গোপিনী-কীর্ত্তন
পূর্ববঙ্গ গীতিকা - তৃতীয় খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন
শ্রীশ্রীগোপিনী-কীর্ত্তন বন্দনা দিশা—আমি প্রথমে বন্দনা করি শ্রীগুরু চরণ। কৃপা করি দিল গুরু মন্ত্র মহাধন ॥ এই দেহ ছিল আমার পাষাণ সমান। মন্ত্র দিয়া কৈল গুরু ফুলের বাগান॥ ২ আমি লোহা, গুরু আমার পরশ-রতন। পরশে করিল গুরু আমাকে কাঞ্চন॥ ৪ দ্বিতীয়ে বন্দনা করি শিক্ষাগুরু পায়। কৃপা করি জ্ঞান দান যে কৈল আমায় ॥ ৬ অজ্ঞানেতে ছিলাম আমি অন্ধের সমান। দয়া করি দিল গুরু মেলিয়া নয়ান ॥ ৮ তৃতীয়ে বন্দনা করি দেব নারায়ণ। লক্ষ্মী সরস্বতী যার ভার্য্যা দুইজন ॥ ১০ হরগৌরী বন্দিলাম কৈলাস পৰ্ব্বতে। মহাবিষ্ণু বন্দিলাম ক্ষীরোদের জলেতে। ১২ ব্রহ্মাঠাকুর বন্দিলাম সৃষ্টি অধিপতি। পালনের কর্ত্তা বন্দি বিষ্ণু মহামতি ॥ ১৪ সংহারের কর্ত্তা বন্দি দেব পশুপতি। তান ভাৰ্য্যা বন্দিলাম গঙ্গা আর পার্ব্বতী ॥ ১৬ দশদিক্ বন্দিলাম দশদিকে পাল। আনন্দে বন্দনা করি নন্দের গোপাল ॥ ১৮ করযোড়ে বন্দিলাম ঠাকুর ব্রাহ্মণ। যাহার চরণ গুণে তরে ত্রিভুবন ॥ ২০ পিতামাতা বন্দিলাম সংসারের সার। যাহার প্রসাতে আমি দেখিলাম সংসার ॥ ২২ সরস্বতী মাও বন্দি যুড়ি দুই হাত। যাহার প্রসাদে আইলাম সভার সাক্ষাৎ ॥ ২৪ সভার চরণ বন্দি গলে দিয়া বাস। পদভঙ্গে কেহ না করিবেন উপহাস ॥ ২৬ করিবেন সকলে মিলিয়া আশীর্ব্বাদ। পদভঙ্গে কেহ না লইবেন অপরাধ ॥ ২৮ স্বামীর চরণ বন্দি ভক্তিযুক্ত হইয়া। বিদেশে গেলা আর না আইল ফিরিয়া ॥ ৩০ যেখানে সেখানে থাক মোর প্রাণপতি। তোমার চরণে যেন থাকে মোর মতি ॥ ৩২ যা হবার হইয়াছে কপালের লেখা। মরণের দিনে দিও এ দাসীরে দেখা ॥ ৩৪ রাধাকৃষ্ণ বন্দিলাম মধুর বৃন্দাবনে। যার নামে কীৰ্ত্তন করিব এইখানে ॥ ৩৬ বৈষ্ণব ঠাকুর বন্দি, দয়ার সাগর। কৃপা কর প্রভু মোরে আমি যে পামর ॥ ৩৮ ছাডু নাথের পায় বন্দি লুটাইয়া ধরা। হাতে ধরি যে মোরে শিখাইলা লেখাপড়া ॥ ৪০ কি জানি বন্দনা আমি কিবা জানি গান। কৃপা করি মান রক্ষা কর ভগবান্ ॥ ৪২ চণ্ডালিনী বলে প্রভু না করহ ঘৃণা। শ্রীচরণে দিও স্থান, সুলার প্রার্থনা ॥ ৪৪ শ্রীকৃষ্ণের জন্ম দিশা—জন্মিল অনাদি কৃষ্ণ শুভলগ্ন পাইয়া। কৃষ্ণপক্ষ অষ্টমী তিথি নক্ষত্র রোহিনী। শুভদিনে জন্মিল কৃষ্ণ গুণমণি॥ ২ ভাদ্রমাসে নিশা কালে কংস-কারাগারে। হইল কৃষ্ণের জন্ম দৈবকীর উদরে॥ ৪ দেবগণ করে তখন পুষ্প বরিষণ। ত্রিশ কোটি দেব-দেবীর আনন্দিত মন॥ ৬ ছাওয়ালের রূপ যেন কোটি কোটি চাদ। শুভক্ষণে জন্মিল পূর্ণ ভগবান॥ ৮ অপরূপ রূপ দেখি দৈবকিনী কয়। কেন বিধি দিল মোরে এ হেন তনয়। ১০ বসুদেব বলে পুত্র দেব অবতার। মনুষ্য বলিয়া মনে না হয় আমার॥ ১২ আসিয়া দেখিলে কংস লইবে কাড়িয়া। পাষাণে আছাড় দিয়া ফেলিবে মারিয়া॥ ১৪ এই পুত্র রাখি আসি নন্দ ঘোষের ঘরে। যেমতে দুরন্ত কংস জানিতে না পারে॥ ১৬ পুত্র কোলে করি বস্তু হইল বাহির। ঘোর অন্ধকার নিশি চিত্ত নাহি স্থির। ১৮ ফুটি ফুটি বৃষ্টি গড়ে পিছলয়ে পাও। শোকে ভয়ে সাধুর কম্পিত হুইল গাও॥ ২০ সাবধানে চলে বসু অতি ধীরে ধীরে। কতক্ষণে উপনীত যমুনার তীরে॥ ২২ কণা কণা বৃষ্টি পড়ে ছাওয়ালের শিরে। ফণা ফেলি অনন্তু শিরেতে ছত্র ধরে॥ ২৪ যমুনার তরঙ্গ দেখি বসু পাইল ভয়। অকূল অগাধ নদী কেমনে পার হয় ॥ ২৬ ভবপারের কর্ত্তা হরি কোলেতে করিয়া। চিন্তাযুক্ত হইল বসু পারের লাগিয়া ॥ ২৮ অগাধ গভীর কাল যমুনার মাঝে। ঘেরে অন্ধকার নিশি কালো মেঘের সাজে ॥ ৩০ চিন্তাযুক্ত বসুদেব পড়িল বসিয়া। উপরেতে কালো মেঘ উঠিল গর্জ্জিয়া ॥ ৩২ বসুদেবের দুঃখে কান্দে দেবতা সকল। ছুটিছে পবন অতি হইয়া প্রবল ॥ ৩৪ বিজুলীর ছটা হইল বসুর সহায়। বিজুলী পশরে বসু দেখিবারে পায় ॥ ৩৬ এক শৃগালিনী সেই যমুনার জলে। হাঁটিয়া যমুনা পার হয় অবহেলে ॥ ৩৮ দেখিয়াত বসুদেবের সাহস বাড়িল। জলধর কোলে করি জলেতে নামিল ॥ ৪০ অনন্ত কৃষ্ণের লীলা দেব অগোচর। জানিয়া দেবের কার্য্য গাঙ্গে দিল চর ॥ ৪২ হেন কালে চক্রধারী কি কার্য্য করিল। মধ্য যমুনার জলে পড়িয়া যে গেল ॥ ৪৪ শিরে করাঘাত করি বসুদেব কান্দে। বসুর কান্দনে কান্দে সূর্য্য আর চান্দে ॥ ৪৬ পাইয়া নিধি হারাইলাম আমি অভাগিয়া। পুত্র হেন ধন দিলাম জলে ডুবাইয়া। ৪৮ জলমধ্যে বসুদেব করে অন্বেষণ। খুঁজিতে খুঁজিতে পায় আপন নন্দন॥ ৫০ পুত্র কোলে করি বসু তীরেতে উঠিল। দরিদ্র হঠাতে যেন মহারত্ন পাইল॥ ৫২ অন্ধ যেন চক্ষু পাইয়া আনন্দিত মন। পুত্র পাইয়া বসুদেবের হইল তেমন॥ ৫৪ মৃত্যুদেহে প্রাণ পাইল বসুদেব ঠাকুর। দেখিয়া পুত্রের মুখ আনন্দে বিভোর॥ ৫৬ পুত্র কোলে করি বসু তীরেতে উঠিল। ধীরে ধীরে নন্দ‑গৃহে উপনাত হইল॥ ৫৮ যশোদার ঘরে যাইয়া করে দরশন। কন্যা এক কোলে রাণী ঘুমে অচেতন॥ ৬০ পুত্র থৈয়া কন্যা লৈয়া বসু গেল ঘরে। দিল নিয়া সেই কন্যা দুষ্ট কংসাসুরে॥ ৬২ বসু বলে কংস রাজ কর অবধান। এই কন্যা হইয়াছে নাহি সুসন্তান॥ ৬৪ এত শুনি কন্যা লইয়া বসুদেব যায়। পাষাণে আছাড় দিয়া মারিবারে চায়॥ ৬৬ শূন্যে উড়ি যায় কন্যা দেবী রূপ ধরি। কংসেরে বলয়ে কিছু তিরস্কার করি॥ ৬৮ ওরে দুষ্ট কংসাসুর তোরে নাহি ভয়। তোরে যে বধিবে সে আছে নন্দালয়॥ ৭০ আমারে বধিতে তোর কিছু সাধ্য নাই। হের দেখ শূন্যপথে আমি চলি যাই॥ ৭২ এত কহি মহামায়া হইল অন্তর্দ্ধান। সুলা বলে অন্তকালে পদে দিও স্থান॥ ৭৪ গোষ্ঠ দিশা—আয়রে গোপাল যাই ধেনু চরাইতে। প্রভাতে উঠিয়া যত ব্রজের রাখাল। নন্দ ঘোষের দ্বারে আইল লৈয়া ধেনুর পাল ॥ ২ “আবা আবা” ধ্বনি করে যত রাখুয়াল। শ্রীদাম সুদাম ডাকে আয়রে গোপাল ॥ ৪ বলরাম শিঙ্গা ধরি ঘন ডাক ছাড়ে। আয়রে কানাই ভাই আয় শীঘ্র করে ॥ ৬ নিত্য নিত্য তোরে কেবা সাথে নিবে ভাই। আইসরে গোপাল শীঘ্র গোচারণে চাই ॥ ৮ তুই না গেলে কানন-মাঝে যায় না ধেনু। কাণ পাতিয়া আছেরে শুনিতে তোর বেণু ॥ ১০ শুনিয়া বাঁশীর গান ধেনু চলে বনে।
-
-
-
- ॥ ১২ রাখালের আবাবধ্বনি শুনি নন্দরাণী। কোলেতে তুলিয়া লইল কৃষ্ণ গুণমণি ॥ ১৪ গোপালেরে কোলে করি নন্দরাণী কয়। বনেতে দিব না আজি দুখিনীর তনয় ॥ ১৬ শুনরে শ্রীদাম সুদাম শুন হলধর। আজি গোষ্ঠে নাহি দিব পুত্র জলধর ॥ ১৮ সাত নাই পাঁচ নাই একটি ছাওয়াল। পাছে আছে শত্রু আমার কংস রাজা কাল ॥ ২০ শ্রীদাম সুদাম বলে কি বল জননী। না দিলে গোপাল মোরা ত্যাজিব পরাণী ॥ ২২ সাধে কি গোপাল তোর বনে নিতে চাই। রাখালের জীবন ধন তোমার কানাই ॥ ২৪ মরিলে পরাণ পাই গোপালের গুণে। জানি না গোপাল তোর কিবা মন্ত্র জানে॥ ২৬ সাবধানে রাখিব, না যাব দূর বনে। সকালে সাজায়ে দে মা তোর কৃষ্ণধনে॥ ২৮ এত শুনি নন্দরাণী সাজায়ে গোপালে। বয়ান ভাসিল রাণীর নয়নের জলে॥ ৩০ গোপালের সাজন দিশা---আয়রে গোপাল তোরে দেই সাজাইয়া। গোষ্ঠেতে যাইবে যদি মায়েরে কান্দাইয়া॥ আঙ্গিনার মাঝে গোপাল ধূলা খেলায় ছিল। লক্ষ চুম্ব দিয়া মায় কোলে তুল্যা লৈল॥ ২ মুছাইয়া সর্ব অঙ্গ পরাইল ধড়া। গলায়ে তুলিয়া দিল নবগুঞ্জা ছড়া॥ ৪ মন্ত্র পড়ি চূড়া বান্ধে মউর পাখা দিয়া। বান্ধিল মোহন চূড়া বামে হেলাইয়া॥ ৬ অলকা তিলকা দিল করিয়া উজ্জ্বল। কর্ণেতে কুণ্ডল দিল নয়নে কাজল॥ ৮ নূপুর পরায়ে দিল যুগল রাঙ্গা পায়। কটিতে কিঙ্কিণী দিল পীতাম্বর গায়॥ ১০ করেতে তুলিয়া দিল পাঁচনী আর বাঁশী। বাছুরি বান্ধিতে দিল এক গাছি রশী॥ ১২ সুবর্ণের খাড়ু দিল কৃষ্ণের দুই করে। তার বাজু বান্ধি দিল বাহুর উপরে॥ ১৪ গলায় বান্ধিয়া দিল সুবর্ণের পাটা। সোণায় বান্ধা বাঘের নউখ ১ কাঁচ কড়ি কয়টা॥ ১৬ সাজাইয়া কাচাইয়া রাণী গোপাল লৈয়া কোলে। অঝোরে ঝুরিছে রাণী নয়ানের জলে॥ ১৮ গোপালের বাম হস্তের কাণি আঙ্গুলখানি। দশণে দংশন তবে কৈলা নন্দরাণী ॥ ২০ মায়ে দংশন কল্লে তারে অন্যে না দংশয়। এতেকে দংশিল রাণী আপন তনয় ॥ ২২ ধড়ার অঞ্চলে বান্ধি ক্ষীর ছানা ননী। কাননে খাইবে বলি দিল নন্দরাণী ॥ ২৪ বামপদের ধূলা দিল গোপালের শিরে। শিরে থুথু দিয়া কত রক্ষামন্ত্র পড়ে ॥ ২৬ হেনকালে সাজি আইল ব্রজের রাখাল। সুলা বলে গোপাল গোষ্ঠে দেও মা সকাল ॥ ২৮ রাখালগণের প্রতি যশোদার উক্তি দিশা—আমার গোপালরে না নিয়ো দূর বনে। রে রাখুয়াল, আমার হরিরে না নিও দূর বনে ॥ নিকটে থাকিয়া সবে চরাইও ধেনু। ঘরে থাকি আমি যেন শুনি কানুর বেণু ॥ ২ সঙ্গে সঙ্গে থাক্য তুমি বাছা হলধর। তোমা সভা ছাড়ি যেন না যায় স্থানান্তর ॥ ৪ দুধের ছাওয়াল মোর কিছু নাহি বুঝে। আসা যাওয়া কালে তারে সবে রাখ্যো মাঝে ॥ ৬ দুরন্ত কংসের চর ফিরে বনে বনে। সর্ব্বনাশ জানি বা ঘটায় কোন্ দিনে ॥ ৮ সাত নাই পাঁচ নাই একমাত্র কানু। তোমরা তাহারে নেও চরাইতে ধেনু ॥ ১০ দণ্ডে দণ্ডে তিলে তিলে ক্ষুধা লাগে তার। ক্ষীর সর ননী বিনে না করে আহার ॥ ১২ ধর বাপু হলধর এই নেও ননী। ক্ষুধায় যেন কষ্ট নাহি পায় নীলমণি ॥ ১৪ দারুণ ভানুর তাপে কানু যে না ঘামে। শীতল বটের তলে রাখিও আরামে ॥ ১৬ চঞ্চল বাছুরি পাছে, যেন নাহি ধায়। দেখিও কুশের কাঁটা না ফুটে যে পায় ॥ ১৮ দুষ্ট গরু যে সকল যারে তারে মারে। সাবধান! কানু যে না যায় তার ধারে ॥ ২০ হাটিতে না পারে যদি কোলে তুল্যা লৈও। করিলে অন্যায় কিছু দোষ ক্ষমা দিও ॥ ২২ খেলিবার কালে কেহ না করিও দ্বন্দ্ব। বাড়ী আসি বরঞ্চ আমারে কৈও মন্দ ॥ ২৪ দুঃখিনীর ধন আমার কানু গুণনিধি। কত না ভাগ্যের বলে মিলাইল বিধি ॥ ২৬ গোকুলে নন্দের ধেনু হইয়াছে কাল। কে দেয় গোষ্ঠেতে হেন দুধের ছাওয়াল ॥ ২৮ আমার মনের দুঃখ কহিবাম কারে। এই পুত্র পাইয়াছি শিবদুর্গার বরে ॥ ৩০ বনে দিতে মনে কয় আমি যাই মরি। নতুবা মরিয়া যাউক নন্দের বাছুরি ॥ ৩২ যত দুঃখের গোপাল আমার রোহিণী সে জানে। তোমারা দুধের শিশু জানিবা কেমনে ॥ ৩৪ সকালে আসিও বাপ গোপালেরে লইয়া। সুলা বলে পন্থপানে রহিবাম চাইয়া ॥ ৩৬ শ্রীকৃষ্ণের গোষ্ঠযাত্রা ও বনে রাখাল সহ খেলা দিশা—গোষ্ঠে যায়রে নন্দের কানু বেণু বাজাইয়া। গোষ্ঠে যায় নন্দলাল, লৈয়া ধেনুর পাল। হৈ হৈ করি চলে যত রাখুয়াল ॥ ২ আগে চলে হলধর শিঙ্গা বাজাইয়া। শ্রীদাম সুদাম চলে নাচিয়া নাচিয়া ॥ ৪ আগে পাছে সখাগণ চলে সারি সারি। শুনিয়া কৃষ্ণের সেই মোহন মুরলী ॥ ৬ ব্রজ মাইয়া সবে উলু উলু ধ্বনি। আনন্দে গোষ্ঠে যায় গোপাল গুণমণি ॥ ৮ লীলায় চলিয়া গেল যমুনার কোলে। বসিল সকলে কেলিকদম্বের তলে ॥ ১০ খেলিছে বিবিধ খেলা যত রাখুয়াল। না জিতিলেও সবে বলে জিতেছে গোপাল ॥ ১২ দুই চারি বালক বলে নয়, নয়, নয়, নয়। এইবার গোপালের হইল পরাজয় ॥ ১৪ কেহ বলে রাগ করি, শুনরে শ্রীদাম। গোপালের সঙ্গে মোরা আর না খেলিবাম ॥ ১৬ না জিতিলেও সবে বলে জিতেছে গোপাল। কেন বা ব্রজেতে তার এত ঠাকুরাল১ ॥ ১৮ হেন মতে নানা খেলে খেলে রাখুয়াল। দৈবেকালিদ্হের তীরে আইল ধেনুর পাল ॥ ২০ গোপ-বালক ও কৃষ্ণ—৪৫৮ পৃঃ The provided image is completely blank. There is no text or content visible to transcribe. শ্রীকৃষ্ণের কালিদহে ঝাঁপ দিশা—ওরে ডুবিল নন্দের কানু কালিদয় সাগরে ॥ কালিদহে কালনাগ, সদা করে বাস। পর্ব্বত পুড়িয়া যায়, যদি লাগে শ্বাস ॥২ তাহার বিষের তেজে বিষময় জল। সবে জানে এই হ্রদের জলেতে গরল ॥ ৪ কালিদহের উপর দিয়া পাখী উড়্যা গেলে। বিষের তেজে ঢল্যা পড়ে সেই বিষ-জলে ॥ ৬ তৃষ্ণায় কাতর হৈয়া ধেনু বৎসগণ। কালিদহের জল খাই ত্যজিল জীবন ॥ ৮ খেলা ভাঙ্গি রাখুয়াল ধেনু অন্বেষণে। কানুরে লইয়া সঙ্গে ফিরে বনে বনে ॥ ১০ ভ্রমিতে ভ্রমিতে আইল কালিদহের কূলে। দেখে সব ধেনু বৎস পড়িয়াছে চইলে ॥ ১২ অন্তর্য্যামী ভগবান্ অন্তরে জানিল। কালিদহের জল খাই ধেনু বৎস মৈল ॥ ১৪ এত ভাবি ভগবান্ কদম্বে উঠিল। কালিদহের জলে তার ছায়া যে পড়িল ॥ ১৬ ছায়া দেখি দূর হৈতে পাইয়া অতি রাগ। ধাইয়া আইল দংশিবারে দুষ্ট কালিনাগ ॥ ১৮ কালিনাগ আইল দেখি কৃষ্ণ কুতূহলে। ঝাঁপ দিয়া পড়িলেন কালিদহের জলে ॥ ২০ কালির মস্তকে চড়ি কৃষ্ণ জলধর। নৃত্য করেন মহানন্দে হরিষ অন্তর ॥ ২২ কত জন্মের পুণ্যফল কালির জানি ছিল। ব্রহ্মাদির আরাধ্য পদ অনায়াসে পাইল ॥ ২৪ কালির ফণাতে চড়ি নাচে কালাচান। সংবাদ পঁউছিল কালির পত্নী বিদ্যমান॥ ২৬ সংবাদ পাইয়া তবে নাগ-পত্নীগণ। ধাইয়া আইল সবে পতির সদন॥ ২৮ স্বামীর মস্তকে নাচে ভবআরাধ্য ধন। দেখি নাগ-পত্নীগণে বন্দিল চরণ॥ ৩০ যোড় হাতে স্তব করে সম্মুখে দাঁড়াইয়া। দেখিছে কৃষ্ণের রূপ নয়ান ভরিয়া॥ ৩২ ফণি-শিরে নীলমণি খেলে কত খেলা। আনন্দে মোহিত যত নাগ নাগবালা॥ ৩৪ নাগের আলয় হৈল দিব্য গোলোকধাম। তীরে বসি কৃঞ্চশোকে কান্দে বলরাম॥ ৩৬ সুলা বলে না কান্দিও শ্রীদাম সুদাম। এখনি উঠিবেন তীরে নব ঘনশ্যাম॥ ৩৮ রাখালগণের খেদ দিশা—কান্দেরে রাখালগণ বলিয়া কানাই। কই থৈয়া গেলে তোর শ্রীদাম সুদাম ভাই॥ কই গেলে কানাই ভাই শীঘ্র দেরে দেখা। তোর মার কেউ নাই তুই বিনে একা॥ ২ শ্রীদাম সুদাম কান্দে ভূমে দিয়া গড়ি। সুদাম সখা কান্দে কোথা গেলেরে শ্রীহরি॥ ৪ কাল্রিন্দহের বিষ-জলে ঝাঁপ দিলে কেনে। তোরে বিনে আমরা কি বাঁচিব পরাণে॥ ৬ শ্রীদাম কহিছে আর সহেনা সন্তাপ। আইস সবে মিলি দেই বিষ-জলে ঝাঁপ॥ ৮ নাগ-রমণীগণ ও কৃষ্ণ—৪৮০ পৃঃ কাছে এসে দাঁড়ালে তিনি। বললেন, “এসো বাছা— এসে বসো।” স্নেহের সেই স্বর। তেমনি করুণা-কোমল মুখের হাসি। আমি তাঁর পায়ের ধূলো মাথায় নিয়ে সেই তক্তপোষে বসলাম। তিনি আমার মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “অনেক দুঃখ পেয়েছ তুমি। তবু ভগবান যে তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, এই তাঁর দয়া।” একটু থেমে আবার বললেন, “তুমি তো ওবাড়ীর হরেনবাবুর মেয়ে? না গো?” আমি চুপ করে রইলাম। উত্তর দিতে পারলাম না। বুকখানা তখন বেদনায় ভেঙে পড়ছে। ব্রাহ্মণী বললেন, “ওবাড়ী এখন সব খোল-নল্চে বদলে গিয়েছে বাছা! তবে কি জানো—মাটি তো আর বদলায়নি। মাটির মানুষ সব বদলে গিয়েছে। তা তুমি কি আর ওখানে যাবে?” আমি এবার কথা বললাম। বললাম, “জানিনে মা! মাথা গোঁজবার মতো তো আমার আর কোন জায়গা নেই—কোথায় যাব?” ব্রাহ্মণী বললেন, “কেন, এখানে থাকবে আমাদের কাছে। ভগবান যেমন ভাত জোগাবেন, তেমনি সকলে ভাগ করে খাব। আমাদের ঘরবাড়ী তো আর কেউ কেড়ে নেয়নি?” মনে মনে বললাম, সত্যিই তো! এদের ঘরবাড়ী তো কেউ কেড়ে নেয়নি! এরা আজও তেমনি তেমনিই আছে। ব্রাহ্মণী আবার বলতে লাগলেন, “তা বাছা! তোমার সে কষ্টের দিনের খবর তো আমরা কিছুই পাইনি। ও পাড়ার কে একজন বললে যে, তুমি নাকি ছিবিরে ছিলে? তা ছিবিরখান। কোথায় গা? সেখানে বড্ড কষ্ট?” শুদ্ধ-ভাষা ‘শিবির’ কথাটি পাড়াগাঁয়ের নিরক্ষর অবলা-সরলা নারীর মুখের কোণে ‘ছিবির’ হয়ে উঠেছে। আমি বললাম, “হ্যাঁ মা! সেখানে বড় কষ্ট।” তিনি কৌতূহলী হয়ে শুধোলেন, “তা সেখানে খায় কি সবায়? ঘর-দুয়ার কেমন?” আমি সংক্ষেপে জানালাম যে, সে এক বিরাট কাণ্ড। সেখানে ঘর-দুয়ার নেই—আছে তাবু। আর খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট তো আছেই। কেমনে এ পোড়ামুখ দেখাইব যাইয়া। পথ পানে চাহি আছে নন্দরাণী মাইয়া। কিবা ধন লইয়া যাইব নন্দরাণী ঠাঁই। এক কৃষ্ণ বিনে মায়ের অন্য লক্ষ্য নাই॥ যখনে শুনিবে ইহা নন্দরাণী মাতা। ত্যজিবে পরাণ ভাঙ্গি পাষাণেতে মাথা॥ যত সব আছে এই গোকুলে গোয়াল। সকলি পাগল হবে বলিয়া গোপাল॥ শীঘ্র উঠ কানাই ভাই বলে কোন জন। কেহ বলে এখনো কি আছেরে জীবন॥ হেনমতে সবে মিলি করে হায় হায়। জল হইতে তখনি উঠিলা শ্যামরায়॥ কৃষ্ণকে দেখিয়া তখন যত সখাগণ। মরণ শরীরে যেন পাইলা জীবন॥ দূরে গেল শোক তাপ আনন্দিত মন। একে একে সকলে করিল আলিঙ্গন॥ তবে কৃষ্ণ এক অঞ্জলি জল হাতে লৈয়া। মৃত গরুর উপরেতে দিল ছিটাইল॥ জলে ছিটা পাইয়া ধেনু পূর্ব্বমত হৈয়া। বৎস সহ উঠিলেক গা ঝাড়া দিয়া॥ আনন্দে রাখালগণ ধেনু বৎস সঙ্গে। বনে প্রবেশিল, খেলা আরম্ভিল রঙ্গে॥ সুলা বলে এইবার খেলিবাম আমি। চরণের দাসী হৈয়া কৃষ্ণ করি স্বামী॥ ফিরা গোষ্ঠ দিশা—চলেরে ব্রজের রাখুয়াল। হৈ হৈ করি চলে লয়ে ধেনুর পাল ॥ বেলা অবসান হইল দেখিয়া বলাই। বলে এখন গৃহে চল ভাইরে কানাই ॥ ২ এত বলি হলধর শিঙ্গা ফুকারিল। বৎস সহ ধেনু সব এক ঠাঁই হৈল ॥ ৪ শ্যামলী ধবলী আইল হাম্বা হাম্বা করি। উচ্চ পুচ্ছ করি নাচে যতেক বাছুরি ॥ ৬ আগে চলে হলধর শিঙ্গা বাজাইয়া। তার পাছে ধেনু সব যায় ধাইয়া ধাইয়া ॥ ৮ তার পাছে আনন্দিত চলিয়াছে আনন্দেতে কানু। নাচিয়া নাচিয়া যায় বাজাইয়া বেণু ॥ ১০ তার পাছে চলে যত রাখালের দল। ‘আবা আবা’ হৈ হৈ করি কোলাহল ॥ ২ যশোদা রোহিণী আদি যত ব্রজ মাইয়া। আঙুবাড়ি ১ দাঁড়াইল ধান্য দূর্ব্বা লৈয়া ॥ ১৪ উুলু উলু ধ্বনি করে যত নারীগণ। ব্রজের গোওয়ালে কত বাজায় বাজন ॥ ১৬ আঙুবাড়ি আইলা কৃষ্ণ লৈয়া ধেনুপাল। নন্দরাণী কোলে তুল্য লইলা গোপাল ॥ ১৮ অঞ্চলে মুছাইয়া তার চান মুখখান। লক্ষ চুম্বা দিয়া কৈলা আশীর্বাদ কল্যাণ ॥ ২০ যার তরে মরে গেল যত রাখুয়াল। যশোমতী নিজগৃহে লইলা গোপাল ॥ ২২ মধুময় কৃষ্ণলীলা কি তার তুলনা। তাহে ডুব মন মোর কহে সুলক্ষণা ১ ॥ ২৪ কৃষ্ণ নাবিক-বেশে ব্রজগোপীগণকে পার করিতেছেন গোপীদের উক্তি দিশা—পার করহে ওহে নূতন নাইয়া। মথুরায় বেচা কেনার সময় গেল বইয়া ॥ শীঘ্র পার করহে! কৃষ্ণ-লীলাসিন্ধু তার কূল কিনারা নাই। খেয়ানীর বেশে একদিন সাজিলা কানাই ॥ ২ ভাঙ্গা নৌকা রাঙ্গা বৈঠা পাছার মাঝে বসি। কত লীলা খেলা করে কৃষ্ণ কালোশশী ॥ ৪ মধ্য গাঙ্গে নৌকা লৈয়া করে আনাগুনা। কে বুঝিতে পারে তান মনে কি বাসনা ॥ ৬ গোপিকার সঙ্গে রঙ্গ করিবে বলিয়া। পার ঘাটের মাঝি হৈলা শ্রীকৃষ্ণ রঙ্গিয়া। ৮ হেন কালে ঘাটে আইলা বৃষভানুর ঝি ২। আসি দেখে ভাঙ্গা নায়ে শ্যামনাগর মাঝি ॥ ১০ ললিতা বিশাখা সঙ্গে রাই কমলিনী। হাসিতে লাগিলা দেখি নূতন খেয়ানী ॥ ১২ বিশাখা ডাকিয়া বলে ওহে নূতন নাইয়া। মথুরাতে যাব শীঘ্র দেও পার করিয়া ॥ ১৪ পার কর পার কর নাইয়া তীরে ভিড়াও তরী। আমাদের সঙ্গে আছেন রাধিকা সুন্দরী॥ ১৬ নাবিক বেশে নায়ে আছেন কৃষ্ণ কালশশী। তা দেখিয়া শ্রীরাধিকার মুচ্ কি মুচ্ কি হাসি॥ ১৮ ঘুমটা খুলে বারে বারে দেখিবারে চায়। বৈঠা হাতে শ্যাম নাগরে কেমন দেখা যায়॥ ২০ ললিতা বলয়ে যাব দধি বেচিবারে। শীঘ্র করি পার কর আমরা সবাকারে॥ ২২ দধির পসার মাথে, মোদের তপ্ত হৈল তনু। আর কত দাঁড়াইয়া রব মাথায় উঠল ভানু॥ ২৪ নাইয়া বলে ভাঙ্গা নৌকায় কেমনে করি পার। শুনিয়াছি গোয়ালিনীর গায়ে বড় ভার॥ ২৬ আরো ভারি হইয়াছে দধির পসারে। আরো ভারি করিয়াছে যুগ্ম পয়োধরে॥ ২৮ দৈবে আমার ভাঙ্গা নৌকা ভাঙ্গ্যা যদি যায়। কেমনে ভরিব পেট কি হবে উপায়॥ ৩০ সখীগণ বলে তুমি বড়ই নিলাজ। করিতে আইলে কেন খেওয়ানীর কাজ॥ ৩২ আসা যাওয়া করে লোক কেমনে কর পার। ভাঙ্গা নৌকা লৈয়া কেনে হৈলে কর্ণধার॥ ৩৪ কৃষ্ণ কহেন মর্ম্মকথা জান না ত তুমি। এক এক জন করি পার করি আমি॥ ৩৬ পার হইবার যদি ইচ্ছা থাকে তোমরার। আগে আন শ্রীরাধারে করে দেই পার॥ ৩৮ সখী বলে আমরা সব কুলের যুবতী। একা গেলে তব নায় কেমনে থাকে জাতি॥ ৪০ নব নারী হব মোরা একবারে পার। তারেতে লাগাও তরী শীঘ্র কর্ণধার ॥ ৪২ এক কথা কহি আমি, তোমাদের ঠাঁই। তোমাদের ইচ্ছাতে অনিচ্ছা মোর নাই ॥ ৪৪ পাছের কথা আগে কিছু কহিয়া রাখি তাই। নৌকা যদি ডুবে তবে মোর দোষ নাই ॥ ৪৬ তোমরা মরিবা প্রাণে আমার ডুবিবে নাও। এমত কৰ্ম্মেতে সাহস কেনবা দেখাও ॥ ৪৮ সখী বলে তরী ডুবূলে অখ্যাতি তোমার। ডুবিল তরণী থাকতে কৃষ্ণ কর্ণধার ॥ ৫০ ভাঙ্গা নাও বাইতে জানে মাঝি কই তারে। নূতন তরণী বাইতে সকলেই পারে ॥ ৫২ নৌকারে না দিও দোষ ছিঃ ছিঃ লাজে মরি। বুঝিয়াছি মাঝি তুমি আসলে আনারি ॥ ৫৪ মাঝি বলে কিবা দিব আগে দেহ দান। তার পাছে বুঝা যাবে পারের বিধান ॥ ৫৬ বিনা দানে কেহ নাহি পার হইতে পারে। কেবা কিবা দান দিবা আগে কহ মোরে ॥ ৫৮ সথা বলে পার কর নবীন কাণ্ডারী। ফিরিয়া যাইবার কালে দিব পারের কড়ি ॥ ৬০ এখন মোদের সঙ্গে কিছুমাত্র নাই। সঙ্গে আছে যা তোমাদের তাহা আমি চাই ॥ ৬২ সথা বলে সঙ্গে আছে বেচিবার দই। কৃষ্ণ বলে স্বপনেও তাহা নাহি চাই ॥ ৬৪ সঙ্গে আছে তোমাদের নওয়ালী’ যৌবন। তাহা যদি দান দিবা তুষ্ট হয় মন॥ ৬৬ সখী কহে কথা কহ মুখ সামালিয়া। দেওয়াব উচিত শাস্তি কংস রাজায় কৈয়া॥ ৬৮ ছোট মুখে বড় কথা শোভা নাহি পায়। দেবতার ভোগ কি কাউয়ায় কভু খায়॥ ৭০ কৃষ্ণ কহে গোয়ালীণী নাহি কর চোট। মধ্যে মধ্যে দেব-ভোগে কাউয়ায় দেয় ঠোট্॥ ৭২ সখী কহে সাবধান না বল বেজায়। পাটুনীর মুখে কি এ কথা শোভা পায়॥ ৭৪ লজ্জিত হইয়া কৃষ্ণ কন আর বার। বান্ধা দিয়া যাও তবে অঙ্গের অলঙ্কার॥ ৭৬ অন্য জনে পার করি লৈয়া আনা আনা। গোপিনী করিতে পার চাই কাণের সোণা॥ ৭৮ হাসি বলে গোপীগণ শোন নূতন নাইয়া। যাহা দিবার দিব পরে দেও পার করিয়া॥ ৮০ তবে কৃষ্ণ নৌকা নিয়া ভিড়াইল তীরে। একে একে গোপীগণ নৌকামধ্যে চড়ে॥ ৮২ কৃষ্ণ কহেন সাবধান ধর্ম্মের দোহাই। নৌকা যদি ডুবে তবে মোর দোষ নাই॥ ৮৪ আগার দিকে পসার থুইয়া গোড়ার উপর বইও। ভাঙ্গা নৌকায় পানি ছুয়ায় সেঁওতে সিঁচিও॥ ৮৬ এত বলি নৌকা ছাড়ি দিল কর্ণধার। গোপিকা সকলে দিল মঙ্গল জুকার॥ ৮৮ আধাআধি গাঙ্গে ১ গিয়া নায় দিল লাচা ২ । কাঁপিল গোপিকার গাও নায়ের ভাঙ্গিল পাছা ॥ ৯০ হাহাকার করে তত গোপিনী সকল। থৈ থৈ করে যত যমুনার জল ॥ ৯২ তরঙ্গে পড়িয়া তরী হেলি দুলি যায়। ভয় পাইয়া গোপীগণ কৃষ্ণ মুখ চায় ॥ ৯৪ ললিতা বিশাখা বলে শুন কর্ণধার। তরী যদি ডুবে তবে কলঙ্ক তোমার ॥ ৯৬ কিছু কিছু করি তরী পাইল কিনারা। তীরেতে উঠিল রাধা সহ গোপিনীরা ॥ ৯৮ কৃষ্ণ কহেন শুন শুন রাধা চন্দ্রমুখী। যাবার কালে দিও দান নাহি দিও ফাঁকি ॥ ১০০ এই আমি ঘাট কূলে বান্ধিলাম তরী। আবার করিব পার আইস শীঘ্র করি। ১০২ সুৱা বলে শুন মাঝি প্রার্থনা আমার। তুমি যদি কর আন্তে ভবনদী পার ॥ ১০৪ শ্রীকৃষ্ণের ননী চুরি দিশা—রাধার মন চোর চুরি করে ননী- খায় রাধারসে ভোর ৩ ॥ শ্রীরাধিকার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিবারে। ননী চুরি করেন কৃষ্ণ আয়ান ঘোষের ঘরে ॥ ২ নিত্য নিত্য কমলিনী জলের ঘাটে যায়। গোপনে লইয়া ননী কৃষ্ণেরে খাওয়ায় ॥ ৪obuf_size_t_of_t_of_t_of_t_of_t_of_t_of_t_of_t_of_t_of_t_of_t_of_t_of_t_of_t আর দিন কুটিলায় জানিয়া সে সব। রাধিকারে গালি দেয় বড় অসম্ভব ॥ ৬ সেই হইতে ননী দিতে পারে না কৃষ্ণেরে। মনোদুঃখে শ্রীরাধিকা দিবা নিশি ঝুরে ॥ ৮ লুকাইয়া রাখে ননী আযান ঘোষের মায়। বৌয়ে পাছে চুরি করি কৃষ্ণেরে খাওযায় ॥ ১০ চাঙ্গের ১ উপর রাখে ছিক্যা ২ টাঙ্গাইয়া ৩। অন্তরে জানিলা সব নন্দের কালিয়া ॥ ১২ আর দিন শ্রীরাধারে কহিলেন হরি। তব বাঞ্ছা পুরাইতে ননী কর্ব্বো চুরি ॥ ১৪ কেন তুমি মনে এত দুঃখ ভাব রাই। ঘুচাব তোমার দুঃখ আমি ননী খাই ॥ ১৬ এত বলি রাধিকারে শান্ত করি হরি। নিত্য নিত্য জটিলার ঘরে করেন চুরি ॥ ১৮ ভাণ্ড ভাঙ্গেন ছিক্যা ছিঁড়েন খান ননী ছানা। জটিলা কুটিলা চোর ধরিতে পারে না ॥ ২০ আর দিন দেখে কৃষ্ণ ননী খাইয়া যায়। ধরিতে না পারে বুড়ী করে হায় হায় ॥ ২২ সহিতে না পারে আর কৃষ্ণের উৎপাত। দুঃখে করে করাঘাত নিজের মাথাত ॥ ২৪ আঙ্গুল ফুটাইয়া কয় সর্ব্বনাশ্যা মর। কোন কালে ভাল আর না হইবে তোর ॥ ২৬ অল্প আয়ু হউক তোর মোরে দিস্ দুখ। ধরিতে পারিলে তোর চিবিয়া দিব মুখ ॥ ২৮ জলিয়া পুড়িয়া মরে জটিলা কুটিলা। দরমের আড়ালে হাসে বৃষভানু বালা ॥ ৩ আর দিন নড়ী হাতে সে জটিলা বুড়ী। কাঁপিতে কাঁপিতে গেল নন্দ ঘোষের বাড়ী ॥ ৩২ যশোদার ঠাঁই কয় দিয়া ওলাহন। সুলা বলে আর নাগো! পোড়ে মোর মন ॥ ৩৪ যশোদার প্রতি জটিলার ওলাহন বাক্য দিশা —রাণী গোপালকে সাম্লাইও। নিত্য নিত্য পরের ঘরে যায় না যে অরে কৈও ॥ ঘরে গিয়া প্রতিদিন তোমার গোপাল। তঙ্ক লঙ্ক করে যত ঘরের মালামাল ॥ ২ গৃহকর্ম্মে থাকি মোরা আন্মনা হৈয়া। ভাণ্ড ভাঙ্গে চিকা ছিঁড়ে তোর গোপাল গিয়া ॥ ৪ বৌকে লৈয়া ঘাটে যাই দোয়ারে দিয়া বান্। কেম্নে জানি ঘরে যায় তোমার কালাচান ॥ ৬ ধর্ত্তে নারি অম্নি সয়তান থাকে লুকাইয়া। সর্ব্বনাশ করে আমার খালি ঘর পাইয়া ॥ ৮ দৈবে যদি দেখি তারে মাখন খাইয়া যায়। গালি দিলে ঘাড় বাঁকাইয়া হাসি মুখে চায় ॥ ১০ কত মতে পোড়ামুখা আমারে জ্বালায়। হাত নাচাইয়া ননীর দলা আমারে দেখায় ॥ ১২ কালী করে কোন দিন লাগাল পাই তারে। দুই হাতে মুচড়াইয়া ঘাড় ভাঙ্গিব ভাল করে ॥ ১৪ এমন নিলাজ পুলা জন্মিল তোর পেটে। না লয় ঘর না লয় বাড়ী থাকে পথে মাঠে॥ ১৬ পরের ঘরে চুরি করে ছি ছি লাজে মরি। হেন পুত পেটে সয় কোন আভাগ্যা নারী॥ ১৮ এমন হৈলে যমের মুখে ডাক দিয়া দেই তারে। এমন পুত মরে না কেন? যদি চুরি করে॥ ২০ আরো কয় দিন কইছি তোমায় গোপাল করে চুরি। আজও কিছু কইয়া গেলাম দুই হাত যুড়ি॥ ২২ আর কোন দিন যায় না যে গো মানা কৈর তারে। দধি দুগ্ধ মাখন ছানা নাই কি তোমার ঘরে॥ ২৪ বারে বারে কহিলাম সহ্য কত করি। আর কোন দিন গেলে কিন্তু হাতে দিব দড়ি ॥ ২৬ ভাগ্যে পাইলে একটি পুত দুর্গার ছিল বর। পাঁচ সাতটা হৈলে ভাঙ্গত গোকুল নগর॥ ২৮ ঠোট রাঙ্গা তার বর্ণ কালা কোন্ বা চকের পুত। সদায় থাকে কদম গাছে আস্লা গাছের ভূত॥ ৩০ তিনের মাঝে বড় গুণ জানে কেবল চুরি। গোপের কূলে খোটা হৈল ছি ছি লাজে মরি॥ ৩২ জটিলাকে যোড়হাতে জানায় তখন সুলা। ব্রহ্মা বিষ্ণু বাঞ্ছা করে এই চোরের ধুলা॥ ৩৪ যশোদা কর্তৃক গোপাল-বন্ধন দিশা—আয়রে হা পুত বান্ধিবাম আজ তোরে। শুনিয়া জটিলার গালি কটু কর্কশ রাও। আগুন জ্বালাইয়া দিল নন্দরাণীর গাও॥ ২ ক্রোধে রাণী নড়ি’ হাতে ধাইয়া ধাইয়া যায়। দেখিয়া মায়ের ক্রোধ গোপাল পলায়॥ ৪ গোপালে ধরিতে রাণী পাছে পাছে ধায়। কাছে কাছে থাকে গোপাল ধরিতে না পায়॥ ৬ কে তারে ধরিতে পারে ধরা নাহি দিলে। যশোদা পাইয়াছে কোলে কোটি পুণ্য-ফলে॥ ৮ কে বুঝে কৃষ্ণের লীলা ভক্তজন বিনে। অন্ধে কি বুঝিতে পারে কি গুণ দর্শনে॥ ১০ যার নামে শমন পলায়, দুঃখ যায় দূরে। সে পুত্র পলায় আজ গোয়ালিনীর ডরে॥ ১২ কি লীলা করিল হরি মধুর বৃন্দাবনে। কি তপস্যা করেছিল ব্রজের গোপীগণে॥ ১৪ পুত্র রূপে পালন করে ভবআরাধ্য ধন। গোপালে দেখিলে নারীর আপনে ঝরে স্তন॥ ১৬ এমন বাৎসল্যের ধনে আপনে রাণী কয়। আজ তোরে বান্ধিবাম নিশ্চয় নিশ্চয়॥ ১৮ পরের ঘরে চুরি করে লোকে বলে মন্দ। আমাকেই বা কি বলিবে যদি শুনে নন্দ॥ ২০ ঘরে কি মোর মাখনের আছে রে অভাব। এত খাইয়াও গোপাল তোর এমন স্বভাব॥ ২২ যেখানেতে পাই তোরে নিশ্চয় ধরিয়া। হাতে পায় দড়ি দিয়া রাখিব বাঁধিয়া॥ ২৪ এত বলি নন্দরাণী পাছে পাছে ধায়। অতিশ্রমে যশোদার ঘৰ্ম্ম বহে গায়॥ ২৬of_thought দেখিয়া মায়ের কষ্ট কৃষ্ণ চূড়ামণি। মনে ভাবেন বড় দুঃখ পাইল জননী॥ ২৮ দেখিয়া মায়ের দুঃখ দয়ার ঠাকুর। পড়িলা মায়ের পদে ধরা পৈল চোর॥ ৩০ ধরিয়া আনিয়া রাণী দড়ি লইলা হাতে। গোপালের দুই হাতে বান্ধে ভাল মতে॥ ৩২ শক্ত করি বান্ধিতেও প্রাণে কষ্ট পায়। তবু শক্ত করি বান্ধে প্রাণের জ্বালায়॥ ৩৪ মায়া করি বলেন হরি নন্দরাণীর ঠাঁই। দিব্য করি আর যদি চুরি করি খাই॥ ৩৬ বেন্ধো না বেন্ধো না মাগো ধরি তোমার পায়। পাইব বড়ই দুঃখ বান্ধের জ্বালায়॥ ৩৮ রাগে রাণী নাহি শুনে গোপালে যা বলে। পলাইবে বলি বান্ধি থৈল উদখলে॥ ৪০ পায়ে পড়ি সুলা বলে যশোমতি মাও। বন্ধন খুলিয়া দেও মোর মাথা খাও॥ ৪২ গোপাল-বন্ধনে ব্রজবালকের খেদ দিশা—ওগো ছেড়ে দে মা নন্দরাণী গোপালের বন্ধন। শুনিয়া রাখাল সবে কৃষ্ণের বন্ধন। দৌড়া দৌড়ি আসি সবে জুড়িল ক্রন্দন॥ ২ শ্রীদাম সুদাম দাম সুবল বসুদাম। সিঙ্গা হাতে ধাইয়া আইল বলরাম॥ ৪ আসিয়া দেখিল কৃষ্ণ বান্ধা উদুখলে। দেখিয়া ভাইয়ের দশা ভাসে নয়ন-জলে॥ ৬ নন্দরাণীর পদে পড়ি সকল রাখাল। বলে মাগো গোপালেরে ছাইড়া দে সকাল ॥ ৮ মায়া করি কান্দে কৃষ্ণ বন্ধন জ্বালায়। দেখিয়া রাখাল সবে করে হায় হায় ॥ ১০ কোন রাখুয়াল বলে হের দেখ রাণী। দুই চক্ষে গোপালের ঝরিতেছে পানি ॥ ১২ পাষাণ মিলায়ে যায় দেখি চান্দমুখ। কি দিয়া বান্ধিছ রাণী আইজ তোমার বুক ॥ ১৪ কোন রাখাল ক্রোধে বলে রাণী যশোদায়। এমন করিয়া বান্ধে কার মায় ॥ ১৬ কেহ বলে ছেড়ে দে মা আর করব না চুরি। আমরা সকলে ইহা কহি দিব্য করি ॥ ১৮ কেহ বলে শীঘ্র করি ছাড়িয়া গোপালে। আমারে বান্ধিয়া রাখ তাহার বদলে ॥ ২০ কেহ বলে গোপালেরে নাহি দিলে ছাড়িয়া। মরিব আমরা সবে জলে ঝাঁপ দিয়া ॥ ২২ কেহ বলে আমরা আর না খাইব ননী। আমাদের ননী খাবে তোর নীলমণি ॥ ২৪ বলাই কহিছে তখন শিঙ্গা ফুকারিয়া। সকালে গোপালে রাণী দেওগো ছাড়িয়া ॥ ২৬ নতুবা লাঙ্গল লই বিনাশিব সৃষ্টি। এত কহি হলধর করে কোপ দৃষ্টি ॥ ২৮ মাটিতে লুটাইয়া কান্দে কত শতজন। কতজন ধরে নন্দরাণীর চরণ ॥ ৩০ দেখিয়া শুনিয়া তবে রাখালের দুখ। বাৎসল্য ভরিয়া উঠলো নন্দরাণীর বুক ॥ ৩২ দূরে গেল ক্রোধ রাণীর শান্ত হৈল মন। তখনি খুলিয়া দিল कृষ্ণের বন্ধন ॥ ৩৪ বন্ধন মোচন কথা শুনে যেইজন। তাহার না থাকে কভু ভবের বন্ধন ॥ ৩৬ যোড়হাতে জানাই আমি কর্ম্মকর্ত্তার পায়। এ হেন সময়ে তবে গাইনে কাপড় পায় ॥ ৩৮ লক্ষ চুম্ব দিয়া রাণী গোপাল কোলে লয়। মুছাইয়া চক্ষের জল কত কথা কয় ॥ ৪০ দূলা ঝাড়ি কোলে লৈল গোপালেরে রাণী। আনন্দে রাখাল করে আবা আবা ধ্বনি ॥ ৪ বুকে মুখে চক্ষের জল তায় ফুটিল হাসি। শিশিরেতে ভিজা যেমন ফুল রাশি রাশি ॥ ৪৪ দেখি দেখি করি যত রাখালে প্রত্যেকে। পুনঃ পুনঃ গোপালের হাতখানি দেখে ॥ ৪৬ বন্ধনের দাগ দেখি কেহ বলে উঃ। জ্বালা জুড়াইবে বলি কেহ দেয় ফুঁ ॥ ৪৮ কৃষ্ণের বন্ধন মুক্তি শুনে যেই জনে। ভবের বন্ধন তার নাই কোন দিনে ॥ ৫০ আনন্দে পূর্ণিত হৈল নন্দের ভবন। সুলা বলে কৃষ্ণ-রসে মজে মোর মন ॥ ৫২ শ্রীমতীর কলঙ্ক-ভঞ্জন দিশা—হরি বলরে পামর মন দিন বইয়া যায়। অনন্ত কৃষ্ণের লীলা কেবা জানে সীমা। বেদাঙ্গমে নাহি জানে তাহান মহিমা ॥ ২ একদিন রাধা সহ কৃষ্ণের মিলন। হইল নিকুঞ্জ বনে সহ সখীগণ ॥ ৪ রাধা কহে কৃষ্ণ তুমি জগতের স্বামী। তোমারে ভজনা করি কলঙ্কিনী আমি ॥ ৬ ঘরে পরে কত জ্বালা প্রাণে কত সয়। কৃষ্ণ কলঙ্কিনী বলি সবে মোরে কয় ॥ ৮ শুনিয়া রাধার কথা কৃষ্ণ গুণধাম। কহিলেন প্রিয়া আমি সব বুঝিলাম ॥ ১০ কলঙ্ক-ভঞ্জন তব করিব সকালে। শুনি হরষিত হইলা সখীরা সকলে ॥ ১২ তারপর কতদিন গত হৈয়া যায়। কৃষ্ণ কোলে নন্দরাণী আঙ্গিনা বেড়ায় ॥ ১৪ হেনকালে ব্রজ মাইয়া আইল কতজন। দেখিবরে গোপালের মধুর নাচন ॥ ১৬ রাণী বলে বাছা কৃষ্ণ নাচ দেখি চাই১। নাচন দেখিতে আইল যত ব্রজ মাই ॥ ১৮ যত নাচ তত দিব ক্ষীর ননী ছানা। না নাচিলে ক্ষীর সর কিছুই দিব না ॥ ২০ এত শুনি কৃষ্ণচন্দ্র লাগিলা নাচিতে। করতালি দেয় রাণী আনন্দিত চিতে ॥ ২২ কঙ্কণের কিনি কিনি নূপুর ঝঙ্কার। মিশিয়া হইল ধ্বনি বড় চমৎকার ॥ ২৪ গোপালের পায় বাজে সোণার নূপুর। তিং জিতাং শব্দ করে অতি সুমধুর ॥ ২৬ নাচিছে গোপাল দেখি যত ব্রজমাই। বলে হেন নাচনিয়া সংসারেতে নাই॥ ২৮ হেলিয়া দুলিয়া তবে নাচে পীতবাস। নারীগণে বলে ধন্য সাবাস্ সাবাস্ ॥ ৩০ সবে মিলি করতালি দেয় চারিভিতে। মধ্যে নাচে কালোমাণিক ননীর দলা হাতে ॥ ৩২ নাচিতে নাচিতে পরে হইল স্মরণ। করিবারে রাধিকার কলঙ্ক ভঞ্জন ॥ ৩৪ কপটে মূচ্ছিত হইয়া পড়িল ভূতলে। কি হৈল! কি হৈল! বলি রাণী লৈল কোলে ॥ ৩৬ দেখে কৃষ্ণের শ্বাস বন্ধ কণ্ঠা গত প্রাণ। মুখেতে ঝরিছে ফেণা ঊর্দ্ধে দুই নয়ন ॥ ৩৮ সর্ব্বাঈ তিতিয়া গেল শরীরের ঘামে। লাগিয়া রহিছে হায় দশনে দশনে ॥ ৪০ দেখিয়াত নন্দরাণীর উড়িল পরাণ। কাঁদিতে লাগিল রাণী ভাবি অকল্যাণ ॥ ৪২ ব্রজমাই সবে কান্দে সঙ্গেতে রোহিণী। শিরে করাঘাত করি কান্দে নন্দরাণী ॥ ৪৪ শ্রীকৃষ্ণের মূচ্ছায় সকলের খেদ দিশা—কোথায় যাওরে দুঃখিনীর ধন জননী ছাড়িয়া। বিনা মেঘে বজ্রাঘাত পড়িল যেমন। যশোদার কান্দনে কান্দে গোপগোপীগণ ॥ ২ আছাড় খাইয়া ভূমে পড়ে নন্দ ঘোষ। উপানন্দ১ বলে হায় কপালের দোষ॥ ৪ ব্রজবাসী সবে কান্দে শিরে হানে কর। কানাইরে কানাইরে বলি কান্দে হলধর॥ ৬ শ্রীদাম সুদাম কান্দে ভূমে গড়ি দিয়া। বলে কোথা যাও ওরে ভাইরে কানাইয়া॥ ৮ আমরা মরিব সবে জলে ঝাঁপ দিয়া। নতুবা বিরহে তোর মরিব জ্বলিয়া॥ ১০ বনফল তুলি আর দিব কার মুখে। এ বড় দারুণ দুঃখ রহিলরে বুকে॥ ১২ বনফুল তুলি আর দিব কার গলে। রাজা সাজাইব কারে কদম্বের মূলে॥ ১৪ কার সঙ্গে কানন-মাঝে চরাইব ধেনু। কে আর বাজাবে তোর সুমধুর বেণু॥ ১৬ মনের আনন্দে আর কারে লব কাঁধে। কে আর করিবে রক্ষা পড়িলে বিপদে॥ ১৮ নন্দরাণী বলে বাপ হের দেখ চাহিয়া। শ্রীদাম সুদাম কান্দে তোমার লাগিয়া॥ ২০ হেন মতে কান্দিতেছে ব্রজবাসী জন। কান্দিছে সুবলার প্রাণ, ঝরিছে নয়ন॥ ২২ নন্দালয়ে বৈদ্যের প্রবেশ দিশা—আমার গোপালের প্রাণ দান কর বৈদ্য তুমি। নন্দের ভবন হৈল নিরানন্দময়। কৃষ্ণ-শোকে কান্দে সবে পাগলের প্রায়॥ ২ লীলাময় ভগবান্ কত লীলা জানে। চিনা নাহি দিলে আর কে চিনিবে তানে॥ ৪ মায়া করি ভগবান্ বৈদ্যরূপ ধরি। হেনকালে আইলেন নন্দ ঘোষের বাড়ী॥ ৬ এক মূর্ত্তি মূচ্ছিত হৈয়া রৈলা মায়ের কোলে। আর মূর্ত্তি বৈদ্য হৈয়া আইলা সেকালে॥ ৮ হাতে লাঠি ভাঙ্গা ছাতি ঔষধের পুটলী। আইলেন বৈদ্যবর হরি হরি বলি॥ ১০ বৈদ্যেরে দেখিয়া রাণী করযোড়ে কয়। মোর ভাগ্যে তুমি আসি হইলা উদয়॥ ১২ বাঁচে না গোপাল মোর কি হইল তার। দয়া করি বৈদ্যরাজ দেখ একবার॥ ১৪ তোমার ঔষধে মোর বাঁচুক বাছাটি। তোমারে ধরিয়া দিব নয় লক্ষ গাই॥ ১৬ আর দিব যত মোর অঙ্গের অলঙ্কার। নন্দ উপনন্দ করিবেন পুরস্কার॥ ১৮ কবিরাজের পায় পড়ি বলিছে বলাই। আমি এই শিঙ্গা দিব বাঁচউক কানাই॥ ২০ শ্রীদাম সুদাম বলে কবিরাজ ভাই। আম্যি দিব বনফল যেখানে যা পাই॥ ২২ গাব গোটা বেত গোটা ভাল ভাল ফল। যতনে খাওয়াব ভাই তোমারে সকল॥ ২৪ গোপালেরে ভাল করি ভাল ঔষধ দিয়া। থাকউক তোমার যশ সংসার জুড়িয়া॥ ২৬ এতেক শুনিয়া বৈদ্য ধীরে ধীরে গিয়া। ধরিলা কৃষ্ণের নাড়ী পরীক্ষা লাগিয়া॥ ২৮ নাড়ী ধরি বৈদ্য বলে শুন বলি মাই। হইয়াছে কঠিন রোগ তোমাকে জানাই ॥ ৩০ এই রোগ হৈলে মানুষ বাঁচে না ত প্রায়। বড়ই সঙ্কট রাণী ভাবে বুঝা যায় ॥ ৩২ শুনিয়া বৈদ্যের বাক্য নন্দরাণী মায়। দুই হাতে সাপুটি ধরে সেই বৈদ্যের পায় ॥ ৩৪ বৈদ্য বলে চিন্তা নাই স্থির কর মন। আগে কিছু করগো ঔষধের আয়োজন ॥ ৩৬ বাণী বলে কিবা চাহ বল মোর ঠাঁই। তোমার আশীর্বাদে নন্দর কোন অভাব নাই ॥ ৩৮ বৈদ্য বলে শুন আগে এক নিবেদন। নূতন কলসী এক কর আনয়ন ॥ ৪০ করিব সহস্র ছিদ্র কলসী ভিতরে। এক জন সতী চাই জল আনিবারে ॥ ৪২ ছিদ্র কুম্ভে সতী নারী আনি দিবে জল। সেই জলে ঝাড়া দিলে বাঁচিবে গোপাল ॥ নতুবা এ রোগের আর অন্য ঔষধ নাই। অতএব শীঘ্র একটি সতীনারী চাই ॥ ৪৬ এত শুনি নন্দরাণী কলসী আনিল। কলসী তলাতে ছিদ্র সহস্র করিল ॥ ৪৮ যশোদা কহিল শুন রমণী সকল। তোমরা কেহ আনি দেও ছিদ্র কুম্ভে জল ॥ ৫০ এত শুনি চিন্তাযুক্ত যত নারীগণ। পরস্পর চাওয়া চাওয়ি করিল তখন ॥ ৫২ কিছু কিছু করি নারী সকলি পিছায়। এমন সঙ্কট্যা কামে বল কেবা যায় ॥ ৫৪ দৈবে যদি কলসীর পড়ি যায় জল । লাভ হবে গোকুলেতে কলঙ্ক কেবল ॥ ৫৬ না পারিব আমরা শুন নন্দরানী মাই। সতীর পরীক্ষা দিতে কেন মোরা যাই ॥ ৫৮ এত শুনি নন্দরানী হইলা আকুল। মনে ভাবে সতীশূন্য হইলা গোকুল ॥ ৬০ বৈদ্য বলে একি লজ্জা গোয়ালের কূলে। একটিও নাই সতী এই যে গোকুলে ॥ ৬২ শুনিয়া বৈদ্যের কথা আয়ানের মায়। শক্ত শক্ত দুইটা কথা বৈদ্যেরে শুনায় ॥ ৬৪ কি বলিলা বৈদ্য তুমি বাড়ী কোন্ দেশে। গোকুলেতে সতী নাই বলে কাপুরুষে ॥ ৬৬ অসম্ভব কথা তুমি শুনাইলে বৈদ্য। আছে কি না আছে সতী দেখাইব অন্য ॥ ৬৮ শুনিয়া জটিলা মুখে এতেক বয়ান। যশোদার দেহে যেন আইল পরাণ ॥ ৭০ যশমতী বলে মাও ধরি তব পাও। ছিদ্র কুম্ভে জল আনি কৃষ্ণেরে বাঁচাও ॥ ৭২ বাঁচাব বাঁচাব আমি দিব জল ভরি। আর যেন মোর ঘরে নাহি করে চুরি ॥ ৭৪ আরো কথা আছে কব গোপনে বসিয়া। ঘর ভাঙ্গাইল মোর তোর গোপালিয়া ॥ ৭৬ দিন রাইতে ফিরে কেবল বাজাইয়া বাঁশী। শুনিয়া পাগল হয় বৌ সর্ব্বনাশী ॥ ৭৮ রাণী বলে বাঁশী দিব জলে ভাসাইয়া। কেমনে করিবে চুরি রাখিব বান্ধিয়া ॥ ৮০ এত শুনি ছিদ্র কুম্ভ কাঁখে করি বুড়ী। নড়ী হাতে জল আনিতে যায় ঘুড়ি ঘুড়ি ॥ ৮২ তা দেখিয়া কুটিলায় গর্ব্ব করি যায়। ঝি থাকিতে জল আনিতে যাবে কেন মায় ॥ ৮৪ এই আমি জল আনি থাকহ বসিয়া। এত কহি কলসীটা লইল কাড়িয়া ॥ ৮৬ ছিদ্র কুম্ভে জল আনিতে কুটিলা চলিল। রঙ্গ দেখিবারে লোক সহস্ৰেক গেল ॥ ৮৮ সারি সারি সকলে দাঁড়াইয়া রঙ্গ চায়। দপ করি কুটিলা সে কলসী বুড়ায় ॥ ৯০ কলসী বুড়াইয়া যখন কাঁখে তুল্যা লৈল। ঝর ঝর করি জল সকলি পড়িল ॥ ৯২ চারিদিকে সব লোকে দেয় চিট্কারী। বেশ বেশ ধন্য ধন্য বেশ সতী নারী ॥ ৯৪ হাসি বলে বৈদ্যরাজ এবে গেল জানা। তোমার মনের পাপ তুমি কি জান না ॥ ৯৬ লাজে অপমানে সে কুটিলা মৃত্যুপ্রায়। যশোদা বলিছে হায় কি হবে উপায় ॥ ৯৮ হিয়ে পাইল অপমান দেখিয়া জটিলা। জল আনিতে নড়ী হাতে আপনি উঠিলা ॥ ১০০ ছিদ্র কুম্ভ কাঁখে ক’রে বুড়ী যায় জলে। তামাসা দেখিতে লোক চলে দলে দলে ॥ ১০২ কলসী বুড়াইয়া বুড়ী কাঁকেতে লইল। ঝর ঝর করি জল সকলি পড়িল ॥ ১০৪ হাসিতে লাগিল সবে দিয়া টিট্কারী। অধোমুখ শিরে কর ভূমে বৈল বুড়ী॥ ১০৬ মায়ে ঝিয়ে লজ্জা পাইল যারা ছিল সতী। ভয়ে কেহ নাহি চায় কলসীর প্রতি॥ ১০৮ বৈদ্য বলে যশোদাগো সতী শীঘ্র চাই। বিলম্ব হইলে তবে মরিবে কানাই॥ ১১০ যশোমতী বলে বাপ শুণ কবিরাজ। জল আনিতে জটিলা কুটিলা পাইল লাজ॥ ১১২ এবে আর কেহ না যাইবে জল আনিতে। আমার গোপাল তবে বাঁচিবে কিমতে॥ ১১৪ আমি যাই জল আনিব শুণ বাপ বলি। এত বলি ছিদ্র কুম্ভ কক্ষে লৈল তুলি॥ ১১৬ বৈদ্যরূপী ভগবান্ ভাবিলেন মনে। রাধার কলঙ্কভঞ্জন হইবে কেমনে॥ ১১৮ মায় যদি আনে জল পারিবে আনিতে। মায়েরেরে অসতী আর করিব কিমতে॥ ১২০ এত ভাবি বৈদ্য বলে যশোদার ঠাঁই। শুণগো মা নন্দরাণী তোমাকে জানাই॥ ১২২ মায়ের ঔষধে নাই সন্তানের উপকার। বরঞ্চ বাড়িয়া উঠে রোগের বিকার॥ ১২৪ মায় যদি সন্তানেরে ঔষধ খাওয়ায়। নিজ হাতে বাটিয়া, সন্তান মরি যায়॥ ১২৬ অতএব জল আনিতে তুমি না যাইয়া। ভাল এক সতী শীঘ্র ডাকহ আনিয়া॥ ১২৮ যশোমতী বলে বাপ সবে পাইল ভয়। কে আনিবে জল তবে কি উপায় হয় ॥ ১৩০ বৈদ্য বলে সাক্ষী দেয় আমার অন্তরে। অবশ্যই আছে সতী গোকুল নগরে। ১৩২ ঠিক ধরি দেখিয়াছি কৈতে নাহি বাধা। গোকুলেতে আছে সতী নাম তার রাধা ॥ ১৩৪ তার মত সতী এই ত্রিজগতে নাই। শীঘ্র তানে ডাকি আন নন্দরাণী মাই ॥ ১৩৬ রাঁধারে আনিতে যদি নন্দরাণী যায়। জটিলা কুটিলা উঠে বামুণীর প্রায় ॥ ১৩৮ যাইও না যাইও না রাণী আনিতে বউয়েরে। আমরাই লজ্জা পাইলাম সভার মাঝারে ॥ ১৪০ বাকী আছে বৌ এখন আন্তে যাও তারে। কলঙ্কিনী নাম যার গোকুল নগরে ॥ ১৪২ আমরা পুরাণ সতী জানে ভগবান্। কুচক্রিয়া ১ বৈদ্য বেটা কৈল অপমান ॥ ১৪৪ এখন আছে বৌ বাকা তারে আন্তে কয়। জাত মারা বেটা এই কবিরাজকে কয় ॥ ১৪৬ দিনান্তে দুইদিনে বুঝি নাহি মিলে ভাত। আসিয়াছে মারিবারে গোপ গোষ্ঠীর জাত ॥ ১৪৮ জটিলার পায় ধরি বলে নন্দরাণী। তুমি যদি বল তবে শ্রীরাধারে আনি ॥ ১৫০ বাঁচউক গোপাল আমার সবে দেও বর। বিলম্ব না সহে মাগো শীঘ্র আজ্ঞা কর॥ ১৫২ যশোদার স্তুতিবাক্যে জটিলা পড়িল। হয় নয় ভাল মন্দ কিছু না কহিল ॥ ১৫৪ তবে রাণী শ্রীরাধারে আনিতে চলিলা। সকল বৃত্তান্ত যাই রাধারে কহিলা ॥ ১৫৬ রাধা বলে গোকুলেতে কলঙ্কিনী আমি। আমারে আনিতে জল কেন কহ তুমি ॥ ১৫৮ রাণী বলে সে কথায় নাহি কিছু কাষ। মরিবে গোপাল মোর হইলে বিয়াজ১ ॥ ১৬০ তবে রাণী হাতে ধরি রাধারে লইয়া। ক্ষণকাল মধ্যে তেই আসিলা চলিয়া ॥ ১৬২ আসিয়া বৈদ্যের কাছে নন্দরাণী কয়। এই রাধা সতী দেখ হয় নাকি হয় ॥ ১৬৪ বৈদ্য বলে এই নারী সতী-শিরোমণি। এঁ পারিবে ছিদ্র কুম্ভে ভরিবারে পানি ॥ ১৬৬ ছিদ্র কুম্ভ দেখাইয়া দিল নন্দরাণী। কলসী তুলিয়া লৈল রাধা ঠাকুরাণী ॥ ১৬৮ বৈদ্য বলে যশোদা রে ক্ষণেক দাঁড়াও। আরো কিছু কার্য্য আছে শুন বলি মাও ॥ ১৭০ করিব কেশের সাকু২ যমুনা উপরে। তাহাতে হাঁটিয়া পার যে হইতে পারে ॥ ১৭২ সেই সে ভরিতে পার্ব্বে ছিদ্র কুম্ভে জল। নতুবা হইবে সার কলঙ্ক কেবল ॥ ১৭৪ এত বলি বৈদ্যবর কেশ কিছু লইয়া। বান্ধিল কেশের সাকু কেশে জুড়া দিয়া ॥ ১৭৬_ কেশ-সেতু নির্ম্মাইয়া তবে বৈদ্যবরে। হাটিয়া হইতে পার বলে শ্রীরাধারে ॥ ১৭৮ ধর এই ছিদ্র কুম্ভ কাঁখে করি লও। দেখউক সকল লোকে হাঁটি পার হও ॥ ১৮০ রাধিকা আনিবে জল এ বড় কৌতুক। দেখিতে আসিল কত লক্ষ লক্ষ লোক ॥ ১৮২ নগর ভাঙ্গিয়া আইল তামাসা দেখিতে। কলঙ্কিনী আনিবে জল ছিদ্র কুম্ভেতে ॥ ১৮৪ সুলা বলে সাবধান না ভুলিও তাঁরে। জীবন যৌবন ধন সঁপিয়াছ যাঁরে ॥ ১৮৬ শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শ্রীরাধার স্বগত আত্মনিবেদন দিশ—দাসীর মান রাখহে ভগবান্ লজ্জা দিও না দাসীরে। কলসী লইয়া কাঁখে, কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলি ডাকে মনে মনে জপে কৃষ্ণ নাম। দুইখান হস্ত যুড়ি, ঊর্দ্ধ দিকে দৃষ্টি করি উদ্দেশ্যেতে করিল প্রণাম ॥ ২ বলে প্রভু রক্ষা কর, দাসীর এ বিপদ্ হর মান রাখ দেব দয়াময়। ছিদ্র কুম্ভ কাঁখে করি, বিপদে পড়েছি হরি তব পদে মাগিহে আশ্রয় ॥ ৪ তুমি বিনে কেবা আছে, কব দুঃখ কার কাছে আজি যদি আমি লজ্জা পাই। নামেতে কলঙ্ক হবে, জগতে অখ্যাতি রবে এই ডর মনেতে ডরাই ॥ ৬ কলঙ্কিনী বলি’ মোরে, ঘরে পরে নিন্দা করে আমি কিন্তু নাহি জানি আর। রমণী-জনম পাইয়া, সর্ব্ব ধর্ম্ম তেয়াগিয়া তোমার চরণ কৈলাম সার॥ ৮ বিপদ-সাগরে পড়ি, তোমাকে স্মরণ করি বিপদ-ভঞ্জন দয়াময়। তোমার করুণা হৈলে, পার হব অবহেলে তবে আর আছে কিবা ভয়॥ ১০ একবার নিজ গুণে, কালী হৈলে নিধুবনে এ দাসীরে করিবারে রক্ষা। তুমি যে আমার নাথ, তখনি বুঝেছি তা’ ত পাইয়াছি দয়ার পরীক্ষা॥ ১২ সেই বলে করি বল, আস্তে ছিদ্র কুম্ভে জল নির্ভয়ে চলিয়াছি হরি। এই মোর নিবেদন, রাধিকা-জীবন-ধন এ ঘোর বিপদে যেন তরি॥ ১৪ জগতের পতি হরি, তোমারে ভজনা করি অসতী হইছি লোক মাঝে। যাই না কাহার কাছে, শত্রু আছে পাছে পাছে বদন ঢাকিয়া রাখি লাজে॥ ১৬ ছিদ্র কুম্ভে আস্তে বারি, যদি আমি নাহি পারি উলটিয়া না আসিব ঘরে। ত্যজিব এই ছার প্রাণ, শুন ওহে ভগবান্ ঝাঁপ দিব যমুনার নীরে॥ ১৮ মরিনু মরিনু তাই, ইতে কিছু চিন্তা নাই যাহা থাকে হইবে করমে। এই দুঃখ মনে হয়, কি করিব দয়াময় কলঙ্ক রহিবে কৃষ্ণ নামে॥ ২০ সতী কি অসতী যাহা, তুমিই ত জান তাহা তুমি বিনে আমি নাহি জানি। তোমারে ভজিয়া কালা, মুই অভাগী কুলবালা নাম হইল কৃষ্ণ-কলঙ্কিনী ॥ ২২ কলঙ্ক তার অলঙ্কার, ইহাই ভাবিছি সার স্বামী যার শ্যাম চিন্তামণি। লোক-লাজ ঘৃণা ভয়, ছাড়িয়াছি সমুদয় ভাবি তব চরণ দুইখানি ॥ ২৪ দেখি কেশের সাকুখান, আগেই কাঁপিছে প্রাণ প্রাণনাথ কি উপায় করি। পড়িছি বিপদ ঘোরে, রক্ষা কর এ দাসীরে ভকত-বৎসল বংশীধারী ॥ ২৬ গুরুজনের পায়ে পড়ি, সবারে প্রণাম করি এত বলি চলিলেন রাই। করিলেন আশীর্ব্বাদ, পুরউক মনের সাধ যশোমতী আদি ব্রজরাই ॥ ২৮ সুলা বলে সাবধান, না ভুলিও কৃষ্ণ নাম না করিও অন্তরে বড়াই। ছিদ্র কুম্ভে ভরি জল, দেখাও সতীত্বের বল শত্রুর মুখেতে পড়উক ছাই ॥ ৩০ শ্রীমতীর কেশ-সেতু পার হওন ও ছিদ্রকুম্ভে জল আনয়ন দিশা—তোরা দেখরে নাগরিয়া লোক জল ভরে রাধা কলঙ্কিনী। সাকুতে তুলিতে পাও, কাঁপিল রাধার গাও কৃষ্ণ রূপ ভাবিয়া অন্তরে। শ্রীহরি স্মরণ করি, বৃষভানু কুমারী উঠিলেন সাকুর উপরে॥ ২ চারি দিকে জয় জয়, হরি হরি সবে কয় নারীগণে দেয় উলুধ্বনি। জয় রাধা রাধা বলি, কেহ দেয় করতালি আনন্দে বিভোর নন্দরানী॥ ৪ সবে বসি রঙ্গ চায়, লীলায় হাঁটিয়া যায় অবহেলে হইলেন পার। কেহ কেহ ডাকি কয়, দেখি দেখি কিবা হয় সাকু পার হও পুনর্বার॥ ৬ বৈদ্য বলে হয় হয়, তবে সে হইবে প্রত্যয় ক্রমে পার হও সাতবার। তবে বৃষভানু সুতা, শুনিয়া বৈদ্যের কথা সাতবার হইলেন পার॥ ৮ ছিদ্র কুম্ভ কাঁখে লইয়া, সাতবার পার হৈয়া কলসীতে ভরিলেন জল। এক বিন্দু না পড়িল, দেখিয়া অবাক্ হৈল গোকুলের গোপিনী সকল॥ ১০ সবে বলে ধন্য ধন্য, বৃষভানু রাজা ধন্য কন্যা যার সতী-শিরোমণি। রাধিকারে সঙ্গে কইরে, বৈদ্যসহ নিজ ঘরে আনন্দে চলিলা নন্দরানী॥ ১২ গোকুলে হইল খ্যাতি রাধা সম নাহি সতী কলঙ্কিনী নাম হইল দূর। কৃষ্ণনাম যাঁর অন্তরে লোকে কি করিতে পারে যার পক্ষে শ্রীকৃষ্ণ ঠাকুর ॥ ১৪ কলঙ্কভঞ্জন হায় যেবা শুনে যেবা গায় রাধাকৃষ্ণ-পদে রাখে মন। সুলা বলে শত বার কলঙ্ক নাহিক তার অন্তে পায় নিত্য বৃন্দাবন ॥ ১৬ কলঙ্ক-ভঞ্জন হৈল সবে হরি হরি বল হরিনাম শেষের সম্বল। শ্রীকৃষ্ণ স্মরণ করি বৃষভানু-কুমারী ছিদ্র কুম্ভে ভরিলেন জল ॥ ১৮ শ্রীকৃষ্ণকে ঔষধপ্রয়োগ এবং বৈদ্যবিদায় দিশা—উঠ হরি নন্দের কুমার। তবে কৃষ্ণ ছিদ্র কুম্ভের জল কিছু লৈয়া। মন্ত্র পড়ি কৃষ্ণের গায় দিল ছিটাইয়া। ২ জল-ছিটা পাইয়া কৃষ্ণ মেলিলা নয়ন। নন্দরাণীর দেহে তবে আইল পরাণ ॥ ৪ আনন্দে শ্রীনন্দ বলে উঠ বাপধন। উঠিয়া বসিলা কৃষ্ণ শ্রীনন্দনন্দন ॥ ৬ আনন্দিত হৈল যত গোপগোপীগণ। জটিলা কুটিলা মাত্র বাকী দুইজন। ৮ চৈতা্য হইল যদি চেতনার সার। বৈদ্য বলে নন্দরাণী বিদায় আমার ॥ ১০ কিবা দ্রব্য দিবা মোরে আন দেখি চাই। বৰ্ত্তিল ১ তোমার কৃষ্ণ আমি ঘরে যাই ॥ ১২ রাণী বলে কি বিদায় দিব বাপু আর। আমার যতেক ধন সকলি তোমার ॥ ১৪ যাহা চাহ তুমি বাপু তাহা দিব আমি। আমার গোপাল ধন বর্ত্তাইলা তুমি ॥ ১৬ বৈদ্য বলে ধনে মোর নাহি প্রয়োজন। বিদায়ের কালে করি এক নিবেদন ॥ ১৮ গোপালের মত তুমি আমারে দেখিও। জন্মে জন্মে তুমি মোর জননী হইও ॥ ২০ কোলে করি যত্নে মোরে পিয়াইও স্তন। অপরাধ পাইলে কৈর স্নেহেতে বন্ধন ॥ ২২ অভেদ ভাবিও গোপালের সঙ্গে মোরে। আমার বাসনা সদা থাকি গোপ-ঘরে ॥ ২৪ এত বলি বৈদ্যবর হইল বিদায়। সম্ভ্রমে প্রণাম করি নন্দরাণী-পায়॥ ২৬ কে বুঝে কৃষ্ণের খেলা কিবা লীলা তান। দেখিতে দেখিতে বৈদ্য হৈল অন্তৰ্দ্ধান ॥ ২৮ করযোড়ে সুলা বলে কর্ম্মকর্ত্তার পায়। বৈদ্যের বিদায় কালে গাইনে কলসী পায় ॥ ৩০ শ্রীরাধার কলঙ্কভঞ্জন হইল এতক্ষণে। আনন্দেতে হরি হরি বল সর্ব্বজনে॥ ৩২ কৰ্ম্মকাৰ্ত্তাকে জয়দান দিশা—হরি জয় হরি জয় মঙ্গল রে। তানে দেও দয়াল হরি ধনপুত্রের বর। চিরকাল লক্ষ্মী বান্ধা থাকউক তান ১ ঘর ॥ ২ আপদ বালাই তান সব যাউক দূরে। সকল কল্যাণ হউক শিবদুর্গার বরে ॥ ৪ দিনে দিনে বৃদ্ধি হউক ভাঙারের ধন। দিনে রাইতে সেবা হউক লক্ষ্মীনারায়ণ ॥ ৬ গোয়াইল ভরিয়া থাউক গাভী দুগ্ধবতী। এই ঘরে থাকে যেন লক্ষ্মীর বসতি ॥ ৮ অন্তকালে স্বর্গপুরে হউক তান স্থান। তেত্রিশ কোটি দেবগণে করাইল কল্যাণ ॥ ১০ যক্ষ-দানব ভূত-প্রেতের ভয় যাউক দূরে। নরসিংহ রক্ষা করইন ২ তাহান ৩ কুমারে ॥ ১২ সাপে বাঘের ভয় যেন কিছু নাহি হয়। শ্রীহরি নামেতে সব রিষ্টি হউক ক্ষয় ॥ ১৪ সুলা বলে হরি হরি বল সর্ব্বজন। সমাপন হৈল এই গোপিনী-কীৰ্ত্তন ॥ ১৬ সেখানে কেবলই তপোবন, ঝর্ণা, হরিণ শিশু আর কুটিরের দৃশ্য। সেখানে বীরভোগ্যা বসুন্ধরার রুদ্র রূপ ফুটিয়ে তোলবার বা অবসর বিনোদন করবার মত কোনো অবসরই ছিল না। কাজেই ছবিগুলি দেখে যেমন আনন্দ পাওয়া গেল, তেমনই আবার বিস্মিতও হতে হল। এর কারণ এই যে, মহাকবি কালিদাসের কাব্যে বীর-রস, আদিরস ইত্যাদি সব রকম রসেরই ত সমাবেশ রয়েছে, অথচ শুধু শান্ত রসের দিকেই শিল্পীর দৃষ্টি এতখানি আকৃষ্ট হল কেন, তা ভেবে স্থির করা কঠিন। এর একমাত্র উত্তর এই দেওয়া যেতে পারে যে, শিল্পী কালিদাসের রস সৃষ্টি অপেক্ষা কালিদাসের বর্ণিত প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর দিকেই বেশি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। প্রকৃতির শান্ত সমাহিত রূপটি শিল্পীর মনে বেশি রেখাপাত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘চিত্রাঙ্গদা’য় বলেছেন - “আমি চিত্রাঙ্গদা, আমি দেবী নহি, নহি সাধারণী নারী। পূজা করি মোরে রাখিবে উর্ধ্বে সে নহি নহি, হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে সে নহি নহি। যদি পার্শ্বে রাখ মোরে সংকটের পথে, দুরূহ চিন্তার যদি অংশ দাও, যদি অনুমতি কর কঠিন ব্রতের তব সহায় হইতে, যদি সুখে দুঃখে মোরে কর সহচরী, তবে পাইবে আমার পরিচয়।” রবীন্দ্রনাথের এই উক্তিতেই নারীজাতির প্রকৃত বাণী প্রতিধ্বনিত হয়েছে। যুগে যুগে নারীজাতি পুরুষের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রেরণা জুগিয়েছে, পুরুষের জীবনের সাথে আপনার জীবনকে মিলিয়ে ধন্য হয়েছে। যুগ যুগান্তরের সাধনার ফলেই নারী আজ এই স্থান অধিকার করতে পেরেছে। সুদূর অতীতকাল হতেই ভারতীয় নারী সমাজে আদরণীয়া ও পূজনীয়া হয়ে রয়েছে। রামায়ণী সভ্যতায় আমরা সীতাদেবীর পুণ্যময় চরিত্র দেখতে পাই। সীতা দেবী কেবল রাজ-অন্তঃপুরের রূপসী রানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন রামচন্দ্রের জীবনসঙ্গিনী - সহধর্মিণী - সহমর্মিণী। তাই রামচন্দ্রের বনবাসকালে তিনি রাজপ্রাসাদের সমস্ত সুখ-ঐশ্বর্য পায়ে ঠেলে অবলীলাক্রমে স্বামীর অনুগামিনী হয়েছিলেন। সেখানে বনের দুঃখ কষ্টকে দুঃখ কষ্ট বলে জ্ঞান করেন নি, বরং স্বামীর পার্শ্বে থেকে তাঁর সেবায় আত্মনিয়োগ করে ধন্যা হয়েছিলেন। স্বামীর দুঃখকে নিজের দুঃখ বলে মনে করেছিলেন। স্বামীর সুখে সুখী এবং দুঃখেই দুঃখী হওয়া নারীধর্মের শ্রেষ্ঠ লক্ষণ। সীতা দেবীর চরিত্রে এই শ্রেষ্ঠ লক্ষণেরই সমাবেশ হয়েছিল। তাই সীতা চরিত্র ভারতীয় আদর্শে সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করেছে এবং জগতের ইতিহাসে এ চরিত্র অনন্যসাধারণ ও তুলনাহীন।
-
-