দুয়ার খুলিয়া বুড়ী দিলরে তখন ॥ তিনজন আসি তারা সামাইল ঘরে। পরথমে বাঁধিল মুখ হাত তার পরে ॥ তার পরে পা বাঁধিয়া কি কাম করিল। আমিনারে কাঁদৎ লৈয়া ঘরের বাহির হৈল ॥ কাঁদিতে ন পারে কইন্যা লড়িতে ন পারে। যাইবার কালে একবার চাইল গুণর মারে ॥ হায়রে দুনিয়াদারী কন্তে পাইবা সুখ। পাথরের মত দড় হৈয়ে মায়ের বুক ॥ ন বুঝিলা আমিনার মা কি করিলা কাম। কাঞ্চাসোনা বেচিয়ারে পাইলা কাঁচর দাম ॥ সরেঙ্গা নুকা যে এক ঘাটে বাঁধা ছিল। আমিনারে আনি তারা নুকাতে তুলিল ॥ তুলিয়া নুকার মাঝে খুলি দিলা বান । বুক কুডি কুডি কইন্যা করে আনছান ॥ ছোড় ছোড় খাল বাইয়া একদিনের পর। মাঝির গাঁও গেরাম তারা আইল বরাবর॥ কইন্যারে লইয়া তারা কিনা কাম করে। দাখিল করিল নিয়া এছাকের গোচরে॥ (১—৭৮) (১৭) এদিকে হইল কিবা শুন বিবরণ। নছররে কি করিল যত ডাকুগণ॥ সেইনা ছুলুপ আর ছিল যত মাল। বেচিয়া পাইল ডাকু টাকা টালে টাল’॥ পশ্চিম দিগেতে রাজ্য দরেয়ার শেষ। মাইনূসে মানুষ বেচি খায় আচানক দেশ॥ দাড়ি মাল্লা ছিল যত ছুয়ানী টেঙুল। সেই দেশেতে সকলবে বেচে ডাকুর দল ॥ নছররে বেচিয়ারে পাইল বহু দাম। হার্ম্মাদ্যারা চলি আইলো যে যার মোকাম॥ গোলাম হইয়া নছর যার বাড়ীতে ছিল। ছোড় একখান নুকা তারা নছররে দিল॥ হাট করে বাজার করে বোঝা লইয়া আনে। ছোড় নুকা লৈয়া নছর যায়রে স্থানে স্থানে॥ সুবুদ্ধি আছিল তার কুবুদ্ধি হইল। সেই নুকা লৈয়া নছর দেশে বাইছা দিল॥ ছোড় গাও ছাড়ি পাইল বেমান দরিয়া। ভাইবত লাগিল কনমিক্যাদি ২ যাইব পাড়ি দিয়া॥ জ্ঞানের লালছ ৩ তার নাহি ছিল হায়। বেমান সাইগরে নুকা ভাসি ভাসি যায়॥ এক দুই তিন করি গেল চাইর দিন। উয়াসে কায়াসে নছর হৈল বলহীন ॥ দোন হাত ফুলি গেইয়ে নাই চলে আর। কনমিক্যা ন দেখে যে কূল আর কিনার ॥ ঢেউয়ের উপরে নুকা ভাসি ভাসি যায়। ন ডুবিয়া রইয়ে কেমতে জানে যে আল্লায় ॥ সাইগরের জানোয়ার পাহাড়ের সমান। ‘হুমানুমি’ শব্দ করে যেনরে তুয়ান ॥ চোখে নাই দেখে নছর মাথা নাই থির। নুকাতে পড়িয়া জপে আল্লার জিকির ॥ জপিতে জপিতে নাম হইল বেহোঁস। এত কষ্ট পায় নছর নছিবের দোষ ॥ দরেয়ার পীর সেই খোয়াজ খিজির। শুনিল শুনিল যেন তাহার জিকির ॥ বড় বড় নুকা লৈয়া খাটাইয়া পাল। সারি গাইয়া যায়রে জাইল্যা বোসাইতে জাল ॥ মাঝ দরিয়ায় ছোড় নুকা ঢেউয়ের মাথাৎ খেলে। দেখি তারা ধীরে ধীরে নুকা ধরি ফেলে ॥ নছররে পাইয়া তারা তুলিয়া আনিল। পরাণ আছে কি নাই বুঝা নাই গেল ॥ মাথাৎ দিল ঠাণ্ডা পানি খাইতে দিল ডাব। খানিক বাদে ভাল হৈল নছরের ভাব ॥ কেহ কারো কথা নাই বুঝে কোন মতে। নছর দুঃখের কথা জানাইল ইঙ্গিতে ॥ ’ পুষূদ্দেশী’ ছুলুপ এক ধান বেচিয়া যায়। নছররে দিল জাইন্যা তারার জিম্মায় ॥ অঙ্গী সহরেতে মাফো ভাবিতে লাগিল। ‘বছরের মধ্যে নছর ঘরে ন ফিরিল ॥ পরীদিয়া পাঠাইলাম লাউখ্যার ২ কারণে। ফাকি দিয়া ধাইল বুঝি নিজের মোকামে ॥ উতরের কালা তারা বড় দাগাবাজ। এত টাকা দিলাম তারে না বুঝি আন্দাজ ৩ ॥ এই না ভাবিয়া মাফো কি কাম করিল। নছরের কারবারেতে যত মাল ছিল ॥ সব মালমাতা ৪ বেচি ভাঙ্গিল কারবার। ‘এখিন’ কন্যারে সাদি দিলারে আবার ॥ নছর ফিরিয়া আইল বছরের পরে। দূরে থাকি শুনি সব নাহি গেল ঘরে ॥ ভিংছা জাতি ৫ হয় তারা গলাৎ দিব ছুরি। অঙ্গী সহর হৈতে নছর ধাইল তাড়াতাড়ি ॥ “এখিন” কইন্যার আর ন চাহিল মুখ। খসম্ লইয়ে শুনিয়ারে ভাঙি গেল্গই বুক ॥ আবরু ইজ্জত নাই দিলেতে দরদ। ভিন্ন নাই ভাবে তারা বেগানা মরদ ॥ পিরিতির মর্ম্ম নাহি জানে এই জাত। চৈয়া পৈছা পাইলে পিরিত ন পাইলে ফজ্জাত ূ দিলরে করিয়া ছাপ মালুম নছর। এক্কৈবারে ছাড়ি আইল ভিংছার সহর ॥ নছিবেতে দুঃখ তার খেলিছে আল্লায়। পাগলের মত হৈল নানান চিন্তায় ॥ টেঁয়া নাই পৈছাঁ নাই পন্থের ভিখারী। দুনিয়াতে কেহ নাই নাইরে ঘরবাড়ী ॥ উতর দেশে আসে নছর ঘুরিয়া ফিরিয়া। কন দিন থাকে হায় গাছতলে পড়িয়া ॥ এক নিশাকালে নছর খোয়াব দেখিল। আমিনা আসিয়া যেন ছাম্নে খাড়া হৈল ॥ আমিনা আসিয়া যেন ছাম্নে হৈল খাড়া। দুই চোগে জ্বলে তার আসমানের তারা ॥ অঙ্গের বরণ তার যেন চাম্পা ফুল। সস্তিপনা রাইখ্যে কন্যা রাইখ্যে জাত কুল ॥ যৌবন কলসী সেই কিছু নহে উনা। কন দোষ নাই তার নাই কন ওনা ॥ বুকেতে দরদ তার মুখে মৃদু হাসি। এই ফুল ঝরা নহে, নহে ইহা বাসী ॥ খোয়াব দেখিয়া নছর খানিক ভাবিল। দেখিতে আমিনার মুখ একিন করিল ॥ আমিনারে লুডি আইন্যে এছাক দুষমন। নানারকম লোভ দেখায় কাড়ি নিত মন ॥ ন মানিল পোষ কইন্যা ন মানিল পোষ। জাঁহুরা ১ হাপের মত করে ফোঁস ফোঁস ॥ বৃধা ওঝার গুণ গেয়ান ফুসা ২ হৈয়া গেল। বরবাদ ৩ হইল কত মন্তর্ পড়া তেল ॥ দোয়। তাবিজ কৈল কত কৈল দারু টোনা ৪। আগুনে পুড়িলে ভাই চিনা যায় সোণা ॥ ছয়মাস গেল কইন্যার ন ভিজিল মন। শুন শুন কি করিল এছাক তখন ॥ দিন আর বাকী নাই পড়ি গেইয়ে বেল্। আমিনার কাছে এছাক ধীরে ধীরে গেল্ ॥ ধীরে ধীরে যাইয়া বলে—“শুনরে আমিনা। ছোড লোকের মাইয়া তুই বড়ই কমিনা ৫ ॥ আমার ঘরেতে তোর নাই আর জাগা। বড় পেরেসান ৬ দিলি পাইলাম বড় দাগা ॥ জল্দি করি যারে চলি ন থাকিস্ আর। বড় গোম্বা ৭ হৈয়ে ‘মেমা’ বিবিজান আমার ॥ বাহির করিয়া দিব চুলৎ ধরি টানি। আমার ঘরে ন পাইবি ভাত আর পানি॥” শুনি এছাকের কথা আমিনার দিল্। ধুমাইয়া ধুমাইয়া জ্বলিতে লাগিল্ ॥ বাহির হইল কইন্যা চোগৎ লৈয়া পানি। বাপের বাড়ি আসি দেখে ঘরৎ নাহি ছানি ॥ ঘরৎ নাহি ছানি আর ভাঙা ভাঙা বেড়া। রাতুয়া হিয়াল থাকে, আবর্জ্জনা ভরা॥ কেমনে ঘুমায় কইন্যা নাইরে দুয়ার। সারা রাইত বসি রইল এক কোণে তার॥ আধা রাইতে আচমানেতে উইট্যে সোণার চান। এছাকের মাথায় বিষ আনছান পরাণ॥ একলা ঘরে আছে কইন্যা জানেরে দুষমন। আরজু পুরাইতে আইলো পশুর মতন॥ গুমরি বসিয়া কইন্যা ঘরের কোণায়। দেখিল এছাক আঙ্গে হৈল বিষম দায়॥ হরিণীরে পাইয়ে বাঘ ধরিবে কামড়ি। এমনি কালে ভাঙা ঘর কাঁপে থরথরি॥ নছর লইয়া এক বাঁশর টুনিহারি। এছাকের মাথাৎ দিল মস্ত বড় বাড়ি॥ জোন পহর উইট্যে ভাল দক্ষিণালী বায়। আমিনা বেড়াই ধৈল নছরের গলায়॥ কথাবার্তা নাই তারার চোগৎ বহে পানি। নছরের পিন্ধনেতে ছিড়া একখান কানি॥ বেগর খাওনে তার শুকায় গেইয়ে মুখ। দেখিয়া আমিনা কইন্যার ফাড়ি যার গই বুক॥ মাথার চুল দিয়া কইন্যা লইল নিছনি। “কেমনে ছিলা ভুলি মোরে আমার নয়ন-মণি ॥” কিছু ন কহিল নছর ন কহিল কিছু। ঘরর বাহির হৈয়া গেল কইন্যার পিছু পিছু ॥ (১-৪৮)