পীর বাতাসী

প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা - চতুর্থ খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন

পীর বাতাসী বন্দনা বন্দুম পীর বন্দুম ছাহেব গাজিরে বল হায় মুরলী হায়রে পীর বন্দুম ছাহেব গাজিরে। পরথমে বন্দনা গো করলাম আল্লা নিরঞ্জন। বন্দুম পীর⋯⋯⋯⋯⋯ দ্বিতীয়ে বন্দনা গো করলাম মাও বাপের চরণ। বন্দুম পীর⋯⋯⋯⋯⋯ তিতিয়ে বন্দনা গো করলাম ওস্তাদ বড় পীর। বন্দুম পীর⋯⋯⋯⋯⋯ চারকোণা পিরথিমী বইন্দা মন করিলাম থির। বন্দুম পীর⋯⋯⋯⋯⋯ সভাজনে বন্দিয়া ভাই হিন্দু মুসলমান। বন্দুম পীর⋯⋯⋯⋯⋯ মক্কা মদীনা বন্দুলাম কাশী গয়া থান। বন্দুম⋯⋯⋯⋯⋯⋯⋯⋯ আর বন্দুলাম পার বন্দুলাম সমুদ্র সায়র। জিন্দা স্থানে বন্দি আইলাম ছায়ব আলীর কয়বর বন্দুম⋯⋯⋯⋯⋯⋯⋯⋯ হিমালী পর্ব্বত বন্দি গাই বেবাকের বড়। আসর বন্দিয়া আমি মন করিলাম দড়॥ বন্দুম⋯⋯⋯⋯⋯⋯⋯⋯ আসন থাইক্যা জিন্দাগাজী মোরে দেউখাইন ১ বর। তাল মান নাইসে জানি সদা মনে ডর॥ বন্দুম… আরবার বন্দিয়া গাই সভার চরণ। বন্দনা করিয়া ইতি পালা আরম্ভন॥ ২৬ ( পালা আরম্ভ ) ( ১ ) আস্তের কাহিনী কথা শুন মন দিয়া। জন্ম লইল বিনাথ জন্মদুংখী হইয়া॥ একমাস দুইমাস তিনমাস যায়। মায়ের কোলেতে বিনাথ শুইয়া নিদ্রা যায়॥ চারি পাঁচ ছয়রে মাস এহি রূপে গেল। সাত মাসেতে বিনাথ বাপে হারাইল॥ শাইল ক্ষেতের দাম ছারিতে ২ বাপে খাইল শাপে। আভাগিনী মাও কান্দে পড়িয়া বিপাকে॥ বেমান সংসার মাঝে আর বন্ধু নাই। কোলের না কাঞ্চন ছাওয়াল কেমনে বাঁচাই॥ বাইরে রোজগাড়ী নাইরে পেটে নাই অন্ন। অঙ্গের বসন খানি সেও হইল ছিন্ন॥ চিরা তেনা ৩ দিয়া মায় বিনাথে ঢাকিল। মায়ের চোখে পানি দরিয়া ভাসিল॥ হায় ভাবিয়া চিন্তিয়া মায় কোন্ কাম করে। গাও গেরামে চান্দ মোরাল গেল তার ঘরে॥ বড় ধনী চান্দ মোরাল ক্ষমতা অপার। ছাওয়াল কোলে লইয়া মায় গেল বাড়ী তার। বায়াকুটি ১ রাইন্দা তার বিনাথে পালিল। এহি মতে বিনাথ তবে ছয় বৎসরের অইল॥ দুঃখের কপাল বিনাথ সুখ কোথা পায়। সাত না বছর কালে হারাইল মায়॥ মাটিতে লুটাইয়ে বিনাথ কান্দে মায়ের লাগিয়া। এইমন দরদী মাও গেলা গো ছাড়িয়া॥ গায়ে যদি কুটা গো বালি মায় ঝাইরা লইত কোলে। হেন মাও অভাগারে কোথায় ছাইরা গেলে॥ চৌদিকে চাহিয়া দেখি আপন কেহ নাই। সংসারে কে সুহৃদ্ আছে গো কই গিয়া দাড়াই॥ চাঁদের বাড়ীতে বিনাথ করে গরুর রাখালী। কিছু কিছু কইরা বিনাথ দুঃখু যায়রে ভুলি॥ কাটিয়া মরাল বাঁশ বিনাথ বাঁশী বানাইল। দেখিতে শুনিতে তার কুড়ি বছর হইল॥ ওস্তাদ ধরিয়া বিনাথ বাঁশীর গান শিখে। চান্দের জননীরে বিনাথ মা বলিয়া ডাকে॥ সুজন্তী তাদের কন্যা চান্দের সমান। এইমত সুন্দরী কন্যা নাইসে তিরভুবন॥ পুষ্প যেমন হেল্যা পড়ে পবনার বায়। হালিয়া নাচিয়া কন্যার বার বছর যায়॥ ঢলুম ঢলুম ১ মুখখানি কন্যার চিরল ২ দাঁতের হাসি। এরে দেখ্যা বাইজ্যা উঠে বিনাথের বাঁশী॥ ৪০ ( ২ ) এমন সময় হইল কিবা শুন দিয়া মন। চান্দ ব্যাপারী যাইব বাণিজ্য কারণ॥ ভাবিয়া চিন্তিয়া চঁাদ কোন কাম করিল। একেলা বিনাথে তবে সঙ্গেত লইল॥ বার নাও তের পানসী ধানেত বুঝাইয়া। উত্তর ময়ালে চলে ডিঙ্গা ভাসাইয়া॥ গাঙ্গের বাঁকে কেওয়া ফুল রৈয়া রৈয়া ফুটে। কত নারী ছান করে গাঙ্গির ঘাটে ঘাটে॥ কত নাইয়া নাও বাহিয়া যায়রে দূরের পানে। এমন সুন্দর বিনাথ না দেখছে নয়ানে॥ দেখিয়া শুনিয়া বিনাথ বাঁশীতে মাইল টান। ভাটি ছিল চিলা গাঙ্গরে বাহিল উজান॥ কাঙ্কের না ভরা কলসী নামাইয়া জমিনে। ভিজা বসনে নারী বাঁশীর গান শুনে॥ কেবা যাওরে বাঁশের বাঁশী মোরে যাওরে কৈয়া। এইখানে লাগুক ডিঙ্গা খানেক দাড়াইয়া॥ পাইয়া নবীন পাল উত্তরাল বাতাসে। ছুটিল চান্দের নাও বাণিজ্যের আসে॥ ছয় মাসের পথ সাধু একুদিনে যায়। চিলা যেমুন আসমানেতে উড়িয়া পলায়॥ তের বাঁক পানি বাইয়া কংসনদী ধরে। এইখানে গিয়া সাধু ডিঙ্গা কাছি করে১ ॥ সাতদিনের পন্তরে বাইয়া নারয়ী মুলুক। এইখানে পৌঁছিলে নাও সাধু পাইবে সুখ ॥ এন কালেতে হইল কিবা শুুন দিয়া মন। রাত্রি নিশাকালে শুন দেয়ার গরজন॥ মেঘেতে আসমান ছাইল তুফান হইল ভারী। কতেক পানসীর দেখ কাছি লইল ছিড়ি॥ সূতের মুখেতে যেমুন জলুইর কুটা ভাসে। বিনাথে ভাসাইয়া নিল কংসনদীর পাকে। বিনাথের কথা ভালা এইখানে থৈয়া॥ সুমাই ওঝার কথা শুন মন দিয়া। ৩২ ( ৩ ) ভেউর ২ জঙ্গলা দেখ কংস নদীর পারে। সেইখানে সুমাই ওঝা বসতি না করে ॥ মানুষের গতাগম্ব সদাকালে নাই। আবশ্য পড়িলে লোকে ওঝারে বিছুড়াই ৩ ॥ নানা মন্তর জানে বেটা জ্ঞানে বিহস্পতি। ঔষধ মন্ত্রের জোরে বনেত বসতি ॥ মন্ত্র পড়া পঞ্চ না কড়ি আছে তার খানে। জঙ্গলার যত সপ্প সকল ধইরা আনে ॥ কেউটা রোখা বর্মজাল নোওয়ায় দেইখ্যা মাথা। বনের বিরূক ওঝার দেখ মাথায় ধরে ছাতা ॥ খরম পায় হাটে ওঝা নদীর না পাকে। রাজা বাদ্সা নাগাল নাই সে পায়রে তাহাকে॥ কড়ি চালনা দিয়া দেখ সর্প ধইরা আনে। ছয় মাসের মরা জিয়ায় ঔষধের গুণে॥ বাতাসী ওঝার মাইয়া পাল্যা করছে বড়। ওঝার সহিত থাকে বনের ভিতর॥ দেখিতে সুন্দর কন্যা বনের হরিণী। সর্পের মাথায় যেন জ্বলে দিব্য মণি॥ সিন্দুর মাথা ঠোট দুখানি কাজল মাথা আঁখি। এহি মত সুন্দর কন্যা কভু নাইসে দেখি॥ ২০ ( ৪ ) দৈবের নিবন্ধ কথা শুন্‌ দিয়া মন। সূতেত ভাসিয়া বিনাথ কইরাছে গমন॥ আছে কিনা আছে পরাণ বিধাতা সে জানে। দেখিয়া দৈচ্ছত ১ কন্যা পাইল পরাণে॥ বাপের আগে কয়ত খবর ঘন ঘন সূয়াস। সুন্দর কুমারের নাই সে জীবনের আশ॥ চান্দ যেমন ভাস্যা যায় কংস নদীর পাকে। কাহার কোলের যাদু পড়িল বিপাকে॥ উবু হইয়া আউল কেশ মাটিত লুটায়। ওঝার পিছনে কন্যা পাগলিনী প্রায়॥ তবেত সূমাই ওঝা কোন্ কাম করিল। মরার মতন বিনাথেরে টানিয়া ধরিল॥ দুইজনে ধরাধরি বিনাথের লইয়া। জঙ্গলার ঘরে গেল বড় দুঃখ পাইয়া ॥ ঝর ঝর বাতাসীর দুই চক্ষু ঝরে। পরের লাগিয়া কন্যা কাইন্দা কেন বা মরে ॥ শেষেতে শুয়াইয়া ওঝা কোন্ কাম করিল। ভেউর জঙ্গলার মধ্যে পরবেশ করিল ॥ কহিয়া গেল কইন্যা তুমি বইস লো শিয়রে। যতক্ষণ ঔষধ লইয়া নাহি ফিরি ঘরে ॥ শিয়রে বসিয়া কন্যা এক দিষ্টে চায়। আছে কিনা আছে পরাণ বুঝা নাই গো যায় ॥ কাহার কোলের পুত্র কেবা মাতা পিতা। আঞ্চল ধরিয়া কন্যা মুছে চক্ষের পাতা ॥ ঘর আইন্ধাইর বাড়ীরে আইন্ধার এমন কইরা হায়। এহারে ভাসাই ঘরে কেমনে আছে মায় ॥ ডাকিতে ডুকুরে কন্যা নাম নাই সে জানে ১। হেনকালে আইল ওঝা তার বির্দ্দমানে ॥ “শুন শুন বাতােসী কন্যা কহিয়ে তোমারে। ঔষধ বাটিয়া শীঘ্র আনহ ত্বরিতে ॥” ধুইয়া মুছিয়া কন্যা শিল পাটা লইল। বাপের দেওয়া ওষুধ খানি নিষ্পেশ বাটিল ॥ মন্ত্র পড়িয়া সুমাই অসুধ খাওয়ায়। কিছু কিছু আছে পরাণ যেন বুঝা যায় ॥ কিছু কিছু সুরে সুয়াস আশার মতন। তবে ওঝা স্মরণ করে ওস্তাদের চরণ॥ নয়ন মেলিয়া বিনাধ চারিদিকে চায়। আপনার জন কেউ দেখা নাই সে পায়॥ স্বপ্নের মতন যেমন দেখিতে লাগিল। বাতাসী কন্যার পানে চক্ষু তুইলা চাইল॥ লাজে রাঙা রক্ত না জবা কন্যা নোওয়াইল মাথা সরম ভরম কন্যার আগে ছিল কোথা॥ ৪২ ( ৫ ) এক দুই করি দেখ যায় তিন মাস। তবেত হইল তার জীবনের আশ॥ একতে একতে পড়ে মনে মা বাপের কথা। বনেত বসিবার আগে বসত ছিল কোথা॥ সেই দেশেত মাও নাই গর্ভ সোদর ভাই। দরদী বান্ধব নাই কোন্ দেশে বা যাই॥ একতে একতে পড়ে মনে বাকী বক্কা যত। কে মোরে আদর করব আপন মায়ের মত॥ একতে একতে মনে পড়ে সুজস্তী কন্যায়। সকল ভুলিল কন্যা বাতাসীর দায়॥ নগর থাক্যা বিজন ভালা আপন থাক্যা পর। ঘর থাক্যা বাহির ভালা আশায় করলো ভর॥ বাপ মরিল সর্পের বিষে তাও পড়িল মনে। মন্তুর শিখিব বিনাধ ওস্তাদের চরণে॥ ভাবিয়া চিন্তিয়া বিনাধ মন করিল থির। শুমাইরে মানিয়া লইল গুরু মন্ত্রের পীর॥ ১৬ ( ৬ ) (দিশা) পুষ্প তোরে কোন বিধি সিরজিল। বননী পাতার ঘরে কেন বা জন্ম দিলরে… পুষ্প তোরে… ॥ বনে থাক বনের ফুলরে মুখে মিষ্ট হাসি। কোন বিধাতা করলো লো কন্যা তোরে বনবাসী রে পুষ্প তোরে… ॥ বনে থাক সুন্দর কন্যা বনেলা হরিণী। একেলা ভরমন করলো সুন্দর কামিনীরে পুষ্প তোরে… ॥ ভমরে না পাইছে লাগাম মধু ভরা ভরা। একটি কথা শুন কন্যা সামনে থাক্যা খাড়ালো পুষ্প তোরে… ॥ কেবা তোমার মাতা পিতা কোথায় বাড়ী ঘর। কিবা দেখি বনবাসী দেহত উত্তর লো পুষ্প তোরে… । বাতাসে উড়াইয়া নিচে অঙ্গের বসন খানি। এইখানে খাড়াইয়া কন্যা মুখের কথা শুনি লো পুষ্প তোরে… ॥ “নাহি আমার মাতারে পিতা থাকি ভেউর বনে। ছেউরা শৈশব হইতে পালে অন্য জনে ॥ লালিয়া পালিয়া মোরে এত কৈল বড়। সেই মোর বাপ মাও আছি তার ঘর ॥ কেবা তোমার মাতাপিতা কেবা তোমার ভাই।” “তোমার মতন কন্যা আমার কেউ নাই ॥ জনমি না দেখিলাম জন্ম দাতা বাপে। অবুঝ শৈশব কালে খাইল তারে সাপে ॥ এমন করিয়া মাও গেলত ফেলিয়া। কাল বিধাতা দিল মোরে সাঙরে ভাসাইয়া ॥ সুতের সেওলা যেমন ভাসিয়া বেড়াই। তোমার কারণে কন্যা পরাণ বাঁচাই ॥” ৩০ তবেত হইল কিবা শুণ দিয়া মন। দুই জনে হইল দেখ পরাণে মিলন ॥ তিল দণ্ড না দেখিলে বাহিরয় পরাণী। বনেলা কৈতরী যেন পাইলা জোরনী ১ ॥ তবেত বিনাথ দেখ, কোন্ কাম করে। পীরের নিকটে বিনাথ মস্তর শিক্ষা করে ॥ পরথমে শিখিল মস্তর নামে ফুল কড়ি। জঙ্গলার যত সপ্প আনে তারে ধরি ॥ দ্বিতীয়ে শিখিল মন্ত্র ওস্তাদে বাখানি। থাপার চুইডেতে ২ দেখ বিষ করে পানি ॥ বাপেত দিয়াছেরে বিয়া থাকি পরের ঘরে। তিতিয়ে শিখিল মন্ত্র বরম্মজাল নামে। চালুনি ভরিয়া জল আনে যার গুণে ॥ চতুর্থে শিখিল মন্ত্র নালে নামে বিষ। পঞ্চমে শিখিল মন্ত্র উত্তর পাতর। বাসুকী নোয়ায় মাথা ঝারি সে মস্তর ॥ ষষ্ঠেতে শিখিল মস্তর নাম তার খৈয়া। কালীদহের কালী নাগ যায় পলাইয়া ॥ সপ্তমে শিখিল যত ধূলাপড়া আছে। কেউটিয়ার ফণায় বিনাথ খাড়াইয়া নাচে ॥ অষ্টমে শিখিল মন্তর নামেতে গাড়ুইয়া। ধন্বন্তরীর যশ রৈল মরা বাঁচাইয়া ॥ জীয়ন মন্তর শিখে বিনাথ ওস্তাদের চরণে। ছয় মাসের মরা জিয়ে যে মন্ত্রের গুণে ॥ শিক্ষা নাই সে দিয়া সুমাইর হিংসা হইল মনে। শিষ্য না হইয়া বিনাথ নিজগুরু জিনে ॥ দেশেতে হইল খেতি বিনাথের গুণ। এরে দেখ্যা সুমাই ওঝা হিংসিত আগুন ॥ বিনাথে মারিতে ওঝা যুক্তি করে মনে। এই কথা শুনিল বিনাথ বাতাসীর খানে ॥ চক্ষে দর দর ধারা কন্যা কান্দিয়া বুঝায়। বিমনা হইল বিনাথ ঘটলো বিষম দায় ॥ তবে ত বিনাথ ওঝা কোন্ কাম করে। গোপনে কহিল কথা বাতাসী কন্যারে ॥ “শুন শুন পরাণের কন্যা আমার কথা ধর। এই দেশ ছাড়িয়া আমি যাইবাম দেশান্তর ॥ বাপ হইয়া বৈরী হইল এদেশে থাকা দায়। নিজমনে ভাব কন্যা নিজের উপায় ॥ পুষ্প যদি হইতা কন্যা ফুট্যা থাকতা ডালে। না হইত না পাইত কন্যা এইমত জঞ্জালে ॥ পক্ষী যদি হইতা কন্যা পিঞ্জরা ভরিয়া। সঙ্কেত লইতাম তোমায় যতন করিয়া ॥ নানা মন্তর জানে পীর ভয় হয় মনে। এ দেশ ছাড়িয়া আমি যাইব তে কারণে॥” সান্ধ্যা গুঞ্জরিয়া যায় লীলারি বয়ারে। ছোটু ছোটু নদীর ঢেউ তোলাপাড়া করে॥ গাঙ্গের ঘাটে যাইতে কন্যা মুছে চক্ষের পাণি। “কেমুনে বিদায় করি না ধরে পরাণী॥ বিরখ হইয়া থাকরে বন্ধু জঙ্গলার মাঝে। ছায়া হইয়া থাকি বন্ধু তোমার না কাছে॥ ভমরা হইয়া রে বন্ধু পাতায় লুকাও। এই বনে না থাক্যা বন্ধু পুষ্পের মধু খাও॥ সারস হইয়ারে থাক ঐ না জলে স্থলে। তোমার আমার হৈব দেখা রাত্রনিশাকলে॥” ঘাটে বান্ধা পানসী নাও বিনাথ বান্ধন খুলিল। আস্তে ব্যস্তে বিনাত দেখ নায়ে পাও দিল॥ পানিতে মারিল বাড়ি পবন বৈঠা দিয়া। চলিল বিনাথের পানসী এ দেশ ছাড়িয়া॥ ডাক দিয়া বলে বিনাথ “কন্যা ঘরে যাও। আমারে ভুলিয়া যাইও আমার মাথা খাও॥ এই দেখা শেষ দেখা আর যেন না ফিরি। তোমারে ভুলিলে কন্যা যেন জলে ডুব্যা মরি॥” সান্ধ্যা গুঞ্জরিয়া যায় আন্ধার হইল বন। শূন্য ঘরে যাইতে কন্যার নাইসে চলে মন॥ নিজ দেশে গেছে বিনাত নিজ মন লইয়া। খাড়াইয়া রহিল কন্যা অন্ধকারে চাহিয়া॥ ২২_ ( ৯ ) (হায় ভালা) দেশে ত পোছিয়া বিনাথ কোন্ যুক্তি করে। একবারে চল্যা গেল বিনাথ চান্দ মড়লের ঘরে ॥ দেশেতে জাহির হৈল তাহার জহরা। কেউ চায় তাবিজ কবচ কেউ বা জলপড়া ॥ সর্পের ভয় দূরে গেল জানে সর্ব জনে। জিয়াইল সাপ কাটা জিয়ন মন্ত্রের গুণে ॥ চান্দের আপন পুত্র কুশাই নাম ধরে। সেও পুত্র বাচ্যা গেল সাপের কামড়ে ॥ তবেত চান্দ মড়ল কোন্ কাম করিল। সুজন্তী কন্যার সঙ্গে বিভা তার দিল ॥ বছর গোয়াইল বিনাথ চান্দ মোড়লের ঘরে। অতঃপর কিবান হইল জানাই সভার গোচরে ॥ বিনাথ সুজন্তী হায় না হইল মিলন। বিনাথে ভাবিল কন্যা আপন দুষ্মন ॥ লুকাইয়া সুজন্তী বাসে পাড়ার নাগরে। এই কথা বিনাথ যে জানিল সুস্তরে ॥ রৈয়া রৈয়া পড়ে মনে বাতাসীর কথা। বাতাসে আসিয়া কয় কন্যার মনের বেথা ॥ স্বপ্নেত দেখায় বিনাথ কন্যা নদীর কূলে খাড়া। ছিন্ন ভিন্ন চিকণ কেশ হইল আউল দরা ॥ ২০ ( ১০ ) এখনে হইল কিবা শুন দিয়া মন। দেশে আস্তা সুমাই ওঝা দিল দরশন ॥ নানা মন্ত্র জানে বেটা বড় কুত্তেয়ানী। শিষ্য সেবক কত হইল ডাকুরাণী॥ ছল কইরা সুমাই ওঝা কোন্ কাম করিল। জিয়ন মন্ত্র ছিল তার হরণ করিল॥ তবেত হইল বিনাথ দেশে হতচ্ছারা। যত গুণ গেরাম ছিল সকল হইল হারা॥ কি মতে হরিল মন্তর শুন দিয়া মন। সুমাই লুকাইয়া লইল সুজন্তীর শরণ॥ করিল যতেক তত বিনাথ না জানে। মিষ্ট বুলে সুজন্তী কহিল স্বামীর স্থানে॥ জিওন মন্ত্র জান তুমি মোরে শিক্ষা দেও। আমিত তোমার শিষ্য নহে অন্য কেও॥ বিনাথ ভাঙ্গাইয়া ১ বলে তুমি নারী জাতি। ওস্তাদের হুকুম নাই নারীরে শিখাইতে॥ সুজন্তী যতেক বলে বিনাথ নাই সে মানে। ঠেকিল বিনাথ শেষে সুজন্তীর স্থানে॥ ঠেকিয়া জীয়ন মন্ত্র দিল আড়াই অক্ষর। নিজ মন্ত্র পণ্ড হইল ওস্তাদের বর॥ নিজ কার্য্য সাইরা সুমাই গেল নিজ বাড়ী। দেশের যত লোক হইল বিনাথের বৈরী॥ বিষ ছাড়া সপ্প যেমন বিনাথ সকল হারাইয়া। আবার চলিল বিনাথ এদেশ ছাড়াইয়া॥ কোথায় যাইব বিনাথ না পায় ভাবিয়া। রৈয়া রৈয়া উঠে মনে বনের কন্যার কথা। দুঃ খাঁর কপােলরে দুঃখ লিখ্যাছে বিধাতা॥ ( ১১ ) নয়া গাঙ্গের পাড়েরে ফুটিল চাম্পার ফুল। কে তুমি বসিয়া কন্যা শুখাও ভিজা চুল॥ নয়া গাঙ্গের পারের বিরুক্ষ চিরল চিরল পাতা। আমি ডাকি সুন্দর কন্যা পিছন ফিইরা চায়। মনের মধ্যে ডাকে কন্যায় চাহিয়া না পায়॥ বন্ধে চাহিয়া না পায়। বাতাসে কাঁপিছে কন্যার নূতন বসনখানি। দুরের পানে চাহে কন্যার অঝোরে ঝরে পানি॥ কোথা হইতে আইসারে নৌকা উজান বইয়া যাও। ভিন দেশী বন্ধুর লাগ কোথা নাকি পাও॥ আমি কান্দি কইও বন্ধে নদীর কূলে বইয়া। আমারে লইতে বন্ধে যেন পানসী নাও সে বাইয়া॥ উজান বাঁকে থাকরে বন্ধু ভাইটাল বাঁকে টানা। মুখের হাসি চোখের দেখা তোরে কে করিল মানা ॥ ( রে বন্ধু কে করিল মানা ) ভাটিয়ালা শুকনা নদী জোয়ার পানে ভাসে। নারী যৈবন ভাটি পাইলে আর না [?]ফইরা আসে রে॥ ( বন্ধু আর না ফিইরা আসে ) আমি যে অবুলারে নারী কৈতে নারি কথা। তুমি কি বুঝনা বন্ধু আমার মনের ব্যেথা॥ সল্প যেমন হারাইয়া নিজ মাথার মুণি। তোমার লাগিয়া বন্ধু আমি পাগলিনী রে বন্ধু॥ ( আমি উন্মাদিনী ) বাপেত দিয়াছে বিয়া দেইখ্যা বড় ঘরে। তোমারে ছাড়িয়া বন্ধু কেমনে থাকি ঘরেরে॥ ( বন্ধু, কেমনে থাকি ঘরে ) খাট পালঙ্কের আমার কোন কাজ নাই। বিরক্ষের নীচে তোমায় লইয়া আইঞ্চল বিছাই॥ আমিতে অবলা নারী কইতে নারি কথা। তুমি বিনা অভাগীর জীবন যৌবন বৃথা রে॥ (বন্ধু কেমনে থাকি ঘরে) কাটিয়া চাচর কেশ পাথারে ভাসাই। কাজলী মাথিয়া চক্ষে কোন কার্য্য নাই॥ দিনান্তে তোমার দেখা নাহি পাই যুদি। কাটারিতে কাট্যা তুলি এই দুটি আঁখি রে॥ (বন্ধু…) আমার মরণ নাইরে বন্ধু আমার মরণ নাই। মনে যে পক্ষী হইয়া উড়িয়া না পলাই॥ পিরীত নদীর পারে বাস পিরীত বিরক্ষের তল। পিরীত গাছের ফল আমি খাইয়া গায়ে কইরাছি বল॥ (রে বন্ধু আমার মরণ নাই) জলেতে ডুবিলে বন্ধু দরিয়া শুকায়। আগুনে ঝাঁপিলে বন্ধু আগুন নিব্যা যায়॥ (রে বন্ধু আমার মরণ নাই) বিরক্ষ ডালে বুরা ১ লতায় তানিলাম ফাঁসি। ফাঁসি হৈল গলার মালা আমি কর্ম্মদোষী রে॥ (বন্ধু আমার মরণ নাই) দড়ি লইলাম কলসী লইলাম আন্ধাইর রাতের নিশি। নদীর পাড়ে শুনলাম রে বন্ধু তোমার পুরাণ বাঁশী॥ (বাঁশী করিল মানা বন্ধু) কলসী কহে কারেনরে কন্যা না ডুবিও জলে। প্রাণ থাকিলে হইব দেখা ঐনা নদীর কূলেরে॥ ( বন্ধু কলসী করলো মানা ) দড়ি কহে পাগলী কন্যা আমি হই যে ফাঁসী। কাইল বিয়ানে ১ শুনতে পাইবা তোমার বন্ধের বাঁশী॥ বন্ধু … কাটারী কয় কন্যা তুমি আমার কথা ধর। আমারে বাঁধিয়া গলায় কোন্ বা দোষে মর॥ লো কন্যা… কাকাল গরল কয় কন্যা না হইও গো ভুখাঁ। জীবন থাকিলে দেখ একদিন হইব দেখা॥ রে কন্যা… পোষা পক্ষিনী কয় কন্যা রাখ নিজ পরাণ। কাইল নিশীতে আমি যেমন শুণ্যাছি বাঁশীর গান॥ লো কন্যা… বনের পন্থী ডাক্যা কয় কন্যা থাক আশার আশে। আইজ বা গেল মন্দে রে মন্দে কাইল বা সুদিন আসে॥ রে কন্যা… যদি আইসে তোমার বন্ধু তোমার লাগিয়া। এই ময়ালে ২ না পায় যদি কেমনে ধরব হিয়া। তোমার বন্ধু মরব কন্যা তোমার লাগিয়া॥ ৭২ ( ১২ ) পরাণ ধরা নাই সে যায়। পরাণ ধরা নাই সে যায়। আর কত দিন রাখব জীবন আশায় আশায়॥ বাগ লাগাইয়া রে বন্ধু রোপণ করলাম লতা। না ফুটল তার আশার কলি সকল হইল বেরথা ॥ আইল বান্ধিলাম পাইল বান্ধিলাম নয়ন জলে পানি। ঢালিয়া না পাইলাম ফল শুকাইয়া মরে প্রাণী ॥ পুষ্প যেমন তিলে দণ্ডে দিনে দিনে ফুটে। দিন মাদানে বাসী হইয়া জীবন যৌবন টুটে ॥ বান্ধিয়া চান্দিয়া রে ঘর আশানদীর পাড়ে। আশাপান্থ চাইয়া বন্ধু অন্ধ আঁখি ঝুরে রে বন্ধু— আমি আর ত পারিনা রে বন্ধু আর ত পারি না। যৌবন হইল বিষের বোঝা ধরতে পারি না ॥ একেলা সুন্দর লো কন্যা কাঁখেতে কলসী। কার পিরীতে মজিয়া কন্যা হইলা উদাসী ॥ জল দায়ে নয়রে ঘাটে হইয়াছি উদাসী। কাইল নিশীথে শুনলাম আমি পুরীণা বন্ধুর বাঁশী ॥ ঘরে নাই সে থাকে মন বাহির হইতে চায়। বনেলা পক্ষিনী যেমন পিঞ্জরা ভাঙ্গায় ॥ তোমার পিরীতে বন্ধু গলায় দিব ফাঁসি। আপনা ভুলিয়া হইলাম ছিচরণে দাসী ॥ আগেত জানিনারে পিরীত তুই যে গরল জ্বালা। জানিলে না করতাম তোরে গলার রতন মালা ॥ আগেত জানিনারে পিরীত তুই তোষের আগুনি। ষুষিয়া যুষিয়া পুড়ে অবলার পরাণী ॥ আগেত জানিনারে পিরীত এমুন করবা মোরে। তোরে ছাইড়া গিয়া দাণ্ডাতাম দূরে॥ আগেত জানিনারে পিরীত এমুন দিবা ফাঁকি। অন্ধ যে করিয়া রাখতাম না চাহিতাম আঁখি॥ রজনী গোপালে কয় কন্যা পিরীতে না দোষ। বিচ্ছেদ ভুলিয়া কন্যা বন্ধুর কোলে বইস॥ পিরীত কর গলার মালা পিরীতে কর পূজা। পিরীতি অজপা মন্তর পিরীত নহে সাজা॥ মিলন হইতে বিচ্ছেদ ভালা মহাজনে বুলে। গদ হইতে ভুখা ভালা জানতে পারবা কালে॥ কাছ হইতে দূরে ভালা যদি প্রাণের টান। বিরহ বিচ্ছেদ দুই পিরীতির পরাণ॥ বহুতা পিয়াসে যেমুন পান করিলে পানি। বিরহ বিচ্ছেদ মতে মিলে দুই পরাণী॥ দুঃখ ভুঞ্জিলে কন্যা সুখ লাগিব মিঠা। জানিয়া শুনিয়া বিধি পুষ্পে দিল কাঁটা॥ ৪২ ( ১৩ ) তোমার বাঁশী শুন্যারে বন্ধু আইলাম নদীর ঘাটে কে জানি কোথায়ে থাকি তোমারে বা দেখে॥ বাপেত দিয়াছেরে বিয়া থাকি পরের ঘরে। যত বিষ খাইয়া মরি জানে তা অন্তরে॥ বনের পক্ষিনী:বন্ধু পিঞ্জরে ভরিয়া। আমারে রাখিছে বন্ধু শিকলে বান্ধিয়া॥ ঘরে নাইসে থাকে মন তোমার লাগিয়া। আমি ধুয়ার ছলনে কান্দি চক্ষে বসন দিয়া’ ॥ খাট পালঙ্করে ছাইড়া জমিনে বিছান। জিজ্ঞাসিলে কই কথা আমার পুইড়া গেছে প্রাণ ॥ অন্তরায় লোহার কবাট সেও খাইয়াছে ঘুণে। নিশিদিন তোমার মুখ দেখি যে স্বপনে ॥ আর না থাকিতেরে পারি গিরে চ্ল্যা যাই। দুষ্মনে দেখিলে লজ্জা রাখ্ তে স্থান নাই ॥ তোমারে ছাইড়ারে বন্ধু যাই নিজ ঘরে। চরণ অবশ গতি মনে নাই সে ধরে ॥ ভ্রমরা হইয়া বন্ধু লুকাও বনের ফুল। আইজ নিশীথে হইব দেখা ঐনা নদীর কূল ॥ নিশি রাইতে বাজল বনে মন-পাগেলা বাঁশী। শিরে হাত দিয়া ভাবে অন্ধকারে বসি ॥ পশ্চিম দুয়ার কন্যা তরিতে খুলিল। অস্তেব্যস্তে সুন্দর কন্যা পৈটায় পারা দিল ॥ হস্তের জলের ঝারি ভুয়ে নামাইল। গলার রতন হার দূরে ফালাইল ॥ গায়ের যত অলঙ্কার একে একে খুলে। উঠান হইয়া পার অস্তেব্যস্তে চলে ॥ অন্ধকারে হস্তের তালা দেখা নাহি যায়। একেলা ঘরের নারী সেইনা পথে যায় ॥ একবার না ভাবে কন্যা চলে একেশ্বর। ঘর হইল বাহির কন্যায় আপন হইল পর ২ ॥ কলঙ্ক কাজল হইল কুলের নাই সে ভয়। বান্ধিয়া না রাখতে পারে পিরীতে যারে লয়॥ গম্ভীরা রাইতের নিশা নাই সে পউখ পাখালীর রাও। কুল ছাড়িয়া কুলের নারী অকূলে দিল পাও॥ গয়িন জঙ্গলার মধ্যে পরবেশ করিল। তিন দিনেরপন্থ তারা একদিনে গেল॥ মানুষের নাই গতাগম্ জঙ্গলা যে বড়। সেইখানে গিয়া বিনাথ বান্ধিলেক ঘর॥ লতায় বান্ধিয়া ঘর পাতায় দিল ছানি। সেই ঘরে বসত করে তারা দুইটি প্রাণী॥ কইতরা কইতরী যেমন মুখে মুখ দিয়া। বড় সুখ পাইল কন্যা কাননে আসিয়া॥ মস্তক না রইল যুদি কি করিব চুলে। বন্ধু যুদি না মিলিল কি করিব কুলে॥ ৪৭ ( ১৪ ) হেথাতে সুমাই ওঝা গোস্বায় আগুনি। দুষ্কৰ্ম্ম কইরাছে বিনাথ মনে অনুমানি॥ পদ্মনাল সপ্প সুমাই ডাকিয়া আনিল। মন্তর পড়িয়া সুমাই চালনা যে করিল॥ মা মনসার নাগ তুমি শীঘ্র কইরা যাও। যথায় পাও দুষ মনেরে শীঘ্র কইরা খাও॥ বিষতেজে পদ্মনালরে চলিল উড়িয়া। বেউরা জঙ্গলার মধ্যে পরবেশ করল গিয়া॥ সুখে নিদ্রা যায় বিনাথ নারী বুকে লইয়া। সুখনিদ্রা ভাঙ্গিল মাগো চরণে দংশিয়া॥ “উঠ উঠ কন্যা তুমি কত নিদ্রা যাও। জিয়ন মন্তর হারাইয়াছি সপ্পে খাইল পাও॥ কালনাগে খাইল মোরে বিষে ছাইল অঙ্গ। সংসারের সুখের খেলা আইজ হইতে ভঙ্গ॥” বিষে কালি হইল অঙ্গরে ঘন বহে শ্বাস। ততক্ষণে ছাড়ে বিনাথ জীবনের আশ॥ মাথা থাপাইয়া কন্যা কান্দে পাগলিনী। আমারে ছাড়িয়া বন্ধু কোথা যাও তুমি॥ চান্দের সমান বন্ধুরে তোমার মুখের হাসি। আর না দেখিব তোমায় পোহাইয়া নিশি॥ ভেউর জঙ্গলা বন্ধুরে নাইরে সঙ্গী সাথী। একেলা রাখিয়া বিধি নিলা পরাণের পতি॥ ভাবিয়া চিন্তিয়া কন্যা শোকেতে বিউর১। মাথার না কেশ ছিইড়া পায় বান্ধিল ডুর॥ উর্দ্ধ নালে সপ্পবিষ উজাইয়া চলে। মস্তকে উঠিল বিষ সেই উর্দ্ধ নালে॥ ঢলিয়া পড়িল বিনাথ কন্যার যে কোলে। হেন কালে সুমাই ওঝা জঙ্গলায় আসিল। দেখিয়া কন্যা কান্দিয়া পড়িল॥ মন্তর পড়িয়া সুমাই দিল জলপড়া। নাকেত শুয়াস নাই প্রাণের নাই সাড়া॥ জিয়ন মন্তর ঝাড়ে ওঝা নাহিক পতায়। মহাজ্ঞান মন্ত্র ওঝার হইল ব্যত্যয়২॥ লোভেতে পড়িয়া ওঝা লইল টঙ্কাকড়ি। জিয়ন মন্তরের গুণ ওঝায় গেছে ছাড়ি ॥ বৈমুখ হইল ওঝা বিনাথ মরিল। কৈন্যার কান্দন দেখি পাষাণ গলিল ॥ বনে কান্দে বনের পশুপক্ষী কান্দে ডালে। “হায় বন্ধু ছাইড়া গেলে এমন যৌবন কালে ॥ মনুষ্য যে দিব গালি আইলাম বনে। আমারে ছাড়িয়া বন্ধু চলিলা আপনে ॥ শুনরে দারুণ বিধি আমার মাথা খাও। অভাগীর পরমাই দিয়া বন্ধেরে বাঁচাও ॥” ৪৪ ( ১৫ ) মহাসূতে চলে ধারা সান্তরিয়া নদী। থল নাই কূল নাই চলে নিরবধি ॥ অভাগী ওঝার কন্যা কোন্ কাম করে। বন্ধু কোলে লইয়া কন্যা গেল নদীর পারে ॥ সাক্ষী হইও দেব ধরম সাক্ষী তরুলতা। কি দোষ পাইয়া বিধি দিল এমুন বেথা ॥ চান্দ সুরুজ সাক্ষী কইরা কন্যা কোন্ কাম করিল। আপনে ভাসাইয়া সূতে বন্ধে ভাসাইল ॥ সাওরিয়া পাগলা নদী ঢেউয়ে ভাঙ্গে পাড়। থল নাই সে কূল নাই সে নদী অকূল পাথার ॥ কূল-কলঙ্কিনী কন্যা সকলেতে দোষে। কূল ছাড়িয়া কুলের কন্যা অকূলেতে ভাসে ॥ পিরীতি অজপা মন্তর পিরীত কর সার। পিরীতি নৌকায় হবে ভবনদী পার ॥ মানুষ পিরীত কইরা দেবতারে বান্ধি। রজনীগোপালে কয় ঐ পিরীতির সন্ধি ॥ ভাটিলা ময়ালে ঘর জগন্নাথের পুত্র। মাও হইলা সোণামণি মধুকুল্য গোত্র ॥ পরিচয় দিয়া আমি পালা করি ইতি। সভার চরণে জানাই প্রণাম মিন্নতি ॥ ২০