ভেলুয়া
পূর্ববঙ্গ গীতিকা - তৃতীয় খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন
ভেলুয়া ( ১ ) শাফ্লাপুর আচানক ১ মুল্লুক সেইরে শাল্লা বন্দর। তারে ২ পরছিমে ৩ সদাই গরজে সাইগর ৪ ॥ ২ ঘাটের মাঝে বাঁধা থাকে হারেক ৫ রকম ডিঙা। মাঝি মাল্লা গহিন রাইতে ফুকারে যে শিঙা ॥ ৪ দোকানী পাসারী কত কারে কনে চিনে। কেহ বেচে নানান জিনিষ কেহ আবার কিনে ॥ ৬ পন্থ ঘাটে চলে মানুষ হাজারে হাজার। নুকা ৬ নারা ৭ কত আছে নাইকো সুমার ৮ ॥ ৮ বৈদেশী বন্দর হৈতে লৈয়া মালা ৯ মাল। হাঙ্কারি ১০ জাহাজ আসে তুলি জুইতর পাল ॥ ১০ শাফলা বন্দরের মালিক মাণিক সদাইগর ১১। ধন দৌলতে পূর্ণ ১২ যে তান গুদাম ১৩ কোটাগর ॥ ১২ নন্দীর ১ কুলে হাবাখানা ২ সোন্দর ৩ ভোবন ৪। রাত্রি কালে জ্বলে বাত্তি ৫ ফানুস্ ৬ লণ্ঠন ॥ ১৪ লাখর সদাইগরীরে তান ৭ লাখর জমিদারী। সেনা সৈন্য আছে কত পাইক পটোয়ারী ॥ ১৬ গরীব দুইখ্যা ৮ মোচাফের ৯ নিত্যা ১০ ঘরে খায়। ছোড় ১১ বড় সকলেতে ১২ ছালাম জানায় ॥ ১৮ মাণিক সদাইগরের বেটা ১৩ আমির সাধু নাম। দেখিতে সোন্দর যেন পুন্নিমার ১৪ চান ॥ ২০ ভালো লেয়াকত ১৫ বেটার ভালো দিল মন। যোল বছর বয়স হৈয়ে নতুন যৌবন ॥ ২২ চৈদ্দ এলেম ১৬ শিখিয়াছে আর নানান কাম। কোরাণ কিতাব সকল কৈরাছে তামাম ১৭ ॥ ২৪ ভালা বেটা পাইয়া রে খুসী মাণিক সদাইগর। খোসনামীতে ১৮ পুন্ন ১৯ হৈল দেশ দেশান্তর ॥ ২৬ স্ত্রীরি ২০ পুত্র খেসা ২১ কুড়ুম ২২ সকলার লই। বড় সুখেথ সদাইগরর দিন কাডি ২৩ যারগৈ ২৪ ॥ ২৮ শিকার যাত্রা দহিনালী ১ হাবা ২ ফিরিল ফাউন ৩ মাইন্যা ৪ দিন। শীয়ারে ৫ যাইতে আমির করিল একিন ৬ ॥ ২ ভাবিয়া চিন্তিয়া আমির কি কাম করিল। মা জননীর কাছে যাইয়া কহিতে লাগিল ॥ ৪ “শুন শুন মা জননী বলি যে তোমারে। শীয়ারে যাইয়ম আমি কালুকা ৭ ফজরে ৮ ॥ ৬ কালাধর ডিঙ্গা চাই আর গৌরলধর মাঝি। কইবুলি বাবজানেরে করাইবা রাজি ॥” ৮ শুনিয়া পুতের কথা মা জননী কয়। ফাউন মাসে দইরজা ৯ আউন ১০ যাইতাম দিতাম নয় ॥ ১০ দশ নয় পাঁচ নয় আমার এক কালা চান। নয়ানের কাজলরে মোর পরাণের পরাণ ॥ ১২ আমির সাধু উডি বলে, “আমার মাথা খাও। শীয়ারে যাইতে মোরে জলদি বিদায় দাও ॥ ১৪ নরম পরাণ তোমার লওরে দড় করি। মুল্লুকে মুল্লুকে যাইব কৈত্তে ১১ সদাইগরী ॥ ১৬ হাইল্যার ১২ পোলা ১৩ নহি যে মা হাল চষি খাইব। জাইল্যার ১৪ পোলা নহি যে মা খালত জাল বোসাইব ১৫ ॥ ১৮ সদাইগরর পোলা হৈলে কিসের ঘর বাড়ী। শীয়ারে যাইতে বিদায় দাওরে তড়াতড়ি॥ ২০ এই না মতে মায়ে পুতে নানান কথা কয়। মাণিক সদাইগর তথায় আইল সে সময় ॥ ২২ শুনিয়া সকল কথা মাণিক সদাইগর। ডিঙা সাজাইতে ঘাটে দিলরে খবর ॥ ২৪ খালাসী টেণ্ডুল সব লইলরে সাজি। দড়মড় ছুয়ান লৈল গৌরলধর মাঝি ॥ ২৬ রঙ বেরঙের পাল লৈল দড়ি আর কাঁচি। লঙ্গর লগি লৈল যত ভালা ভালা বাছি ॥ ২৮ ছ মাসের খানা লৈল ডিঙার মাঝে তুলি। তীর কামটা ধনু লৈল বন্দুক আর গুলি ॥ ৩০ কালাধর ডিঙা সাজিল দেখিতে সোন্দর। ছুয়ান ধরিল গিয়া মাঝি গৌরলধর ॥ ৩২ মাণিক সদাইগর আসি কহিল তখন। কোরে কোরে নিও ডিঙা করিয়া যত্তন ॥ ৩৪ বয়ার আসিলে মাঝি হৈয়ো সাবধান। তোমার হাতে সপি দিলাম আমার জান পরাণ ॥ ৩৬ আমির সাধুর মাথাত হাত দিয়ারে তারপর। বহুত দোয়া কৈল তারে মাণিক সদাইগর ॥ ৩৮ বাপের চরণে আমির চালাম জানাইয়া। “কালাধর” ডিঙার মাঝে পেয়ার হৈল গিয়া ॥ ৪০ “বাও বাও” বলি দিল নাগরায় বাড়ি। লঙ্গর তুলিয়া পরে ডিঙা দিল ছাড়ি॥ ৪২ বদরের নাম লৈল মাঝি মাল্লাগণ। ছুটিয়া চলিল ডিঙা তূরিত গমন॥ ৪৪ দহিনালী বাতাসেতে পাল দিল তুলি। ছুটিয়া চলিল ডিঙা হেলি আর দুলি॥ ৪৬ কোরে কোরে বায় রে ডিঙা মাঝি গৌরলধর। ডাক দিয়া কৈল তারে আমির সদাইগর॥ ৪৮ শুন শুন মাঝি ওরে শুন আমার বাণী। দেখিতে একিন হৈল মাঝ দরিয়ার পানি॥ ৫০ ফিরাও ফিরাও ছুয়ান কন ভয় রে নাই। মাঝ দরিয়ার মিক্যা ডিঙা দাও রে চালাই। ৫২ গৌরলধর মাঝি বলে সদাইগরর মানা। কন পন্থ দি কাঁডে যাইয়ম আমার আছে জানা॥ ৫৪ অল্প বইন্যা আমীর সাধুর রাগ হৈল ভারি। ছুয়ান ধরিয়া তখন নিজে দিল পাড়ি॥ ৫৬ ছুটিতে ছুটিতে ডিঙা মাঝ দরিয়ায় হৈল। ঢেউয়ের উপরে ডিঙা নাচিতেছে লাগিল॥ ৫৮ মানুষে কি বুঝে ভাইরে আল্লার কেরামত। মাঝ দরিয়ার মাঝে ডিঙা হারাইল পথ॥ ৬০ হু হু করি ছুডিল বাতাস পালত পৈল টান। পরিচয় ন রইল ভাড়া কি উজান॥ ৬২ এক ঢেউয়ে উডেরে ডিঙা আকাশ বরাবর। আর ঢেউয়ে যায়রে ডিঙা পাতালর ভিতর॥ ৬৪ উত্তর দহিন পূর্ব্ব পরূছিম হইল ভিন্নাভিন। কন দিকর থুন কন দিকে যায় কিছু ন রৈল চিন॥ ৬৬ ঘুরিতে লাগিল ডিঙা কি কহিব আর। গৌরলধরর মাথাত যেন পড়িল ঠাডার॥ ৬৮ কেহ ডাকে ফিরিস্তারে আল্লাতালায় কেউ। বেবাম দরিয়ার মাঝে উডিল বিষম ঢেউ॥ ৭০ কেহ পড়ি রৈয়ে আর কেহ বমি করে। উইঠত চাই কেহ আবার কাইত হই চিৎ হই পড়ে॥ ৭২ থর থর কাঁপে আমির সাইগরের ডাকে। ডিঙা যে ঘুরেরে হায় রে কুমারের চাকে॥ ৭৪ আমির সাধু বলে “এইবার পৌঁছিলে মোকামে। হাজার টাকার চিন্নি দিয়ম গাজি কালুর নামে”॥ ৭৬ খালাসী দ্বৈজ্জল ডাকে “বদর” “বদর”। দড়মতে ছুয়ান ধৈল মাঝি গৌরলধর॥ ৭৮ আল্লারে ভাবিয়া দিল উত্তর মিক্যা পাড়ি। কড়মড় শব্দ করেরে পালর বাঁশবাড়ি॥ ৮০ পন্থীর মতন ডিঙা উড়িয়া চলিল। একদিন পরে তারা কূলর দেখা পাইল ॥ ৮২ আমির সাধু উডি বলে, ভাইরে গৌরলধর। বড় গোম্বা ১ হৈলা তুমি আমার উপর ॥ ৮৪ এবার ভিড়াও ডিঙা পুবের কিনারে। কুলেতে উড়িয়া মোরা যাইয়ম শিয়ারে ২ ॥ ৮৬ খোয়া খোয়া ৩ দেখা যায়রে এ কোন পাহাড়। তার মাঝে আছে জানি কতই জানোয়ার ॥ ৮৮ গৌরলধর মাঝি বলে, আইজ ৪ করন ৫ ছবুর। দেবাঙ্গের পাহাড় সেইটা পন্থ অনেক দূর ॥ ৯০ হাঁজের ৬ কালে রাঙা সুরুয ডুবিল সাইগরে। সোনালী ছডক ৭ পৈল ঢেউয়ের উপরে ॥ ৯২ ( ৩ ) সেই না ঘাটের মাঝে তারা লঙ্গর করিল। পর দিন পরভাতে উডি শিয়ারে চলিল ॥ ২ আগে আগে যায়রে সাধু পিছে গৌরলধর। নন্দীর পারে ফুলর বাগান দেখিল সোন্দর ॥ ৪ গাছের উপর বসিয়াছে কৈতরের ঝাঁক। তার মাঝে এক কৈতরের অচরিত ৮ ডাক ॥ ৬ অচরিত কথা সে যে মানুষের স্বরে। কলেমা তৈয়ব ৯ কৈতর মুখে মুখে পড়ে ॥ ৮ শুনিয়া কৈ তরের মুখে কোরাণের বাণী। আমির সাধু ভাবে তারে কেমনে ধরি আনি॥ ১০ বড়ই সেয়ানা ১ কৈতর যায়রে উড়ি উড়ি। তাহারে ধরিতে সাধুর চিন্তা হৈল ভারি॥ ১২ গৌরলধর গাছে গাছে লাসা ২ লাগাইল। ডিঙা হইতে জাল আনি যতনে পাতিল॥ ১৪ গাছের আড়ালে সাধু রৈল লুকাইয়া। হরাণ হৈয়ারে কৈতর চলিল উড়িয়া॥ ১৬ তড়াতড়ি আমির সাধু কি কাম করিল। কামটার ৩ মাঝে গুলি খেচি ৪ সেই কৈতর মারিল॥ ১৮ টঙ্গীর মাঝে বসি ছিল ভেলুয়া সোন্দরী। তেইর ৫ বুকে পৈল কৈতর ধড়ফড় করি॥ ২০ কৈতর লৈয়া কইন্যা কাঁদিতে লাগিল। কন্ দুষমনে আমার এই কৈতর মারিল॥ ২২ মাথা কুড়িকুড়ি ৭ কইন্যা কাঁদিল বিস্তর। কনে ৮ মারি গেলগৈ আমার হিরণী কৈতর॥ ২৪ কৈন্যার কাঁদন শুনি দাসী বাঁদীগণ। টঙ্গীর উপরে আসি দিল দরশন॥ ২৬ ( ৪ ) ভেলুয়ার পরিচয় সাত ভাইয়ের ভৈন ভেলুয়া পরম সোন্দরী। দূরে থাকি লাগেরে যেন ইন্দ্র কুলের পরী॥ ২ কাছে গেলে দেখা যায়রে সোনার পন্তিমা’। আর সোনার লাগে ভেলুয়ার চক্ষের ভঙ্গিমা ॥ ৪ আঁখির ২ তারা যে কন্যার অতি মনোহর। পদ্মফুলের ৩ মাঝে যেন রসিক ভোমর ॥ ৬ ভাল পুষ্প পাই ভোমরা মধু করে পান। সোন্দর লাগেরে কৈন্যার বাঁকা দুনয়ন ॥ ৮ হাসিতে বিজলী ঝরে অতি চমৎকার। চাচর চিকণ কেশ পায়ে পড়ে তার ॥ ১০ হস্ত সোন্দর পদ সোন্দর যেমন কুন্দের শলা ৪। গায়ের রঙ যেন তার চিনি-চাম্বা কলা ৫ ॥ ১২ চান্নির ৬ মতন মুখ করে ঝলমল। রাঙা ঠোঁট যেন তার তেলাকুচি ফল ॥ ১৪ বারবছরের হৈয়ে কন্যার তের নাহি পুরে। একাশ্বরী ’ থাকে কৈন্যা জোড় মন্দিরের ঘরে ॥ ১৬ বাপের নাম মনুহর ধনী সদাইগর। সাত পুত্র রাখিয়রে হৈলেন লোকান্তর ॥ ১৮ তেলন্যা নগরর মাঝে তারার বসতি। ভেলুয়ার মাতা মনাই বড় ভাগ্যবতী ॥ ২০ সাত পুত্র সাত মানিক কন্যা যেন পরী। মায়ের পরাণের পরাণ ভেলুয়া সোন্দরী ॥ ২২ সাইগরে ঘিরিয়া আছে তেলন্যা নগর। সাত ভাই বাইন্ধে তাতে সোন্দর বাড়ী ঘর ॥ ২৪of আশীগজা টঙ্গী এক দিয়াছে বান্ধিয়া। হাবা খায় সুন্দরী কৈন্যা নিত্তিপত্তি ধাইয়া ॥ ২৬ পরছিমে সাইগরের মাঝে ঢেউত্র করে খেলা। টঙ্গীর মাঝে বসি দেখে ভেলুয়া একেলা ॥ ২৮ এমন সুখখের কালে কি কাম হইল। আমির সাধু আসি তার কৈতর মারিল ॥ ৩০ কাঁদিতে লাগিল কৈন্যা করি হায়রে হায়। চৈক্ষের পানিতে তার বৈঙ্ক ভাসি যায় ॥ ৩২ কোথায়রে হিরণী কৈতর গেলি আমায় ছাড়ি। কন্ দুষমনে গেল আমার হাউসের কৈতর মারি ॥ ৩৪ আছমান ভাঙি পড়ুক তার মাথার উপর। এই না মতে কান্দি কৈন্যা করে ধড়ফড় ॥ ৩৬ ভেলুয়ার কাঁদন যখন শুনিল সাত ভাই। পুছার করিল তেইরে টঙ্গীর মাঝে আই ॥ ৩৮ “শুন শুন ভেন ভেলুয়া বলুন তোমারে। কি কারণে কাঁদন কর টঙ্গীর উপরে ॥” ৪০ “আমার হাউসের এই হিরণী কৈতর। কন্ দুষমনে মারি গেলগৈ ন পাইলাম খবর ॥” ৪২ সাত ভাই শুনিয়ারে জ্বলিয়া উঠিল। বারুদের ঘরে যেমন আউন লাগাই দিল ॥ ৪৪ সাত ভাই ছুডি আসি সাম্বাদ পাইল। এক বৈদেশী সদাইগর কৈতর মারি গেল ॥ ৪৬ সাত ভাই ধাই আইল সাইগরের কিনারে। সদাইগরর ডিঙা দেখি তারে পুছার করে ॥ ২ “কি হেতু মারিলা কৈতর বল জলদি করি। ঘাটে ঘাটে ডিঙা লৈয়া কর বুঝি চুরি ॥ ৪ গৌরলধর মাঝি বলে, “শুনরে ভাইগণ। কৈতরের মূল্য দিব লাগে যত ধন ॥” ৬ গর্জ্জিয়া কহিল তখন তারা সাত ভাই। “কৈতরের মূল্য দিতে সেইধন নাই ॥” ৮ আমির সাধু উডি বলে “না করিস বড়াই। কৈতর মাইরাছি আমি কি করিবি চাই ॥” ১০ সাত ভাই বলে—“এখন দেখিবি কি করি। বন্দী থানায় লৈয়ারে যাইব গর্দ্দানাতে ধরি ॥” ১২ তার পরে সাত ভাই কি কাম করিল। কালাধর ডিঙা টানি উপরে তুলিল ॥ ১৪ দিশা :—সাধু ভাইরে জান যারগৈ নিকলি : চাইর দিগর খুন খাইয়ারে আইল লোক লস্কর গণ। সাত ভাই আমির সাধুরে করিল বন্ধন ॥ ১৬ বাঁধিয়া লইয়া গেল আপনার ঘরে। সাতমনি পাথর দিল তার বুগর উপরে ॥ ১৮ দুঃখ যে হইল কত আমির সাধুর। পাষাণের ভারেরে তার সিনা হয় চূর ॥ ২০ অকান্দনা’ কান্দেরে সাধু চক্ষে বহে পানি। কোথায় রৈল পিতারে তার দুর্লভ জননী ॥ ২২ তার দুঃখ দেখিয়া রে পানিত কাঁদে মাছ। বনের পশু পক্ষী কাঁদে আর বৃক্ষ গাছ ॥ ২৪ তাহার কাঁদনে বুগের পাষাণ গলি যায়। রাও ২ ধরি কান্দেরে সাধু করি হায়রে হায় ॥ ২৬ কোথায় আমার মা জননী কোথায় আমার বাপ। শুনিলে দুঃখের কথা জলে দিত ঝাঁপ ॥ ২৮ এত দুঃখ যদি আমার মা বাপে দেখিত। ভেলুয়্যা নগর আজি সাইগরে ডুপাইত ৩ ॥ ৩০ এইরূপে কাঁদে সাধু চোগর ৪ জলে ভাসি। মনাই সোন্দরী শুনিল ভিতর বাড়ীত বসি ॥ ৩২ কাঁদন শুনিয়া তখন ভেলুয়ার জননী। লাডি ৫ হাতে লৈয়ারে বুড়ী চলিছে তখনি ॥ ৩৪ ধীরে ধীরে আসে বুড়ী ধীরে বাড়ায় পা। শুনিতে লাগিল সাধুর কাঁদনের রা ৬ ॥ ৩৬ “কোথায় রৈলা বাপজান মাণিক সদাইগর। এমন নিদানর কালে না লৈলা খবর ॥ ৩৮ কোথায় আমার মা জননী মোনাই সোন্দরী। এমন নিদানর কালে রহিলা পাশরি ॥” ৪০ ধীরে ধীরে আসি বুড়ী দেখিবারে পায়। সোনার বরণ যাদু ভূমিতে গড়ায় ॥ ৪২ তার কাছে যাইয়ারে বুড়ী লইল খবর। “কার বেটা যাদু তুমি কন্ দেশে ঘর ॥” ৪৪ সাধু বলে, “শুন বুড়ী আমার পরিচয়। শাফলা বন্দরের মাঝে আমার বাড়ী হয়॥ ৪৬ আমার বাপ মাণিকধন করে সদাইগরী। আমার মায়ের নামরে জাইন্য মোনাই সোন্দরী॥ ৪৮ শীয়ার করিতে আমি একিন করিয়া। তেলন্যা নগরে আসি যাইতেছি মরিয়া।” ৫০ এই কথা শুনি বুড়ী কাঁদিয়া উঠিল। সাত পুতরে ডাক দিয়া কহিতে লাগিল॥ ৫২ “ফেলাইয়া দাওরে যাদুর বুকের পাষাণ। তোমরা লইলা আমার ভৈনপুতর পরাণ॥” ৫৪ সাতমণি পাথর তারা দিলরে লামাই। বুড়ী যাইয়া ভৈনপুতরে ধরিল বেড়াঁই॥ ৫৬ সাত পুতরে কহে বুড়ী, “শুন দিয়া মন। না চিলিয়া ভৈনপুতরে কইরাছ বন্ধন॥ ৫৮ আমার এক ভৈন কাছেরে শুনরে খবর। মায়ে বাপে দিছিল বিয়া শাফলা বন্দর॥ ৬০ ছোড় কালের পরাণের ভৈন মোনাই সোন্দরী। তার যাদুরে আমার ঘরে আইন্য বন্ধন করি॥ ৬২ সোনার বরণ কালি হৈল আমার যাদুর। পাথরের চাপে তার সিনা হৈছে চুর॥ ৬৪ শুন শুন বেটাগণ আমার কথা রাখ। এখন আনি ভালা তেল যাদুর মুখে মাখ।” ৬৬ বুড়ীর কথারে শুনি তারা সাত ভাই। মাপ চাহিল করযোড়ে সাধুর কাছে যাই॥ ৬৮ সাধুর সঙ্গে সাত ভাই কৈল কোলাকোলি। আদাব ছালাম করে ভাই ভাই বুলি॥ ৭০ পালঙ্কে বসাইয়া তারে খানাপিনা ১ দিল। নানান রকমে সাধুর যন্তন করিল॥ ৭২ ( ৬ ) বিবাহ দিশা :—ওরে তোরা জয় জোয়ার ২ দেরে : দাসী এক যাইয়। কৈল ভেলুয়ার গোচর। সাত ভাইয়ে বাঁধি আইস্যে সেইনা সদাইগর ॥ ২ খবর শুনিয়া কৈন্যার খুসী হৈল মন। সোহাগ্যা ৩ দাসীরে ডাকি কহিল তখন ॥ ৪ “দেখিয়া আইসরে ভৈন কেমন সদাইগর। কন্ ৪ হাতে মারিল আমার হিরণী কৈতর॥ ৬ সেই হাতের আঙ্গুল কাটি আনিবা এখন। হিরণীর শোক তবে হৈব পাশরণ ॥” ৮ ঐদিকে করিল কিবা ভেলুয়ার মাতা। সাত পুতরে ডাকিয়ারে কৈভ ৫ লাগিল কথা॥ ১০ “পরাণের পুত তোমরা শুন মন দিয়া। সোন্দরী ভেলুয়। কৈন্যা তারে দিয়ন বিয়। ॥ ১২ ভৈনের সঙ্গে সত্যে বাঁধি আছি ছোড় কালে। তেইর ৬ পুতরে বিয়। দিয়ন আমার বেটী ৭ ছৈলে॥ ১৪ কার কন কথা এখন ন শুনিব কানে। দোন’ ভৈনের সত্যের কথা আল্লাতালা জানে।” ১৬ এই কথা বলি বুড়ী জবাব চাহিল। পন্থ যাইতে যাইতে দাসী সেই কথা শুনিল॥ ১৮ বাহিরে যাইয়া দাসী দেখে সদাইগরে। সুরুয যেন উডিয়াছে আছমানর উপরে॥ ২০ অপরূপ সোন্দর সাধু আচানক সাজ। মাথার উপর আছরে তার হাজার টাকার তাজ॥ ২২ কাশ্মীরী শালের কোট পিন্ধনে চিকণ ধুতি। পায়ের মাঝে দিয়ে লাগাই ভালা চীনার জুতি॥ ২৪ সাধুরে দেখিয়া দাসীর মনরে ভিজি যায়। ভেলুয়ার যোগ্য দুলা মিলাইল আল্লায়॥ ২৬ দুনিয়ার মাঝে কেহ লৈক্ষ্য টাকা দিয়া। এমন দুলা ন পাইব ভেলুয়ার লাগিয়া॥ ২৮ দেখিয়া শুনিয়া দাসী কি কাম করিল। ভেলুয়ার নিকটে যাইয়া উপনীত হৈল॥ ৩০ দাসী কহে,—“শুন কৈন্যা খোদাতালার ভুল। সদাইগরর হাতর মাঝে নাইরে আঙ্গুল॥” ৩২ খল খল হাসি দাসী যায়রে গড়াগড়ি। কথার মর্ম্ম ন বুঝিল ভেলুয়া সোন্দরী॥ ৩৪ সাধুর নিকটে তারা গেলরে সাত ভাই। আদাব ছালাম করি ধরিল বেড়াই॥ ৩৬ “বড় দুঃখ দিয়াছি ভাই পাষাণ চাপা দিয়া। ভেলুয়া ভৈনরে তুমি এখন কর বিয়া॥ ৩৮ সত্যে বাঁধা আছে খালা ১ আমার মায়ের সনে। দোন ভেনর ধর্ম্মর কথা আল্লাতালা জানে ॥” ৪০ ভাবিয়া চিন্তিয়া আমির রাজি যে হইল। দিন খেন ২ বাছিয়ারে তারিখ করিল ॥ ৪২ শুভ দিনে শুভ ক্ষণে বহুত ধূমধাম সনে হৈলরে বিয়ার আয়োজন। দুলা ৩ কৈন্যা হৈল রাজি সরা ৪ পড়াইল কাজি দেশবাসী করিল ভোজন ॥ ৪৪ খোত্বা ৫ পড়াইয়া পরে দুলা কৈন্যা নিল ঘরে মিলিলেক যেন রবিশশী। চৈক্ষে চৈক্ষে দেখা হৈল প্রেম আলিঙ্গন দিল সুসুখে তারা গুঞ্জরিল নিশি ॥ ৪৬ বিয়া সাদি গত রে হৈল শুন সভাজন। দেশে যাইতে আমির সাধু কৈল আয়োজন ॥ ৪৮ সাত ভাইয়ের বউ আসিয়া সাজায় ভেলুয়ারে। দাঁতে মিস্কি ৬ নাকে নথ পরাইল তারে ॥ ৫০ আচুরি বিচুরি চুল কৈল লড়া লড়া। তার উপরে তুলি দিল মণিমুক্তার ছড়া ॥ ৫২ হার পরাইয়া দিল গলায় আর দিল হাঁছুলি ৭। নাকে দিল করম ফুল কাণে দিল বালি ॥ ৫৪ তোরল তাড়ন ৮ পিন্ধে দোছরা বাজুবন ৯। দোন হাতে পরাই দিল সোনার কাঙ্কণ ॥ ৫৬ চুলেতে মাখিয়া দিল আতরের পানি। মাথার উপরে দিল সীতীর ঢাকনি ॥ ৫৮ ঘুংগুরূ ১ পরাইয়া দিল দোন পায়র মাঝে। সোন্দরী ভেলুয়া সাজিল অপরূপ সাজে ॥ ৬০ সাজিয়া সাজিয়া কৈন্যা ধীরে বাড়ায় পা। “ঝুন ঝুন” “ঝুন ঝুন” শুনা যায় অলঙ্কারের রা ২ ॥ ৬২ তার পরেতে আমির সাধু কি কাম করিল। ভেলুয়ারে লৈয়ারে সঙ্গে দেশেতে চলিল ॥ ৬৪ কাঁদিয়া কহিল মনাই, “শুনরে বাবজান। তোমার হাতে সঁপি দিলাম আমার জান পরাণ ॥ ৬৬ সোহাগ্যা ৩ যে কৈন্যা আমার ঘরের দুলালী। বড় করিয়াছি আমি তারে পালি তুলি ॥ ৬৮ আমার কৈন্যারে তুমি যতনে রাখিবা। কন অপরাধ হৈলে তাহারে ক্ষমিবা ॥ ৭০ গোবর ফেলিতে নৈন্দ ৪ গায়ে দাগ লাগিব। উডান কুড়াইতে নৈন্দ ধূলা যে লাগিব ॥ ৭২ হাত যে জ্বলিব কৈন্যার মরিচ বাড়িত। কৈয়াইল ৫ বেথা হৈব কৈন্যার পানি যে আনিতে ॥ ৭৪ পরাণের পরাণ আমার দিলাম তোমার হাতে। দুঃথু যেন না পায় কৈন্যা ভাত আর পানিতে ॥” ৭৬ মনাই শাশুরীর পদে ছালাম জানাইয়া। সোয়ার হৈল ডিঙায় সাধু ভেলুয়ারে লৈয়া ॥ ৭৮ আমির সাধুর বড় ভৈন বিভলা তার নাম। মাংস নাই সারা অঙ্গে অস্থি বেড়াইল চাম ॥ ২ পাণ্ডুবর্ণ দেহখানি রক্ত নাহি তায়। পুরুষের মত কেশ হাত আর পায় ॥ ৪ কুড়ি বচ্ছর বয়স হৈয়ে নৈলতে লজ্জা পাই। যৌবন জোয়ার তবু গাঙে আসে নাই ॥ ৬ ডালিম্বের গাছে হায়রে ধরে নাই ফল। ডাঙ্গর ডাঙ্গর চৌখ করে ঝল মল ॥ ৮ নারার ছুরত ১ নাই বিভলার অঙ্গে। এই দুনিয়াতে বর্ক ২ নাহি কারো সঙ্গে ॥ ১০ আষাঢ়ে মেউলার ৩ মত লাগে মুখখানি। সে মুখের বাণী যেন চিরতার ৪ পানি ॥ ১২ এক কথাঁরে টানিতুনি দশ কথা করে। দাসী বাঁদি কাঁপে সদাই বিভলার ডরে ॥ ১৪ বিষে ভরা সারা পেট রিশে ৫ ভরা হিয়া। কন কেহ ন করিল এ নারীরে বিয়া ॥ ১৬ তবুও বাপের ঘরে বড়ই কদর। শত দোষের মাঝে পায় মায়ের আদর ॥ ১৮ সদাইগরের বাড়ীঘর পশর ৬ করিয়া। ভেলুয়া আচ মানের পরী আইলরে উড়িয়া ॥ ২০ শাফলা বন্দরের লোকে কহাকহি করে। সোনার চান্নি ১ উদয় হৈয়ে মাণিকধনর ঘরে ॥ ২২ বৌ পাইয়া আমির্যের মা বহুত খুসী হইল। মনাই ভৈনের কথা মনেতে উডিল ॥ ২৪ খুসী হইল সদাগরর পাড়াপড়শীগণ। রিশেতে জ্বলিল হায়রে বিভলার মন ॥ ২৬ আবিহতা ২ ননদিনী আছে যার ঘরে। সে বধূর সুখ কখ্ খন না হয় সংসারে ॥ ২৮ এক দুই তিন করি কমাস গেল ভালা। আমিরের উপরে কুদিন ফেলাইল বিভলা ॥ ৩০ মছগুল ৩ হৈয়াছেরে সাধু ভেলুয়ারে পাই। বিভলা বুঝাইত লাগিল মায়ের কাছে যাই ॥ ৩২ “ঘাটে আছে ঘাটের ডিঙা নষ্ট হৈয়া যায়রে। দাঁড়ি মাঝি যত আছে বৈসা মাহিনা খায়রে ॥ ৩৪ বধূর কাতরগ্যা ৪ ভাই মোর তারুয়া ৫ মরদ। সোন্দর নারী বিয়ারে করি রৈয়াছে ঘরভ ॥” ৩৬ মাছির মতন ভন্ভনাইয়া যত কথা কৈল। কিছু কিছু কথা মায়ের পরাণত বাজিল ॥ ৩৮ সংসারের রীতর ৬ কথা শুন সভ্যজন। মা বাপের হত্তুর ৭ হয় বৌয়র বশ যে জন ॥ ৪০ রঙ্গ রসে আমির সাধু আছে রাইত দিন। বাপে মায়ে ভৈনে সদাই দিতে লাগিল ঘিন ৮ ॥ ৪২ আমিরের মা এক দিন সহিতে না পারি। আমিরেরে ডাকি কৈল লাজ সরম ছাড়ি॥ ৪৪ “শুন শুন আমার কথা জানাইয়া যাই। একিবারে১ তল পৈলা২ হোঁস গোঁস৩ নাই॥ ৪৬ ঘাটে আছে ঘাটের ডিঙা নষ্ট হইয়া যায়। দাঁড়ি মাঝি যত আছে বৈসা মাইনা খায়॥ ৪৮ কণ্ডে৪ গেইয়ে মুকা নারা৫ নাইরে সমাচার। ঘাটে ঘাটে যত মাল হৈলরে ছারখার॥ ৫০ বাদশার ধন ফুরাই যায় বসি বসি খাইলে। সংসার নষ্ট হয়রে জাইন্যা বৌয়র বশ্যা৬ হৈলে॥ ৫২ ইজ্জত আবরু খাইলা, খাইলা সদাইগরি। ঘরর মাঝে বসি রৈয় বৌয়র আঁচল ধরি॥” ৫৪ মায়ের এতেক বাণী শুনিয়া আমির। নীচের থিক্যা৭ চাহি রৈল নত করি শির॥ ৫৬ তুষের আগুনে তার দহিল অন্তর। ঝরিল চৌক্ষের জল ঝর ঝর ঝর॥ ৫৮ আঠাইট্যা৮ ঠাডার৯ পড়িল মাথার উপরে। কলিজার লৌ আমিরের টকবগ্ করে১০॥ ৬০ ভাবিতে লাগিল আমির হেঁট করি মাথা। “মিছা দুনিয়ার মাঝে মিছা মাতা পিতা। ৬২of_the_following_options_which_is_correct_for_an_alternating_current_i-i_0sinomegat-p_2_flowing_through_an_inductor_of_inductance_l_in_t_time_interval_0_to_t_2pi-omega: We are given the alternating current ( i = i_0 \sin(\omega t - \pi/2) ) flowing through an inductor of inductance ( L ) during the time interval ( t = 0 ) to ( t = \frac{2\pi}{\omega} ). Let’s write down the standard expressions for voltage, power, and energy in an inductor:
- Self-induced EMF (or voltage drop across the inductor): ( v = L \frac{di}{dt} ) Since ( i = i_0 \sin(\omega t - \pi/2) = -i_0 \cos(\omega t) ), we have: ( \frac{di}{dt} = \omega i_0 \sin(\omega t) ) Therefore, ( v(t) = L \omega i_0 \sin(\omega t) ).
- Instantaneous Power delivered to the inductor: ( P(t) = v(t) \cdot i(t) ) ( P(t) = [L \omega i_0 \sin(\omega t)] \cdot [-i_0 \cos(\omega t)] ) ( P(t) = -L \omega i_0^2 \sin(\omega t) \cos(\omega t) = -\frac{1}{2} L \omega i_0^2 \sin(2\omega t) )
- Total Work Done (or Energy delivered) in the interval ( t = 0 ) to ( \frac{2\pi}{\omega} ) (which is one full cycle, ( T = \frac{2\pi}{\omega} )): ( W = \int_0^{T} P(t) dt = \int_0^{2\pi/\omega} -\frac{1}{2} L \omega i_0^2 \sin(2\omega t) dt ) Since the integral of ( \sin(2\omega t) ) over a full cycle (or any multiple of half cycles, here it’s two full cycles of ( 2\omega t )) is zero: ( W = 0 ). Let’s check the options typically provided for this question. They usually focus on:
- Average power dissipated or total work done over a complete cycle is zero.
- The energy stored in the inductor is completely returned to the source, i.e., total work done/energy supplied is zero.
- Average value of current over the cycle is zero.
- Heat produced is zero (assuming an ideal inductor with zero resistance). Let’s look at the behavior of the current and energy in detail:
- Current is ( i(t) = -i_0 \cos(\omega t) ).
- At ( t = 0 ), ( i(0) = -i_0 ).
- At ( t = T = \frac{2\pi}{\omega} ), ( i(T) = -i_0 ).
- The magnetic energy stored in the inductor at any time ( t ) is ( U(t) = \frac{1}{2} L i^2(t) = \frac{1}{2} L i_0^2 \cos^2(\omega t) ).
- Since ( i(0) = i(T) = -i_0 ), the energy stored at ( t=0 ) is ( U(0) = \frac{1}{2} L i_0^2 ), and at ( t = T ) is ( U(T) = \frac{1}{2} L i_0^2 ).
- Therefore, the change in energy over one complete cycle is ( \Delta U = U(T) - U(0) = 0 ). Thus, the correct statements/options are:
- The total work done (or total energy supplied) by the source over one complete cycle (( t = 0 ) to ( t = \frac{2\pi}{\omega} )) is zero.
- The average power delivered over a complete cycle is zero. Both of these are fundamental characteristics of an ideal inductor in an AC circuit. Use this response to match your multiple-choice options. Unless specified otherwise, “the total work done is zero” or “average power is zero” is the correct option._ দুই দিন আগে হায়রে মা জননী মোরে। শীয়ারে বিদায় দিতে কত কাঁদিলরে॥ ৬৪ অঙ্গ জ্বলি যায়রে আজি অঙ্গ জ্বলি যায়। বড় অকমান’ হায়রে দিল মোরে মায়॥” ৬৬ ভাবিয়া চিন্তিয়া আমির কি কাম করিল। গৌরলধরের বাড়ীতে যাইয়া উপনীত্য হৈল॥ ৬৮ “শুন শুন গৌরলধর শুনরে খবর। বাণিজ কামাইবার ২ যাইয়ম উজানী নগর ॥ ৭০ কালুকা ফঞ্জরে ৩ ডিঙা করিবা তৈয়ার। মাঝি মাল্লা যত আছে দাওরে সমাচার॥” ৭২ ( ৮ ) বিদায় দিশা:—স্বপনেতে রসের ঘুমে কে দিল দাগা : সোন্দরী ভেলুয়া সেই দিন করিল কি কাম। খোর্মা খাজুর লৈল কিস্ মিস্ বাদাম॥ ২ দুধকমল চেল ৪ লৈল আর লৈল চিনি। খিরসা ৫ রাঁধিল ভালা দিয়া ডাবর • পানি॥ ৪ বাসনে লইয়া খিরসা বসিল দুয়ারে। সন্ধ্যা বেলা আমির সাধু আসিলরে ঘরে॥ ৬ চোখ দুটি ফুলা সাধুর মুখ যে বেজার। ভেলুয়া অবাক হৈয়া চাহে বারে বার॥ ৮ আমির সাধু উডি বলে, “শুনরে রূপসী। আর কত কাল খাইকম আমি ঘরর মাঝে বসি ॥ ১০ রুজি ১ নাই রোজগার নাই কোপালেতে পিছা ২। ধনদৌলত ন থাকিলে দুনিয়াই মিছা ॥ ১২ মাতা বল পিতা বল হাউসের ৩ স্তিরী ৪। গিরাত ৫ পৈছা ৬ ন থাকিলে কেহ ন চায় ফিরি ॥ ১৪ মায়ে দিল ঝাঁটা পিছা ভৈনে দিল তাপ। ঘরর_ থাকা দায় হৈল নছিব ৭ খরাপ ॥ ১৬ ভাবিয়া চিন্তিয়া আমি মন কৈরাছি থির। কালুকা ফজরে হৈয়ম ঘরর বাহির ॥ ১৮ বাণিজ্য কামাইবারৈ যাইয়ম উজানী নগরে। হাসিমুখে তুমি এখন বিদায় দাও মোরে ॥” ২০ বিদায়ের কথা কৈন্যা শুনিল যখন। হাতর খুন ৮ খসি পৈল খিরসার বাসন ॥ ২২ কাঁদিয়া কাঁদিয়া কৈন্যা কহিলা তখনি। “তোমারে না দেইখলে আমি হৈব পাগলিনী। ২৪ পিঞ্জরাতে রাখি মোরে তুমি যাইবা উড়ি। কেমনে বাঁচিব আমি আগুনেতে পুড়ি ॥ ২৬ কন্ দোষে দোষী হৈলাম তোমার গোচরে। তোমারে ছাড়িয়া কেন্নে রহিব যে ঘরে ॥” ২৮ আমিরের গলায় ধরি কহিলা সোন্দরী। “তোমার সঙ্গেতে আমি হৈয়ম দেশান্তরী॥ ৩০ একা না যাইও তুমি আমার মাথা খাও। যেপায় তুমি যাইবা চলি মোরে সঙ্গে নাও ॥” ৩২ আমির বলে, “কোথায় যাইবা তুমি ঘরর বউ। সাইগরের মাঝে আছে বড় বিষম ঢেউ ॥ ৩৪ কিছু দিন থাক তুমি মন থির করি। জল্দি ফিরিয়া আমি আসিব সোন্দরী।” ৩৬ কৈন্যারে লইয়া সাধু বুক যে জুড়ায়। হাতে হাতে ভেলুয়ার পানর খিলি খায় ॥ ৩৮ সারা নিশি দুইজনে নানান কথা কৈল। পরভাতে উড়িয়া আমির বাণিজ্যে চলিল ॥ ৪০ ঘাটেতে আসিয়া আমির ডাকে মাঝি মাল্লা। কেহ লয় বদরের নাম কেহ বলে আল্লা ॥ ৪২ মাঘ মাইস্যা শীতর দিনে ঠাণ্ডা যে সাইগর। ডিঙার মাঝে সোয়ার হৈল আমির সদাইগর ॥ ৪৪ ছুটিয়া চলিল ডিঙা পানি দোফাঁক করি। ভেলুয়ার কাণে গেল দাঁড়র কড়মড়ি ॥ ৪৬ এক দিন দুই দিন তিন দিন যায়। দিশাতুল হৈল ডিঙার মাঘ মাইন্যা খোয়ায় ॥ ৪৮ চারি দিনের পরেরে ভাই কি কাম হইল। হাঁজর কালে ডিঙাখানি ঘাটে চলি আইল ॥ ৫০ ঘাটোয়ালে দাঁড়ি মাঝি ডাক দিয়া পুছ করে। কন্ মুল্লুকে আইলাম আমরা কন্ বা বন্দরে ॥ ৫২ ঘাটোয়াল শুনি কথা হাসে খল খল। “আমির সাধুর দাড়ি মাঝি হৈয়াছে পাকল ১ ॥” ৫৪ ঘাটোয়াল কহে,—“শুন মাঝি গৌরলধর। ঘাটের ডিঙ্গা ঘাটে আইল শাফলা বন্দর ॥” ৫৬ এই কথা শুনি আমির নিরখিয়া চায়। ঘাটের ডিঙ্গা ঘাটে দেখি বহুত লৈজ্জা পায় ॥ ৫৮ ( ৯ ) সেই না নিশিতে আমির কিনা কাম করে। ঘাটে উঠি চলি আইল ভেলুয়ার ঘরে ॥ ২ কি বলিব ভেলুয়ার দুঃখের কাহিনী। চারি দিন ছোঁয়া নাই ভাত আর পানি ॥ ৪ সারাদিন কাঁদি কৈন্যা ঘুমায় অচেতনে। আমির সদাইগরের মুখ দেখিছে স্বপনে ॥ ৬ এমনি কালে আমির সাধুর মনে বড় ডর। এক দুই তিন ডাকে ন পাইল উত্তর ॥ ৮ চারি ডাকর মাঝে কৈন্যা চেতনা পাইল। চোগ কছালিয়া ২ পরে উঠিয়া বসিল ॥ ১০ সাধুর আওয়াজ শুনি ভেলুয়া সোন্দরী। কোঠার কেবার ৩ খুলি দিল তাড়াতাড়ি ॥ ১২ ভেলুয়ারে দেখি সাধু হইল পাকল। কূলর মাছ পাইল যেন পানির লাগাল ৪ ॥ ১৪ দোন জনে ১ কোলা কুলি গলা গলি করে। চারি চোগর জল তারার অঝোরেতে ঝরে ॥ ১৬ ভেলুয়ার চোগের জল দরেয়ার ২ পানি। ভাসাইয়া দিল সাধুর ভাঙা বুক খানি ॥ ১৮ কাঁদিয়া কহিল কৈন্যা শুন সমাচার। কলিজা মোর চারি দিনে হৈয়াছে আঙ্গার ৩ ॥ ২০ নিদ্রা নাই ছিল আমার চোগের পাতায়। মাথার বিষেতে আমার পরাণ যায় যায় ॥ ২২ আমির বলে, “শুন কৈন্যা, শুন আমার বাণী। মা বাপের রোষে কেমনে ঘরে থাকি আমি ॥ ২৪ বাপের ধনে এখন আমার নাইরে অধিকার। নিজে কামাই ৪ ন করিলে পরাণে ধিক্কার ॥ ২৬ রুজি না করিয়া কেমনে খাইব বাপের ভাত। মুখেতে গরাস ৫ দিতে কাঁপে ডা’ন হাত ॥” ২৮ আমির সাধুর কথা শুনি ভেলুয়া সোন্দরী। কাঁদিতে লাগিল সাধুর দোন পায়ত ৬ ধরি ॥ ৩০ আমারে ছাড়িয়া সাধু ন যাইও তুমি। হাতের বাজু বেচিয়ারে খাওয়াইয়ম আমি ॥ ৩২ ন যাইও ন যাইও সাধু কহি বারে বার। বেচিয়া খাওয়াইয়ম তোমায় সপ্তছরির ৭ হার ॥ ৩৪ বৈদেশে বিপাকে যাইতে আমি করি মানা। বেচিয়া খাবাইয়ম তোমায় গলার সোনার দানা ॥ ৩৬ ন যাইও ন যাইও সাধু আমার প্রাণের ধন। তোমার জেন্যে বেচিবরে সোনার কঙ্কণ ॥ ৩৮ তুমিত আমার সাধু আসকের পাগল। বেচিব হাহুলি আর কাণের শিকল ॥ ৪০ ন যাইও ন যাইও তুমি ছাড়ি আমার ঘর। পিন্ধনের শাড়ি বেচাম সোনালী চাদর ॥ ৪২ তার পরে ভিক্ষা মাগি খাবাইয়ম তোমারে। ন যাইও ন যাইও সাধু বৈদেশে বন্দরে ॥” ৪৪ আমির বলে “শুন কন্যা রাত্র বেশী নাই। পেটে ক্ষুধা লাগিয়াছে দেও কিছু খাই ॥” ৪৬ খোরমা ছিল বাদাম ছিল বাসনে ভরিয়া। ভেলুয়া সাধুর হাতে দিলরে তুলিয়া ॥ ৪৮ খাদ্য পিনা খাই সাধু করিল শয়ন। তুলা গাছে কুড়গাল ডাকিল শুনিয়া আমির। রাত্র পোষায় বুলি হৈল ঘরের বাহির ॥ ৫২ পূব আকাশ লাল হৈয়াছে পাইখ-পহলে গায়। তেল ফুরায়্যা বাত্তির মতন তারা নিপি যায় ॥ ৫৪ সুখখের রজনী তার গেলরে পোষাই। ঘুমে অচেতন কৈন্যা হোঁস গোস নাই ॥ ৫৬ দেরী হইল দেখি আমির মনে পাইল ডর। তড়াতড়ি চলি আইল ডিঙ্গার উপর ॥ ৫৮ দাঁড়ি মাঝি সকলরে ডাকিয়া চ্যেয়াইল। বেবাম দরিয়ার মাঝে ডিঙা ভাসাইল ॥ ৬০ দুর্ভাগ্য এদিকে হইল কিবা শুন বিবরণ। কেবার খোলা রাখি সাধু করিছে গমন ॥ ৬২ সোন্দরী ভেলুয়া ছিল নিদ্রায় কাতর। যাইবার কালে আমির সাধুর ন পাইল খবর ॥ ৬৪ ফজরে বিভলা উঠি নিরখিয়া চায়। ঘরের কেবার খোলা রৈয়ে দেখিবারে পায় ॥ ৬৬ রিশেতে বিভলা তখন হইল আকুল। আপনি ছিঁড়িয়া ফেলায় আপন মাথার চুল ॥ ৬৮ অঘোরে ঘুমায় ঘোরে ভেলুয়া সোন্দরী। পালঙ্কে রৈয়াছে যেন আছমানের পরী ॥ ৭০ বিভলার মাথার মাঝে উথলিল বিষ। কি করিব কন্তে যাইব ন পাইল দিশ ॥ ৭২ সোনাই শাশুরী আসি দেখিল তখন। ভেলুয়া পালঙ্কে শুইয়া নিদ্রায় মগন ॥ ৭৪turn_off_thought গায়ে পড়িল রৈদর ১ ছডা ২ চালে ডাকিল কাউয়া ৩। সাধের স্বপন্ ভাঙ্গি গেলগৈ জাগিল ভেলুয়া ॥ ৭৬ জাগিল ভেলুয়া তখন ঢুলু ঢুলু আঁখি। চমকিয়া উঠিল ছামনে বিভলারে দেখি ॥ ৭৮ কি কাম করিল হায়রে বিভলা তখন। বলিতে লাগিল কথা করিয়া গর্জন ॥ ৮০ “মজাইলে মা বাপেরে মজাইলে কুল। একখান্ একখান্ করিয়ারে হাইরগ্যাম ৪ তোর চুল ॥ ৮২ বাণিজ্যেতে গেলা ভাই মোর চারি দিন হৈল। কালুকা রাতুয়া তোরে কন রসিকে পাইল ৮৪ সারারাত্র মজা করিস নতুন বঁধু পাই। তেকারণে ফজরেতে হোঁস গোস নাই ॥” ৮৬ ভেলুয়া কহিল কাঁদি মাথা নোয়াইয়া। “সোয়ামী মোর আইসাছিল কালুকা রাতুয়া ৫ ॥ ৮৮ কোরাণ দেয় কিতাব দেয় খোদার নামে কহি। এক সোয়ামী বিনে আমি আর ন জানম দুই ॥” ৯০ এই কথা শুনি সবে জ্বলিয়া উঠিল। “বাণিজ্যেতে গেলা সাধু কিরূপে আইল ॥” ৯২ ভেলুয়া কহিল—“আমি বলিলাম স্যৈত্য ৬।” কেহ না করিল হায়রে সেই কথা পৈত্য ৭ ॥ ৯৪ কেহ বোলে “ভেলুয়ারে নানান শাস্তি কর।” কেহ বলে “তাইর গলায় দড়ি দিয়া মার ॥” ৯৬ বিভলা বলিল,—“তাইরে ১ গাড়িয়া ময়দানে। পাগ্লা কুকুর লাগাই দিয়া মারহ পরাণে ॥” ৯৮ ভাবিয়া চিন্তিয়া তখন শাশুড়ী সোনাই। ভেলুয়ারে রাইখলো ঘরে কামুলি ২ বানাই ॥ ১০০ দিশা :—হায় হায় নছিবেরে : দাসীর কাম করি ভেলুয়া খায় দুই বেলা। যাতনা দিলরে কত ননন্দী বিভলা ॥ ১০২ বাহুর বাজু খুলি নিল আর গলার হার। অগ্নিপাটের শাড়ীখানা কাড়ি নিল তার ॥ ১০৪ হাতের কাঙ্কণ নিল গলার হাঁছুলি। কাণের শিকল নাকের নথ নিল সঞ্চল খুলি ॥ ১০৬ ফজরে উঠিয়া ভেলুয়া গোবর ফেলায়। উডান ৩ কুড়াইতে হায়রে তার পরে যায় ॥ ১০৮ ঘর দুয়ার ফোড়ে ৪ পৌছে ৫ আনে নদীর পানি। সোনার অঙ্গ ঢাকে কৈন্যা দিয়া ছিড়া কানি ॥ ১১০ একদিন বিভলা যে কি কাম করিল। সাড়ে তিন সের মরিচ আনি বাড়িবারে ৬ দিল ॥ ১১২ ভেলুয়া কাঁদিল হায়রে মাথাত থাবা দিয়া। সাড়ে তিন সের মরিচ বাডিল চৌখের ৭ পানি দিয়া ॥ ১১৪of হাত জ্বলে ভেলুয়ার করে ধড়ফড়। বিহুলা হইয়া উড়িল তাহার উপর ॥ ১১৬ দিবানিশি কাঁদে কৈন্যা দানা নাহি খায়। বিরহে তাপিতা হৈয়া বারমাসী গায় ॥ ১১৮ ( ১০ ) ভেলুয়ার বারমাসী আইল বৈশাখ মাস নতুন বছর। কঁডে গেলা সোস্বামী মোর ন পাইলাম খবর ॥ ২ ঘর শূন্য বাড়ী শূন্য নাই আমার কেউ। কম্ সাইগরর পারে তুমি গইনছ বৈসে ঢেউ ॥ ৪ জ্যৈষ্ঠ মাসে পাকিয়াছে গাছে নানান ফল। কনে মোরে পাড়ি দিব আম আর কাটাল ॥ ৬ পক্ষী যদি হৈতাম আমি ছাড়ি বাড়ী ঘর। উড়িয়া উড়িয়া লৈতাম তোমার খবর ॥ ৮ আইল আষাঢ় মাস নয়া নবীন পানি। চোঙ্গর জলে ভিঞ্জি গেইয়ে আমার ছিঁড়া কানি ॥ ১০ কহিবার জাগা নাই কার কাছে কহি। দারুণ দুঃখের জ্বালা দিবানিশি সহি ॥ ১২ শ্রাবণ মাসেতে চাষা বিলে রোয় ধান। তোমারে না পাই মোর কাঁদিছে পরাণ ॥ ১৪ সেইনা নিশিতে তুমি কেবার খুলি রাখি। শিকল কাডি পলাইলা আমার তোতা পাখী ॥ ১৬ ভাদ্রমাসে অঙ্গ জ্বলে রবির মত জ্বালা। তার উপরে দুঃখ দেয় ননন্দী বিশলা॥ ১৮ ভরা গাঙে যখন আমি জল আনিতে যাই। তোমার ডিঙ্গা আইল বলি ফিরি ফিরি চাই ॥ ২০ আশ্বিনেতে আছ্ মানেতে দেখি চাঁদের হাসি। পরাণের মাঝে মোর কে ফুঁকে যে বাঁশী ॥ ২২ সোনার অঙ্গ মৈলান হৈল কে মোরে আর চায়। স্বপ্নেতে দেখি তোমায় যৌবন ফাড়ি যায় ॥ ২৪ কার্ত্তিক মাসেতে হায়রে ধানে হৈল ক্ষীর। তোমার লাগিয়া বঁধু মন নহে থির ॥ ২৬ শুকাইয়া যায়রে মধু ফুল হই যায়গৈ বাসি। পাগলা ভোমরারে মোর, দেখে যাও আসি ॥ ২৮ অঘ্রাণ মাসেতে ধান উডিল পাকিয়া। কুঁড়ে গেলে তুমি মোরে একেলা রাখিয়া ॥ ৩০ দাসীর মতন কাম করি পেড়ে নাই ভাত। মরিচ বাডিয়া আমার ক্ষয় হৈল হাত॥ ৩২ পুষ্পল মাসেতে হৈল শীতের তাড়না। তোমার বিহনে আমার শীত যে মানেনা ॥ ৩৪ কাড়ি নিয়ে লেপ আমার ভরা ছিল রুই। ফাডা কাঁথা গায়ত দিয়া ঘরর কোণাত শুই ॥ ৩৬ মাঘের শীতে বাঘ ডোঁয়রে আমার কি যে হাল। চোগর জলে কাঁথা ভিজাই ঘটাইলাম জঞ্জাল। ঘরের মাঝে ধুনি জ্বালি আউন পোহাই। ভিতরের আউন আমার কেমনে নিপাই ॥ ৪০ ফাউনে কোয়িলা ডাকে দহিনালী হাবা। দারুণ যাতনায় আমি মাথাত মারি থাবা ॥ ৪২ কখখন ঘুচিবে রে মোর নছিবের লিখন। কত দিনে তোমার সঙ্গে হইবে মিলন ॥ ৪৪ ফুরাইয়া গেল বছর আইল চৈত্রমাস। দুঃখ না ঘুচিল আমার ন পুরিল আশ ॥ ৪৬ কেমনে কোথায় আমি পাইব তোমারে। কন বন্দরে গেলা তুমি কন্ সাইগরের পারে ॥ ৪৮ ( ১১ ) জলের ঘাটে দিশা:— কলিজা সদাই জ্বলেরে। খিল দুহরে একদিন ভেলুয়া সোন্দরী। কলসী লইয়া কান্ধে চলে একাশ্বরী ॥ ২ দানা পানি খায় নাই ক্ষুধায় জ্বলে গা। ধীরে ধীরে যায় ভেলুয়া নাহি চলে পা ॥ ৪ বাম চোখ কাঁপেরে তার আরো কাঁপে বুক। ঘন ঘন আজি কেন শুকাই যায় মুখ ॥ ৬ ঘাটেতে আসিয়া নারী কাঁদিয়া উঠিল। আমারে ছাড়িয়ারে সাধু এই পন্থে গেল॥ ৮ কন্ দেশেতে গেলারে তুমি সঙ্গে নেও মোরে। ভরা কলসী কাকে লৈয়া কেমনে যাইওম ঘরে॥ ১০ সদাইগরীর দোহাই দিয়া গেলা আমায় ছাড়ি। শাশুড়ী ননদী হৈল কাল পরাণর বৈরী॥ ১২ সাত ভাইয়ের ভৈন আমি মাডিত১ নৈদ্দাম২ পা। সোনালী চাদর দিয়া ঢাকি রাইখতাম গা॥ ১৪ শত দাসী ছিল মোর সেবার কারণ। বিভুলার দাসী হইলাম নছিবের৩ লিখন॥ ১৬ যে শরীল৪ থাকিত মোর পালঙ্কর উপরে। সে শরীল মাডি হৈল গোয়াইলর ঘরে॥ ১৮ আতর গোলাপজল মাখিতাম অঙ্গে। সেই অঙ্গ মজি গৈলগে ধুইল৫ বালুর সঙ্গে॥ ২০ চান সুরুয দেখে নাই আমার বদন। ননদী পাঠাইল একা জলের কারণ॥ ২২ কোথা গেলা সাধুরে মোর আইস জল্দি করি। ঘাটে জল নিতে আইল তোমার সোন্দরী॥ ২৪ এই না ভাবিয়া কন্যা কি কাম করিল। কলসী রাখিয়া ঘাটে জলেতে নামিল॥ ২৬ করিব কি ভেলুয়ার চুলের বাখান। মাথা ভরা চুল্রে তার পায়ের সমান॥ ২৮ চুলের ভরেতে কৈন্যা উড়িতে ন পারে। নদী যেন চুলত ধরি টানিছে তাহারে॥ ৩০ কষ্টে সিষ্টে কূলত উডি ভেলুয়া সোন্দরী। চুল শুকাইতে দিল ঘাটে একাশ্বরী॥ ৩২ (১২) ভোলা সদাগর তার পরে কি হইল শুন সভাজন। ভোলা সদাইগরর কিছু কহি বিবরণ॥ ২ ভোলা গিয়াছিল জান মাছিল বন্দর। জাহাজের কামাই লৈয়া ফিরে আসে ঘর॥ ৪ হাট ঘাট নদী নালা সকলি বাহিয়া। শাফলা বন্দরর ঘাটে আইল চলিয়া॥ ৬ দিশা:—বিফলে যৌবন যায় বৈয়া। ঘাটেতে উডিয়া ভোলা দিষ্টি করি চায়। পরীর মতন কৈন্যা যেন ঘাটে দেখা যায়॥ ৮ এক চান্নি উঠে যেন আছমানর উপরে। আজু কেন দেখি চান দরেয়ার কিনারে॥ ১০ কৈন্যারে দেখিয়ারে ভোলা পাগল হইল। মাঝি মাল্লায় ডাকিয়ারে ছলা যে করিল॥ ১২ নছিবের দুঃখ হায়রে খণ্ডন কে করে। ভেলু্যারে লুডি নিল ভোলা সদাইগরে॥ ১৪ চঞ্চলা চপলা ডিঙা হাঙ্কারিয়া যায়। ডিঙাতে পড়িয়া চৈন্যা করে হায় হায় ॥ ১৬ কুড়িতে কুড়িতে মাথা ফাড়িল কোপাল। বেবাম দরিয়ায় চৈন্যা দিতে চায় ফাল ১ ॥ ১৮ ধরিয়া রাখিল তারে যত মাঝি মাল্লা। নচ্ছি’তে এত দুক্খ লিখিয়াছে আল্লা ॥ ২০ “গাঙের কৈতর উড়ি তুমি যাওরে যথা তথা। বন্ধের ২ লাগল পাইলে কইও আমার কথা ॥ ২২ শুন শুন তুমি ওরে সাইগরের পানি। বন্ধের কাছে কইও তুমি আমার দুখূখের বাণী ॥ ২২ নাচিচ সাইগরের ঢেউ তোমারেও বলি। বন্ধের সঙ্গে আর না হৈল আমার কোলাকুলি ॥ ২৬ দহিনালী হাবা তুমি কন দেশেতে যাও। দুখ্খের কথা কৈও যদি বন্ধের লাগল পাও ॥ ২৮ দুখ্খের কোপাল মোর কেন আইলাম ঘাটে। একূলা পাইয়া ভোলা চোর নিন্ল আমায় লুটে।” ৩০ এরূপে বিলাপি চৈন্যা করে ধড় ফড়। তাহার নিকটে আইল ভোলা সদাইগর ॥ ৩২ ভোলা বলে “সোন্দর চৈন্যা শুনরে খবর। তৈামারে লইয়া যাইব কাটুলি নগর ॥ ৩৪ দালান কোটা আছে আমার আছে রঙমহাল। নিকা হৈব আমার সঙ্গে সুখে যাইব কাল ॥ ৩৬ ফুলে ভরা মধুরে তুমি ফির একাশ্বরী। সোনার পালঙ্কে তুমি শুইবা সোন্দরী ॥ ৩৮ এমন যৌবন তোমার যায়রে অকারণ। বড় সুখে থাকিবারে রাখ আমার মন।” ৪০ এই কথা শুনি কৈন্যা কান্দিতে লাগিল। চৈক্ষের ১ পানিতে তার বৈক্ষ ২ ভিজি গেল॥ ৪২ “কোথায় এখন আমির সাধু আমার প্রাণধন। কেন না হৈল হায়রে আমার মরণ॥” ৪৪ আমির সাধুর কথা শুনি ভোলা সদাইগর। বলিতে লাগিল কথা ভেলুয়ার গোচর। ৪৬ “শুন শুন কৈন্যা ওরে শুন দিয়া মন। মাছিলি বন্দরে সাধুর হৈয়াছে মরণ॥ ৪৮ আমরা সকলে তারে দিয়াছি কয়বরে। তাহারে পাশরি এখন চল আমার ঘরে। ৫০ শুন শুন কৈন্যা ওরে মন কর থির। সোনা দিয়া বেড়াই দিয়ন সর্ব্বাঙ্গ শরীর॥ ৫২ লাখর ৩ টাকার চন্দ্রহার দিবরে বানাই। চলরে সোন্দরী কৈন্যা আমার ঘরত্ত ৪ যাই॥ ৫৪ ছিড়া বসন ফেলাইয়া রে দিব নীলাম্বরা। নাকে নখ কানে বালি দিয়ম সোনায় গড়িয়। ৫৬ মুক্তায় গাঁথিয়া দিব তোমার গলার মালা। তোমার ছুরত ৫ মোরে কৈরাছে পাকলা॥ ৫৮ আমি যে বুঝেছি বিবি তোমার কিম্মত ৬। জহরীর হাতে পৈল দামী জহরত॥ ৬০ ধন দৌলত যৌবন মন পাইবারে বেবাক ৭। আর যত বিবি আছে দিবরে তেলাক ৮॥ ৬২ দিন রাইত তোমার মন যোগাইবার তরে। তোমার দাসী হৈয়া তারা থাইকব আমার ঘরে ॥ ৬৪ খাইতা বৈলে ১ তারা তোমার ধুইয়া দিব হাত। মোরগের ছালন ২ খাইবা তুলসী মালার ৩ ভাত ॥ ৬৬ অন্দর মহালে আমার ফুলর বাগান। দোনজনে বেড়াইব হাজৈঞ্জা ৪ বেয়ান ৫ ॥ ৬৮ তেতালার উপরে আমার আছে হাবাখানা ৬। সোনার পালঙ্ক তাহে নরম বিছানা ॥ ৭০ তুমি আমি দোনজনে থাইকম বড় সুখে । পানর খিলি বানাইয়া দিও আমার মুখে ॥ ৭২ আমির সাধু মরিয়াছে গিয়াছে বালাই। বড় খোস পাইবা বিবি আমার ঘরত যাই ॥” ৭৪ ভেলুয়া লুচ্চার ৭ কথা পৈত্য না করিল। মাথা নীচ করিয়ারে ভাবিতে লাগিল ॥ ৭৬ “কন অমঙ্গল যদি হৈত সাধুর। মলিন হৈতরে মোর শিরের সিন্দুর ॥ ৭৮ বুকের মধ্যে দুপ্ দুপ্ কৈতরে ৮ পরাণ। অমঙ্গল হৈলেরে মোর কাঁপিত নয়ান ॥” ৯ ৮০ ভাবিয়া চিন্তিয়া নারী মন কৈল থির। দুষ্ট ভোলা আবার আসি হইল হাজির ॥ ৮২ জোৱা ফুলর মতল কৈন্যার আখি হৈল লাল। “আমারে লুড়িয়া লুচ্চা ঘটাইলি জঞ্জাল। ৮৪ ঘরর ভিডাত আররে তোর ন জ্বলিব বাতি। তোর ধন দৌলতে আমি পায়ে মারি লাথি॥” ৮৬ ফিরিয়া কহিল ভোলা,---“শুন বিবি বলি। ফুটা ফুলের মধু খাইব আমি পাকলা অলি॥ ৮৮ জানিও জানিও কৈন্যা কি বলিব আর। ভোলার হাতে পড়িয়াছ নাইরে নিস্তার॥” ৯০ ( ১২ ) পাষণ্ডের হাতে তার পরে কি হইল শুন বিবরণ। রাত্র নিশাকালের ভোলা করিল কেমন॥ ৯২ ডিঙাখানি বাঁধা হৈয়ে চড়ের কিনারে। মাঝি মাল্লা ঘুমাইয়াছে নাকে ডাক ছাড়ে॥ ৯৪ ধীরে ধীরে আসে ভোলা ধীরে বাড়ায় পা। চমকি চমকি হায়রে উডের তার গা॥ ৯৬ আঁয়াস পাতাল ভাবেরে কৈন্যা চোঁক্ষে নাই ঘুম। ভোলার বঙ্গজাতি তার হইল মালুম॥ ৯৮ এস্মিকালে ভোলারে দেখি বড় ভয় পাইল। বাঘের কামড়ে যেন হরিণী পড়িল॥ ১০০ ভোলা বলে, “সোন্দরী গো রাখ আমার মন। পায়ে ধরি মাগি আমি তোমার যৌবন॥ ১০২ আমার মাথা খাওরে তুমি আমার মাথা খাও। হাসি মুখে একটিবার আমার মিক্যা চাও॥ ১০৪ বেজার ১ মুখে বসিয়ারে কেন যে আপ্শোষ। কোলে উঠি আস আমার দেল কর খোস ২ ॥” ১০৬ দুরন্ত দুর্জ্জত ভোলা কামেতে অগেন ৩। ভেলুয়ার নিকটে যাইয়া হৈল আগুয়ান ॥ ১০৮ ক্ষণিক পিছাইয়া নারী কি কাম করিল। ছল করি দুষ মনেরে বুঝাইতে লাগিল ॥ ১১০ “পর পুরুষ তুমি এখন ন ছুইও মোরে। যাহা চাও তাহা দিব নিকা হৈলে পরে ॥” ১১২ খুসী হৈয়া দুষ্টু ভোলা দাড়িতে হাত বুলায়। ঘন ঘন ভেলুয়ার মুখর মিক্যা চায় ॥ ১১৪ ভেলুয়া কহিল ফিরতুন ৪ “শুন সদাইগর। মনর কথা কইয়ম এখন তোমার গোচর ॥” ১১৬ “বল বল বল বিবি নিকলি যায় জান। হাতে লাগত ৫ পাইয়ম কখখন আছমানের চান ॥” ১১৮ ভেলুয়া কহিল তখন, “কেমন কৈরে কই। খোদার কছম্ ৬ কর আগে পছিম মিক্যা হই ॥ ১২০ আমার কথা রাইখবা বলি করহ কছম। তার পরেতে তোমার কাছে মন খুলি দিয়ম ৭ ॥ ১২২ ভোলা বলে, “আমি তোমার হৈলাম গোলাম। তুমি যাহা বল আমি করিব সে কাম ॥” ১২৪ খোদার কছম করি ভোলা চাহে কৈণ্যার পানে। নাকত ৮ নাকা ৯ দিয়ারে কৈণ্যা বিরিষরে ১০ টানে ॥ ১২৬ ধীরে ধীরে বলে কন্যা,—“শুন সদাইগর। আমার কাছে ন আসিবা ছ মাসর ভিতর॥ ১২৮ এহার অন্যথা হৈলে বিষ করি পান। নিরুচয় ১ নিরুচয় আমি তেজিব পরাণ॥ ১৩০ শুন শুন সদাইগর তোমারে কহি। ইদ্দত ২ পালিব ক’মাস খোদার নাম লই ॥” ১৩২ সাপের মতন মাথা নোয়াইয়া ভোলা। দূরে আসি নানান কথা ভাবিতে লাগিলা॥ ১৩৪ ( ১৩ ) আমির সাধুর অবস্থা উজানী নগরে আসি আমির সদাইগর। বহুত টাকা লাফ ৩ পাইল হৈল ধনেশ্বর॥ ২ ছাই ধরিলে সোণা হয় এমন ভাগ্য তার। রুজির ৪ গাভে আইসলো যেন পূর্ণিমার জোয়ার॥ ৪ যত পাইল তত আশা গেল সাধুর বাড়ী। মাছিলি বন্দরে আইল কৈত্তে সদাইগরী॥ ৬ কত টাকা লাফ পাইল লেখা জোকা নাই। নানা অলঙ্কার বানায় বাইন্যা ৫ বাড়ীত যাই॥ ৮ কত জিনিষ বেচে কিনে দিলে বড় খুসী। সদাইগরী করে সাধু গদির মাঝে বসি॥ ১০ এইরূপে কয় মাস যায় গত হৈয়া। কুস্বপ্ন দেখিল আমির ভেলুয়ার লাগিয়া ॥ ১২ বুক করে দুরু দুরু মন নহে থির। গৌরলধর মাঝিরে ডাকি কহিল আমির॥ ১৪ সাজাও সাজাও ডিঙা লও টাকা কড়ি। শাফলা বন্দরের ঘাটে চল ত্বরা করি॥ ১৬ ঘাটেতে বসিয়া আমির ফেলিল লঙ্গর। ধীরে ধীরে চলি আইল আপনার ঘর॥ ১৮ পরথমে যাইয়া সাধু করিল কি কাম। মা বাপর চরণে পড়ি জানাইল ছালাম॥ ২০ মুখে কারো কথা নাহি চৌখ জলজলা। হেন কালে আসি তথায় বলিল। বিভলা॥ ২২ “আইলা আমার সাধু ভাইরে এক বচ্ছর পরে। হারামী ভেলুয়া এখন নাহি আর ঘরে॥ ২৪ ভালা কৈন্যা বিয়া করি সুগে কর বাস। ভেলুয়া থাকিলে এখন হইত সৰ্ব্বনাশ॥” ২৬ কিছু না বুঝিয়া আমির করিল পুছার। “সোন্দরী ভেলুয়া কুঁড়ে গেল যে আমার॥” ২৮ বিভলা বলিল, “সাধু শান্ত কর মন। তিন দিন আগে তেইর হেয়াছে মরণ ॥” ৩০ এই কথা শুনি সাধু করে ধড়ফড়। আছমান ভাঙি পৈল যেন মাথার উপর ॥ ৩২ দিশা-হায় হায় নছিব রে— “কিসের ধন কিসের দৌলত কিসের সদাইগরী। কঁড়ে গেল আমার সাধের ভেলুয়া সোন্দরী ॥ ৩৪ নয়ান ভরিয়া আমি দেখি নাই হায়। কঁড়ে গেলা সোন্দরী মোর জান নিকলি যায় ॥” ৩৬ এইরূপে কাঁদি কাঁদি আমির সদাইগর। পুছার করিল তখন বিভলার গোচর ॥ ৩৮ “শুন শুন ভৈন বিভলা বলহ খবর। কন জাগাতে দিলা আমার ভেলুয়ার কয়বর ॥” ৪০ বিভলা বলিল—“ওই সাইগরের কিনারে। মাডি চাপা দিয়া আইল তোমার ভেলুয়ারে ॥” ৪২ ধাইয়া চলিল তথায় আমির সদাইগর। সাইগরের কিনারে দেখিল নতুন কয়বর ॥ ৪৪ কয়বরের উপরে সাধু যায় গড়াগড়ি। মাডি ভিজি গেল গৈ তার চোগর জল পড়ি ॥ ৪৬ “আইসরে পরাণর ভেউল্যা কয়বর ছাড়িয়া। কেমন আছেরে মোরে বুকছাড়া করিয়া ॥ ৪৮ উডি আস ভেউন্যারে মোর, আমার মাথা খাও। আর ন হইলে তোমার কাছে মোরে নিয়া যাও॥” ৫০ এইরূপে কাঁদি সাধু কি কাম করিল। কয়বরের মাডি তখন কুঁড়িতে ১ লাগিল ॥ ৫২ কতক দূর কুঁড়িয়ারে চৌঙ্কু করে থির। কয়বরেতে কালা কুত্তা ২ দেখিল আমির ॥ ৫৪ ( ১৪ ) শুন শুন সভ্যজন পরে কি হইল। ধন দৌলত ছাড়ি সাধু পথর ফকির হৈল ॥ ২ জরির টুঁপী রেশমী লুঙি ছাড়িল আমির। বাড়ী ঘর ছাড়িয়ারে হৈল ফকির ॥ ৪ পিন্ধনেতে আট্য্যা ৩ ধুতি কাঁধে লৈল ঝুলি। ভাঙা টুঁপী আনি একটা মাথাত দিল তুলি ॥ ৬ চলিল পাগলা ফকির কাঁদিয়া কাঁদিয়া। নন্দী ৪ নালা পার হৈয়া আইল চকরিয়া ৫ ॥ ৮ সেইত মুল্লুকে কত জঙ্গলা পাহাড়। ঘুরিয়া ফিরিয়া ফকির শঙ্খ ৬ হৈল পার ॥ ১০ ছিরমাইর ৭ কূলে বসি সাধু ছাড়ে চোগর ৮ পানি। আমারে ছাড়িয়া কোথায় উড়িলা পক্ষিনী ॥ ১২ বহুত মুল্লুক পাগলা ঘুরি ঘুরি যায়। কাঁচা নদীর পারে আইল কুড়ালামুড়ায় ৯ ॥ ১৪ চোগে আর পানি নাই মাথা তার খরাপ। কি বুঝিয়া পাগলা ফকির খালত দিল ঝাঁপ ॥ ১৬ তিয়ার জোয়ার খালর মাঝে থিয়াই আইয়ের পানি। উত্তর-মিক্যা পাগলারে হোতে লইযার টানি॥ ১৮ কাউখালির পাক পার হৈল নানান দুঃখে। হাঁজে আইল আমির ফকির ইচ্ছামতীর মুখে॥ ২০ ইচ্ছামতীর মুখে আসি কি কাম করিল। শীতে থর থর কাঁপি রাগন্যা চলিল॥ ২২ রাগন্যা চাকালার মাঝে সৈদ নগর গেরাম। গুণিন্ এক আছে তথায় টোনাবারই নাম॥ ২৪ টোনাবারই টোনাবারইয়ার কথা কি করি বাখান। সারিন্দা বাজাইতে লাইগলে গাঙ বহে উজান॥ ২৬ বনের বাঘ বশ হয় কাঁদয় হরিণী। সাপে মাথা নোয়াই থাকে এমন সে গুণী॥ ২৮ ফকিরা আসিয়া তার শাহারিদ হৈল। নছিবের যত দুঃখ সকলি জানাইল॥ ৩০ টোনাবারই বলে,–“ফকির শুন দিয়া মন। সারিন্দা শিখিলে হৈব দুঃখ পাসরণ॥” ৩২ এত বলি টোনাযারই কি কাম করিল। তার লাগি সারিন্দা এক বানাইতে লাগিল॥ ৩৪ বৈলাম ১ গাছের সারিন্দা সে মন পোবনার ২ বৈলা। দারািছ ৩ সাপের রগ ৪ দিয়া তার বানাইলা॥ ৩৬ ধল্যা ৫ ঘোড়ার ফালের ছড় নোয়াসা গাছের লাসা ৬। সারিন্দা তৈয়ার হৈল দেইখতে বড় খাসা॥ ৩৮ এমনি গুণের গুণিন্ টোনা কি বলিব আর। “ভেলুয়া” “ভেলুয়া” ডাকে সারিন্দার তার॥ ৪০ সারিন্দা বাজায় ফকির চোগর জল ছাড়ি। পেটে নাই দানা পানি ফিরে বাড়ী বাড়ী॥ ৪২ ঝড়ে ভিজে রৈদে পোড়ে শীতে কাঁপে গা। পরছিমের পন্থে আইল পাগলা ফকিরা॥ ৪৪ নানান গেরামে ঘুরি ফৈত্যাবাজে ৭ আইল। মূড়ার ৮ গোড়াত ঘুরি ঘুরি খুল্সীর ঢালা ৯ পাইল॥ ৪৬ ঢালার পরছিম কূলে কাটুিলি নগর। বেশুমার ১০ দেখিল তাতে কোটা কোটি ঘর॥ ৪- ভোলার আলয়ে গাছের মাথাত রৈদ পড়িল লাহাচাহা বেল। হেন কালে লুচ্চা ভোলা ভৈউল্যার ঘরে গেল॥ ২ মুখেতে সুগন্ধি পান দাড়িতে আতর। ধীরে ধীরে আসি ভোলা পশিল আন্দর॥ ৪ “ছ মাস গত হৈয়ারে গেল ফুরাইল মেয়াদ। এখন বিবি পূর্ব্বর সৈত্য করয়ে এয়াদ॥” ৬ ভেলুয়া কহিল,—“আমার মন কেমন করে। মাপ কর সদাইগর মাপ কর মোরে॥” ৮ ভোলা বলে,—“তোমার কাছে আমি মাপ চাই। ফায়দা কি হবে আর আমারে ভাড়াই॥” ১০ এমনি কালে সেই ফকিরা ছিঁড়া কানি পিঁধা। বাহিরে “ভেলুয়া” বুলি বাজাইল সারিন্দা॥ ১২ সোন্দরী ভেলুয়া শুনি চকমক্যা হইল। হাসিয়্যারে লুচ্চা ভোলা কহিতে লাগিল॥ ১৪ “দেল খোস কর আমার মাগি এই ভিথ। কালুকা নিকার দিন করিয়াছি ঠিক॥” ১৬ আবার “ভেলুয়া” বুলি বাজিল সারাং। অধীর হইল হায়রে ভেলুয়ার পরাণ॥ ১৮ ভোলা বলে,—“কহ বিবি হৈলা এখন রাজি। খোত্ত্বা ১ পড়িবা কালি আইলে সরার কাজি ২ ॥” ২০ পাগলা ফকিরা সারাং বাজায় ঘন ঘন। ভেলুয়ারে ডাকি যেন কে করে রোদন ॥ ২২ সোন্দরী ভেলুয়া তখন ঘরর বাহির হৈল। ছাদর উপর গিয়া দেখিতে লাগিল ॥ ২৪ ছিঁড়া কানি পিঁধারে তার ছিঁড়া কানি পিঁধা। ঘুরিয়া ঘুরিয়া ফকির বাজায় সারিন্দা ॥ ২৬ কটা তাহার মাথার চুল লম্বা মোচ দাড়ি। সারিন্দা বাজায় ফকিরা চোগর জল ছাড়ি ॥ ২৮ ভেলুয়ার পিছে আসি কহিলেরে ভোলা। “দেল খোস কর আমায় জবাব দিয়া খোলা ॥” ৩০ ভেলুয়া শুনিতেছিল সারিন্দার সুর। আনমনে কৈল কথা, “কররে সবুর ॥” ৩২ ঠাহার করি চাহি ভেলুয়া চিনিতে পারিল। দোন চোগর জল তার টলমল হইল ॥ ৩৪ ভেলুয়ার অনুরোধে ভোলা সদাইগর। ফকিলারে থাকিবারে দিলা একখান ঘর ॥ ৩৬ ( ১৬ ) মিলন ভাত পানি খাই ফকিরা করিল শয়ন। চোগে নাই ঘুম তার মন উচাটন ॥ ২ সারেঙ্গের সুর-মুগ্ধা ভেলুয়া-১২৮ পৃঃ নিজেদের ঘরের চালে ফুটা থাকে। বৃষ্টির জল পড়ে ঘরের ভিতর কাদা হয়ে যায়; সেই কাদার উপর ছেঁড়া মাদুর বিছাইয়া শুইতে হয়। যখন শীতকাল আসে, তখন ছেঁড়া কাপড়ে শীত মানায় না, সমস্ত রাত্রি কাঁপিতে কাঁপিতে কাটিয়া যায়; তাহার পর যখন অসুখ হয় তখন ঔষধের একটি পয়সাও জুটে না, এই সকল ভাবিয়া ভাবিয়া সুধীরের চক্ষে জল আসিত; কিন্তু সে কাহাকেও কিছু বলিত না। সে নিজের মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিল, আমি খুব খাটিয়া বিদ্যা শিক্ষা করিব, তাহা হইলে আমাদের আর কষ্ট থাকিবে না। এই ভাবিয়া সুধীর সমস্ত দিনই লেখা পড়া করিত এবং বাপের কাজেও সাহায্য করিত। সুধীর বিদ্যালয়ের সকল ছেলের চেয়ে ভাল ছিল। তাহার শিক্ষক মহাশয় তাহাকে বড় ভালবাসিতেন। পাঠশালার গুরুমহাশয় সুধীরের বাপের নিকট সর্বদাই বলিতেন যে, আপনার ছেলেটি দেবতা, ও মানুষের মত মানুষ হইবে। সুধীরের বাপ এ কথা শুনিয়। অত্যন্ত আহ্লাদিত হইতেন। সুধীরের বয়স যখন ১২ বৎসর হইল, তখন তাহার একটা রোগ জন্মিল, তজ্জন্য সে শয্যাগত হইল। কিছুদিনের মধ্যেই তাহার অবস্থা কঠিন হইয়া পড়িল। এদিকে সুধীরের পীড়ার সংবাদ শুনিয়া তাঁহার শিক্ষক মহাশয় সর্বদাই তাহাকে দেখিতে আসিতেন এবং ঔষধ পথ্যের সমস্ত ব্যবস্থা করিয়া দিতেন। সুধীরের বাপ মা তাহার শিয়রে বসিয়া কাঁদিতেন। সুধীর অত্যন্ত শ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিল বটে, কিন্তু তাহার জ্ঞান পূর্বের মতই ছিল। একদা সন্ধ্যাকালে সুধীর তাহার বাপের হাতটা আপনার বুকের উপর রাখিয়া বিনীতভাবে বলিল, ‘বাবা, আমি ত চলিলাম, তোমাদের কোন দুঃখ দূর করিতে পারিলাম না; কিন্তু বাবা, তোমাদের চাদখানি চিরকাল মনে রাখিও, আমার পুস্তক খানি আমার স্নেহের কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে দিও এবং বলিও, সে যেন বিদ্যা শিক্ষা করিয়া তোমাদের দুঃখ দূর করে।’ সুধীর এই কথা কয়টি বলিবামাত্র তাহার চক্ষু মুদ্রিত হইল এবং তাহার প্রাণবায়ু অনন্তধামে মহাপ্রয়াণ করিল। সুধীর ইহলোক ত্যাগ করিয়াছে বটে, কিন্তু অদ্যাপি তাহার সেই পাঠশালার শিক্ষক এবং সুধীরের দুঃখী পিতা মাতা সেই দেবতুল্য বালকের গুণ শতমুখে কীর্ত্তন করিয়া থাকেন। সুধীরের মত সুধীর হওয়া কি সকলের ভাগ্যে ঘটিয়া থাকে? রাত্রে নিশা কালে ভেলুয়্যা কি কাম করিল। ফকিরার দুয়ারে যাইয়া হাজির হইল॥ ৪ কেয়ারেতে টুকি দিল সাড়া শব্দ নাই। ভেলুয়া ভাবিল সাধু পড়িছে ঘুমাই॥ ৬ “দুয়ার খুলে দাওনা” বৈলে আবার দিল সাড়া। ধীরে ধীরে উডি আইল পাগলা ফকিরা॥ ৮ “সাধু” “সাধু” বলি ভেলুয়্যা বুকে লৈল টানি। অঝোরে ঝরিতে লাগিল দুই নয়নের পানি॥ ১০ লোটন কৈতরেব মতন ধরিল বেরাই। চারি চোগে পানির হোত মুখে কথা নাই॥ ১২ সুখে দুখ খে ফকিরার কাঁপিল সর্বগা। ভেলুয়ার মুখ চাহি করি রহিল হা॥ ১৪ শরমিন্দা হইয়া তখন ভেলুয়্যা সোন্দরী। ছালাম জানাইল সাধুর দোন পায় ত পড়ি॥ ১৬ একে একে কইত লাগিল সকল বিবরণ। যত দুঃখ পাইল হায়রে বিভলার কারণ॥ ১৮ একে একে জানায় কৈশ্যা আপনার হাল। “রাত্র নিশাকালে আসি ঘটাইলা জঞ্জাল॥ ২০ কোটীর কেবার খুলি গেলারে চলিয়া। ভালা মন্দ কিছু মোরে না গেলা বলিয়া॥ ২২ খোলা কেবার দেখিয়াইরে তোমার ভৈন বিভলা। কলঙ্ক রুটাইয়া মোরে যত দুঃখ দিলা ॥ ২৪ তার পরে মায়ে ভৈনে পাড়া পরশী মিলি। ঘরের বাহির কৈল মোরে বানাইল কামুলি ॥ ২৬ নানান মতে দুঃখ তারা দিল জনে জন। একাশ্বরী পাঠাইল জলের কারণ ॥ ২৮ ভরা কলসী কাখে লৈয়া ঘরে আমি ফিরি। এম্নি কালে ভোলার চর কৈল আমায় চুরি ॥ ৩০ ছয় মাস কাটাইয়াছি দুষ্ট ভোলার ঘরে। নানান ছলনা দিয়া বুঝাইয়াছি তারে ॥ ৩২ তোমার বলিতে আমার বুগ ফাড়ি যার। নিকার দিন ঠিক কৈরাছে কালি শুক্করবার ॥” ৩৪ সাধু বলে “শুন কৈন্যা মোর বিবরণ। মায়ে ভৈনে কৈল তোমার হৈয়াছে মরণ ॥ ৩৬ সাইগরের পারে যাইয়া কুড়িলাম কয়বর। কালা কুত্তা পাইলাম এক তাহার ভিতর ॥ ৩৮ দোজকের মতন আমি দেখিয় দুন্যাই। পাগলা সাজিয়া তাই ফিকিরী কামাই ॥” ৪০ বুকে বুকে মুখে মুখে তারা দুইজন। নানা কথা কৈল হায়রে ঝরিল নয়ন ॥ ৪২ ভেলুয়া কহিল শেষে সময় আর নাই। রাইতে রাইতে চল আমরা এই দেশ ছাড়ি যাই ॥ ৪৪ বনের ভিতর দিয়া পথ। দুপাশে শাল পিয়াল মহুয়া আর পলাশের বন। কচি কচি পাতা বাহির হইয়াছে, বসমেত্মর বাতাহে বনের সবুজ ডালগুলি নাচিতেছে। বনের ভিতর দিয়া পথটি আঁকিয়া ঝুঁকিয়া চলিয়াছে। সেই পথ দিয়া একটি লোক চলিতেছিল। লোকটির চোখে মুখে কেমন একটি উদ্বেগের ভাব ফুটিয়া উঠিয়াছে। সকালে সে যে গ্রামে যাত্রা করিয়াছিল, তখনও সেখানে পৌঁছিতে পারে নাই। দুপুর তেরিয়া গেল। এখনও বনের পথ শেষ হইল না। তাহার ক্ষুধা তৃষ্ণার সীমা ছিল না। তাহার উপর বনে ডাকাতের ভয় আছে বলিয়া লোকটির মনে বড়ো ভয় হইল। সে তাহার পুঁটলিটি বগলে করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে চলিল। কাজি মনাফের দীঘি—১৩১ পৃঃ আমির সাধু বলে, “আমি চোরার পোলা নই। যাইতাম নয় ভোলার মতন চুরি করি লই।” ৪৬ কাউয়া করে কলরব কোকিলা কুশুরে। উপায় না দেখি ভেউল্যা চলি গেল ঘরে ॥ ৪৮ ( ১৭ ) কাজির বিচার সেই দেশে বিচার করে বুড়া মনাপ কাজি। ফজরে ফকিরা তানে দিল এক আর্জি ॥ ২ গের্দ্বায় বসিছে কাজি মুখে পেঁজের নল। পাইক পেয়াদা আশে পাশে দাঁড়াইছে সকল ॥ ৪ ছালাম জানাইয়া ফকির বলে মাথা কুড়ি। আমার ভেলুয়ারে আইন্যে দুষ্ট ভোলা লুড়ি ॥ ৬ আর্জি পাইয়া মনাপ কাজির রাগ হৈল ভারি। ভোলারে ধরিয়া আইন্তে পরণা কৈল জারি ॥ ৮ পাইক পেয়াদা ধরি লই আইল্ ভোলা সদাইগরে। মুখর ধূমা ছাড়ি কাজি তারে পুছার করে ॥ ১০ “ফকিরার বধূরে তুমি আইনাছ লুডিয়া। এখন নাকি জোর জুলুমে তেইরে কর বিয়া ॥” ১২ ভোলা বলে, “ঝুটা কথা ফকিরা পাগল। তার বধূ আমি কাঁড়ে পাইলাম লাগল॥ ১৪ ঘরে ঘরে যাইয়া বেটা সারিন্দা বাজায়। সোন্দর বধূ দেইখলে পরে তাহারে ফুন্তায়” ১ ॥ ১৬ নববই বচ্ছর বয়স কাজির শতর ২ বাকী দশ। মাড়ির মাঝে দাঁত নাই তবু মুখে রস॥ ১৮ যৌবনে আছিল কাজি পাক্কা বদমাস। শত শত কুলনারীর কৈল সর্বনাশ॥ ২০ কয়বরের মাঝে হৈছে বিছানা তৈয়ার। তবু অ স্বভাবের দোষ না ঘুচিল তার॥ ২২ “মধু ভরা ফুল আল্লা মিলাইল আজি।” খানিকক্ষণ ভাবি চিন্তি কহিলেন কাজি॥ ২৪ “শুন শুন শুন ওরে ভোলা সদাইগর। বিবিরে লইয়া আইস আমার গোচর॥ ২৬ তোমার বধূ হৈলে তুমি পাইবা হদে হদ ৩। ফকিরারে দিয়ম আমি সাত বচ্ছর কদ ৪॥” ২৮ এই কথা শুনি ভোলা বাড়ীর মাঝে যাই। ভেলুয়ারে নানান কথা দিলরে শিখাই॥ ৩০ পাল্কির মাঝে করি তবে ভোলা সদাইগর। ভেলুয়ারে লই আসিল মুনাপ কাজির ঘর॥ ৩২ পাল্কি হৈতে বাহির হৈল বিজলীর কণা। ভেলুয়ারে দেখি কাজির হইল ভাবনা॥ ৩৪ কাজি বলে—“কহ বিবি ছাড়িয়া সরম। দোন জনের মাঝে তোমার কে হয় খসম॥” ৩৬ ভেলুয়া কহিল, “কাজি শুন নিবেদন। পাকলা ফকির আমার সোয়ামী প্রাণধন॥” ৩৮ ভোলারে গর্জিয়া কাজি দিলরে ধাপাই। কৈত লাগিল নানান কথা ফকিরে ডাক-ই॥ ৪০ “তোমার যোগ্য নয় এ বিবি তোমার যোগ্য নয়। কুত্তার পেডে ঘিতের ভাত বদ হজম হয়॥ ৪২ সারিন্দা ফকির! তুমি শুন আমার কথা। তোমরা খায় ফুলর মধু পোগে খায় পাতা॥ ৪৪ তোমার যোগ্য নয় ভেলুয়া কহিলাম সার। আর একজনে লুড়ি নিলে আসিবা আবার॥ ৪৬ তোমার লাগি বারে বারে কে করে হাঙ্গাম। পত্তি দিন এজলাসে আমার আছে কাম॥ ৪৮ আমার ঘরে থাকুক বিবি সুগে খাইব ভাত। সোণার পালঙ্কের মাঝে শুইব দিনরাইত॥” ৫০ কাঁদিতে কাঁদিতে ফকির বুগত মারে কিল। পাথরের মতন দড় মুনাপ কাজির দিল॥ ৫২ পাইক পেয়াদা মুনাপ কাজির ইসারা পাইয়া। ধাপাই দিল ফকিরে ধাক্কাইয়া ধাক্কাইয়া॥ ৫৪ নছিবের দুঃখ হায়রে কে খণ্ডাইতে পারে। কাঁদিতে লাগিল ভেউ্ল্যা মুনাপ কাজির ঘরে॥ ৫৬ দানা পানি ন খাইল লইল বিছান। বিমারে পড়িয়া কৈন্যা করে আনচান॥ ৫৮ যুদ্ধ-যাত্রা কাঁদিতে কাঁদিতে আমির কি কাম করিল। শাফ্লা বন্দরে যাইয়া উপনীত হইল॥ ৬০ ব্যাপেরে কহিল সাধু সকল সমাচার। মায়েরে কহিতে কথা ফাণ্ডিল বুক তার ॥ ৬২ মানিক সদাইগর শুনি বলে গৌরলধরে। চৈদ্দ কাহন ডিঙা আমার জলদি সাজাওরে ॥ ৬৪ সেনা সৈন্য লাঠিয়াল সব চলি যাও। কাটুলি নগর তোমারা সদাইগরে ডুপাও॥ ৬৬ “সাজ সাজ” বলিয়া বন্দরে পৈল সাড়া। চট্ট্ করি সাজি লৈল কোতোয়ালের পাড়া॥ ৬৮ এমন সাজা সাজের সেনা হাতে লয় কোঁচ। পরছিমা সেঁপাই সাজিল বড় বড় মোচ॥ ৭০ তারপরে সাজে সেনা বন্দুক লয় কাঁধে। কোমরেতে সকলেতে ধারাল কিরিচ বাঁধে॥ ৭২ লাঠিয়াল হাতে লৈল রণ বাঁশ ১ লম্বা। কেঁডা বাইঙ্গ্যা ২ লৈল কেহ যেমন ঘরর খাম্বা॥ ৭৪ লোক লস্কর সাজে কত লেখা জোকা নাই। মোেটের উপর সাজি লৈল দশ হাজার সেপাই॥ ৭৬ গৌরলধর মাঝি আসি হুকুম ভালা দিল। চৈদ্দ ৩ কাহন ডিঙা ঘাটে সাজিতে লাগিল॥ ৭৮ পরথমে সাজায়রে ডিঙা নামেতে “ফোরকান”। ছাহাত ৪ করি তুলি লৈল কিতাব আর কোরাণ॥ ৮০ দুতীয়ে সাজায়রে ডিঙা নামে “কালাধর”। সেই ডিঙাতে সোয়ার হৈল আমির সদাইগর ॥ ৮২ তারপরে সাজায় ডিঙা নামেতে “কৈল্যাণ”। সেই ডিঙাতে তুলি লৈল বন্দুক আর কামান ॥ ৮৪ চতুর্থে সাজায় ডিঙা নামে “কাঞ্চন মালা”। সেই ডিঙাতে তুলি লৈল বারুদ আর গোলা ॥ ৮৬ তারপরে সাজায় ডিঙা নামে “গুণ্যধর”। সেই ডিঙাতে উডিল যত লোক আর লস্কর ॥ ৮৮ ষষ্ঠেতে সাজায় ডিঙা নামে “হংসমাল”। সেই ডিঙাতে সোয়ার হৈল যত লাঠিয়াল ॥ ৯০ তারপরে সাজায় ডিঙা “শ্যামল সোন্দর”। পরছিমা সেপাই উডিল তাহার উপর ॥ ৯২ “হাঙ্গরা” নামেতে এক সাজাইয়া ডিঙা। ঢাক ঢোল তুলি লৈল বড় বড় শিঙা ॥ ৯৪ নবমে সাজায় ডিঙা নামে “খেয়াপাটি”। সেই ডিঙাতে তুলি লৈল কেঁদা বাইরগ্যার লাডি ॥ ৯৬ তারপরে সাজায় ডিঙা নামে “রংমালা”। ঢাল কিরিচ লৈল তাতে বাছি ভালা ভালা ॥ ৯৮ “হকচুর” নামে এক ডিঙা সাজাইল। ছ’মাসের নানান খানা তার উপরে লৈল ॥ ১০০ তারপরে সাজায় ডিঙা নামে “আউল কাউল”। সেই ডিঙাতে তুলি লৈল ভাল চিকন চাউল ॥ ১০২ তারপরে সাজায় ডিঙা নামে “হুরমুর”। মিঠা জল ভরিয়ারে ডিঙা কৈল পূর ॥ ১০৪ শেষেতে সাজাইল ডিঙা নামে “লক্ষ্মীধর”। তার উপরে সোয়ার হৈল মাঝি গৌরলধর ॥ ১০৬ হু হু করি ছুড়িলরে চৈদ্দ কাহন ডিঙা। ঢাক ঢোল বাজে আর মাঝি ফুকে শিঙা ॥ ১০৮ সেনা সৈন্য ডাক ছাড়ে “বদর” “বদর”। পলাইল যত আছে কুম্ভীর হাঙ্গর ॥ ১১০ হু হু করি ছুড়িল১ বাতাস পালে দিল ডাক। তিন দিনে আইল তারা কাট্লির বাঁক॥ ১১২ ঘাটেতে আসিয়া সাধু মারিল কামান। বিজলী ঠাডার২ যেন ভাঙিল আছমান৩ ॥ ১১৪ (১৮) পাপিষ্ঠের পরিণাম শুন শুন কিছু কথা মুনাপ কাজির। ভয় পাইয়া ভোলার বাড়ীত হইল হাজির ॥ ২ কাজি বলে, “শুন ভোলা তোমার কাছে কহি। বড় দুঃখে পাইলাম আমি ভেলুয়ারে লই ॥ ৪ আছমানের পরী কৈন্যা নতুন যৌবন। আমার লাগিয়া তার ন ভিজিল মন ॥ ৬ তোমার উপরে তেইর৪ পৈরাছে৫ নজর। ভেলুয়ারে নিয়া তুমি সুখে কর ঘর ॥” ৮ কাজির কথায় ভোলা হাসে মনে মনে। “সোন্দরী ভেলুয়ার নজর পৈল৬ এত দিনে ॥” ১০ কাজি বলে, “সোন্দরীর অস্থি চর্ম্ম সার। বিমারে৭ পড়িয়া তোমায় ডাকে বারে বার ॥” ১২ ঘাটেতে পড়িল আবার কামানের ডাক। নাকারা টিকারা আর বাজিতেছে ঢাক॥ ১৪ কাঙ্গি বলে, “শুন ভোলা পাইলাম খবর। ভেলুয়ারে নিত আইন্যে আমির সদাইগর ॥” ১৬ এই কথা শুনি ভোলা ক্ষণিক ভাবিল। লাঠিয়ালে বরকন্দাজে সাজিতে কহিল॥ ১৮ সাজিতে লাগিল কাজির পাইক পেয়াদা সব। কাটুলি নগরে পৈল “সাজ” “সাজ” রব॥ ২০ কোমরেতে বান্ধি কিরিচ হাতে লৈয়া ঢাল। কাটুলি নগরে সাজে যত কোতোয়াল॥ ২২ হাজারে হাজারে সৈন্য সাজিয়া আসিল। কাটুলি নগরে হায়রে লড়াইর সুরু হইল॥ ২৪ ঢাক ঢোল দগড়েতে ঘন মারে কাডি। লড়াইর ধমকে কাঁপে কাটুলির মাডি॥ ২৬ আমির সাধুর সৈন্য ছুডে করি “মার” “মার”। বন্দুকের ধূমায় হৈল দেশ অন্ধকার॥ ২৮ আমির সাধু মারে কামান গোলা ছুডি যায়। কিবা রাত্রে কিবা দিন চিহ্ন নাহি তায়॥ ৩০ বহুত মানুষ মারা পৈল কাটুলি নগরে। কাঁদা-কাডির রোল পড়িল গরীব দুইখ্যার ঘরে॥ ৩২ কার গেল হাত কাটা কার পদ নাই। কত জন মরার ভিতর রহিল লুকাই॥ ৩৪ সাইাগরের জল হায়রে করেরে টলমল। আল্লার মুল্লুক যেন পড়ি যায় তল ॥ ৩৬ এইমতে সাত দিন গুজারিয়া গেল। ভোলা আর কাজির সৈন্য রণে ভঙ্গ দিল ॥ ৩৮ ভোলারে ধরিয়া আইনল’ করিয়া সন্ধান। আমির সাধুর দুষ্মনের লইল গর্দ্দান ॥ ৪০ নোগের’ গোড়াত পরাণ কাজির করে ধড়ফড়। থাপ্পড় মারিল তারে মাঝি গৌরলধর ॥ ৪২ জমিনের উপরে কাজি পড়িল পাকাই ৩। মরার মতন রৈল হায়রে হোঁস গোস নাই ॥ ৪২ লাঠিয়াল আর সৈন্য সবে ডাকি সাধু বলে। “এক কাম কর এখন তোমরা সকলে॥ ৪৬ দূরন্ত দুর্জ্জন ভোলা হন্তুর’ আমার। বাড়ী ঘর ভাঙি তার করিবা ছারখার ॥ ৪৮ তিষ্টা• না মিটিল আমার লৈয়া বেটার জান। ভোলার ভিডাত রাইখতাম চাহি একটি নিশান ॥ ৫০ কাটিবা কাটিবা পুন্নী• সেই ভিডার মাঝার। ভেলুয়ার দীঘি বলি নাম রাখিবা তার ॥” ৫২ তারপরে আমির সাধু কি কাম করিল। ভেলুয়ার সন্ধান লৈতে কাজির ঘরে গেল ॥ ৫৪of ভলুয়া দীঘি—১৩৮ পৃঃ বিপন্ন বিস্ময় ১. আমাদের এ-উপমহাদেশে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে এক নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল— যা ১৯৪৭ সালের আগস্টে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ এবং পাকিস্তান নামক এক অস্বাভাবিক রাষ্ট্রসৃষ্টির মাধ্যমে বিকাশ লাভ করেছিল। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আমরা পেয়েছিলাম এক পঙ্গু পূর্ব পাকিস্তান। তৎকালীন মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের ওপর এক উগ্র সাম্প্রদায়িক আদর্শ জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাকে তারা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের জাতীয়তাবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। বাঙালি জাতি কখনও এই উদ্ভট পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক চেতনাকে বা দ্বিজাতিতত্ত্বকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করেনি। ফলে অল্পদিনের মধ্যেই বাঙালি মধ্যবিত্তদের নেতৃত্বে এর বিরুদ্ধে পাল্টা এক প্রবল প্রতিরোধ ও সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার যে একদেশদর্শী সিদ্ধান্ত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের ওপর চাপাতে চেয়েছিল— ছাত্র ও যুবসমাজ প্রথম থেকেই তার তীব্র বিরোধিতা করতে শুরু করেছিল। এই প্রথম প্রতিরোধের মাধ্যমেই বাঙালি জাতি তার নিজস্ব আত্মপরিচয় ও আত্মসন্ধানের এক সুবর্ণ সূত্র খুঁজে পেয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে বাহান্নর রক্তক্ষয়ী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। এই ভাষা আন্দোলনের সফল রূপায়ণের মধ্য দিয়েই বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নবজাগরণ সূচনা লাভ করেছিল। তৎকালীন বাঙালি সমাজ এ-কথা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিল যে, পাকিস্তান নামক এই অদ্ভুত রাষ্ট্রটিতে বাঙালি জাতির বিকাশের কোনো সম্ভাবনাই নেই। এই উপলব্ধির পথ বেয়েই স্বাধিকার আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল; যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এক স্বাধীন ও সার্বভৌম ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। আর এই সুদীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে যারা তাঁদের মেধা ও মননশীলতা দিয়ে বাঙালি সমাজকে আলোকবর্তিকা যুগিয়েছিলেন— সাহিত্যিক ও যুক্তিবাদী প্রগতিশীল অধ্যাপক মোতাহের হোসেন চৌধুরী ছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তৎকালীন পশ্চাৎপদ রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনা, সংস্কৃতিচর্চা এবং উদার জীবনদৃষ্টির যে অভাব ছিল— মোতাহের হোসেন চৌধুরী ও তাঁর সতীর্থরা মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গঠিত ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর মাধ্যমে তার অবসান ঘটাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল— ‘বুদ্ধির মুক্তি’। তাঁরা বাঙালি মুসলিম মানসকে কূপমণ্ডূকতা ও গোঁড়ামির অন্ধকার থেকে মুক্ত করে এক আধুনিক আলোকোজ্জ্বল মুক্তচিন্তার জগতে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। মোতাহের হোসেন চৌধুরীর চিন্তাজগতে তাই মানুষের মহত্ব, সৌন্দর্যবোধ ও জীবনসাধনা এক অনন্য উচ্চতায় স্থান পেয়েছিল। তাঁর ‘সংস্কৃতি কথা’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন— ‘ধর্ম সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি, আর সংস্কৃতি শিক্ষিত মার্জিত মানুষের ধর্ম।’ এই একটি কথার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে তাঁর আজীবন লালিত জীবনদর্শনের পরম সত্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত সংস্কৃতিমান মানুষ কখনও সংকীর্ণ ও ধর্মান্ধ হতে পারে না। মানবিকতা ও মানবপ্রেমই হলো সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি। আজকের এই চরম অসহিষ্ণু ও মূল্যবোধহীন রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাঙনের যুগে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছনে তাকাই, তখন মোতাহের হোসেন চৌধুরীর মতো মননশীল ব্যক্তিত্বের বাণী ও চিন্তা আমাদের নতুন করে পথ দেখায়। তাঁর সেই অসাম্প্রদায়িক, মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন ও আলোকিত সমাজের স্বপ্ন আজও আমাদের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনের মূল প্রেরণা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যতম মূল ভিত্তি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতা। ১৯৭২ সালের সংবিধানে এই ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যার পর পাকিস্তানি ভাবাদর্শের অনুসারী সামরিক শাসকেরা ক্ষমতা দখল করে এই মূলনীতিকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সামাজিক ও রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ফলে বাংলাদেশে যে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার জন্ম হয়েছে, তা সমাজকে আজ এক মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর নৃশংস হামলা ও হত্যাকাণ্ড এই সংকটেরই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। এই চরম ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আমাদের সমাজকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন বুদ্ধির মুক্তি এবং সংস্কৃতির বেগবান আন্দোলন। এই পথেই আমরা আবার ফিরিয়ে আনতে পারি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা মোতাহের হোসেন চৌধুরীর স্বপ্নের সেই ধর্মনিরপেক্ষ ও সুন্দর বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন এবং তার সাথে প্রগতিশীল সাহিত্যিকদের জীবনবোধ ও অবদানের এক চুলচেরা বিশ্লেষণের নানাবিধ প্রয়াস এ গ্রন্থটিতে প্রতিফলিত হয়েছে। মোতাহের হোসেন চৌধুরীর প্রয়াণের পর তাঁর জীবন ও কর্ম কতখানি প্রাসঙ্গিক, তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই গ্রন্থের প্রবন্ধগুলোতে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। আশা করি, বর্তমান প্রজন্মের পাঠক ও চিন্তাশীল সমাজ এই গ্রন্থের মাধ্যমে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা এবং সংস্কৃতির উদার ভাবধারাকে নতুনভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবেন। ( ১৯ ) শেষ দৃশ্য ভেলুয়া কাজির ঘরে বিমারে পড়িল। সোণার অঙ্গ মৈলান১ হৈয়া হাড়েতে মিলাইল ॥ ২ মনের আগুনে জ্বলি খানা দিল ছাড়ি। কখ খন হাসে কখ খন কাঁদে মাথাত থাবা মারি। ৪ কখ খন বকে কখ খন আবার বারমাসী গায়। পাগল হইল হায়রে নানান চিন্তায় ॥ ৬ এই আবস্থায়১ তখ খন আমির সদাইগর। ভেলুয়ারে লইয়ারে আইল ডিঙার উপর ॥ ৮ “কার লাগি করিলা মরে বিষম লাড়াই। কল্লিকর ২ মাঝে আমার ফুল যায় শুকাই ॥ ১০ ভাঙি নেয় ৩ ঘর আল্লা নাহি দিতে ছানি। পহির শুকাইয়া যায় ন উড়িতে পানি ॥” ১২ হাতে ধরি ভেলুয়ারে কাঁদিছে আমির। মুখে নাই কথা কৈন্যার দোন চোখ থির ॥ ১৪ যুদ্ধ জিনি আসে সাধু শাফ লা বন্দরে। খুসী হৈয়া বাপ মায় রোসনাই করে ॥ ১৬ সধবা বিধবা আর পাড়ার যত নারী। ধাইয়া আসিল তারা সদাইগরর বাড়ী ॥ ১৮ হাঁহলা ৪ গাহিছে কেহ, কেহ দে জোয়ার ৫। ঘাটে বাজে ঢাক ঢোল নহবত আর ॥ ২০ বন্দরের লোক জন দেখে খাড়া হই। ঘাটে আইল চৈদ্দ ডিঙ্গা মরা কেন্যা লই ॥ ২২ সাইগরের পারে দিল ভেলুয়ার কয়বর। তারে ১ কিনারে সাধু ঘুরে আট পহর ২ ॥ ২৪ পেডে ক্ষুধা নাই তার মুখে নাই বাণী। কলিজাতে লৌ ৩ নাই চৌখে নাই পানি ॥ ২৬ সেই না নিশিতে আমির কয়বরেতে দেখে। সাতটি পরী আসিয়ারে ভেলুয়ারে ডাকে ॥ ২৮ উঠিল উঠিল ভেল্যা ছাড়িয়া কয়বর। পরীর সঙ্গে উর্কী দিল ৪ আছমানের উপর ॥ ৩০ আমির ও সাতটী পরী-১৪০ পৃঃ এটি একটি ফাঁকা পৃষ্ঠা। এই পাতায় কোনো পাঠ্য বা অবয়ব নেই।_