কাফন চোরা
পূর্ববঙ্গ গীতিকা - তৃতীয় খন্ড - দীনেশ চন্দ্র সেন
কাফেন-চোরা প্রণতি সভাজনে পন্নাম১ করি ঠাঁইয়াজির২ মোকাম। ছোট্লেরে৩ মান্যতা জানাই বড়রে ছালাম॥ তোমরা সকলর কাছে মাগি অপরাধ। শুদ্ধ কি অশুদ্ধ হৈলে ন কৈবা সভাত॥ তোমরা সবে গুণবন্ত আমি অধমজন। বুড়াবুড়ীর কাছে রে মুই ছাওয়ালের মতন॥ ভালামন্দ দুই আছে দুনিয়ার মাঝারে। ভাঙাচোরা৪ কথা আইলে ক্ষমিবা আমারে॥ আমি হীন মূর্খমতি নাহি তাল মান। বিছমিল্লা বলিয়া এখন সুরু করি গান॥ পার্ব্বত্য অঞ্চল ও চেঁউয়া পরী চাঁটিগার পুগে৫ আছে উঁচল৬ পাহাড়। দিনে রাইতে ঘুরে সেথায় কতই জানোয়ার॥ গহিন জঙ্গলে চরে ১ মির্ক ২ নানান জাতি। বাঘ ভাল্লুক গয়াল ৩ আর ঝাঁকে ঝাঁকে হাতী ॥ যত পূগে যাইবারে তত বড় বড় মুড়া। আছ্মান লাগৎ পায়রে যেন পাহাড়ের চূড়া ॥ সেখানে বসতি করে রোসাঈঙ্গা ৪ বন্জুগী ৫। পাংখোয়া ৬ মুরুং ৭ আর লেঙা ভেঙা ৮ কুকী ॥ বাঘ ভাল্লুকের মত বনে বনে ফিরে। আনক্যারে ৯ পাইলে তারা বুগত ছুরি মারে ॥ জুম্মা ১০ চাঙ্গ্যোয়া ১১ আছে যারা জোমকুচি ১২ খায়। মুড়ার ১৩ গুড়িত ১৪ মাচাং ১৫ বাঁধি সুখে দিন কাডায় ১৬ ॥ জোমর ক্ষেতে সোনা ফলে মাডির এমন বল। হৈরত ১৭ হুতা ১৮ মারফা ১৯ চিনার ২০ নানান রকম ফল ॥ জঙ্গলারা বেচে রে মাল হাডে হাডে যাই। ভূঁইয়র ১ মানুষ আসে জিনিষ কিনিবার লাই॥ (১-১৬) ( ২ ) লুধাগাজি নামে ছিল ওয়া ২ একজন। পাহাড় হইতে আনি বেচে বাঁশ ছন ৩॥ হুদিন ৪ মাসে বাঁশ বেয়ার ৫ করে লুধাগাজি। তাহার সঙ্গেতে যায় দুইজনা মাঝি॥ কাঁচিচার ৬ উজান বাঁকে করিয়া ভরমণ। চালি ৭ লৈয়া ঠেগার কুলত করিল গমন॥ দুমদুম্যার ৮ পাড়ায় গেল চাটিগাইয় কাল। হৈর কিনে হুতা কিনে চাহি ভালা ভালা॥ বাঁশের চালিতে তারা রাঁধি বাড়ি খায়। সারাদিন ঘুরে লুধ পাড়ায় পাড়ায়॥ ঠেগার কুলে বলা ৯ জাগাত ১০ আছে জুম্মাপাড়া। কিছুদিন সেই ঘাটে রহিলেক তারা॥ একদিন লুধাগাজি দেখিবারে পায়। অপরূপ সোন্দর কৈন্যা জোমর ক্ষেতত যায়॥ এমন ছুরত রে তার কি করি বয়ান। পিন্ধনেতে কালা থামি বাঁকা দুনয়ান॥ কানর মাঝে সোনার নাধং চান্দর মতন মুখ । সিনাতে আনারের কলি ফাড়ি পড়ের বুক !! গলার মাঝে সোনার দানা কণ্ঠমণির হার । মাথার উয়র ফুলর ছাড়া বয়ারে উড়ার ॥ মুচ্ কি হাসি যায় রে নারী আর চাবায় পান। নবযৌবন ষোলকলা ঠারে লইয়ায় প্রাণ ॥ আরে, গুড়াধন কারবারীর নাতিন ঢেঁউয়া পরী নাম। ঠেগার কুলত ঘুরি সেই করে জোমত কাম ॥ বাঁশর চালিত বসি দেখে লুধাগাজি ভাই। ধড়ফড় করে পরাণ ঢেঁউয়া পরীর লাই ॥ ( ১-২৬ ) ( ৩ ) তারপরে কি হইল শুন গুণিগণ। ঠেগার খালে আইল রে কৈন্যা গোছলের কারণ ॥ গাছের আগাত থোরা থোরা রৈদর ছড়া আছে। চালি হৈতে নামি লুধা আইল কৈন্যার কাছে ॥ ধীরে ধীরে আসে লুধা কথা বার্তা নাই। পিছের দিকে যাইয়া তারে ধরিল বেড়ায় ॥ ফির চাহি ঢেঁউয়া পরী উডিল রে কাঁদি। লুধাগাজি গামছা দিয়া মুখখান লৈল বান্ধি ॥ তারপরে দুষমন লুধা কিনা কাম করে। কৈন্যারে তুলিয়া লৈল কাঁধের উপরে ॥ বাঘের মুখেতে পড়ি বনের হরিণী। ছাড়ি দিয়ে হোতর ১ মতন দোন ২ চোগর পানি॥ (১-১২) ( ৪ ) ঠেগার ছড়া ৩ এরি ৪ চালি ৫ কাঁইচা খালে পৈল। কাঁদিতে কাঁদিতে চেঁউয়া বেহোঁস হইল॥ ভাডি-গাঙে ৬ যায় রে চালি কৈন্যারে লইয়া। লুধাগাজি প্রবোধ দে’রে নানান কথা কৈয়া॥ নাহি বুঝে কথা কৈন্যা নাহি বুঝে বাণী। কাঁইচার হোত ৭ বাড়াই দিল তার চোগর পানি॥ চলিতে চলিতে চালি চাইর দিনের পরে। গজালি গেরামে লুধা আইল আপন ঘরে॥ অনাহারে মরে কৈন্যা নাহি সহে দুঃখ। দিনে দিনে শুকাইল তার সোনা মুখ॥ নাহি ছোঁয় ভাত কৈন্যা নাহি ছোঁয় পানি। লোহার পিঞ্জােরায় কাঁধা পড়িল হরিণী॥ (১-১২) ( ৫ ) তার পরে সভাজন শুন দিয়া মন। কিছুকাল পরে হৈল গর্ভের লক্ষণ॥ মাথায় উড়িল বিষ সর্ব অঙ্গে জ্বালা। চাম্পার বরণী কৈন্যার দেহ হৈল কালা॥_ বীপরীত হৈল সব আচানক কাম। গর্ভ যাতনায় কৈন্যার নিষ্কলি যায় জান॥ হাঁড়িতে ন পারে চেঁউয়া ঝিমি ঝিমি পড়ে। এত দুঃখ তার হায় ন সৈত শরীরে॥ নিকট হইল যখন পরসাসের দিন। ক্রমে ক্রমে চেঁউয়া পরীর তনু হৈল ক্ষীণ॥ দিন মাস পুন্ন হৈলে দরদ উড়িল। মাড়িতে পড়িয়া কৈন্যা বেহোঁয়স হইল॥ বহুত পাইল দুঃখ নছিবেতে লেখা। মা বাপের সঙ্গে আর ন হইল দেখা॥ গর্ভপাত হৈতে কৈন্যার দম হৈল বন। জন্মিল ছাওয়াল এক বড় অলৈক্ষণ॥ মায়েরে খাইল পুতে পরসবের কালে। লুধাগাজি তারে লৈয়া পড়িল বেনালে॥ (১-১৮) (৬) কাফন-চোরা মনসুর দিনে দিনে বাড়ে ছাওয়াল বাঘের বাচ্চার মত। পুগ্যের জঙ্গলের মাঝে ঘুরে অবিরত॥ মনসুর বলিয়া তার রাখা গেল নাম। শিখিতে লাগিল বেটা দাগাবাজি কাম॥ কালা বরণ দেহরে তার চোগর বরণ লাল। চলিতে ফিরিতে সদাই করে উথাল্ তাল॥ কোন দিন জঙ্গলে থাকে কোন দিন ঘরে। মা মরা ছেমরের ১ কথা কনে ২ পুছার ৩ গড়ে ৪ ॥ পিঁধনেতে ছিড়া লেঙি ৫ মৈষা গন্ধ গায়। আটপর ৬ মুখ লাড়ে যাহা পায় খায় ॥ গাছে গাছে থাকে বেটা গাছের বাঁদর। পৌছেনা ৭ তাহারে বাপে ন করে আদর ॥ একদিন কি হইল কহিয়া জানাই। রাত্র নিশা কালে লুধা বাথানেতে যাই ॥ দেখিল বিরিষ ৮ গরু বাঘে ধরি টানে। লাডি ৯ লৈয়া তড়াতড়ি গেল সেইখানে ॥ গরুরে ছাড়িয়া বাঘ ধরিল লুধারে। খাইয়া বুকের লোঁ পলাইল পাহাড়ে ॥ এইরূপে হৈল হায় রে লুধার মরণ। জাহিল১০ হইয়া মনসুর ফিরে বনে বন ॥ ধন দৌলত নাই রে তার নাই রে ঘর বাড়ী। কুসঙ্গে মজিয়া হৈল দুষ মন দুরাচারী ॥ সেই গেরামের পূগ কিনারে মস্ত মস্ত মুড়া। পাইয়া ১১ বাঁশে গল্লাক বেতে ১২ আর উলু ছনে ভরা ॥ সেইত জঙ্গলে মনসুর ঘুরে অবিরত। ভুঁ ইয়র ১৩ মানুষ ভাবে তারে বাঘ ভাল্লুকর মত ॥ মাও নাই বাপ নাই নাই রে বাড়ী ঘর । ডাকতি করিয়া ঘুরে জঙ্গলের ভূতর’ ॥ খুন করে ডাকাইতি করে মনে নাই তার দুঃখ। সিকাডি ২ বাহির করে ঘরের ছন্ধুক ৩ ॥ এমনি ডাকাইত হৈল কি বলিব হায়। মরার কাফেন চুরি করি বাজারে বিকায় ॥ দপনের ৪ সাম্বাদ যখন পায় রে মনসুর চেরা। রাইত নিশিতে সুরু করে মরার কয়বর খোড়া ॥ আখেরেের সম্বল চুরি করি নিশি রাইত। দোজকের ‘ রাস্তা কাডি লৈয়াছে ডাকাইত ॥ দুই চক্ষু দেখতে লাল সুরুজ বরণ। মুখের আবাজ যেন দেবার ” গর্জন ॥ মানুষ মারিতে বেটার দিলে দুঃখ নাই। খুসী হয় ধন দৌলত সঙ্গীরে বিলাই ॥ কেহ বলে-‘ মরা খায় ডাকাইত্যা মনসুর’। কেহ বলে-‘দেয়র ’ মতন তার গায়ের জোর’ ॥ দল বল হৈল রে তার নানান মোঁকামে। কোলর পোয়া ৮ হাঙ্ক • হয় কাফন চোরার নামে ॥ কন্যাযাত্রা জোন পহরগ্যা ১০ রাইঙরে ওরে দোলা যায় চলি। মুট করি মরের মেল| বৈল ফুলর কলি ১১ ॥ দোলা যায় যায় রে দোলা মুড়ার কেনার দিয়া। মনসুরগ্যা ডাকাইত্যা ভাবের আজুয়া১ কার বিয়া॥ ভাবিয়া চিন্তিয়া ডাকাইত কুর্ম্মাই খালর বাঁকত২। চুপে চুপে লুকাই রহিল কেঁয়া কেঁড়ার ঢাকত৩॥ দোলা যায় যায় রে দোলা অষ্ট বেড়ার৪ কাঁধে। দোলার ভিতর৫ নয়া বউয়ে গুঁড়ি গুঁড়ি কান্দে॥ মা বাপের মনত পড়ে আর ছোড৬ ভাইয়র মুখ। ঝিঁ ঝিঁ পোগর৭ ডাগ৮ শুনি কাঁপি উডের৯ বুক॥ আগে পিছে বৈরাতী১০ যায় যায় রে ধীরে ধীরে। দহিনালী১১ হাবা পাইয়া দোলার উলাস১২ উড়ে॥ ধবধব্যা১৩ জোন পহর দিনর মতন রাইত। ঝাড়ত১৪ বহি খাপ্দি রইয়ে মনসুরগ্যা ডাকাইত॥ এক ছোতি১৫ কুর্ম্মাই খাল হাঁড়ি১৬ হৈয়া পার। আস্তে আস্তে আইল দোলা ঝাড়ের কেনার॥ বাঘে যেমন ঝাঁপ দিয়া রে গরু ঝাঁকত১৭ পড়ে। মনসুর ডাকাইত পৈল১৮ তেমনি দোলার উপরে॥ দোলার উপরে পড়ি মাইল১৯ এক ডাগ২০। কেহ বলে ভালুক আইল কেহ বলে বাঘ॥ সোয়ারী ১ ফেলিয়া বেড়া পরাণ লৈয়া ধায়। পাল্কীর দুয়ার খুলিয়া রে মনসুর আলী চায় ॥ নয়া ২ বউ এ কাঁদি উডিল ৩ আল্লাতাল্লা বুলি। টান মারি লইল ডাকাইত গলার হাঁছুলি। কানর করম ফুল লৈল আর নাগর নথ। তাড়াতাড়ি মনসুর আলী ফাল্দি ৪ পৈল ৫ ঝাড়ত ৬ ॥ বৈরাতীরা ৭ ধাইয়ারে আইল দোলার কিনারে। আচানক তঁয়সা ৮ দেখি ‘হায়রে হায়’ করে ॥ দেখিল সকলে তখন দোলার ভূতর ৯। নাগর ১০ লৌয়ে বুগর ১১ চুলি ১২ ভাসি যায় বৌয়র ॥ জোন পহরগ্যা রাইতলে ওরে দোলা আইল চলি। বিয়া বাড়ীতে কাঁদা কাডি পাল্কীর দুয়ার খুলি ॥ * (১-৩২) কন্যাযাত্রা জ্যোৎস্না প্রহর রাত্রে ওরে, যায়রে দোলা চলি’— মুঠা মুঠা কে ছড়ালে বেল ফুলের কলি? দোলা যায় যায়রে— দোলা পাহাড়-তলী দিয়ে, ( ৮ ) আয়রা ও আজিম চিন্তাপুর গেরাম সেই যে দেখিতে সোন্দর। দোচালা চৌচালা তাতে কত বাড়ী ঘর॥ কুর্ম্মাই খালের পারে পারে আছে সোনার ভূঁই। দুই খোন্দ পায় চাষা দুই বার রুই ॥ মনসুর ডাকাত ভাবে ওরে আজি যা কা’র বিয়ে! ভাবিয়া চিন্তিয়া ডাকাত কুর্ম্মাই খালের বাঁকে চুপি চুপি লুকায়ে রয় কেয়া কাঁটার ঝাঁকে। দোলা যায় যায়রে— দোলা আট বেহারার কাঁধে, দোলার ভিতর নূতন বৌ গুঁড়ি গুঁড়ি কাঁদে! মা বাপে তার মনে পড়ে, ছোট ভাইয়ের মুখ, ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শুনে কেঁপে ওঠে বুক! আগে পিছে বর-যাত্রী যায়রে ধীরে দূরে, দক্ষিণা বাতাসে দোলার রঙ্গিন কাপড় উড়ে! ধবধবে জোছ্ না প্রহর, দিনের মতন রাত! কেয়া ঝাড়ে ওঁৎ পেতে রয় মনসুর ডাকাত। এক-স্রোতা কুর্ম্মাই খাল হেঁটে হয়ে পার আস্তে আস্তে এল দোলা খালের কিনার। বাঘে যেমন ঝাঁপ দিয়া গরুর ঝাঁকে পড়ে মনসুর ডাকাত পড়ল তেমনি দোলার উপরে! দোলার উপর পড়ে’ মনসুর ছাড়িল এক ডাক, কেহ বলে ভালুক এল, কেহ বা বাঘ। সোয়ারীকে ফেলে বেহারা প্রাণ নিয়ে ধায়! পাল্কীর দুয়ার খুলে মনসুর আলি চায়! মাঝে মাঝে আছে রে ভাই মিডা ১ পানর বর। কুর্শ্বাইর কুলত শোভা ধরে আজিমের ঘর। পাঁচখানি সরেঙা ২ নাও ঘাটে থাকে তার। সকলে মান্যতা করে পাড়ার ছরুদার ৩ ॥ কাছালং আর মাইয়নীতে জোম বেয়ার ৪ করে। বছর বছর তোড়া তোড়া টাকা আনে ঘরে। দুনিয়াদারীতে আজিম বড় হুসিয়ারী। জুম্মা চান্দ্বোঁয়া কহে তারে সালখারা ৫ বেয়ারী ৬ ॥ পরথম আওরাত তার গিয়াছে মরিয়া। চল্লিশ বছর উমরেতে ৭ আবার কৈল বিয়া ॥ দোতীয় ৮ বিবির নাম আয়রা সোন্দরী। শুন সভাজন থোরা ৯ রূপর বয়ান করি ॥ নতুন বৌ কাঁদে, মুখে ‘আল্লা তালা’ বুলি ! টান মেরে নিল ডাকাত গলার হাঁসুলী ! কাণের করম-ফুল আর নাকের নথ নিয়া ঝোঁপের ভিতর মনসুর আলি পড়িল লাফ দিয়া! বরযাত্রী ধেয়ে এল দোলার কিনারায় হঠাৎ বিপদ্ দেখি’ সবাই করে ‘হায়, হায়!’ সবাই তখন দেখতে থাকে দোলার কাপড় তুলি’ নাকের রক্তে ভাসে বৌয়ের বুকের কাঁচুলী। জোৎস্না-প্রহর রাত্রে ওরে দোলা এল চলে’— বিয়ে-বাড়ীতে কাঁদা-কাটা, পাখীর দুয়ার খুলে’! নতুন যৌবন কন্যার সোন্দর বদন। থাকুক মরদের কথা নারীর ভুলে মন॥ হাসিতে ঝলকে যেন বিজলির রেখা। মুখেতে মুক্তার ছড়া জুড়ে যায় দেখা॥ কি করিব আয়রার চুলের বয়ান। যেমন কালা তেমন লাম্বা পায়ের সমান॥ বড়ই ছুরত তার দুনয়ান বাঁকা। ধনুর মতন ভুরু আছমানেতে আঁকা॥ হস্তপদ গোলগাল চাম্পা ফুলর কলি। হাঁটিতে লাগেরে যেন খঞ্জন যায় চলি॥ উন্মত্ত যৌবন হৈয়ে ভালা লাগের অতি। উনাই উনাই পড়ি যারগৈ শরীলের জ্যোতিঃ॥ ভাডি বসের কালে পাইয়া নতুন যৌবন। বড় সুখে আছে আজিম খোসালিত মন॥ বিয়ার দিনে ডাকাইত্যার হাতেতে পড়িয়া। লাগর বঁড় কানর লতি গিয়াছে ছিঁড়িয়া॥ নাগে কানে হাত বুলাইয়া আজিম যখন চায়। সরমেন্দা হইয়া আয়রা বুকে মুখ লুকায়॥ আজিম বলে—“আমার কথা শুন আওরত। কঁডে সোনার করম ফুল আর নাগর নথ॥” আয়রা বলিল—“আমার সাদি হৈবার আগে। ধৈরেছিল আমারে যে কালা এক বাঘে॥ কানর করমফুল লৈয়া আর নাগর নথ। কালা বাইধ্যা পোলাইয়াছে পূগুর জঙ্গলত ॥ এইরূপে দুইজনে রঙ্গ রস করে। বড়ই আসক আজিম আয়রার উপরে ॥ ( ৯ ) জোম বেপারে যাত্রা আহ্ন মাসে শীত পৈল ক্ষেতে পাকে ধান। জোম বেয়ারে যায় রে আজিম মাইয়নী উজান ॥ মায় আসি কাঁদন করে ধরি পুতর হাত। “কতদিন পরে আবার পাইমু সাইক্ষ্যাৎ ॥ তুমি আমার এক পুত্র অন্ধজনের লাঙি। তিলেক মাত্র ন দেখিলে বৈক্ষ যাইব ফাড়ি” ঘাটেতে সরেঙা নৌকা হৈয়াছে তৈয়ার। আয়রার মুখ আজিম চাহে বারে বার ॥ “পরাণের পরাণ তুমি বিদায় দাও মোরে। ঘাটেতে ফিরিব আর তিন মাস পরে ॥ কাঁদিতে লাগিল আয়রা মাডির মাঝে পড়ি। ধড়ফড় করে যেমন পাগভাঙা কৈতরী ॥ “ন দিব পরাণের খসম ন দিব ছাড়িয়া। তুমি ছাড়ি গেলে আমি যাইব মরিয়া ॥ ধন দৌলত নাই চাই মালমাত্ত। আর। দিন রাইত চাহি খাইক্যাম সোনামুখ তোমার ॥ মায়েরে বুঝাইয়া আজিম বুঝায় আওরতে। তারারে করিয়া হাস্য যাত্রা কৈল পথে ॥ উড়িয়া যাইতে তার চৈক্ষে হানিল মাছি। ঘরের খুন বাহির হৈতে মুখে পৈল হাঁচি ॥ ডানর খুন আসি সর্প বামে গেল ধাই। পন্থের মাঝে দেখে আজিম ডুমা একটা গাই ॥ দধির ভাণ্ড ভাঙ্গিয়াছে গোয়াল্যার চাওয়াল। জাইল্যার পুতে কাঁদন করে ঘুট্যাত বাজাই জাল ॥ তিন বিবি বসিয়া রে মাথাত উকুন চায়। খাইল্যা কলসী লৈয়া নারী জল আনিতে যায় ॥ এই সব অলৈক্ষণ দেখিল আজিম। খোদার মরজি বুঝা বড়ই কঠিন ॥ উজান গাঙে নৌকা লৈয়া জোম বেয়ারে যায়। দূরে থাকি বাড়ীর মিথ্যা ফিরি ফিরি চায় ॥ মায়ে দিছে ভাতর মোচা বউয়ে দিছে পান। সারি গাইয়া যায়রে আজিম মাইয়নী উজান ॥ (১-২) উদিস করিয়া সেই ডাকাইত্যা মনসুর। গোপ্তভাবে চলি আইল গেরাম চিন্তাপুর॥ এক বুড়ীর বাড়ীত আসি হইল হাজির। খালা বুলি ডাকি কৈল—‘আইলাম মোছাফির’॥ মিডা কথা কহি বুড়ার মন হরি নিল। খাওনের মালমাত্ত ভেট বেগার দিল॥ মনছুর ডাকাইত বলে—“শুন ওরে খালা। আখেরের লাগি আমার মন হৈছে উতালা॥ সে কারণে হামিক্ষণ কুর্শ্বাইর পারত যাই। আছমানের মিক্যা চাইয়া ফিকিরী কামাই॥ হাছামিছা নানান কথা কহি বুড়ীর কাছে। আয়রার লাগি ডাকাইত থাপ্দি বসি আছে॥ এই না মতে কিছুকাল গোজারিয়া যায়। মোরগের ছালন বুড়ী পতিদিন খায়॥ এক দিন কি হইল শুনরে খবর। জোহরের আক্ত সুরুজ মাথার উপর। রাঁধা বাড়া সাঙ্গ করি অপম্বর হই। গাঙ-সেয়ানে আইল আয়রা কলসী কাঁকে লই॥ রঙিনা সাটিনের চুলি পড়িয়াছে গায়। নতুন ডালম্বের কলি আল্গে দেখা যায় ॥ কাল ভমরা দেখিয়া রে করে আনচান। নিকলি যাইতে চায়রে দুরগত্যা পরাণ ॥ হাত পা মাজিয়া কৈন্যা ডুব্ব দিল জলে। ডাকাইত্যা দেখিল বসি হিজল গাছের তলে ॥ “কি দেখিলাম কি হইল অপরূপ ধাঁধা। কাল তনু ঘাটে রাখি পরাণ দিলাম বাঁধা ॥ সোন্দরী আয়রার সঙ্গে হইলে মিলন। দুনিয়ার মাঝে হৈব সাফল্য জীবন ॥ কলসী লইয়া আয়রা ঘরে চলি গেল। মনসুর ডাকাইত নানান কথা ভাবিতে লাগিল ॥ হাঁজর ঘরে বাত্তি দিয়া সোন্দরী আয়রা। ঘরের যত কাজকৰ্ম্ম করি লৈল সারা ॥ আইসাছে চৈত্রল মাস গৰ্ম্মি লাগে অতি। খসমের কথা ভাবি থির নহে মতি ॥ তিন মাস চলি গেল ন আসিল ঘরে। বিরহ আগুনে কৈন্যা জ্বল পুড়ে মরে ॥ জ্বোমে আছে বাঘ ভালুক নানান জানোয়ার। অমঙ্গল কথা মনে উডের আয়রার ॥ নানান কথা ভাবি কৈন্যার বুক ফাড়ি যায়। মনের সন্তাপে তখন বারমসী গায় ॥ “যৌবনকালে এমন জ্বালা কেমন কৈরে সহি। ন বুঝি সোয়ামী আমার বিদেশ গৈয়েগই১॥ নানান ফুল ফুড়িয়াছে উড়ে ফুলর বাস। নিত্তি পত্তি২ কাঁদি আমি খসম পরবাস॥ নিমায়া৩ হইয়া তুমি গেলা প্রাণের ধন। প্রেমানলে দিল মোর জ্বলে হামিক্ষণ॥ তোমার লাগিয়া আমি উদাসিনা থাকি। তিন মাসর কথা কহি এখন দিলা ফাঁকি॥ নানান ফুলে উড়ি উড়ি ভমরা মধু খায়। কালা পাখীর বুলি শুনি বুগ ফাড়ি যায়॥ পূগ দুয়ারগ্যা৪ ঘরের মাঝে দক্ষিণাালী বাও৫। এ সময় প্রাণবন্ধু মুখখান দেখাই যাও॥ আমি হৈব ফুল বন্ধু তুমি হৈবা অলি। ঘরেতে থাকিলে বন্ধু মুখে দিতাম পান। কায়া অঙ্গ সঁপি দিতাম কৈত্তাম যৌবন দান॥ এইবার আসিলে তোমার ছান্মে৬ মৈগ্যাম৭ কাঁদি। মাথার চুলর রশি পাঙ্গাই পা রাখিব বাঁধি॥” এইনা ভাবিয়া আয়রা পালঙ্কে শুতিল। ঘুমের ঘোরে আজিমের মুখ স্বপনে দেখিল॥ জোড় পালঙ্কে শুতি কৈন্যা ঘোরে নিদ্রা যায়। কামারের ভাতির মতন নিয়াস ফেলায়॥ বাহিরে গুটগুট্যা ১ আঁধার গহীন হৈল রাইত। সিং কাড়ি ২ ঘরেতে ঢুকিল মনসুরগ্যা ডাকাইত ॥ জ্বালাইয়া মোমের বাত্তি চারিদিকে চায়। পালকেতে হুরপরী দেখিবারে পায় ॥ আউলা ঝাউলা চুল, গায়ে কাপড় নাই। মনসুর আলী চাহি রৈল দুই চোগ পাগাই ॥ তার পরেতে লুচ্চা ৩ মনসুর কি কাম করিল। আয়রার মুখের কাছে মোমের বাত্তি নিল ॥ চমকি জাগিয়া কৈন্যা কাঁপে ঘন ঘন। বারুদের ঘরে আগুন লাগিল যেমন ॥ মনসুর বলিল তখন—“শুন আওরাত। তোমার লাগি মহব্বত প্রেম হইয়াছে কৈলজাত ৪ ॥ আমার আচমানে তুমি পূর্ণিমার চান। যৌবন দিয়া ঠাণ্ডা কর আসকের ৫ পরাণ ॥” গোল্লার আবাজের ৬ মতন মারিয়া চিল্কার ৭। পাড়াপরশীগণে আয়রা ডাকে বারে বার ॥ আসকে মসগুল চোরা হুঁশিয়ার নাই। এক দিষ্টে চাহি রৈয়ে দোন ৮ চোগ পাগাই ॥ ছুড়ি আইল চাইর মিক্যাথুন ৯ লোক লস্করগণ। মনসুরগ্যারে ধরি তারা করিল বন্ধন ॥ কেহ মারে কিল লাথি মাইরর ১০ পড়িল ধুম। ভাদ মাইন্যা তালের মতন পড়ের ঘুমাদুম ॥ কেহ চুল টানে কেহ নাগত মারে ঘুষি। হাতর সুখ করি রৈল যার যেমন খুসী ॥ তারপর গলার মাঝে টোয়াল ১ বাঁধিয়া। হেছেরাই হেছেরাই ২ নিল মুড়ার পন্থ দিয়া ॥ অঘোর জঙ্গলে তারা হইল হাজির। ছুতা ৩ ধরি রৈল ডাকাইত ন লাড়ি ৪ শরীর ॥ বেদম ৫ হইল মনসুর নাগত ৬ শোয়াস ৭ নাই। গলার মাঝে ফাঁসি দিয়া রাখিল ল্ট্কাই ॥ আচানক কথা সেই কি বলিব হায়। ক্ষণিক পরে মনসুর আলী চোগ মেলিয়া চায় ॥ সকলে চলিয়া গেছে নাই কোন জন। ধীরে ধীরে খোলে ডাকাইত ফাঁসির বন্ধন ॥ গাছ হৈতে লামিয়ারে চলে হেলিতেলি। পানির তিরাসে ৮ তার জান যায় নিকলি ॥ কতক্ষণ বসি সেই গাছের তলায়। পাহাড়ী চড়ায় ৯ ডাকাইত পানি খাইতে যায় ॥ (১-১০০) ( ১১ ) আয়রার শেষ দৃশ্য এইরূপে কিছু দিন গত হৈয়া গেল। মনের আগুনে আয়রা বিমারে ১০ পড়িল ॥ শুকাইয়া গেলরে তার সোনার যৌবন। শুকাইয়া গেলরে তার ও চান বদন ॥ ক্ষণে উঠে ক্ষণে বৈসে ভাবনা বিস্তর। একমাসে ন থামিল সান্নিপাতিক জ্বর ॥ মনের যাতনা কৈল্ল্যা কৈব কার ঠাঁই। বিছানাতে পড়ি কাঁদের গড়াই গড়াই ॥ চোগর জলে বালুশ ভিজে, ভিজে বিছান কাথা। জ্বরের গরমে যেন ফাড়ি যারগৈ মাথা ॥ সকলে চাহিয়া কৈল বাঁচিব না আর। আখেরের সম্বল এখন কররে তৈয়ার ॥ সেই দিন না সৈন্ধাকালে সরেঙা না ১ নিয়া। গেরামের ঘাটে আজিম আইল চলিয়া ॥ ঘরেতে যাইয়া আজিম দেখিল্লরে হায়। শোয়াসে শোয়াসে আয়রার জান নিকলি যায় ॥ কলেমা শাদত ২ পড়ে মোল্লা খোন্দকার। দেখিয়া আজিম তখন করে হাহাকার ॥ “পরাণের বিবি আমার উডি কও কথা। বহুত দিন দিয়াছি যে তোমার দিলত ব্যথা ॥ আয়রা বেগূরে আমার কেমনে যাইব কাল। টাকা কড়ি ঘর গিরস্থি হইল বেনাল ॥ কুছাহাতে ৩ গেলাম আমি মাইয়লা উজানে। সাইগরে ডুপিয়া ৪ মৈলাম জান আর পরাণে ॥ তোমারে ছাড়িয়া আমি পাইক্যম ৫ কোন সুখে। কে মুছাইব চোক্কের জল আর কে লইব বুকে ॥ কনে খাইব ধন দৌলত কনে খাইব রে। তোমারে ছাড়িয়া আমি কন পন্থে যাইব রে ॥ জোম বেয়ারের কামাই আমার কনে খাইব রে। আসকের ধন আমার কুঁদে পাইব রে ॥ কুর্ম্মাইর কুলর মিডা পান আর কনে খাইব রে। হাসি মুখেথে আমার মিক্যা কনে চাইব রে ॥ জোড় পালকের খাট আমার থাইল্লা রৈল রে। বুগর ভিতর কেল্লা আমার ফাড়ি পেল রে।” এইরূপে কাঁদি আজিম দোন চোগ ফুলায়। পাড়া পরশী পরবোধ দিয়া পিডে হাত বুলায় ॥ “হয়াত ময়ত রৈয়ে আল্লাজির হাতে। সুখ দুখ দুই আছে দুনিয়াদারীতে ॥” দেখিতে দেখিতে আয়রার শোয়াস হৈল বন। কেবলামুখী কেরে মরা করাইল শয়ন ॥ খাটের উন্নর চিতভাবে শয়ন করাইয়া। জ্বলদি করি অজু বানায় মুখত পানি দিয়া ॥ গরম পানি দিয়া পরে করাইল গোছল। গায়েতে মাখিয়া দিল আতর গোলাপ জল ॥ কাপুরের গুড়া মাখি কাপড়ে তখন। সিনাবদ্ধ ঘোমটা দিয়া পরাইল কাফন ॥ তারপর জানাজার ১ নামাজ পড়িয়া। আওরাতে লইয়া গেল খাটেতে তুলিয়া ॥ মিলিমিশি পাড়াপরশী ভাই বেরাদর ২। ময়দানের মাঝে দিল আয়রার কয়বর ॥ (১-৫০) ( ১২ ) কাফেন চুরী গহিন রাইতে ঝিঁজি ডাকে অন্ধকার ঘোর। ময়দানে চলিয়া আইল সেইরে কাফেন-চোর ॥ সঙ্গে কেহ নাই রে তার সঙ্গে কেহ নাই। খন্দা কোদাল লইয়া রে আইস্তে ৩ গোর কুঁড়িবার লাই ৪ ॥ সেই দিনের মাইরে ৫ হৈয়ে বুগে ৬ পিডে ৭ ধরা। তবু ও আসকের টানে আইস্তে কাফেন চোরা ॥ কয়বর কুঁড়িয়া মনসুর দেখিবারে পায়। বেহেস্তের পরা আয়রা সুখে নিদ্রা যায় ॥ খানিকক্ষণ ভাবি ডাকাইত কি কাম করিল। সিনাবদ্ধ কাফন ধরি একটান দিল ॥ খোদার মরজি কেহ বুঝিতে না পারে। মরা কৈন্যা লড়ি উড়িল ৮ কয়বরের ভিতরে ॥ টানাতানি করে মনসুর ধরিয়া কাফন। আতাইক্যা ৯ চোয়াড় পৈল ঠাডারের ১০ মতন ॥ ভ্যোমরা পাক খাইয়া ডাকু জবিনে গড়ায়। দর দর লৌ তার মুখে বৈয়া যায়॥ তার পরে কি হইল শুন বিবরণ। ভূঁইয়র মাঝে পড়ি মনসুর হইল অচেতন॥ হেঁাস গোঁস নাই রে তার চোখে কাল ঘুম। দুনিয়ার দুঃখ ধাম্ধা ন রৈল মালুম॥ ঘুমের ঘোরে খোয়াবেতে দেখে মনসুর চোরা। কয়বর ছাড়ি আসি আয়রা ছাম্নে হৈল খাড়া॥ হাত নাড়ি বলে কৈন্যা “শুনরে মনসুর। আখেরেের কথা ভাব দুঃখ হৈব দূর॥ ছাড়ি দাও আজি হৈতে দাগা বাজি কাম। নমাজ পড় রোজা থাক রাখবে ইমান॥” খোয়াবেতে বলে মনসুর জোড় করি হাত। “ডাকাতি ন কেল্লে আমার ন জুটিব ভাত॥ ন খাই মরিলে কনে পড়িবে নমাজ। কেমন করি চুরি ছাড়ি নিজের পেশা কাজ॥” আয়রা বলিল তখন “বুঝিবে মরদ। একদিন তোমার দিলে আসিবে দরদ॥ চুরি কর ক্ষোতি নাই শুন আমার কথা। পাঁচ আক্ত নমাজ পড় না কর অন্যথা॥ কন কেহ নহে আপন মিছা দুনিয়াই। হক ছাড়ি কাড়াকাড়ি নাহকের লাই (জন্য)। ভাসিয়া দেখরে তুমি বেহেস্তের পথে। মাথাত লই গুনার গাট্টি যাইবা কি মতে॥ ছাড়িতে না পার যদি চুরি পেশা কাম। পাঁচ আক্ত নমাজ তবু পড়িবা তামাম ॥” খোয়াবেতে কাফেন চোরা মাথা নাড়ি কয়। “পাঁচ আক্ত নমাজ আমি পড়িব নিরচয় ॥” এই কথা শুনি আয়রা হৈল অদর্শন। জমিনে রহিল চোরা ঘুমে অচেতন ॥ (১-৪৬) ( ১৩ ) পরিবর্তন গোজারিয়া১ গেল রাইত হইল বেয়ান। কুড়ার ডাকেতে মনসুর পাইল রে থ্যান২ ॥ খোয়াবের কথা মনে হইল উদয়। কয়বরেতে মরা কেন্যা দেখে সে সময় ॥ তড়াতড়ি উঠি ডাকাইত কি কাম করিল। ফজরের নমাজ আগে পড়িয়া লইল ॥ তারপর আয়রার কয়বরের উপরে। মাটিচাপা দিয়া গেল আপনার ঘরে ॥ গোমর৩ মতন থাকে মনসুর আগের মতন নাই। পাঁচ আক্ত নমাজ পড়ে মোচইদেতে৪ যাই ॥ দলবল আসে যায় চুরির কারণ। ভালা করি নাহি বুঝে ছরদারের মন ॥ কেহ বলে—“বিমার হৈয়ে দিলে নাই খোস”। কেহ বলে—“মাঠর খাইয়া হারাইয়াছে হোঁস” ॥ এইরূপে নানান কথা ভাবিয়া চিন্তিয়া। এক দিন কহে তারা সামনে খাড়া হৈয়া ॥ “শুন শুন ওস্তাদজি আজ তোমার কাছে কহি। খাওন বেগরে ১ মোরা মরিয়া যাইরগই ২ ॥ এতদিন পালাইলা রাপের সমান। ভোনের ৩ জ্বালায় এখন নিকলি যায় জান ॥” মনসুর তখন কহে “শুন দোস্ত জন। ডাকাইতি করিব আজি কর আয়োজন” ॥ কাঁচা পার হৈল তারা শিলকের মুখে। গুদাম কোটা দেখিবারে সেই বাড়ীতে ঢুকে ॥ অমাবস্যা রাইতের নিশি ঘুটগুট্যা ৪ আঁধার। বাড়ীর পিছর পন্থ দিয়া চোরর দল যার ॥ ধারে ধারে গেল তারা পিছের ডেইয়ার ৫ কোণে। যদি কেহ চেতন থাকে,—কান পাতিয়া শুনে ॥ সাড়া শব্দ নাই কারো নিঝাপ ৬ সকল। পরামর্শ করে তখন মনসুর চোরার দল ॥ বাইং দুয়ার ৭ দি রৈল কেহ, কেহ সিং কোড়ে। ছুরদার মনসুর একা পরবেশিল ঘরে ॥ জোড় পালঙ্কের খাটের মাঝে রঙিলা মশারী। দৌলতদার শুইয়া আছে লৈয়া দোন্দর নারী ॥ বড় এক ছন্দুক ৮ আছে হিথানে তারার। থাবা দিয়া তাল বাজায় চোরা বারেবার ॥ অঘোরে ঘুমায় তারা থান ৯ না পাইল। ১০ সর চাবি দিয়া চোরা ছন্দুক খুলিল ॥ ছন্দুক খুলিয়া পাইল টাকা তোড়া তোড়া । আষ্ট অলঙ্কার আর সাল জোড়া জোড়া ॥ দামী মালমাত্ত। সব করিয়া বাহির। ভাবিতে লাগিল মনসুর মাথা করি স্থির ॥ এন্মিকালে কুড়ায় ডাকি জানাইল ফজর। খাপ্দি চাহি দেখে ডাকাইত হৈতেছে পহর ॥ আছ মানেতে তারা নাহি পূগর দিক লাল। দূরর তুলাগাছত বসি ডাকিছে কুড়গাল ॥ মোছৈদেতে আজাহাত দিল মোল্লাগণ। “লা-এলাহা-ইল-আল্লাহ” ডাকে মনসুর তখন ॥ ফজরের নমাজ পড়ে হোঁস গোঁস নাই। দলর মানুষ পাড়ি দিল নিজের জান বাঁচাই ॥ তকবীয় করিয়া ডাকাইত দিল এক ডাক। গিরছ উড়িয়া দেখি হইল অবাক ॥ নমাজ হইলে শেষ গিরছ আসিয়া। মনসুরের পরর উয়র রহিল পড়িয়া ॥ কোন আউলিয়া তুমি আইলা কোন পীর। পরিচয় দিয়া আমার মন কর স্থির ॥ মনসুর বলিল “আমার কাফন চোরা নাম। দুনিয়াতে করি আমি দাগা বাজি কাম ॥ নাহি অন্য পেশা আমার চুরি করি খাই। তোমার ঘরে সিং দিয়াছি মালমান্তার লাই।” গিরস্থ বলিল তখন—“ঝুটা কেন কহ। তোমার পায়ের তলায় মোরে আজি লহ ॥ এই বলি সেই গিরছ কি কাম করিল। বেশুমার ধন দৌলত মনসুরের দিল॥ দৌলত আনিয়া মনসুর আপনার ঘরে। ভাগবাটরা করি দিল দলের লোকেরে॥ তারপর ঝোলা একটা পিড়েতে লইয়া। জঙ্গলের পন্থে ডাকাইত গেল যে চলিয়া॥ কতকাল গতরে হৈয়া গেলরে তারপর। কাফনে চোরার কেহ আর না পাইল খবর॥ মাঝে মাঝে জঙ্গল হৈতে আসে এক পীর। কদমে কদমে জপে আল্লাহর জিকির॥ মাঝে মাঝে দেখা যায় ময়দানের উপরে। আয়রার কয়বর পীর জেয়ারত করে॥ সমাপ্ত