সন্নমালা
প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা - চতুর্থ খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন
সন্নমালা , কথায় :— উজলা মাণিক, উজলা মাণিক, জন্ম হৈল রাজার ঘরে দিন দিন বাড়ে ॥ ৩ চান সুরুজ তারা— মায়ের বুক জোরা । ৫ চান সুরুজ তারা— বাপের আঁখি-তারা ॥ ৭ ঘর খানি আলা দুয়ার খানি ঝালা । মায় বাপে রাখে, নাম সন্নমালা ॥ ৯ সুরে :— আর ভাই রে ভাই— আত্তিশালায় আছে ওরে আত্তি , ভালা কথা, ঘোড়া না শালে ঘোড়া । ১২ ডাকে নামে ছিলাইন ওগো রাজা, ভালা, পুব দেশ জোরা নারে— আরে ভাই, ধামায় মাপ্যা ধন রাজার ভাঙ্গারে ত আছেরে বংশে বাত্তি দিতে রাজার এক পুত্র নাহিরে ॥ ১৬ কথায়:— ঘর আন্ধার বাড়ী আন্ধার। রাজা-রাণীর কাঁদন-কাটি সার॥ ১৮ বেপার-বাণিজ্যে পায় রে ধন পায়। ষষ্ঠী নাই সে দিলে পুত পাইব কোথায়॥ ২০ দেব-দোয়ারে মানে, মানে পীরের চিন্নি— আঁটকুরা রাজার না হয় পুত্র, না হয় কন্যা॥ ২২ [ কতকদিন এই রকমে কাটিলে, রাজার ঘরে কন্যা জন্ম লইল। মাতাপিতা খুব আদর করিয়া তাহার নাম রাখিলেন। ] কথায়:— সন্নের বরণ কন্যা ভালা। নাম রাখে সন্মমালা॥ ২৪ মায় বাপে গৈরব করে— আসমানে জ্বলে কি রে তারা আর চান। আমার না সন্মমালা পুন্ন মাসীর চান॥ ২৮ জমিনে জ্বলে কিরে মাণিক মণি রতন। আমার না সন্মমালা সাত রাজার ধন॥ ৩০ সুরে:— এক মাস দুই মাস আরে তিন মাস না গেল। দিন দিন করা মায়ের না কোলে শিশু বাড়িতে লাগিল রে॥ ৩২ ছয় মাসের বাড়ন কন্যা বাড়ে এক না মাসে। মায়ের কোলেতে কন্যা চান্দ সমান হাসে রে ॥ ৩৪ সেই হাসি ঝইড়া না পড়ে ভালা মায়ের আইঞ্চলে। লইক্ষ লইক্ষ চুম্ব না দিয়া মায় কন্যা লয় কোলে ॥ ৩৬ কথায় :— ডুগ ডাগর আঁখি। তারার সমান দেখি ॥ ৩৮ লাম্বা কেশ উড়ে। আডু বাইয়া পড়ে বান্ধি বা না বান্ধি ॥ ৪১ ধাই দাসীরে ডাইক্যা কয় রাণী। “বহু দুঃখে পাইয়াছি কন্যা দেব-দুয়ারে মানি ॥” ৪৩ তখন রাজা করলাইন কি, যত যত গণক আছিল তাঁর রাজ্যে সকলরে আন্ল ডাকিয়া। “ওরে গণক গণ্যা কুশল কও ধামায় মাপ্যা ধন লও কন্যার আয়ু বর— কি মত উত্তুরিব তার বিয়ার ঘর ॥” ৪৭ “ভয়ে কি নিভ্ভয়ে মহারাজ ?” “কও নিভ্ভয়ে।” তখন গণক গণ্যা কইল। সুরে :— “শুন শুন আরে রাজা কহিয়া না বুঝাই তুমারে রে। কৈন্যা যে জন্ম্যাছে রাজা এই না তুমার ঘরে রে ॥ অলক্ষ্মীর অংশে জন্ম কৈন্যার, শুন নরপতি। এহি কন্যার লাগ্যা তোমার নিবিব ঘরের বাতি ॥ ৫১ আত্তি ঘোড়া মৈরা যাইব, রাজা, যত পোষা প্রাণী। টুইয়ে ত লাগিব রাজা তোমার দুপুরে আগুনি ॥ ৫৫ রাজভাণ্ডারের ধন, রাজা, ফুঁয়ে যাইব উড়ি। দিনে দিনে অইবারে তুমি কড়ার ভিখারী ॥ ৬১ দেশে দেশে ভরমিবারে রাজা, রাজা আরে, কানন, বনে বনে। ৬৩ কবিলা ছাড়িব ঘাস তোমার দুঃখের কারণে ॥ ৬৫ পাষাণ না মিলাইব, রাজা, আরে দেইখ্যা তোমার দশা। দিনে দিনে আশা তোমার হইব নৈরাশা ॥ ৬৭ পুরীতে সন্ধ্যার বাতি, রাজা, আর জ্বলে বা না জ্বলে। ৬৯ সিতাবী কন্যারে রাজা পাঠাও বনবাসে ॥” ৭১ ( ২ ) পুরীতে উঠিল আরে কান্দনের রোল। রাজা কান্দে, রাণী কান্দে, কান্দে ধাই-দাসী ॥ ২ মায়েরে বুঝায় কন্যা, বাপেরে বুঝায়। “কি লাগিয়া কান্দ মাগো, কি পইরাছে দায় ॥ ৪ হিয়ার মাংস কাট্যা দিলে মাগো দুঃখু তোমার যায়। সেইত কাটিয়া মাগো দিবাম তোমার দায় ॥” ৮ রাজা কান্দে, রাণী কান্দে, ভালা আরে, এক্কই খাটে বৈয়া । জলন্ত আগুনি মায়ের উঠে রৈয়া রৈয়া ॥ ১১ “দশ মাস দশ না দিন গো তোরে রাখ্যাছি উদরে। স্তইনের না দুগ্ধু দিয়া মাগো পাল্যাছি তোমারে ॥ ১৩ পালা কুড়া জ্বালা বুঝে মাগো পাল্যাছে যে জন।” ঝিয়্যের না ধইরা গলা মায় জুড়িল কান্দন ॥ ১৫ “শুন শুন পরাণের ঝি গো তোরে বনে না দিয়া। ১৭ কি সুখে থাকিবাম ঘরে গো কোন্ বা ধন লইয়া ॥ ১৯ সোণামণি হারাইয়া গেল মোর আইঞ্চলে কেন গির। ২১ রাজ্য ছাইড়া সঙ্গত ভালা হইবাম বনান্তর॥ ২৩ ঝিয়ে ত কান্দিয়া বুঝায় “মা গো কহি যে তোমারে। আমার লাগ্যা না কর সে দুঃখু ছাইড়া দেহ আমারে॥ ২৫ জন্ম ত দিয়াছ বাপ-মাও গো কপাল দিবা কি? কপালে ত আছে তোমার মাগো বনবাসী ঝি॥” ২৭ এহি মতে কান্দন-কাটি সাত দিন রাইত না। কন্যারে লইয়া রাজা বনে চলিলাইন আপনে॥ ২৯ আরে ভালা বাঘ না ভালুক না রে ঘোর জংলায় বাসা। রাজ্য ছাড়িয়া আইল কন্যার জংলাতে বাসা॥ ৩ কামেলা যতেক মিলি হুকুম পাইল। পাতালতা দিয়া ভালা খয়রাত করিল॥ ৩৩ বান্ধিয়া ছান্দিয়া ঘর রাজা কন্যারে কহিল। “তোমার বরাতে মাগো এত দুঃখু ছিল॥ ৩৫ জনম তোমার মাও গো জোড়-মন্দির ঘরে। সোণার পালঙ্গে শুইতা মাগো পুষ্পের উপরে॥ ৩ আর মাগো কোন্ বিধি ভাঙ্গিল তোর এমন সুখের বাসা। রাজার বাড়ী ছাইড়া আইল মাগো কুঁড়ে ঘরে বাসা॥” ৩৯ এই মতে কাইন্দা বাপ গো হইল বিদায়। বনবাসে সম্মমালার এক মাস যায়॥ ৩’ অইল কি, সাধু সদাগর বাণিজ্যে যায়। বার বছরের পারি সঙ্গে লৈয়া। সাত ডিঙ্গা ধন, সাত খান পাল, সাত মাসের খোরাক, সাত রাজ্য ভরণ। দেশে রাজা কৈয়া দিছে—এই এই চিজ-বস্তু আমি চাই, না অইলে সদাগরের গর্দান যাইব। ভরা সায়র অলছ-তলছ পানি। কোন্ দৈবে করল দুষ্মনা॥ ২ বনের কাছে আইয়া সাত ডিঙ্গা চড়ে আইটকা গেল, তখন সাধু সদাগর মাঝি-মাল্লারে কয়, “ও মাঝি-মাল্লাগণ!”—“কও কও সদাগর কিবা নিবারণ।” “বনে উঠ্যা দেখ চাই বনে আছে কোন্ দেবতা, কোন্ বা পীর। পীরের সিন্নি দিবাম, দেবতার দিবাম পূজা। ভরা সায়রে দিল চড়া। সাত মাসে না ফিরি রাজা লইব গর্দান।” সুরে :— তবে মাঝি-মাল্লাগণে বন ভাঙ্গিয়া বিচারে। গাছ বিরিঙ্ক যত দেখে একে একে॥ ৪ বাঘ ভালুক না দেখে ময়ূরা-ময়ূরী। হরিণ না হরিণা দেখে ত ভালা জঙ্গলার পরী॥ ৬ হীরামণ শাড়ী দাড়াকের ডালে। সোণালী কেতরা দেখে সোণা এন জ্বলে॥ এর মধ্যে দেখে কন্যা সোণার বরণ। ডিঙ্গায় ফিরিয়া তারা কয় বিবরণ॥ ১০ “শুন শুন সাধু আর কৈয়া বুঝাই তোরে রে। জঙ্গলায় দেখিলাম আচানকা কন্যা এক বসতি না করে ॥ ১২ দানাপরী হবে কি হবে বনের দেবতা। এমন সুন্দর রূপ নাহি দেখি কোণ ॥” ১৪ তবে সাধু সদাগর মেলা যে করিল। কন্যার নিকটে গিয়া দরিশন দিল ॥ ১৬ আইঞ্চল বিছাইয়া কন্যা শুইয়া নিদ্রা যায়। মা মা বলিয়া সাধু কন্যারে জিগায় ॥ ১৮ “কোথা কারে সুন্দর কন্যা আইলা কোথা হইতে। রাজার ছাওয়াল, কেন আইলা বনেতে ॥ ২০ আসমানের চান্দ কেন জমিনে বিছান। মাও বাপ কন্যা লো তোর জিয়ন্তের পাষাণ ॥ ২২ ケমন কইরা কন্যা লো তোরে কোন্ পরাণে ছাড়ি। এমুন বয়স কালে লো কৈল বনচারী ॥” ২৪ “শুন শুন ধর্ম্মের বাপ গো কহি যে তোমারে। জন্ম লইয়া ছিলাম আমি এক রাজার ঘরে ॥ ২৬ নিষ্ঠুর হইয়া মাও বাপে করলো বনবাসী। কান্দিয়া কাটিয়া আমি গো পোহাই দিবানিশি ॥” ২৮ কন্যা তখন সাধুর কাছে যত বিরি বৃত্তান্ত এক এক কইর্যা সকল কইল। তখন সাধু কইল, যা থাকে কপালে এই কন্যারে লইয়া যাইবাম দেশে। আচরিত কথা ; যখনে সাধু কন্যারে ডিঙ্গায় তুল্যা লইল তখন ডিঙ্গা পানির উপর ভাস্যা উঠল। কন্যার রূপে ডিঙ্গা উজল, পানি তর্ তর্, কন্যার রূপে সাত ডিঙ্গা পশর। সাত মাস ঘুইর্যা সাধু বাড়ী চল্ল। এইবার বাণিজ্যে তার দোন দ্বিগুণ লাভ। পনে কাউন; জিরায় হীরা; সাধুর আনন্দ দেখে কে? মার্ মার্ কইর্যা সাত মাসের সাত দিন থাকৃতে ঘাটে ডিঙ্গা লাগল। গলুইয়ে ধান, দূর্বা, সিন্দুর। সদাগরের সাত নারী ডিঙ্গা আর্য্যা পুছ্যা ঘরে ধন-দৌলত নিল তুল্যা॥ ধন নিল দৌলত নিল রে আর বা নিল কি ? নিছিয়া পুঁছিয়া লৈল সদাগরের ঝি ॥ ৩০ এক পুত্র আছিল সাধুর আরে ভাল। অন্ধের নয়ন। can দেখিতে সুন্দর কুমার সোণার বরণ ॥ ৩২ কিছু কিছু কুমারে সাধু শিখায় লেখাপড়া। কিছু কিছু শিখায় সাধু বাণিজ্য-বেপার ॥ ৩৪ কুড়ি বচ্ছর যায় কুমার পড়িল যৌবন। এন কালে কন্যার সাথে হইল দরিশন ॥ ৩৬ দুইজনে একইথান বৈয়া লেখাপড়া করে। সদাগরপুত্র কন্যারে হাত ধইরা লেখাপড়া শিখায়। এই মতে যায় দিন। পরথম যৌবন, চাঁদ-সুরুজে মিলন। তারা দুই জনরে দেখলে চৌক্ষের ঘুম পলকে যায়, পেটের ভুক্ লুকায়। যে দেখে, কয়—কি সুন্দর দুইজনে ! সোণার পক্ষী, পক্ষিনী! মাথায় লৈয়া পুষ্পের ডালা কন্যা ফুল তুলিতে যায়। শিরে ত চিকুন কেশ পায়ে ত লুটায়॥ ৩৮ পুষ্প না তুলিয়া কন্যা গাঁথে ফুলের মালা। সাধু-পুতের গলায় মালা বিনাইত উজালা॥ ৪০ এক দিনের কথা কন্যা কোন্ কাম করিল। লিখিতে লিখিতে কলম ভালা ভূমিতে পড়িল॥ ৪২ পরথম যৌবন কন্যা অঙ্গ হইল ভারী। আলসে ভাঙ্গিয়া পড়ে বেকুলা সুন্দরী॥ ৪৪ “শুন শুন কুমার আরে কৈয়া বুঝাই তোমারে। উঠিতে না পারি আমি গা যেন কেমন করে॥ ৪৬ কলম তুলিয়া কুমার রে তুল্যা দেও মোর হাতে। মাথা খাও নবীন রে কুমার লাজে নাই সে বাঁচি॥ ৪৮ পড়ায় নাহিক মন রে হইলাম উদাসী॥ আজি যদি ক্ষেমা রে কর কুমার আর সে নাহি চাই। আমার পড়ার স্থান করবাম অন্য ঠাঁই।” ৫১ “সত্য কর সুন্দর রে কন্যা সত্য কর বৈয়া— যুদি দেই তুলিয়া কলম মোরে করব কিনা বিয়ারে!” ৫৩ “পরের ঘরে থাকিরে কুমার পরের ঘরে বাসী। কিবা সত্য করবাম আমি হইয়া পরের দাসী॥ ৫৫ কিবা সত্য করবাম কুমার, কুমার আরে, কি দেই বা উত্তর। ভাবিয়া চিন্তিয়া আমার গায়ে উঠিল জ্বর॥ ৫৭ ভাবিয়া চিন্তিয়া আমার মাথায় হইল বিষ। কিবা ন করিব সত্য নাই সে আমার দিশ॥ ৫৯ বাপে খেদাইল কুমার অলক্ষ্মী জানিয়া। বেকুল জঙ্গলার মধ্যে নিব্বাস দিল রে নিয়া॥ ৬১ গাছের গলা ধইরা কান্দিরে কুমার এই করলাইন ধাতা। আমার কান্দনে ঝড়ে দারাকের পাতা॥ ৬৩ দুই আঙ্খির জলেরে কুমার, কুমার আরে, বসুমাতা ভিজে। পালঙ্ক ছাড়িয়া শয়ান কঠিন মাটির শেজে॥ ৬৫ আমারে করিলে বিয়া! পড়িবে বিপাকে। গাইষ্ঠে বাইন্ধা নিজের মন্দ পরে কেবা দেখে॥ ৬৭ অধম অলক্ষ্মী কন্যা, কুমার রে, বাপে খেদাইল। সংসারের যত লোক ঠাঁই নাই সে দিল॥ ৬৯ ক্ষেমা কর সুন্দর কুমার, কুমার রে, চিতে ক্ষেমা দিয়া। কত কত রাজার কন্যা মায় করাইব বিয়া॥ ৭১ যদি যাইরে গাছের তলে অভাগীর কর্ম্মদোষে। দেও গাছ জ্বলিয়া যায় মোর কর্ম্মের বাতাসে॥ ৭৩ জলে গেলে শুকায় জল কেউ না দেয় থান। সুন্দর পুরীতে নাই সে দেও অলক্ষ্মীরে স্থান॥” ৭৫ “শুন শুন সুন্দর কন্যা তুমি না ভাবিয়। সকল ছাড়িয়া কন্যা কর্ব্বাম তোরে বিয়া লো॥ ৭৭ ভরা বানিজ্জি মোর উভে হউক তল। তোমারে দেখিয়া কন্যা হইয়াছি পাগল॥ ৭৯ ভাল মন্দ আমার হবে লো কন্যা তোমার নাই সে দায়। সত্য কর সুন্দর কন্যা গায়ে দিয়া হাত॥” ৮১ “সত্য করিলাম রে কুমার এই খানে ত বসি। আজি হইতে হইলাম কুমার শ্রীচরণের দাসী॥ ৮৩ তবে ত তুলিয়া কলম কন্যার হাতে দিল॥ ৮৫ ( ৪ ) কন্যার রূপের কথা সহরে বাজারে রাষ্ট্র-পষ্ট। গায় গেরামে শুনে। রাজায় পরজায় জানে। চান্দের সমান রূপ উজল ঘরের বাতি। সদাগর বন থ্যাকা আন্ছে পরথম যৌবন কন্যা রূপবতী। এরে শুইনা রাজার কন্যা কল্ল কি, চামর ধামর দুই ধাই-দাসী পাঠাইল সদাগরের কাছে। রূপবতী কন্যার সাথে রাজকন্যা পাতবা সহেলা। ‘সদাগর সদাগর বাড়ীত নি আছ? রাজকন্যা পাঠাইল তোমার কন্যা দেখতো। তার বড় সাধ আলা ঝালা গলার মালা তোমার কন্যার সাথে রাজ কন্যার হইব সহেলা। চুলী ডগরী যে যেখানে আছে এতমনদার খেজমতকার সকলের নিমন্তন আজ, রাজকন্যার সঙ্গে সদাগর-কন্যার সহেলা।’ রাজ না বাড়ীর আগে পুষ্পের বাগান। মধু মাসে ডালে বইসা কুইলায় করে গান॥ ২ আকর বাকর চাম্পা নাহি হয় বাসি। ফুট্যা রইছে গন্ধরাজ সোণালী অতসী ॥ ৪ দুই সইয়ে কোলাকুলি বনে ত বেড়ায়। মধুমাসে ডালে বইসা কুইলাতে গায় ॥ ৬ পরথম যৈবন দোঁহে রূপে ত উজালা। পুষ্প তুলিয়া দোঁহে গাথে বনমালা ॥ ৮ দৈবের নিবন্ধ কথা কহন না যায়। ছিড়িল কন্যার কেশ আকড় ’ কাঁটায় ॥ ১০ দিশা—রূপের বাহার গো, ঝাড়িয়া বান্ধিত মাথার কেশ। রাজকুমার “শুন শুন পরাণের বইন গো কহিয়া বুঝাই তরে। কোন্ জনে আইল কাইল বাগান ভরমণে ॥” ১২ রাজকন্যা “শুন শুন প্রাণের ভাই কইবাম তোমায় কী। কালুকা বেড়াইয়া গেল সদাগরের ঝি ॥” ১৪ রাজকুমার “শুন শুন পরাণের বইন গো কহি যে তোমায়। কি মত দেখিতে কন্যা দেখ বানি যায় ॥” ১৬ রাজকন্যা “শুন শুন পরাণের ভাইরে বলি তোমার ঠাঁই। এমতি সুন্দর রূপ তিরভুবনে নাই রে ॥ ১৮ এক তিল রূপ না কন্যার লক্ষ টাকার মূল। হাঁটিতে ভূমিতে পড়ে দীঘল মাথার চুল ॥ ২০ বন থাক্যা সদাগর আনিল পাইয়া। সহেলো পাতাছি আমি সুন্দর দেখিয়া ॥ ২২ পরীর সমান রূপ অঙ্গে নাই সে ধরে। হাটিয়া যাইতে রূপ তার তিলে তিলে ঝরে ॥ ২৪ রাজকুমার “শুন শুন প্রাণের বইন গো কহি যে তোমারে। অছিলা ধরিয়া কন্যা দেখাও আমারে ॥” ২৬ পরদিন আবার নিমন্তন। দুই সইয়ে কোলাকুলি হুলাহুলি। গাছের পাতায় লুকাইয়া রাজপুত্র রূপ দেখিয়া পাগল।… “শুন পরাণের বইন, আমি পরতিজ্ঞা করছি।” “কি পরতিজ্ঞা কইরাছ?” “এই কেশ যার, তায় বিয়া করবাম। আর যদি না পাই তা অইলে জোড়-মন্দির ঘরে না খাইয়া না লাইয়া পরাণ তেগবাম।” রাজকন্যা তখন একদিন চুপি চুপি সদাগর-কন্যার মনের কথা লৈল। অনেক দুঃখ কইরা কন্যা তখন বাপের বাড়ীর কথা হইতে আরম্ভ না কইর্যা বনবাসের কথা কইল। একটা কথাও গোপন করল না। সদাগর-পুত্রের সাথে সত্য করনের কথা, তাও কইল। কইল যে সত্যের কারণ আমরার বিয়া অইয়া গেছে, একথা কেউ জানে না। “শুন শুন পরাণের সই গো কহি যে তোমারে। আমার গোপন কথা তুমি না কইয়ো গো কারে ॥ ২৮ একদিন হস্তের কলম গো ভূমিতে পড়িল। সেই কলম সাধুর পুত্র হস্তে তুল্যা দিল ॥ ৩০ সত্য কইরলাম রাজার কন্যা গো কলম হাতে লইয়া। শুন শুন সাধুর পুত্র তোমায় করবাম বিয়া ॥ ৩২ আকড় অতসী চাপা ফুট্যা হইল বাসি। আজি হইতে হইলাম তোমার শ্রীচরণের দাসী ॥” ৩৪ যত ইতিকথা কন্যার ভাইয়েরে জানায়। কুবুদ্ধি রাজার পুত্র রহে অছিলায় ১। ॥ ৩৬ রাজপুত্র জোড়-মন্দিরের কপাট লাগাইয়া শুইল, খায় না ঘুমায় না। রাজ্য জুড়িয়া হুলুস্থুল। রাজারাণী পাগল। রাজপুত্র কেন এমন, জানতে জানতে জান্ল রাজপুত্র এক ধন চায়। কি ধন চায়। “সাপের মাথার মণি।” রাজা সদাগরে ডাক্যা কইল, “আজ থাক্যা ছয় মাসের মধ্যে সাপের মণি আন্যা হাজির কর, নইলে জান-বাচ্চার ২ গর্দান যাইব।” সদাগর চিন্তায় পড়ল। বাণিজ্য কইর্যা মাথার চুল পাকাইছে, দাঁত পড়ছে, রাজার বন্দরে কত কত রাজার দেশে গিয়াছে,—সাপের মণি কোনো দিন দেখে নাই। লোকে কয় শুনা কথা— বড় দুঃখিত হইল সদাগর কহে পুত্রে আগে। “এতক দিন পরে পুত্র খাইল জংলার বাঘে ॥ ৩৮ রাজার হুকুম হইল আনুতে সাপের মণি। কোথায় জ্বলে সাপের মণি শব্দেও না শুনি ॥” ৪০ সাধু-পুত্র কহে “বাপগো না চিন্তিও তুমি। বাণিজ্য কারণে আইজ যাইবাম আমি ॥ ৪২ অতিবৃদ্ধ অইলা তুমি, ঘরে বইস্যা থাই। ডিঙ্গা সাজাইয়া দেও গো বাণিজ্যেতে যাই॥” ৪৪ মায় মানা বাপে মানা, মানা নাই সে শুনে। যাইব সাধুর পুত্র বাণিজ্য কারণে ॥ ৪৬ “শুন শুন সুন্দর কন্যা কহি যে তোমারে। ছয় মাস থাক তুমি আমার বাপের পুরে ॥ ৪৮ রাজার আদেশ হইল আন্তে সাপের মণি। বিরধ বাপে না পাঠাইব যাইব আপনি ॥ ৫০ ধরিয়া চাঁচর কেশ কন্যা পা দুখানি মুছে। “এইত চরণ ছাড়া আমার সংসারে কি আছে ॥ ৫২ ভালমন্দ নাই সে জানি অন্য নাই সে চাই। বিদেশে বিপাকে রক্ষা করুন গোঁসাই ॥” ৫৪ লাল নিশান, নীল নিশান উড়াইয়া সদাগর-পুত্র যায় বৈদেশে। সাত শ ডঙ্কা ঘন ঘন বাজে। কে যায় বাণিজ্যে? সদাগরের পুত্র। নগরের লোকে জয় জয়। ছয় মাস পর সাধু-পুত্র দেশে ফিরুল। সাপের মণি নাই, আচাভুয়া কথা। সদাগর-পুত্র পা’র পর্বত ভাইঙ্গা হাজার-বিজার সাপ ধইরা আন্ছে; লগে তার একদল বাঘা—শঙ্খরাজ, মণিরাজ, মাছুয়া, চিলাবাকা, খৈয়াগোখুরা। সাপ আছে মণি নাই। রাজা গোঁসা হইল। অত শত সাপের মণি সদাগর-পুত্র সম্বুরিয়া লৈছে; রাজারে ফাঁকি দিছে এই সাপ দিয়া সদাগর-পুত্ররে খাওয়াও, তবে আমার পুত্র বাঁচে। রাজার হুকুম পাইয়া লোক জনে সদাগর-পুত্রের হাতে গলায় ছাইন্ধা বাইন্ধা সাপের মুখে ফালাইয়া দিল। কালত গরল বিষরে অঙ্গ ছাইল। কাল বিষের জ্বালায় সাধু-পুত্র পরাণ ত্যজিল ॥ ৫৬ সোণার বরণ অঙ্গ, বিষে হইল ছালী। সাধু সদাগর কাঁদে পুত্র পুত্র বলি ॥ ৫৮ মরা পুত্র কোলে কান্দে সাধুর না নারী। নগরিয়া লোকে কান্দে করি হাহাকারি ॥ সাপের ডৌকা পুড়িতে ভাইরে দেশাচারে মানা ॥ ৬০ বান্ধিল ডাগর ভেরা নগরের লোকে। নেহালি নেহালি সাধু পুত্র মুখ দেখে ॥ ৬৩ ভেরায় তুলিয়া পুত্র ভাসাইল জলে। কান্দিয়া বেকুলা কন্যা ভাসে আখ্থি জলে ॥ ৬৫ “শুন শুন ধর্ম্মের রাজা কহি যে তোমারে। সাগর শুকাইল আমার কপালের দোষে ॥ ৬৭ বিরখ নীচে খাড়াইলাম ছায়া পাইবার দায়। সেই বিরখ জ্বলিয়া গিয়া হইল অঙ্গার ॥ ৬৯ তুমি ত ধর্ম্মের রাজা রাজ্য অধিপতি। পতির সঙ্গে ত যাইতে কর অনুমতি ॥ ৭১ সদাগর শ্বশুর ওগো মোর কথা ধর। স্বামীর সহিত যাইতে গো অনুমতি কর ॥ ৭৩ জান না না জান বিয়া গো করিল আমারে। অল্প কালে ত পতি গো ছাইড়া যায় সে মোরে ॥ ৭৫ কার বা বাড়া ভাতে গো দিয়াছিলাম ছালী । কপাল খাইতে মোরে কে দিলরে গালী ॥ ৭৭ কোন্ কাঁচী বাছুরার গলা না টিপিয়া। মায়ের উরের দুধ খাইছিলাম কাড়িয়া ॥ ৭৯ কার পুত্র খাইলাম জানি বাঘুনী হইয়া। কার ধন বা হইরাছিলাম গো মাথায় বাড়ি দিয়া ॥ ৮১ সাপিনী হইয়া খাইলাম কোন্ বা বাসার ছাও । কোন্ দোষে পতি আমার, মোরে ছাইড়া যাও॥” ৮৩ দুই চইক্ষের জলে কন্যার নদী নালা ভাসে। ঢেউয়ের উপর ভেরা মরা লৈয়া ভাসে ॥ ৮৫ ভাসিয়া চলিল ভেরা মরারে লৈয়া। পাছে পাছে চলে কন্যা পাগল হইয়া ॥ ৮৭ নদীর না পাড়ে পাড়ে কন্যা কান্দিয়া বেড়ায়। আইঞ্চল ধরিয়া কন্যা দুই চোখ, মুছে । চলিল সুন্দর কন্যা মরা স্বামীর পাছে ॥ ৯০ ( অসমাপ্ত )