হাতী-খেদা

পূর্ববঙ্গ গীতিকা - তৃতীয় খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন

হাতী-খেদার গান পরথমে আল্লার নাম করিয়া স্মরণ। দরুদ ১ চালাম ভেঙ্গি ২ নবীর চরণ ॥ আছমানেতে চান সুরুজ রইয়ে কত দূরে। লাখে লাখে তারা আরো চাকর ৩ মতন ঘুরে ॥ কনে ৪ যে কাডিল ৫ এই বেমান ৬ সাইগর ৭। কেমনে হইল নন্দী ৮ আরো বালুর চর ॥ কনে বানাইল ৯ মুড়া ১০ কতুন ১১ মাডি ১২ আনি। দেবার ডাকে ১৩ কনে পেলায় ১৪ আছমানর খুন্‌ ১৫ পানি ॥ কনে দিল হস্তপদ কনে দিল মাথা। বিচির ১৬ ভিতর গাছ আর গাছর ভিতর পাতা ॥ পরভুর অসাধ্য কর্ম্ম নাইরে দুনিয়াইত ১৭। দিনরে করিতে পারন ১৮ আঁধারিয়া রাইত ॥ তান ১৯ ইসারায় বাদ্‌সা হয় যে ফকির। সতান ২০ কখনো হয় সরিয়তের পীর ॥ ঘর বাড়ী টাকা পৈসা ১ মিছা জিন্দীগানি ২। টলমল করে যেমন কচু পাতার পানি॥ ওরে সিনা ৩ ফাড়ি ৪ একদিন বাহির হৈব দম ৫। পরনা ৬ লইয়া হাতে হাজির আছে যম॥ হয়াত ৭ ফুরাইয়া গেলে চলি যাইমুগই ৮। অকাঁদনা কাঁদির কেন ছাড়া ভিডাঁ ৯ লই॥ মওতের ১০ পরে হবে আখেরের ইন্সাফ ১১। জন্মাবধির গুনা ১২ আল্লা তুমি কর মাপ॥ (১-২২) ( ২ ) শুন শুন সভ্যজন শুন সমাচার। হাতী খেদার কিস্তা ১৩ কহি অতি চমৎকার॥ ২ শুন আচানক কাণ্ড হাতীর চরিত। এত বড় জানোয়ার নাই পৃখিস্থিত ১৪ ॥ ৪ এগার বচ্ছর হাতীর বাচ্চা পেটে থাকে। বাঘ ভাল্লুক পোলায় ১৫ ডরে গুণ্ডা হাতীর ডাকে॥ ৬ প্রসবের ১৬ কালে হায়রে কি বলিব আর। গুজরি গুজরি ১৭ কুন্কী ১৮ ভাঙে যে পাহাড়॥ ৮ হাতীর ঠ্যাং দেখিতে যেমন গুদামের ’ থম ২। মুড়ার পন্থত ৩ লাগত পাইলে হাতী মাইনসর যম ॥ ১০ ডাঁহর ডাঁহর ৪ কাণ যেমন দুইয়ান কুলা। দাঁতাল হাতার দাঁত দুইটা মাঘ মাস্থা মুলা ॥ ১২ টেঁকির সমান ছোড়তা তার মাথা সদাই হেট। ছোড় ছোড় ৬ চোগ হাতীর ডলর ৭ মতন পেট ॥ ১৪ কে বুঝিতে পারে ভাইরে আল্লার কেরামত। হাতার গা দেখিলে হাতীর ঘটিত বিপদ্ ॥ ১৬ ( ৩ ) ঝাঁকে ঝাঁকে চলে হাতী অঘোর জঙ্গলে। খেদা বানাই ধরে মাইন্সে হেকমূতেরি কলে ॥ ২ আগা পিছা হাতীর খোঁচ ৮ একই বরাবর। খোঁচ ধরি পাঞ্জালী ১ লয়রে হাতীর খবর ॥ ৪ কোথায় থাকে এত হাতা আসে কোথা হৈতে। শুনিয়াছি থোরা ১০ কথা বুড়াবুড়ী কৈতে ১১ ॥ ৬ ওরে আচমানলাগা ১২ মুড়া আছে চাঁডীয়ার ১৩ পূগে ১৪। কুকী মুরুং পাহাড়ীর দিন কাটায় ১৫ সুগে ১৬॥ ৮ কুকীর মুল্লুক ছাড়ি গেলে আছে গহিন বন। মস্ত মস্ত গাছ সেথায় বাঁশ বেত ছন॥ ১০ অঘোর জঙ্গল সেই ওর নাহি তার। দিনে রাইতে একই মত গুটগুট্যা আঁধার॥ ১২ একছড়ি হাঁডি গেলে ছমাসের পথ। লাখে লাখে হাতী থাকে সেই জঙ্গলত॥ ১৪ একান্তরে থাকে হাতী একই ছুল্লুক। সে গহিন বনে নাইরে বাঘ আর ভাল্লুক॥ ১৬ আচমানে উড়ে না পক্ষী জলে নাইরে মাছ। উপাড়িয়া ফেলে হাতী মস্ত মস্ত গাছ॥ ১৮ সেই জঙ্গলের কথা কি বলিব আর। হাজার হাজার মাইল নাইরে শুমার॥ ২০ দক্ষিণেতে আছে জাগা “থুম্বু-ফালুম” নাম। সেই জাগাতে বর্ম্মার মাইনসে করে খেদার কাম॥ ২২ পোহনাপরীর মুল্লুক উত্তরেতে জানি। সাদা হাতী খায়রে পূগে ঐরাবতীর পানি॥ ২৪ আহন ১ মাসে খোয়া ঝরের ধানে হৈল পাক। করলডেঁয়ার ২ মুড়ার মাঝে শুইন্‌লুম হাতীর ডাক॥ ২ পাহাড়ীর মুখ শুকাইল—ওরে মুখ শুকাইল খেতি গেল, ভাবনা বিস্তর। জুম্মা ৩ উডিল ৪ মোচার উয়র ৫ বাঙ্গাল হৈল ঘর॥ ৪ ( হৈল ভাবনা বিস্তর ) মুড়ার গুড়িত ৬ বাড়ী যারার—ওরে বাড়ী যারার হৈল তারার, নোগর ৭ গোড়াত জান। বনর হাতী খাইলো হায়রে পূগর ৮ বিলর ধান॥ ৬ ( ওরে পূগর বিলর ধান ) হাইল্যা ৯ চাষার কুশ্যাল ১০ ক্ষেতি—ওরে কুশ্যাল ক্ষেতি খাইল হাতী, খোদায় দিল দাগা। পৈমাল ১১ করিয়া গেল দোনাদোনি ১২ জাগা॥ ৮ ( হায়রে দোনাদোনি জাগা ) কারো খাইল বাইয়ন ১ মুলা—ওরে বাইয়ন মুলা মৈক্যাগুলা, ২ ডলি ৩ গেল ভূঁই ৪। কাইছনীর মা বুড়ী বলে ‘চৈঁয়র ডুয়া ৫ কই’॥ ১০ ( হায়রে ডলি গেল ভূঁই ) কেহ কাঁদে মাথাত হাত দি—ওরে মাথাত হাত দি নিরবধি, চৈক্ষের ৬ জল ঝরে। বৌ-পোয়া যে মারা যাইব আইয়ের ৭ যে বছরে! ১২ ( হায়রে চৈক্ষের জল ঝরে ) ধূয়া … নছিব হায়রে হায়— ঝরে ভিঞ্জি রৈদে পুড়ি করিলুমরে চাষ। বনলা ৮ হাতা যে এইবার কৈল সর্বনাশ॥ ১৪ ধন নাই দৌলত নাই গায়ে ছিড়া তেনা ৯। বৌয়ের জেয়র ১০ বাঁধা দিয়া করিলুমরে দেনা॥ ১৬ কেমনে হুজিব ১১ দেন ১২ থাল্যা ১৩ রৈল গোলা। কি খাইব সোণার মাণিক এক বছরগ্যা ১৪ পোলা॥ ১৮ নছিবের দোষে এইবার ভাসি গেল সব। বনলা হাতী যে হৈল খোদার গজব॥ ২০ এইরূপে কান্দে চাষা হাতীর পৈমালে। পাহাড়িয়া জুম্মা চাউ-স্মা পড়িল বেনালে॥ ২২ বাঁশ কাডৈয়া ছন কাডৈয়ার হইল দুর্গতি। চালার মুয়ত বন হৈলরে মাইনূসর গতাগতি॥ ২৪ বাঘ ভাল্লুক পোলায় ডরে পক্ষী গেল উড়ি। দহিন মিক্যা আইলো হাতী মুড়ার পন্থ ধরি॥ ২৬ ডুলাহাজারায আইলো চুনতির পাহাড়ে। চেরি পিডি দিল মাইনসে হাডে আর বাজারে॥ ২৮ “জুম্মার জোম হৈলরে নাশ বাঙ্গাল্যার খেতি। পূগের পাহাড়ে আইলো ঝাঁকে ঝাঁকে হাতী॥” ৩০ দেশ বিদেশে খবর হৈল জানিল সবাই। অনেক জনে ভাবে মনে খেদা দিবার লাই॥ ৩২ নলুয়া ছড়ার পারে আছে নুনা মাডি। খেদা বানায় কোন জনে গাছ গাছড়া কাড়ি॥ ৩৪ কেহ হাতীর কিল্লা মারে ডুলাহাজারায়। আর কেহ বানায় খেদা চুনতির ডালায়॥ ৩৬of কাচালং ১ ও শুভলং ২ আর মাইয়নীর ৩ উজানে। বৈদেশী পাঞ্জালী ৪ আসি হাতী ধরি আনে ॥ ৩৬ ( ৫ ) কাগবাজারের ৫ বহুত পূগে ৬ বাঘখালীর ৭ আগাত ৮। অঘোর জঙ্গল আছে সেইত জাগাত ॥ ২ এমন গর্জ্জন গাছ চুঁ ইয়াছে আচ্মান। তার বের ৯ ঘুরিতে মাইন্সের লাগে এক মাধান ১০ ॥ ৪ জায়ৈল গাম্ভারী আর গল্লাক বেতর বন। সেই জাগার খেদার কিছু কহি বিবরণ ॥ ৬ নুনাছড়া আছে এক নুনা ১১ পানি। পৌষ মাসে হাতী আসে সেই খালের উজানি ॥ ৮ আর এক খাল আছে মিডাছরা নাম। ডাবর মতন মিষ্টি পানি নামর মতন কাম ॥ ১০ ইহার দক্ষিণে আছে রোসাঙ্গার ১২ দেশ। ভিনছায় ১৩ লাগত পাইলে ছুরি মারি শেষ ॥ ১২ মঘে আর বাঘে জাইন্যূ একই বরাবর। বেঁকাছুরি হাতত নৈলে তারারে বড় ভর॥ ১৪ সেই গর্জ্জন্যার মুড়ায় আইলো হাতীর ঝাঁক। পোলাই গেলগৈ হরিণ গ্যাল টেইক্যা পোড়া বাঘ॥ ১৬ অঝাগর হাপ কত আছিল মুড়ায় মুড়ায়। শোয়াসে শোয়াসে হাপুর তুয়ান যেন ধায়॥ ১৮ শোয়াসে পরাণ লয়রে এমনি বিশাল তেজ। এক মুড়ায় মাথা হাপর আর এক মুড়ায় লেজ॥ ২০ বনের পশু গিলি গিলি খায়রে অজাগর। এন্নিকালে পাইলরে সে হাতীর খবর॥ ২২ গাছের খোঁধাত লুকাইলরে আছিল যত হাপ। বনের হিয়াল গাতত দল্লি রৈলরে চুপচাপ॥ ২৪ মাঘ মাসে খেদার কার্য্য করে জমাদার। জঙ্গলেতে হাতী ধরা আচানক কারবার॥ ২৬ বহুদিন গতরে হৈল খবর শুনরে। চাটগাঁইয়া কালা আইলো গর্জ্জন্যার পাহাড়ে॥ ২৮ চাড়ীগাঁখুন’ আইলো তারা খেদা দিবার মন। জমাদার আইলো সঙ্গে নাম “গোলবদন”॥ ৩০ ওরে গোলবদন জমাদার মস্ত পলোয়ান। সঙ্কলর’ ছরদার মিঞা আকল৩ ভালা তান॥ ৩২ বহুত খেদায় হাতী ধরি জোড়াইলা নাম। বনের বাঘ ভাল্লুক তানে৪ কল্পিত ছালাম॥ ৩৪ আগে পিছে চলে মিঞার পান শ জনা কুলি। কেহ লৈয়ে ছেল৫ বল্লম আর কেহ লৈয়ে গুলি॥ ৩৬ সঙ্গেতে চ্যৈকাল৬ চলে অতি হুসিয়ার। কুড়াল খন্দা লৈল আর যত হাতিয়ার’॥ ৩৮ শতে শতে লৈল তারা দড়ি আর কাছি। ভালা ভালা আলাত৮ লৈল মোটা মোটা বাছি॥ ৪০ চাউল লৈল মরিচ লৈল আরো লৈল তেল। গর্জ্জন্যার ঢালায়৯ তারা হাতী ধৈস্ত১০ গেল॥ ৪২ ( ৬ ) হায়রে মাঘের শীতে-ওরে মাঘের শীতে গা কাঁপিতে লাইগ্ল থর থর। চুপ্পে চুপ্পে পার হয় তারা টিলা আর টঙ্কর ১১ ॥ ২ ( ওরে টিলা আর টঙ্কর ) পার হৈল নন্দী১ নালা—ওরে নন্দী নালা কত ঢালা,২ পার হৈয়া যায়। ছড়ার কুলত গাছর তলে ভাত রাঁধিয়া খায়॥ ৪ ( ওরে ভাত রাঁধিয়া খায় ) কেহর হৈয়ে গা-অত ৩ বেথা—ওরে গা-অত বেথা রজাই ৪ কেথা ৫, শীতর সম্বল নাই। কেহর পেড় ৬ ফুলি উঠে নুনা ৭ ইলিশ খাই॥ ৬ ( ওরে নুনা ইলিশ খাই ) কেহ করে আনছান ৮—ওরে আনছান দিলুম জান, কৈল্লাম এবার কি। ঘরর কথা ভাবের কেহ বোচ্কা হিতান দি ৯॥ ৮ ( ওরে বোচ্কা হিতান দি ) ওরে নিজের কবর কাডি ১০ মুই—হায়রে কাডি মুই পৈলাম শুই, কৈল্লাম কেরেস্কাল। কনে ১১ চাইব আমারি সে দুধেরি ছাবাল ১২॥ ১০ ( ওরে দুধেরি ছাবাল ) কনে দিব ভাত পানি—হায়রে ভাত পানি ঘরর ছানি, দিব কনে আর। খেদার লালছে ১৩ পড়ি হৈলামরে ছারখার॥ ১২ ( ওরে হৈলামরে ছারখার ) দেশে ছিলাম বড় সুগে — ওরে বড় সুগে দিলুম বুগে, নিজের হাতে ছেল। গাছত কাট্ল দেখিয়ಾರೆ ওডত দিলুম তেল॥ ১৪ ( ওরে ওডত দিলুম তেল ) চাউ-ষ্মার কুল গেরাম সেই যে দেখিতে সোন্দর। তার মাঝে আছে যত জুম্মা চাউ-ষ্মার ঘর॥ ২ পাহাড়িয়া মহরে তারা শুন কহি যাই। বেপর্দা মাইয়া মাইন্সর লাজ সরম নাই॥ ৪ পরনে এক পেঁচর থামি আড়াই হাতর মাপ। ন মানে যে ভাই বেরাদর ন মানে মা বাপ॥ ৬ বুগর উয়র ধইয়া বেড়ায় মাথ। রাইখ্যে খোলা। বেপর্দা জুম্মা চাউ-ষ্মার যত মাইয়া পোলা॥ ৮ মা বাপরে পুছ ১ না কৈরে নিজে খসম ২ লয়। মাইয়া লোকে পুরুষরে ন করে ডর্ ভয় ॥ ১০ মংলা নামে রোয়াজা ৩ এক চাউ-স্মার কুলত ঘর। এরুঈ ডাকে চিনে মাইনসে মস্ত তোয়াঙ্গর ৪ ॥ ১২ ঘরে আছে গরু মৈষ আর বাইরে জোমর ক্ষেত। বছর বছর হাজার টাকার বেচে গল্লাক বেত ॥ ১৪ আশী বছর উমর ৫ বুড়ার মাড়ীর দাঁত নাই। ছেইচ্যা ৬ পান খায়রে তবু মাট্যাই মাট্যাই ৭ ॥ ১৬ ঝুরি ঝুরি পড়ে বুড়ার বয়স হৈয়ে ভারি। গোলবদন আইলো সেই মংলা মষ্যার বাড়ী ॥ ১৮ মংলা বলে—“শুন তোমরা আমি বলি সার। কোথায় থাকে বনর হাতী জানি সবিস্তার ॥ ২০ মুড়ার মুড়ার মাঝে ঘুরি অবিরত। ভালামতে চিনি আমি জঙ্গলের পথ ॥ ২২ লোক লস্কর লৈয়া তুমি থাক আমার বাড়ী। গোলার ধানর ভাত খাইবা খেতর তরকারী ॥ ২৪ ঘরে আছে খামা খামা ৮ পানি ছাড়া দই। খাইয়া দাইয়া দেশে যাইবা হাতী ধরি লই ॥” ২৬ মংলা মষ্যার কথা শুনি খুসী হৈল মন। তার বাড়ীতে ডেরা ৯ পাতির্ মিঞা গোলবদন ॥ ২৮ মধ্যারে লইয়া তারা ঘুরে বনে বনে। কোথায় পাব হাতীর দেখা ভাবে মনে মনে ॥ ৩০ দিন যায় রাইত যায় ন পায় খবর। গোলবদনর মনর মাঝে হৈলরে বড় ডর ॥ ৩২ “বাড়ী ছাড়ি আইলুমরে মুই কত দূরের দেশ। গুনায়ারী পৈলে এইবার এক্কিবারে শেষ ॥ ৩৪ মাহাজনে বাড়ী ভিঁডা বেচি নিব মোর। টাকা দিতে ন পারিলে দেশে হৈয়ম চোর ॥” ৩৬ এইরূপে ভাবে তেনি গাছতলাতে শুইয়া। এম্মিকালে আইলো একজন জঙ্গলের গুঞিয়া ॥ ৩৮ গুঞিয়া বলে—“শুন ওরে জমাদার ভাই। বহুত হাতী শেষান করের ছামনের ঢেবাত আ-ই ॥” এই কথা শুনিয়ারে মিঞা গোলবদন। রোয়াজারে সঙ্গে লৈয়া চলিল তখন ॥ ৪২ ধীরে ধীরে যায়রে তারা চরণ না চলে। গা-অরে লুকাইয়া রাখে গাছের আঁড়ালে ॥ ৪৪ তারা আসি দেইখ্‌ল হাতী ঢেবার পানি খায়। গোলবদন ভাবে মনে কেম্মে ধরন যায় ॥ ৪৬ ভাবিয়া চিন্তিয়া তখন মন কৈল স্থির। দলর যত মাইনসর কাছে হইল হাজির ॥ ৪৮ পানছল্লা ১ করিয়া তারা কি কাম করিল। ইটগড়ের ২ পাহাড়ৈ যাইয়া দাখিল হইল ॥ ৫০ পরে গেল পূগদিকে ৩ ছড়ার উজানে। বড় বড় হাতীর খাঁচ ৪ দেখিল সেখানে ॥ ৫২ বড় বড় হাতীর খাঁচ রইয়ে তাজা তাজা ৫। “এই পন্থে হাতী চলে” বলিল রোয়াজা ॥ ৫৪ “এইখানে ধরিব হাতী ডেকাইয়া ৬ আনি।” শুনিয়্যারে গোলবদনর বুগত ৭ আইলো পানি ॥ ৫৬ কুলী আইলো চৈক্কাল ৮ আইলো আইলোরে সিকদার ৯। জমাদারে হুকুম কৈল “এখন হাতীর কিল্লা মার ॥” ৫৮ কোনা কুন্যা দুই মুড়া পূগ ১০ পছিন্মে ১১ খাড়া। দক্ষিণেতে থলি ১২ জাগা উত্তরেতে ছড়া ॥ ৬০ একহোতি ১৩ ছড়ার মাঝে থোরা থোরা ১৪ পানি। থলি জাগা হবে রে ভাই দশ কি বার কাণী ১৫ ॥ ৬২ ছড়ার কুলত কলাবন ঝাড় জঙ্গলে ঘেরা। এই পন্থে আছে জাইন্যু বন্যা হাতীর ডেরা ॥ ৬৪ তারপরে কি হইল কহিয়া জানাই। কুলীগণে গাছ আনিল জঙ্গলেতে যাই ॥ ৬৬ খলি জাগার চতুরপার্শে কাইটো উইয়া গড়। বাহির কুলে খাম্বা গাইল্ল এক এক হাত অন্তর ॥ ৬৮ বড় বড় খাম্বা সে যে দুই তিন হাতের বের। দড় করি গাড়িয়ারে কৈল খেদার ঘের ॥ ৭০ তারপরে পত্তি খাম্বায় মোটা কাছি দিয়া। বড় বড় গাছ বাঁধিল করি পাতারিয়া ॥ ৭২ বাহির কুলে খাম্বার পিছে লাগাইল ঠেক্। গোলবদন কহে—“একবার ঠেলামারি দেখ্ ॥ ৭৪ খেদার কাম জানিওরে পোলার খেলা নয়। এমন করি ঠেক্ লাগাইবা (যেন) হাতীর ঠেলা সয় ॥” ৭৬ উত্তর দক্ষিণে খেদার কৈলরে দুয়ার। তার পরেতে কিনা কাম করে জমাদার ॥ ৭৮ উপরেতে কল্পিকল ঘিলা দড়ি দিয়া। আশ্চর্য্য হেকমতে ঝাপ রাইথ্যে টাঙ্গাইয়া ॥ ৮০ ঝাপ টাঙ্গাইয়া রাখিল্ একশত হাত উপর। দোন দুয়ার কৈল তারা একই বরাবর ॥ ৮২ কনমিক্যাতুন আইবো হাতী নাইরে তারার জানা। খারা কি মানুষে পায় হাতীর ঠিকানা ॥ ৮৪ জমাদার বলে “তোমরা ন করিও দের। চুপে চুপে যাইয়া এখন দাওরে পাতা বের ॥ ৮৬ উত্তর মিক্যা যাইবা কজন গজালিয়া ছাড়ি। খানিক পুগে লাগত পাইবা খুঁডাখালীর ফারি ॥ ৮৮ দহিন মিক্যা যাইবা কজন ডেবার পারত। ভালা করি তোয়াই চাইবা ঘুরিয়া ঝারত ॥ ৯০ পুগে আছে খামাংমুড়া যাওরে বেশী লোক। সেমিক্যা পোলাইতে হাতীর বড় বেশী ঝোঁক ॥ ৯২ বেশী দূরে যাইবা তোমরা করি সাবধান। পূগ-পাহাড় ছুঁইলে হাতীর ন পাইবা সন্ধান ॥” ৯৪ শীত কাইল্যা বেল চল্তি মুকা দেখতে দেখতে যায়। আঁধার ঘনাইয়া আইলো গর্জন্যার মুড়ায় ॥ ২ তাল্লাসীরা ১ চলে বনে গাছের ফাকে ফাকে। কন ২ রকম ঝক ৩ পাইলেরে লুকাই লুকাই থাকে ॥ ৪ অঘোর জঙ্গলে তারা তোয়াইছে ৪ হাতী। জাইল্যা যেমন জাক ৫ ঘোলায় থানেতে জাল পাতি ॥ ৬ খেদার পার্শে মুড়ার উন্নয় ৬ আছে চৌকিদার। কেহ গাছে বাসা বান্ধি নিরপি চাহার ॥ ৮ যারা গিয়াছিল পূগে ৭ খামাংএর মুড়ায়। ওরা বাঁশর ৮ বনত তারা হাতীর আবাজ ৯ পায় ॥ ১০ আবাজ পাইয়া তারা কি কাম করিল। আরো দুই মাইল পূগে যাইয়া উপনত হৈল ॥ ১২ ওরে কোমরেতে দা—তারার মুখে নাইরে রা। মাঘ মাইস্যা দারুণ শীতে বেশোধ ১০ হাত আর পা ॥ ১৪ শীতের দিনে গাছের পাতা পড়িয়াছে ঝরি। আগুন লাগাইয়া তারা দিল তড়াতড়ি ॥ ১৬ ওরে কোমরেতে দা—তারার মুখে নাইরে রা। ধুনি ১১ জ্বালি সকলেতে চেগি ১২ লৈল গা ॥ ১৮ একেত আঁধারী রাইত উতরালি ১ বায়। আগুন ধরাইয়া দিল মুড়ায় মুড়ায় ॥ ২০ মাঝে মাঝে বাইরগ্যা দুয়াত ২ বড় বড় বাঁশ। ধুমাই ধুমাই জ্বলে—ফুড়ের খ্যাঁস খ্যাঁস ॥ ২২ আবাজ ৩ শুনিয়া হাতীর মনে হৈল ডর। থোরা পূগে ৪ আসি মাইনসর পাইলারে লড় চড় ॥ ২৪ জলি উঠে ৫ মুড়ায় আগুন ছুঁইয়াছে আচ মান। উত্তর মিক্যা ৬ বনর হাতী হৈল আগুয়ান ॥ ২৬ ছোড়তা ৭ তুলিয়া ছুডিল ৮ পিছে নাহি দেখে। খুঁভাখালীর পারত আসি সকল হাতী ঠেকে ॥ ২৮ আগেতে পাঙ্গালী ৯ আসি সেই না জাগায়। মাঘর শীতে ফুলি ফুলি হোঁকা টানি খায় ॥ ৩০ একেত গহিন বন আঁধারিয়া রাইত। পা ছাড়াইয়া ১০ বইশ্যে ১১ কেহ ওরে কেহ হৈয়ে কাইত ॥ ৩২ কোনজনে খায়রে তামুক আর কেহ চায়। ন যাচিলে সেই হোঁকা কাড়ি লৈয়া খায় ॥ ৩৪ এম্নি কালে কি হইল শুন রে খবর। বনর মাঝে শুনারে গেল পাতার মর মর ॥ ৩৬ আতাইক্যা ১২ হাতীর ডাকে ভাঙিল চমক। তাড়াতাড়ি উডি তারা মারিল ধমক ॥ ৩৮_ হৈল বড় হুলুস্থুল ওরে হুলুস্থুল শোর গোল করিল সবায়। কেহ সিঙা ফুকে কেহ বাঁশের ঠাগ বাজায় ॥ ৪০ ( ওরে বাঁশের ঠাগ বাজায় ) কেহ ছাড়ে হাবুই বাজি— ওরে হাবুই বাজি, হৈল আজি পরাণ লৈয়া টান। কোন জনে গহিন বনে ফুকারে আজান ॥ ৪২ (ওরে ফুকারে আজান) কেহ করে নানান ঢং— ওরে নানান ঢং, বাজায় ভং, কাঁসাত মারে বারি। কেহ গলা ফাড়ি পেলার কুইক্যা চিক্কির মারি ॥ ৪৪ (ওরে কুইক্যা চিক্কির মারি) পরাণের লালছ নাইরে সয়রে কত দুঃখ। নানান ফন্দী করি তারা ফিরায় হাতার মুখ ॥ ৪৬ ফিরাইল মুখ হাতা চকমক্যা হইল। পুগেতে আগুন দেখি মনে ডর পাইল ॥ ৪৮ দহিনখুন আইল মানুষ রাইতর হৈল নিশি। হাতারে ডেকান্যা দিল দোন দলে মিশি ॥ ৫০ পছিম চাবি ১ দহিনমিক্যা ২ যায়রে বনর হাতী। ছোড়তায় ৩ টানি ভাঙ্গে গাছ গাছড়ার মাথি ॥ ৫২ পিছে থাকি কিনা কাম করিল পাঞ্জালী। হাতারে যে দিতে লাগিল্ নানান রকম গালি ॥ ৫৪ ওরে কুলার আগাত নুন—হাতী কান পাতি হুন ৪ তেরিমেরী ৫ করিলে তোর কপালে আগুন— হাতী কান পাতি হুন। ৫৬ ওরে কুলার আগাত নুন—হাতী কান পাতি হুন কোনাকন্যা যাওরে এখন উত্তর মিক্যাথুন ৬— হাতী কান পাতি হুন। ৫৮ মাইনসর কেরামতি হাতা ন বুঝিল হায়। ছড়ার পন্ত ধরিয়ারে খেদার মিক্যা যায় ॥ ৬০ খেদার মিক্যা যায়রে হাতী খেদার মিক্যা যায়। গাছর আগাত চৈক্কাল ৭ বসি ফুইক্যা ৮ মারি চায়। ৬২ ( ৯ ) একই খোঁচ ৯ চলে হাতী একই বরাবর। ডাল ভাঙ্গে গাছর পাতা করে মরমর ॥ ২ ভিতরেতে কলাবন আর তারা গাছ। হাতী ন চিনে যে খেদা জাল ন চিনে মাছ ॥ ৪ ভাবিল তাহারা এই অঘোর জঙ্গল। বনব পশু ন চিনিল গুষ্টিমারা কল ॥ ৬ খেদার মুখেতে ধীরে আইলো হাতীর ঝাঁক। দরজার উপরে দরান হামিসা সজাগ ॥ ৮ বুকের মাঝে দুরু দুরু ন পড়ে শোয়াস। ইসারায় ধরি রাইখো কল্লি কলররাশ ॥ ১০ ধারে ধীরে কলাপাতা টানি টানি খায়। খাইতে খাইতে সকল হাতী খেদার ভিতর যায় ॥ ১২ গুণ্ডা হাতী চালাক ছিল ফিরিয়া আসিতে। উপরের দরজা দরান ছাড়ে আচম্বিতে ॥ ১৪ দুইদিকে পড়িল ঝাঁপ এই যে বিষম ফন্দী। বহুত হাতী খেদার মাঝে হৈয়া গেল বন্দী ॥ ১৬ ধলপহর মারের পৃগে নাইরে বেশী রাতি। খেদার মাঝে বাঁধা পৈল শতর উপর হাতী ॥ ১৮ ধাইয়া আইলো চৈকাল আর যত কুলাগণ। খেদার চাইর দিকে তারা ঘেরিল তখন ॥ ২০ শত শত উজাল হাতে চেল বল্লম আর। আগুন লাগাইয়া দিল পাহাড়ে পাহাড় ॥ ২২ তখন যে গুণ্ডা হাতী কি কাম করিল। খেদার ভিতরে শুধু ঘুরিতে লাগিল ॥ ২৪ পথ ন পাইল রে হাতী হইতে বাহির। আপন অবস্থা বুঝি মারিল চিক্কির১ ॥ ২৬ সেই ডাকে থর থরাইয়া কাঁপিল পাহাড়। গুবগুবানির২ চোডে৩ যেন মুল্লুক ডুবি যার ॥ ২৮ গুজরি গুজরি হাতী করে আনছান৪ । জঙ্গলেতে খেদা যেন করবুলার মৈদান৫ ॥ ৩০ মাথা মারে বনর হাতী খাম্বার কাছে যাই। ভৈরাকল৬ ভাঙ্গনের বুদ্ধি হাতীর কাছে নাই ॥ ৩২ মন করিয়া হাতী যদি মারে এক টান। হারি৭ আইব খেদার ঘির ছিড়ি যাইব বান৮ ॥ ৩৪ কে বুঝিবে মুরুখ৯ হাতার একি আলামত। টান ন মারি কেন হায়রে ঠেলে অবিরত ॥ ৩৬ ছোড়তায়১০ টানি ভাঙে কত বড় ডাল। খেদার ঘিরা বনর হাতীর যেন মায়াজাল ॥ ৩৮ মুরুখ হাতীর বুদ্ধি নাইরে খাম্বারে টানিতে। চোখ বাঁধা বলদের মত ঘুরিছে ঘানিতে ॥ ৪০ বাহিরেতে চৈক্কালেরা ঘুরে চারি ধার। ঘিরার কাছে গেলে হাতী ছেলর১১ গুথ১২ খায়১৩ ॥ ৪২ বিষ্ণুলোক—মৃত্যুঞ্জয় মহাদেব মন্দির The page is completely white with no visible text content. আথেমা হইয়া হাতী যখন মারে ঠেলা। গোল্লার মুয়ত আগুন লাগাই ভিতরে দে মেলা ॥ ৪৪ গোল্লার আবাজে হাতী যায়রে থমকিয়া। ঝঝোরে ঝরে যে পানি দোন চোঁগ দিয়া ॥ ৪৫ ক্ষণিক পরে হৈল তথায় বাজি খেলার শুরু। ওরে আচমানে হাবুই ছাড়ে জমিনে তুম্বুরু ॥ ৪৮ তুম্বুরুর হুরহুরানী হাবুই বাজির ডাক। শুনিয়ারে জঙ্গলা হাতী হইল অবাক ॥ ৫০ কেহ গোল্লা ছাড়ে কেহ বন্দুক করে ফৈর। মনর ডরে বনর হাতী মাডাত লৈল গৈড় ॥ ৫২ রাইত পোয়াইল ধীরে ধীরে সুরুজ উঠে লাল। দিনর প্রহর পাইয়া হাতী দিতে লাগিল ফাল ॥ ৫৪ চিহ্ন নাইরে কলাবনর নাইরে এগগাছ খের। ছিড়িভিড়ি ধুইলর হঙ্গে আচমানে উড়ের ॥ ৫৬ লাড়াই বাজিল্ ভিতরেতে কি বলিব হায়। শতর উপর পৈড়গ্যো হাতী খেদা রাখন দায় ॥ ৫৮ ওরে গোলবদন জমাদার করিল কি কাম। মাঘ মাস্যা শীতে ও যে কোপালেতে ঘাম ॥ ৬০ ডাক দিয়া কহে মিঞা নাই ভান হুস। “গেরামে যাইয়া এখন আনহ মানুষ ॥ ৬২ দিনর গতে রাতুয়া ১ আইজ ২ বড় বিষম লেটা। আর পানশ ৩ চাহি আমি জোয়ান জোয়ান বেটা ॥ ৬৪ খেদার চাইর দিকে তোমরা কুড়াওরে কাঠ। আজুয়া ৪ রাতিয়া কর ভালামতে ঠাঠ ॥ ৬৬ হাজার উজাল ৫ চাহি বড় বড় বোঁধা ’ । শুকনা চাহি বাচ্ছি আইনযু ’ ন আনিও ওদা ॥” ৬৮ রাইতের নিশি হৈল যখন ভাতঘুমার ৯ সময়। পূগের মুড়ায় গুমগুমাপ্তম্ কিসের আবাজ ১০ হয় ॥ ৭০ তারপরে কি হইল কহিয়া জানাই। উজাল ১১ ধরিয়া কুলি চাহিল উজাই ১২ ॥ ৭২ দেখিল হাতীর ঝাঁক ছামনে রৈয়ে খাড়া। আর এক্কেন। ১৩ আগুয়াইলে ১৪ জানর দফা সারা ॥ ৭৪ বাহিরের জংল| সেই কিন| কাম করে। খেদার মিক্যা ১৫ আইসূত ১৬ লাগিল ধীরে ধীরে ধীরে ॥ ৭৬ কেহ কি ভাবিয়াছিল যে, এ দেশের অবহেলিত মুষ্টিমেয় অরণ্যচারী সাঁওতাল বা কোল এবং বাগ্‌দী-কৈবর্ত কৃষক ছাড়া সমস্ত হিন্দুসমাজ ক্ষুরধার খড়গের তলে মস্তক অবনত করিতে উদ্যত হইবে এবং আপামর সাধারণে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করিয়া প্রাণরক্ষা করিতে চাহিবে? ক্ষণ কালের জন্যও দেশের বা সমাজপতিদের মনে এই চিন্তা উদিত হয় নাই। তাহারা বুঝিয়াছিল, এ দেশ ম্লেচ্ছ কবলিত হইতে পারে, রাজ্য ধ্বংস হইতে পারে, কিন্তু হিন্দু-ধর্ম সনাতন ও চিরন্তন, ইহার বিলোপসাধন কেহই করিতে পারিবে না। কিন্তু কালস্রোত রুদ্ধ হইবার নহে। এ দেশের রাজশক্তিই কেবল ম্লেচ্ছকর্তৃক অধিকৃত হইল না, পরন্তু এ দেশের নরনারী দলে দলে ইস্‌লাম ধর্ম পরিগ্রহ করিতে লাগিল। সমাজপতিদ্বয় শ্যেনচক্ষু বিস্তার করিয়াও এই ধৰ্ম্মান্ধ অত্যাচারী বিজেতৃগণের হস্ত হইতে আত্মরক্ষা এবং সমাজ রক্ষা করিতে পারিলেন না। তখন তাঁহারা নিরুপায় হইয়া কেবল এই কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করিলেন যে, যাহারা সামান্য মাত্র অপরাধে অপরাধী বা ম্লেচ্ছকর্তৃক খণ্ডিত ও স্পৃষ্ট হইয়াছে, তাহাদিগকে সমাজ হইতে চিরকালের জন্য নির্বাসিত করা হউক। তাঁহাদের এই ধারণা ছিল যে, ব্যাধিপীড়িত অঙ্গ কাটিয়া ফেলিলে যেমন শরীর রক্ষা পায়, তদ্রূপ এই সমাজ-দ্রোহীদিগকে হিন্দুসমাজ হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দিলে হিন্দুধর্ম কলুষমুক্ত হইবে। কিন্তু এ ব্যবস্থা যে কতদূর নিষ্ফল ও হানিকর হইয়াছিল, তাহা পরবর্ত্তী ইতিহাসের পৃষ্ঠা আলোচনা করিলেই বুঝিতে পারা যায়। তখন দেশে চলিয়াছিল দারুণ অরাজকতা। এ দেশের ধনদৌলত লুণ্ঠিত হইতেছিল, দেবালয়সকল ভগ্নাবশেষে পরিণত হইতেছিল এবং অসংখ্য দেবমূর্ত্তি চূর্ণীকৃত হইয়া রাজপথের সোপান-শ্রেণীতে বিন্যস্ত হইতেছিল। এ মহা বিপ্লবের দিনে দেশের লোক আত্মরক্ষা করিবে, না ধৰ্ম্ম রক্ষা করিবে, তাহার কোন স্থিরতা ছিল না। একদিকে ম্লেচ্ছ আক্রমণ, অন্যদিকে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অত্যাচার-উভয় সঙ্কটে পতিত হইয়া বৌদ্ধ ও নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা দলে দলে মুসলমান ধর্ম্ম গ্রহণ করিতে লাগিল। কেবল তাহাই নহে, যাহারা হিন্দুসমাজের উচ্চস্তরে বিরাজ করিতেছিলেন, তাঁহারাও প্রাণভয়ে ও রাজ্যলোভে মহম্মদের শরণাপন্ন হইতে লাগিলেন। এ দেশের অতি প্রাচীন ও সমৃদ্ধিশালী কায়স্থ এবং ব্রাহ্মণ বংশের ধ্বংসাবশেষ হইতে আমরা আজ খাঁ, চৌধুরী, মল্লিক ও রাজা উপাধিধারী রাজকর্মচারিগণের পরিচয় প্রাপ্ত হই। মূর্ত্তিপূজক হিন্দু নিরাকার একেশ্বরবাদী মুসলমানের নিকট মস্তক অবনত করিল। ইহাই হিন্দুসমাজের সর্ব্বাপেক্ষা সঙ্কটকাল। একদিকে সমাজপতিদের কঠোর অনুশাসন ও নির্যাতন, অন্যদিকে বিজেতৃগণের উগ্র ধর্ম্মোন্মাদ ও প্রলোভন। এই দুই প্রবল শক্তির সংঘর্ষে হিন্দুসমাজ ভাঙ্গিয়া চূরমার হইতে লাগিল। শত শত বর্ষের প্রাচীন কৃষ্টি, সভ্যতা ও সাধনা যেন এক মুহূর্ত্তে ধূলিসাৎ হইয়া গেল। এ দেশে তখন কোন কেন্দ্রীয় শাসনদণ্ড ছিল না, যাহাকে অবলম্বন করিয়া বিপন্ন দেশবাসী আত্মরক্ষা করিতে পারে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামন্তরাজগণ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই ব্যস্ত ছিলেন, দেশের বা সমাজের কল্যাণসাধনের অবসর তাঁহাদের ছিল না। ফলে, অরাজকতার অন্ধকূপ হইতে উদ্ধার পাইবার জন্য এক বৃহৎ মানব গোষ্ঠী নবধর্ম্মের উদার প্রাঙ্গণে আশ্রয় গ্রহণ করিল, যেখানে জাতিভেদের কশাঘাত নাই, অস্পৃশ্যতার গ্লানি নাই। হাতী-খেদা (২য় চিত্র)—১৭৭ পৃঃ খবরিয়া খবর কৈল জমাদারের ঠাঁই। কাইপ্ৎ লাগিল সকলের পেডর পিলাই॥ ৭৮ সপ্ সপাসপ্ গুম্ গুমাসুগুম্ হাতীর আওয়াজ। দুনিয়াতে রোজ কেয়ামত হবে বুঝি আজ॥ ৮০ হাতী যদি ভাঙে খেদা পরাণ লৈয়া টান। স্থানে স্থানে মুছলমানে ফুকারে আজান॥ ৮২ হিন্দু বলে “জয় কালী” মঘে ডাকে “ফরা”॥ এইবার প্রভু নিরাঞ্জন সঙ্কটেতে তরা॥ ৮৪ এন্ধি কালে কি হইল শুন বিবরণ। হাবুই ছাড়ে গোল্লা ফুডায় যত চ্যৈকালগণ॥ ৮৬ উজাল জ্বালিয়া তারা রাইতরে করে দিন। কাঁসা ভংত বাড়ি মারে বাজায় মৈষর শিং॥ ৮৮ ধুনির আগুন তখন ছুঁইল আচ্‌মান। বাহিরের জংলা ধাইল লৈয়া নিজর জান॥ ৯০ এক দুই তিন করি চাইল দিন যায়। হেরাল্যা হইল হাতী পড়িয়া খেদায়॥ ২ খাওন বেগরে তারার গায়ে বল নাই। চলিতে ফিরিতে পড়ে পাকাই পাকাই॥ ৪of যেই গুণ্ডা আইনাছিল খেদার ভিতরে। হোতের ১ মতন তার চোগর ২ পানি ঝরে ॥ ৬ চোগর পানি ছাড়ি হাতী হইল হরাণ ৩। অবশেষে মাডীত দাঁত দি ৪ তেজিল পরাণ ॥ ৮ তার পরে জমাদার কিনা কাম করে। পালা হাতী আনিয়াহে বন্য হাতী ধরে ॥ ১০ আচানক তঁয়সা ৫ সেই যে কি বলিব আর। খেদার ঢাকত্ আর এক খেদা বানায় চমৎকার ॥ ১২ তার মাঝে কলাগাছ রাখে সারি সারি। নতুন দুয়ার বানায় খেদার দুয়ারী ॥ ১৪ এমন দুয়ার সেই যে বড়ই হেকমত। কেবলমাত্র একটি হাতীর আসনের পথ ॥ ১৬ একটি হাতী আইস্লে পরে বন ৬ হয় দুয়ার। পালা হাতী দুইটা থাকে দুই পাশে তার ॥ ১৮ কলাগাছ খায়রে জংলা ৭ কলাগাছ খায়। শুন এখন কেমন কৈরে হাতী বাঁধন যায় ॥ ২০ পোষা হাতীর পেডর ৮ নীচে ঢুলেনে ৯ মাহুত। জানের লালছ ১০ নাই অভাগ্যার পুত ॥ ২২ ইসার। করিলে মাহুত পালা হাতী আসি। দুই পার্শ্ব দি জঙ্গলারে চিবি ধরে কসি ॥ ২৪ আর এক পোষা কুনকী ছায়নের দিকে যাই। টানি ধরে ছোড়তাতে ছোড়তা বেড়ায়। ২৬ লড়িতে চড়িতে তার নাই থাকে সাধ্য। তিনটা হাতীর ডরে জংলা হৈয়া যায় বাধ্য॥ ২৮ এমুনি কালে সেই মাহুত বলি ‘বা-রে-বা’। বাধিলরে বনর হাতীর পিছর দোন পা ॥ ৩০ বাধা পড়ি জংলি হাতী ছাড়ে চোগর পানি। এই না মতে সকল হাতী বাহিরে আনে টানি॥ ৩২ খুসী হৈয়া আইয়ের সবে আইয়ের খুসী হই। মংলা মঘ্যার বাড়ীত আবার খাইলো মৈষর দই ॥ ৩৪ দেশ বৈদেশে গোলবদনর হৈল বড় নাম। শতেক হাতী ধরিয়াছে লাখো টাকা দাম॥ ৩. এইরূপ ব্যবহার করিতে করিতে পরিশেষে রামের প্রতি তাঁহার গাঢ় অনুরাগ জন্মিল। রামের গুণে তিনি এমত বশীভূত হইলেন যে, রামের অদর্শনে তিনি এক মুহূর্ত্ত ও তিষ্ঠিতে পারিতেন না; রামকে না দেখিলে, তাঁহার প্রাণ ব্যাকুল হইত এবং আহার বিহার আদি কোনও ক্রিয়াতে তাঁহার প্রবৃত্তি হইত না। রামও, লক্ষ্মণের যেরূপ স্নেহ ও ভক্তি দেখিতেন, তদনুরূপ প্রীতি ও সমাদর করিতেন। এইরূপে, ভ্রাতৃযুগল পরস্পর প্রীতিসূত্রে নিবদ্ধ ও সদা সর্ব্বদা একত্র অবস্থিত হইয়া, পরম সুখে কালহরণ করিতে লাগিলেন। কনিষ্ঠ শত্রুঘ্ন, লক্ষ্মণের ন্যায় ভরতকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন, এবং তাঁহার অনুবর্ত্তী হইয়া চলিতেন। অনন্তর, মহারাজ দশরথ, পুত্রের বয়ঃক্রম ষোড়শ বর্ষ অতীত হইলে, তাঁহাদের বিবাহ বিষয়ে চিন্তা করিতে লাগিলেন। এক দিবস, তিনি পাত্র মিত্র উপাধ্যায় প্রভৃতি সমভিব্যাহারে এই বিষয়ের মন্ত্রণা করিতেছেন, এমন সময়ে মহাতেজা মহর্ষি বিশ্বামিত্র রাজদ্বারে উপস্থিত হইলেন, এবং দ্বারপাল দ্বারা সংবাদ পাঠাইলেন, গাধিনন্দন কুশিকবংশীয় বিশ্বামিত্র আসিয়াছেন, মহারাজকে সংবাদ দাও। রাজা, সংবাদ পাইবামাত্র, সাতিশয় আহ্লাদিত হইয়া, উপাধ্যায় বশিষ্ঠকে সমভিব্যাহারে লইলেন, এবং ত্বরিত পদে গমন করিয়া, সাদর সম্ভাষণ পূর্ব্বক মহর্ষিকে অন্তপুরে আনয়ন করিলেন। রাজা, যথাবিহিত পূজা ও বন্দনাদি সমাপন করিয়া, কৃতাঞ্জলিপুটে সবিনয়ে কহিলেন, ভগবন্! আপুনি অযাচিত হইয়া আগমন পূর্ব্বক, আমায় কৃতার্থ করিলেন। অমৃতলাভে যেমন পরম আহ্লাদ হয়, তদ্রূপ আপনার আগমনে আমার পরম আহ্লাদ জন্মিতেছে। আপনার শুভাগমনে আমার কুল পবিত্র হইল, পূর্ব্বজন্মের মহান্ তপস্যার ফল প্রাপ্ত হইলাম। প্রসন্ন হইয়া আজ্ঞা করুন, কি নিমিত্ত আগমন করিয়াছেন; আমি আপনার অভীষ্ট সাধনে প্রাণপণে যত্নবান হইব। আপনি আমার পরম পূজনীয় পরম দেবতা।