রতন ঠাকুরের পালা
প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা - চতুর্থ খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন
রতন ঠাকুরের পালা ( ১ ) “চান্দের বাগের ফুল নারে সূরুজে দিলাইন দড়ি’ । এই না ফুল দিয়া আমি মালা খানি গাঁথি ॥ ২ গাঁথিতে গাঁথিতে রে মালা, মালা আরে মালঞ্চ উজার’ । এই না মালার নাম আমার ‘বসন্ত-বাহার’ ॥ ৪ শতেক না চম্পা ফুলে আরে গাঁথলাম মালা । মধ্যে মধ্যে দিছি ফুল কালা না রে ধলা’ ॥ ৬ শুন শুন বিরধ বাপ শুন বলিরে তোমারে । এই মালা লইয়া যাহ রে তুমি তিরপুরার হাটে ॥ ৮ তিরপুরার হাটখানি বইসে বিয়ান বেলা’ । সেই না হাটে বিকাইয়া আইস চিকণ ফুলের মালা ॥ ১০ শুন শুন বাপ আরে কহি যে তোমার আগে । এই মালা বিকাইয়া আইস কাহনার দরে ॥” ১২ মালা লইয়া বিরধ মালী হাটে চল্যা যায় । একেলা ঘরেত কন্যা শুইয়া নিদ্রা যায় ॥ ১৪ তিরপুরার স’রে নাইরে এমুন গাঁথুনী। যারা গাঁথে ফুলের মালা বেবাক্ আমি চিনি ॥ ১৬ ( ২ ) “শুন শুন মালী আরে কহি যে তোমারে। কোন বা জনে গাঁথিল মালা কহ না সত্য ক’রে ॥ ২ কেওয় না কেতকীর গন্ধ বাতাসে মিলায়। কেমুন জনে গাঁথে মালা দেহ পরিচয় ॥” ৮ “ঘরে আছে এক কন্যা দুই নয়নের তারা। তুলিয়া মালঞ্চের ফুল সে গাঁথিল মালা ॥ ৬ পুবের বাতাস পাইচ মাইল বয়ারে নদী বাড়ে ঢেউ। এহি কন্যা ছাড়া আমার দুইনায় নাইরে কেউ ॥ ৮ চালে আমার নাইরে ছানি, কুলায় নাই সে ধান। এই মালা বেচিয়া খাই তবে বাঁচে পরাণ ॥” ১০ “শুন শুন বুড়া মালী আরে কহি যে তোমারে। কি মত বয়স কন্যা আছে তোমার ঘরে ॥ ১২ দিছ কি না দিছ বিয়া কহ পরিচয়। বড় ঘরে দিত বিয়া তবে উচিত হয় ॥” ১৪ “আ-বিয়াত কন্যা আমার ফুলের কুমারী। একেলার কন্যা মোর শিয়রের পরী ॥ ১৬ ভাত রান্ধে কন্যা আমার পান্থে যোগায় পানি। পরের হাতে সঁ প্যা কেমনে বাঁচাবো পরাণী।” (হায়!) হাস্যা কয়রে রতন ঠাকুর শুন বিরধ মালী। “কি দরে বিকাবে মালা কহ মোরে শুনি॥” “বুড়ীতে বুড়ীতে পনরে পনে কাহন মিলে। এক কাহন কড়ি দিলে মালা দিয়াম তারে॥” হাসি হাসি রতন ঠাকুর মালা দিল গলে। গণ্যা বাছ্যা কাউন কড়ি তুল্যা দিল হাতে॥ ( ৩ ) একেলা সুন্দর কন্যা গাঙ্গের ঘাটে খাড়া। মধু ভরা ফুলের খবর না পাইছে ভ্রমরা॥ “যৈবনে যৈবতী লো কন্যা একলা থাক ঘরে। কতখানি বয়স হইল না জান আপনে॥ টলমল অঙ্গলো কন্যা যৈবন বাইয়া পরে। নিজে নাই জান খবর না দিয়াছে পরে ” ॥” আঁখি মেল্যা দেখে কন্যা সুন্দর নাগর। কেওয়া কেতকী পুষ্পে উইড়াছে ভ্রমর॥ “দিনের আলো নিমি ঝিমি রে কুমার রাইতের আলো ভালো। একেত অবুলা নারী তা হতে একলা॥ দিনের আলো নিমিরে ঝিমিরে কুমার ঘিরিল আন্ধারে। পন্থ ছাড়রে কুমার যাইব নিজ ঘরে।” “কেবা তোর বাপ মাও লো কন্যা কহ পরিচয়। একেলা আইসাছ ঘাটে তাতে নাইলো ভয় ॥ ১৪ ভারি যদি কলসী কন্যা ভইরা দিবাম আমি। আগুয়াইয়া দিবাম তোরে গায়ের পন্থ খানি ॥ ১৬ চিন বা নাচিন পন্থ তাতে ক্ষতি নাই। যথায় যাইবা কন্যা তথা আমি যাই ॥” ১৮ “আমার না বাপ রে কুমার, কুমার আরে, তোমার বাগের মালী। জলেত খাড়ইয়া রে কুমার পরিচয় করি ॥ ২০ জল লড়ে স্থলেরে লড়ে জলে না পাই ভর। আন্ধাইরে ডড়িনা কেবল কলঙ্কের ডড় ॥ বাঘ ভালুকেরে কুমার, কুমার আরে, যত না ডরাই। অবুলা কুলের নারী কুলের ভয় সে পাই ॥ ২৪ আসমানেতে ফুটে তারা, জমিন আন্ধারে। পন্থ ছাড় রে কুমার যাইব নিজ ঘরে ॥” ২৬ “বায়ে লড়ে বন বাহুরা জলে উঠে ঢেউ। মনের কথা কইব কন্যা এইখানে নাইরে কেউ ॥” ২৮ “আজুকার নিশি রে কুমার, কুমার আরে, চিত্তে দেও রে ক্ষেমা। ফুল বাগানে অইব দেখা কালুকা বিয়ানে ॥” ৩০ “ডাল ভাঙ্গ, ফুল তুল লো, উগ্রাইয়া নেও চারা। হাতে হাতে আইজ কন্যা পইরা গেছ ধরা॥ ২ আজুকা বাগানে মোর নিছাদি পাহারা। ( কন্যাগো ) নিত্তি নিত্তি লৈয়া যাহলো কন্যা পুষ্পনা কইরা চুরি। ভালা শাস্তি দিবাম লো আজি শুনলো সুন্দরী॥ ৫ কাটিয়া চামর কেশ লো কন্যা আলো গলায় বাঁধিম। তোর যৌবন পুষ্প তুল্যা লো কন্যা মালা সে গাঁথিম॥ ৭ দুই আখি অপরাজিতা, বদন চম্পা ফুল— এই না ফুলে গাঁথিয়া মালা পড়িবাম গলায়। চোরের ধন চুরি করলে নাই সে বড় দায়॥” ১০ “কি কথা কইলা রে কুমার বড় দুঃখু পাই। অবিচার্য্যা দেশে কুমার বিচার না সে পাই॥ ১২ কোটালিয়া দেশের রাজা রাজা দেয় রে পারা ! যার লাগ্যা করিলাম চুরি সেই সে বলে চোরা॥ ১৪ এই দেশ ছাড়িয়া যাইম বৈদেশী হইয়া। পুষ্পে মোর কাজ্জ নাই হস্ত দেওরে ছাইরা॥” ১৬ “না ছাড়বো, না ছাড়বো হাত লো, কন্যা আলো, রৈয়া শুনলো কথা। যৌবন করলো দান রাখলো মোর কথা॥” ১৮ “এই ত বিয়ান বেলারে বন্ধুরে পুষ্প ফুটে ডালে। হাটের সময় হৈয়া যায় বন্ধু! ছাইরা দেওরে মোরে॥” ২০ “সত্য কর সুন্দর কন্যা লো সত্য কর তুমি রৈয়া। গোপন কালে করবানি লো দেখা, মোরে যাওলো কৈয়া॥” ২২ “নিশিকালে যাইও বন্ধুরে আমার ওই না বাড়ী। চারি না দিকে বেউর কলা রুইছি সারি সারি। কলাবনে আইব দেখা গেলাম সত্য করি।” ২৫ ( ৫ ) “পৈথান দিয়া আইস বন্ধুরে শিথান দিয়া বইও। বাটায় আছে পান শুপারী, বন্ধু চুণ দেখিয়া খাইও রে॥ ২ পরাণ পাগেলা বন্ধুরে— হাম অবুলা নারীরে বন্ধু পরথম যৌবন। পরথম পিরীত বন্ধু, বন্ধুরে পরথম মিলন রে॥ ৪ পরাণ পাগেলা বন্ধুরে— থর থরিয়া কাঁপে অঙ্গরে বন্ধু মুখে দিল সে ঘাম। পাড়ার দুষ্মন্ লোকে বন্ধু রটাইব বদনাম রে॥ ৬ পরাণ পাগেলা বন্ধুরে— পরথমে যখনই বন্ধুরে গলায় হাত দিল। অবুরে অবশা অঙ্গ কাঁপা না উঠিল রে॥ ৮ পরাণ পাগেলা বন্ধুরে— পরথমে যখন বন্ধুরে মুখে দিল মুখ। অঝুরে অবশা অঙ্গ আমার কাঁপ্যা উঠে বুকরে ॥ ১০ পরাণ পাগেলা বন্ধুরে— চান্দ সাক্ষী সুরুজ সাক্ষীরে সাক্ষী তারাগণ। এই মতে সঁপ্যা দিলাম জীবন যৌবন রে ॥ ১২ পরাণ পাগেলা বন্ধুরে— জীবন দিলাম যৌবন দিলাম, আর সে কিছু নাই। ঘুম থাক্যা জাগিয়া দেখি বন্ধু কাছে নাই ওরে ॥ ১৪ পরাণ পাগেলা বন্ধুরে—” ( ৬ ) পরভাত কালে উঠে কন্যা সামনে পুষ্পডালা। চক্ষে লাগল কাল ঘুমরে কেমনে গাঁথি মালা ॥ ২ কালী হইল সোণার অঙ্গরে লোকে কাণাকাণি। দিবসে না হইব দেখারে হইলাম পাগলিনী ॥ ৪ দিবসে মোর কাজ্জ নাইরে রাত্রি মোর ভালা। সংসারে মোর ক’জ্জ নাইরে ঝইড়া পড়ে মালা ॥ ৬ হাটে মোর কাজ্জ নাইরে কিসের বিকি-কিনি— ছানে মোর কাজ্জ নাইরে কিসের খাউনী জিউনী রে ॥ ৮ ঘুমে মোর কাজ্জ নাইরে এ সবে না চাই। পন্থ পানে চাইয়া থাকিরে কেবল একটু দেখা পাই— রে বন্ধু একটু দেখা পাই ॥ ১০ বাপ বাদী হইল কুমাররে মাও সে বাদী হইল। জলেত যাইতে তারা মানা মোরে করে রে॥ ১২ বাপ সে বাদী হইল কুমার রে মাও সে হইল বাদী। পুষ্প তুলিতে গেলে তারা পরতিবাদী রে— কাল কালিন্দী বিষ রে॥ ১৪ রাধন না সয় বন্ধুরে বাড়ন না সয়। ঘর গরল জ্বালা রে বিষে তনু দয় রে— কাল কালিন্দী বিষ রে॥ ১৬ বাউরা পাগল মন রে ঘরে নাই সে টিকে। শিকল কাটা টিয়া যেমুন বনে বনে উড়ে রে— কাল কালিন্দী বিষ রে॥ ১৮ দুষমন পাড়ার লোকরে, দেশে নাই সে ঠাঁই। বৈদেশী হইয়া চল বন্ধু অন্য দেশে যাই রে— কাল কালিন্দী বিষ রে॥ ২০ ( ৭ ) রতন ঠাকুর ছান করতো যায় গামছা কান্ধে দিয়া। মালীর ছেড়ী চাইয়া থাকে ভাঙ্গা বেড়া দিয়া রে— আর, কান্দে নদীর কূলে বৈয়া ॥ রতন ঠাকুর পন্থে বাহির হইল হাতে লৈয়া বাঁশী। মালীর ছেড়ী ঘাটে যায় রে ভালা কাঙ্কেতে কলসী রে— আর, কান্দে পন্থ পানে চাইয়া॥ ৪ গাঙ্গের ঘাটে রতন ঠাকুর রে করে আনিগুনি। মালীর ছেড়ী ঢাই্ল্যা দিল ভরা কলসীর পানি রে— আর, কান্দে নদীর কূলে যাইয়া ॥ ৬ পন্থ্বে বাইরইল রতন ঠাকুর নব রঙ্গের বেশ। এরে দেখ্যা মালীর ছেড়ী ঝাইরা বান্ধে কেশ রে— আর, কান্দে আরশীর দিকে চাহিয়া ॥ ৮ ঘাটে বাটে যায় রতন রে সকাল সৈন্ধ্য বেলা। মালীর ছেড়ী ফুল তুলতে যায় হাতে লৈয়া ডালা রে— আর, কান্দে ফুলের পানে চাহিয়া ॥ ১০ রতন ঠাকুর হাটে যায় রে বেইল ফুরাইয়া গেল। আমার লাগিল্ আইন্য কিণ্যা সাঁচি গন্ধের তেল রে—
-
* * * * ১২
( ৮ ) পলায়ন দেওয়ায় ডাকে গুরু গুরু রে ঘাটে নাইরে খেয়া। ঢেউয়ের উপর ভাইন্দা পড়েরে ঝাউ হিজলের ছায়া রে— আরে কান্দে রতন ঠাকুর বুইলা ॥ ২ চিলিক চিলিক বিজ্জলী ঠাডারে পবনের বাও। আজুকা রাত্রিতে বান্ধা সাধু মাল্লার নাও রে— আরে কান্দে রতন ঠাকুর বুইলা ॥ ৪ “ঘরের বাইরে ’ আইলাম কন্যালো আর না যাইম ঘরে। তোমারে লৈয়া কন্যা লো ভাসিম সায়রে ॥ ৬ রাজ্য থাকুক ধন থাকুক, থাকুক বাপ মাও। তোরে লইয়া ছারম দেশ লো, কপালে থাকে যাও ‘ ॥” আরে কান্দে রতন ঠাকুর বুইলা ॥ ৮ “পইরা রইল কাক কোইলা দেশের বাড়ী ঘর। বৈদেশ করিলাম দেশ রে আপন কৈলাম পর রে ’ ॥ ১০ বাপ মাও ছাড়লাম বন্ধুরে ছাড়লাম নিজ ঘরে। কালুকা বিয়ানে লোকে কি বলিবে মোরে ॥ ১২ ছয় মাসের বান্ধা ঘর লহমাতে ভাঙ্গে রে—” আর কান্দে রতন ঠাকুর বুইলা ॥ ১৪ সজিস্তার দেশ খানি দেখিতে সুন্দর। মালী আর মাল্যানী তথা বান্ধে বাড়ী ঘর ॥ ১৬ চিরল কুটি দিয়া তারা ঘর যে বান্ধিল।
-
-
-
- ॥ ১৮ খাগরের ছানি দিল ইকরের বেড়া। রাজার হুকুম লৈয়া বান্ধিল বাসুরা ॥ ২০ পুষ্প তোলে মালা গাঁথে এহি মাত্র কাম। রাজার আন্দরে হইল মালীর খোসনাম ॥ ২২ [ এদিকে দেশ জুড়িয়া রতন ঠাকুরের খোঁজ পড়িল। খুঁজিতে খুঁজিতে লোকজন জানিয়া গেল যে এই সজিস্তার দেশের মালী-মালিনীই রতন ঠাকুর ও তা’র প্রণয়িণী—সেই বৃদ্ধ মালীর কন্যা। ] ( ৯ ) গাও না গেরাম লৈয়া ভালা যুক্তি যে করিল। রঙ্গিলা বেশ্যারে কৈয়া সজিস্তা পাঠাইল ॥ ২ “শুন শুন রঙ্গিলা বেশ্যা বলি যে তোমারে। আমার পুত্র পাগল হইয়া গিয়াছে বৈদেশে ॥ ৪ অর্ধেক রাজত্ব দিবাম আর সে দিবাম তার। সোণাতে বান্ধিয়া দিবাম তোমার গলার হার ॥” ৬ পান খাইয়া রঙ্গিলা বেশ্যা আরে ঠোঁট কইরাছে লাল। হাল আবেস্থা তার শুন দিয়া মন। যাদুমন্ত্র জানে কন্যা পরথম যৌবন ॥ ৯ দুহুমনে সুহৃদ করে পান পড়া দিয়া। সতী নারীর পতি সে যে নেয় ত ভুলাইয়া ॥ ১১ এক ফোটা জল পইরা গায়ে ছিট দিলে। পাগলিনী হইয়া সতী আপন পতি ভুলে ॥” ১৩ (হায় ভালা) তবে ত রঙ্গিলা বেশ্যা আরে গমন না করিল। সজিস্তার দেশে গিয়া দাখিল হইল ॥ ১৫ বাজারে মারিয়া ঢোল বান্ধিলেক ঘর। বড় বড় লোক রাখে বানাইয়া নফর ॥ ১৭ একদিন সজিস্তার রাজা খবর পাইল। রঙ্গিলার কাছে আইসা হাজির হইল ॥ ১৯ মুখ দেখিয়া রাজা পাগল হইয়া গেল। আর পাগল হইল রাজা পান যখন খাইল ॥ ২১ হায়! মালীর না গাঁথা মালা ভালা রাজা রঙ্গিলারে দিল। খুশী হইয়া রঙ্গিলা যে তারিফ করিল ॥ ২৩ “এমন সুন্দর মালা গাঁথে কোন জন। যে জনে গাঁথিল মালা সে জানি কেমন ॥” ২৫ রাজা বলে “আমার মালী মালা সে গাঁথিল।” “কেমন তোমার মালী” রঙ্গিলা কহিল ॥ ২৭ “আর দিন তারে তুমি সঙ্গেতে আনিও। আর গাছি ফুলের মালা গাথিয়া সে দিও ॥” ২৯ রতন ঠাকুর ও বৃদ্ধ মালীর কন্যা কন্যা। আজুকার নিশিরে বন্ধু স্বপন দেখ্লাম ভারী। দুক্ষিনীর কপালের কথা কইতে নাই সে পারি ॥ ৩১ মরা বিরূখে ডাকে কাউয়া পেঁচা ডাকে ঘরে। কি জানি বিধাতা বন্ধু ফেলায় কোন্ ফেরে ॥ ৩৩ মাও বাপে মনে উঠেরে বন্ধু দিবানিশি কাল। কি জানি দারুণা বিধি ঘটাইল জঞ্জাল ॥ ৩৫ চক্ষে চক্ষে থাকরে বন্ধু ফুলে কাজ নাই। তোমার বদলে আমি পুষ্প তোলা যাই ॥ ৩৭ বুকে বুকে থাকরে বন্ধু, বন্ধু আরে না হইও অদেখা। কি জানি বা এহি দেখা জনমের দেখা ॥ ৩৯ মুখে মুখে থাকরে বন্ধু হেন মনে লয়। তিলেক হইলে ছাড়া পরাণে না সয় ॥ ৪১ আইঞ্চলে বান্ধিয়া রাখি হেন মনে লয়। আঁখি কাঁপে ঘন ঘন রে বন্ধু কহিতে ডরাই। কি জানি আঞ্চলের নিধি বান্ধিতে হারাই ॥ ৪৪ ছয় মাস আছিরে বন্ধু সজিস্তার ঘরে। কাল নিশায় স্বপ্ন দেখি বন্ধু, তুমি গেছ চোরে ॥ ৪৬ রতন ঠাকুর। না কাইন্দ না কাইন্দ লো কন্যা নাই সে কাইন্দ তুমি। যেখানে থাকিবা তুমি সেইখানে আমি ॥ ৪৮ হিয়াতে লাগিল হিয়া পরাণে পরাণ। তোমার মরণে কইন্যা আমার মরণ ॥ ৫০ [ রতন ঠাকুর যে দিন রঙ্গিলাকে মালা দিতে গেল, সে দিন সে আর বাড়ী ফিরিল না। লোকজন খোঁজ করিতে গিয়া দেখিল যে রঙ্গিলা ও রতন ঠাকুর উভয়েই উধাও হইয়াছে। রাজা এ সংবাদে ভীষণ ক্রুদ্ধ হইয়া রতন ঠাকুরের ঘর পুড়াইয়া দিতে হুকুম দিলেন। তাঁহার অনুচরেরা ফিরিয়া আসিয়া জানাইল যে রতন ঠাকুরের ঘরে একজন সুন্দরী স্ত্রীলোক আছে। রাজা তাহাকে ধরিয়া অন্দরে আনিতে বলিলেন। ] আর ত সময় নাইরে বন্ধু, আর সময় নাই ! চক্ষের দেখা দেখা দেওরে, আমি দেইখ্যা প্রাণ জুড়াই রে বন্ধু—আর ত সময় নাই ! ৩ দারুণ গরল রে বিষে বন্ধুরে অঙ্গ হইল কালী। আমার বন্ধু একবার আইস, অন্তিম দেখা দেখিরে বন্ধু— আর ত সময় নাই ! ৬ তুমি ত তুলিতে ফুল রে আমি গাঁথতাম মালা, অবিচারে গেলে রে বন্ধু মোরে ফেলি’ একেলা রে বন্ধু— আর ত সময় নাই ! ৯ মাও বাপে পর করিলাম বন্ধুরে ছাড়লাম বাড়ীঘর, দেশ ছাইরা বৈদেশী হইলাম রে বন্ধু আপন হইল পর রে বন্ধু — আর ত সময় নাই ! ১২ আর না দেখবাম চান্দরে সুখ-নিশিতে জাগিয়া আর না কহিব রে কথা হাসিয়া হাসিয়া রে বন্ধু— আর ত সময় নাই ! ১৫ পরাণের বন্ধুরে আমার, দুষমনী করিলা অবলার মজাইয়া কুল রে বন্ধু, ফাঁকি দিয়া গেলা রে বন্ধু— আর ত সময় নাই ! ১৮ পরে রে না দিবরে দোষ, দিব সে আপনে কোন্ জনে পাইয়া এমন, হারায় বা কোন্ জনে রে বন্ধু— আর ত সময় নাই ! ২১ বন্ধেরে না দিবরে দোষ নিজে কর্ম্মদোষী, আর ত সময় নাই ! ২৪ মরিবার কালেরে বন্ধু না পাইলাম দেখা এই সে ছিল অভাগিনীর সাত করমের লেখা রে বন্ধু— আর ত সময় নাই! ২৭ তোমরা যদি কেউ বুঝগো আমার মনের দাগা বন্ধু আইলে কইও নাগো আমার মরণ কথা রে বন্ধু— আর ত সময় নাই! ৩০ আর ত সময় নাইরে বন্ধু আর ত সময় নাই— ৩১ [ রঙ্গিলার মোহ কাটাইয়া যেদিন রতন ঠাকুর আবার সজিস্তার দেশে ফিরিল সে দিন সে আর তার প্রিয়তমাকে পাইল না। সজিস্তার দীর্ঘশ্বাসের মত বাতাস আর বন-সোহাগী পাখীরা কাঁদিয়া কাঁদিয়া তাহাকে কন্যার মরণের খবর দিল। ] এই কথা শুনিয়া রতন ঠাকুর পাগল হইল— মাও বাপ বাড়ী ঘর সকল ভুল্যা গেল রে ! রতন ঠাকুর ! ঠাকুর আরে ! মাও কান্দে পন্থ পানে চাহিয়া ! ৩৫ দেশে নাই সে গেল রে ঠাকুর না ফিরিল ঘরে দেশে দেশে রতন ঠাকুর পাগল হইয়া ফিরে রে— রতন ঠাকুর ! ঠাকুর আরে ! মাও সে কান্দে পন্থ পানে চাহিয়া ! ৩৯ সমাপ্ত
-
-