আয়না বিবি
পূর্ববঙ্গ গীতিকা - তৃতীয় খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন
আয়না বিবি
পরিচয়—পালা আরম্ভ
( ১ )
চান্দের না ভিটায় ঘর আরে ভালা মামুদ উজ্জ্যাল সদাগর রে
তার কথা শুন দিয়া মন রে।
হায় সাধু মামুদ উজ্জ্যাল রে
শিশু থুইয়া বাপ মরে মায় পাল্যা বড় না করে
হায় ভালা এক ডইন এক ভাই সংসারে ॥ ২
হায় সাধু মামুদ উজ্জ্যাল রে।
নারাইন খলার ১ কানছা ২ বাইয়া আরে ভালা চলে ভেড়ামনা ৩ উজাইয়া
পারে বাড়ী দেখিতে সুন্দর ।
খাগরে ৪ করিয়া বিউনী ৫ উলু ছনে দিয়ারে ছানী
সুন্দী বেতে বান্ধিয়াছে ঘর ॥ ৪
টঙ্গি যে আছিল তার অতিশয় চমৎকার
আয়নার মতন ঝিলিমিলি।
গিরস্তি ৬ গুরজান ৭ যত তাহা বা কহিবাম রে ৮ কত
ধনে পুত্রে ছিল ঠাকুরালী ॥ ৬
হায় ! এই মতে রাখ্যা বাপে সংসার ছাড়িল
সোণার না জমিন বাড়ী পড়া ৯ যে পড়িল। ৮
বড় বাড়ী বড় ঘর রে বড় কইর না আশা।
যেই বাড়ী রাখিয়া বান্ধা লইব নদীর কূলে বাসা॥ ১০
হাট ভাঙ্গিলে কে কোথায় যায় কেউ না দেখে চাহিয়া।
পক্ষী যেমন বিরক্ষ ছাইড়া যায় রাত্র পোহাইয়া॥ ১২
পইড়া থাকে দরদালানী পইড়া থাকে বাড়ী।
জিজ্ঞাসাতে না আইয়ে বান্ধা কোথায় পুত্রনারী॥ ১৪
কুলের ছাওয়াল মামুদ উজ্জ্যাল একলা পড়িল।
যতন না কইরা মায়ে পালিতে লাগিল॥ ১৬
এই পুত্র বড় হইলে দুঃখিনীর কপালে
সুখের দিন আইব ফিরিয়া।
এক কন্যা পুত্র তার অঙ্কের নড়ি যেন মার
দিন গোয়ায় দুঃখেতে পড়িয়া রে॥ ১৮
হায়! সাধু মামুদ উজ্জ্যাল রে।
(২)
হায় সায়রে না ভাইস্যা যায় কিনারা পাইল।
এক দুই বচ্ছর কইরা পুত্ৰ বাড়ীতে লাগিল॥ ২
তিন বচ্ছর যায় পুত্রের হাসিয়া খেলিয়া।
চাইর বচ্ছর যায় পুত্রের আশার পানে চাহিয়া॥ ৪
পাঁচ ছয় করি তার দশ বচ্ছর যায়।
ঘর গিরিস্তিরে মায় বানাইল আশায়॥ ৬
ষোল বছরের কালে আাশা হইল মনে।
হালের বলদ সাধু লইলেন কিনে॥ ৮
সর জমিনে ১ উজ্জ্যাল চাযে মন দিল।
কার্তিক মাসেতে উজ্জ্যাল জালা ২ যে ফালাইল॥ ১০
আগুন মাসেতে উজ্জ্যাল ক্ষেতে হাল বায়।
কিছু কাম নিজে করে কিছু কামলায় ৩॥ ১২
পৌষ মাসেতে রুয়া ৪ পৌষের আবরে (?)।
পাঁচ কোটা ৫ ক্ষেত মাসুদ উজ্জ্যাল রূপণ না করে॥ ১৪
রুয়া না পাইয়া মামুদ উজ্জ্যাল ক্ষেতে সিঞ্চে পানি।
মাথার ঘাম পায়ে গড়ে দেইখ্যা হায় ভালা কান্দে মা জননী॥ ১৬
আহা রে পরাণের পুত্র এমন হইল।
কেচেরা বয়সকলে ৬ সংসারে মজিল॥ ১৮
বৈশাখ মাসেতে মাসুদ উজ্জ্যাল কোন কায করে।
ধারের কাঁচি লইয়া সাধু চলিল হাওরে ৭॥ ২০
সঙ্গে লইল হালের বলদ মাঠে চইল্যা যায়।
পাকিল সাইলের ধান ৮ কিছু কিছু দায় ৯॥ ২২
ধান না দাইয়া ১০ উজ্জ্যাল সাধু বাড়ীতে আনিল।
বাতরে ১১ মারান দিয়া ঝারিয়া লইল॥ ২৪
পুত্রের পরথম কামাই ১২ মায় মাথায় করিয়া।
গোলায় তুলিল মায় মাদারে ১৩ স্মরিয়া॥ ২৬
আগ কুলা হইতে মায় যতনে রাখিল ।
সেই ধানে পীর মাদারের সিন্নি যে করিল ॥ ২৮
হালের খোরাকী ঘরে মনে হইল হাসি।
কতদিন অভাগী মায় রইয়াছে উবাসী ॥ ৩০
পুত্র আমার বাঁচিয়া থাউক লোহার কাটী হইয়া।
পীরের সিন্নি মানে মায় আইঞ্চল পাতীয়া ॥ ৩২
( ৩ )
জ্যৈষ্ঠ মাসের দীঘল দিন কভু না ফুরায়।
চউক্ষ আলমালাইতে নিশা পরভাত হইয়া যায় ॥ ২
আম পাকে জাম পাকে ডালে কাগার রা ।
কাটিয়া গাছের ফল মায় পুত্রে রে খাওয়ায় ॥ ৪
জ্যৈষ্ঠ মাস গেল যাদুর মায়ের পানে চাহিয়া।
এই মাসে উজ্জ্যাল সাধুর না হইল বিয়া ॥ ৬
এই মাসে বনের পক্ষি ডালে বান্ধে বাসা।
পুত্র বউ না আইল ঘরে মায়ের না পূরিল রে আশা ॥ ৮
আইল আষাঢ় মাস লইয়া মেঘের রাণী।
নদী নালা বাইয়া আইসে আষাঢ়িয়া পানি ॥ ১০
শুকুনা নদীতে ঢেউয়ে তোলপার করে।
বাণিজ্য করিতে সাধু যত যাহে দেশান্তরে ॥ ১২
পাল উড়ে পাল পড়ে রে উজান ভাসে নাইয়া ।
কোনবা দেশে যায় সাধু উজান নদী বাইয়া ॥ ১৪
গিরকর্ম্ম ১ কর মাগো আমার কথা ধর।
বাণিজ্য করিতে যাইবো কিবান কথা ২ বল ॥১৬
হাতের না কাম মাগো ভূমিতে ফেলায়।
অন্ধের মাণিক পুত্র ছাইড়া কিমতে থাক্ব মায় ॥১৮
বাণিজ্যেতে কায্য নাই রে ঘরে বইস্যা খাও।
এই ধন বৈদেশে দিয়া পরাণ কেমনে ধরূব মাও ॥২০
যত যত বুঝায় পুত্রে পরবোধ না মানে।
বাণিজ্যে যাইবে উজ্জ্যাল কালুকা বিয়ানে ৩ ॥২২
সৃতার আনিয়া মামুদ উজ্জ্যাল নায়ের বান্ধে খিলি।
লোয়ার টক্কর মাইরা দিল গাব কালী ॥২৪
ছৈ ছাপ্পর ৫ বান্ধে যতেক আলিমাছি ৬।
জব্বর করিয়া বান্ধে নাও বান্ধার কাছি ॥২৬
সকাল করিয়া মায় ঘুমতি ৭ উঠিল।
মনৈদেশী পুত্রের লাগ্যা ৮ রন্ধনা করিল ॥২৮
রন্ধনা কইরা যে মায় পুতেরে খাওয়ায়।
এক প্রহর মধ্যে সাধু বাণিজ্যেতে যায় ॥৩০
শাইলার চাউল দিল মায় পুত্রের লগে।
পীরের সিন্নি মান্যা মায় আগে পীরেরে ছেলাম জানায়।
পীরের কদরে ৯ পুত্র ফইির পায় মায় ॥৩৩
কিছু কিছু দিল মায় বিন্নি ধানের খৈ।
কিছু কিছু দিল লগে ঘরুয়া মেষের দৈ ॥৩৫
আপছোস্ খাইতে দিল ভাল খইর খাজিয়ার চাউল।
বিদায় করিয়া মায় হইল বাউল॥ ৩৭
আষাঢ়িয়া মেঘের ধারা চক্ষে বহে পানি।
জমিনে পড়িয়া কান্দে অভাগী জননী॥ ৩৯
মাও সে জানে পুত্রের বেদন গো আর জানিবে কে।
দশমাস দশদিন ভালা উদরে রাখলে যে॥ ৪১
ঢেউয়েতে ভাঙ্গিয়া পড়ে নদীর পাহার।
এরে দেইখ্যা প্রাণে কান্দে অভাগিনী মার॥ ৪৩
সাওরে ডাকিয়া বান ঢেউয়ে মারে পাক।
অভাগিনী ঘুইরা বেড়ায় কুস্তকারের চাক॥ ৪৫
আম্মানেতে কাল মেঘ দেওয়ায় ঢাকে ঘন।
ঘরে বান্ধা নাইসে থাকে কান্দে মায়ের মন॥ ৪৭
এই বুঝি আইসে পুত্র পালের নাও বাইয়া।
উজান চইল্লা যায় নাও মাও সে থাকে চাইয়া॥ ৪৯
এহি মতে কাইন্দারে মায়ের ছয় মাস যায়।
কোন্ বা দেশে গেল পুত্র খবর নাই সে পায়॥ ৫১
হায় শুন শুন সভার ভাইরে শুন দিয়া মন।
কোন্ বা পথে গেল সাধু বাণিজ্য কারণ॥ ২
ভেড়ামনা বাইয়া সাধু উত্তরে চলিল।
শিবার বাঁক হাতের ডাইনে পড়িয়া রহিল॥ ৪
ভাগীদারে কয় উজ্জ্যাল সন্ধ্যা যে মিলায়।
চোর ডাকাইতের ভয় যাওন হইল দায়॥ ৬_
এইখানে বান্ধি নাও আইজরে নিশি থাকি।
অন্যজনে কইছে তবে উজ্জ্বলরে ডাকি॥ ৮
বেবান বান্ধের মাঝে যাইয়া কার্য্য নাই।
এই গেরামের বাঁকে আইজ থাক্যা যাই॥ ১০
পারেতে হিজলী গাছ জলে পড়ে ডাল।
কাছিতে বান্ধিয়া নাও করিল সামাল॥ ১২
আগুন আনিতে উজ্জ্বল সাধু কোন্ কাম করে।
নাওত ছাড়িয়া সাধু উঠে বালুচরে॥ ১৪
কিছু দূরে গিয়া সাধু দেখে ডেপুরা একখানি।
বৈসা আছে বুড়া মানুষ এক চক্ষে তার পানি॥ ১৬
উজ্জ্বলে দেখিয়া বুড়া ডাকিয়া আনিল।
আপনার হালচাল যত কহিতে লাগিল॥ ১৮
দুনিয়া ভেতরে বান্দার আরে ভালা আর কেউ নাই।
গ্রামেতে বসতি করে এক চাচার ভাই॥ ২০
জোত জমা ছিল, নিচে নদীতে ভাঙ্গিয়া।
কামাই কইরা খাওয়ায় এমন নাই যে অর্জনিয়া॥ ২২
দিনের দিন মানে একবার ভাত খাই।
তবুও দিনের নাগাল দৌড়াইয়া না পাই॥ ২৪
এক কন্যা আছেরে বান্দার অন্ধের যেমন নড়ি।
কহিতে কন্যার কথা বহে চক্ষের পানি॥ ২৬
বিয়ার হইল বছর কেমনে দিয়াম বিয়া।
এর দুঃখে যাইব আমায় কয় বর কাটিয়া॥ ২৮
এতেক বলিয়া বান্দা কান্দিতে লাগিল।
এহেন কালেতে শুন কোন কাম হইল॥ ৩০
পানি লইয়া আয়না তবে ফইিরা আইল বাড়ী।
উডানে ১ বইয়া দেখে ভিন্ দেশী পুরুষে ॥ ৩২
লাজে রাঙ্গা হইল মুখ টাঙ্গ্যা ঘুরে গা।
চলিতে চাহিলে কন্যায নাই সে উঠে পা ॥ ৩৪
উজ্জ্যাল সাধু দেখে কন্যার পরথম যৌবন।
এমত ছুরত সাধু ভাল না দেখে কখন ॥ ৩৬
দুই নয়ান দেখিয়া উজ্জ্যাল সাধু নয়ানে বুঝায়।
মাথার কেশ উবুত ২ হইয়া পড়িয়াছে পায় ॥ ৩৮
বসনে না ঢাকে অঙ্গ পড়ে ঝলৃকিয়া ৩।
কন্যারে দেখিয়া সাধুর না ধরয়ে হিয়া ॥ ৪০
দেশে আছে চাম্পার ফুল ফুট্যা থকে গাছে।
সেও চাম্পা মৈলান হবে এই কন্যার কাছে ॥ ৪২
হায়! পরিচয় কহিল সাধু মাও বাপের নাম।
পরিচয় কথা উজ্জ্যাল কহে নিজ গ্রাম ॥ ৪৪
পরিচয় শুনিয়া বান্দা কান্দিতে লাগিল।
বয়স কালে তোমার বাপ দোস্ত যে আছিল ॥ ৪৬
বাপের কথা যত ইতি সাধু শুনিয়া শ্রবণে।
আরবার দেখা দিও ফিরিবার দিনে ॥ ৪৮
এই কথা কহিয়া মামুদ উজ্জ্যাল আগুনে মাগিল।
ভেউয়ায় ৪ করিয়া কন্যা আগুন আন্যা দিল ॥ ৫০
চারি চক্ষে চাওয়া চাওয়ি ভালা মন বান্ধা থুইয়া।
পুব দেশে চলে সাধু নাও ভাসাইয়া ॥ ৫২
উজ্জ্বল ও আয়না-১৯৮ পৃঃ
জগতে এমন অবোধ কে আছে যে, সাধ করিয়া আত্মবিচ্ছেদ ঘটাইতে চায়? জীবজগতে এবং মানবসমাজে যাহা-কিছু বাঁধন তাহা যেমন একদিকে আমাদিগকে রক্ষা করিতেছে তেমনি আর-একদিকে আমাদিগকে পীড়িত করিতেছে। এই বন্ধন যদি একেবারেই না থাকিত তবে আমরা ধূলিসমষ্টির মতো ছড়াইয়া পড়িতাম এবং আমাদের আত্মরক্ষা করা অসম্ভব হইত। আবার, এই বন্ধন যদি আমাদের চতুর্দিকে নিরেট হইয়া আমাদিগকে লেশমাত্র স্বতন্ত্র চলিবার অবসর না দিত তাহা হইলেও আমরা জড়ের মতো জড়ীভূত হইয়া অচিরকাল-মধ্যে বিনাশপ্রাপ্ত হইতাম। এইজন্য সমাজে সর্বত্রই বন্ধনের আবশ্যকতা এবং স্বাতন্ত্রের আবশ্যকতা দুই রক্ষা করিতে হইবে। এই দুই কঠিন শক্তির সংঘর্ষে সর্বদাই আত্মরক্ষা এবং সমাজরক্ষা করিয়া চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
একদিকে সমাজের আকর্ষণ আর-একদিকে নিজের স্বাতন্ত্র্য্যপ্রয়োজন, এই দুই লইয়া সমাজ চলিতেছে। ইহার মধ্যে কোনো এক দিকে অতিমাত্র হেলিয়া পড়িলেই সমাজ উৎসন্ন যায়। অতিমাত্র স্বাতন্ত্র্য অর্থাৎ বন্ধন ও শৃঙ্খলার একান্ত অভাব যেখানে, সেখানে সমাজ বালুকাসমূহ; আর যেখানে বন্ধনই চরম সীমা, সেখানে সমাজ পাথরের মতো কঠিন— সেখানে তাহার বৃদ্ধি নাই, গতি নাই, কালক্রমে তাহা ধ্বংসের দিকেই উন্মুখ হয়।
গিরকর্ম্ম করে কন্যালো আলো কন্যা চক্ষে কেন পানি।
কোন্ জনে জ্বালাইয়া গেল তোর মনের আগুন ॥ ২
এইমন যৈবন কন্যালো তোর যায় অকারণে।
কাঞ্চা বয়স কালে লো ধরিয়াছে ঘুণে ॥ ৪
জ্বালাইতে সন্ধ্যার বাতি লো মনে নাই যে রয়।
জলের ঘাটে গেলে কন্যা দুরে চাহিয়া রয় ॥ ৬
কোন্ দেশ হইতে আইল নাইয়ারে নাওখানি বাইয়া।
এই নায়ে নি আইল বন্ধু অভাগীরে চাহিয়া ॥ ৮
ভরায়ে কলসী কন্যা পানির ঠেকা নাই।
ভরন্ত কলসী ঢাল্যা কেনবা জল খাও ॥ ১০
ছানের হইল বেলালো তোর গায়ে নাইলো পানি।
শুকাইয়া হইয়াছে কন্যা চিকন কাকনী ॥ ১২
মনের দুঃখু সে কেউ না বুঝতে পারে।
এ রোগের ঔষধ নাইরে চিন্তায় যারে মারে ॥ ১৪
ঋণচিন্তা রোগচিন্তা সংসারচিন্তা দর ।
যৈবনকালের পীরিতচিন্তা সকল চিন্তার বড় ॥ ১৬
উজান পানি বাইয়া বাইয়ারে সাধু পূবের মূলকে যায়।
ভাগীদার মাল্লাগণে নাওখানি বায় ॥ ১৮
পাঁচ বাঁক গিয়া সাধু তবে পাল উড়াইল।
পুবালী বয়ারে সাধু গায়ে কাঁটা দিল ॥ ২০
গায়েতে আসিল জ্বর সাধু শুইল চিন্তায়।
দুই আঁখি বুজি সে দেখে পন্থের আয়নায় ॥ ২২
দুই আখি চাহিলে দেখে আয়না সামনে খারা।
শয়নে স্বপনে সাধুর নিরাল ১ আখির তারা ॥ ২৪
কিসের চিন্তা কিসের রোগ দুর্জ্জন পিরিতে ধরিল।
তিন মাস বাইয়া নদী সাধু পূর্ব্বদেশে গেল ॥ ২৬
আইজ ভাল কাইল মন্দ এই মতে দিন যায়।
লাভের বাণিজ্য সাধু সমূলে আড়ায় ২।
আসলে কিমিয় মাল ফসলে ৩ বিকায় ॥ ২৯
ভাগীদারে কয় সাধু পাগল হইল।
ছয়মাস পরে উজ্জ্যাল দেশেতে ফিরিল ॥ ৩১
গাঙ্গের পরে হিজল গাছ পাতায় পাতায় পানি।
এইখানে বান্ধহ নাও আজুকার নিশি ॥ ৩৩
নিশিতে পোহাইল উজ্জ্যাল ভাগীদারে কয়।
আজি দিন এইখানে থাকিব নিশ্চয় ॥ ৩৫
চরেতে উঠিল উজ্জ্যাল আয়ন রে দেখিতে।
শূণ্য ভিটা পইড়া আছে না পায় দেখিতে ॥ ৩৭
পিঞ্জরা রহিয়াছে খালি পক্ষী মারছে উড়া।
খূজ্যা না পায় উজ্জ্যাল সাধু হইল বেহুরাম ॥ ৩৯
একখানে দেখে সাধু কবরের চিন্।
ঘুরিতে ঘুরিতে সাধুর গেল ইহ দিন ॥ ৪১
পাড়াপড়শী জনে উজ্জ্যাল জিজ্ঞাসা যে করে।
দুইমাস হইল বান্দা গিয়াছে বেস্তরে ৫ ॥ ৪৩
দুনিয়ার চিহ্ন তার কয়বর ৫ পইড়া আছে।
পাড়াপড়শীর কাছে সাধু আয়নার কথা পুছে ৭ ॥ ৪৫
কেউ জানে কেউ না জানে কেউবা কহে মন্দ।
আর দিন গেল সাধুর না গুছিল সন্দ ॥ ৪৭
আমার মায়ে কইওরে ভাগীদার বাড়ীতে গিয়া।
তোমার পুত্র উজ্জ্বল গেছে ফকির হইয়া ॥ ৪৯
আমার মায়ে কইওরে ভাগীদার তোমারে জানাই।
তোমার পুত্র উজ্জ্বল সাধু পরাণে বাঁচ্যা নাই ॥ ৫১
আমার মায়ে কইওরে ভাগীদার যদি মায়ে পুছে।
তোমার পুত্র পুব দরিয়ায় ডুব্যা সে মইরাছে ॥ ৫৩
আর কইও আর কইওরে ভাগীদার দুক্ষিণী মায়েরে।
আর না আইব মামুদ উজ্জ্বল চান্দের ভিটার ঘরে ॥ ৫৫
বেলুরা হইয়া সাধু ঘুরিয়া বেড়ায়।
ভিক্ষা মাগিতে সাধু উজ্জ্যাল বাড়ী বাড়ী যায় ॥ ৫৭
কেহ দেয় মুইঠের চাউল কেহ বা দেয় গালি।
কেচেরা বয়সে কেন লইল ভিক্ষার ঝুলি ॥ ৫৯
কেউ বলে কারণ আছে কেউ বা বলে নাই।
এক গেরাম ছাড়িয়া সাধু অন্য গেরামে যায় ॥ ৬১
কুলের বউরে দিতে ভিক্ষা হাউরী করে মানা।
কেউ বলে এই ফকির প্রেমের দাওয়ানা ॥ ৬৩
বাঙ্গায় চিনে সোনা রূপারে রসিকী রসিক।
তিন গাঁও ঘুরিয়া উজ্জ্যাল আইজ না পাইল ভিক ॥ ৬৫
( ৬ )
সন্ধ্যা গুঞ্জরিয়া যায় ঝিলিমিলি পথ।
এই গেরাম ছাড়িয়া সাধু চলিল অন্যত ॥ ২
সাঁজালের ধূমা উঠ্যা বাঁশ বনেতে উড়ে।
উইর্য্যা আইসে কাউয়া কুলী আপনার বাসায়।
সন্ধ্যার আইন্ধারে গ্রামের পথ না দেখা যায়॥ ৫
আইজ থাকিয়া মামুদ উজ্জ্যাল অই না গাছের তলে।
কাইল যাইব উজ্জ্যাল সাধু ভিক্ষার কারণে॥ ৭
কিসের ভিক্ষা কিসের খাওন আয়নারে খুঁজিয়া।
ছয় মাস গেল সাধুর কান্দিয়া কান্দিয়া॥ ৯
পরের মায় ডাক্যা তারে দিনমানে খাওয়ায়।
কোন দিন পেটে দানা উপাসে বা যায়॥ ১১
( ৭ )
জিকির ছাড়িয়া ফকির বলল দেউরীর কোণে খারা রে।
আর সুজন গিরস্ত ডাক্যা কয় ত ভিক্ষা দেও সকাল করি রে॥ ২
আর ভিক্ষার না ডালা লইয়া কন্যা তারে ভিক্ষা দিতে সে আইল।
ফকিরে দেখিয়া হাতের ডালা ভূমিতে পইড়া গেল রে॥ ৪
চারি চক্ষে এক হইল ঝাইরা বয় রে পানি।
কোন্ দিন দেখ্যাছে কন্যা না যায় ভুলন রে॥ ৬
“ভিক্ষা নাই সে করি কন্যালো ভিক্ষার কার্য্য নাই রে।
তোমার লাগ্যা দেশ বিদেশ ত ঘুরিয়া বেড়াই রে॥ ৮
ছয় মাস ঘুইরা ঘুইরা জান করি হয়রাণি।
সংসারের লোক কয় পাগল বেহুরা রে॥ ১০
চাউল নাই সে চাই কন্যালো কড়ি নাই সে চাই রে।
তোমার যৌবন ভিক্ষা করিলো কন্যা দেশে চই্ল্যা যাই রে।” ১২
“মামুর বাড়ীতে আছিরে বন্ধু বাপ গেছে মারা।
ছয় মাস ধইরারে আমার কান্দন কাটি সার্ রে ॥ ১৪
পরের ঘরে পরের মাও বাপে ভাল ডাক্যা আছি বাপ মাও।
যে দেশেতে যাইবা আমারে তুমি সঙ্গে লইয়া যাও ॥” ১৬
এক যাদু মিলের ভালা পাণে আর চুণে।
আর যাদু মিলে ভালা দুই আখির কোণে ॥ ১৮
আরে যাদু মিলেরে ভালা পরাণে পরাণে।
সংসারের সার পিরীত যে পায় সন্ধানে ॥ ২০
*পিরীত রতন পিরীত যতন পিরীত গলার হার।
পিরীত কইরা মইল বান্দা সফল জীবন তার ॥ ২২
[ মামুর ঘরের ভাইয়ের সঙ্গে আয়নার বিবাহের কথাবার্তা হয়। আয়না
মামুদ উজ্জ্যাল সাধুর সঙ্গে পলাইয়া যায়। উজ্জ্যাল সাধুর বাড়ীতে আসে ও
উভয়ের বিবাহ হয়। ]
( ৮ )
উজ্জ্যাল সাধু হাটে যায়রে কিম্বা আন্ ব কি।
আয়নার লাগি কিন্যা আবের চিরুণী ॥ † ২
উজ্জ্যাল সাধু হাটে যায়রে কোণাকুণি পথ।
আয়নার লাগি কিন্যা আনু নাক-বলাক নথ ॥ ৪
উজ্জ্যাল সাধু হাটে যায়রে কিম্বা আন্ ব কি।
আয়নার লাগ্যা কিন্যা আব আস্মান তারা শাড়ী ॥ ৬
আস্মান তারা শাড়ী নারে মধ্যে মধ্যে ফুল।
এই শাড়ী পিন্ধিয়া কন্যা যাইব জলের ঘাটে ॥ ৮
জলের ঘাটেও যাইব কন্যা কলসী কাঁকে লইয়া।
আয়নার লাগ্যা থাকব সাধু পন্হের পানে চাইয়া ॥ ১০
উজ্জ্যাল সাধু হাটে যায় রে কিন্যা আব কি।
আয়নার লাগি কিন্যা আনব সাঁচিগন্ধের তেল ৷ ১২
পুত্র বিয়া দিয়া মায় বউ লৈল সে কোলে।
সন্ধ্যা কালের বাত্তি যেমন ঘর পশরিয়া জ্বলে ৷ ১৪
মাও খুসি বইন খুসি আয়নারে পাইয়া।
আর খুসি হইল উজ্জ্যাল আয়নারে পাইয়া ৷ ১৬
গিরস্তির কামে মামুদ উজ্জ্যাল মন নাই সে দিল।
পৌষ মাসে না উজ্জ্যাল সাধু জালা ফালাইল ৷ ১৮
মাঘ মাসেতে সাধু জালায় দেয় পানি।
সুয়ামীরে খাওয়ায় আয়না ঘরুয়া মৈষের দৈ ॥ ২০
মায়েত তুলিয়া রাখছে বিন্নীধানের খৈ।
অরস্তছরস্ত উজ্জ্যাল ঘামে ভিজে অঙ্গ ৷ ২২
কাছেতে খাড়ইয়া আয়না গায়ে বাতাস করে।
ঠাণ্ডা নদীর পানি খাওয়ায় স্বামীরে ৷ ২৪
চৈভ বৈশাখ মাস এহি মতে যায়।
কামেলা লইয়া উজ্জ্যাল সাধু ক্ষেতের ধান দায় ॥ ২৬
গিরস্তির কর্ম্মে সারা মুখে মধুর হাসি।
সুয়ামীরে পাইয়া আয়না মনে বড় খুসি ॥ ২৮
যৌবন ঢলিয়া পড়ে লিলুয়া বয়ারে।
আস্মান তারা শাড়ী কন্যার ক্ষণে উড়ে পড়ে ॥ ৩০
এবে দেখি মামুদ উজ্জ্যাল পাগল হইল।
ভাবিয়া চিন্তিয়া সাধুর জ্যৈষ্ট মাস গেল ॥ ৩২
জ্যৈষ্ঠ মাস যায় দেখে গাছে পাকে আম।
এই মাসে হইয়াছে শেষ ঘর গিরস্তির কাম ॥ ৩৪
কাটিয়া নিজের হাতে স্বামীরে খাওয়ায়।
চউক আলমালাইতে দেখে রজনী পোহায় ॥ ৩৬
আর একটু থাকল কন্যা বুকেতে শুইয়া।
আজুকার নিশি কেমনে গেল পোহাইয়া ॥ ৩৮
( ৯ )
হায় তরিয়া নাইরারে ভাই দেখ জ্যৈষ্ঠ মাস গেল।
জলের যৈবন লইয়া আষাঢ় মাস আইল ॥ ২
কাঞ্চে কলসী মেঘের রাণী ফিরুন পাড়া পাড়া।
আসমানে খাড়ুইয়া জমিনে ঢালে ধারা ॥ ৪
সায়র হায়র নদীরে করে কলকল।
কোথা হইতে আইল পাগল জোয়ারের জল ॥ ৬
ডুবা ডেঙ্গরা বাহিয়া মুলুক হইল তল।
আষাঢ়িয়া নয়া পানি হইয়াছে পাগল ॥ ৮
কোথা হইতে আইসেরে ঢেউ ফেনা মুখে লইয়া।
সাধুর তরণী যায় পাল উড়াইয়া ॥ ১০
ভাগীদার আইসা কয় সাধু কি কর বসিয়া।
এই ত আষাঢ় মাস আদ্ধেক যায় রে বইয়া ॥ ১২
বাণিজ্যের সময় দেখ গত হইয়া যায়।
বয়সে না করিলে অর্জ্জন পিছে হবে দায় ॥ ১৪
ভাগীদারের কথায় সাধু কোন্ কাম করে।
সুতার ডাকিয়া পানসী দোরস্ত সে করে ॥ ১৬
নয়া কাষ্ঠ লাগাইয়া মারিল পাতাম।
নয়া নবীল বস্ত্রে বানাইল বাদাম॥ ১৮
হায় এহি মতে উজ্জ্যাল সাধু বাণিজ্যেতে যায়।
মায়ের কাছেতে সাধু মাগিল বিদায়॥ ২০
বইনের কাছেতে সাধু মাগিল বিদায়।
আয়নার কাছেতে সাধু বিদায় হইতে যায়॥ ২২
“আরে শুন শুন প্রাণের আয়না সুধাই তোমারে।
বাণিজ্যের লাগিয়া যাইব দূর না দেশান্তরে॥ ২৪
মাও আছে বহিন আছে লো তাদের নিয়া থাক।
ছয় মাস পরে আমি আইবাম বাড়ী।
ছয় মাস থাক তুমি হইয়া অবর নারী॥ ২৭
আমার না মাও লো ও আয়না তোমার না শাশুরী লো।
তারে লইয়া বঞ্চিও ছয় মাস লো॥ ২৯
আমার না বহিনী লো ও আয়না তোমার না ননদী লো।
তারে লইয়া বঞ্চিও ছয় মাস লো॥ ৩১
পাড়া পড়সী আছে যত লো আয়না সবে মা ও ভাই লো।
সব লইয়া বঞ্চিও ছয় মাস লো॥ ৩৩
ছয় মাস পরে লো কন্যা যদি থাকে কপালে।
পীরের পরসাদে যদি হারাধন মিলে॥ ৩৫
তোমারে লইয়া লো কোলে হইবাম সুখী।
ছয় মাস থাকিব আমি উড়ন চরা পাখী॥ ৩৭
যৈবনে যৈবতী লো কন্যা না যায় পাশরা।
এইখানে রাখিয়া গেলাম দুনয়নের তারা॥” ৩৯
“না যাইও না যাইও রে বন্ধু দূর দেশান্তর।
অভাগী আয়নারে লিয়া থাক আপন ঘর॥ ৪১
না যাইও না যাইও রে বন্ধু বাণিজ্য কারণে।
বৈদেশে পাঠাইয়া বন্দে থাকিব কেমনে ॥ ৪৩
চান্দ ছাড়া কাল রে নিশি দেখ সদাই যে আন্ধারা।
যৌবন কালে নারীর পতি পুষ্পের ভমরা
বন্ধু যাইওনা রে ॥ ৪৫
খরদর ঢেউয়ের নদীরে তাতে যৌবন তরী।
এমন কালে ছাইরা গেলে কে অইব কাণ্ডারী
বন্ধু যাইওনা রে ॥ ৪৭
ভর যৌবতী নারীর বন্ধু ভাল হৃদ্পিঞ্জিরায় পাখী।
অসময়ে কেন যাওরে দিয়া মোরে ফাঁকি
বন্ধু যাইওনা রে ॥ ৪৯
আরাকারা ঢেউয়ের নদীরে কে করে সামাল।
অখন্দে ছাড়িয়া গেলে বন্ধু যৌবন হইবে কাল
বন্ধু যাইওনা রে ॥ ৫১
খাই বা না খাই বন্ধুরে বুকে লইয়া থাকি।
এইমন সোনার যৌবন কেমনে ধইরা রাখি
বন্ধু যাইওনা রে ॥ ৫৩
সোনা নয় রূপা নয় নয়রে পিতল কাসা।
ভাঙ্গিলে সে গড়া যায়রে পরে আছে আশা
বন্ধু যাইওনা রে ॥ ৫৫
আষাঢ়িয়া পাগল পানিরে বয় রে উজান ঘাটা।
কার্ত্তিক মাসেতে পানি ফিরা লইব ভাটা
বন্ধু যাইওনা রে ॥ ৫৭
আভাগ্যা নারীর যৌবন ধইরাছে জোয়ারে।
এই পানি ভাটাইলে দেখ আরত নাই সে ফিরে
বন্ধু যাইওনা রে ॥” ৫৯
এইমতে অভাগী আয়না রোদনা করিল।
শুক্কুর বারেতে সাধু খোয়াজের সিমি দিল ॥ ৬১
শনিবারে উজ্জ্যাল সাধু ছাড়িলেক নাও।
অভাগিনী আয়না কান্দে “আমার মাথা খাও।
বানপাকরের মুখে না ধরিও নাও ॥” ৬৪
অভাগিনী আয়না কান্দে “শুন পরাণের পতি।
দেওয়ায় ডাকিলে বান্ধিও নায়ের কাছি ॥” ৬৬
অভাগিনী আয়না কান্দে “আমার মাথা খাও।
রাইত নিশিতে বন্ধু না বহিও নাও ॥ ৬৮
গারুয়া বঙ্গারের মুলুক সেই দেশে না যাইও।
ছয়মাস মধ্যে তুমি ফিরিয়া আসিও ॥ ৭০
কিবা ধন পাইবারে বন্ধু জুরাইত হিয়া।”
আয়নারে রাখিয়া সাধু বাণিজ্যেতে যায়।
অভাগী আয়নার আইল ঘরে থাকা দায় ॥ ৭৩
[ এইস্থান খণ্ডিত। কিছুদিন পরে ভাগীদার ফিরিয়া আসিল। তাহারা আসিয়া বাড়ীতে খবর দিল, নৌকা ডুবি হইয়া মামুদ উজ্জ্যাল মারা গিয়াছে। বাস্তবিকই তুফানে সাধুর নৌকা মারা পড়িয়াছিল। অংশীদারগণের মধ্যেও কেহ কেহ নিখোঁজ হইয়া গিয়াছিল। যাহারা প্রাণে বাঁচিয়াছিল তাহারাই আসিয়া এই সংবাদ দিল এবং উহা শুনিয়া আয়না পাগল হইয়া গেল। একদিন কাহাকেও কিছু না বলিয়া সে ঘরের বাহির হইয়া পড়িল।
পাগলের মত হইয়া আয়না বনে বনে পথে পথে কাঁদিয়া বেড়াইতে লাগিল। ভাগ্যক্রমে একদিন এক “দয়াদার” (দয়ালু) সুজন গৃহস্থ তাহাকে নিজের বাড়ীতে লইয়া যায়। তাহার সাত পুত্র অনেক খুঁজিয়া এক নদীর চরে ছয়মাসের “কাছিলতা” (কাতর) মামুদকে পাইয়া উদ্ধার করে। আয়না স্বামী লইয়া ঘরে আর্সে।
মামুদ উজ্জ্যাল বাড়ী আসিয়া সারিয়া উঠার পর ঘর-গৃহস্থালীর কাযে মন দেয়। কিন্তু তখন গ্রাম জুড়িয়া একটা বিষম দলাদলি চলিতেছিল। সকলেই বলাবলি করিত যে আয়না অসতী। সে একা নারী ঘরের বাহির হইয়া যায়। এই ছয়মাস কোথায় ছিল কোথায় না ছিল তার কোনও খোঁজ খবর নাই। এমতাবস্থায় পাড়ার লোক, আয়নাকে নিয়া ঘর-গৃহস্থালী, পান-পাঙ্কাইত ( সামাজিক আচার-ব্যবহার) করিতে অস্বীকার করিল। তখন মামুদ উজ্জ্যালের মতিগতি খারাপ হইয়া যায় এবং এক নদীর চরে আয়নাকে লইয়া বাণিজ্য যাইবার ছল করিয়া তাহাকে নির্বাসন দেয়।
আয়না একা স্বামীকর্তৃর্ক নির্বাসিত হইয়া সেই বনে কাঁদিয়া বেড়াইতে লাগিল। এমন সময় দৈবযোগে একদল কুরুঞ্জিয়া জাতি সেই চরে নৌকা লাগাইল।]
( ১০ )
হায় কুরুঞ্জিয়া এক না জাতি ভালা কহি সভার আগে।
নায় থাকে নায় বাসা ফিরে বিদেশে॥ ২
পুরুষেরা রান্ধে বাড়ে সুখে বস্তা খায়।
ঘরের নারী তারা গাও্যালে বেড়ায় রে॥ ৪
সজ্জমসিল্লাইয়া তারা ভালা ফিরে দেশ ও বিদেশে।
বারমাসে তের পাতি জল হাওরে ভাসে॥ ৬
বাণিজ্যি বেসাতী যত আর দেখ মাইয়া লোকে করে।
ঢেকুরা পুরুষের দল কেবল বায় সে নাও॥ ৮
বাইতে বাইতেরে নাও নানান্ দেশেরে গেল।
দৈবযােগে ডেঙ্গার চর তামাম নৌকা লাগাইল রে॥ ১০
“আরে ভাইরে শুকুন কাষ্ঠের লাগ্যা আরে ভালা চরেতে
ভিড়ায় নাও।
দৈবেতে আসিয়া দেখ ভালা কন্যারে মিলায়॥ ১২
হায় কোন্ দেশে ঘর কন্যালো কন্যা আলো কোন্ দেশে বাড়ী।
ঘোর জঙ্গলায় বসত কেনলো হইয়া সুন্দর নারী।” ১৪
“বাড়ী নাই ঘর নাই কপাল পুড়া আমি গো।
নির্ব্বন্ধ করিয়া আল্লা মোরে বনে পাঠাইলো গো ॥ ১৬
মাও নাই সে বাপ নাই সে রে আমার গর্ভ সোদরার ভাই।
পানির মুখে শেওলার মত আমি ভাসিয়া বেড়াই রে ॥ ১৮
যেই রে বিরক্ষের তলে যাই আরে ছায়া পাওনের আশে রে।
পত্র ছেড়্যা রৌদ্র লাগে দেখ কপালের দুষে রে ॥ ২০
দইরাতে ডুবিতে গেলে দেখ দইরা শুকায়।
গায়ের না বাতাস লাগলে আর ভালা আগুণি ঝিমায় রে ॥ ২২
হায় কাল কাটারী নাইরে গলায় মারিব রে।
জমিনে নাহি যে ফাঁক থাকিবাম লুকাইয়া রে ॥” ২৪
“না কাইন্দ না কাইন্দ কন্যালো তুমি ধর্ম্মের ঝি।
সঙ্গেত থাকিবা কন্যা অইয়া মোর ঝি রে ॥” ২৬
এক দুই বছর গেল আয়না জলেতে ভাসিয়া।
নানান দেশে যায় কন্যা সাধুর লাগিয়া রে ॥ ২৮
হায় এইমত কইরা আরে ভালা তিন বছর গেল রে।
ঘুরিয়া না পাইল কন্যা হায় ভালা চান্দের ভিটার ঘর রে ॥ ৩০
সঙ্গমল্লা লইয়া কন্যারে গাওয়াল কইরা ফিরে।
দুই নয়ানে জলে কন্যা পন্থ না ঠাওর ১ করে রে ॥ ৩২
দেশ বিদেশ সে জিজ্ঞাসা করে কন্যা কত কত জনে।
চান্দের ভিটা পাইবাম আমরা কোন বা পন্থে গেলে রে ॥ ৩৪
কোন বা পথে যাইবাম আরে ভালা কোন বা নদী বাইয়া।
উজ্ঞান যাইবাম শ্রীরা কি যাইবাম ভাটা বাইয়া রে ॥ ৩৬
কেউ বলে শুণ্যাছি কানে, ভালা কেউ বলে নয় রে।
তিন বচ্ছর ধইরা খোঁজে কন্যা চান্দের ভিটার ঘর রে॥ ৩৮
মৈষ লাইয়া যায় মৈষালরা খবর কইরা চায় রে।
তের ঝাঁক পানি গেলে চান্দর ভিটা ঘর রে॥ ৪০
সন্ধ্যাবেলা কুলের বউ-ঝি পরদীম ১ লাগায়।
তা সবে জিজ্ঞাসে কন্যা জানে বিবরণ।
নাও বান্ধিল সবে কন্যার কারণ রে॥ ৪৩
( ১১ )
হায় পরভাত কালে উঠ্যা কন্যা ভালা কোন্ কাম করিল।
কুরুঞ্জিয়া নারীর বেশ অঙ্গেতে ধরিল ॥ :
আগাদুরি ২ পাটের পাছা ৩ ভালা কোমরে বান্ধিয়া।
খোপাত বান্ধিল কন্যা উব্দা ৪ করিয়া রে॥ ৪
হায় গলায় ত পরিল কন্যা ভালা নয়া গুঞ্জির মালা রে।
মাথায় তুলিয়া লইল কন্যা বেসাতীর ছালা রে॥ ৬
সাইর বইনি ৫ কুরুঞ্জিয়ায় নারীগো আর সঙ্গে যায়।
বেসাতী করিতে তারা বাইর হইল গাওয়ালে রে॥ ৮
হায় চান্দের ভিটায় গাছ গাছালী আর ভালা সেইমত আছে।
ডালেতে বাউই-টিয়া ৬ বাসা না কইরাছে॥ ১০
এই ঘরে থাক্যা সুন্দর আয়নারে করিলা গিরস্তালি রে।
সংসারের আশায় কন্যার আইজ পইড়াকে ছালি ৭ রে॥ ১২
আস্তে ব্যস্তে যায় কন্যা আরে আপনার ভাড়া রে।
থরথরি কাঁপে হিয়া আরে নাই সে চলে পাও রে॥ ১৪
তিন বছর পরে দেখে কন্যা আরে ভালা আপন বাড়ী ঘর।
তিন বচ্ছর পরে দেখে কন্যা আপন সোয়ামীর মুখ ॥ ১৬
হায় দুই নয়নে বহে ধারা ভালা আইঞ্চল ধুইয়া মুছে রে।
অভাগীর চক্ষের জল কেউনা চাইয়া দেখে রে ॥ ১৮
উঠানের কানছায় ১ দেখে মৈন্দি গাছের চারা রে।
রুইয়াছিল অভাগিনী এই মেন্দির চারা রে ॥ ২০
সেই ঘর সেই দুয়ার ভালা সকলই ত আছে রে।
লেপিয়া পুছিয়া কন্যা দুবরাজি ২ করিত রে ॥ ২২
বাউয়ের বাসা যেমন কামে নাই সে লাগে রে।
ঘর থাকিতে যেন বাইরে বস্যা ভিজে রে ॥ ২৪
সেই ঘর সেই দুয়ার সেইত পইড়া আছে রে।
এই ঘরে অভাগী আয়না আর না পাইব ঠাঁই রে ॥ ২৬
বিয়া কইরা মামুদ উজ্জ্যাল সুখে বস্যা খায়।
অভাগী দুষ্মণ ৩ আয়না কান্দিয়া বেড়ায় রে ॥ ২৮
কোলেতে সুন্দর ছাওয়াল কাঞ্চা সোনা জ্বলে রে।
পুত্র কোলে লইয়া সতীন আলাকালা ৪ করে রে ॥ ৩০
হায় কার বা ঘরের সুন্দর কন্যা হায় ভালা শুনি।
কোন দৈবে কইরাছে কন্যায এমন দুক্ষিণী রে ॥ ৩২
হায় দুঃখের ঘর সুখের বাড়ী না রে সকল ছাড়িয়া।
নগরে বেসাতী করে ভালা কুরুঞ্চিয়া হইয়া ॥ ৩৪
“কার কন্যা কার ঝি না লো কন্যা আলো কেবা বাপ মাও।
মাথা খাও কন্যা আমায় দেও পরিচয় লো ॥ ৩৬
বেদিয়া-বৈশিনী আয়না-২১৩ পৃঃ
নিলাম। এই মর্ত্যলোক যে সত্য ও আনন্দময়,
সুখ দুঃখের আলোছায়ার রহস্যে ঘেরা, তা এই
নশ্বর মন স্বীকার করেছে।
আমার এই দেহটি পঞ্চভূতের প্রীতি ও অনু-
রাগে গঠিত। পঞ্চ অলৌকিক শক্তির সংলাপে
আমার চিত্ত বিচিত্র রূপ লাভ করেছে। নিখিলের
স্পর্শ আমার অনুভবে ধন্য হয়েছে। কত বরষার
বর্ষণে শ্রাবণের মেঘের ছায়ায় আমার হৃদয় দোলা
খেয়েছে। কত বসন্তের দিনে অশোক রক্তিমায় রেণু-
রাগ লেপে দিয়েছে আমার ললাটে। কত নিশীথের
তারায় তারায় আমি অনুভব করেছি অনন্তের ইঙ্গিত।
আজ বিদায়ের ক্ষণে দুঃখকে বড় করে দেখব
না। যেখানে কিছু হারিয়েছি, যেখানে পেয়েছি
ব্যথা, তাকেই কেন সত্য বলে জানব? জীবনের
ঐশ্বর্য তো ক্ষণিকের মরীচিকা নয়। প্রকৃতির
এই খেলাঘরে আমি যে আসন পেয়েছিলাম, তা-ই
আমার পরম লাভ।
যে গান গেয়েছি, যে প্রেম দিয়েছি আর
যেটুকু অক্ষয় আনন্দ সঞ্চয় করেছি, তাই নিয়ে
আমার জীবনের শেষ অঞ্জলি রচনা করি। নদী
যেমন সাগর অভিমুখে চলে, তেমনি আমার এই
জীবনধারাও মহাকালের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
সেথা কোনো রিক্ততা নেই, কোনো ভয় নেই।
মর্ত্যের বিদায়লগ্নে দাঁড়িয়ে শান্ত মনে এই
জগৎকে প্রণাম জানিয়ে যাই।
হায় ভালা অনেক দিনের কথা দেখিবানা দেখিরে।
কান্দিয়া কান্দিয়া তোর লাগ্যা আমার আন্ধাইর দুই
আঁখি রে ॥” ৩৮
এইমতে কান্দন করে ভালা শাশুরী ননদী রে।
আয়নারে চক্ষের জলে ভাসে নদী নালা রে ॥ ৪০
“মাও আমার নাই বাপ আমার সে নাই।
দারুণ কপালের দোষে সকলি হারাই রে ॥ ৪২
দারুণ কপালের লেখা ঘুইরা না বেড়ায় রে ।
আমার লাগ্যা যে তোমরা হায় ভাল কি লাগিয়া কান্দ রে ॥ ৪৪
আমি কান্দি তোমারে আমার মায়ের মতন দেখ্যা রে।
ছোড় বেলার কথা আমার মনে ভালা পড়ে ॥ ৪৬
গায়েতে লাগের ধূলা মায় আইঞ্চলে দিত ঝাইরা রে।
কান্দিলে অভাগী মাও গো আইত দৌড়িয়া।
দেশে দেশে কাইন্দা ফিরিগো এখন কেউনা দেখে চাইয়া ॥ ৪৮
থেকান খাইয়া পড়িলে জমিনে মায় তুল্যা লইত কোলে রে।
এখন রিদরে বিন্নলে ছন্তিছেল কেউনা দেখে রে॥” ৫১
হায় ভালা বেসাতী তুলিয়া কন্যা আস্তে আস্তে যায় রে।
দুই নয়ানের পানি বইয়া ভাঙ্গা যায় বুক রে ॥ ৫৩
“আয়না যদি অইয়া থাকছবি কন্যা, কন্যা আলো নাই সে
যাও ফিরিয়া।
ভিক্ষা মাগিয়া খাইবাম তোহারে না লইয়া রে ॥ ৫৫
আয়না যদি অইয়া থাকছলো কন্যা আরে ভালা ঘরে ফিরা আয়।
পান-পাঙ্কাইত ছারবাম তোর না লাগিয়া রে ॥ ৫৭
আয়না যদি আইয়া থাক্ছলো কন্যা আমার মাথা খাও।
অভাগীরে থুইয়া আর ভিন্ দেশে না যাও॥ ৫৯
আয়না যদি আইয়া থাক্ছলো কন্যা গিরে নাই সে কাজ।
তোরে লইয়া করবাম লো কন্যা জঙ্গলায় বসাত রে॥ ৬
হায় এহিমতে শাশুরী গো যত করিলা কান্দন।
খুলিয়া ফেলাইল কন্যা ভালা কেশের না বান্ধন রে॥ ৬৩
আর ভালা মাথার বেসাতী কন্যা জমিনে ফালাইল রে।
পাগল হইয়া কন্যা পরবেশ করে নায় রে॥ ৬৫
“ছাড় ছাড় নাও ছাড় রে বাইছা না থাক্ব এই দেশে।
এই দেশেতে ডাকাইতের বাসা ভালা বাইবাম আর দেশেরে॥ ৬৭
মার মার করিয়া নাও ছাড়িয়া সে দিল রে।
চান্দের না ভিটা ছাইরা মাইঝ দরিয়ায় পড়ে রে॥ ৬৯
আশা গেল বাসা গেল কিসের লাগ্যা আর বাঁচি রে।
আপন বন্ধু পর হইল কোন্ বা সুখে থাকি রে॥ ৭১
আপন ঘর পর হইল হায় ভালা বাচ্যা কার্য্য নাই।
এই ঘরে আয়নার নাই আঙ্গুল পাতবার ঠাই রে॥ ৭৩
মনের কথা পরাণের কথা রে আর ভালা পারিত জানিতে।
বিরয় বিচ্ছেদের জ্বালা না থাকিত পিরীতে॥ ৭৫
“হায়! চান্দের ভিটার পউখ-পাখালী কহি যে তোমরা রে।
আমি যে আইসাছি খবর বন্দে যেন না জানে॥ ৭৭
আমি যে আইসাছি কথা না কইও বন্ধেরে।
কথা যদি সুধায় রে বন্ধু কইও তাহার আগে॥ ৭৯
অভাগী দুঃখমণ আয়না তোমার লাগি জলে ডূব্যা মরছে।
হায় সুখেতে থাকবে বন্ধু পুত্র কোলে লইয়া ॥ ৮১
সুখেতে থাকরে বন্ধু সতীন বুকে লইয়া।
আমি অভাগিনী দেখা যাই চান্দ মুখ রে জন্মের লাগিয়া ॥ ৮৩
হায়! এই আসা শেষ আসা রে আর ত আসা নাই।
সুখে থাক প্রাণের বন্ধু আর না কিছু চাই ॥” ৮৫
আষাঢ়িয়া তোরের নদীতে ঢেউয়ে ভাইস্যা যায়।
কাঞ্চা সোনার তনু জলেত ভাসায় রে ॥ ৮৭
মাও নাই বাপ রে নাই সে নাই সোদর ভাই।
মরিলে কান্দইয়া সুহৃদ হারাইলে বিচরাই রে ১ ॥ ৮৯
দিশা—কান্দে সাধু মামুদ উজ্জ্বলরে।
হায় বাতাসে কয় কাণে কাণে ভালা আস্মানে কয় রৈয়া।
আইল দুক্ষিণী আয়না তোহারে খুঁজিয়া ॥ ৯১
নয় সে কুরুক্ষিয়ার নারীরে নয়ত সে বাদিয়া।
আইসাছিল দুক্ষিণী আয়না তোমারে খুঁজিয়া ॥ ৯৩
পঙ্খিনী আইসাছিল বাসাতে খুঁজিয়া।
সেই মুখ সেই চটক ভালা সেইত সকল রে ॥ ৯৫
আইসাছিল অভাগিনী তোমায় দেখ্ত না রে।
কেউনা পুছিল অভাগিনীরে কেউনা কইল থাক রে ॥ ৯৭
জীুলকির ২ পশর ৩ আংকা ৪ আন্ধইর হইল রে।
হায় কইবা গেল আয়না আমার কোন্বা পথে রে ॥ ৯৯
যারে দেখে কাইন্দা সাধু জিজ্ঞাসা সে করে রে।
ফকির হইয়া সাধু ভালা দেশে দেশে ফিরে ॥ ১০১
আয়নার তল্পাসে সাধু দাওয়ালেতে ঘুরে রে।
আয়নার তল্পাসে সাধু বনে বনে ঘুরে রে ॥ ১০৩
হায় তারা হইল ঝিমিঝিমি রে ভালা ফুল হইল বাসি।
জন্মের লাগ্যা মায়ের পুত্র হইল বৈদেশী রে।
কান্দে সাধু মামুদ উজ্জ্বল রে ॥ ১০৫