পরীবানুর হাহঁলা

প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা - চতুর্থ খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন

পরীবানুর হাঁহলা ( ১ ) ধুয়া—সাইগরে ডুপালি পরীরে হায়! হায়! দুখে মরি রে। কি ভাবে গাহিব ওই দুঃখের বিবরণ। যে হালে হইল সেই পরীর মরণ ॥ কেমনে দুঃখের কথা বয়ান করি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— ভেজের বাজি দুনিয়া যে কেবল বেড়া জাল। কাড়াকাড়ি মারামারি আর যত জঞ্জাল ॥ মিছা রাজ্য মিছা ধন মিছা টাকা কড়ি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— বার বাঙ্গলার বাদসা সুজা রাজত্বর ওর নাই। বাপর দিব্যা তক্তর লাগি করিল লড়াই ॥ মার পেডর ভাই যে হৈল কাল পরাণ বৈরীরে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— ভাইয়ে চাইলো ভাইয়ের লোউ’ মিছা রাজ্যর লাগি। গরীব গুইন্যা বেশী ভাল্যা যারা খায় মাগি ২ ॥ কিসের রাজ্য কিসের ধন কিসের টাকা কড়িরে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— লড়াইতে হঠিয়া সুজা হইল পেরেসানি। পরিবার লইয়া সঙ্গে করিলা মেলানি ॥ ধন দৌলত কিছু কিছু নিলা সঙ্গে করিরে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— সুজা বাদসার আওরাত পরীবানু নাম। চাদিগাঁতে আসি তারা বদরের ৩ মোকাম ॥ বহুত খরাত দিলা সোণা ভরী ভরী রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— পাইক পহল ৪ ভালা থাকে গাছৎ ৫ বাসা বাঁধি। বাদসার পোলা দেশে দেশে ঘুরে কাঁদি কাঁদি ॥ সুগ ৬ নাই কন কাইত ৭ পদে পদে অরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— (১—৩০) ( ২ ) নসীবের লেখা কভু না যায় খণ্ডন। চাড়িগাঁ ছাড়িতে বাদশা করিল মনন ॥ দহিন মিক্যা আইল তারা হাতীর উয়র চড়িরে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— মধ্যে বইস্তে সুজা বাদশা বামে পরীজান। জেনে বইস্যে দোন কইন্যা পুন্নমাসীর চান ॥ ধীরে ধীরে যায় তারা মুড়ায় পন্থ ধরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— মুড়ায় পন্থ ধরি তারা দহিন মিক্যা যায়। পিন্ পিন্ পিন্ সাড়ী পরীর বয়ারে উড়ার ॥ চুনকি বাদলা কত পড়ে ঝরি ঝরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— পরীর হাতৎ লাল বাখরি মাঝে মাঝে লেখা। ঝুম্কামালা কানৎ পরীর চান বোলাকটা বেঁকা ॥ পাড়াল্যা মা ভৈনে আসি চাইলো নয়ন ভরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— হাতীর উয়র হাওদা যে সোণাতে তৈয়ার। পরীর ছুরত চোগে ধাঁধা লাগাই যার ॥ কোন হুরিপুরী১ এই পন্থে গড়াগড়ি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— কোন্ দিগদি কণ্ডে ২ যাইব নাইরে ঠিকানা। কেহ দিল পন্থ দেখাই কেহ করে মানা ॥ ধীরে ধীরে যায় তারা মুড়ায় পন্থ ধরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— কেহ বলে আমার বাড়ীৎ আইস পরীজান। তুলসীমালার ৩ ভাত দিয়ম ছালৈন ৪ নানান ॥ সাঁচি বরর পান আর দিয়ম বাটুা ভরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— কেহ বলে দহিন মিক্যা না যাইও আর। চালার ৫ মুয়ং ৬ চাইল্ম বাইঘ্যা ৭ লেজরি ঘুরার ॥ সেই পন্থে গেলে বাইঘ্যা খাইব ধরি ধরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— বড় বড় দইরন্যা ৮ পাইবা গেলে তার পর। ডাঙ্গর ৯ ডাঙ্গর আছে কুন্তীর হাঙ্গর ॥ কনে ১ • দিব তোমরারে দইরন্যা পার করি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— পেরাবন ১ আছে সেথায় নানান সাগর বাসা। একবার দংশিলে আর প্রাণের নাই আশা ॥ ফায়দা ২ কি পাইবা তোমরা হুদাহুদি ৩ মরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— ন যাইও ন যাইও পরী রোদ্যাঙ্গ্যার ৪ দেশে। ধন দৌলত হারাইবা জান দিবা শেষে ॥ সে মিক্যা ৫ না যাইও পরী মুড়ার পন্থ ধরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— ন যাইও ন যাইও পরী মুরুঙ্গ্যার ৬ ঠাঁই। মাইনসর গোস্ত খায় তারা হিঁজাই ৭ হিজাই ॥ এক পাও যাইতে আর আমি মানা করি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— পছিম মিক্যা ন যাইও সাইগরের পারে। আমার কথা মনৎ রাইখ্যো কহি বারে বারে ॥ হার্ম্মাদ্যারা লৈয়া যাইব গলাৎ বান্ধি দড়ি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— ( ১–-৩২ ) ( ৩ ) ন শুনিল কথা বাদসা ন মানিল মানা। নাহি চিনে পন্থ তারা বেগর ঠিকানা ॥ ধীরে ধীরে যারগই ৮ তবু হাতীর উপর চড়িরে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— তের দিন তের রাইত ভরণা করিয়া। ছাম্মে পাইল সুজা বাদ্সা বেমান ১ দরিয়া ॥ কুলেতে পড়িয়া ঢেউ করে গড়াগড়ি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— আকাশ পাতাল বাদ্‌সা ভাবে বারে বার। এমন দরিয়া আমায় কে করিবে পার ॥ সঙ্কটে পড়িলাম এখন উপায় কি করি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে — এইরূপে তিন দিন গুজারিয়া ২ যায়। চারিদিনে রোসাঙ্গা এক আসিল তথায় ॥ বাদ্সার আবস্থা সেই জাইল ভাল করি রে সাইগরে ডুপালি পরীরে— এর সঙ্গে বাদ্সাজাদা কি কাম করিল। রোসাং সহরে আসি দাখিল হইল ॥ সংবাদ পাইয়া রাজা কহে তড়াতড়ি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— বার বাঙ্গলার বাদ্‌সা সুজা আইলো আমার ঠাঁই। তান সঙ্গে হইব এখন বিষম লড়াই ॥ চট্ করি সাজি লও রোসাং নগরী রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— পরেতে জানিল রাজা সুজা বাদ্সার হাল। দেশ ছাড়ি রাজ্য ছাড়ি পন্থের কাঙ্গাল ॥ নছিবের দোষে তান ভাই হৈয়ে বৈরী রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— রাজার সঙ্গেতে তান দুস্তি হৈল শেষে। গর বাড়ী ছাড়ি সুজা রৈল রোসাং দেশে॥ তারপরে কি হইল কেম্মে বয়ান করি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে—(১—৩২) ( ৪ ) দুনিয়াতে জাইন্য ভাইরে লালছে পড়িয়া। মানুষে মানুষর বুকে বিঁধে ছুরি দিয়া॥ দুদিন্যা দুনিয়া খোদা দিয়ে দুখ্যে ভরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— একদিন পরীবানু দোনাহালার ঘরে। খসমের কাছে বসি রং তামাসা করে॥ শত দুখ্খ বাদসা তখন গেলা যে পাসরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে- রোসঙ্গার রাজা তখন সেই পন্থ দিয়া। হাবা খাইত যাইত আছিল হাতীতে চড়িয়া॥ আতাইক্যা দেখিল এই অপরূপ সোন্দরীরে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— সোন্দরী পরীর তখন দোলে নাগর নথ। মন মনুরা দিল উড়া দেখিয়া ছুরত॥ হাতীর উপরে রাজা যায় গড়াগড়ি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— ভোগালুয়ে ভাত চায় তিয়াসীয়ে পানি। পানিরে পাইলে নদী বুকে লয় টানি॥ আসকে ভাবে যে কেম্মে বাঞ্ছা পূর্ণ করি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— আসকের মন জাইন্য বারিষার ঢল। পরীর লাগিয়া রাজা হইল পাকল॥ নছিবের দোষে সুজার দোন্ত হইল অরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে—( ১—২৪ ) ( ৫ ) আদিগুড়ি কথা সুজা যখন শুনিল। কাঁদিয়া পরীর কাছে কহিতে লাগিল॥ দোন চোখে পানি তান পড়ে ঝরি ঝরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— দেশ নাই রাজ্য নাই না আছিল দুখ। ভরা রাইথ্য তুমি আমার এই যে খাইল্যা বুক॥ তোমারে ছাড়িয়া আমি কেম্মে পরাণ ধরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— সুজার কাঁদনে পরীর বুগ ফাড়ি যায়। দুঃখের উপরে দুঃখ দিল যে আল্লায়॥ রোসাঙ্গ্যার রাজা হইল কাল পরাণর বৈরী রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— কাঁদিয়া কাটিয়া পরে মন করি স্থির। পৌঁহাইত্যা রাতুয়া তারা হইল বাহির ॥ পিছে ফিরি নাহি চায় চলে তড়াতড়ি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— সাইগরের পারে আইলো বাদসা পরীজান। দোন কন্যার লাগি তারার ঝরিল নয়ান ॥ দুনিয়ার দুখখ আর ন সৈত শরীরে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— মাছ ধরে রোসাঙ্গ্যা ভাই ছোড একখান নাও। বাদসা বলে তোমার নুকা মোরে আজি দাও ॥ সঙ্গে লইয়া যাইয়ম আমি তোমার এই তরী রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— রোসাঙ্গ্যার হাতে পরী দিল সোণার হার। সুজা বাদসা মাঝি হৈয়া সে নৌকা বাহার ॥ পরথম জোয়ারের পানি আইয়ের হু হু করি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— বেমান দরিয়ার মাঝে নয়া এক মাঝি। আওরতে লইয়া সঙ্গে পাড়ি দিয়ে আজি ॥ ঢেউএ যেন ডাকে তানে গুজরি গুজরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— বাদসার মুখের পানে পরী রইলো চাহি। মাঝ দরিয়ায় চলে সুজা নৌকা বাহি বাহি ॥ হাত নাহি চলে অঙ্গ কাঁপে থরথরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— পোহাইয়া গেল রাইত হইল বেয়ান। কণ্ডে যারগই নয়া মাঝি নাইরে গেয়ান ॥ পরাণ উড়িছে তান শিহরি শিহরি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— মনে মনে পড়ি লৈল ফজরের নমাজ। বাদসা বলে শুন পরী শেষ দেখা আজ ॥ ঢেউএর বাড়ি খাই লৈল গড়াগড়ি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— আছমানে উড়িল সুরুজ—বরণ তার লাল। পরীর মুখ চাহি সুজা দিল এক ফাল ॥ ওরে দেখা নাইসে গেল আর সেই ছোট তরী রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— ডুপিল ডুপিল নুকা—সুজা পরীভান। দরিয়ার মাঝে হায় দিল রে পরাণ ॥ মরণেও রৈল তারা বুক জড়াজড়ি রে। সাইগরে ডুপালি পরীরে— হায় হায় দুখখে মরি রে! (১— ৩)